জয়দেব দত্ত
অবসরির অবসর নাই, অবসর নাই। সেই কোন সাঁঝবেলায় ভিজে মাথা নিয়ে রান্না ঘরে ঢুকেছে, এখনো বেরিয়ে আসতে পারল না। চটপট কাজ কাম সেরে, পেট নামক মস্ত সাঙটাকে শান্ত করে, পাহাড়ের মতো গতরটা মাটিতে ধপ করে নামিয়ে দিয়ে, ঠ্যাং ম্যাং বিছে, কাঁড়ার মতো নাক ডেকে ঘুমাবে কোথায়! তা না, এখনো উনানে ফুঁ দিচ্ছে!
আর উনানটাও হয়েছে সেই রকম। তিনদিকের তিনটি উঁচু ঢিবির মধ্যে, দুটি ভেঙে গেছে। সেই ভাঙা দুটি ঢিবিতে দুটি ভাঙা ইঁটের টুকরো কোনোকরম ঠেলে গুঁজে ভরে দিয়ে, লোহার কড়াইটা চাপিয়েছে। মাছ ভাজছে। 'চুনোমাছ'।
আজ খুব ভোর ভোর মুনিবদের ক্ষেতে কাজে লেগে ছিল। সেই দৌলতে, গায়ে মাখার জন্য, একদশান তেল পেয়ে ছিল। সেই তেল গায়ে না মেখে, হড় হড় কড়াই এ ঢেলে ছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয়, মাছের গায়ে এক ফোঁটাও লাগেনি। তপ্ত কড়াই এ তেল পড়তেই, চোঁ করে ধোঁয়া হয়ে উড়ে গেছে।
ফলে মাছগুলো তেল বিনা 'রুখু' ভাজছে। তাই কড়াই-এ চ্যাট চ্যাট চিটিয়ে যাচ্ছে। কুন্তিতে ঠুকে ঠুকে মাছের চিট ছাড়াচ্ছে। মাছগুলো ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে। মাছপোড়া 'ভবক' উঠছে।
শুধু মাছপোড়া কেন, ধোঁয়ারও 'ভবক' উঠছে পুরো কড়াই জুড়ে। উনানটা তো জ্বলছে না। কেবল ফুঁ দিয়ে দিয়ে আলাতন হয়ে যাচ্ছে।
ভিজে কাঠ। একদম ভিজে সপসপে। কাজে যাবার আগে, উঠানে মিলে দিয়ে গেছিল অবসরি। সেই থেকে আর জায়গা বদল হয়নি। যেখানে কাঠ সেখানেই পড়ে ছিল। অবসরি তো 'চৈপরদিন' ঘরে ছিল না। ঘরে ছিল নয় বছরের মেয়ে কুড়ুনি। কিন্তু সে থাকাও যা, আর না থাকাও তা। তাই কাজ সেরে ঘরে ফিরে আসতেই, উঠানের পড়ে থাকা কাঠগুলোকে চোখে পড়ে ছিল। চোখ থেকে আগুন বেরচ্ছিল তখন। কেন না, কাঠগুলো আকাশের জল পেয়ে ভিজে গেছে।
সেই ভিজে কাঠগুলো উনানে ঢুকিয়ে মাছ ভাজছে। ফলে উনানে আগুন জ্বলছে না। কেবল ধোঁয়া উড়ছে। ধোঁয়াটা ঘরের ভিতর 'গুরুলছে'। মানে, পাক খাচ্ছে। বাইরের দমকা বাতাস ধোঁয়াটাকে বেরতে দিচ্ছে না। ঠেলে, ভিতরে ঢুকিয়ে দিচ্ছে। অবসরি ধোঁয়াতে 'হাপুচুপু' খাচ্ছে। বুকের ভিতর দম আটকে যাচ্ছে। চোখগুলোও জ্বলে পুড়ে খাঁক হয়ে যাচ্ছে। বিরক্ত, বিরক্ত।
ঘরের এককোণে, জড়ো পুঁটুলি হয়ে শুয়ে থাকা, ঘুমন্ত মেয়ে কুড়ুনিকে রাগে এক 'টালা' দিল। মুখে বিড় বিড় করে বলতে থাকল, অত বড় মেয়ে হয়েচিস, মায়ের ব্যাথা বুজলি নাই! হ্যাঁ, মাটা কাজে গেচে, আমাদের পিন্ডি জোগাবেক বলে, ম্যাগটা আকুল করে আইচে, জল পড়বেক। কাটগুলো উটনে মিলা আচে, ভিজে যাবেক, ঘরে ঢুকিয়ে দিই, তা নাই খালখাবুলে মাচ ধরতে গেচে। ব্যাতে গুড়ালে তুর মাচ ধরা বার করব। আবার এক 'টালা'। মানে, চড়।
কুড়ুনি দ্বিতীয়বার মার খেয়েও ওর কোনো হেলদোল নেই। এমন 'ঘ্যাতো'! মার খাওয়াটা ওর স্বভাব হয়ে গেছে। মার না খেলে, ঘুম হয় না।
অবসরি মেয়েকে বাম হাতে মেরে, রাগে দুঃখে কাঁদছে। আর অপবিত্র বাম হাতের পাঁচ আঙুল মাটিতে ঠেকিয়ে, আঙুলের ফাঁক ফোক্কোরে লেগে থাকা মাটি নাক দিয়ে শুঁকে, সন্তানের শত্রু নিধন করছে। মনমরা হয়ে বসে থাকছে দু হাঁটুর ফাঁকে মুখ গুঁজে।
কুড়ুনি যখন মায়ের পেটে ছিল, তখন শীতকালের রাত। শীত বলে শীত, ঘর থেকে বেরনো যায় না। তো হঠাৎ, তলপেটটা কনকনিয়ে উঠল। অবসরি ভাবল, বাহ্যে যাবে। লন্ঠন হাতে বাহ্যে গিয়েও ছিল ঘরের 'পেছপাদাড়ে'। ঘরের পেছনে ঐ যে ছোট ছোট আঁকড়ঝোড়, তারপরই বাঁশবাগান। বাঁশবাগানের ফাঁকে ফাঁকে হিমসাগর গাছ। আম নয় কিন্তু হলুদ গাছের মতো। কুঁড়লেই মাটির তল থেকে চ্যাং চ্যাং হলুদ বেরিয়ে আসে। শিলে দিলেই ও ফগলু! একেবারে ফক্কা! হলুদ কোথা, এ যে ঊষনী জল! সেই হিমসাগর গাছের ফাঁকে, লন্ঠনটা নামিয়ে, বাহ্যে বসেছিল অবসরি। কিন্তু বাহ্যে কোথায়! বাহ্যে তো দূর অস্ত, পেটের তল দিয়ে একটা দানাপানিও বার হয়নি।
ততক্ষণে হিমসাগর গাছের বাতাসে লন্ঠনটা নিভে গেছে। অন্ধকারে পেট চাপড়াতে চাপড়াতে কখন যে এসে, জলে নেমে গেছে খেয়াল করেনি। যখন খেয়াল হল, তখন জল থেকে আর উঠতে পারছে না। ভাগ্যে কমলি খুঁড়ি বামুনদের গোহালে ঘুঁটে চুরি করতে গিয়েছিল। গোহালের গোবরে পা দিতেই প্যাচ! সঙ্গে সঙ্গেই পা ধুতে হয়েছিল। নাহলে, পায়ের চিহ্ন গোবরের সর দেখে দেখে...। সেই পা ধোওয়ার সময় কমলিখুঁড়ি আবিস্কার করেছিল অবসরিকে। তারপর জল থেকে টেনে তুলেছিল। যখন জল থেকে টেনে তুলল, তখন মায়ের দ্বার দু'ফাঁক করে ঝড়ে পড়ল একটা তাজা রক্তপিণ্ড। ভাদিখুঁড়ি কোথায় লুকিয়ে ছিল কে জানে, হয়তো কমলি—খুঁড়ির ঘুঁটে চুরি হাতে নাতে ধরবে বলে, কিন্তু কমলিখুঁড়িকে হাতে নাতে না ধরে ঝড়ের বেগে উড়ে এল। এসেই টুক করে আঁচলেতে কুড়িয়ে নিল রক্তপিন্ডটা। সেই থেকেই কুড়ুনি নামে পরিচিত হল মেয়েটা।
কুড়ুনি হবার সময়, ওর মা জলে বুক ডুবিয়ে বসেছিল বলেই নাকি মেয়েটা খুব 'খালখাবুলে'। খাল ডোবা দেখলেই, থালা দিয়ে জল সেঁচে, 'খাবুলে' 'খাবুলে' মাছ ধরাতে ওস্তাদ।
কুড়ুনিকে নিয়ে ওর মা যেদিন প্রথম আঁতুড় ঘরে শুয়েছিল সেদিন ধনপতি মুনিব ঘর থেকে রাতের আহার পিনা সেরে, সর্প ভয়ে হাততালি দিতে দিতে ঝোড় জল পেরিয়ে নিজের ঘর ঢুকল। ঢুকেই অবাক! মেয়ের মুখ দেখে হাসতে হাসতে বলল, মেয়েই হোক আর ছেলেই হোক, ভালোয় ভালোয় হয়েছে তো, মন্দ কি! ভগবান ভাল রাখুক। আর দুটিতে কাজ নেই। একটাই যথেষ্ট। ছোট সংসার, সুখী পরিবার। ছোট সংসার সুখী...।
প্রথম দিকে অবসরি, ধনপতির কথায় রা কাটেনি। কিন্তু বার বার সুখী পরিবার, সুখী পরিবার বলে চেল্লাতে, অবসরির মেজাজ গেল বিগড়ে। রাগের মাথায় বিছানায় পড়ে পড়েই ফোঁস করে ছোবল মারল, অমন সুকের মুখে আগুন!
ধনপতি পাল্টা প্রশ্ন করল, কেনে, কেনে?
কেনে কেনে আবার কী। বুনের কোলে ভাই থাকবেক নাই, ভাই-এর কোলে বুন থাকবেন নাই, ই আবার কোন দ্যাশের কথা!
ধনপতি অনেকক্ষণ কোন উত্তর দেয়নি। গরুর গাড়ির ভাঙা 'পাই' টার উপর উঁচু হয়ে বসে রাগে ফসফস করছিল। এবার রা কাটল, বুনের কোলে ভাই যদি না হয় তখন?
কেনে হবে নাই?
তার কি কোনো মানে আচে?
আচে বইকি।
আচে বললেই তো হবেক নাই। আবার একটা বুন-ও তো হতে পারে।
কতদিনে ভাই না হয় দেকব।
কঠিন মেয়ে বটিস তুই!
ই বাবা, সুমাজে ভাই থাকবেক নাই, বুন থাকবেন নাই, ই আবার হয় নাকি! ভাই বুন না থাকলে, সমাজটা কেমন হবেক একবার ভেবে দেখেছ। সব স্বার্থপর হয়ে যাবেক। লাজ লজ্জা বলে কিছুই থাকবেক নাই দ্যাশে। কাকা-কাকিমা, জ্যাঠা-জ্যেঠিমা, পিসিমা-পিসেমশাই, মাসি-মেসো, মামা-মামিমা ইগুলো সব দ্যাশ থিকে উচ্ছেদ হয়ে যাবেক। তুমার নাতি পুতিরা কী করে জানবেক, আমার কোলে বুন বলে একটা সম্পর্ক ছিল। জানতে হলে উদেরকে ইতিহাস চেঁচিয়ে পড়তে হবেক নাই?
তু পড়বি। ধনপতি রাগে উত্তর দেয়।
আমি কেনে পড়ব?
কেনে পড়বি নাই? তুরই তো দরকার।
আমার একার কেনে, সুবার দরকার।
তাহলে চেঁচিয়ে পড়ার জন্যে একপাল ছেলে বিয়া।
বিয়াব তো।
বিয়াবি?
হ বিয়াব।
খেতে দিবেক কে?
ভাত দেয় কি ভাতারে, ভাত দেয় গতরে।
তুর গতর কত?
গতর আছে বলেই তো খাচ্চি গো।
খাচ্ছিস তো, কিন্তু থাকবেক কোথায়?
সি জায়গা আচে। এতবড় পৃথিবীতে জায়গার অভাব।
তাহলে তেলে বিয়া।
বিয়াব তো।
এই বিয়াব তো, বিয়াব তো করে করেই কেটে গেল ক'টা বছর। কিন্তু একটাও বেটাছেলের জন্ম দিতে পারল না অবসরি। একদিকে, মাত্র ক'দিনের জন্ডিসেই ধনপতি, ধন হারাল। দুর্বল শরীর নিয়ে, পুকুরের পাড়ে বাহ্যে বসতে গিয়েছিল। একটু জোরে কোঁৎ দিতেই, বাহ্যে না বেরিয়ে, খাঁচা ছেড়ে প্রাণ পাখিটা ফুড়ুৎ করে উড়ে গেল। যাবার সময় কাউকে কিছু বলা কওয়া বা নোটিস না দিয়েই চলে গেল। এইটুকু আক্ষেপ রয়ে গেল অবসরির মনে।
ধনপতি অবসরির জন্য রেখে গেল একটা পাহাড় প্রমাণ বোঝা। কেননা, এর মধ্যেই চার চারটি বিটিছেলের জননী সে। বড়টা 'খালখাবুলে'। মেজটা 'ছ্যাত-কাঁদুনে'। সেজটা 'লড়েভোলা'। আর কোলেরটা তো নেহাৎ শিশু।
এ ছাড়াও আরো দুটি পিস যন্ত্র রয়ে গেছে ধনপতির পুরনো এ্যাজলাসে। সে দুটি আর কেউ নয়, একটা অন্ধ ক্ষেপা ননদ, আর একটা বৃদ্ধ পঙ্গু শ্বশুর মশাই।
এই ছয় ছয়টি পটে আঁকা বাবা শিবের অনুচর নিয়ে মা দুর্গার ভরা সংসার। এদেরকে সামাল দেওয়ার জন্য অবসরি 'ইজ্জত রাখতে জরুরি উপস জানে'।
আজ 'চৈপদিন' হাড়ভাঙ্গা খাটাখাটুনী খেটেছে সে। কোন সকালে কোলের ছা'টাকে ট্যাকে করে বেঁধে কাস্তে হাতে মুনিবদের মাঠে গেছে ধান কাটতে। ছা'টাকে ট্যাক থেকে নামিয়ে, ছাতা মাথায় এলের উপর শুইয়ে রেখে ছিল। তারপর কাস্তের ডগে থুতু ছিটিয়ে, অশরীরীয় আত্মাদের কাছ ছাড়া করে, হুসমুস হুসমুস ধান কাটতে লেগে গিয়েছিল।
প্রথম দিকে সকালটা বেশ হাল্কা মেজাজে ছিল। ফুর ফুর বাতাস দিচ্ছিল। অবসরি বুকের কাপড় সরিয়ে বাতাস নিচ্ছিল। কিন্তু বেলা বাড়তেই রোদের চোট বাড়ে। বাতাসটাও বন্ধ হয়ে যায়। চারদিকে আগুন ঝরছিল তখন। কাস্তেটাও উত্তাপে তাপ ছাড়ছিল।
তবু অবসরির বিরাম নেই। খস কস করে কেটে যাচ্ছিল ধান। মনটা বড় কু গায়ছিল। কেননা, আকাশটা পুরো থম মেরে গেছে। গাছের পাতা একটুও নড়ছে না। অথচ আগুন বৃষ্টি হচ্ছে যেন চরাচরে।
ভয়ে ময়ে অবসরি ধান বাঁধতে শুরু করে দেয়। পাঁই পাঁই হাত ঘুরিয়ে, বাঁধা ধানের 'আউলি' ফেলে। চার চারটি আঁটি বেঁধে তৈরি করে গন্ডা। গন্ডার পর গন্ডা নামিয়ে 'পাই' ফেলে।
ধানের 'আউলি'গুলো রোদে খুব শুকিয়ে গেছে। তাড়াতাড়ি 'এঁটোতে' গিয়ে 'আউলি' কট কট ছিঁড়ে যাচ্ছে। তাই 'আউলি'র ভেতর থেকে, নরম খড় বার করে ধান এঁটোচ্ছে অবসরি। একদম 'হাঁপ-জিরেন' নিচ্ছে না।
কপাল বেয়ে ঘাম বেরিয়ে আসছে গড়গড়। ঘাম ফেলারও সময় নেই। সময় কোথা! ঘামে মাথার চুলগুলো ভিজে গেছে। চুল থেকে ঘামের বটকা গন্ধ ছাড়ছে। বমি করারও সময় নেই।
আকাশটা খুব তাড়াতাড়ি কালো হয়ে এল। পশ্চিমদিকে প্রথম মেঘ ঢুসাল, গুড়ুম...। ছাথা মাথায় এলে শুইয়ে রাখা ছা'টা ভয়ে তরাসে কোঁকিয়ে উঠল, কুয়া-আ-আ-আ অবসরি শুনেও শুনতে পেল না।
ধান এঁটোনো হয়ে গেলে, ধান গাদা দিচ্ছে অবসরি। আকাশটা কালো হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। সাদা বক উড়ে উড়ে কোথায় যেন চলে যাচ্ছে। প্যাচ করে হেগে দিয়ে যাচ্ছে ধান মাঠে। বকের হাগার বিকট গন্ধ ছাড়ছে। তবু বিরাম নেই। মা লক্ষ্মীর দানাগুলো খিল খিল হাসছে। ওদেরকে কি ফেলে রাখা যায় মাঠে!
আকাশে ঝড় উঠল। তুমুল ঝড়। এলে শুইয়ে রাখা ছা'টার মাথা থেকে ছাতাটা উড়ে গেল। উড়ে চলে গেল। অবসরি ধরতে গিয়েও ধরতে পারল না। ব্যর্থ মনরথে ফিরে এল। ছা'টাকে বুকে জড়িয়ে ধরল। যখন ধরল, মনে হচ্ছে, ঝড়ে মায়ে-ছাঁয়ে উড়ে চলে যাবে। অবসরি এলের 'আউড়িকোলে' ছা'টাকে বুকে নিয়ে শুয়ে পড়ল। 'আউড়িকোল' হল এলের নীচ অংশ। যেখানে বাতাস এসে বাধা পায়। তবুও বাতাস বাধা মানছে না। বাতাসে অবসরির পৎ পৎ কাপড় উড়ছে। শুধু কাপড় উড়ছে না, অবসরিকে তুলছে আর ফেলছে।
ঝড় বলে ঝড়! মাঠের গাদা দেওয়া ধান ঝড়ে উড়ে যাচ্ছে। অসরির গায়ে এসে ধুপ ধাপ আছাড় খেয়ে পড়ছে। অবসরি পিঠটাকে কুলো করে রেখেছে। যত পারছিস কিলো, আমার পিঠ করেছি কুলো!
ক্যানেলের ইউক্যালিপটাস গাছগুলো মড় মড় চড় চড় শব্দ করে পড়ে যাচ্ছে। তালগাছের মাথা থেকে শুকনো তালপাতা উড়ে চলে যাচ্ছে। সাদা বক 'গুঁপ' খেয়ে মাটিতে পড়ছে। পড়ে, মরে যাচ্ছে।
ক্রমে ঝড় কমলে, মাটি থেকে ঝেড়ে মেরে উঠে, কোলের ছা'টাকে বুকের দুধ দিতে দিতে ঘরে গেল। ততক্ষণে বড় বড় টোপ দিয়ে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। বৃষ্টিতে ভিজে গেছে অবসরি। ঘরে গিয়ে দেখল, উঠানে রোদে দেওয়া কাঠগুলো উঠানেই পড়ে আছে। পড়ে পড়ে ভিজছে।
কাল 'চেপরাত', মানে সারারাত না ঘুমিয়ে কেটেছে অবসরির। রান্না বান্না সেরে, ছা'গুলোকে খাইয়ে দাইয়ে কোনোরকম ঘুম পাড়িয়ে দিতেই, আবার আকাশটা ঘোর করে নেমে এসেছিল। ঘোর বলে ঘোর! সারারাত শুধু 'আড়ামহানে' জল ঢেলে দিল। অর্থাৎ, প্রচুর বৃষ্টি! বৃষ্টিতে ভিজে গেছে অবসরির ঘর। আর ঘর তো খুব! মাটির ছেয়া দিয়ে দিয়ে কোনোরকম এককুঠুরি। খড়ের চাল। চালগুলো পচে গেছে। একহাত দু'হাত গর্ত তৈরি হয়েছে। গর্ত দিয়ে ভদ ভদ জল পড়েছে। গর্তমুখ সোজা করে, থালা বাটি পেতে বসে আছে অবসরি। থালা বাটির উপর জল পড়েছে, দড় বড় দড় বড়। থালা বাটি ভর্তি হয়ে গেছে। বাইরে জল ফেলে এসেছে। আবার ভর্তি হয়ে গেছে। তবু শেষ রক্ষা করতে পারেনি। ঘরটা ভিজে গেছে।
দেওয়ালের ধারে ধারে ইঁদুরের গর্ত। গর্ত দিয়ে ভদ ভদ করে জল ঢুকছে। জল পেয়ে ইঁদুরগুলো গর্ত থেকে ছুটে বেরিয়ে এসেছে। বেরিয়ে সারা ঘর ছোটাছুটি করেছে। কোথাও ঠাঁই পায়নি। 'তিল ঠাঁই আর নাহিরে'।
গর্তে জল ঢোকার ফলে, দেওয়ালের মাটি ভিজে গেছে। ভিজে সোঁদা মাটির গন্ধ বেরিয়ে আসছে। দেওয়ালগুলো হেলে গেছে। হেলে পড়ব পড়ব করছে।
ছা'গুলোর নড়া ধরে মা সারাটা রাত এপাশ ওপাশ করেছে শুধু। তবু ছা'গুলো ভিজে গেছে। নাক টানছে।
ছা'গুলোর নড়া ধরে এপাশ ওপাশ করার ফলে নড়াগুলো দরজ ধরে গেছে। দরজের যন্ত্রণায় ছা'গুলো কাঁদছে।
দরজের হাত থেকে ক্ষেপা ননদটাও বাদ যায়নি। তবে ও ছা'গুলোর মতো কাঁদছে না। কেবল গাল পাড়ছে। বিশ্রী বিশ্রী কথা বলছে।
ননদটা জলে ভিজে থর থর কাঁপছে। কাঁপতে কাঁপতে বাবার গা থেকে, গায়ের পরনের কাপড়টা টেনে, খুলে নিয়ে ঢাকা নিচ্ছে। এতে ওর বাবা ন্যাংটো হয়ে পড়ে থাকছে।
বাবার যখন শীত করছে, তখন মেয়ের গা থেকে টেনে খুলে নিচ্ছে কাপড়টা। মেয়ের গায়ে তখন কিছুই থাকছে না।
অবসরি সারাটা রাত বাপ-বিটির কাপড় টানাটানি দেখেছে। দেখে, আকুল হয়ে কেঁদেছে। কিন্তু জল ফেলতে পারেনি। কেননা, তখন তো জলে ভিজে যাচ্ছে ঘরটা।
পশ্চিম দিকে দেওয়াল থেকে 'মচ' 'মচ' শব্দ বেরিয়ে আসছে। অবসরি ভয়ে ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে এল। দেওয়ালের পেছন দিকে গেল। দেখল, পেছন দিকের দেওয়ালটা এক হাঁটু জলে ডুবে আছে। জলটা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। জলটা যেন বাইরে কোথাও বেরচ্ছে না। 'তাহলে কি ড্রেনের মুড়ি দিয়ে জল বেরচ্ছে না!' একটা লম্বা বাঁশ হাতে নিয়ে, ড্রেন ধরে হপাং হপাং শব্দ করে, জল কেটে কেটে এগিয়ে গেল। দেখল, হ্যাঁ, তার অনুমান ঠিক। মুড়ির মুখে ইঁদুর মাটি ফেলে ফেলে মুড়ি বুজিয়ে দিয়েছে। হাতের বাঁশটা মুড়ির মুখে ঠেলে গুঁজে দিল। খেচারে খেচারে মুড়ির মুখ পরিষ্কার করল। করতেই দরদর বেগে জল বেরতে থাকল। জলের স্রোত অবসরিকে টেনে, মুড়ির মুখে ভরে দিচ্ছে। ভয়ে ময়ে অবসরি ড্রেন থেকে বেরিয়ে এল।
ভিজে কাপড়ে ঘর ঢুকল অবসরি। ঢুকতেই পশ্চিমদিকের দেওয়ালটা হুড়মুড় শব্দ করে পড়ে গেল। দেওয়াল পতনের শব্দে ভূমি কেঁপে গেল।
ঘরের ভিতর থর থর কাঁপছে অবসরি। আর ঠাকুর নাম করছে। রস, রস ঠাকুর! আর অমন করনা!
আকাশে গুড়ুম শব্দ করে বাজ পড়ল। বাজের আলোয় উঠানের আমড়া গাছটাকে দেখতে পেল। আমড়াগাছে মুনিবদের লাঙলটা দাঁড় করানো আছে। ছুটে গিয়ে কাঁধে তুলল লাঙলটা। এক লহমায় সারকুড়ে পুঁতে দিয়ে এল। আসার সময় সারকুড়টাকে হাঁটু গেড়ে গড় করল। রক্ষা কর, রক্ষা কর নারায়ণ ঠাকুর। আর অমন ভাসিয়ে দিও না। ছেলেপুলে নিয়ে ঘর করতে দাও। সারকুড়ে মাথা ঠুকে অবসরি। মাথার চুলে, সারকুড়ের ভিজে পোয়ালচুনী লেগে যায়।
সারকুড় প্রণাম সেরে, ঘরে এল অবসরি। বৃষ্টিটার একটু জোর কমল। যখন কমল, ঘোষদের ঘর থেকে, ষাড়া মরগটা গলা তুলে 'বাঁক' দিল, কোঁকরের কোঁক-অ-অ-অ!
মোরগের 'বাঁক' শুনেই নাকি, বাঁশঝোড় থেকে, সরমানা থেকে, মুড়মুড়ি গাছের ভিতর থেকে শেয়ালগুলো সব ডাক দিল, হুক্কা হুয়া, হুয়া, হুয়া, ছেলেগুলোকে বাগিয়ে শুয়া! তো ছেলেগুলোকে বাগিয়ে শোয়াবে কি তখন রাত কেটে ভোর হয়ে গেছে।
অবসরি আর কাল বিলম্ব করে না। লন্ঠন হাতে গোহাল যায়। গরু বার করে। 'দনে' গরুগুলোকে খেতে দেয়।
গো সেবা করে যখন অবসরি ঘরে ফিরে এল, দেখল, কুড়ুনি নাক দাবা নিয়ে বসে আছে। শ্বশুরটা একঝুড়ি হেগে রেখেছে ঘরের ভিতর। গন্ধ উঠছে।
মাকে দেখেই কুড়ুনি চিৎকার করে উঠল, টেনে ফেলে দিয়ে আয় দিকি বুড়টাকে।
অবসরি ঘাড় নেড়ে চোখ টিপল, বলতে নাই, গুরুজন, বুড়ো হয়েছে...।
বুড়ো হয়েচে তো অত খাবার বাতিক কিসের! কুড়ুনি মায়ের সঙ্গে সমানে 'চপা' করতে থাকল। মানে ঝগড়া।
অবসরি আর মেয়ের সঙ্গে পেরে উঠল না। খড়ের 'নুতো' নিয়ে গু ফেলতে গেল। কুড়ুনি হাঁক দিল, গোবর দিয়ে ভাল করে হাত ধুয়ে আসবি কিন্তু, নাইলে তোকেও টেনে ফেলে দিয়ে আসব...।
হাত ধুয়ে ঘরে বসল অবসরি। তখনও গন্ধটা ঘরের ভিতর ঘুর পাক খাচ্ছে। পেটের নাড়িগুলো বেরিয়ে আসছে মুখ দিয়ে। এরই মাঝে ধনপতি ঝুপ করে অবসরির মাথায় চেপে বসল। থাকবি কোথায়? সত্যিই আজ অবসরির থাকার জায়গা নেই। পশ্চিম দিকের দেওয়ালটা পড়ে গেছে। বাকি তিনদিকের দেওয়াল হাঁ হয়ে হেলে গেছে। ঘরের ভিতরটা ভিজে জবজবে হয়ে রয়েছে। এখনো এখানে সেখানে জল জমে আছে। পুকুরে যেমন মাছ চাষ করা যায়, হয়তো আর কিছুদিন পর, পুকুর হয়ে যাবে ঘরটা!
চিন্তায় ভাবনায় অবসরির মাথাটা ঘুরছে। যেমন পৃথিবী ঘুরে মহাবেগে, অবসরির মাথাটাও ঘুরপাক খাচ্ছে। কিন্তু কুল কিনারা পাচ্ছে না।
শেষ মেষ, বি.ডি.ওর শরণাপন্ন হল অবসরি। বি.ডি.ওর রাঙা পা দুটিকে জড়িয়ে ধরল, আমি মরতে বসেচি বিডিয়া সাহাব, আমাকে বাঁচান। আমার চার চারটি বিটিছেলে...
বি.ডি.ও. সদয় হল। মুখ তুলে তাকাল। জিজ্ঞাসা করল, কি নাম তোমার?
অবসরি উত্তর দিল, অবসরি।
—বি.পি.এল. কার্ড আছে?
—হ আচে।
—দু'টাকা দরে চাল পাও?
—হ পাই।
—বি.পি.এল. নাম্বার জান?
—হ, জানি।
—কত?
—পিটু সমান ত্রিরি।
—আর স্কোর?
—চৌত্রিশ—অ—অ—অ...।
বি.ডি.ও. ঘাড় নাড়ল। জিভ তুলে চকচক করল। বলল, মাপ কর, স্টেপ জাম্প করতে পারব না। এখনো অনেক দেরি আছে তোমার।
অবসরি বি.ডি.ও.র পা ছেড়ে, অফিস সংলগ্ন বটগাছের ছাওয়ায় বসল। চারদিকে সান বাঁধানো বেদি, বটগাছটাকে ঘিরে রেখেছে। সেই ঘেরার অলিন্দে নিজেকে কোনোরকম সঁপে দিল। দিতেই, অবসরির মাথায় প্যাচ করে হেগে দিল একটা কাক। হেগে উড়ে গেল। উড়তে উড়তে কা কা করতে থাকল।
অবসরি মাথায় লেগে থাকা কাকের গু, হাতে পড়ে পরিষ্কার করল না, গায়ে পায়ে লেপ্টে নিল। তারপর হন হন করে হাঁটতে থাকল। হাঁটতে থাকল।
আকাশটা অবার কালো করে নেমে এসেছে। বড় বড় টোপ দিয়ে জল পড়ছে, জল। জলে ভিজে যাচ্ছে অবসরির সারা গা। অবসরি গা পেতে জল নিচ্ছে। অবসরিকে জলে ভাসিয়ে দিক। ভেসে যাক চরাচর। সব ভেসে যাক।
অবসরির গা বেয়ে দর দর বেগে জল বইছে। জলে পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে অবসরির গা। কাকের গু ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যাচ্ছে। অবসরি সাদা হয়ে উঠছে ক্রমশ।
ডাঙমানার মাঠে এসে দেখল, গজে বাঁধা লালগাইটা চুবুড় ভেজা ভিজে গেছে। ভিজে রঙ বদলেছে। লাল রঙটা পাল্টে গেছে।
গজের চারপাশ ঘুরছে গাইটা। ঘুরে ঘুরে গজ উপড়াতে চাইছে। মাঝে মাঝে হ্যাঁচকা টানও মারছে। কিন্তু গজ উপড়াতে পারছে না। এত গভীরে পোঁতা আছে গজটা।
অবসরি গাইটাকে দেখে থমকে দাঁড়াল। গাইটাও ওর গায়ের গন্ধ পেয়েছে। তাই দাঁড়িয়ে গেছে। আর ঘুরছে না। কেবল চোখ তুলে অপলক তাকিয়ে আছে। আর হাম্বা ডাকছে। তার মানে, অবসরিকে চিনেছে।
অবসরিও দূর থেকে হাত নেড়ে ওর উপস্থিতির জানান দিল। কাছে গিয়ে গজ উপড়ে দড়িটা ওর পিঠে চাপিয়ে দিল। গজ, গাই, মানুষ সব জলে ভিজছে।
বাথানের কাছে যেতেই, গাইটা বাথানে ছুটে ঢুকে গেল। অবসরি মনে মনে ভাবছে, নিরাপদ আশ্রয়ে কে না ছুটে যায়।
গাইটাকে বাথানের গজে বেঁধে দিল অবসরি। বেঁধে বেরতে যাবে, এমন সময় দেখল গাইটা কাত হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। অবসরিকে কিছুতেই বেরতে দিচ্ছে না। এমন দুর্যোগে কেউ কি কাউকে বেরতে দেয়!
অবসরি গাইটার গলার ঝঁটিতে হাত বুলাতে থাকল। আরাম পেয়ে গাইটা চোখ মুদল। চোখ মুদে কি ঘুমিয়ে গেল!
অবসরি সুর সুর বাথান ছেড়ে বেরিয়ে এল। যখন বেরিয়ে এল তখন গাইটা জানতে পেরেছে। তাই হাম্বা ডাকছে, হাম্বা-আ-আ!
অবসরি হাত নেড়ে আশ্বস্ত করল, আসছি, আসছি, এসে খেতে দিচ্ছি।
অবসরি যখন ঘরে এল, দেখল, ঘরের পেছন দিকে দেওয়ালটা পড়ে গেছে। একটা ইঁদুর চাপ পড়ে রয়েছে। মরে পড়ে আছে। ঘরে মরা মরা গন্ধ!
হেঁসলের ঢাকনা খুলে, পা ছড়িয়ে পান্তাভাত খেতে বসল। পান্তাভাতে নুন ছড়িয়ে ফুঁ দিয়ে ভাত খাচ্ছে অবসরি।
এমন সময় উঠানে আলো জ্বলল। মেঘ কেটে গেল তাহলে। একদল তরুণ তরতাজা যুবক বাইঠুকে অবসরির সামনে দাঁড়াল। এ যেন ভাঙা ঘরে চাঁদের হাট! যুবকগুলো সমস্বরে বলল, বড় সমিস্যায় পড়েচি মা!
অবসরি মুখের ভাত চিবতে চিবতে বলল, কও, তুমাদের সমিস্যাডা কি কও দিকি একবার।
যুবকগুলো বলল, আমরা একটা নতুন দল গড়েচি।
অবসরি বলল, বেশ তো, লড়ে যাও।
যুবকগুলো বলল, লড়ে তো যাব, কিন্তু সামনে দাঁড়বক কে?
অবসরি বলল, তুমাদের এই সমিস্যা!
যুবকগুলো বলল, হ্যাঁ মা, তুমাকে আমাদের মহিলা প্রতিনিধি হতে হবেক।
অবসরি কী বুঝল কে জানে! গলাতে এক ঘটি জল হড় হড় করে ঢেলে নিল। তারপর ঢেকুর তুলে বলল, ''তোমরা তো বাঘকে ইঁদুর বানাও, ইঁদুরকে বাঘ। তো আমাকে একবার দ্যাশের ভার দাও না। কথা দিচ্ছি, কুনও গরবি মানুষকে উদোম জায়গায় থাকতে হবেক নাই। সকলের মাথায় ছাদ তুলে নিব। পাহাড় ভাঙা পাথরের ছাদ। যাতে কুনও দিন না ভাঙে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন