যমকুলি

জয়দেব দত্ত

উঠানের একেবারে ঠিক মাঝখানটিতে ব বাড়ুই খেজুর পাতার তালাই পেতে শুয়েছে। শুয়ে শুয়েই বামহাতটাকে উল্টিয়ে, অনামিকা আর মধ্যমাকে লম্বালম্বি শুইয়ে, তর্জনি আর কনিষ্ঠাকে এক করতে চাইছে। যাতে করে আঙ্গুল যেন 'ব'-এর আকার নেয়।

কিন্তু বুড়ো হাড়ে কি তা সম্ভব? সম্ভব যে নয়, সেটা সে কিছুতেই মানতে চাইছে না। তাই সে চেষ্টা করেই যাচ্ছে।

এতে ওরই বা দোষ কী? এক সময় তো 'হরদম' করেছে। তখন কোনও কষ্টই হত না। অনায়াসেই হয়ে যেত ব্যাপারটা। তখন তো গাঁ-গঞ্জে গরু মোষের সংখ্যা কম ছিল না। হামেসায় পেট কামড়ানি রোগ লেগেই থাকত। পেটের যন্ত্রণায় গরু বা মোষ উঠত আর বসত। অবলা জীব মুখে তো কিছু বলতে পারত না, কেবল গঁজের চারপাশ অসহিষ্ণু ঘুরত। গরু মোষের এমন ধারা হলেই ব বাড়ুইকে ডাক পড়ত। ব বাড়ুই যেখানেই থাকত, ডাক শুনে 'হুটুর' খেয়ে ছুটে আসত। এসেই বাম হাত উল্টিয়ে, তর্জনী আর কনিষ্ঠাকে এক করে, গরুর তলপেটে লিখে দিত 'ব'। তাতেই কিস্তমাত! গরু একেবারে 'চাঙ্গা'। পরক্ষণে 'ডাবাতে মুখ ডুবিয়ে চঁচাড়ে চুবি' খেত, 'চুবি'।

শুধু গরু বা মোষ কেন, মানুষের কি কোনও কাজে লাগেনি ব বাড়ুই? এই যেমন কোমরে 'ডালকে' লাগা, কারও কোমরে যদি খ্যাচ করে লেগেছে, তো সঙ্গে সঙ্গে ব বাড়ুইয়ের কাছে। ব বাড়ুই কোমরের উল্টোদিকে 'ব' লিখে দিয়েছে, তো আর বলে কে? তবে গরু বা মোষের মতো সঙ্গে সঙ্গেই কাজ নয়, কাজ হতে একটু দেরি হত। তবে দেরি বলতে 'মাসাদরুনে', মানে মাসের পর মাস নয়, ওই দু'চারদিন সময় লাগত আর কী। তা লাগুক।

গ্রাম যদি কোন দেবতা বা অপদেবতার অভিসম্পাতে পড়লে, এই যেমন 'মায়ের খেলা', মানে বসন্ত রোগ, কিংবা কলেরা কিংবা জন্ডিস রোগ দেখা দিলে ব বাড়ুইকে দরকার পড়ত। কারণ ওই রোগগুলি তো আর 'এন্দি-পেন্দি' রোগ নয়, রীতিমতো ডেনজারাস! দেখা দিলেই 'সব্বখান', মানে কয়েক দিনের মধ্যেই সারা গ্রাম শ্মশানপুরী! যাতে করে গ্রামটা শ্মশানপুরী না হয়ে যায়, তার জন্য খেজুর গাছের তলে 'ব' লিখে দিত, তাতেই মোটামুটি 'হ' মানত, মানে বাধা।

এর জন্য ব বাড়ুইয়ের খাতির ছিল খুব। 'ব' লিখে লিখে শেষে নামটাই 'ব' হয়ে গেল। ব বাড়ুই। 'ব' ছাড়াও আর একটা নাম ছিল ব বাড়ুইয়ের। কিন্তু কী সেই নাম আজ আর মনে করতে পারে না। নিজের নামটা মনে করার জন্য কত নাম যে ওর মনে আসে তার ঠিক নেই। কখনও মনে করে শ্রীকান্ত, কখনও মনে করে সুশান্ত, আবার কখনও বা সুকান্ত। কোনও নামটাই ওর মনে বেশিক্ষণ বাসা বাঁধে না। মনে হয়, না না, এটা নয়। অন্য কোনও।

