সুব্রত গুহ
চোখের সূক্ষ্ম নাড়াচাড়া দিয়েই, খুব জলদি দরোতেয়া, দেখে নিল দেওয়াল ঘড়িটা। ওর কপালে মুক্তোর মত ঘাম জমেছে। রাত এগারোটা পঁয়তাল্লিশ।
বেশ দেরি হয়ে গেছে। সন্ধে ছ’টা নাগাদ এক্সোরসিজম শুরু হয়েছিল।
চল, চ...ল – ক্লান্ত স্বর ফিসফিস করল।
আবিষ্ট মেয়েটি, যাতে নিজের বা অন্যের ক্ষতি করতে না পারে, তাই তাকে খাটের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছিল। তার মুখ দিয়ে বেরোচ্ছিল গ্যাঁজলা, লালা।তার দাঁত দু-পাটি এমনভাবে আটকানো যেন দুটো মিশে একটাই পাটি হয়ে গেছে। তার মধ্য দিয়েই লালা গড়াচ্ছে।
তার চোখের মধ্যে ঘৃণার চাইতেও লালসা আর হিংস্রতার এক অদ্ভুত মিশ্রণ, যা বারো বছরের মেয়ের জন্য খুবই অস্বাভাবিক।
বিপরীতভাবে দরোতেয়া, যদিও ভূত তাড়ানোর কাজ করে, কিন্তু সে নিজে ব্যাপারটা বিশ্বাস করে না। সে অন্য জগত সম্পর্কে অনেককিছু জানে। বিভিন্ন আধ্যাত্মিক স্তরের অনেক কিছু। ছোটবেলায় ঘুমের মাঝে সে এইসব জায়গায় ঘুরে বেড়াত।
ওই কচি বয়সেই সে স্বপ্নের লাইব্রেরি এবং সমষ্টিগত অজ্ঞানতার দুঃস্বপ্নে সে ঢুকতে পারত। সে জানত যে কিছু দৈত্য যথেষ্ট বন্য,আর তাদের সহজে পোষ মানানো যায় না। ধর্ম বিশ্বাসের দ্বারা তাদের তাড়ানো যেতে পারে। কিন্তু এই ব্যাপারটা ভিন্ন। এটা একেবারেই অন্যরকম।
একজন যাজক, একজন নিরাময়কারী, দু’জন ধর্মপ্রচারক, এরা সবাই মিলে চেষ্টা করেও যখন কিছু করতে পারেনি বা বলা যেতে পারে ব্যর্থ হয়েছিল, তখন মেয়েটির আত্মীয় স্বজনরা দরোতেয়াকে ডাকার সিদ্ধান্ত নেয়।
ফাদার কার্বাসের পদ্ধতিটা স্মরণ করে সে মেয়েটির বাঁ কানের কাছে মুখ নিয়ে, যে সত্ত্বা মেয়েটিকে যন্ত্রণা দিচ্ছে, তাকে বলল মেয়েটিকে ছেড়ে দিতে।
যা হয়েছিল। লুসিফুনো রোফোকালে উত্তর দিল। যদি ওই আত্মা, কোন শরীর পায় যাতে সে আশ্রয় নিতে পারে, এ রকম কিছু পেলে সে মেয়েটিকে ছেড়ে দিতে পারে।
দরোতেয়া পরিস্থিতির কথা চিন্তা করে, বুঝতে পেরেছিল যে এ কোন দৈত্য নয়। সুতরাং এর সঙ্গে ব্যবস্থাপনা করা যেতেই পারে।
-ঠিক আছে–সে একমত – কিছু শুধুমাত্র একবার আমার শরীরে ঢুকতে পার।
ভিতরে থাকতে থাকতে লুসিফুনো রোফোকালে হাসল। ঠিক যেমন একজন চালাক ছাত্রের সামনে একজন ভাল শিক্ষক হাসেন।
তাছাড়া মহিলাটি, সুন্দরী, খুব স্মার্ট আর অত্যন্ত সাহসী।
