বেশ দিলি মাইরি

জয়দেব দত্ত

মুড়ির টিনের মতো ঝড়াং ঝড়াং করতে করতে বাসটা যখন আমাদের এই ছোট্ট মফসসল শহরের সরু ঘুপচি রাস্তাটার মধ্যে ঢুকল, আমি তখন তড়াং করে লাফ দিয়ে রাস্তায় নামলাম।

নামতেই টের পেলাম, আমার দেহটা যেন পচে গেছে। দেহের অংশবিশেষ থেকে টুকরো বিটুকরো হয়ে পচা পচা গন্ধ বেরিয়ে আসছে। বেরোবে না, যা ভিড়! এতক্ষণ ভ্যাপসা গরমে সেদ্ধ হয়ে যাচ্ছিল শরীরটা। কেবলই মনে হচ্ছিল আমরা যেন কেউই বেঁচে বর্তে নেই, সব মরে গেছি। মরে পচে গেছি। মরা পচা মাথাগুলো যেন বাসে ঝুলছে।

হয়তো এই সবই আমার ট্রাভেল সিকনেসের ফল। যখন থেকে বাসে চেপেছি, তখন থেকেই শুরু হয়েছে ব্যাপারটা। মনে হয়েছে, বাসটা যেন রোডে চলেনি। আমার কপালের ঠিক মাঝখানটিতে চক্রাকারে অবিরাম সিলিং ফ্যানের মতো পোঁ পোঁ ঘুরছে। ফলে মুখ বেয়ে অনর্গল বেরিয়ে এসেছে বমি। একদম নিশ্বাস প্রশ্বাস দেবে, দাঁত ফাঁত টিপে ওর বেরিয়ে আসার পথ কোনোরকম বন্ধ রেখেছিলাম। কিন্তু ব্রেক দাবলেই, আমি ফেল। একেবারে তেল থেকে বেরিয়ে এসেছে পেটের নাড়ি। বেরিয়ে গাড়ির চাকার পাশে যে সরু রাস্তা, সেই রাস্তাটাকে পুরো ভিজিয়ে দিয়ে গেছে! তখন কী কষ্ট আমার!

এর থেকেও আরও বেশি কষ্ট পেয়েছিলাম কাল রাতে। রাতে বিছানায় ঘুমচ্ছি। খুব ঘুমাচ্ছি। ঘুমে শান নেই। কালঘুম যাকে বলে আর কি! কেটে দিলেও ঘুম ভাঙবে না, এমন ঘুম। তো, হঠাৎ একেবারে হঠাৎই, আমার 'মাথা-সিথেন'টা কোঁকিয়ে কেঁদে উঠল। কী ব্যাপার কী! না, তোর ছোটকা আর নেই।

নাই মানে?

নাই মানে নাই।

কোথায় গেল ছোটকা?

তোর ছোটকা মরে গেছে।

ছোটকা মরে গেছে! আমি আঁৎকে উঠলাম। আমার বাবার আদরের আপন ছোটো ভাই, সে ম-রে গে-ল-অ-অ। যে ভাইয়ের জন্য, আমার বাবা তার দুধে দাঁতে চুকচুক দুধ চুষতে চুষতে, না বলতে না করতে, একবাক্যে ছেড়ে দিয়েছিল মায়ের কোল। সে কাকা, গু খেয়ে, মুত খেয়ে আমাকে কোলে পিঠে মানুষ করেছিল, আমার সেই পরম ভক্তিজনেষু ছোটকা মরে গেল।

আমার আর আক্ষেপের জায়গা থাকল না। বিছানায় পড়ে পড়েই ভ্যা করে কেঁদে দিলাম। চোখের জলে একসময় 'সিথেন'টা ভিজে গেল। ভিজবে না। ছোটকা বলে কথা। আঁধানো নয়, গাঁধানো হয়, নিজের ছোটকা। আমার বাবার একই মায়ের সন্তান।

সকাল হয়েছে কী হয়নি, হাত মুখ ধুয়েছি কী ধুইনি, অমনি কাঁধে ব্যাগ লটকে বেরিয়ে গেলাম বাসস্ট্যান্ডে, বাস ধরার জন্য। স্ট্যান্ডে গিয়ে থ। দেখি কী, বাস কোথায়, সব পরপর লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে। কী ব্যাপার কী, বৃত্তান্তটা কী ঘটল? না, আজ বাংলা বন্ধ। বোঝ ঠেলা!

মনে মনে গাল দিতে থাকলাম প্রচুর। এমনি এমনি তো গাল দেওয়া অভ্যাস নেই। তাই ব্যাগ হাতড়ে খাতা কলম বার করলাম। মগজে ধোঁয়া দিয়ে, টেনে হেঁচড়ে, এক একটি মণি-মুক্তো মূল্যবান বাখান লিখলাম খাতাতে। সুর করে করে, হাত-পা-মাথা-ঘাড় হেলিয়ে দুলিয়ে, কবিতা পড়ার মতো, রিহার্সাল দিলাম খানিকক্ষণ। তারপর মুখস্থ হয়ে গেলে, সোজা স্টেজে। স্টেজে উঠে, বাখানে জল বসিয়ে দিলাম।

এতক্ষণ ধরে চেঁচানোর ফলে আমার বাখান কেউ শুনতে পেল কি পেল না, জানি না। তবে যদি কেউ শুনেও থাকে, আমার ভয় ডর নাই। ভয় করব কাকে? যাকে এতদিন ভয় করে এসেছি, সে তো চলে গেল!

এভাবে একা একা দাঁড়িয়ে কতক্ষণ আর মুখ ধরাতে পারি। আমার 'সাপোডার' বলে তো কেউ নেই। যার গায়ে গা নিয়ে দাঁড়াব খানিকক্ষণ। ফলে পাগুলো আমার টলে যাচ্ছিল। দেহটা ক্লান্ত। কাল মাঝরাত থেকে যা গেছে!

দেহের সুস্থির আনার জন্য একটা গাছতলায় আশ্রয় নিলাম। না, গাছটাই আমাকে নিজে টেনে বসিয়ে নিল। খুব বড় গাছ তো! আর যে কোনো বড় জিনিসের, নিজের দিকে টানার একটা মহৎ গুণ থাকে।

গাছটার নীচে বসে, নিজেকে সম্পূর্ণ সঁপে দিলাম। কী আশ্চর্য, বড়দের কাছে নিজেদেরকে সঁপে না দিলে হয়!

গাছটা আমাকে শীতল ছায়া দিল। সকালের শীতল। নেহাত মন্দ লাগছে না। মুখ চোখ হাঁ করে বাতাস নিচ্ছি। আর ওর সঙ্গে আমার দুঃখের কথা সিয়ার' করতে করতে ক্রমেই ঘনিষ্ঠ হয়ে যাচ্ছি। বুকটা হালকা হয়ে যাচ্ছে ওর সঙ্গে কথা বলতে পেরে। মনের কথা কাউকে না শোনাতে পারলে, বুক কি হালকা হয়!'

গাছটা খুব মন দিয়ে কথা শুনছে। চোখের পাতা পড়ছে না যেন। মাঝে মধ্যে ঢোক গিলছে। আর আমাকে ধৈর্য্যবান হতে বলছে। কিন্তু আমি কিছুতেই ধৈর্য্য ধরতে পারছি না। চোখ বেয়ে কেবলই জল বেরিয়ে আসছে। পাঁচ আঙুল দিয়ে জল মুছছি। বাধ মানছে না। আবার হড় হড় করে বেরিয়ে আসছে।

মাঝে মধ্যে প্রমাদ গুনছি আমি, একটা একটা বাসও যদি কোনোমন্দে স্ট্যান্ড ছাড়ে তো সঙ্গে সঙ্গে বাঘ হয়ে যাব। একে তাকে হ্যাঁচুড়ে হুঁচুড়ে ঠিকই নিজের দাঁড়াবার মতো জায়গা বার করে নিব। গাছটার উদ্দেশ্যে বললাম, আর না ছাড়ে তো, তোমারই তলে বসে থেকে, তোমারই মাটি খেয়ে খেয়ে, একদিন মাটি নিয়ে নিব।

শুনে গাছটা হো হো হাসল খানিকক্ষণ। এমন সময় ঝাপসা চোখে দেখতে পেলাম, এসবিএসটিসি বাসটা নড়ে উঠল। আর বলে কে। বাঘ হতে আমার বেশিক্ষণ সময় লাগল না। তড়াং করে লাফ দিয়ে বাসে উঠলাম। আমার লাফ দেওয়ার জন্যই নাকি কে জানে, বাসটা এধার থেকে ওধার নড়ে উঠল।

বাসে তখনও ভালো করে থিতু হয়ে দাঁড়াইনি। অমনি কনডাক্টরের হেঁড়ে গলা, বাসে উঠছেন, বেশ করেছেন। উঠতে মানা করছি না। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছোতে পারবেন, এমন কথা বলতে পারব নাই। যেখানেই আটকে যাবে, নেমে পড়তে হবে। কোনও পয়সা ফেরৎ নাই।

এই মুহূর্তে কনডাক্টরের হেঁড়ে গলা আমার কানেই ঢুকল না। কারণ পয়সায় কী আসে যায়। পয়সা আসতেও জানে, যেতেও জানে। কিন্তু মানুষ চলে গেলে, আর আসে না। কী করে আসবে, যমেতে ছুঁয়েছে যে। যম ছুঁলে, মানুষের হাত পা বাঁধা।

মানুষের হাত পা বাঁধা, বিলক্ষণ জানি। তবু কিছুতেই যে মন মানছে না। কেবলই বুকের ভিতরটা আকুলি বিকুলি করছে। একটা মাত্র কাকা আমার। কাকা কাকা বলে ঘরে ঢুকতাম আর বেরতাম। আজ কী বলে ঘর ঢুকব?

এক এক সময় মনে হচ্ছে, ছোটকা মরে ভালোই হয়েছে। ছোটকা তো মরেনি, মরে বেঁচে গেছে। গো-জন্ম থেকে খালাস পেয়েছে।

এতদিন কী কষ্টটাই না হত ছোটকার। বন্য জীবজন্তুর মতো হাতে পায়ে হাঁটতে হত। হাতে পায়ে হেঁটে হেঁটে হাঁটুর মালাইচাকিগুলো খ্যাস খ্যাসে সাদা আকোল পড়ে গেছিল। সেই সাদা জায়গায় খুটিং অথবা কাঁকরে পা পড়ে পড়ে, একহাত দু'হাত গর্ত হয়ে গেছিল। সেই গর্তমুখে কোনো কিছু পড়লেই, প্রাণটা যন্ত্রণায় ধড় থেকে বেরিয়ে আসতে চায়তো। কিন্তু ছোটকার গা তো, মোষের গা! মোষের কি কাঠি না খোঁচা, কোনো কিছু, হুঁস থাকে কি।

অথচ ছোটকা তো বরাবরই এই রকম ছিল না। শুনেছি। এক সময়ে না কি খুব সুপুরুষ ছিল। গায়ে হাতির মতো বল ছিল। আর গায়ের রং টা ছিল, ঠিক ওই পাকা আমের মতো।

বেগোকন্দার 'তাও দাদু' অর্থাৎ আমার কাকিমার বাবা, তিনি এসেছিলেন আমাদের ঘরে গরু কিনতে। গরু কেনা তো খুব হয়েছিল। কারণ, তখন গোয়ালের গোরুগুলো 'মেল্লামাঠ'-এ। মানে, ফাঁকা মাঠে, সে সময় মাঠে কোনও ফসল থাকে না, চরতে গেছিল। ফলে শূন্য গোয়াল। গোয়ালটা শূন্য হলে কী হবে, আমাদের ঘরটা তো আর জনশূন্য ছিল না। ফলে রীতিমতো একঘর লোক ছিল। সেই সঙ্গে ছিল আমাদের ছোটকা। 'তাওদাদু' আমাদের ছোটকাকে নিজের কোলের সামনে দাঁড় করিয়ে রেখে, গোরুর মতোই ছোটকার হাইট মাপ ছিল, চোদ্দো 'পুয়া' না পনেরো 'পুয়া' 'খাড়ায়'। মানে লম্বা। আর আমাদের এই ছোটকা, অবলা জীবের ঘাড়ের ঠিক উলটো দিকে হাত বুলালে, জীব কেমন আরামসে তার চোখ 'পাতালে' দেয়, মানে, চোখ উলটে দেয়, আমাদের ছোটকাও 'তাওদাদু'র কোলের ভিতর ঢুকে চোখ 'পাতালে' দিচ্ছিল।

তারপর আমার বাবা মাঠ থেকে ঘর এলে, 'তাওদাদু'কে সঙ্গে নিয়ে, আমাদের গুদাম ঘরে খিল এঁটে কী সব গুজুর ফুসুর করছিল। আমাদের কানে ওইসকল কথা মোটেই ধাতে টিকেনি। বাবা একাই কেবল নিজের মনের মধ্যে গুরুল ছিল কথাটা। কাউকে ঘুণাক্ষরেও শোনায়নি।

কিন্তু বাবা না শোনালে কী হবে, বাতাসেরও তো কান আছে। তো বাতাসে বাতাসে ছোটকার কানের ভিতর, একেবারে গুরুপর্দায় সোজা ঢুকে গেছিল কথাটা। তখন ছোটকার মজা দেখে কে!

সেই বলে না, উপর বাঁধ ভেঙে গেলে মাঝের বাঁধে বান আসে। তো কথাটা শোনা মাত্রই, ছোটকার উপর বাঁধ ভেঙে চৌচির। মাঝের বাঁধে কেবলই হড় হড় বান আসছিল। তবে এই বান আসা তো ছোটকার একার নয়, আর এই পাড়ে একা একা চুপি চুপি দাঁড়িয়ে, যে কেবলই ঢেউ গুনছিল, তারও তো বাঁধ ফাঁদ ভেঙে চুরে একাকার। দু'জনেই কেবলই ছলাৎ ছলাৎ শব্দ তুলছিল।

ওই শব্দ শুনে বাবার কী বুক ঢিপ ঢিপ। উপর বাঁধ গেছে গেছে। কিন্তু মাঝের বাঁধটা যদি কোনোমন্দে ভেঙ্গে একাকার হয়ে যায় তো, বিপদের জায়গা থাকবে না। এখন বাবা তো বাবা, গোটা গাঁয়ের লোক ছি ছি করবে।

তাই বাবা, 'তাওদাদু'কে চোখের ইশারায় ডেকে পাঠিয়েছিল। বাবার ডাকে 'তাওদাদু' সাত তাড়াতাড়ি এসেছিলও। আসবে না মানে, পাত্রটি বাবার ভাই হলেও কন্যেটি' যে তার নিজের। একেবারে প্রথম প্রেমের টাটকা ফসল। সে আর দেখতে আছে।

খুব তাড়াহুড়ো করে বিয়ের দিন ঠিক হল আষাঢ়ে। সেই সেবার, যখন আমাদের আষাঢ়ে আমগাছটায় আম পেকে আম পড়ছিল ধুস ধুস। আর আমরা হাত পেতে আম লুফছিলাম লফ লফ। তখন আমাদের গাঁয়ের 'দশের লোক' অর্থাৎ গাঁয়ের দশজন যাকে নিমন্ত্রণ করার দায়িত্ব দিয়েছে। সেই 'দশের লোক' হাঁক পাড়ল, বিয়ে দিতে যাবি নাই, চ যাবি কখন?

যাব নাই মানে। খুব তাড়াতাড়ি পকেটে আম ভরছি। তপ তপে পাকা আম। আমের ভারে হল কী, না, আমার প্যান্টের পকেটটা গেল ভরভর করে ছিঁড়ে। যা চলে।

খুব তাড়াতাড়ি পকেটে সেফটিপিন এঁটে জোড়া দিচ্ছি। জোড় কিছুতেই মানছে না, কেবল ছিঁড়ে যাচ্ছে। এমন সময় আকাশে বাঁধভাঙ্গা বৃষ্টি। বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে আমার আর বরযাত্রী যাওয়া হল না। না যেতে পারার আক্ষেপে বসে আছি। বসে বসে কাঁদছি, এমন সময় দেখি কী, ছোটকা ছাতা ফুটিয়ে বিয়ে করতে বেরিয়ে গেল। তার পেছন পেছন পেখে মাথায় বরযাত্রীর দল।

তালপাতার পেখে। ঢপ ঢপ জল পড়ছে পেখের উপর। শব্দ শুনে মনে হচ্ছে, ছোটকা যেন ব্যান্ডপাই বাজনা নিয়ে নয়, পেখেপাই বাজনা বাজিয়ে বিয়ে করতে যাচ্ছে।

বাজনার শব্দ শুনে, কান্না ভুলে গেলাম। তার জায়গায় বুক ঠেলে হাসি বেরিয়ে এল। বেদম হাসছি। হাসতে হাসতে মুখে ফ্যান বেরিয়ে যাচ্ছে আমাদের। তবু হাসি থামছে না।

তারপরের দিনও বৃষ্টি ছাড়ল না। সকাল পেরিয়ে দুপুর গড়িয়ে গেল, তাও না। এদিকে ছোটকা না আসতে পারার দরুণ আমার চোখে জল গড়িয়ে যাচ্ছে। তাহলে কি ছোটকা আর আসবে না? না কি আজ থেকে ঘর-জামাই থেকে গেল! নানান কুচিন্তা আসছে মাথায়, এমন সময় পদ্মপুকুরে চোখ চালাতেই দেখি কী, কাকা আর কাকিমা ছাতা টাতা ফেলে, বৃষ্টিতে চুবুড় ভেজা ভিজতে ভিজতে, দু'জন জড়াজড়ি করে টিপে ধরে আসছে। কাকিমার পেছনের পিঠের শাড়িটা কোমর পর্যন্ত কাদায় লেপ্টি লাগা লেগে রয়েছে। আর আশ্চর্য, কাকার গায়ে কোথাও কাদা লেগে নেই। কেবল হাতের কুনুইগুলি ছাড়া।

তারপর মোয়ান দিকে কত জল পেরিয়ে গেছে। একদিন নয়, দশদিন নয়, বেশ কয়েকমাস পর, আমাদের পায়রাচরে যে মাঠের পুকুর। অর্থাৎ কোনো মানুষজনের পুকুর নয়, মাঠেদের পুকুর, মাঠের পুকুর। গ্রীষ্মকালে তপ্ত বাতাসে মাঠ যখন ফেটে কাঁকুড় ফাটা, ফসলগুলোর তৃষ্ণায় বুক ফাটছে। সব্জিগুলো আগুন, আগুন সেবন করছে কেবল, তখন পুকুরের জল সেঁচে সেঁচে মাঠগুলো তৃষ্ণা মিটাচ্ছে। সেই থেকে মাঠের পুকুর।

পুকুরের দক্ষিণ দিকে কুয়াতলা। কুয়াতলায় চারপাশে সরু সরু বালি। কুয়াতলায় সরু বালি পায়রা গম গম করে গো/ পায়রা নয় যা পাখি নয় মা তুসু খেলা করে গো। দূর, এখানে তুসু খেলতে যাবে কেন? তুসু খেলে আমাদের আঙ্গিনার মাঝখানে যে কুয়াতলা, তার চারপাশ যে সরু বালি, সেই বালিতে। এখানে এই নির্জন প্রান্তরে, ঝোপ-ঝাড় লতা-গুল্ম বেষ্টিত জঙ্গলময় স্তূপে তুসু খেলতে যাবে কোন দুঃখে। সে আমাদের মেয়ে না। বরঞ্চ খেলার মধ্যে খেলে, আমাদের মাথনাবুড়ো। এই বুড়ো তো আর ইঁট কাঠ পাথরের সিমেন্টের বেদী, অথবা সৌখিন কোন মন্দিরে থাকে না। সে থাকে লতাগুল্মে বেষ্টিত ঝোপ ঝাড়ের ভিতর কয়েকটা ভাঙ্গা চোরা হাতি ঘোড়ার ভিতর। তারপর রাত নিঝুম হলে, হাতি ঘোড়ার বুক চিরে ঠেলে বেরিয়ে আসে এই বালি গাদাতে। ছোট্টো শিশু হয়ে আপন মনে খেলা করে। আমার বাবা রাতের বেলায় জল পাওয়াতে পাওয়াতে কতবার যে দেখেছে।

মাথানবুড়োর মাথার উপর একটা শুকনো বাবলা গাছ ছিল। একদিন কী মনে করে পরশুরামের মতো দুর্জয় কুঠার হাতে করে ঝপ ঝপ শব্দে গাছটাকে একেবারে ধরাশায়ী করে ফেলেছিল আমাদের ছোটকা।

আর সেই রাতেই বিছানায় শুয়ে শুয়ে ছোটকার পক্ষাঘাত। অনেক মেহনত করে ছোটকার পক্ষাঘাত সারল ঠিকই, কিন্তু পা দুটি আর সারল না। চিরতরে খোঁড়া হয়ে গেল।

সে দেখে বাবার কান্না দেখে কে। বাবা তো কেঁদে কেঁদে নিজেই রুগি হয়ে গেছিল। দিনরাত ধরনা দিয়ে পড়ে থাকত বুড়োর থানে। শুধু বাবা একা কেন, আমাদের সংসারে একপ্রকার সবাই মাথনাবুড়োর থানে পড়ে থাকত। মাথনাবুড়োই তো রেগে মেগে এমন অকাজটা করল। অন্তত আমাদের বাড়ির প্রায় প্রতিটি সদস্যই এই কথাটা মনে করে।

বাবা যখন কাকার পা দুটির শোকে সুর করে কাঁদতে কাঁদতে লাঙল চালাত, বাবার কান্নার সুর শুনেই না কী মাথনাবুড়ো সাপ বেশে, বাবার লাঙলের ফালে দেখা দিত। ফাল ধরে সোজা লাঙলের বোঁটাতে উঠে, টিপে বোঁটা ধরত। বাবা তখন বোঁটা ফোঁটা ছেড়ে, একপাশে ঘুরে দাঁড়াত। দু'হাতে গড় হয়ে সেলাম ঠুকত।

শুধু যে মাঠেই দেখা দিত, তা না। মাঝে মাঝে আমাদের ঘরেও উঠে আসত। কাকিমা একদিন মুড়ির টিন থেকে মুড়ি ঢালতে গিয়ে দেখে ফেলে ব্যাপারটা। মুড়ির টিনের তলে যে পাটাতন, সেই পাটাতনের নীচে লম্বালম্বি শুয়ে রয়ে চক্রধারী সাপটা। সাপ দেখে কাকিমা তো ভয়ে অজ্ঞান। কাকিমার চিৎকারের ফলে গোটা গাঁয়ের লোক জড়ো হয়ে গেছিল আমাদের ঘরে। তারা এসে দেখে কী, পাটাতনের তলে একটা নয়, তার পাশে যে ইঁদুরগর্ত, সেই গর্তের ভেতরে নাহলেও দশ বারোটা ছোটো বড়ো সাপ কুন্ডলি পাকিয়ে। বোঝ ঠেলা।

আমার মা সঙ্গে সঙ্গে দুধ কলা নিয়ে, ঢাক কাঁসরঘণ্টা বাঝিয়ে মাথনাবুড়োকে পুজো দিয়ে আসে। এত করেও মাথনাবুড়োর মন গলানো গেল না। কাকার পা'টা যে কে সেই থেকে গেল। আমাদের বাড়ির সকলের আক্ষেপের আর জায়গা থাকল না।

সেই দিনের সেই কাকা আজ হুট করে মরে গেল। এতদিন এত রোগ ভোগের পরও কাকা ঠিকই বেঁচেবর্তে ছিল। কিন্তু কাল মাঝরাতে কী যে হল।

কাকা মরে বেঁচে গেছে। খুব 'খোদাবিকুলে' লোক ছিল তো। মানে, কাজ পাগল লোক। রোজ সকাল হলেই গোরুর বানে ষোলো বালতি জল ভরত। সকালে ষোলো, আর দুপুরে বত্রিশ বালতি। বোঝ ব্যাপারটা। না হলে এতগুলো অবলা জীব খাবে-টা কী? অষ্টরম্ভা?

কাকার বালতি ভরে জল ভরার ব্যাপার ছিল কী অদ্ভুত। কলের হ্যান্ডেলটা ধরে চুপ করে বসে থাকতে থাকতে হঠাৎ তিড়িং করে লাফ দিয়ে, হ্যান্ডেলটা নীচে নামাত। ভর ভর করে জল পড়ত বালতিতে। এভাবে কল টিপে টিপে বালতি ভরতি করে, ছোটকা যখন জল বইত, তখন একটা হাতে বালতিটা উপর দিকে তুলে ধরত, আর অন্যহাতে—মাটিতে হাত গেদে গেদে, হাঁটু মুড়ে মুড়ে চলত। কাকার কী কষ্ট তখন। এত কষ্ট দেখেও তো কিছু করার ছিল না। কারণ, কাকার হাতের কাজ কেড়ে নেব কী, কাকাই আমাদের হাতের লফ লফ কেড়ে নিত। খুব 'খোদাবিকুলে' ছিল না।

গোরু বাছুরের খাবার, ছেনি কাটাতে ছিল ছোটকা এ গাঁয়ের অদ্বিতীয়। বুটিনের 'পুড়ি' মুখে এমন খস খস খড় কাটত, দেখে মনে হত, বুটিন নয়, যে মেসিন চলছে ছোটকার হাতে। আর তেমন ছিল বসার তারিফ। খোঁড়া পাগুলোকে এমন জড়ো করে বসত, মনে হত ছোটকা যেন খড় কাটতে বসেনি, খড় খেতে বসেছে।

ধান ঝাড়ার পর খড়ের ডগে শুকনো চিমসে ধান এঁটুলির গায়ে চিটিয়ে থাকে। সেই ধান বুটিনের 'পুড়ি' মুখে পড়লে পর সোজা। বুটিনের বারমুখের ঘষ্টানিতে ধান ঝর ঝর করে নীচে পড়ে। যা ইঁদুর বাঁদরেরও অখাদ্য। সেই অখাদ্যগুলিকে ঝাঁট দিয়ে জড়ো করে, তাতে কুলোর বাতাস দিয়ে গোয়ালের এক কোণে ফেলে রাখত। 'সমবছর' পর, অর্থাৎ সারা বছরের শেষে, সেই ধান বস্তায় ভরে, আড়তে বিক্রি করত ছোটকা। সেই দিয়ে আমাদের বই খাতা জোগাড়।

এ এলাকায় বৃষ্টি বাদল হলে, অথবা কাজ কাম না থাকলে, আমাদের গোয়ালের মাচা থেকে, গোরুর গাড়ির ভাঙা ফুটো 'পাইটা' ছোটকা টেনে বার করত। ওই 'পাই' এর উপর বসে 'ঢেরা' পাকাত। পলিথিনের বস্তা অথবা নুনের বস্তা থেকে সরু সরু সুঁতলি বার করে উঁচুতে কোনো এক জায়গায়, মাথার ঝুঁটির মতো বেঁধে, ঝুঁটি থেকে সুঁতলি বার করে করে ঢেরা'তে পাক দিত। শেষে 'ঢেরা' ভরতি হয়ে গেলে, 'ঢেরা' ভেঙে ভেঙে দড়ি পাকাত ছোটকা। সেই দড়ি হত অক্ষয়, অজয়। ছোটকা মচের কড়ে কড়ে হেসে বলত, 'দড়ি ছিঁড়বেক কি রে-এ-এ। ছেলে ছিঁড়ে যাবেক তবু ছেলের ঘুমসি ছিঁড়বেক নাই। বুঝলি, কি না বুঝলি!'

ছোটকার একমাত্র যান বলতে ছিল গোরুর গাড়ি। আমরা তো পায়ে হেঁটে হেঁটে হিল্লিদিল্লী ঘুরে নিতাম। ছোটকার তো সেই মুরদ ছিল না। ফলে ছোটকার একমাত্র গোরুর গাড়ি ছিল সহায় সম্বল। এ তল্লাটে এমন কোনও জায়গা ছিল না, যা ছোটকার গাড়িতে চেপে দু'চার পাক দিইনি।

প্রতি বছর নিয়ম করে, ছোটকা আমাদের পুরো ফ্যামিলিটাকে গরুর গাড়িতে চাপিয়ে, পৌষমাসের সংক্রান্তিতে মকরচান করিয়ে আনত।

সকাল হতেই কাটারি হাতে বেরিয়ে যেতাম বাঁশঝোড়ে। বাঁশঝোড় থেকে কঞ্চি কেটে এনে, 'ঘরগাড়ি' বানাতাম। তার উপর তালাই পেতে, আমাদের একদিনের সুখী সংসার। সংসারটা তো গ্রামে থাকত না, গাড়ি চেপে চলে যেত নদীর বালিয়াড়িতে। সেখানে নদীচান করে, গামছার উপর মুড়িতে চপ মেখে, চোঁয়ো কেটে, জল তুলে তুলে খেতাম। একপ্রকার ছোটকাই ছিল, সেই দিনের সেই মকরচান করার কান্ডারী। ছোটকাই তো, আমাদের পুরো ফ্যামিলিটাকে এক জায়গা জড়ো করে নদীচান করিয়ে আনত।

আজ ছোটকা নেই, আমাদে এত বড়ো সংসারটাকে কে রোজ রোজ চান করিয়ে আনবে।

ছোটকা যে নেই, সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত। কেন না, পিলকা নিজে মুখে খবরটা দিয়েছে আমাকে। পিলকা ছোকটার সবেধন নীলমনি। আর আমার কাকাতো ভাই। নিজের ভাই নয় ঠিক কথা, কাকাতো ভাই তো বটে। কাকাতো ভাই পর হল?

আমি তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। পিলকাও ঘুমাচ্ছিল নিশ্চয়। ঘুমতে ঘুমতে বাবার মৃত্যু দেখেছে। আর স্থির থাকতে পারেনি। বিপদে পড়ে অসহায় স্মরণ নিয়েছে আমার। তাই জোরে, একেবারে বিকট শব্দ করে, ডেকেছে আমাকে। আমি যত দূরেই থাকি না কেন, ওর ডাক ঠিকই শুনতে পেয়েছি। কী আশ্চর্য শুনতে পাব না? নাড়ির টান বলে কথা। এক নাড়িতে টান পড়লে, আর এক নাড়িতে ব্যাথা অনুভব হয় না কি? মৃত্তিকার সঙ্গে মৃত্তিকার অনেক তফাৎ হতে পারে। কিন্তু এক আঁতের সঙ্গে আর আঁতের কোনো তফাৎ হয় কি? ওর আঁত কেঁদেছে, তাই আমার আঁত কাঁদতে বাধ্য। আঁত মানে আত্মা।

পিলকাকে আমি যতটা অন্তর দিয়ে ভালোবাসি, ঠিক ততটাই বিরক্ত হই। কেন হব না, খুব বাচাল যে।

এই তো সেদিন, ক'দিন আর হবে, বড়োজোর একবছর, কি তার দু'একমাস কম বেশি হবে। আমরা সবাই মিলে পরপর লাইন দিয়ে খেতে বসেছি। একমাত্র পিলকা ব্যতিক্রম। পিলকা তো কখনোই আমাদের লাইনে আসে না। বেলাইনে হাঁটতে ভালোবাসে। তো পিলকা খেতে বসেছিল, আমার মায়ের মুড়িভাজা উননটার পাশে। বসতেই, উননটা ভেঙ্গে যাবার ভয়ে, কাকিমা রি রি করে তেড়ে এসেছিল মায়ের উননে ফুঁঙ দেওয়া, বাঁশের খুঁকচোঙটা হাতে করে। কিন্তু বেশিদূর এগোতে পারেনি, কারণ সামনেই বসেছিল আমাদের ফ্যামিলির শ্রীখণ্ডি, শ্রী শ্রী হলধর পটল মহাশয়, যিনি এ সংসারের সর্বেসর্বা। আমার বাবা। আর কাকিমার ভাসুর ঠাকুর। কাকিমা বাবাকে দেখেই, পাঁচ না এগোল, তো দশ পা পেছিয়ে গেল সঙ্গে সঙ্গে।

পিলকা তো পেহোল না, বরঞ্চ আরও দু'ইঞ্চি উননটার পাশ দিকে সরে গেল। তারপর উটের মতো মুখ তুলে ফস করে বলে বসল, বলতো পুরুষের যৌবন কারে কই?

পিলকার এমন বেভঙ্গি প্রশ্ন শুনে মাথাটা আমার মুহূর্তে হ্যাট হয়ে গেল। আমি আর কোনোরকম মাথাটা উপর দিকে তুলতে পারছি না। নাভিকুন্ডের ঠিক নীচ থেকে, লজ্জা ঘৃণা আর আক্রোশ, আমার শরীরটাকে বার বার ঝাঁকুনি দিচ্ছে। তবু কোনোরকম আমি সামলে সুমলে আছি। এমন সময় ছোটকাই, সমূহ বিপদ থেকে আমদের প্রত্যেককেই উদ্ধার করল। খুব আমতা আমতা করে বলল, যৌবন আর কিছু নয়, যৌবন হল—একটা পরিণত মানুষের কতকগুলো স্মরণীয় বয়স মাত্র।

শুনে পিলকার কী ঘাড় নাড়ানো। ঘাড়টা এধার থেকে ওধার নড়াতে নড়াতে বলল, নো ন্নো ন্নো নো-ও-ও, ভুল ভুল বিগ জিরো। যৌবন হল পয়সা; পয়সাই পুরুষের যৌবন।

কথা শোনার মাত্রই মাথাটা চম করে ধরে গেল আমার। হ্যাঁ তাই তো। ঠিকই তো। পুরুষের পয়সাই সব!

তারপর থেকে পয়সার চিন্তা আমাকে কামড়াতে থাকে। সেই কামড়ানোর হাত থেকে রেহাই পেতে, আজ আমার বিদেশ ভুঁই-এ আসা। সেঅবধি, কাজে কাজে আর কখনোই ঘরমুখ হতে পারিনি। আজ আবার সেই পিলকার ডাকে আমাকে ঘর মুখ হতে হয়েছে।

ছেলেটা পিতৃশোকে কেঁদে কেঁদে এতক্ষণ হয়তো পাষাণ হয়ে গেছে। আমাকে ঘর যেয়ে ওর পাষাণমুর্তি ভাঙতে হবে। কী করেই ভাঙি, আমারও যে কোমরটা ভেঙে গেছে।

বাস থেকে নামার পরে থেকেই পচা গন্ধটা আমার গা থেকে কিছুতেই যাচ্ছে না। কী যে করি? রাস্তায় গাড়ি ঘোড়াও দেখছি না, যে চেপে ঝপ করে চলে যাব। একা দুটো সাইকেলও নেই। ফলত আমকে হেঁটে হেঁটেই যেতে হবে। কিন্তু পথ তো ঠাঁই নয়, সে অনেক দূর।

বিরক্ত মনেই এক পা দু'পা হাঁটলাম। এখনো গা'টা গুলাচ্ছে আমার। তাহলে বাসের ধকল যায়নি। মুখ বেয়ে বমি আসছে। রাস্তার একপাশে বমি করার চেষ্টা করলাম। বমি হল না, উলটে মাথাটা ঘুরে গেল। ধক করে বসে পড়লাম মাটিতে। মুখে আঙুল ভরে বমি করার চেষ্টা করলাম। হল না। মুখ বেয়ে তেতো জল বেরিয়ে এল খানিকটা। কী দুর্গন্ধ।

মাথার যন্ত্রণায় মাটিতে ফেটে পড়তে ইচ্ছা করছে। মুখটা মাটিতে গুঁজে গেল আমার। তাহলে কি আর বাড়ি যেতে পারব না?

আকাশটা ক্রমে কালো হচ্ছে যাচ্ছে। একটু পরই বৃষ্টি এসে ভাসিয়ে নিয়ে চলে যাবে কোন মুলুকে। জলের তোড়ের সঙ্গে হয়তো আমাকে ভেসে ভেসে চলে যেতে হবে। এ যাত্রায় আর বাড়ি যাওয়া হল না। মনে মনে আক্ষেপে মরছি। এমন সময় দেখি কী, একটা গোরুর গাড়ি এসে আমার গা ঘেঁষে দাঁড়াল। কোনোরকম চোখ ওপর দিকে তুলে তাকালাম। দেখি কী, গাড়ির মহড়ায় বসে আমার ছোটকা! আর আর বিস্ময়ের সীমা পরিসীমা থাকল না।

পিলকা কি আমাকে মিথ্যা কথা বলেছে? না, সে তো মিথ্যা কথা বলার পাত্র নয়। সে যাকে ঝাড় দেয় দে, আমাকে কখনও কদাচ কস্মিনকালেও মিথ্যা কথা বলে না। এমনকি, পিলকা যদি কোনো কিছু করে থাকে, আমাকে না জানিয়ে কিছু করে না। এতটা বিশ্বাস আমার পিলকার প্রতি। সেই পিলকা আমাকে মিথ্যা কথা বলল। মিথ্যুক! বেইমান! নিমকহারাম কোথাকার। তোর এতদূর মনে মনে ছিল। আমাকে ঠকালি।

আমি কোনোমন্দে ওঠে দাঁড়িয়ে, 'খাটলা'র উপর ভর দিয়ে, গাড়িতে চেপে বসলাম। বসতেই গাড়ির পাটাতনের লম্বা লম্বা বাতাগুলো আমাকে সশরীরে টেনে নিল। গাড়িতে; বাতার ফাঁকে মুখ গুঁজে দিলাম। আমার মুখ গুঁজে দেওয়ার পরই গোরুগুলো চলতে আরম্ভ করল।

'ঘরমুখো' গোরু আমাদের। তাই ছোটকাকে গাড়ি চালাতে মোটেই পরিশ্রম করতে হচ্ছে না। গোরুগুলো নিজে নিজেই চলছে। খুব দ্রুত চলছে এমনিতেই 'ঘরমুখো' গোরু হলে তিন ঘণ্টার পথ, এক ঘণ্টায় পাড়ি দেয়। এ যেন তারও আগে পৌঁছে যাবে। ঘরমুখ হলে কে আগে বাড়ে না।

গাড়িতে চাপার পর থেকে আবার রোগটা শুরু হয়ে গেল পৃথিবীটা বন বন ঘুরছে। সেই সঙ্গে পেট থেকে বমি বেরিয়ে আসছে। ঘন ঘন। গাড়ির বাতার ফাঁকে মুখটা ঢুকিয়ে দিয়েছি। ওয়াক ওয়াক শব্দ বমি করছি। বমির টুকরো বাতার গায়ে লেগে থাকছে। যখন গাড়ির চাকা 'গচ্ছায়' পড়ছে, অর্থাৎ খানাডোবাতে পড়ছে, তখন বাতার গায়ে লেগে থাকা বমি, আমার মুখের সর্বাঙ্গে লেপটে যাচ্ছে। কী দুর্গন্ধ। বিশ্রী।

মাঝে মধ্যে গাড়ির বাতা থেকে মুখ তুলে ছোটকাকে দেখছি, কিন্তু কোনো কথা বলতে পারছি না। কী করে পারব? আমার যা অবস্থা।

কি পালটে গেছে ছোটকা। দেখে তো চেনাই যাচ্ছে না। পাগুলো আরো সরু হয়ে গেছে। বুকের হাড়গুলো দেখা যাচ্ছে স্পষ্ট। ছোটকার মুখটা যেন আর মুখ না, কে যেন একলেপা কালি লেপ্টে দিয়েছে।

আকাশের আলোটা ক্রমে মিচকে আসছে। মানে কমে আসছে। তার উপর মেঘ রয়েছে। ওই মেঘ এক্ষুনি যদি তেড়ে আসে তো ফের। আসার সম্ভাবনা আছে। বাতাসটা একেবারে থম মেরে আছে। মেঘটা ওই ছোটকার মুখের মতোই।

গাড়িটা এতক্ষণে আমাদের গ্রামের রাস্তা ধরল। পলি মাটির রাস্তা। রাস্তার দু'পাশ সরবন। বর্ষার জল পেয়ে গাছগুলো খুব 'ডাকুরে' গেছে। মানে, লকলকে। বড়ো হয়ে গেছে। সরের ঝাড় ছেড়ে, সরগুলো রাস্তার দিকে হেলে এসেছে। আমাদের সাদা সাদা গোরুগুলো সরের গা ছুঁয়ে ছুঁয়ে গাড়ি টানছে। তাতে কেমন এক ধরনের সর সর শব্দ হচ্ছে।

গাড়িটা মিচ্ছিরী বাঁধের কাছে আসতেই, আকাশটা নিভে গেল। খুব কম আলোতে গোরুগুলো আমাদের হেঁটে হেঁটে গাড়ি টানছে। রাস্তায় পড়ে থাকা সর গাড়ির চাকায় পিষ্ট হয়ে, ডেডবডি হয়ে পড়ে থাকছে। আর মৃত্যু যন্ত্রণার মতো ভয়ঙ্কর কী কী সব শব্দ হচ্ছে। তাতে আমার বুকের ভেতরটা, চলতে চলতে আটকে যাচ্ছে প্রায়ই। আচ্ছা, রাস্তাটা, রাস্তা তো? গোরুগুলো, গোরুগুলো তো? ছোটকা ছোটকা তো?

পিলকা তো আমার সঙ্গে মিথ্যা কথা বলে না কখনো। তাহলে পিলকা কি রসিকতা করল? তা কি হয়? বুকটা ভয়ে কেবলই ঢিপ ঢিপ করছে আমার। বুঝতে পারছি, বেশ রহস্যের ঘেরাটোপে ঢুকে গেছি আমি। এই রহস্য থেকে বেরিয়ে আসা, বোধ হয় এ জীবনে সম্ভব নয়।

গাড়িটা বাঁশঝোড়ে আসতেই অন্ধকারটা গল গল করে নেমে গেল। গাছপালা, ঘরবাড়ি, খড়ের পালুই ধানের মরাই, এমনকি আমাদের সাদা সাদা গোরুগুলোও নজরে আসছে না। এত অন্ধকার হয়? বাঁশঝোড়টা, বাঁশঝোন বটে তো? আমাদের গ্রামটা গ্রাম বটে তো?

গ্রামটা একেবারে নিশুতি। একটা লোকও ঘর বার হচ্ছে না। শ্মশানের নরীবতা যাকে বলে আর কী। তাহলে গন্ধ আমাদের গ্রামেও ঢুকে গেল না কী?

আমাদের খামারে গাড়িটা এসে দাঁড়াতেই, বুকে বল পেলাম। মনে মনে হনুমানের সাগর ডেঙ্কনোর মতো জয় শ্রী রাম বলতে বলতে, তড়াং করে লাফ দেওয়ার জন্যই না কী কে জানে, খড়ের গাদা অথবা পুয়ালচুনীর মধ্যে শুয়ে থাকা, গ্রামের ন্যাড়া নেড়ি কুত্তাগুলো ছুটে আমার কাছে এল। আমাকে মধ্যিখানে রেখে, চারপাশে ভুকতে থাকল খুব।

তাপর কুকুর কিত্তন শেষ হলে, আমাদের ঘরে কাকিমার কান্না শুনতে পেলাম। কাকিমা বিকট শব্দ করে কাঁদছে। কাঁদতে কাঁদতে লন্ঠনটা হাতে করে ছুটে আসছে আমার দিকে।

আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম। কোনো কিছুই বুঝতে পারছি না। ব্যাপার কী?

কাকিমা পাগল হয়ে আমাকে টিপে ধরল। আমি আর টাল সামলাতে পারলাম না। মাটিতে ধপ করে পড়ে গেলাম। কাকিমাও আমার বুকের উপর বুক রেখে গাঁ-গোল করে কাঁদছে, তোর ভাই আর নাই।

কে নাই?

তোর ভাই পিলকা

পিলকা কোথায় গেল?

পিলকা ম-রে গেছে।

পিলকা মরে গেল! কবে?

কাল রাতে।

কী হয়েছিল?

কিছু হয় না বাপ। কালরাতে খেয়ে দেয়ে ঘর ঢুকল। কত হাসি, কত ঠাট্টা। আর সকালে খুলে দেখছি, ছেলে আমার নাই।

আমি কোনোরকম কাকিমাকে ছেড়ে ছুড়ে দাঁড়ালাম। দাঁড়াতে আর পারলাম কই? এখন আমি বেশ বুঝতে পারছি, আমার কেবল কোমরটাই ভেঙ্গে যায়নি, গোটা অষ্টাঙ্গটা ভেঙে গেছে। তবু যে করেই হোক, যে ভাবেই হোক, ভাঙা অঙ্গগুলি আমাকে সারাতে হবে। আমি যদি নিজের টাল নিজেই না সামলাতে পারি, এতবড়ো সংসারটার টাল সামলাব কী করে।

কাকিমার কাছ থেকে একটুখানি সরে, পিলকার উদ্দেশ্যে গড় ঠুকলাম—একবার নয়, দু'বার নয়, দশ বা বিশবার নয় সহস্র সহস্র বার। আর মনে মনে কেবলই বলতে থাকলাম বেশ দিলি মাইরি, বেশ দিলি।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%