তাই পুরোনো নাম নিয়ে ওর এখন কিছু যায় আসে না। ও এখন ব বাড়ুই হয়েই বেঁচে থাকতে চায়। ভোটার লিস্টে ব বাড়ুই, ভোটের ছবিতে ব বাড়ুই, জব কার্ডেও ব বাড়ুই।

ব বাড়ুই শুয়ে শুয়েই আঙ্গুলে 'ব' এর কেরামতি খেলছে। পারছে না তো কী হয়েছে? এক বার না পারিলে দেখ শতবার। সেই শতবার চেষ্টা করছে। আর তার ফাঁকে ফাঁকে মাঝে মধ্যে আকাশ দেখছে। আকাশে 'যমকুলি' উঠেছে কি? না উঠেনি। উঠেনি তো ভালোই হয়েছে।

ভালো হয়েছে, ভালো হয়েছে, ভেবে ভেবে আবার আঙুলের কেরামতিতে মেতে উঠেছে বাড়ুই। বাড়ুইয়ের চোখগুলো পিটপিট করছে। কেন করবে না? ক'দিন আগে যা ধকল গেছে শরীরটা। রাতে খাবার খাওয়ার পর বিছানা নিতেই শরীরের বাম দিকটা ঝিম ঝিম ভাব। প্রথমে আমল দেয়নি। পরে রাত বাড়লে আরও বাড়ে। বাড়তেই ছেলে হাবলের কানে খবরটা যেতে দেরি হয় না। তখন গরমে হাবল এর গায়ে মাদুরটা চিটিয়ে গেছে। পিঠে মাদুর দিয়ে বাবাকে দেখতে এসে হাবল ভোঁ! নয় কাজ ভালো জেনে, মোবাইলে অ্যাম্বুলেন্স ডেকে সোজা নার্সিংহোম। নার্সিংহোমের ডাক্তারের হাতে পড়ার পর খানিকটা স্বস্তি। ভাগ্যে সেখানে পাঁচদিন ছিল, না হলে শরীরের বাম দিকটাই পুরো অবশ হয়ে যেত। অন্তত ডাক্তাররা সেই রকমই বলেছে।

পাঁচদিন পর ফিরে এসে উঠোনে ফের তালাই পেতে শুয়েছে। তাহলে এতদিন ওর শরীরে ধক যায়নি কি? নাকি বিপিএল তালিকায় পাওয়া নার্সিংহোমের খরচপাতির মতো, ওর শরীরেও ধকলের ব্যাপারটাও সরকারি খাতায় জমা হয়ে ওর শরীর থেকেই ভ্যানিশ হয়ে গেছে? তা তো নয়। বরঞ্চ আজই ক্লান্তিটা একটু বেশি লাগছে। চোখ তার প্রমাণ। চোখগুলো ধোঁয়া ধোঁয়া লাগছে। চোখ তার প্রমাণ। চোখগুলো ধোঁয়া ধোঁয়া লাগছে। আর চোখের কোণে পেঁচুটি জমেছে প্রচুর। দু'হাতে মাঝে মধ্যে ওকে পেঁচুটি সরাতে হচ্ছে। তারপর চোখের দৃষ্টি খানিকটা স্বাভাবিক হচ্ছে। আর তখনই ভ্রূ থেকে তেড়ে ফুঁড়ে চোখ বার করে আকাশে 'যমকুলি' খুঁজছে।

না, আকাশে এখন কোনও 'যমকুলি'র দেখাসাক্ষাৎ নেই। এখন যার সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ হচ্ছে, সে হল তারা। সারা আকাশ তারায় তারাময়। মনে হচ্ছে আকাশের বুকে চাঁদটাও যেন নেই। হয়তো কুটুমবাড়ি বেড়াতে গেছে। কিন্তু 'যমকুলি'? তার তো কোনও কুটুমবাড়ি নেই। তার আকাশে অস্তিত্ব কেবল সময়-এর 'বোচক'। সময় হলেই আকাশের এক কোণ থেকে আর এক কোণে সোজা চলে যায়। আলোক রেখা হয়ে। তখন ঠিক ওই রাস্তার মতো দেখতে লাগে।

আকাশের বুকে এমন আলোর রাস্তা দেখলে, গাঁ-গঞ্জের লোকেরা ভয়ে ময়ে সিঁটিয়ে যেত। হাত জোড় করত। কিন্তু হাত জোড় মানত না। কী করে মানাবে। এ রাস্তা তো আর ন্যাশনাল হাইওয়ে নয়, আর প্রধান মন্ত্রীর সড়ক যোজনার পিচ ঢালা আঁকা-বাঁকা-তালচাকা নয়। এ হল কোনাকুনি, সোজা একটা আলোক রাস্তা। নাম 'যমকুলি'। আকাশে 'যমকুলি' দেখা দিয়েছে মানেই মাটিতে তখন ঘোর বিপদ। নিশ্চয় মর্তে যমরাজ রুষ্ট হয়েছে। তাই রাস্তা নির্মাণ করেছে।

এই রাস্তা দিয়ে তো যমরাজ আসে না। আসে যমরাজের কুলিকামিনরা। তাই 'যমকুলি'। তাও গেদে-গুচ্ছেং কুলিকামিন নয়, দুটি কি বড় জোর তিনটি। এই দু'তিনটি কুলিকামিনেই গোটা গ্রামের মানুষজনকে তুলে নিয়ে যায় যমপুরীতে। হয় কলেরা, নয় মায়েরর খেলা, নয়তো ওলাওঠা রোগ ঢুকিয়ে দেয় গ্রামের আনাচে কানাচে। তাহলে মানুষ মরবে না? মানুষ মরে, মরে শেষ হয়ে যায়।

কিন্তু তা বলে কি মানুষও সহজে যমরাজের কাছে হার মানতে চায়? চায় না। আর চায় না বলেই, সারা গ্রাম জুড়ে চলে নানান 'আনায় ধানায়'। সকলে ক্লান্ত হলে, ডাক পড়ে ব বাড়ুইকে। ব বাড়ুই খেজুর গাছের তলে 'ব' লিখে দিলেই সব সমস্যার নিরসন।

কিন্তু সেই যুগ তো আজ আর নেই, নেই বললেই কি হবে? রথের চাকা তো বন বন বন ঘুরছে। সে কোনও সময় চাকা ঘুরতেই পারে। তাই ব বাড়ুই আশঙ্কায় আশঙ্কায় রাতের আকাশ দেখছে। এখন তো সারা পৃথিবীটার অসুখ। হয়তো নিজের গ্রামটায় অসুখ ঢুকেনি এই যা। কিন্তু ঢুকতে কতক্ষণ? সন্দেহের দোলাচালে ব বাড়ুই কেবলই আকাশ দেখছে। না, কোথাও 'যমকুলি' নেই। নেই তো ভালোই হয়েছে। যেন কোনও দিন না থাকে। কোনও দিনও না। মনের আনন্দে ব বাড়ুই গান ধরে, রুই একলা না কেট পাত। তাতেই কাপড় তাতেই ভাত...।

ছেলে হাবল বাবাকে রাতের পথ্য দিতে আসছিল। বাবার গলার গান শুনে দেওয়ালের এক কোণে থমকে দাঁড়াল। কী মিষ্টি গলা বাবার! এর আগে বাবার এমন মিষ্টি গলা, নিজ কানে কখনও শুনেনি। হয়তো এর তার কাছে দু'একবার বাবার গানের খাতির শুনেছে। এই পর্যন্ত। আজ নিজ কানে এই প্রথম। গান শুনে হাবল নিজেকে ভারী ভারী মনে করছে, এমন গুণবান বাপের বেটা সে! গানের ভাষাগুলো পুরোনো হলেও বেশ সুন্দর। রুই একলা না কেট পাত, তাতেই কাপড় তাতেই ভাত...। তখনকার দিনে ভাত কাপড়েরই তো কালচার ছিল। গ্রাম ছিল গরিব! খুব গরিব। খুব।

বাবার মুখেই শোনা, দাদু নাকি রাত দুটো কি তিনটে বাজলেই, মানে প্রথম মোরগ 'বাঁক' দেওয়ার আগেই গোয়াল থেকে গরু বার করে লাঙল নিয়ে সোজা চলে যেত মাঠে। মুখে দুটি মুড়িও জুটত না। তাই গামছার 'খুঁটে' মানে গামছার এক কোণে মুঠো দুই 'আগালি' মানে খুদে চাল বেঁধে নিত। সেই চাল চিবোতে চিবোতে দাদু লাঙল চালাত। আর ডমুর তলার কুয়া থেকে কচুপাতায় জল তুলে ঢক ঢক গিলত। তখন গোটা মাঠে কুয়া বলতে তো একটাই। আর সেটা ডমুরতলা! তাতে 'লাঙলে' যত দূরে যাক, তাকে পায়ে হেঁটে আসতেই হত ডমুরতলা। তারপর কুয়ার পাটে পাটে যে গর্ত, তাতে পা ঠেকিয়ে কুয়ার জলে নামতে হত। দড়ি বা বালতির তখন কোনও বালাই ছিল না। দড়ি বা বালতি আনবেটা কে? কেই বা করবে তার রক্ষণাবেক্ষণ? ফলে পা আছে, পা দু'ফাঁক করে নেমে পড়ো কুয়ার তলে, আর কচুপাতা দিয়ে জল তুলে, জল ঢক ঢক খাও, কিন্তু 'এ্যাঁটো' কোরো না। ব্যাস।

বাবার ডান পাশে লন্ঠনটা 'দম মিচকে' টিমটিম জ্বলছে। বাবার ওই এক রোগ! লন্ঠনটাকে বাবা কিছুতেই কাছছাড়া করে না। বাবার তো বিড়ির নেশা। বিশেষ করে 'খেঁকো' বিড়ির। একটা বিড়ি সাতবার না ধরলে, বাবার তৃপ্তিই মিটে না। সাতবার আগুন ঠুকে কে? সে যে আগুন ঠুকে ঠুকেই 'আলামারা' হয়ে যাবে। তার থেকে লন্ঠনের 'বাড়' খুলে, দূর থেকে লন্ঠনের শিষে বিড়ি ঠেকাও। ব্যাস, জ্বালা চুকে যাবে। বাবা এইভাবেই লন্ডনের উপর ভর করে, বিড়ির জ্বালা চুকিয়ে নেয়।

হাবল বাবার লন্ঠনের আলোতে খুব আবছা আবছা বাবাকে দেখছে। কিন্তু বাবার গাওয়া গানটা মোটেই আবছা নয়। খুব পরিষ্কার হয়ে ধরা দিচ্ছে হাবলের অন্তরে। সেইদিনকার পুরোনো ছবি তো খুবই কষ্টের! ভাত কাপড়ের কষ্ট!

বাবা কষ্ট করেই গানটা গাইছে। হাবল দেওয়ালের আড়কোণে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গানটা শুনছে। যাতে করে রসভঙ্গ না হয়। এমন অবস্থায়, এমন কুক্ষণে, দামি জুতের খস খস শব্দ। বড্ড বেসুরো লাগল কানে। বাবা গান বন্ধ করে দিল। ঘাড় তুলে দেখল লোকটাকে। কিন্তু চিনতে পারল না। জুতোর মচমচে শব্দ শুনেই নাকি কে জানে, লন্ঠনটা নিভে গেল। আর লন্ঠনটার বহুদূরে অপেক্ষমান অন্ধকার, সুযোগ বুঝে উঠোনটার দখন নিল।

হাবল কিছু দেখতে পায় না। না দেখেই হোঁচট খেতে খেতে বাবার তালাই এর কাছে এল। তালাইয়ের চারপাশে বাবার লুকিয়ে রাখা দেশলাইটা হাতড়ে হাতড়ে খুঁজছে। খুঁজতে খুঁজতে বাবার হাতে হাত ঠেকল। তাহলে বাবাও খুঁজছে দেশলাইটাকে। তবে বাবা তালাইয়ের চারপাশে নয়, নিজের সিঁথেন-এর চারপাশ, মানে বালিশের চারপাশে। শেষে বাবাই দেশলাইটা পেল। আর তাতে দেশলাই কাঠির নড়াচড়ার ঘং ঘং শব্দ হল। মনে হল দেশলাইটা বলছে, আমি, হ্যাঁ আমি, যাকে খুঁজছ সেই আমি।

হাবল বাবার হাত থেকে দেশলাই নিয়ে, দেশলাইয়ের বাক্স খুলে কাঠি বার করে, খোলে ঠুকতেই কাঠি জ্বলে যায়। আর কাঠি থেকে একটা ছোট্ট বারুদের টুকরো, আগুন হয়ে আগন্তুকের দিকে তেড়ে যায়। আগন্তুক হাত না ঝেড়ে সতর্ক হওয়ার আগেই বারুদ নিভে যায়। হাবল লণ্ঠনে আগুন ঠেকাতেই লন্ঠন দাউ দাউ জ্বলে যায়। আর তা থেকে চাপ চাপ 'ভুঁসো' ওড়ে। সেই 'ভুঁসো' হাবলের নাকের ফুটো ভেদ করে ব্রহ্মতালুতে ধাক্কা মারে। আঁঃ কী গেরো! কী বিটকিলে গন্ধরে বাবা! হাবল বাম হাতের বুড়ো আঙ্গুলে চাপ দিয়ে নাকের একটা ফুটো বন্ধ করে, নাক ঝাড়ে। ঝাড়তেই নাক থেকে একটা বিশালাকার কালো কুচকুতে দৈত্য হাত পা ছেড়ে মাটিতে এসে ধপ করে পড়ে। আঃ, শান্তি!

ব বাড়ুই 'সিঁথেন' থেকে ঘাড় তুলে আগন্তুককে চেনার চেষ্টা করে, কে?

আমি, আমি নিকুঞ্জ।

কোন কুঞ্জ?

নিকুঞ্জ।

অ-নিকু? অনেকদিন তো দেখা সাক্ষাৎ নাই। তা হঠাৎ কী মতলব?

আমি এলেই তুমি কেবল মতলব খুঁজে পাও, ও জন্যেই আসি না। ভুল করে এসেচি যখন, চলে যাচ্ছি।

চলে যান না, বোস। হাবল ঘর থেকে মেচেটা বার করে দাদাকে দে বাবা।

হাবল মেচে আনার জন্য ঘর মুখ। নিকুঞ্জ বাধা দেয়, নারে, মেচে আনতে হয় না। আমি বরঞ্চ খুঁড়োর পাশটাতে বসি।

ব বাড়ুই সুখী হয়ে বলে, হাতির মতো বাহন, মাটির মতো বসন, আর কী আছো?

হাবল বাবার মুখের কথা শুনে ফিক করে হেসে ওঠে, সত্যি বাবা সেকালেরই রয়া গেল! এ কালে কেউ কি মাটির উপর বসে?

বাবা বোধহয় হাবলের মনের কথা জানতে পেরেছে। তাই বলে হাস না বাবা, হাস না। এমন কুতায় মূর্খরা হাসে। মাটি হল খাঁটি। যখন তুমাকে কেউ জায়গা দিবকে নাই, তখন কিন্তু তুমাকে মাটিতেই এসে পড়তে হবেক। তাই এই মাটিকে নিয়ে কোনও দিন মসকরা কোরো না।

হাবলের ভাব গম্ভীর হয়। কিন্তু সেই গাম্ভীর্য আর কতক্ষণ? ওইদিকে যে ক'জোড়া জুতোর মচমচ শব্দ আসছে। শুধু কি জুতোর শব্দ? কয়েকটা টর্চের আলোও ফিনকুটি দিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে। ব বাড়ুইয়ের উঠানে। আলোগুলো ব বাড়ুইয়ের কাছে এসে নিভে গেল। হাবল লন্ঠনের আলোতে দেখছে তিন জন লোক। সামনেরটা মোটামতো সাইফোন। সাইফোন মাছের পেটটা যেমন ফুলো ডিগডিগে হয়, ওই লোকটাও ঠিক সেই রকম ফুলো। তাই সাইফোন।

সাইফোন নিকুঞ্জকে বলে, তুমি এসে গেছ?

হ।

আর এদিকে আমরা সুবাই মিলে মিলনের দুকানে খুঁজে মরচি। দ্বিতীয় লোকটা দাঁত ফেড়ে কথাগুলো বলল। দাঁত ফাড়বে নাতো কি? ওর তো দাঁতগুলো সব সময় ফাড়া থাকে। তাই দাঁতফাড়া। আর দাঁতেরই বা দোষ কি? মুখগহ্বরটা তো আর ছোট নয়, ছোটখাটো 'মুড়ি' বললে ভুল হয় না। ও যখন দাঁত ফেড়ে হাসে, ঠোঁটের কোণগুলো কানের লতিতে এসে 'ঢুঁস' মারে ঠিক সেই রকমই হাবলকে ঢুঁস মেরে বলে, কি রে হাবলা, দাঁড়িয়ে থাকব? আমরা এলাম, কোথায় বসতে দিবি তা না, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বড়দের কতা শুনচে! যা ঘরে যা, মেচে টেচে যা আছে আন। কথার শেষে আবার হাসি। এই হাসির দরুণ, ওর কানের লতিগুলো এঁটো হয়ে গেল।

হাবল দাঁতফাড়ার 'ঢেঁস' খেয়ে ঘরের উদ্দেশে ছুট দেয়। আর অমনি সাইফোন হাবলের হাতটা খপ করে ধরে ফেলে, কোথায় যাচ্ছিস, ঘর নাকি? খুঁড়ো রইল নীচে, আমরা উপরে বসে জাং চাপড়াব নাকি? চ, আমরা সবাই মিলে খুঁড়োর পা তলে বসব।

সকলে ব বাড়ুই-এর পায়ের তলে বসে। ব বাড়ুই পাগুলো গুটিয়ে নেয়।

তৃতীয়জন, সরুমতো লোকটা বসে বসেই উঠানের চারিদিকে টর্চের আলো ফেলছে। আর কী সব দেখছে।

ব বাড়ুই এর ডানদিকে একটা তুলসীতলা। তুলসীতলার ওপারে একটা মরাই। মরাইয়ের পরই একটা আঁজির গাছ। গাছটার পর খানিকটা ফাঁকা জায়গা। তারপরই আগাছা ঘেরা বাউন্ডারি। সেই বাউন্ডারিতে রাতের বেলাতেও ছাগল চরছে।

বামদিকে তালপাতার সাঁড়ক দেওয়া গোয়াল ঘর। সেই গোয়াল ঘরে গরু লেজ নেড়ে মশা তাড়াচ্ছে। আর তা থেকে তালপাতার ঢং ঢং শব্দ বেরিয়ে আসছে কেবলই। গোয়ালে ঘরের গা ঘেঁষে একটা সরু লম্বা খেজুর গাছ। খেজুর গাছ থেকে শুকনো খেজুর পড়ছে টুপটাপ।

ব বাড়ুইয়ের পা তলের ওধারে রায়দের দালানকুঠা। আর মাথার উপরে, নিজের খ্যাচা কার্তিক।

পাতলা মতো লোকটা খ্যাচা কার্তিকের গায়ে আলো ফেলে দেখছে। খ্যাচা কার্তিক হেলে গেছে। যাক হেলে, তবুও তো ব বাড়ুইয়ের বসত বাড়ি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

টর্চের আলোটা নিভে যেতেই, সাইফোন কথা বলে, কী করছ খুঁড়ো?

কী আর করব?

এমনি করে চলবেক?

চলে তো যাচ্ছে।

এটা কি আর চলা বলে?

আমি তো বলি।

সে আগেকার দিন এটা চলা বলত, কিন্তু এখন দিন কাল পালটে গেছে খুঁড়ো।

আমি তো পালটাই নাই।

পালটাতে হবেক।

না, পালটাব নাই।

পালটাব নাই বললে হবেক? এই যে তোমার খ্যাচা কার্তিক, এ আর ক'দিন?

য'দিন যায়।

আর দিক যাবাক নাই। এবার এসে বুকে পড়বেক।

পড়লে তোমরা আছ, এসে মাটি সরাবে।

হ্যাঁ, আমরা তো আচি, কিন্তু তখন তুমি তো থাকবে নাই।

আমি থাকব নাই এটা ঠিক কতা, কিন্তু তোমরা সব এখানে চিরটাকাল থাকবে বলচ?

চিরটাকাল না থাকি, কিচুদিন তো থাকব।

সে থেকে লাভ?

লাভ গোটাটায়, আমরা জীবনকে যাপন করতে শিখেছি খুঁড়ো।

আমি যাপন করি না?

এটাকি আর যাপন বলে? তোমার শুধু চিন্তা ভাত আর কাপড়ের।

ভাত-কাপড় ছাড়া আছে কি?

সব কিছুই আচে।

কি সেই সব কিছু?

তোমাকে বুঝাতে পারব নাই খুঁড়ো তুমি হলে ওল্ড মডেল।

তোমাদের নতুন মডেলের কি রদবদল হয়েচে?

সব কিচুই... এখন সবকিচুই ঝ্যাকেস...

আমিও তো ঝ্যাকেস, হয়তো তোমরা দেখতে পাও না, এই যা।

ওসব আনায় ধানায় বাদ দাও খুঁড়ো, একটা ঘর করো।

ঘর তো রহেচে।

ওটা থাকবেক নাই, পড়ে যাবেক।

পড়ে গেলে করব।

তখন থাকবে কোথায়?

গাছ তলে।

ওহ খুঁড়ো একটা বুদ্ধি দিচ্চি শোনো।

বলো।

শুনেচ কি, আমাদের এ এলাকায় একটা স্পিনিং মিল হচ্ছে?

না।

শুনবে কি করে? তুমি তো তখন নার্সিহোমে। খুব বড় মাপের একটা লোক ওই মিলটা করচে। তা আমাদের সবাইকে জমি দিকে হবেক।

আমি জমি দুব কেনে?

জমি না দিলে যে মিলটা হবেক নাই। আর না হলে কত ক্ষতি জান?

মিল না হলে ক্ষতি, আর চাষ না হয়ে ক্ষতি নাই?

আমাদের এলাকায় চাষ না হলে কী ক্ষতি আচে?

আলু, ধান, গম, জব, তিল, কপি, মূলা, পালং—এই গুলো কি তোমার মিলে ফলবেক নাকি?

হাবল বাবার কথায় 'তেঁয়ে' যায়। বাবাটা না, কথা বলতেও জানে না।

সাইফোন দম নিয়ে কথা বলে, না তা ফলবেক নাই, তখন আমরা কিনে খাব-ব-ব।

কিন্তু পাবেটা কোথায়? কো-থা-য় পা-বে?

হঠাৎ পাতলা মতো লোকটা চেঁচিয়ে ওঠে, খুঁড়ো তুমি যে বলচ জমি দুব নাই, আমরা চারদিকের লোক জমি দিয়ে দিলাম, তুমি মাঝখানে, যাবে কোনদিকে?

ব বাড়ুই আর কথা বলে না। বুঝতে পারে এরা কোমর 'এঁটে' এসেছে। মিচকেপড়া নিকুঞ্জও বোধ হয় এদের দলে।

সাইফোন বলে, খুঁড়ো দিন কাল পালটে গেচে। আগের মতো আর ধামা ধরে বসে থাকলে চলবেক নাই। এটা বিশ্বায়নের যুগ। মানুষকে উন্নত ধারায় চলতে হবেক। মানুষ উন্নয়ন চায়। উন্নয়ন আসবেক শিল্পায়নের হাত ধরে। আমাদেরকে শিল্পায়নের সহযোগিতা করতে হবেক।

ব বাড়ুই চুপ করে থাকে।

লোকগুলো বকতে বকতে উঠে যায়। ওদের পায়ের জোরে লন্ঠনটা দম উস্কে আরও জোরে জোরে জ্বলতে থাকে। ব বাড়ুই ওদের দিকে তাকতে পারে না। ওদের মুখে এখন একশোটা সূর্যের প্রভা। হাবলের মুখেও তার তেরছা খানিকটা পড়ছে।

লন্ঠনটা এখনও জ্বলছে। গাদা গাদা 'ভুঁসো' ছাড়ছে সারা আকাশ জুড়ে। ভুঁসোময় আকাশে ব বাড়ুই চোখ তুলে তাকাল। হ্যাঁ, যা অনুমান ঠিক তাই। আকাশে 'যমকুলি' উঠেছে! যমরাজ আকাশে রাস্তা নির্মাণ করেছে, তার কুলিকামিনদের মাটিতে নামার জন্য। ব বাড়ুই ত্রস্ত গেল খেজুর গাছটার কাছে। খেজুর গাছের তলপিঠে বাম হাত উল্টিয়ে, মধ্যমা আর অনামিকাকে লম্বালম্বি পাশে শুইয়ে, তর্জনী আর কনিষ্ঠাকে এক করে, ও এখন 'ব' লিখছে। 'ব'।

__

অধ্যায় ১৭ / ১৭
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%