আর সে জানত (শয়তান জানে বেশি যখন তার বয়স বেশি হয়) এবং বুদ্ধিমান হিসাবে তার প্রতিপক্ষের বিশ্বাসের অভাব বুঝতে পারছিল। এটা ঠিকই যে মহিলাটি তাইই করেছিল যা সে চেয়েছিল, কারণ সে জানত যে সে ডিভাইনের পক্ষে নয়।
সে তার প্রেমে পড়ে গিয়েছিল। একটা নিখুঁত স্ত্রী আর প্রেমিকা পাওয়া যাবে।
-তাই হোক – লুসিফানো রোফোকালের উত্তর।
মেয়েটির শরীরে হঠাৎ কাঁপুনি শুরু হল। শুরু করল বমি করতে। কিন্তু অর্ধেক হজম করা খাবারের পরিবর্তে তার মুখ দিয়ে তরল ধোঁয়ার এক অবিরাম স্রোত বেরিয়ে আসা শুরু হল। মনে হতে লাগল যে তার দমবন্ধ হয়ে যাবে। যেন এইবার তার অন্ত্র তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসবে।
দরোতেয়া তার অভিজ্ঞতা থেকে জানত দৈত্য বা ভূতেদের মধ্যে কোন রকম নরম ভাব নেই। তাই তারা যা করবে, সব ধীরে সুস্থে করবে এ ব্যাপারটাই ভাবা যায় না। তারা এটা চিন্তাই করতে পারেনা। ফলে দরোতেয়া বাচ্চাটার জন্য খুবই ভয় পাচ্ছিল। আর ওই ভয়ের সঙ্গে, পুরো ঘটনার বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ করছিল।
ওই ধোঁয়া ক্রমশঃ একটা ত্রিমাত্রিক সিল্যুয়েট অবয়বের রূপ নিল। পরে তা বদলে গেল এক তরুণ যুবকে। বেশ লম্বা, লাল চুল, রাজার মত পোষাক পড়া, একটা বিশাল রুবির আংটি তার অনামিকায়। রাজকীয় সোনার সাপ তার কড়ে আঙুলে জড়ান।
দরোতেয়া কেমন যেন একটু হতবাক হয়ে গেছে।বেশ কয়েকবার ঢোঁক গিলে নিয়েছে। ভাবখানা এমন যেন সে কথা হারিয়ে ফেলেছে। লোকটিকে দেখে তার মনে হল এই সেই মানুষ যার জন্যে সে এত বছর অপেক্ষা করে আছে।
তাকে খুব ভাল করে দেখে তার মনে হল যে তার জীবনের শ্রেষ্ঠ ভূত তাড়ানোর কাজ সে করে ফেলেছে। আর আজ পর্যন্ত তার শূন্য জীবনে যত কাজ সে করেছে, তার মধ্যে আজই সে সব চাইতে ভাগ্যবান।
-ঠিক আছে একবারই – কিন্তু ওটা আমার বাড়ীতে হবে।
বলা হয় যে দুটো বিশাল পাখনা প্রায় দেবদূতদের যেমন থাকে, শুধু তফাৎটা হচ্ছে পালকগুলো কালো। ওই পাখনা দুটো তার রাজকীয় কাঁধের ওপর থেকে বেরিয়ে এল।কয়েকবার পালকগুলোকে ঝেড়ে নিয়ে,পাখনা দুটো ঝাপটে নিল বার কয়েক। তারপরই সে ধরল তার উড়ান। তার আগেই তরুণী তার গলা জড়িয়ে ধরেছে।
একটা দমকা হাওয়া জানালাকে হাট করে খুলে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যুগলরা দিগন্তে মিলিয়ে গেল।
আজ পর্যন্ত দরোতেয়া ফিরেও আসেনি, খবরও পাওয়া যায়নি।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন