অভিবাসী মা’কে একটি চিঠি

সুব্রত গুহ

দু’বছর আগে কান্দেলেরিয়া পাজ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তার মেয়ে কারিনা নোয়েমি এগারো বছরের আর জেফার্সন জোয়েল সাত,এই দুই ছেলেমেয়েকে তার বাবা মায়ের কাছে রেখে যাবে তার জন্মস্থানের শহরে, সান হোসে এল আল্‌তো তে।

মে মাসের দশ তারিখের পর, সপ্তাহের শেষে সে চলে গেল। সে অন্তত চেয়েছিল যে মাদার্স ডে টা তার ছেলে মেয়ের সঙ্গে উদযাপন করবে। জানি না আবার কবে দেখা যাবে।

রবিবারের ভোর থেকে শুরু হয়েছে প্রচণ্ড বৃষ্টি। তার মধ্যেই সে বেরিয়ে পড়েছে, একটা ছোট ব্যাকপ্যাক সঙ্গে নিয়ে। তাতে চারটে জিনিস আছেই। গুয়াদালুপের ভার্জিন এর ছবি, যা তাকে তার মা দিয়েছিল। এক হাজার কোয়াটজেল এটা সে কষ্ট করে দু বছর ধরে জমিয়েছে। একটা ছোট ছুরি যেটা সে কিনেছিল শহরের কেন্দ্র থেকে।

সবাই কিন্তু তাকে সাবধান করেছিল। সীমান্তগামী রাস্তাটা বিপদজনক।

দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিয়ে বৃষ্টির মধ্যে সে বাসস্ট্যাণ্ডে পৌঁছল যেখান দিয়ে তার বাস যাবে এবং তাকে রাজধানী শহরে নিয়ে যাবে। ওখানে তার বন্ধু রোজারিওর সঙ্গে কয়েক দিন কাটাবে। এই জায়গায় বেশ কয়েকবছর ধরে বাড়ীতে কাজ করছে।

ওখানে সে কয়েকটা দিন কাটাবে যতক্ষণ না কেউ এসে তাকে সীমান্তে নিয়ে যায়।

দিনগুলো মাসে বদলে যায়। রোজারিওর পৃষ্ঠপোষক তার নয়মাস বয়সী শিশুর যত্ন নেওয়া এবং একটি ছোট মেয়ে যে জেফারসনেরই বয়সী, এই দুজনের দেখভালের জন্য তাকে ওখানে থাকতে দিয়েছিল।

রবিবার তার বন্ধু বহুবার বলা সত্ত্বেও, সে বাড়ীতেই রয়ে গেল, কারণ সে একটা পয়সাও খরচ করতে রাজী নয়। তাছাড়া তার মনে একটা দুঃখবোধও কাজ করছিল কারণ এতদিনে একবারের জন্যও বাড়ীতে ফোন করেনি। আসলে সে বলতে চায়নি যে এখনও সে গুয়াতেমালাতেই আছে। যখন সে কিছু টাকা পাঠাতে পারবে তখনই সবাই জানতে পারবে।

অক্টোবর মাসে সে তাপাচুলাতে পৌঁছল। প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে সে ছিল সান মার্কোসে। কাজ করছিল রান্নার। যেখানে তাকে ক্রেতাদের প্রায় মাছির মত তাড়াতে হত।

তার ওজন যথেষ্ট কমে গিয়েছিল। একে ওই খাটনি তার ওপর খাওয়া কম। সে ছিল স্বর্ণকেশী ক্লেইরণ ৯৩৪।পায়ের নখ আর আঙুলের নখ স্ট্রবেরী রং এর। সে বেশির ভাগ সময় ছোট একটা স্কার্ট আর নুডল স্ট্র্যাপ ব্লাউজ পড়ে থাকত। প্রথমত ওই গরমের মোকাবিলা করা, দ্বিতীয়ত খরিদদারদের মনোরঞ্জন।

ওই তিন সপ্তাহ সোম থেকে রবি, প্রতিদিন প্রায় বারো ঘন্টার ওপর কাজ করত। শেষ পর্যন্ত ক্লারিবেল আলেগ্রিয়া, ইসাবেল আয়েন্দে ও আলমা গুটিয়েরেজ, এদের সাথে একসঙ্গে তেকুনউমান-সিউদাদ ইদালগো সীমান্তে চলে যায়।

তারা শুক্রবার রাতে এসে পৌঁছল।ক্লারিবেলের তুতোভাই,তাদের একটা ছোট ঘরে থাকার ব্যবস্থা করল, সেখানে আরও তিনটি মেয়ে ছিল। ওখানে তারা রবিবার অবধি থেকে যায়। এবং ওইদিনই তারা তাপাচুলায় চলে যায়। শহরের কেন্দ্রে তাদের সঙ্গে দেখা হবে এক দালালের সঙ্গে। সে, মহিলা বা পুরুষ, তাদের রেষ্টুরেন্ট, বাড়ী অথবা বিউটি পার্লারে কাজের ব্যবস্থা করবে।

কান্দেলারিয়া ভাগ্যবতী। তাপাচুলার কেন্দ্রে অবস্থিত, একটা চিনা রেষ্টুরেন্টে কাজ পেয়ে গেল। তখনকার ক্লায়েন্টরা বখশিস দিতে খুবই দিল দরিয়া। শুধু তার জামাটা অনেকটাই খোলামেলা হওয়া চাই। অথবা অবাঞ্ছিত স্পর্শের ব্যাপারে উদাসীন হতে হবে। বিশেষত যখন এক টেবিল থেকে অন্য টেবিলে ট্রে নিয়ে যেতে হয়। তাছাড়াও ভাগ্য ভাল থাকলে, দিনের বেঁচে যাওয়া খাবারের ভাগও পাওয়া যেত।

দু’মাস পরে সে প্রথম বাড়ীতে টাকা পাঠাতে পারল। ক্লারিবেলের সাহায্য নিয়ে মা’কে চিঠি লিখল। সে তো পড়তে পারত না, তাই তাকে দন রোকেকে নিয়ে স্বাস্থ্য কেন্দ্রে গিয়ে পড়াতে হবে।

সেখানে সে ব্যাখ্যা করেছিল যে Q৩০০ খাবারের জন্য। Q২০০ তার ধর্ম মায়ের জন্য টাকা,তাকে দিতে হবে। Q১০০ যাতে সে শেষ পর্যন্ত ডাক্তারের কাছে যেতে পারে আর Q২০০ ছেলেমেয়েদের জামা কাপড় কেনার টাকা।

কখন বেশী কখনও কম, মোটামুটিভাবে এইরকম টাকাই সে পাঠাত প্রায় দু’বছর ধরে। দোনা চুসিতা, তার মা, সব সময় চাইত যাতে তার কাছে কোন সমস্যা না পৌঁছয়। কারণ তিনি বুঝতেই পারতেন, হাজার টাকা পাঠাতে মেয়েকে কত কষ্ট করতে হয়।

কান্দেলারিয়ার ভাগ্য হঠাৎ বদলে গেল। তার সঙ্গে আলাপ হল মাউরো রুইজের। সে ছিল ওখানকার কশাই। যখনই রুইজ তাকে দেখেছে, সেই মুহূর্তে সে তাকে কামনা করেছে। কান্দেলারিয়াও তার প্রেমে পড়ল। তারপর দুজনে একসাথে থাকতে শুরু করল।

কান্দেলারিয়া ক্রমশ আরও বেশি বেশি করে টাকা পাঠাতে লাগল। সেই সময় একদিন হঠাৎই তার মনে হল যে সে চার বছরের ওপর কাটিয়ে দিয়েছে। তার মানে এখন কারিনা নাওমি পনেরো বছরের আর জেফারসন এই এপ্রিলে এগারো বছরে পা দেবে। এটাই বাড়ী যাবার প্রকৃষ্ট সময়। ছেলে মেয়ের সঙ্গে দেখাও হবে, মেয়ের পনেরো বছর উদযাপনও হবে। সে প্রথমে ফিরে যাবে। ওখানে গিয়ে মাউরোর আসার জন্য জমি তৈরি করবে। একটা ট্যাক্সি নিয়ে তেকুনউমান গিয়ে, ওখান থেকে একটা পুলমান নিয়ে পৌঁছে যাবে রাজধানী শহরে।

ষ্টেশনে যাবার পথে দুজন পুরুষ তাকে লাঞ্ছিত করে। সে তাদের ঘড়ি সেল ফোন, ব্যাগে যা ছিল তা তাদের দিয়ে দেয়। শেষে একজন যখন তার ব্লাউজের ভেতরে হাত ঢোকায়, তখন স্বাভাবিকভাবেই সে তাকে ধাক্কা দেয়।

এই রকমই বলেছিল একজন সাক্ষী যে অন্য দিকের কোণে দাঁড়িয়ে পুরো ঘটনাটা দেখেছিল।কান্দেলারিয়াকে যখন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হল, ততক্ষণে অতিরিক্ত রক্ত ক্ষরণে তার মৃত্যু হয়েছে। আততায়ী অত্যন্ত কুশলী ভাবে তার ফিমোরাল ধমনী কেটে দিয়েছিল।

তার জিনিসপত্রের মধ্যে কারিনার লেখা শেষ চিঠিটা পাওয়া যায়।

প্রিয় মা,

অনেকদিন ধরে তোমার কোন খবর পাইনা। কিন্তু আমার জন্য তুমি যে জামাগুলো পাঠিয়েছিলে তার জন্য ধন্যবাদ। ওগুলো খুবই সুন্দর। কিন্তু পরেরবার যখন পাঠাবে, কিছু ব্র্যাণ্ডড আর মডার্ন জামা কাপড় পাঠিও। আমি স্কুলে খুব ভাল ফল করছি। আমার খুব ভাল লাগছে যে আমাকে কোন সাধারণ স্কুলে যেতে হচ্ছে না।

দাদু তাঁর শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। তিনি প্রায়ই বলেন তাঁর আগেই চলে যাওয়া উচিৎ ছিল। তা হলে আমরা ঋণমুক্ত থাকতে পারতাম। ঠাকুমা প্রায়ই কাঁদে আর বলে যে কি ঘটতে চলেছে।

এবার বিষয়ের একটু বদল করি। তুমি আমাকে একটা এম.পি.থ্রি কিনতে বলেছ। মনে হয় যে এটা আমার খুবই কাজে লাগবে। মারুদের দেখিয়ে দেব। ওরা সবসময় বলে, তুমি আমায় ভালবাসো না। আর সেই জন্যই চলে গেছ। আমি জানি এটা সত্যি নয়। পুরোপুরি হিংসার কথা। শেষ পর্যন্ত মাসের শেষে কিছুই পাবেনা।

দেখো মা, তোমার চলে যাওয়াতে আমার কিছু এসে যায়নি। তোমার দিব্যি, কারণ আমি জানি যে এটা আমাদের ভালরই জন্যে। হ্যাঁ জেফারসন মাঝেমাঝেই বিভ্রান্ত হয় ঠিকই আর মাঝেমাঝে চিৎকার করে। কিন্তু ওকে সহজে ভোলানো যায়। যদি তোমাকে থাকতে হয়, অবশ্যই থাকবে। বাবার ওই বোলিং নিয়ে কখনওই ফিরে আসবে না।

মাঝে মাঝে খুব রাগ হয় তুমি এতদূরে কেন গেছ। তুমি জান না, ওই মাদার্স ডে’র গানটা, কি রকম বোকার মত লাগে। আর কি কষ্ট হয় গানটা গাইতে। একেক সময় মনে হয় গাইতেই পারছি না।

তুমি সব সময় বলতে অভাবই তোমাকে ঘর ছাড়া করেছে। আর এ ব্যাপারে আমাদের কিছু করার ছিল না। মা, আমি তো পনেরো বছরের হয়ে যাব। তারপর আমিও বেরিয়ে যাব। হয়ত খুঁজে পেয়ে যাব। ঠাকুমাকে কিছুই বলব না। পার্কে গিয়েছিলাম ফ্লোরিকে খুঁজতে। এম.পি.থ্রি মনে আছে তো!

কারিনা

পুঃ – হ্যাপী মাদার্স ডে

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%