সুব্রত গুহ
পনেরো মিনিট আগে আমি গাড়ির মধ্যে ছিলাম। নোয়েল পেটশপে তার পশুগুলো বেচতে গিয়েছিল। আমি বসে বসে দেখছিলাম বাইরে থেকে। শপ উইন্ডো দিয়ে সব দেখা যায়।
নোয়েল শেষ পর্যন্ত তাদের থেকে মুক্তি চাইছিল। আমাকে সেইজন্য সাহায্য করতে বলেছিল যাতে ওইগুলোকে তুলে দিতে পারি। তারপর নিয়ে যাব সেই ভেট এর কাছে যিনি তাদের কিনে নেবেন। ভেট, একজন বয়স্ক লোক, টুপি পড়া। পশুগুলোকে দেখে আমার বেশ মজা লাগছিল।
কুকুর আর বেড়াল নিয়ে ওনার কোন আপত্তি ছিল না, কিন্তু তোতাপাখি নিয়ে আছে। তার মানে পশুরা সাধারণত উদাসীন হয়। মনে হয় সত্যি। কারণ নোয়েল ওদের পেট ভরে খেতে দিত না। যাইহোক, শেষ পর্যন্ত চুক্তি শেষ করা হল। কুকুর, বেড়ালের জন্য টাকা নিয়ে, তোতার খাঁচাটা সঙ্গে নিয়ে এসে, খাঁচাটা রাখলো সীটের পেছনে।
একটা সিগারেট বার করলাম। সবে ধরাতে যাব নোয়েল একেবারে হাঁ হাঁ করে উঠল। তোতা নাকি অসুস্থ হয়ে পড়বে সিগারেটের ধোঁয়ায়। বিরক্তিকর।এটা আমাদের জন্য যত সমস্যার সৃষ্টি করবে। গজগজ করতে লাগলাম। নোয়েল হঠাৎই গাড়িটা পাগলের মত ঘুরিয়ে নিল।
জিজ্ঞেসই করতে চাইনি, আমরা কোথায় যাচ্ছি। কারণ আমার মনে হয়েছিল এটা অনিশ্চিত। নোয়েল চালাচ্ছিল আস্তে খুবই আস্তে। ঘন্টা খানেক যাওয়ার পর শহরের প্রান্তে এসে পৌঁছলাম। গাড়িটা রাখল একটা পুরনো বাড়ীর সামনে। দোতলা বাড়ী, সামনে একটা লোহার রড থেকে বিয়ারের লেবেল ঝুলছে। হাওয়ার সাথে সেটা এমনভাবে দুলছে যে মনে হচ্ছে এক্ষুনি পড়ে যাবে।
নোয়েল গাড়ি থেকে নামল, পাখিটাকে নিয়ে কি করবে আমি জানিনা। ভাবছিলাম হয়ত পাখিটাকে ওখানে রেখে দেবে, তারপর ওর ভাগ্যে যা আছে তাই হবে। অথবা পোষা পায়রার মত ওকে উড়িয়ে দেবে। কিন্তু না। আমার ভাবনায় ভুল ছিল। একটা কাঠের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ও কাকে কয়েকবার ডাকল। এক মহিলা সংক্ষিপ্ত পোষাকে দরজা খুলল আর সঙ্গে সঙ্গেই জড়িয়ে ধরল নোয়েলকে। কিছু ব্যাপারে তারা কথা বলল, আর দুজনে দুজনের পিঠ চাপড়ে দিল।
ব্যাপারটা আমি ধরতে পারিনি। কারণ শয়তান পাখিটা সারাক্ষণ ডেকে গেছে। শেষ পর্যন্ত সিগারেটটা ধরাতে পারলাম। নোয়েল ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। আমার অপেক্ষা করা ছাড়া কিছু করার নেই। সীটটাকে হেলিয়ে দিলাম।
দূরে কয়েকটি মেয়ে এক্কাদোক্কা খেলছে। আকাশটা অন্যান্য দিনের চাইতে আজ খুব বেশি ঝকঝকে লাগছে। বেশ গরম। এই মাসগুলোতে এই রকমই হয়। একটা বাচ্চা সাইকেল চালিয়ে চলে গেল, রুটির বাক্স মাথায় নিয়ে। একজন বয়স্ক লোক বাড়ীর বাইরে কাঠের চেয়ারে বসে আছে। সারাক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে, চোখ আর সরাচ্ছেই না।
পাখিটা চুপ করছেই না, চেঁচিয়েই চলেছে। গাড়ি থেকে বাইরে বেরিয়ে এলাম। বাড়ীটাকে ভাল করে জরীপ করলাম। নোয়েলকে খোঁজার জন্য একটু এদিকওদিক দেখলাম। কোথাও কোন চিহ্নই নেই। যেন উবে গেছে। প্রত্যেকটা জানালা ভাল করে বন্ধ। কিন্তু কাছে যেতেই ভেতর থেকে হাসির আওয়াজ ভেসে আসছে। একটা তো অবশ্যই নোয়েলের। অন্যগুলো মহিলাদের। কেউ কেউ মনে হয় খুবই অল্পবয়সী।
কাঠের মধ্যে কিছু ফাটল ছিল। সেখানে চোখ রেখে দেখলাম, নোয়েল একটি মেয়েকে জড়িয়ে ধরে বসে আছে। মেয়েটি ওর কোলের ওপর বসে। সত্যিটা বড় তাড়াতাড়ি বুঝে গেলাম।
ও মহিলা নয়, একটা অল্প বয়সী মেয়ে, এই প্রায় চোদ্দ পনেরো বছরের হবে। স্বল্প বসনা টেবিলে বিয়ার দিতে ব্যস্ত। নোয়েল গ্লাসে কয়েকটা চুমুক দিয়ে মেয়েটিকে তুলে নিয়ে গেল যেখানে তক্তা পাতা ছিল বসার জন্য, সেখানে ওরা হারিয়ে গেল।
ওখান থেকে সরে এলাম, গাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। ওই বয়স্ক লোক, কাঠের চেয়ারে বসে, আমার দিকে তাকিয়েই রয়েছে। আরেকটা সিগারেট ধরালাম। শেষ পর্যন্ত নোয়েল বাড়ীটা থেকে বেরিয়ে এল। তার শার্টটা খোলা। এসেই গাড়ির পেছনের দরজা খুলে পাখিশুদ্ধ খাঁচাটা নিয়ে আবার ওই বাড়ীর দরজার দিকে গেল। স্বল্পবসনা, দরজাটা খুলল তারপর ভেতরের দিকে চেয়ে কাউকে ডাকল।
মেয়েটি রাস্তায় বেরিয়ে এল। তার গায়ে একটা স্বচ্ছ জামা, ফলে তার স্তন দেখা যাচ্ছে। পরনে একটা ছোট মিনি স্কার্ট। নোয়েল, তোতাটা ওদের দিয়ে, কয়েকটা টাকাও দিল আর মেয়েটির মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। নোয়েল গুডবাই বলে ওই স্বল্পবসনার নিতম্বে চাপড় মারল।
গাড়িতে উঠেই স্টার্ট, আবার শহর ঘুরে যেতে শুরু করলাম। যতক্ষণ না সিগনালের লাল আলোতে দাঁড়ালাম। নোয়েল আমার দিকে ফিরে, অনুরোধ করল ‘আমান্দাকে কিছু বোলো না’।
আমি কোন উত্তর দিতে পারিনি। সিগারেট বার করে ওকে একটা দিয়ে, নিজেও একটা ধরালাম। বাইরে একটা বাচ্চা, কুকুর নিয়ে বেরিয়েছে। কুকুরটা ঠিক নোয়েল যেটাকে বেচে দিয়ে এসেছে সেটার মত দেখতে।
শেষ বিকেলের আলো ফিরিয়ে নিয়ে এল উষ্ণতা। শহর আরেকটা রাতের জন্য তৈরি হচ্ছে।
আমার কেবলই ওই চেয়ারে বসা বয়স্ক লোকটির চোখের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে।কিছুতেই ভুলতে পারছি না,যেভাবে আমার দিকে তাকিয়েছিলেন। কিছু একটা করতে হবে, যাতে চোখ দুটো ভুলতে পারি।
ওই পুরনো বাড়ীর সামনে বসে, মেয়েটিকে একটু একটু করে বড় হতে দেখেছেন। আজ তার হাতে একটা তোতাপাখি যে কখনও চুপ করে না, সব সময় কিচির মিচির করে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন