সুব্রত গুহ
ঠিক সকাল তিনটে, তিন মিনিট, তেত্রিশ সেকেন্ডে কেঁপে উঠল। এমনই যেন মনে হল। কেউ একটা গোপন বাঙ্কারে বসে, যেখানে ম্যাপে ভর্তি আর লাল লাল বোতাম, পুরোটা আগে থেকে ছকে রেখেছে। আমি সবসময় অঙ্কের ব্যাপারে বা সংখ্যাতত্ত্বে পাকাপোক্ত অর্থাৎ পারফেকশন পছন্দ করি।
তখন খুবই ছোট ছিলাম। সে দিনটা ছিল ফেব্রুয়ারি ৭৬ সালের। আমি ওই রাতের ছবি পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে মনে করতে পারি। আমাকে ঘুম পাড়ানো হয়েছিল যাতে বাবা আমাকে বাইরে নিয়ে যেতে পারে।
মা বসেছিল সাতমাসের অন্তঃসত্ত্বা। আমার ছোটটা তার কোলে শুয়ে গভীর ঘুমে মগ্ন।
হঠাৎই কাকারা, খুড়তুতো ভাইরা, দাদু ঠাকুমাদের সঙ্গে এসে হাজির। তারা যে আসবে তা কেউই জানত না। একেবারে অপ্রত্যাশিত।দাসীরা নীরবে কেঁদে চলেছে। আর ভোরের প্রথম আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে ট্রে ভর্তি করে মাফিন আর গরম কফির পট নিয়ে এসে হাজির।
আমার কাকা চিৎকার করে উঠল। কারণ আমরা, তুতোভাইরা মজা করে ভাঙা কাঁচের টুকরো নিয়ে খেলছিলাম। তখনও বুঝতে পারিনি যে উনপঞ্চাশ মিনিট, যে সময়টুকুতে ভূমিকম্প হয়েছে, তাতে বেশ কিছু লোক মারা গেছে। পরে এটা অনুমান করা হয়েছিল, তিরিশ হাজার লোক।
অবশ্য কিছুই বুঝতে পারিনি। কিন্তু মজা করার ব্যাপারটা খুবই খারাপ হয়েছে।
-কারাদাখিয়ান, এদিকে এসো।
ওর নাম বেণী। ও আমার বাবার সব চাইতে ছোট ভাই। এখনও বিয়ে করেনি। অবিবাহিত। আমি জানি না, কেন আমাকে কারাদাখিয়ান বলে ডাকে। আমাকে বলেছিল, যে মার্কিন কারাদাখিয়ান, আর্জেন্টিনার একজন নামী ফ্রিস্টাইল কুস্তিগীর। উনি রিং এ একজন টাইটান বা দানব।
-বুঝতে পারছ কি হচ্ছে!
মাথা নাড়ালাম। আমি চেষ্টা করলাম টুক করে পালাতে। চাইছিলাম আমার প্রধান আকর্ষণ খেলায় ফিরে যেতে। কিন্তু কাকা যেতে দিলে তো। আমার হাতটা ধরে রেখেই প্রশ্ন – শোন, তুমি জান? নাকি জাননা?
আমি শুধু এটুকুই জানতাম। সত্যি কথা। যে ওখানে কোন স্কুল ছিল না। আর আমার তুতোভাইরা আমাদের সঙ্গে মাত্র কয়েকদিন থাকবে।মাথাটা কেমন যেন ঝিমঝিম করছে। কারণ সব কিছুই কেমন যেন কাঁপছে।
যদিও তিনি ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে কোরিয়ার কোম্পানি পেতাম্পায় কাজ করতেন, বেণীকাকা সবসময় চোখের সামনে থাকতেন। গাড়ির ঠিক পেছনের বসার জায়গার ওপরে, ভলান্টিয়ার দমকর্মীর লাল শিরস্ত্রাণ মাথায় দিয়ে।
আমার খুব ভাল লাগত।নিজেকে বেশ নিরাপদ মনে হত।আমার নিজের কেমন যেন সুপার ম্যান,সুপার ম্যান মনে হত। খুবই সাধারণ একজন মানুষ। কর্মঠ। এতই সাধারণ যে মাঝে মাঝে বিরক্তিকর লাগত। শুধু গাড়ির পিছনে গিয়ে তার ইউনিফর্ম বদলেই নায়ক হয়ে যেতে পারে। যত রকমের ক্ষমতা আছে, সব ধরণের ক্ষমতা অর্জন করতে পারে।
এটা আমাকে এক ধরণের আশা দেয়। আমার মনে হয়, আমার নিজের একটা ইউনিফর্ম খুঁজে নেওয়া উচিত।
-তোমার বাড়ীটা ভাল লাগে?
আমি প্রশ্নটাই বুঝতে পারিনি।
-তোমার বাড়ীটা ভাল লাগে
-আ...
-জান, কতজন লোক গৃহহারা হয়েছে?
আমি কাঁধ ঝাঁকালাম। কাকা হতাশায় দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়িয়ে, আগুন ধরাল একটা সিগারেটের মুখে।
আমার ছোট ভাই আমার কাছে চলে এসেছে। এক হাতে আমার শার্টটা চেপে ধরে চুপচাপ আমার পাশে দাঁড়িয়ে। যেন সবকিছুর সঙ্গেই একাত্ম হতে হবে। এমনকি বকুনি খেতেও।
-যাও, ভাল করে বাড়ীটা দেখে এস। শুনতে পেয়েছ? বেণীকাকা বলল, একরাশ ধোঁয়ার ভেতর থেকে। আমরা দুজনে দৌঁড়ে চলে গেলাম।
কয়েকটা ফাটল ছাড়া আমাদের বাড়ীর বিশেষ কিছু ক্ষতি হয়নি। প্রথম দিকের বিশৃঙ্খলা। বাতিগুলো আর পাত্রগুলো মাটিতে পড়ে আছে। বইগুলো সব, তাদের তাক থেকে পড়ে গেছে। ছবিগুলো বেঁকে চুরে গেছে। চেয়ার টেবিল উল্টে পড়ে রয়েছে, নয়তো বেপট জায়গায় পড়ে আছে।
পিয়া, মার্গারা খুব তাড়াতাড়িই সবকিছু গুছিয়ে রাখতে শুরু করেছে। পিয়েদাদ আর মার্গারিতা আমাদের দাসী।
কিন্তু ধুলো। ধুলোটা রয়ে গেল বেশ কিছুক্ষণ।
সবকিছুই সুন্দর সূক্ষ্ম ধুলোর স্তরে ঢাকা পড়েছে। খুব সাদা। মনে হচ্ছে যেন কেউ রাতের বেলায় পুরো কৌটো ট্যালকম পাউডার উপুড় করে দিয়েছে। আমার ভাই আর আমি লম্বা বারান্দায় মধ্যে বসে তর্জনী দিয়ে ছবি আঁকার চেষ্টা করছি। আমরা ক্রীম রঙের গ্রানাইটের মেঝেতে প্রাথমিক ফিগার শুরু করেছি। যেমন–ঘরবাড়ী, গাছপালা, রথ, ট্রেন, পাহাড়, সূর্য, চন্দ্র, মেঘ। তাছাড়া দুখী/সুখী মুখ নিয়ে লাঠি হাতে পরিবাররা।
আমরা এতই ছোট যে কোন শব্দই লিখতে পারিনা। একটু পরেই পিয়া আর মার্গারা এসে হাজির। তারা ঝাড়ু নিয়ে শুরু করল ঘর পরিষ্কার। আমরা অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে রইলাম আর দেখলাম কিভাবে আমাদের সব চিত্র কলা মুছে গেল আস্তে আস্তে।
আমরা তাড়াতাড়ি অতিথিদের বাথরুমে ঢুকে, আধো অন্ধকারে (কারণ আলো নেই)মেঝেতে,বেসিনে,টয়লেটের ঢাকনায় সর্বত্র ছবি আঁকতে লাগলাম। যতক্ষণ না ওরা এসে আবার সবকিছু পরিষ্কার করে দিল। তারপরে, ঘরে বসার ঘরে এমনকি বাবার স্টুডিওতে পর্যন্ত।
পিয়া আর মার্গারা, কিছু সময় পরে আমাদের পেছনে পেছনে এসে দেখতে লাগল, আমাদের ছেলেমানুষি আঁকিবুঁকি, মনোযোগ দিয়ে। ওদের দিকে তাকিয়ে ভয়ে ভয়ে নিজেদের মধ্যে হেসে ফেললাম। তারা আবার সবকিছু পরিষ্কার করে দিল। যদিও ব্যাপারটা আমরা একটুও পছন্দ করিনি।
আমার ভাইয়ের সঙ্গে, খুব সরলভাবেই, এই খেলায় সময়ের অভাব বুঝতে পেরেছিলাম। এরপরই আমরা ঘর জুড়ে,নতুন আরও বড় ক্যানভাসের খোঁজ করতে থাকি। এই খোঁজার শেষে, ঘরের শেষ ধুলো ভরা জায়গাটা, যেটা বাবা মায়ের বাথরুম।
বাথরুমটা বেশ বড়। এমনকি একটা শিশুর চোখেও বিশাল বড়। একদিকে বাবার জামাকাপড় অন্যদিকে মায়ের জামাকাপড়।আমরা মাঝামাঝি বসে। দু’রকম গন্ধ নাকে আসছে। খুব উঁচু জানালা দিয়ে, যা বাগানের মুখোমুখি।
বাইরে থেকে চিৎকার শুনে বুঝেছি, যে আমার তুতোভাইরা, এক দুই তিন লাল ক্রশ খেলাটা শুরু করেছে।
সবে কাঠের মেঝেতে একটা কিছু আঁকতে শুরু করে বুঝতে পারলাম যে ভাই নেই।ওই নরম আলোতে মুখ তুলে তাকিয়ে দেখি আর ঠিক বুঝেছি, বাবার কোট আর অন্য জামার মাঝে তার সিল্যুয়েট।মাঝারি উচ্চতায় ঝুলছে। ও ওখানে লুকিয়ে আর আমি মন দিয়ে ছবি আঁকছি, আঙ্গুল দিয়ে।
হঠাৎই কোট, ব্যাগে খসখস আওয়াজটা আর নেই। আমি কিন্তু ছবি এঁকেই চলেছি। কোন দিকেই ভ্রূক্ষেপ নেই। বরং সব চুপচাপ হয়ে যাওয়ার জন্য আরও গভীর মনোযোগের সঙ্গে এঁকে চলেছি। আমি তো নিশ্চিত ভাই ওখানে আছে। বাবার জামা কাপড়ের মধ্যে লুকিয়ে আছে।
বেশ কয়েক মিনিট কোন সাড়াশব্দ নেই। না, জামাকাপড়ের শব্দ, না তার পায়ের আওয়াজ। এমনকি নিঃশ্বাসের শব্দও পাচ্ছি না। এরই মধ্যে একটা জোর খট করে আওয়াজ পেলাম। মাথাটা তুলে দেখছি, আবার সেই আওয়াজ। কিরকম একটা শুকনো, অথচ কর্কশ, সংক্ষিপ্ত আওয়াজ, কিন্তু আমার কাছে অচেনা। কি রকম গম্ভীর আওয়াজ।
জামা কাপড় নড়ছে খুব হাল্কা ভাবে। যেন মৃদু ভঙ্গুর বাতাস তাদের ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। আমি দেখার জন্য একটু চেষ্টা করলাম।আর তখনই ব্যাপারটা বুঝতে পারলাম। আমার ভাইয়ের ছায়াটা জামা কাপড়ের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে এল। আমার সামনে দাঁড়িয়ে একেবারে স্থির। অদ্ভুত ভাবে তার দু হাতের মধ্যে ধরা একটা কালো পিস্তল।
-ভগবান। কি করছে ও ওটা দিয়ে।
কোন দ্বিধা না করে পিয়া তার ঝাড়ুটা মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে, ভাইয়ের হাত থেকে পিস্তলটা কেড়ে নিল। তারপর খুবই ঘৃণার সঙ্গে বুড়ো আঙুল আর তর্জনী দিয়ে ধরেছে।তাকে দেখে মনে হচ্ছিল যেন একটা মরা বড় পাখি ধরে রয়েছে।
বেণীকাকা সকাল সাতটার মধ্যে বেরিয়ে গেল। বাবা মা’কে বোঝাবার চেষ্টা করলাম যে কাকার সঙ্গে আমি যাই। দমকলের ভলান্টিয়ার হিসাবে কাকার এখন প্রচুর কাজ। ভূমিকম্পের ফলে অনেক জায়গায় প্রচুর ক্ষতি হয়ে গেছে।
গতরাতে, কতলোকের উপস্থিতিতে, সবাই মিলে খুবই হাসিঠাট্টার মধ্য দিয়ে ডিনার হয়েছে। তখন আমি কারাদাখিয়ান, বলেছিলাম এইবার আমার সময় হয়েছে অন্য শহর জানার। আর কল্পনা করেছিলাম,আমরা সবাই মিলে অনেকদূর চলে যাব। আলাদা একটা শহরে। অন্য ম্যাজিকাল শহর, হয়ত প্রচুর স্লিপ আর সুইমিং পুল নিয়ে।
পরের দিন সকালে, আমি তখন খোলা দরজার সামনে বসে, সামনের রাস্তাটার দিকে তাকিয়েছিলাম। রাস্তাটা সবে ওঠা সূর্যের হলুদ আলোয় ভরে গেছে। সেই সময়েই আমার কাকা যে সব সময় ঘড়ি ধরে চলে, দু’বার হর্ন বাজাল। ফোক্সওয়াগেন, কলাপাতা রঙের।
বেণী কাকা বাঁ হাতে সিগারেট ধরে খায়, আর ডান হাতে অন্য সব কাজ করে। গিয়ার বদলে, গাড়ির স্পিড বদলে, খুলে ফেলল সামনের গ্লোভ বক্স। তারপর রেডিওটা চালিয়ে দিল, খবর শোনার জন্য। আমি অবাক হয়ে ওনার দিকে তাকালাম। যদিও উনি খুব টিপটপ ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন, তার খাঁকি প্যান্ট আর সাদা সার্টে।
মাঝে মাঝে, ওনাকে বুঝতে না দিয়ে, পিছন দিকে তাকিয়ে সিটের ওপর রাখা লাল আলোর ঝিলিক দেওয়া হেলমেটটার দিকে তাকাচ্ছিলাম। নিজেকে মনে হচ্ছিল একজন কেউকেটা।জিজ্ঞেস করলাম আমরা কোন শহরে যাব? খুব দূরে কোথাও? সেখানে আরও বাচ্চা আছে কিনা, যাঁদের সঙ্গে খেলা করা যায়?
কিন্তু ওনার তো সব মনোযোগ খবরে। স্পিকারের মধ্য দিয়ে,নাকি স্বরে নতুন খবর ভেসে আসছে। সর্বশেষ খবর, পরিসংখ্যান সহ।
গাছ আর বাতিস্তম্ভগুলো রাস্তায় পড়ে আছে। ট্রাফিকের আলোগুলো এখনও বন্ধ। অনেকরকমের কাগজ রঙিন প্রজাপতির মত উড়ে বেড়াচ্ছে। আমি সৈন্যদের গুনছিলাম। এরপরই আমরা খুবই আস্তে আস্তে হাঁটতে হাঁটতে শহরের কেন্দ্রস্থলের কাছে নিচু এলাকায় এল কারিতো দেল কারমেনের দিকে এগোতে থাকলাম।
অধিকাংশ বাড়ীই এখন ইঁট কাঠ পাথরের ধ্বংসস্তুপ। চারপাশে ছড়ানো ধূসর পাহাড়। আমরা, একটা জ্বলন্ত পিপে, যেটা ঘিরে লোকজন দাঁড়িয়ে আছে, তার দিকে এগোলাম। একটা বাদামী রঙের ছেলে, প্রায় আমারই বয়সী হবে, রাস্তার পাশে বসে কেঁদে চলেছে।
অ্যাভিনিউর একপাশে পাঁচ ছয়জন লোক শুয়ে আছে সরলরেখায়। দেখলাম যে একটা কালো রঙের বড় বাক্স ছাদের দরজার নিচে। চলতে চলতে বুঝতে পারলাম ওটা একজন তরুণী,তার ঘুমন্ত দুই ছেলে বুকের মধ্যে আঁকড়ে ধরে রয়েছে।
এক ভদ্রলোক গাড়িটার দিকে এগিয়ে আসছে, গায়ে কোন সার্ট নেই, খালি গায়ে, সারা কপালে রক্ত। কাকা গাড়িটা থামাল। কয়েকটা টাকা দিল তার হাতে, কোন রকম কথাবার্তা ছাড়াই। চুপচাপ। তারপর একটা সিগারেট ধরাল। আমি কাকাকে দেখেছিলাম, উনি ঠোঁটে সিগারেটটা আলতো করে চেপে ধরে আমার দিকে ফিরে, চেষ্টা করলেন হাসতে।
হয়ত তার মুখে ছায়া পড়ার জন্য, অথবা সিগারেটটা এমন একটা কোণ করে ধরা ছিল, যেটা মুখে দেখা গেল, তা হল, অদ্ভুত কুটিল আর একটা প্রায় কুৎসিৎ হাসি। যে হাসিটা আর যারই হোক বেণী কাকার নয়।
এসে গেছি।
দমকলের লোকেদের মধ্যে একজনের নাম আঙ্খেল। একজন ছোটখাটো লোক। রোদে পোড়া আর হাল্কা গোঁফ আছে। সামনের দাঁতে একটা রুপোর তারা লাগান। তার মাথায় লাল হেলমেট তো আছেই, সেই সঙ্গে কালো সাদা ইউনিফর্ম। ভলান্টিয়ার দমকল কর্মী। আঙ্খেল আমার কাছে এক বিস্ময়। সে হাঁটছিল খুঁড়িয়ে।
-তুমি এখানেই থাকো – নড়বে না – বুঝেছো ছেলে।
বেণী কাকা একদল দমকলের লোকের সঙ্গে যাবার আগে, আমাকে আঙ্খেলের জিম্মায় দিয়ে গেল, একটা কাঠের টেবিলের পাশে বসিয়ে দিয়ে। আঙ্খেল বিশাল দুটো জলের পাত্র থেকে জল, আর খাবার সরবরাহ করতে লাগল।
সব লোক লাইন দিয়ে, যে যা পেরেছে নিয়ে এসেছে জল নেবার জন্য। আমরা সবুজ রঙের প্লাস্টিকের মগ ভর্তি জল নিয়ে, তাদের ওই পাত্রগুলো জলে ভরে দিতে থাকলাম।
কেউ কোন কথা বলছে না। কেউ আমাদের দিকে তাকাচ্ছে না। তারা শুধু তাদের পাত্রগুলো এগিয়ে দিচ্ছে আর অপেক্ষা করছে। যেন এটা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার যে একটা বাচ্চা ছেলে কয়েকটা ইঁটের ওপর দাঁড়িয়ে, তাদের খাবার জলের রেশন দিয়ে চলেছে।
মাঝে মাঝেই আঙ্খেল কয়েক সেকেন্ডের জন্য অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। তারপর খোঁড়াতে খোঁড়াতে, আবার ফিরে আসছে হাতে একটা নতুন ভারী জলের পিপে নিয়ে। এরপর একটা মরচে পড়া ছুরি নিয়ে,নীল কভারটা কেটে (তখনকার দিনে জলের পাত্রগুলো কাঁচেরই হত)। আর একটু কষ্ট করে প্রায় পাঁচ গ্যালন জল, বিশুদ্ধ পরিষ্কার জল, ঢেলে দিতে লাগল ওই বড় জগের মধ্যে।
সব লোক যারা লাইনে ছিল, হয়ত জলের ওই সুন্দর আওয়াজের জন্য একবার শুধু মুখ তুলে চাইল, বেশ ভীতু ভীতু চোখে।
-কি ছেলে, ক্লান্ত লাগছে?
মাথা নাড়ালাম। কোন ক্লান্তিই নেই। বরং এমন একটা অনুভূতি যা আগে কখনও অনুভবই করিনি। আর আমার ভালই লাগছিল এই অনুভূতিটা।
যদি ক্লান্ত লাগে তবে আমাকে বলবে – বুঝেছ?
সাইরেন বাজিয়ে অ্যাম্বুলেন্সগুলো ছোটাছুটি করছে
একটা শিশু হয়রান হয়ে চিৎকার করে কান্না জুড়েছে। থামানো যাচ্ছে না।
-তোমার কাকা বলেছিল, যে তুমি দমকল কর্মী হতে চাও। দারুণ। আমি তো ভুলেই গেছি বেণী কাকাকে কোন এক সকালে কি বলেছিলাম। যখন সে দুধ দিয়ে কফি খেতে খেতে (শনিবার সকালে আমাদের সঙ্গে ব্রেকফাস্ট করে। ঘন্টা খানেক সিগারেট খেতে খেতে বাবার সঙ্গে গল্প করে) শুনেছিল, মনে হয়েছিল আমার কথাকে কোন গুরুত্বই দেয়নি।
-দমকল কর্মী হওয়া খুব কঠিন – বুঝলে ছেলে, আমি বলছি।
-ওঃ
-তোমার আণ্ডারওয়্যার বেশ টাইট করে পড়তে হবে। অর্থাৎ প্রচুর কষ্ট করতে হবে।
একজন বয়স্কা মহিলা এলেন। হাতে অনেকগুলো পাত্র আর বালতি নিয়ে। সারা মুখে কালিমাখা যেন কয়লা দিয়ে রং করা হয়েছে। আঙ্খেল তাকে খুবই নরম সুরে বলল যে, সে খুবই দুঃখিত। কারণ প্রত্যেককে দু জগ ভর্তি জল দেওয়া যাবে, তার বেশি নয়। এখনও প্রচুর লোক আছে যাঁদের খাবার জলের দরকার।
তিনি পিছন ফিরে দেখলেন, যেন আমাদের কথার সত্যতা যাচাই করলেন। পরে তিনি আমাদের দিকে তাকালেন। তার ঘোলাটে নীল চোখে এমনই এক অভিব্যক্তি ছিল যেন মনে হল এক্ষুনি আঙ্খেলকে অপমান করবেন। কিন্তু তিনি দুটো বড় জগ বেছেছিলেন, তারপর ওদুটো আমার হাতে ধরিয়ে দিলেন। তার চোখ দিয়ে বড় বড় কালো ফোঁটা গাল বেয়ে নামছে।
-কি খবর ভাইপোর? – ওভার
-আহ। খুব ভাল, দন বেণী। ও তো আমার সঙ্গেই আছে কাজ করছে। - ওভার।
আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করছি কারণ একজন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকে জল দিয়েছি।
-ওকে বল যেখানে লেঞ্চো আছে চলে আসতে – ওভার
-অবশ্যই দন বেণী – ওভার
-ওর জন্য এখানে অপেক্ষা করছি – ওভার
-এখুনি বলে দিচ্ছি, দন বেণী – ওভার অ্যান্ড আউট
আঙ্খেল তার ওয়াকিটকিটা চামড়ার খাপে ভরে নিয়ে, ওটা আবার বেল্টের সঙ্গে আটকে রেখে দিল। আমার কাঁধে হাত রেখে ইঙ্গিত করল অন্য দিকে যেতে। আমরা টেবিল ছেড়ে একটা কোণে চলে গেলাম। এক ঝলক পিছন ফিরে দেখে নিলাম। হাতে শূন্য জগ নিয়ে যে সব লোক লাইনে আছে দাঁড়িয়ে, তারা নীরবে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে– হ্যাঁ – যেন তাদেরকে ডুবন্ত জাহাজে ছেড়ে, চলে যাচ্ছি। সব চাইতে ভাল হয় ওদের দিকে আর না তাকান।
কেমন যেন জড়িয়ে পড়েছি। আঙ্খেল আমায় বোঝাল যে কাকা কোথায় আছে। ও হয়ত আমার মধ্যে কিছুটা সংশয় দেখতে পেয়েছে (কিছুটা ছেলে মানুষী, কুঞ্চন আর সন্দেহ)। তার জন্য ও সঙ্গে সঙ্গে যোগ করেছে চিন্তার কিছু নেই কেউ হারিয়ে যায়নি। ওটা আমার মাথাতেই আসেনি। হয়ত ওর মনে হয়েছে। যে তার শেষ কথাগুলো, আমার মনে ভয় ধরিয়ে দিয়েছে। তারই প্রতিফলন হয়ত আমার চোখের মধ্যে পড়েছে। (আরও খোলা, বিস্ফারিত চোখ।মণিটা বড় হয়ে গেছে।উত্তেজকভাবে চোখ পিটপিট, নার্ভাস আর সন্দেহ)কারণ আঙ্খেল লাল হেলমেটটা খুলে আমার মাথায় পড়িয়ে দিল আলতো ভাবে। যদি কোন দরকার হয় বুঝলে ছেলে– তারপর সে চলে গেল খোঁড়াতে খোঁড়াতে।
এটা অন্য একটা সময়। অনেক সরল আর সুগন্ধে ভরা। অনেক সাদা। যেখানে একটা বাচ্চা ছেলে একা একা হাঁটছে দেখাটা কোন অসম্ভব ব্যাপার নয়। যে কোন জায়গায় – এমনকি কোন একটা বিশৃঙ্খল,বিচ্ছিন্ন ধ্বংসাবশেষ ভরা রাস্তায় – তার দুহাত মাথার ওপরে, ওই বিশাল, পেছল দমকলের হেলমেটটা যাতে পড়ে না যায়।
প্রচুর লোক রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। কোন নির্দিষ্ট যাবার জায়গা নেই, শুধুই এদিক ওদিক। যেন তারা ঘর থেকে বেরোতেই চেয়েছে। একেবারেই চায়নি ঘরে থাকতে।
কেউ কেউ ঝাঁট দিচ্ছে। কেউ আবার বেলচা দিয়ে গাড়িতে ধ্বংসাবশেষ তুলছে। কয়েকজন আবার আমার লাল হেলমেটের দিকে তাকিয়ে।
লেঞ্চোর গেটটাকে চিনতে পারলাম। যেমন আঙ্খেল বলেছিল, সব রঙের ডেলা দিয়ে রং করা। গেটটা ঠেলে ভেতরে ঢোকবার আগেই কে যেন ভেতর থেকে খুলে দিল গেটটা। লম্বা রোগা ছেলে, খুব বেশি হলে বছর পনের বয়স।তার পুরো কপাল জুড়ে সাদা পট্টি জড়ান। যেটা একটু গোলাপী হয়ে গেছে।
-কি চাই?
-কাকার সঙ্গে এসেছি – আমতা আমতা করে বললাম।
ছেলেটা কয়েকবার মাথা নাড়াল যেন এক্ষুনি ঘুমোতে চলে যাবে। মাটিতে একগাদা থুতু ফেলে প্রায় টলতে টলতে চলে গেল।
ওখানে প্রায় গোটা বারো বিলিয়ার্ড টেবিল রয়েছে। সব কটায় কমলা রঙের আলো জ্বলছে।প্রত্যেকটারই নিজস্ব গোল আলো, সিলিং থেকে ঝুলছে। একটা লোক শুয়ে আছে সবুজ কাপড়ে মোড়া। কয়েকজন লোক একটা সেরামের বোতলের সঙ্গে যুক্ত। ওগুলো মেটালিক পেডলের সঙ্গে বাঁধা। কিছু লোক এক টেবিল থেকে অন্য টেবিলে পৌঁছে যাচ্ছে প্রায় দৌড়ে। আহতদের শুশ্রূষা করার জন্য।
বাড়ীর নিচে, বারে একটা লাল চামড়ার স্টুলে বসে আছে বেণী কাকা। সিগারেট খাচ্ছে।
আমি কাকার দিকে এগোতে থাকলাম। টেবিল আর দমকল কর্মীদের মধ্যিখান দিয়ে। কর্মীরা আসছে আর যাচ্ছে। এতসব যাতায়াতে, এতসব কর্ম কাণ্ড, আমার কেমন যেন মনে হচ্ছে সবকিছু কিরকম স্লো মোশনে চলছে। নীররতার চরমে।
আমি তো নিশ্চিত যে ওরা কথা বলছিল, চিৎকার করছিল, এমনকি কেউ কেউ গোঙাচ্ছিল পর্যন্ত।
কিন্তু আমার দিক থেকে, স্মৃতিতে কোন আওয়াজই নেই। কোনদিন প্রশ্ন করিনি যে কেন একটা বিলিয়ার্ড রুম, জরুরী অস্থায়ী এমার্জেন্সী রুমে বদলে গেছে।
(অনেক বছর পরে, বুঝতে পেরেছিলাম যে দেশের হাসপাতালগুলো তাদের ক্ষমতার শেষ সীমায় পৌঁছে গিয়েছিল।)
-কি এসে পড়েছ, কারাদাখিয়ান?
