ধূসর গুবরে পোকা

সুব্রত গুহ

লাইব্রেরীর কার্পেটের ওপর শুয়ে, জীবনের প্রথমবার খেয়াল করলাম যে গুবরে পোকাগুলো বইয়ের দোকানের চারপাশে ঘুরঘুর করে। প্রতিরাতেই তারা তাদের সভা বসায় দেওয়ালের কাঠে আর্দ্রতা একটা ফুটো করেছে, সেখানেই তারা সব মিলিত হয়। ওরা সব বইয়ের দোকানের পেছনে চলে যায়, বিশেষত যখন খুব ভীড় থাকে।

চেয়ারের ওপর স্থির হয়ে বসে, ঘরের খোলা জানালা দিয়ে ওদের আমি দেখতে থাকি। সব চাইতে উঁচু ঘাসটা খুঁজে তার ওপর বসে ডানা ছড়িয়ে দেবে। এমন করে যাতে সবাই ওদের দেখে। সবাই ওদের গন্ধ পায়। সারা রাত ধরে, এইরকমভাবে বাতাসে প্রায় হতচেতন হয়ে থাকে। ওদের গন্ধটা খুব খারাপ না, যেন সূর্যের কোন মলম।

আমি একটাকে পছন্দ করলাম। বেশ ভারী চেহারা, প্রাণবন্ত, হালকা পদক্ষেপ ধূসর গুবরে পোকা। খুব ছোট নয়, আবার সবচাইতে বড়োও নয়। খুব সুন্দর নয়, উজ্জ্বলও নয়। যে বিশেষ মনোযোগ আকর্ষণ করে, যখন ওরা কাজ করে। ও নিঃসঙ্গ আর নিজেতে নিজে মগ্ন। নিজের সঙ্গী সাথীদের দিকেও নজর দিত না।

অন্যান্য গুবরে পোকাদের সঙ্গে কথা বলার সময় তার ভাবভঙ্গি (এটা কয়েকবার করেছে) এবং তার পূর্ণ মনোযোগের অভিব্যক্তি, যা তারা রাতে করে থাকে, সেটাই আমাকে ওর প্রতি আকৃষ্ট করেছিল। সেই জন্যই ও আমার পছন্দের ছিল।

কোন এক সকালে ওকে আমি অন্য সকলের থেকে আলাদা আর দূরে থাকতে দেখলাম। কিন্তু অন্য সবার মত গোবরের ডেলা ঠিকই তৈরি করছিল। আমিও অপেক্ষা করছিলাম যে আর একটু দূরে যাক, যাতে ওকে কিছু প্রশ্ন করতে পারি। সেইসঙ্গে এটাও আমার মনের ইচ্ছা ছিল যে কেউ যেন আমাদের কথা শুনতে না পায়।

এটাও লক্ষ্য করেছিলাম যে মাঝে মাঝে ওরা কেমন একে অন্যের সঙ্গে পুরো প্যারাগ্রাফ বলছে। আবার সেই সময়ে কেউ হয়ত তার পেছন দিকটা বিচার করছিল। যখন সুযোগ হল, তখন কথা শুরু করলাম।

আমি অবাক হয়ে গেলাম যে আমার হঠাৎ কথা বলতে এগিয়ে যাওয়াটা তাকে মোটেও অবাক করেনি। উপরন্তু তার সুন্দর হাসি দিয়ে সে আমাকে অভিবাদন জানালো। খুব বেশি সময় আমার পরিচয় অথবা ভূমিকাতে নিইনি। তারপরই আমার প্রশ্নটা করলাম। কেন রাতের দিকেই তারা গন্ধ ছড়ায়। কথাবার্তা অথবা সংলাপ মোটেও ছোট ছিল না, বরং অত্যন্ত বিস্তৃত ছিল।

তার মতে,এটি তাদের পারিবারিক উত্তরাধিকার সূত্রে পরিণত হয়েছিল। এবং তা প্রবাহিত হয়েছিল প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের মধ্যে।আর এটা পরিচালিত হত বয়স্কদের দ্বারা।

সে আর গুবরে পোকা রইল না, মহিলা হয়ে গেছে। ও বলল যে যদিও সে রিচুয়ালে বিশ্বাস করে না, তা সত্ত্বেও সে এটা করে যায় তার কারণ রাতের মৃদুমন্দ বাতাসের সঙ্গে গন্ধ মেশানোতেই তার অন্যরকম অনুভূতি, অন্যরকম আনন্দ হয়। এই ধারণাটাই ওর খুব ভালো লাগে। আর রাতে বেরিয়ে ওই বাতাসে শ্বাস নেওয়া তার কাছে খুবই আনন্দদায়ক।

কিন্তু অন্যেরা, আমি প্রতিবাদ করি।তারা তো ঐতিহ্যের অন্ধ ক্রীতদাস। এবং এটাতে তাদের অবদান আছে।

ধূসর গুবরে পোকা আমার কথাগুলো কোন প্রতিবাদ ছাড়াই শুনলো। কোন প্রতিবাদ, কোন অজুহাত অথবা কোনরকম বিরুদ্ধ কথা বলেনি। সে রাতের ধ্যানের পণ্য সব শুনল, সেই সঙ্গে শুনল আমার তৈরি করা যুক্তি। সে যথেষ্ট লজ্জিত ছিল,তার সময় এবং তার পূর্বপুরুষদের কাজের জন্য।আমাকে যুক্তি দিয়ে সবকিছু বোঝাবার চেষ্টা করছিল।

সন্ধ্যে হয়ে আসছে এইবার সমাবেশে যেতে হবে। আমি তাকে বাইরে থেকে দেখছিলাম। এবং অন্যদের প্রতি আরও কম নজর দিয়েছিলাম।ও ছিল চিন্তিত ও বিক্ষিপ্তচিত্ত। সে চলে গেল তার গন্ধ ছড়াতে, তার হারানো দৃষ্টি নিয়ে। এবং প্রথমবারের মত অন্যদের সঙ্গে যারা ঐতিহ্যে বিশ্বাসী আর তাদের ভয় ছিল একাকীত্ব এবং সমালোচনার। কিন্তু তারা তাকে তাড়াতাড়ি ছেড়ে দিয়েছিল কারণ বাধ্যতামূলক ব্যাপারে তার বিরক্তি।

আমি তাকে গর্তে ফিরে যেতে দেখলাম। কখনও কখনও আমার মনে হয় যে আমার চোখ হয়ত কোনভাবে আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করছে। কুড়ি সেকেন্ডের বেশী আমি কারও দিকে তাকিয়ে থাকতে পারিনা, বিশেষতঃ গভীর মনোযোগের সঙ্গে। অন্তত আমার চোখে ভার অনুভব না করে।

ধূসর পোকার সঙ্গেও একই ব্যাপার। সে জানত কোথায় দু সেকেন্ডের জন্য আমাদের দৃষ্টি মিলিত হবে। দেওয়ালের মাঝে সে অদৃশ্য হওয়ার আগে।

ঘুমাতে গেলাম। যথেষ্ট সন্তুষ্ট হয়ে কিন্তু সেই সঙ্গে কিছু দোষী মনোভাব নিয়ে। তৃতীয় দিন তার মতাদর্শ পরিবর্তনের প্রকল্পে ভোর হয়ে এল। ধূসর পোকা মনে হচ্ছে তার চিন্তায় হারিয়ে গেছে, আমার মত।তার মুখ দেখে মনে হচ্ছে সে নিজেই নিজের ওপর বিরক্ত।

উঠোনে বেরিয়ে এলাম, কয়েকটা পাক দিয়ে দিলাম। এর মধ্যে ওরাও বেরিয়ে পড়েছে আর ঘোড়ার বিষ্ঠা দিয়ে বল তৈরি করছে। সেও বেরিয়ে এল, অন্যদের সঙ্গে। আমিও সেই জায়গায় যেখানে ও ছিল। কিন্তু চোখের কোণ দিয়ে দেখে এবার ওকে অন্যদের থেকে আলাদা করতে পারলাম না। এইভাবে পরদিন কাটিয়ে দিল আর আমাকে এড়িয়ে গেল। হয়ত ভাবছিল আমার আগের দিনের কথাগুলো। আমার নিঃসঙ্গ লাগছিল।

আমার কেমন যেন মনে হচ্ছিল, ওই ধূসর পোকার নীরবতা আমাকে এক ভয়াবহ একাকীত্বের অনুভূতি দিয়েছে। সারারাত আমি তার সুন্দর হাসি থেকে বঞ্চিত হলাম। আমি ওই বিষণ্ণতা নিয়ে গভীর ভাবে চিন্তা করলাম, সে রাতে পোকাদের কাজে তার সংক্ষিপ্ত সংযোগ নিয়ে। আগের রাতের চাইতে সে অনেক আগেই চলে গেল।

আমি জানতাম যে ওকে আমি দেখেছি, সেও জানত আমাকে কোথায় পাওয়া যাবে। কিন্তু সে একবারও ফিরে তাকাল না।

সেদিন অন্যান্য দিনের থেকে অনেক আগেই শুতে গেলাম।

তৃতীয় দিনে যখন ঘুম ভাঙ্গল ভোরের কোন চিহ্নই নেই। এটাই হচ্ছে প্রকৃষ্ট সময় যখন ধূসর পোকাকে অপহরণ করা যায় অথবা তার সঙ্গে একাকী কথা বলা যায়। কেন যে সে এইভাবে আমাকে এড়িয়ে যাচ্ছে!

আমি লক্ষ্য রাখলাম বইয়ের দোকানের চারপাশ। জানি সে নিজের চিন্তায় বিভোর, আর তার ফলে পিছিয়ে পড়বে। বইয়ের পাশে আমি কুঁজো হয়ে পড়েছিলাম। এটার কোন দরকার ছিল না। অকারণ অস্বস্তি। ধূসর পোকা ভাবনায় হারিয়ে গেছে। তার স্থিতিবোধই নষ্ট হয়ে গেছে। সবার পিছনে পড়ে, সিলিং এর দিকে তাকিয়ে রয়েছে।

আমার সামনে চুপচাপ দাঁড়িয়ে। এক পা এগিয়ে সোজা আমার নাকের সঙ্গে ধাক্কা খেল। ওকে কথাই বলতে দিলাম না। দু আঙুলের মধ্যে ওকে নিয়ে সোজা বসার ঘরে চলে গেলাম দৌড়ে।

আমি তার মুখের মধ্যে ঘৃণার কুঞ্চন অবজ্ঞা করতে পারিনি, যখন হাতটা খুললাম। ‘তুমি কথা বলতে চাইছ না কেন’? প্রশ্নটা যখন করলাম, সে একটা বিদ্রূপাত্মক হাসি দিল।

হঠাৎ সে বলে উঠল,আমি জানি না,এটা তোমাকে এত প্রভাবিত করছে কেন? আমাদের একটা স্বভাব আছে – বলেই, আমার দিকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল। ‘কেন সবাই বদলে যাবে’? ‘কি ক্ষতি, যদি যে যার মত কাজ করে’?

সে যা বলল, সবই শুনলাম, কোন কারণ, কোন অজুহাত অথবা একটা কথাও বলিনি, এর বিরুদ্ধে। শুনেছি যে রাতের ধ্যানের পরিণাম আর তার তত্ত্ব অন্যদের বোঝাতে গিয়ে, সময়ের জ্ঞান হারিয়ে আমি লজ্জিত।

তাকে কারণ বোঝাতে চাইলাম।গুবরে পোকার গন্ধ আমার কিছু খারাপ লাগে না।

পরের কয়েকদিন, আমি নিজেই নিজের ওপর বিরক্ত।আর এই কয়দিন ধূসর পোকাকে এড়িয়ে চললাম। রাস্তায় বেরোতে শুরু করলাম, মাথাটা পরিষ্কার করার জন্য। সে ঠিকই ছিল। অজ্ঞতা খুবই সুন্দর। জারের বাইরে থেকে ওদের দেখতে আকর্ষণীয়। কিন্তু এর চাইতেও আকর্ষণীয় এর মধ্যে ঢুকে পড়া আর কিছুক্ষণ পরে বেরিয়ে আসা। আর ওরা যদি আমাকে, ফিরে আসতে ডাকে, তা হলে শুনবো, হাসবো, চলে যাবো।

কয়েকদিন পরে,ঠিক করলাম,বাড়ী ফিরে যাব। ধূসর পোকাকে উঠোনে খুঁজলাম। তার কথা তার সঙ্গীদের জিজ্ঞেস করলাম। তারা আমাকে রাতে ঘাসের ওপর বসতে বললো।পরদিন আমি ওর ভাইদের সঙ্গে দেখা করলাম।

তার শেষ খবর যা পেলাম, তা হল একটা ক্যানারি পাখি যে সবে উড়তে শিখেছে সে ধূসর পোকাকে খেয়ে ফেলেছে।

সমাপ্ত

অধ্যায় ১৯ / ১৯
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%