টাকার গরম

জয়দেব দত্ত

সাত সকালে গোয়ালের গরুগুলো খুলে, হ্যাট হ্যাট তাড়িয়ে তাড়িয়ে নিয়ে যেতে না যেতেই, হঠাৎ শ্রীধরের ভাগ্যটা খুলে গেল। রাস্তার বাম্পারটা টোপকেছে কি টোপকেনি, অমনি চোখে পড়েছে ব্যাগটা। আর বলে কে? যেই না চোখে পড়া, অমনি সাথকে সাথ চিলের মতো ছোঁ মেরে এক লহমায় কাঁধে তুলে নিল ব্যাগটা। আর ব্যাগটার গুণেই নাকি কে জানে, কাঁধটা সঙ্গে সঙ্গে নিচু হয়ে গেল।

তাই নিচু কাঁধ নিয়ে কে আর বেশি দূর যায়। খুব নিকটে, একেবারে দশ হাত অন্তর যে বড় বাগান, সেই বড়বাগানে গরুগুলোকে হ্যাট হ্যাট তাড়িয়ে তাড়িয়ে হুসমুস ঢুকিয়ে দিল।

আর বড়বাগান তো খুব! নামে তালপুকুর কিন্তু ঘটিটিও ডুবে না। সেই হয়েছে বড়বাগানের। বড়বাগানের বড় বড় গাছ আর নেই। ক'টা আম আর অর্জুন প্রহরি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে! বাকি সব গাছ কেটে, ক্ষুদে চাষির দল চাষজমি বাড়িয়েছে। সখের জমি।

সেই আর আর অর্জুনের ছাওয়াই গরুগুলোকে ছেড়ে দিল। আর নিজেও ঢুকে গেল 'খালমুহে'। 'খালমু' বলে 'খালমু'। আখ পেড়িয়ে পেড়িয়ে যে বড়ো মতো এক গর্ত হয়েছে। সেই গর্তে চুঁয়ে চুঁয়ে জল বেরিয়ে এসে পুকুর সৃষ্টি করেছে। সেই নিচু জায়গা 'খালমু'। 'খালমু' এর জলে মশা ডিম পেড়েছে বিস্তর। দিনের বেলাতেও পোঁ পোঁ মশা উড়ছে।

'খালমু'-এর চারপাশ 'ভূতমপুরী'। ভূত যে জায়গায় বাস করে, তাকে তো 'ভূতমপুরী' বলে। মানে, চারদিকটা ঝোড় জঙ্গলে ভরা। শিয়াকুল আর কেলেখোঁড়া দাঁত বার করে আছে। একবার যদি কাউকে 'বাগে' পেয়েছে তো আর রক্ষা নেই। সে ওখানেই থেকেই যাবে যুগবৎ। এমন ভূতমপুরী'তে কে যায়! নেহাত খুব গরজে না পড়লে!

শ্রীধরের গরজ আছে, তাই সুরুৎ করে ঢুকে গেছে। ঢুকে কাঁধের ব্যাগটা নামিয়েছে মরা মানুষের ছেঁড়া উপুর ঝুলুর পড়ে থাকা কাঁথার উপর।

শ্রীধরের বুকটা ভয়ে ময়ে ঢিপ ঢিপ করছে। কেউ দেখেনি তো। যদি চোর সন্দেহ করে, বেঁধে পিটোয়। শ্রীধর হাঁটুর উপর দুটি হাতের ভর দিয়ে, মাথা উঁচু করব না করব না করেও, কোনরকম মাথা উঁচু করে চারপাশটা দেখল, কেউ দেখছে না তো!

কারু দেখা না পেয়ে, আবার ধপ করে বসে পড়ল শ্রীধর। কিন্তু কোন শব্দ হল না। একমাত্র নিজের হাঁটুগুলো মড়মড় চড়চড় শব্দ করল কেবল।

অন্যদিন এমন শব্দে, কুচ পরোয়া নেহি! কিন্তু আজকের সেই একই শব্দে, শ্রীধর শঙ্কিত হল বেশ খানিকক্ষণ! বুকে সাহস এল অনেক পরে। ব্যাগে হাত দিল। দিতেই হাতটা আগুনের শিষের মতো জ্বলে উঠল। বোম নাই তো!

দুর ছাই, এমন গন্ড গাঁয়ে বোম থাকবে কোথায়! বরঞ্চ লোক ঠকানোর আশায় দু'চার কাহন ভিজে পোয়ালচুনী ব্যাগের ভিতর ভরে রাখতে পারে। তার বেশি কি!

শ্রীধর আনাই ধানাই চিন্তা বাদ দিয়ে, সরাসরি ব্যাগের চেনে হাত দিল। চেন খুলতেই চক্ষু চড়কগাছ! কয়েকটা জামা কাপড়ের সঙ্গে থোক থোক টাকার বান্ডিল। সর্বনাশ!

শ্রীধরের বুকের ঢিপ ঢিপটা আরো বেড়ে গেল দশগুণ। ধড়াস ধড়াস নড়ছে বুকটা! এই রে, বুকটা কি বাস্ট হয়ে যাবে নাকি!

শ্রীধর নিজের বুকটাকেও বিশ্বাস করতে পারছে না। হৃদয়ের কলকব্জাগুলো সব ঠিক আছে তো! শুধু বুকটা কেন, জগতের যা কিছু, সব কিছুকে এখন অবিশ্বাস অবিশ্বাস ঠেকছে। এমন কি নিজের গরুগুলোকেও বিশ্বাস করতে পারছে না। ব্যাগটা কুড়োনের সময় গরুগুলো দেখে নাই তো!

শ্রীধর ভাবছে, ব্যাগটাকে এখন কী করবে? মাটিতে পুঁতে দিবে কি! পরক্ষণেই মনে কু কাটে। যাচা ধন আর কাচা কাপড় কেউ কি ফেলে দেয়। যেতে ব্যাগটা কুড়িয়ে পেয়েছে যখন, তখন কি ছাড়ে!

শ্রীধর বগলের ভিতর ব্যাগটা খপ করে ভরে নেয়। গায়ে চাদর ঢাকা দিয়ে তারপর ছুট! ছুট তো ছুট, একেবারে ঘরে। ঘরের ভিতরে একেবারে সিঁধিয়ে গেল। কাক-পক্ষিও টের পেল না, নিজের ছেলে বৌ তো দূরের কথা।

শ্রীধর ঘরের ভিতর দম বন্ধ করে বসে আছে। একদম নিশ্বাস প্রশ্বাসও নিচ্ছে না। নিশ্বাসের শব্দ শুনে যদি কেউ হুড়মুড় করে ঘরের ভিতর ঢুকে যায়! তাহলে তো ব্যাগটা দেখে ফেলবে। আর দেখলেই অশান্তি। তাই শান্তি ফেরানোর লক্ষ্যে ঘরের ভিতর চুপচাপ বসে আছে। বসে বসে ভাবছে, তার দুঃখের দিন শেষ।

এতদিন তো কম দুঃখ পায়নি। কোলে চার চারটি বোন রেখে, মা বাবা সকাল সকাল চোখ মুদল। সৎ পাত্র দেখে, সে চারটি বোনের বিয়েও দিল। বিয়ে দিতে কম কিছু করেনি। পরের ঘরের মুনিষ পর্যন্ত খেটেছে। কিন্তু এত করেও মন পায়নি বোনদের। বলে, কী করেছিস?

এতে বোনদেরকে খুব একটা দোষ দেয় না। বোনরা বলতেই পারে। নিজের ছেলে, সে যখন বাবার দোষ ত্রুটি ধরে, যা না তাই বলে, তখন নিজের অদৃষ্টকে দোষ দেওয়া ছাড়া কিছুই করার থাকে না শ্রীধরের।

যাক, কাল থেকে আর আগুন খেতে হবে না। কেন খাবে, সাত সকালেই যকের ধনের মতো ব্যাগটা আগলে ঘরের ভিতর বসে আছে শ্রীধর। ঘর তো খুব। মাটির ছেয়া দিয়ে দিয়ে কোনরকমে দুটি রুম। সেই দুটি রুমের একটাতে থাকে শ্রীধর। দুটি রুমের পরই একফালি একটা বারান্দা। বারান্দায় সংসারের যত প্রয়োজনীয় জিনিষপত্র ডাঁই করা থাকে। কোথাও কুড়ুল কাটারি গাঁইতি, কোথাও বা ধানের ভুঁষি কিম্বা আগড়া-মথড়া। আর তার উপরে হয়তো শুকনো ঘুঁটের বস্তা।

বারান্দার পর উঠান। উঠানের বাম দিকে একটা ধানের ছোট মরাই। মরাই-এ ধান নেই, শুধু 'বড়'গুলো খড়ে ঢাকা আছে মাত্র। মরাই-এরপর একটা হাড় জিরজিরে আমগাছ। গাছটার ভিতর পোকা লেগেছে নিশ্চয়। মরতে মরতে, কোন মন্দে বেঁচে আছে।

তারপর একটা ধান সেদ্ধ উনান। উনানের পাশে ধান ভিজতে দেওয়া একটা সিমেন্টের 'বান' নামানো আছে। চলতে ফিরতে 'বানটা' পায়ে ধাক্কা লাগে। ধাক্কা লেগে লেগে, বানটার মাথাটা একপ্রকার ভেঙ্গে গেছে। ভেঙ্গে ধার হয়ে আছে। সেই ধার মুখে, কারু পা পড়েছে, তো সঙ্গে সঙ্গে ঠেকা লেগে ক্যাচ!

ডান পাশে একটা লম্বা তেড়েঙ্গা গরুর গোহাল। গোহাল থেকে গোবর আর গো'মুতের গন্ধ বেরিয়ে আসে সব সময়। তারপরই রাস্তা।

আজ আর রাস্তায় বার হয়নি শ্রীধর। কেন হবে? অবস্থাটা কি আগের মতো আছে। সে তো এখন যকের ধন পেয়ে, রীতিমত বড়লোক বনে গেছে। আর দুঃখ্য কি।

দুঃখ্য নেই, দুঃখ্য নেই। সুখের হান্ডিল নিয়ে, ঘরে বসে আছে শ্রীধর। বসে বসে ভাপছে।

ভাপবে না তো কি! একে শীত কাল। তার উপর সন্ধ্যা হয়ে গেছে কখন। সাঁই সাঁই উত্তরে বাতাস দিচ্ছে। জানালার ফাঁক ফোক্কর হয়ে ঘরে ঢুকছে সে বাতাস। কেন ঢুকবে না, জানালার কোন কোপাট মোপাট আছে কি! স্রেফ একটা চটের বস্তা দু'ভাঁজ করে গুজা আছে। বস্তায় কি বাতাস আটকে! আটকাক আর না আটকাক, অন্তত কিছুটা হলেও 'থাক-দমা' হচ্ছে তো! এইভাবেই তো কাটিয়ে দিয়েছে জীবনটা।

হঠাৎ দরজার ক্যাঁ শব্দ করে বৌমা ঘরে ঢুকল। আর সঙ্গে সঙ্গে শ্রীধর নড়ে উঠল। ব্যাগটা, টেনে, ব্যাগটার উপরেই বসে পড়ল বে-মক্কা। বৌমা যেন জানতে না পারে। স্ত্রীলোকের মুখ, কথায় কথায় রাষ্ট্র করে দিবে পাড়াময়। যার ব্যাগ, সে গায়ের জোরে তুলে নিয়ে চলে যাবে।

বৌমা ঘরে ঢুকে, মুখে কোন কথা বলল না। মোবাইলের আলো জ্বেলে খুঁজে নিল নিজের নিশানাটা। তারপর ঘর থেকে, মোবাইলে গান লাগিয়ে, শুনতে শুনতে বেরিয়ে গেল। বেরিয়ে যাবার সময় একটা অবাক কাণ্ড করে গেল। দরজাটা টেনে দিয়ে গেল। অন্যদিন তো দরজা টানা টুনির কোন ব্যাপার নেই। হাট করে খুলে দিয়ে যায়। শন শন বাতাস ঢুকে শ্রীধর প্রাণপণ ছুটে যায়, দরজার বাতাস আটকাতে। কিন্তু আজ আর ছুটে যেতে হল না। অন্য ছবি, আজ একেবারে সম্পূর্ণ অন্য ছবি।

শ্রীধরের মনে খটকা লাগে। তাহলে ব্যাপারটা আঁচ পেয়ে গেল নাকি! দূর, আঁচ পাবে কী করে, কেউ তো দেখেনি। ওর মনে মনে সন্দেহ জাগে গরুগুলোকে। গরুগুলো বাঁধতে গিয়ে, যদি জানিয়ে দিয়েছে। ভগবতির মতিগতি তো। নানান আদব কায়দা যদি বুঝিয়ে দেয় ব্যাপারটা। সাদা বকন-ছাটা ওর খুপ প্যার এর। কোলের উপর বসে, আদর খায় সময় সময়। সেই আদর খেতে খেতে যদি কানে মুখ লাগিয়ে, কিছু বলা কওয়া করেছে।

সাত পাঁচ ভাবছে শ্রীধর। এমন সময় কোনো কিছু বলা কওয়া না করেই, হঠাৎ দেবরাজের মতো ছেলে ছোটন বাবার ঘর ঢুকল। বলল, বসে আছ যে।

হ, বসে আছি।

শরীর টরীর খারাপ নয় তো?

শরীল খারাপ হতে যাবে কেনে!

যা জাড় পড়েছে।

জাড় তো আমার কি! আমি তো আর জাড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি নাই।

না ঘুরে বেড়াও নাই ঠিক কতা, কিন্তু জাড় তো ঘরে ঘুরচে।

হ, তা ঘুরচে।

তবে!

তালুও জাড়ে আমাকে কাবু করতে পারবেন নাই।

কেনে পারবেন নাই, তুমার কাচে মন্ত্র আচে নাকি?

হ, আচে। বলেই কান মুলে শ্রীধর। একেবারে নিজের দু'কান ধরে কস কস! যা আর একটু হলেই প্রকাশ হয়ে গিয়েছিল।

ছোট বলল, ঐ সব মন্ত্র ফন্ত্র বাদ দাও। আজকাল আর মন্ত্র কাজ করে না। সত্যি করে বল, শরীর খারাপ কি না। খারাপ হলে ওষুধ আনতে হবেক।

শ্রীধর বলল, না রে-এ, আমার শরীর ঠিক আছে।

ছোটন বলল, না-ঠিক নাই। আমি তো দেখতে পাচ্ছি।

তু ভুল দেকচিস।

না ঠিক দেকচি। দ্যাক বাবা, এই মুহূর্তে পয়সা কড়ি নাই। তুমার একটা কিচু হয়ে গেলে, কী হবেক বলত?

কী আর হবেক! কে বলল তুকে, পয়সা নাই। আমার কি পয়সার অভাব!

আবার কান ধরল শ্রীধর। হৃদয়ের গোপন কথাটি চ্যাং ল্যাঠা মাছের মতো কেবলই 'খালুই' থেকে লাফ দিচ্ছে। কিন্তু লাফ দিলে তো আর চলবে না। যে করেই হোক, ও লাফ মুখ বন্ধ করতেই হবে। যাচা ধন যখন কুড়িয়ে পেয়েছে, তখন হেলায় হারালে তো চলবে না।

ছোটন হাঁটি হাঁটি পা পা করে করে বাবার জানালাটার কাছে গেল। কাছে গিয়ে চটের বস্তাটাতে হাত দিল। বলল, রাজু মিস্ত্রিকে বলেছি, জানালাটার একটা পাল্লা করার জন্যে।

শ্রীধর চমকে উঠল, পাল্লা করাতে গেলি কেনে?

বাঃ, তুমি বাতাস খাবে, আর আমি আরামে ঘুমব!

আমিও তো ঘুমই।

কত ঘুমও!

ছোট ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। আর ঐদিকে বৌমা ছোটনের পাশ কেটে, মাংসের বাটি হাতে ভাত নিয়ে এল। তাও বা টিনের বা স্টিলের থালাতে নয়, একেবারে ঝকঝকে কাঁসার থালা। থালাটা শ্বশুরের মুখের সামনে রাখল। শুধু রাখল না, নিজেও বসে পড়ল শ্বশুরের এক পাশে। বসে বসে শ্বশুরকে খাওয়াচ্ছে।

শ্রীধর ভাতে মাংসের ঝোল ঢেলে সপাসপ ভাত খাচ্ছে। কতদিন খায়নি এইভাবে, কতদিন! শ্রীধর খেতে খেতে বুঝতে পারছে, ব্যাগের মহিমা। আহা ব্যাগ, ব্যাগ। ব্যাগের জন্যই তো আজ ওর কদর। তা নাই বা প্রকাশ করল ব্যাগের কথা। ব্যাগেতে যে টাকা আছে। ওখান থেকেই তাপ ছাড়ছে টাকাগুলো, আর তার ফলেই সংসারে শান্তি ফিরে এসেছে। না হলে কে কাকে এত যত্ন করে!

বৌমা শ্বশুরের বিছানায় উঠে গেল। নিপাট করে বিছানা সাজাচ্চে বৌমা। কতদিন তো বিছানাটা হাত দেয়নি। তাই ধুলো বালি জমে আছে প্রচুর। বৌমা বিছানা ঝেড়ে ঝেড়ে ধুলো বালি পরিষ্কার করছে। ফলে ঘরে ধুলোর ধোঁয়া উড়ছে। বৌমা সেই সব ধুলো ধোঁয়া ঝাঁট দিয়ে দিয়ে এক জায়গায় করছে। ঝাঁট দিয়ে সব বিদায় করবে।

শ্রীধর বাধা দিল, থাক বৌমা, রাত্রিবেলায় ঘরের ধুলো বাইরে ফেলতে নাই।

বৌমা বলল, জানি বাবা, সব জানি, এইগুলো তো আর ধুলো নয়, সোনা, সোনা লেগে আছে আপনার বিছানায় তাই সোনাগুলো আপনার কোপাটের কোলে জড়ো করে রেখে গেলাম।

শ্রীধর বলল, হ্যাঁ, তাই রেখে যাও না, তাই রেখে যাও!

বৌমা চলে গেল। আর সঙ্গে সঙ্গে শ্রীধর কোপাটটা বন্ধ করে দিল দড়াম করে। একেবারে খিল আটকে দিল।

খিল আটকে দিয়েই, বিছানায় ধড়াস করে ব্যাগটা নামাল। ব্যাগের ভিতর সব যন্ত্র মন্ত্র বার হচ্ছে একে একে।

ব্যাগের উপরে একটা জামা। তার নিচে সোয়েটার, তার নিচে কোট, কোটের নিচে শাড়ি। শাড়িতে সোনার জরি লাগানো। চমৎকার চমৎকার শাড়ি সব। শাড়ির নিচে থোক থোক টাকার বান্ডিল। আর টাকার বান্ডিলের নিচে কত সাদা খাতা। তাতে নাম লেখা। নামের নিচে ফোন নাম্বার, নাইন ফোর থ্রি ফোর...।

শ্রীধর ফোন নাম্বারটা প্রথমে ছিঁড়ে কুটি কুটি করে, মুখে খপ করে ভরে নিল। পেটে চালান হয়ে গেল নাম্বারটা। পেটে গিয়ে কাঁপছে। রিং মারছ ঘন ঘন!

তা মারুক! ওর ফোন তুলছে কে! ফোন না তুলে ব্যাগের ভিতর থেকে প্যান্টটা তুলে নিল। কোমরে গলিয়ে নিল খচ করে। তারপর একে একে জামা সোয়েটার কোট। এমন কি টাইটাও ব্যাগে পড়ে রইল না। গলাতে বেঁধে নিল। একদম ফিট। দানাদার লোক যাকে বলে আর কি! মানে বড়লোক। বহু সখ সাধওয়ালা বড়লোক।

তো বড়লোকের খেয়াল আর ফাটা দেওয়াল এর মধ্যে কোথাও কোনো প্রভেদ আছে কি! ফাটা দেওয়াল, যখন যেদিকে মন পড়তেই পারে! ঠিক সেই রকম শ্রীধরও, পড়বি পড় বিছানায় পড়ল। পড়ল তো পড়ল, কোট ফোট কিছুই খুলল না। না খুলে বিছানায় শুয়ে থাকল। কিন্তু ঘুম এল না। কী করে আসবে, বড়লোকের চোখে ঘুম আসে কি! কত কি ভাবনা।

ভাবনা নয়, ভাবনা নয়, কোটটা যে বিছানায় তাপ ছাড়ছে। তাপে পিট পিট করছে সারা গা।

শ্রীধর গা থেকে কোটটা খুলে ফেলে দিল। তারপর টাই, সোয়টার, জামা গেঞ্জি। এমন কি পরনের অন্তর্বাসটুকুও। তবুও গরমটা এক ইঞ্চি জায়গা ছাড়ল না।

শ্রীধর হাট করে খুলে দিলে জানালাটা। জানালা দিয়ে বাতাস ঢুকছে। গরম বাতাস। বেশ মুশকিল তো! ঘরের কি আগুন লেগে গেল নাকি! আগুনে পুড়ে মরবে কি!

মরতে কি কারু প্রাণ চায়! শ্রীধর ভয়ে ময়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল চোঁচাড়ে। রাস্তায় তখন অন্ধকার। অন্ধকারও আগুন!

একে অমাবস্যার রাত। তার উপর শিশির পড়ছে দমে। শিশির নয়, কুয়াশা। কুয়াশা আঁচল খুল/উষশি ঊষা...। তো কুয়াশাকে আঁচল খুলতে হল না। খোলা আছে। চাপ চাপ কুয়াশা পড়ছে, গরম কুয়াশা। কুয়াশায় গ্রামটাকে আর চেনা যাচ্ছে না। গ্রাম তো দূরের কথা, দু'হাত কি দু'আঙ্গুল দূরের রাস্তা আর দেখা যাচ্ছে না। কেবল রাস্তায় পা পুড়ে যাচ্ছে। শুধু পা কেন, গা হাত মাথা সব। সব জায়গাতেই তো কুয়াশা পড়ছে। গরম গরম কুয়াশা। কুয়াশার তোড়ে, রাস্তা দিয়ে হড় হড় জল বহে যাচ্ছে। জলে ভিজে গেছে মাথার চুল পর্যন্ত। মাথাটা গরম হয়ে গেছে।

গরম মাথায় কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। কেবল শুনতে পাচ্ছে, ঘেউ ঘেউ রব। পাড়ার কুকুরগুলো শ্রীধরকে দেখে চিৎকার করছে। এক্ষুনি কামড়ে দিবে হয়তো। তখন সাত ঘরের তেল মেখে, সাত বামুনের নাম করে, পুকুরে সাত সাতটি ডুব দিতে হবে। তাতেও কি মুক্তি আছে? শ্রীধর ভয়ে ময়ে কাঁদতে শুরু করে দিল। সেই কান্না কুকুরের চিৎকারের সঙ্গে বেশ মানিয়ে গেছে।

প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়ে ছিলেন নিধুবাবু। হাতে হাতি তাড়ানো সার্চলাইট। হঠাৎ টর্চের আলোয় নিধুবাবু ভূত দেখলেন! সাহস করে এগিয়ে এলেন। গায়ে টর্চের আলো ফেলে, হো হো হাসতে থাকলেন। নিধুবাবুর হাসি আর থামে না। তবুও কোন মন্দে অর্ধেকটা থামিয়ে বললেন, তোমার এমন হাল কেন শ্রী-ধ-র-র-র!

শ্রীধর নিধুবাবুকে দেখে স্থল পেল। গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে গেল নিধুবাবুর কাছে। নিধুবাবুর কাছা হাতড়ে বার করল মোবাইলটা। তারপর নিধুবাবুর হাতে দিল। বলল, একবার মোবাইলাটা দাবুন তো, ব্যাগটার গুষ্টির ষষ্টি পূজা করছি! ওর টাকার গরম বার করচি। দাবুন, নাইন ফোর...

অধ্যায় ১ / ১৭
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%