জয়দেব দত্ত
পায়রাচর, পায়রাচর। দিগুভুঁই যখন পায়রাচরে পৌঁছাল, তখন ভালো করে রাত কাটেনি। কী করে কাটবে, তখন তো ভোরই হয়নি। ভোর না হলে, রাত কাটে কী করে। তাই গাছের ডালে অন্ধকার, গাছের বড়ো বড়ো গুঁড়িতে অন্ধকার, গাছের শিকড়ে বাকড়ে অন্ধকার, ঘাসের ডগে অন্ধকার, লতায় পাতায় অন্ধকার, পুকুরের জলে অন্ধকার, কুয়োর পাটে অন্ধকার, কচুপাতায় অন্ধকার, তিলের শুঁটিতে অন্ধকার, মাটিতে অন্ধকার, মাটির ধুলোবালিতে অন্ধকার। একপ্রকার অন্ধকারটা জমাট বেঁধে আছে পুরো পায়রাচরের মাঠ জুড়ে।
কিন্তু তাতে কী, কী হয়েছে দিগুর। দিগু তো আর চোখে অন্ধকার দেখছে না। সব দিনের আলের মতো 'ফার্চা' দেখছে।
দিগু হালের নাঙল জুয়াল জুড়ে যখন 'খালমুহে' গেল, তখন নাঙলের তল অংশটা মাটিতে ঠক করে ঠেকল। আর ঠেকতেই গাছের ডাল ঘুমে কাদা হয়ে থাকা পাখ পাখালির দল ভয়ে ময়ে বুক ধড়াস ধড়াস করতে করতে ঝটপট ঝটপট এদিক ওদিক উড়তে থাকল। পাখপাখালিগুলো তো ওর খুব চেনা, 'হরদম' দেখেছে, তাই নতুন করে চিনতে আর অসুবিধা হল না। এমন কি কোন পাখটা কোন দিকে গেল বা কোথায় বসল, তাও দেখল দিগু। টেসকোনা পাখটা ঝাকড়-মাকড় কাঁটাশিরীষ গাছ থেকে যে ডালপালাহীন আমড়া গাছে বসল, সেও দেখল দিগু।
গতকাল যে ফিঙে পাখটা সুর নৌকার মতো শরীর নিয়ে, জল খাবার জন্য উড়ে উড়ে কলতলায় বসেছিল। বসার সময় খেয়াল করেনি, কোন ফিচকেল বউ-ঝি মাথার একগোছা চুল ফেলে গেছে, সেই চুল লাগবি লাগ, পাখটার পায়ে লেগে গেল! এমন লাগল, পুরো দু'পা জুড়ে 'বেজিয়ে' গেল সঙ্গে সঙ্গে। নে, খা! খাবে কী তখন তো শরীর জুড়ে টালটামাল! ব্যালেন্স আর রাখতে পারে না। কী করে রাখবে, পাগুলো যে এক জায়গায় বাঁধা। কোন রকম টলতে টলতে দিগুর ছামুতে ধাব্বিস করে পড়ল। পড়ল তো পড়ল, আর উঠল না। উঠতে পারল না। উঠতে না পেরে, অসহায় আত্মসমর্পণ। ও হে নাঙলে, খুব তো নাঙল চালাচ্ছ। তো একবার নাঙল টাঙল ফেলে, আমার দিকে ধ্যান দাও দিকি। দেখছ না, আমার পায়ে চুলের বেজ। হয় আমার পা থেকে চুল ছাড়াও, নয়তো তোমার ওই 'হেলেবাড়ি' দিয়ে আমাকে ঠুকে ঠুকে মেরে দাও।
সাথকে সাথ দিগু নাঙল টাঙল ফেলে, ' হেলেবাড়িটা' কোমরের পেছনে গুঁজে, অর্থাৎ গোরু চালানো লাঠিটা কোমরের পেছনে গুঁজে, লেগে গেল পাখটার পায়ের কাজে, চুল ছাড়াতে। কিন্তু চুল কি আর ছাড়ে। কেন ছাড়বে? ছাড়বার জন্য লেগেছে কি। যখন ছাড়ল, তখন পায়ের চামড়া কেটে পুরোদস্তুর রক্ত বেরচ্ছে। দিগু পরনের গামছার খুঁট ছিঁড়ে, পাখটার পায়ে বেঁধে দিল।
সেই পা বাঁধা পাখটা ভয়ে ময়ে ঝটপট ঝটপট করতে করতে যে কাঁটাশিরীষ গাছ থেকে ঝাঁকড় মাকড় কয়েত গাছে বসল, তাও দেখল দিগু। শুধু পাখটাকে দেখল না, পাখটার পায়ে যে গামছার খুঁট বাঁধা আছে, তাও দেখল দিগু। কেন দেখবে না, এমনি এমনি কি আর রোজ শিশিরে চোখ ধোয়? শিশিরের দ্রব্যগুণ আছে না। শিশিরের দ্রব্যগুণেই তো রাতের ঘুরঘুটে অন্ধকারটাকে, দিনের আলো মতো 'ফার্চা' দেখছে। বয়সটা তো আর কম হল না, ভাঙ্গা মাসটা গোটা হলে তিনকুড়ি দশে ঘা মারবে। তাহলে!
'খালমু' পার হলেই কাঁটাশিরীষতলা। আর কাঁটাশিরীষতলার ইতিবৃত্তি নতুন করে কী আর বলব! কাঁটাশিরীষের শুকনো ডাল পড়ে থাকে পুরো পায়রাচরের মাঠ জুড়ে। আর কাঁটাশিরীষের ডাল তো ডাল নয়, পুরোটাই কাঁটা! সেই কাঁটার ধার মুখে একবার কারু পায়ে ফুটেছে তো, দিন নেই, রাত নেই, শুধুই দপ দপ! পা ফেটে পুঁজ বেরিয়ে আসবে নদীর মতো। পুঁজ বেরিয়ে আসবে কি! পায়ে কাঁটা ফুটলে তবে তো পুঁজ। কাঁটা ফুটলেই হল। তার জন্য শিশির ধোয়া চোখগুলো আছে না। চোখগুলো তো আর মুদে মুদে হাঁটছে না, রীতিমতো চেয়ে চেয়ে হাঁটছে। যে জায়গায় কাঁটাশিরীষের ডাল পড়ে রয়েছে, সেই জায়গায় লম্বা করে ছেয়া বাড়িয়ে হাঁটছে। মোটেই কাঁটা ফুটছে না পায়ে।
দিগু সাবধানে হাঁটলেও গোরুগুলো তো আর সাবধানে হাঁটছে না। তাহলে ওদের গোরু বলবে কেন? গোরুগুলো সামনে যা পাচ্ছে, মড়মড় চড়চড় শব্দে তা ভেঙেচুরে যাচ্ছে। রাস্তার কাঁটাও বাদ যাচ্ছে না। গোরুর পায়ে 'খুরে', কাঁটার ধার মুখে ভেঙ্গে চুরে চুরমার হয়ে পড়ে থাকছে রাস্তার যত্রেতত্রে।
আর রাস্তা তো খুব। রাস্তা বলতে 'গফুই'। গোরুর গাড়ি চলে চলে দু'পাশে যে চাকার দাগ, সেই দাগই হল 'গফুই'। 'গফুই' বরাবর হাঁটছে গোরুগুলো। দু'পাশে 'গফুই'। আর মাঝখানটি যে ভুঁড়োর মতো পেটটা বেরিয়ে আছে, সেটা তো পড়ে পড়ে হাওয়া বাতাস খেলতে না। বরঞ্চ পেট ফুঁড়ে বেরিয়ে এসেছে এটা সেটা। হয় মুড়মুড়ি গাছ, নয় ভ্যারেন্ডা, নয় তো জলজ্যান্ত বিচুঁটি। সেই সব গাছ ফাচ লাঙলের ঘায়ে ঘা খেয়ে, কোনটা হাফ ডেডবডি আবার কোনটা পূর্ণ ডেডবডি হয়ে পড়ে থাকছে রাস্তায়। দিগু সেই সব ডেডবডি টপকে টপকে পেরিয়ে যাচ্ছে। কোনও করম ভুল করেও পা দিচ্ছে না। কেন দিবে? ওর পায়ে কি চোখ নেই! আছে! অন্তত একটা হলেও আছে। না হলে, সব কিছু ঠিক ঠাক চলছে কী করে।
নাঙলের 'জুত' বাঁধতে বাঁধতে বাঘা-ছ্যাটকা কুকুরটাকে দেখতে পেল দিগু। কুকুরটা সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। রাস্তায় আসতে আসতে বোদাই নদীর জল খলবল খলবল পেরতে পেরতে কুকুরটার অনেক কথা ভেবেছে দিগু। রাতবিরেতে কেউ থাক আর না থাক, কুকুরটা অন্তত সঙ্গে থাকবে। কেননা, কুকুরটা তো অন্য কোনো গৃহস্থের পোষা কুকুর নয়। ওর মা ভুঁড়োর মতো পেটটা নিয়ে মাঠে এসেছিল খাবার খেতে। বিচারির খাবার খাওয়া হল না। কী করে খাবে, তখন তো পেট যন্ত্রণা শুরু হয়ে গেছে। তাই কোনো রকমে ঢুকে পড়েছিল বাঁশঝোড়ে। ঢুকেই হস করে প্রসব করেছিল ছা'টাকে। মায়ের একটা মাত্র ছটা আট আটটা দুধের বাঁট চকচক চুষতে চুষতে, ইয়া মোটা হয়েছিল। সেই মোটা ছাটা বাঁশঝোড়েই থেকে গেছে, আর কারু ঘর যায়নি। কী করে যাবে, ও তো বাঁশঝোড়েই অলিখিত ঘর বানিয়ে নিয়েছে।
সেই বাঁশঝোড়ে ঘর বানানো কুকুরটা, দিগুর সামনে এসে দাঁড়াল। দাঁড়িয়ে দিগুকে দেখে লেজ নাড়ছে। তার মানে দিগুকে চিনছে। দিগু কুকুরের লেজেটাকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। কেমন একপাশ থেকে অন্য পাশে নাড়ছে লেজটা! কোন শব্দ হচ্ছে না। বরঞ্চ দিগু শব্দ করল। জিভের চকচক শব্দ তুলে, কুকুরটাকে লেজ নাড়ার প্রত্যুত্তর দিল। তার মানে, তুই আছিস, আমি আছি; নে দু'জনেই থাকব।
দিগু মুখে আং বাং বকতে বকতে নাঙল চালাচ্ছে। 'পায়ে পায়ে', 'সিধে সিধে', 'ভিতে ভিতে'। গোরুগুলো ওর মুখে কথা শুনে শুনে চলছে। 'পায়ে পায়ে' বললেই, পায়ের কাছে বোঁ করে ঘুরছে। 'সিধে সিধে' বললেই সোজা চলছে। আর 'ভিতে ভিতে' বললেই জমির এল ধরে, ভিতের গোড়ায় গোড়ায় চলছে। কেন চলবে না, গোরুগুলো যে ওর খুব প্যায়ারের।
গোরুগুলো প্যায়ারের হলে কী হবে, খুব যে 'ঢ্যাকপাই'। ডাইনেরটা ছোটো আর বাঁ-এরটা বড়ো। ছোটোতে বড়োতে কিছুতেই কাঁধে কাঁধে মিল হয় না। তবে ডাইনেরটা ছোটো হলেও খুব 'খুটতেজি'। মোটেই 'গাড়ে-গচ্ছা' অসুবিধা হয় না। যদি কোনোমন্দ 'গাড়ে' ঘ্যাচ করে গাড়ির চাকা পড়েছে তো সঙ্গে সঙ্গে হাঁটু ফাঁটু গেড়ে চোঁচাড়ে তুলে দেয় গাড়িটা। এমন 'ঢ্যাকপাই' গোরু কেউ কি আর 'জোড়-ভাঙ্গে'।
দিগু 'ঢ্যাকপাই' গোরু নিয়ে, জোড় না ভেঙ্গে, নাঙল চালাচ্ছে। নাঙল চালাচ্ছে, নাঙল চালাচ্ছে। এমন সময় কয়েতগাছ থেকে একটা প্যাঁচা ক্যাচক্যাচ ডেকে উঠল। কাকে ডাকল প্যাচাটা? দিগুকে কি? দুর, দিগুকে ডাকবে কেন। দিগু কি ওর প্রেমিক? না, ওর প্রেমিক বসে আছে দূরে, অশ্বত্থ গাছে। অশ্বত্থ গাছে বসে বসে ঝিমচ্ছে। ডাক শুনে হয়তো এতক্ষণ ওর ঝিম ভাব কেটে গেছে। এক্ষুনি ওর ডাকের সাড়া দিবে। আর সঙ্গে সঙ্গে উড়ে আসবে তরস্থ। প্রেমিকার ডাক বলে কথা, ডাকলে কেউ কি আর না আসে! যেই না ভাবা, অমনি অশ্বথ গাছ থেকে ক্যাচ ক্যাচ ডাক! শুধু কি ডাক, আড়াই তাড়াই উড়ে আসছে প্যাঁচাটা। কত বড়ো প্যাঁচা! কত বড়ো বড়ো তার ডানা! মনে হচ্ছে, রাতের অন্ধকার চিরে, একটা উড়ো জাহাজ উড়ে আসছে।
প্যাঁচাটা উড়ে এসে কয়েত গাছে বসল। ঠিক ওর প্রেমিকার পাশে। কতক্ষণ পাশে বসেনি। সে একপ্রহর, একপ্রহর! প্রতি প্রহরে প্রহরে তো এই ভাবেই আসা যাওয়া করে। ডাক শুনে আসে, আদর সোহাগ খায়, আবার চলেও যায় সঙ্গে সঙ্গে। এই হল প্যাঁচা বৃত্তান্ত। দিগু নাঙল চালানো বন্ধ করে, কয়েক গাছে প্যাঁচা দুটিকে দেখছে। কেমন পাশাপাশি বসে আছে দুজন। একে অপরের নাকে নাক ঘষছে। আর মাথা দুটি টুকটুক উপর নীচে নড়ছে। কত সহজ মিলন! এত সহজ মিলন দেখার ভাগ্য কজনার বা জুটে! দিগুর ভাগ্যে জুটেছে। তাই উপর দিকে চোখ করে দেখছে।
কিন্তু দেখার কি আর 'জো' আছে! ডাইনের 'নিরেস' গোরুটা যে কিছুতেই স্থির-ধীর মানছে না। অর্থাৎ ছোটো গোরুটা। ও সব সময় সচল থাকতে চায়।
দিগু বাঁয়ের 'সরেস' গোরুটাকে লেজ মুলে, নাঙল চালাতে শুরু করেছিল। গোরুগুলো নিশ্বাস ফেলছে জোরে জোরে। ফোঁস ফোঁস শব্দ হচ্ছে খুব। নিশ্বাসের ফলে জলীয় বাষ্প উড়ছে। সারা আকাশ ছেয়ে যাচ্ছে।
শুধু কি জলীয় বাষ্পে আকাশটা ছেয়ে যাচ্ছে! আর ঝোড় থেকে যে মশা পন পন বেরিয়ে আসছে। এসে গোরুর গায়ে বসছে, রক্ত চুষে খাচ্ছে। সেই রক্ত চোষার হাত থেকে বাঁচার জন্য, গোরুগুলো পাঁই পাঁই লেজ বিচছে। লেজের আগায় যে ' গোবালি', অর্থাৎ কি না গোরুর চুল, সেই চুলের ঘা খেয়ে, মশাগুলো দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে, এদিক ওদিক ছুটে বেড়াচ্ছে। আর পাঁই করে যে লেজ বিছার শব্দ, সেই শব্দের ঝড়ে, মাটি থেকে ধুলো উড়ছে। ধুলোয় ছেয়ে যাচ্ছে সারা আকাশ। ধুলো নয়, ধুলো নয় ধূলিকণা। দিগু দেখতে পাচ্ছে সেই সব সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম ধূলিকণা। কেন পাবে না, রোজ রোজ শিশিরে চোখ ধোয় এমনি এমনি কি! আ-হা-হা, নাঙলটা মাটির ওপর ভেসে যাচ্ছে যে! এক্ষুনি 'পা ফালাবে' গোরুটা! মানে, পায়ে নাঙলের ফাল ঢুকে যাবে। তখন রক্তে 'পয়ন্যাল' হয়ে যাবে মাটি। হ-হ-হ-হ, দাঁড় করায় নাঙলটা। নাঙলের বোঁটা ধরে টান মারে। টান মারতেই নাঙলের ফালের সঙ্গে উঠে আসে একতাল ঘাস। ঘাসে বেজিয়ে গেছে নাঙলের ফাল।
দিগু হাতের 'হেলেপাচনটা' ঠেলে ভরে দিল, ফালের ডগে, ঘাসের ভিতর। কিন্তু এত সোজা কি! 'হেলেপাচনটা' ঠেলে ভরে দিলেই কি ফালের ডগ থেকে ঘাস ছেড়ে বেরিয়ে যাবে। বেরিয়ে সে যাবে না, তা বিলক্ষণ জানে দিগু। তাই সে চটজলদি হাত লাগাল।
এমন সময় ডাইনের 'নিরেস' গোরুটা পাঁই করে লেজ বিছে দিল। সেই লেজ লাগবি লাগ, দিগুর চোখে ঢুকে গেল। দিগু তখন চোখে চোদ্দভুবন দেখছে। দিগু কি কানা হয়ে গেল নাকি! চোখের যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে নাঙল ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এল। গামছার খুঁট মুখে ভরে, হাপা নিতে থাকল, হাপা! হা-হা-হা!
হা-হা করে, হাপাতে কি চোখ সারল। সারল কি সারল না জানি না। তবে পেছন থেকে ডাক শোনা গেল, কই গো, খাবে এস।
দিগু পেছন থেকে ডাক শুনে সম্বিত ফিরে পেল। হ্যাঁ, তাই তো, কখন সকাল হয়ে গেছে দেখি নাই তো! খাবার বেলা হয়ে গেছে যে! দিগু মনে মনে আপশোশ করে, এত সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম ব্যাপার তার চোখ কিছুতেই এড়াল না, অথচ এত বড়ো একটা সকাল হওয়ার মতো ঘটনা, তার চোখ এড়িয়ে গেল কী করে!
দিগু চোখ পিট পিট করতে করতে মাইতুড়ির কাছে গেল। মানে, মেজ বউ এর কাছে। হাত পাতল, জল দে।
মাইতুড়ি দিগুর হাতে হড় হড় জল ঢেলে দিল। দিগু চোখে মুখে জল নিল। নিতেই, চোখ জ্বলে আগুন হয়ে গেল। চোখের জ্বালায় জ্বলে পুড়ে খাঁক হয়ে যাচ্ছে দিগু।
খাঁক হোক, তবু মাইতুড়ির কাছে গিয়ে বসল। আর বসতেই, মাইতুড়ি দূরে সরে গেল। মাইতুড়ির এই এক স্বভাব! মরতে গেল, তবু স্বভাবটা গেল না। দিগু পাশে বসলেই, মাইতুড়ি লাজে দূরে সরে যায়। দিগু যেন ওর কেউ নয়! যেন কোনদিন চোখের দেখা দেখেনি লোকটাকে।
দুখি মনে, দিগু গপাগপ খাবার খাচ্ছে। মুখে একটাও কথা বলছে না।
মাইতুড়ি কথা বলল। না না, কথা নয় টিপ্পনী কাটল, চোকে কি নাঙলের ফালটা ঢুকে যেইল নাকি?
আগুনের ছেঁকা লাগলে যেমন হাত পা পুড়ে যায়, জ্বালা করে, তেমনি মাইথুড়ির কথায় দিগুর গা জ্বলে গেল। কিন্তু কোন উত্তর দিল না। তাড়াতাড়ি খেয়ে, হাত মুখ ধুয়ে, এর সমুচিত জবাব দিল মাত্র। মাইতুড়ির পাগুলো ধরে, হড়হড় করে টান দিল। আর দিতেই মাইতুড়ি পেছন দিকে পড়ে গেল। এমন পড়ল, আর উঠল না।
দিগু বলল, মাটি নিলি নাকি?
মাইতুড়ি তেড়ে মেড়ে উঠে বসল। বলল, এই তো সবে পড়ল সাঁঝ, এক্ষুনি মাটি নুব কি!
দিগু বলল, তোর সাঁঝ যেন আর না কাটে।
মাইতুড়ি বলল, আজ খোঁকা ফোন করেইল।
খোঁকা!
হ, আমাদের খোঁকা।
কী বলল খোঁকা?
বলল, সামনের একুশ তারিকে আসচে।
একুশ তারিকে?
হ, একুশ তারিকে।
একুশ তারিকে এসে কী করবেক?
ই বাবা, ঘরের ছেলে ঘর আসবেক নাই!
হ ঘর আসবেক বইকি, আসুক ঘর, তা এই অসময়ে? অসময় বলচ কি খোঁকার বাপ? এই একুশ তারিকেই তো আমাদের ইস্কুলটার পঞ্চাশ বছর বয়স হচ্ছে।
তাই নাকি!
হ, জানো না, উদর! আর ই জন্যই তো আমাদের খোঁকা আতদূর থেকে আসচে।
তাই নাকি?
হ। জানো তো, ই বার আর আমদের খোঁকা একা আসচে নাই। সঙ্গে আজ্যপাল না কে একজন আসচে।
কী পাল?
আজ্যপাল, আজ্য পাল।
সি লোকটা আবার কে?
তা আমি জানি না। তবে শুনেছি, লোকটার নাকি বিশাল হাইট!
কতটা হাইট? ছ'ফুট কি সাত ফুট হবেক হয়তো।
লা লা, সে হাইট লয়, সেই হাইট লয়। এ হল অন্য হাইট। লোকটার নাকি বিশাল ব্যাপার স্যাপার। পুলিশ দারগা থেকে আরম্ভ করে সুবাই নাকি ওকে ডর করে।
দিগু ডর শুনে লাফিয়ে উঠল। মাটিতে ধপ ধপ করে হাত চাপড়াতে থাকল। বলল, ডর খাবেক তো, ডর খাবারই কথা তো, দেখতে তো হবেক, কেমন ছেলের সঙ্গে মিশে লোকটা। আমার উজান তো আর যা তা ছেলে নয়। রীতিমতো সৎজন বটে। এমনি এমনি কি লিকা-পুড়া শিকিয়ে মানুষ করেচি, এমনি এমনি কি আর দূর দ্যাশে গেচে!
মাইতুড়ি দিগুর কথা ঢোক গিলল।
দিগু বলল, লোকটা ক'দিন ঘরে থাকবেন?
মাইতুড়ি দিগুর কথায় রেগে গেল। বলল, তুমার ঘর কুথায়, যে ঘরে থাকবেক। খোঁকা সিবার আত করে বলল, একটা ঘর করে দিয়ে যাই, তুমি শুনলে?
না শুনি নাই। কেনে শুনি নাই জানিস?
কী করে জানব?
দালান ঘর করত, দা-লা-ন!
করত বা।
করত বা! দালান ঘর মানে জানিস?
না।
পুড়া মাটির ঘর। উ ঘরের কোন জাত আচে।
কেন নাই?
মাটি পুড়িয়ে পুড়িয়ে ইট। বন্ধা মাটি। মাকে খুন করাও যা, আর মাটিকে পুড়ানোও তাই।
একই পাপ। ওই পাপ মাটিতে আমি থাকব ভেবেচিস?
সে তুমি না থাকলে না থাকলে, ঘরটা তো চাবি দেওয়া পড়ে থাকত। কেউ এলে শুতে তো দেওয়া যেত।
সে আমি মল্লে পর শুতে দিবি...।
মাইতুড়ি খস করে দিগুর মুখটা চেপে ধরল। আর ডুকরে কেঁদে উঠল। বলল, অমন কথা বল না খোঁকার বাপ। বলতে নাই। তুমি বরং আশীর্বাদ কর, আমি যেন তুমার কোলে মাথা রেখে যেতে পারি।
দিগু রেগে গেল। ধমকে উঠল। বলল, আশীর্বাদ টাশির্বাদ নয়, যার যখন যাবার সময় হবেক, আপসেই যাবেক। ই তো আর কারু বাঁধ ধরা জিনিস লয়। দিগু মাইতুড়ির কোলে মুখটা গুঁজে দিল। যেন ছোটো ছেলে, শিশু যেন!
শিশুটা মাইতুড়ির কোলে মুখটা হাঁ করে বার করল না। লাল বাম চোখটা ভুরুর থেকে চেড়ে বার করল। বলল, তুর বুক থেকে একবার মাইটা বার কর দিকি। মাই টিপে মেনা বার করে, আমার চোকে লাগিয়ে দে। বড় জ্বালা করচে চোকটা!
মাইতুড়ি বুকের বোতাম খুলে, 'মাই' টিপে 'মেনা' বার করছে। 'মেনা' কি বার হচ্ছে? 'মেনা' বেরচ্ছে কি বেরচ্ছে না, জানা গেল না। শুধু এইটুকু জানা গেল, মাইতুড়ি 'মাই' টিপছে। আর দিগু লাল বাম চোখটা নিয়ে তাকিয়ে আছে মাইতুড়ির বুকের দিকে।
আজ দিগুদের গ্রামটা নতুন সাজে সেজে উঠেছে। কেন সাজবে না, আজ গ্রামে এই প্রথম রাজ্যপাল আসছেন যে। হাইস্কুলটার পঞ্চাশ বছর পূর্তি অনুষ্ঠান কি না। এই অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হয়ে আসছেন স্বয়ং রাজ্যপাল। এ কি আর কম কথা। তবে সবটাই সম্ভব হয়েছে উজানের জন্য। উজান না থাকলে কি সম্ভব হত।
উজানও তো কম কিছু নয়। কত দূরে থাকে উজান! সেই সাত সমুদ্র তেরো নদীর পারে। সেখানে নাকি সুইজারল্যান্ড বলে কোনো এক দেশ আছে। সে দেশের সাতাশ কিলোমিটার মাটির গভীরে একটা সুড়ঙ্গ কেটেছে। সেই সুড়ঙ্গে প্রোটন কণা ছেড়ে দিয়েছে বিস্তর। প্রোটনকণাগুলো গতিময় হয়ে উঠেছে, তীব্র গতিময়।
উজান সুইজারল্যান্ড গেছে ঈশ্বরকণার সন্ধানে। সেই উজান, সুইজারল্যান্ড থেকে উড়ে আসছে রাজভবনে। পুরো রাজভবনটাকে তুলে আনছে গ্রামে। এ কি সহজ ব্যাপার! সহজ ব্যাপার নয় বলেই তো, সরকার প্রশাসন থেকে শুরু করে, প্রতিটি মানুষ খুব ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। রাস্তার মোড়ে মোড়ে মানুষের ঢল নেমেছে প্রচুর। কলসি কাঁখে মেয়েরা, বউ-ঝিরা রাস্তায় নেমেছে। ছোটো ছোটো ছেলেরা ফুল হাতে। শিশুরা মায়ের কোলে বুক খুঁটছে। আর যারা বুড়োহাবড়া, তারা রাস্তার ঠিক মাঝখানটিতে দাঁড়িয়ে, সরে যা, সরে দাঁড়া, সরে দাঁড়া করছে।
তাহলে দিগুও কি বুড়োহাবড়ার দলে মিশে, রাস্তার মাঝখানটিতে দাঁড়িয়ে, এর তার বুক ধরে ঠিলে দিয়ে, সরে যা, সরে দাঁড়া, সরে দাঁড়া করছে নাকি! খেপেছ, তাই কি কখনো হয়! ও যে পাতিচাষা! ও তো আর রাজ্যপাল চিনে না। চিনার মধ্যে চিনে আশু পালকে। আশু পাল লোকটা তো আর কম ভারী নয়! ইয়া মোটা মতো লোকটা যখন কাঁধে ব্যাগ, আর ব্যাগের ভিতর চেন, আর হতের মুঠোর মধ্যে ম্যাপ ধরে, গদাস গদাস পায়ে মাঠের এল ধরে হাঁটে, পুরো এলাকাটাই ধ্বসে যায় তখন।
ন্যাংটো ছা'গুলো তখন ক্যানেলের পাড়ে ছাগল চরাতে চরাতে, হাঁক পেড়ে বুড়োকে নিয়ে 'লগড়' করে, হাতি তোর গদা পা/ চিংড়ি মাছের মাথা খা...।
আশু পাল চিংড়ি মাছের মাথা খায় না। গোদা পায়ে দিগুর সামেন এসে দাঁড়ায়। পকেটে হাত ভরে বিড়ির তাড়া বার করে বিড়ি ধরায়। তারপর সুখটান দিতে দিতে বলে, বেলা হয়ে গেল, আসছি ভাই দিগু, আসছি-আসছি...।
কিন্তু রাজ্যপাল? তিনি তো আর আশু পাল নন, সে মাঠের মোটা মোটা এল ধসিয়ে দিয়ে, এর তার জমি জায়গা জরিপ করে, হাত নেড়ে নেড়ে বলবেন, আসছি, আসছি ভাই দিগু, আসছি আসছি করবেন। তবে নেহাত যদি খেয়ালখুশিতে পড়ে, মনের আনন্দে রাজভবনটা জমিতে এনে পতিত করেন! তিনি যদি একবার, একটিবারের জন্য মাঠ দিয়ে ঘুরতে বার হন! তাহলে ব্যাপারটা আলাদা দাঁড়ায় না কি!
সেই আলাদা ব্যাপারটা মাথায় এনে, খুব ভোর ভোর মাঠে চলে এসেছে দিগু। কিন্তু রাজ্যপাল খেয়ালখুশিতে পড়লেন না। আর রাজভবনটাও দিগুভুঁই এর জমিতে এল না। না এসে স্কুলের কাজকর্ম সেরে সোজা রাজ্যপাল ফিরে চলে গেলেন। উজান ফিরিয়ে দিয়ে এল খানিকটা রাস্তা।
ফিরে এসে ঘর ঢুকেছে, আর ভোঁ! ঘরে মা আছে, বাবা নেই! সেই মানে! এও কি হয়! গ্রামে এতবড়ো একটা কাণ্ড ঘটে গেল, অথচ বাবা নেই! বাবার চাষটাই সব! উজান বিরক্ত, বিরক্ত, বিরক্ত।
বিরক্ত হয়েই ঘর থেকে বেরিয়ে এল। গায়ে জামা টামা না পরে, পায়ে জুতো চটি না দিয়ে, একদম খালি পায়ে, খালি গায়ে। হন হন হাঁটছে উজান। ঘরের এক চিলতে উঠান পেরিয়ে সরু কাঁচা রাস্তা। কাঁচা রাস্তার পর মোরাম রাস্তা। মেরাম রাস্তার ডান দিয়ে বেঁকে গেলে, অশ্বত্থ গাছ। অশত্থ গাছের শিকড় ধরে নেমে গেলে গোড়েন। গোড়েনের পর নারাঙ্গা। নারাঙ্গার পর নামোবাড়ি। নামোবাড়ি মানে নিচু মাঠ। নিচু মাঠে জল নেই, কাদা নেই, মাটি শুকিয়ে গেছে। শুকনো মাটিতে গোরুর 'পাজ্ঞ', মানে, গোরুর পায়ের খুরের মাটি শুকিয়ে ধার ব্লেড হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে। সেই ব্লেডের উপর দিয়ে হাঁটছে উজান। ফলে পায়ে রক্ত বার হচ্ছে। তা হোক। তবুও ওকে ওর বাবার কাছে যেতে হবে। কতদিন দেখেনি বাবাকে। বাবাকে দেখার জন্য ওর মনটা ছটফট করছে।
নমোবাড়ির পর সরু বোদাই নদী। নদীতে জল নেই। সাদা সাদা বালিগুলো মরে পড়ে আছে। মরা বালির উপর রোদ পড়ছে। ফলে বালি তেতে আগুন। ধোঁয়া বার হচ্ছে। সেই ধোঁয়ার উপর হাঁটছে উজান। ফলে পা পুড়ে যাচ্ছে। তা পুড়ুক। বালির পর এল রাস্তা। এলে ঘাস জন্মেছে প্রচুর। পাতি ঘাস। পাতি ঘাসের দু'পাশ করাতের মতো ধার। এতে ওর পা কেটে কেটে যাচ্ছে তা কাটুক।
এল রাস্তার পর বড়ো বাগান। বড়ো বাগানে অর্জুন আর আমগাছ। মাটিতে তাদের বড়ো বড়ো ছায়া পড়েছে। সেই ছায়াতে ঢুকে গেল উজান। আর তখনই ওর প্রাণটা ফিরে এল। এতক্ষণে মনে হচ্ছে, আপনার প্রাণ!
বড়ো বাগান শেষ হলেই পায়রাচরের মাঠ। পায়রাচরে পায়রা চরছে। একটা নয়, দুটো নয়, অনেক অনেক! এত পায়রা থাকে কোথায়? দেশে এত পায়রা আছে!
উজান মাঠের এল বরাবর হাঁটছে। উজানের হাঁটার দরুন, এল বা এলের পাশে চরতে থাকা পায়রাগুলো অন্যত্র সরে সরে বসছে। অন্যত্র সরার সময় কেমন ফট ফট শব্দ হচ্ছে ডানার। পায়রাগুলো মনের আনন্দে বকম বকম করছে। উজানের বকম বকম রব শুনতে ভালো লাগছে। কতদিন শোনেনি এমন রব!
বকম বকম শুনতে শুনতে মাঠের পুকুরে পৌঁছে গেল উজান। মাঠের পুকুরের পাশে কুয়োতলা। 'কুয়োতলার সরু বালি পায়রা গম গম করে গো/ পায়রা নয়, মা, পাখি নয় মা, তুসু খেলা করে গো।'
ন্না না, তুসু খেলছে না, তুসু খেলছে না, উজানের বাপ খেলছে। সত্যিই কি উজানের বাপ খেলছে? দূর, ওর রখেলার মতো সময় কোথা! ও তো একটা চাষা। চাষার কি খেলার মতো সময় থাকে! বরঞ্চ সময় সুযোগ হলে, কোদালের চোট পাড়ে। সেই কোদালের চোট পাড়ছে দিগু। কেমন মাটিতে ভসভস শব্দ হচ্ছে! আহা কি সুর! সুর নয়, সুর নয়, সুরের মূর্ছনা! উজান কান পেতে কোদালের সুর শুনছে।
কিন্তু বাবা কোদালের সুর তুলে কী করছে? বাবা কি মাটির তলে সুড়ঙ্গ কাটছে! বলা তো যায় না। যা বাতিক ওঠা লোক বাবা। মাথায় একবার কোন বাতিক উঠলেই হল। সঙ্গে সঙ্গে সেই কাজটা করে তবে দম।
উজান কুয়োতলে বসে বসে বাবার বাতিকের ঢেকুর তুলছে। বাবা পরনের কাছাটা 'কমলি খেঁচে' পরেছে। নিতম্বের মাংসপেশি ঠাই ঠাই চোখে ঠেকছে। দূর ছাই, মাংসপেশি কোথায়! সবই তো হাড়! শুকনো শুকনো হাড়গুলো ঠাই ঠাই চোখে ঠেকছে। আর হাড়ের ওপরে যে কালো মাজা, সেই মাজাটাই বারবার চোখে এসে ধাক্কা মারছে।
কিন্তু বাবা সুড়ঙ্গটা কত দূর কাটবে? মাটির তলে সাতাশ কিলোমটার পর্যন্ত নাকি!
দিগু ধম করে বসে গেল। বসে বসে কি করছে বাবা? মুরগির মতো হাতে করে মাটি ইচারছে যে। মাটি ইচারা হল, আঙ্গুল দিয়ে মাটি পরিষ্কার করা।
দিগু আবার এক লহমায় উঠে দাঁড়াল। দাঁড়াতেই কাছাতে হাত চলে গেল। কাছার খুঁটে গিঁট বাঁধা আছে। গিঁট খুলছে দিগু। গিঁটে কী বাঁধা আছে? প্রোটনকণা কি! কি জানি, হবে হয়তো!
দিগু কাছার গিঁট খুলে মুঠো ভরতি করল। মুঠো মুঠো কী যেন ছড়াচ্ছে। তাহলে বীজ ছড়াচ্ছে দিগু। সেই বীজ থেকে সোনা ফলবে।
দিগু কেবল বীজই ছড়াচ্ছে না, সুর করে মন্ত্রও আওড়াচ্ছে। উজান কান খাড়া করল। সহস্রের মুখে পড়ুক, সহস্রের মুখে পড়ুক, সহস্রের মুখে...।
উজানের চোখ মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সুইজারল্যান্ডের পরীক্ষাগারটি কোন নিয়মে উঠে এল দিগুভুঁই এর জমিতে!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন