মুকুলের ঘ্রাণ

জয়দেব দত্ত

শ্যামলের চোখের সামনে ধোঁয়াটে আকাশ। মনের ভেতর অফুরন্ত আশা। ধোঁয়াটে আকাশের দিকে তাকিয়ে আশার স্বপ্ন দেখে শ্যামল। বাগানের কোণ থেকে এসবই দেখছিল আর ভাবছিল শ্যামল। ধরেছে যখন তখন ছাড়বে না, এর একটা হেস্তনেস্ত করবেই। পাশার দান চেলছে শ্যামল। ছক্কা নয় ফক্কা, মায়ের গয়না বিক্রির টাকায়, জঙ্গলের মতো ভুতুড়ে জায়গাটাকে পরিষ্কার করে বাগানের সৌন্দর্য দিয়েছে। ফুল ফলের গাছ পুঁতে এখন সবুজ ফিরিয়ে দিতে চলেছে। দীর্ঘদিনের জংলা মাটিটাকে।

বাবার বেদনার অবসান আর নিজের বেঁচে ওঠার ইচ্ছেতেই নতুন করে উঠে পড়ে লেগেছে।

বাবার হাতে লাগানো 'পড়শী-বিবাদী' আমগাছটা শ্যামল করাতের ঘসটানিতে শুইয়ে দিয়েছিল বেশ কয়েক বছর আগে। পাড়ার লোকের সঙ্গে আম নিয়ে ঝগড়া-ঝাটি বন্ধ করতে শ্যামল ভেবেছিল, গাছটা কাটতে পারলেই সব কিছুর অবসান। বাবাকে না বুঝে করাত চালিয়েছিল গাছের গায়ে নয়, বাবার বুকে। শ্যামলের সেই হিংস্রতা বাবার বুকে সুপ্ত ঘায়ের মতোই এখনো দগদগে হয়ে আছে।

আর নিজের সম্বল ইউনিভার্সিটির সার্টিফিকেটটা তো কোনো কাজে লাগল না! তবু তো বাঁচতে হবে?

সেই বাঁচার তাগিদেই গাছ লাগিয়েছিল শ্যামল।

শ্যামলের সামনে কয়েকশো চারা গাছ। বাগানে নেমে গাছগুলোর পরিচর্যায় মন দেয় শ্যামল। বাবাকে বুঝিয়ে দেবে—বাবার স্বপ্ন তার হাতের ফসল। চারার গোড়ায় একটা আগাছা উঠতে দেবে না শ্যামল। খানিকটা অন্যমনস্ক হয়েই একটা চারাগাছ উপড়ে ফেলে। তখন বাবার ক্ষয়াটে চিন্তাক্লিষ্ট মুখটা ভেসে ওঠে। শ্যামল তাড়াতাড়ি চারাটা পুঁতে দেয় মাটিতে।

বাগানের দুদিকে রাস্তা। কালো আঠার মতো পিচ। দুধারে উঁচু উঁচু বাড়ি। রাস্তার ভিড়, ট্রাক বাসের কর্কশ হর্ন। সে সব সহ্য হয়ে গেছে শ্যামলের। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধান। ঠাকুমার কাছে শোনা বনজঙ্গল গাছপালার গল্পগুলো এখন বহুদূরে সরে গেছে রূপকথার মতো...। চারদিকে কলকারখানা মানুষগুলো সব যন্ত্র। সেই সঙ্গে শুরু হয়েছে গাছপালা কাটার মহাযজ্ঞ। মানুষগুলো হয়ে গেল সব নিষ্ঠুর পরশুরাম। বল্গাহীন বাড়ি কলকারখানা সব দানব বিশেষ। নগর নগর নগরায়ণ।

শ্যামলের ছোট দেহ, গোলগাল বাঁধন। ফর্সা গায়ে মায়ের মুখের ছাঁচ। এ রকম ছেলেই বোধহয় মা-মুখো ছেলে। কিন্তু শ্যামল ঠিক তার নয়, বাপ মায়ের দুটো পৃথক মনকে এক করে একটা নতুন জীবন তৈরি করে পাঠানো ভগবানের উপহার। লেখাপড়ার প্রতি মায়ের কত ভালবাসা ছিল, সে সবই মনে পড়ে। মা চায়নি ছেলে মূর্খ হোক। শ্যামল মাঝে মাঝে মায়ের অভাব বোধ করে। কেবল দূরে আবছা সন্ধ্যার মতো কিছু স্মৃতি ভেসে ওঠে। এদিকে দিনের শেষ হয়ে আসছে। শ্যামলের বাগানে নেমে আসছে সন্ধ্যা।

দীর্ঘ দিন বেকার থাকার পর, মাত্র বিঘাখানেক ভূমি নিয়ে এখন কারবার। এই জমি একদিন ছিল আস্তাকুঁড়। গ্রামের নোংরা আবর্জনার স্তূপ গড়ে উঠত এখানে ওখানে। এই মূহুর্তে শুদ্ধ ভূমির গাছের গায়ে হাত রেখে শ্যামল বলে—'একটু তাড়াতাড়ি বড় হ'।

এক বুক তৃপ্তি নিয়ে শ্যামল এগিয়ে যায় বাগানের ঐ কোণে তরতরিয়ে বেড় ওঠা বটগাছটার দিকে। গাছটার নীচে বসে শ্যামল। কিছুক্ষণের মধ্যেই একরাশ 'হাই' এসে জমা হল শ্যামলের বুকে। বুঝল নিদ্রার তাড়া। শ্যামল ঠিক করেছে সে এখন ঘুমাবে না। ঘুমাতে আসেনি, এসেছে তৃপ্তির হাওয়া লাগাতে। শ্যামল বসে থাকতে থাকতেই শুনতে পেল মোটর সাইকেলের শব্দ। ধনপতি বেনের ছেলে। মোটর সাইকেল স্ট্যান্ড করে সোজা শ্যামলের কাছে। হাসি হাসি মুখে বলে—'তোমার তাজা গাছের হাওয়াটা একটু গায়ে লাগিয়েনি।' গাছের ডালে পাতায় কিচির-মিচির শব্দ। পাখিরা কুলায় ফিরছে।

শ্যামল যখন ঘরের দরজা পার হয়ে ঢুকল তখন আরতি দেবিমূর্তি। সন্ধ্যার প্রদীপ হাতে উঠানে তুলসীতলায়। আরতির হাতের প্রদীপ শূন্যে ঘোরে—

সাঁঝ দিলাম সলতে দিলাম। স্বর্গে দিলাম বাতি।

সব ঠাকুরের সাঁঝ নাও মা। লক্ষ্মী-সরস্বতী।

প্রণামের ভঙ্গিতে আরতি নতজানু। সাঁঝের প্রদীপের দিকে শ্যামলের চোখ। উজ্জ্বল আলো ছড়িয়ে জ্বলছে প্রদীপ মৃদু বাতাসের তালে তালে। শ্যামলের মনটাও নেচে ওঠে। আরতি প্রণাম সেরে টিপ্পনি কাটে—'কি দেখছেন?'

শ্যামল গম্ভীর হয়ে বলে—'আপনার প্রদীপকে।'

—কোনো দিন দেখনি মনে হচ্ছে।

শ্যামল কী উত্তর দেবে ভেবে পায় না। সত্যিই এভাবে তো সে কোনোদিন আরতির সন্ধ্যা দেওয়া দেখেনি, বা খেয়াল করেনি। আরতির দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে শ্যামল। ধূপধূনো নেই, উঠোনের ফুলগাছ থেকে ছড়িয়ে যাচ্ছে ফুলের সুবাস। সন্ধ্যাপ্রদীপ ফুলের গন্ধ-আরতি সব মিলিয়ে এক মিষ্টি পরিবেশ। বেশ নতুন লাগছে, ভাল লাগছে শ্যামলের।

বাগানের গাছে কোকিলের কুহুকুহু ডাকে শ্যামলের ঘুম ভাঙে। ঘড়ির কাঁটা দেখে ওঠার মতোই এই ঘুম ভাঙা, ভুল হয় না—ঘড়ির প্রয়োজন হয় না শ্যামলের। জানালার কাছে গিয়ে বসল শ্যামল। বটগাছের মাথায় এখনো গোল চাঁদটা হাসছে। চাঁদের আলো বাগানের গাছপালার অন্ধকার ধুইয়ে দিচ্ছে। চায়ের কাপ হাতে শ্যামলের পাশে এসে বসল আরতি। আরতির মুখেও পড়ছে চাঁদের আলো। শ্যামল ঠিক এভাবেই আরতিকে কাছে পেতে চায়। আর চায় বলেই আরতি প্রতিদিন এ সময়ে চায়ের কাপ হাতে শ্যামলের পাশটিতে বসে। প্রকৃতির গন্ধ, চাঁদের আলো, নিশ্চুপ ওরা দুজন। দেখতে দেখতে ওরা ক্লান্ত হয়ে পড়ে না। চাঁদটাই সারা রাতের ক্লান্ত শরীরটাকে এক সময় বটগাছটার ঐ পাশে ঠেলে দেয়। হালকা অন্ধকারে শ্যামল আরতির মাথায় নাক ঠেকাল। গন্ধটা ঠিক ধরতে পারল না। জিজ্ঞেস করে—'কিসের গন্ধ বলতো! কই তোমার চুলেও তো নয়?'

আরতি হাসে—'আর চুলের গন্ধ তেলের গন্ধ নিতে হবে না। এ তোমার অকৃত্রিম গন্ধরাজের গন্ধ।' জানালার ডান দিকেই গন্ধরাজের গাছ। ডালে-পালায় বিস্তৃত হয়েছে অনেকখানি। শ্যামল পাগলের মতো লাফিয়ে ওঠে—'আমার বাগানের গাছে ফুল ফুটেছে?' সিঁড়ি বেয়ে তরতরিয়ে নেমে যায় শ্যামল। ছুটে বাবার কাছে। সে বাবাকে উপহার দেবে স্বপ্নের ফসল। ছুটতে থাকে শ্যামল...।

দিনের সতেজ আলোয় শ্যামল বাবাকে নিয়ে আসে বাগানে। গন্ধরাজ রজনীগন্ধার ঘ্রাণ মিশেছে সদ্য বের হওয়া হিমসাগরের মুকুলের সঙ্গে। শ্যামল বাবাকে ফুল দেখাতে নিয়ে এসে আবিষ্কার করল আমগাছটার কয়েক ঝাড় মুকুল...।

বাবার সতেজ হাত কখন শ্যামলের পিঠে এসে পড়েছে। বাবার মুখে চকচক করছে হাসিটা। একবুক আনন্দ নিয়ে বাবা এগিয়ে গেল আম গাছটার দিকে, দৃপ্ত ভঙ্গিমায়।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%