এইবার কাকা কি রকম যেন অন্যভাবে বলেছে। মনে হল ওই ডাকনামটা হঠাৎই অপমানজনক।
-হেলমেটটা?
-আঙ্খেল দিয়েছে – বললাম তখনও হাতে ধরে আছি।
-বেশ, এইবার খুলে রাখ।
কাকা কথা বলছে দরজার দিকে তাকিয়ে, বিলিয়ার্ড টেবিলগুলোর দিকে ফিরে। কিছুতেই বুঝতে পারছি না, কেন, কাকার গলায় ওই রাগ রাগ স্বর।
-ছেড়ে দাও বেণী
তার পাশে আরেকটা স্টুলে,একজন বয়স্ক মানুষ বসে। মোটা, গোলাপী গায়ের রং, ঘন হলদে দাড়ি। বারের ওপর একটা হেলমেট। যা আমার ধারণা ওনার নিজের হেলমেট।
-তোমার এটা ব্যবহার করার কোন অধিকার নেই – বুঝেছ?
-এটা শুধু একটা খেলা বেণী
-লেঞ্চো, এটা তোমার ব্যাপার নয়। এর মধ্যে জড়িও না।
-তুমি এটা নিয়ে নিও না।
এই এটা টা কি তা আমি বুঝতেই পারিনি। কিন্তু এটা বেশ জোরের সঙ্গেই বলা হয়েছিল। যেন শব্দটার তলায় লাইন টানা হয়েছে। বেণী কাকা আর কোন কথা বাড়ায়নি।
-কি খোকা, কিছু খাবে? বলে লেঞ্চো, উঠে দাঁড়িয়ে চলে গেল বারের পিছনে।
কাকার দিকে তাকালাম অনুমতির জন্য।
-তিকি আছে, কোলা, দেলওয়ার পাঞ্চ...
-লেঞ্চো আমার ভাইপোকে কোনরকম সোডা খেতে দেওয়া হয়না
-ধ্যাৎ, কোন মানেই হয় না – ফ্রিজ থেকে একটা বোতল বার করে – স্পুরকোলা কোনদিন কারও কোন ক্ষতি করেনি
লেঞ্চো, আমার দিকে তাকিয়ে ভুরু নাচিয়ে, হেসে, বোতলটা বারের ওপর রাখতে যাবে, সেই সময়েই কোন এক দমকলকর্মী, কোন একটা বিলিয়ার্ড টেবিল থেকে চিৎকার করে উঠেছে। চিৎকারের সঙ্গে যে কথাগুলো বলা হয়েছে তার কিছুই বুঝতে পারিনি। কিন্তু কাকা আর লেঞ্চো ঠিকই বুঝে গেছে। যেমন লোকে অ্যালার্ম বাজলে প্রতিক্রিয়া দেখায়, দুজনে একদৌড়ে ওই চলে গেল ওই টেবিলের দিকে।
বেণী কাকা, একজন বয়স্ক মানুষ, যে চিৎ হয়ে শুয়ে, তার বুকের ওপর চড়ে বসে তারপর মুঠো দিয়ে শুরু করল লোকটির বুক পাম্প করা। ওই অবস্থায় জোরে জোরে দশ পর্যন্ত গুণে, বন্ধ করল পাম্প করা। একই সময়ে লেঞ্চোও দৌড়ে এসেছে। লেঞ্চোও লোকটির নাক চেপে ধরে বেশ কয়েকবার ফুঁ দিল তার মুখের ভেতরে জোরে জোরে।
লোকটির চোখ খোলা। খালি পা। সবুজ কাপড়ের ওপর শুয়ে নিজের জগতেই হারিয়ে গেছে। একটা বিলিয়ার্ড বল, খুবই সাদা, গড়িয়ে চলেছে।
পিয়া আমাকে এককাপ গরম চকোলেট করে এনে দিয়েছে। আমি যখন ওটাতে ছোট ছোট চুমুক দিচ্ছিলাম, ও তখন এসে বসল, আমার সামনে একটা বেঞ্চে, রান্নাঘরে।
আমার ভাই এবং তুতোভাই দুজনেই এখনও বাইরে বাগানে। দিনের শেষ আলোতে দিনের শেষ খেলা। চান করে উঠেছি। ক্রিম মাখা হয়ে গেছে। ইতিমধ্যে আমার নীল পাজামা যার পায়ের দিকটা সাদা, পরে নিয়েছি। আমার মাথায় তখনও ওই বিশাল হেলমেটটা।
-এটা ভাল – ইয়ং ম্যান?
পিয়া সবসময় আমাকে ডবল চকোলেট দেয়, মার্গারেট না।
-দারুণ
-তুমি কি কয়েকটা কুকি নেবে?
আমার উত্তর দেওয়ার আগেই সে একটা কৌটো নিয়ে এসে ঢাকনাটা খুলে ফেলেছে। আমি একটা রোল নিয়ে, ভেঙ্গে, দুভাগ করে একটা টুকরো ডুবিয়ে দিলাম গরম চকোলেটের মধ্যে। ওটা খেয়ে নিলাম, অন্য টুকরোটা শুকনোই খেলাম।
-তোমাকে কোথায় নিয়ে গিয়েছিল তোমার কাকা?
ঘরের ভেতর থেকে বড়দের গলার স্বর ভেসে আসছে। কখনও হাসি, কখনও চামচের টুংটাং শব্দ শোনা যাচ্ছে। বেণী কাকা এখনও যায়নি।
-ওই দিকে
-কিন্তু তোমার ছোটভাই কাঁদছিল
-সত্যিই
-সত্যিই, কারণ ওকে নিয়ে যাওয়া হয়নি
কথা বলতে বলতে আঙুল দিয়ে রুটির টুকরোগুলো পরিষ্কার করছিলাম
-ছোট ভাই খুব কাঁদছিল, তারপর তার মা তাকে নিয়ে গেল। কোথায় জানি না।
পিয়া, রোগা পাতলা আর ফ্যাকাশে, চোখ দুটো অলিভগ্রীন।তার লম্বা কালো চুলে বিনুনী করা। যা নেমে গেছে তার কোমর ছাপিয়ে। ওটা হাতে ধরে থাকতে আমার খুব ভাল লাগে। মনে হয় যেন ওর হাতে হাত ঘসছি।
একটা পায়ের আওয়াজ পেলাম। বারান্দা দিয়ে কেউ আস্তে হেঁটে আসছে। কেউ একজন সুইং দরজাটায় ধাক্কা দিল।
-শুভরাত্রি পিয়া
-শুভরাত্রি দন বেণী
কাকা দরজাটা ধরে দাঁড়িয়ে। যেন আমার জন্যই অপেক্ষা করছিল যদি কিছু বলি।
ফেরার সময় দুজনে, পুরো রাস্তাটায় কেউই কোন কথা বলিনি।
-এবার যাচ্ছি কারাদাখিয়ান
কাকা আবার সেই আগের মত, নরম গলায় স্নেহের সঙ্গে বললেন। এর মধ্যে কোন অপমান বা বিদ্রুপ নেই। আমারও তার ওপর কোন রাগ নেই। বিরক্তও হইনি।সত্যি কথা বলতে কি, কোন কিছু অনুভবও করিনি। যদিও ওকে আর দেখতেও চাই না। খুব তাড়াতাড়ি গরম চকোলেটে চুমুক দিয়েছি। ঠোঁটটা বোধহয় পুড়েই গেল।
-বাচ্চা, হেলমেট – পিয়া ফিসফিস করে বলল।
কেন জানিনা, আমার মনে হচ্ছিল কাকা হয়ত ভুলে যাবে। অথবা কিছু দিনের জন্য আমাকে রাখতে দেবে পুরস্কার হিসাবে। ওই ভারী হেলমেটটা দু হাতে তুলে ওটা ওনাকে দিতে গেলাম। কাকা কিন্তু একটুও নড়ল না। কিছু বললও না।চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে।চুপ। প্রায় দুঃখিত। দরজায় ঠেসান দিয়ে।
লাল হেলমেটটা হাতে নিয়ে, ঠিক তখনই শুরু হল কাঁপুনি। এটা আসলে ভূমিকম্পের পরের আঘাত। এটার ফলে মাথাটা অল্প অল্প ঘুরছে। কিন্তু এই কাঁপুনিটা আগের মত নয়। ক্রমশঃ বাড়ছে। আমার কিরকম ভয় করছে। গা গুলোচ্ছে, বমি বমি পাচ্ছে। মনে হচ্ছে দৌড়ে বাগানের মত নিরাপদ জায়গায় চলে যাই।
আবার শুরু হল সেই অস্বাভাবিক বৃষ্টি। সিলিং থেকে সূক্ষ্ম সাদা গুঁড়ো, পাউডার পড়া শুরু হয়েছে। ঠিক ভূমিকম্পের সকালের মত। সারা বাড়ীটা জুড়ে।
কোন দ্বিধা না করে, এমনকি ওই কাঠের বেঞ্চ থেকে না সরেই আমার চকোলেটের বাটিটা দু’হাতে চেপে ধরে, তার বড় বড় সবুজ চোখ দিয়ে, পিয়া আমার দিকে তাকিয়ে হাসল। আমিও সুযোগ পেয়ে তার বেণী হাতে নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে ফিরে হাসলাম। কারণ বুঝতেই পেরেছিলাম যে এইবার কোন ভয় নেই। সবকিছুই ঠিক হয়ে যাবে এবার।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন