মুখে ভাত

জয়দেব দত্ত

বুড়ো শ্যামাচরণ। না না, শ্যামাচরণও নয়, বামাচরণও নয়। এ হল বি ডি ও। গাঁ শুদ্ধ লোক, শ্যামাচরণ পাল্টে, বিডিও বলে ডাকে। মানে, সমষ্টি উন্নয়ন আধিকারিক। হ্যাঁ, সমষ্টি উন্নয়ন আধিকারিকই তো। কী উন্নতি হয়নি বিডিওর আমলে। গাঁ গঞ্জে ওলিগলি থেকে 'আদি' করে পুকুর-ডোবা, খামার খোলা, রাস্তাঘাট, নালানর্দমা, সারকুড়, উঠান, উঠানের তুলসীতলা, আমতলা, বেলতলা এমনকি শ্মশান ঘাট পর্যন্ত সব পরিস্কার ধবধবে।

কিন্তু আগে কী ছিল গ্রামের অবস্থা। না ছিল কোনো রাস্তা, না ছিল কোনো ঘাট। রাস্তা বলতে আকাশে রকেট চললে যেমন রকেটের পেছনে একটা সরু সাদা মতো দাগ পড়ে, তেমনি একটা একফালি 'চিক' দেওয়া থাকত মাটিতে। বর্ষাকালে কে যায় 'চিক' রাস্তায়। আকাশের জল পেয়ে ফেঁপে ফেঁপে এক হাঁটু কাদা তখন। আর 'ধরনে' মানে। গ্রীষ্মকালে গরুর পায়ে 'খুরে' মাটি উঠে, মাটি শুকিয়ে তাঁত। ছুরি হয়ে হাঁ মুখ। কুল আটি পা যে লোকের সে তো ঐ রাস্তার নাম শুনলেই চমকে ওঠে। তখন তো আর জুতো চটির 'চল' ছিল না। যদি বা ছিল, সে শহরের বাবুদের। গাঁ গঞ্জের হা-ভাতে মানুষরা শখ স্বাদ করে, বড়জোর 'তালঘোঙা' পরত পায়ে। মানে তালপাতার চওড়া 'বেগড়ো'টা পায়ের মাপে কেটে, তাতে দড়ি 'সাঁদ করে', মানে, পরিয়ে পায়ে পরত। কিন্তু সে আর ক'জন। কিম্বা কতক্ষণ। মানুষজনকে খালি পায়েই হাঁটতে হত। একটু অসতর্ক হয়ে হেঁটেছে তো 'হুটুর' খেয়ে, পায়ের নখ উড়ে গেছে! রাস্তা তখন রক্তে 'পয়ান্যাল'!

অবশ্য নিত্যদিন হাঁটাচলা করার জন্য একটা বাইপাশ রাস্তা থাকত। সেই বাইপাশটা হল মাঠের 'এল রাস্তা'। মাঠের 'পগার' ধরে হাঁটত তখন। 'পগার' অর্থাৎ মাঠের চওড়া এল। 'এল রাস্তা' ধরে হেঁটে হেঁটে ভক্তিবুড়ো-র নুন তেলের দোকান যেত। আবার 'এল রাস্তা' ধরেই, পালদের ঘরের 'মাঝদুরন' হয়ে, অর্থাৎ কিনা, পালদের ঘরের মাঝরাস্তা ধরে, সোজা ক্যানেলে উঠত। ক্যানেলে উঠে, ক্যানেলের পাড় বরাবর হেঁটে, ইস্কুল যেত। এই ছিল তখন গ্রামের রাস্তা ঘাট।

গ্রামে কারু 'ভেদবমি' বা 'রসতড়কা' হলে, কোনো ডাক্তার বদ্দি তো দূর অস্ত, একটা কাঠবিড়ালি পর্যন্ত লেজ নাড়তে নাড়তে আসত না। আসার মধ্যে আসত সেই হাবু ডাক্তার। তখন তো ওদের জমিদারি ছিল। এ অঞ্চলের লোকেরা ওদের জমি চাষ করে খেত। তা ছাড়া কার নিজের বাপুতি জমি ছিল শুনি। সব ওদের, সব ওনাদের।

সেই হাবু ডাক্তার কল পেয়ে যখন আসত, গায়ে একটা আর্দির পাঞ্জাবি আর পায়ে নাগরা জুতো পরে, তখন গাঁয়ের লোক সব বেরিয়ে যেত হাবু ডাক্তারকে দেখতে। কিন্তু হাবু ডাক্তারকে দেখা কি অত সোজা। রাস্তা যে 'বাধ' হয়ে আছে। মানে, বাধা। হাবুডাক্তার তো আর মটর বাইকে আসছে না। মটর বাইক আসার মতো রাস্তা কোথায়! ফলে হেঁটে হেঁটেই আসতে হত তাকে।

আর গরু বাগাল সুধন, যে কিনা প্রতি হাটবারে হাটবারে, এত তার গরু নিয়ে হাটে যায়, সেই সুধন ডাক্তারের চামড়ার ব্যাগটা হাতে করে বয়ে ডাক্তারের পেছন পেছন। ডাক্তার তাড়াহুড়ো হাঁটতে গিয়ে, একেবারে সরাসরি রাস্তায় কাদার 'গব্বলে'। ডাক্তার তখন এক হাঁটু কাদাতে। তখন তো ক্রেন ছিল না ফলে সুধনকেই হাত লাগিয়ে ডাক্তারকে টেনে তুলতে হত। গা হাতের কাদা ধুয়ে ডাক্তার যখন রুগীর হাত দেখত, রুগী তখন ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। ফলের গাঁময়, বাখুলময় শুধু কান্নার রোল শোনা যেত।

দুই

এখন সেই সব কান্না টান্না নেই। সব পাল্টে গেছে। তিনজন ডাক্তার হয়েছে গ্রামে। আর দুজন হব হব করছে। যারা হব হব করছে, তাদেরকে এখন তালিকায় আনছি না। যে তিনজন ডাক্তার হয়ে গেছে, তাদের মধ্যে একজন বাগ্দীদের ফুচি। সে এখন রাজস্থানে ডাক্তারী করতে গেছে।

ফুচি ভেটেনারী। মানে পশু চিকিৎসক। আর পশু চিকিৎসক হবে না কেন। ওর গা দিয়ে যে এখনো ছাগলের গন্ধ বের হয়। ওর আঁতুড় ঘরটা ছাগলের গোহাল ঘরে হয়ে ছিল কিনা। ছাগলের মুত আর লেদাড়ি লেগে লেগে ওর চামড়াটা ভেপে গেছে। তাই ছাগল ছাগল গন্ধ বার হয় ওর গা দিয়ে।

ফুচি হবার সময় খুব ছোট হয়েছিল। এত ছোট যে মানুষের ছা বোঝা দায়। এত ছোট মানুষের ছা হয়! হয় না, তবু হয়েছিল। মাত্র সাতশো পঞ্চাশ গ্রাম। তাও মাছ ওজনের দাঁড়ি পাল্লায় ওজন হয়েছিল। একটু অসতর্ক হয়ে কোলে নিলেই, তল দিকে, ফুচ! সেই থেকে ফুচি হয়ে গেল ছেলেটা। কিন্তু এখন আর কেউ ফুচি বলে ডাকে না। ডাকবার সাহস কোথায়। সে তো এখন ডাক্তার। বলা তো যায় না, কখন কার ওকে দরকার পড়বে। কার গোহালের গরু বাছুর কখন কি অবস্থায় থাকে। তখন যদি ওকে ডাক দিতে হয়। তাই ফুচি এখন স্বরূপ হয়ে গেছে। স্বরূপ ডাক্তার।

এই যেমন নব'দের পোড়া। মানে, নিবারণ ঘোষের ছেলে, পোড়া। পুড়ে না গেলে কেউ কি আর পোড়া হয়। ছোটবেলায় হামা টানতে টানতে, ধান সেদ্ধ উনানে মাথাটা গুঁজে দিয়েছিল। সে থেকে পোড়া।

কিন্তু এখন কেউ কি আর পোড়া নামে ডাকে। ও যে এখন গ্রামের ফ্রি প্রাইমারি ইস্কুলের হেডমাস্টার। তার উপর ডবল এম এ। সে এখন শ্রী শ্রী শশিকান্ত ঘোষ হয়ে গেছে। যে ছেলেটার সর্দি কোনদিন ছাড়ত না। নাক দিয়ে সবসময় ভ্যাল ভ্যাল বেরত। আর জিভ দিয়ে চেটে খেত। সে এখন 'কালবৈগুন্যে', মানে, কালের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পোড়া থেকে শশিকান্ত হয়ে গেল। পাল্টে গেল। মানুষজন, দিনকাল পাল্টে গেল।

তিন

এখনো যে পালটায়নি, সে হল বিডিও। বিডিও এখনও ছাগলের গলা থেকে দড়ি খুলে, রোজ গোঠে নিয়ে যায় এই যেমন আজও যাচ্ছে। একটা নয়, দুটো নয়, এক পাল ছাগল। সেই 'ডাকপুরুষের' কথায় আছে না, মানে পূর্বপুরুষের কথায় আছে, যদি শোধতে চাস বাপুতি ঋণ, তবে বুড়ো দেখে ছাগল কিন। ব্যাপারটা হয়েছে তাই। তবে বি ডি ও বুড়ো দেখে ছাগল কিনেনি। একটা ছোট ছাগল ছা 'পালেভাগে' নিয়ে ছিল। অর্থাৎ কোনো এক গৃহস্থ থেকে, একটা ছোট ছাগল নিয়ে ছিল লালন পালন করবার জন্য। শর্ত হিসাবে ছিল, ঐ ছাগলের বাচ্ছা হলে মা-সহ অর্ধেক ছা ফেরৎ দিতে হবে পূর্বের গৃহস্থকে। হয়েছিলও তাই। প্রথম বিয়ানীতেই কিস্তিমাত। পর পর চারটে ছা হয়েছিল ছাগলটির। শর্ত মতো দুটি ভাগ পায় বিডি ও। একটা পাঁঠা, আর একটা পাঁঠি। সেই একটা পাঁঠা আর একটি পাঁঠি থেকে আজ এতগুলি!

এতগুলো কি, এতগুলো কি! আর যেগুলো ফুচির পড়ার দায়ে বিক্রি হয়ে গেছে! ফুচি কি আর এমনি এমনি ডাক্তার হয়ে গেছে। ওর দাদু না ছাগল বিক্রি করলে। ছাগল বিক্রি করেই তো ওর দাদু ওকে মানুষ করল। না হলে বাপুতি জমি ছিল নাকি, যে বিক্রি বাটা করে পড়াবে। সব ছাগলের দৌলতে। এতবড় সংসারটি তো ছাগলের জন্যই চলছে। আর সংসার তো নয়, একটা মাল ভর্তি ছোট-খাট নৌকো যেন। হাওয়ার বেগে তির তির করে কাঁপছে।

পুরো রাস্তা জুড়ে চলছে ছাগলগুলো। চলতে চলতে কখনো সখনো এক জায়গায় 'চাং' বেঁধে যাচ্ছে। আর যখন 'চাং' বেঁধে যাচ্ছে, তখন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকছে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এ একে ঠেলছে এদিকে, তা ও ওকে ঠেলছে ওদিকে। তখন তো আর বিডিও ওদের ঠেলা ঠেলির মজা দেখছে না। বরঞ্চ হাতের ফপরা বাঁশের খ্যাংরা ঠেঙাটা, মাটিতে ঠক ঠক ঠুকে, ঘ্যাং ঘ্যাং শব্দ বার করছে। আর সেই শব্দ শুনে ছাগলগুলো ভয়ে ময়ে 'বিবাল বেঁধে' দৌড়চ্ছে। দৌড়াতে দৌড়াতে পালের বুড়ো ধাড়টা ক্রমশ পেছনে পড়ে যাচ্ছে। এই পেছনে পড়ে যাওয়ার যথেষ্ট কারণও রয়েছে। ওর দুধের বাঁটগুলো তো খুব বড় হয়ে গেছে। একদম মাটিতে ঠেকছে। তাই ফট ফট শব্দ হচ্ছে। দুধের বাঁটে বাঁটে ঠোকাঠুকি হচ্ছে। তখন আর চলতে পারছে না। বিডিও কোলে তুলে নিল ধাড়টাকে। গায়ে মাথায় হাত বুলাতে থাকল। আহা, আমার পয়মন্তর ধাড়রে! পয়মন্তর ধাড়!

বিডিও জানে, ধাড়টার বয়স কম নয়। সে ওর মতোই বুড়ে হয়ে গেছে। আর এও জেনে গেছে, ধাড়টা মরবে না। কেন মরবে? মানুষ তো এখন মরণশীলতা জয় করে ফেলেছে। যে একবার জন্মাচ্ছে, মরছে না। চিরকাল বেঁচে বর্তে থাকছে। এ সব হয়েছে বিডিওর আমলে। বিডিওর নিজের বয়সটা তো আর কম হল না। ভাঙ্গা মাসটা গোটা হলে, পুরো একশোটা বছর পূর্ণ হবে। এ কম কথা কি!

বিডিও ধাড়টাকে কোলে নিয়ে টুকটুক হাঁটছে। কিন্তু কোথাও ধুলো মুলো উড়ছে না। কী করে উড়বে, এ রাস্তা তো ধুলো রাস্তা নয়। এ হল ঝাঁ চকচকে পিচ রাস্তা। পিচের দৌলতে ধুলো মুলো সব সাফ-সুরৎ হয়ে গেছে। একেই বলে, উন্নয়ন! দেশে উন্নয়নের হাওয়া লেগেছে।

পিচ রাস্তায় ছাগল চলার খট খট শব্দ যাচ্ছে। যেন রাস্তা দিয়ে শত সহস্র ঘোড়া ছুটছে। দিগজয়ী ঘোড়া। হ্যাঁ, ছাগলগুলো তো দিগজয় করছে। না হলে দেশে এত উন্নয়নের হাওয়া কেন!

বিডিও কারকডাঙ্গায় এসে, কোলের ধাড়টাকে ছেড়ে দিল। এই ধাড়টা ছাড়া পেয়ে, দুধের বাঁটের ফটফট শব্দ তুলে ছাগল পালে মিশে গেল।

আর বিডিও তড়বড় করে বটগাছে উঠে গেল। গাছ বলে, গাছ, যার ডালপালাগুলো গোটা কারকডাঙ্গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। ঝুরি নেমে নেমে, এক একটা কাণ্ড হয়ে গেছে। আসল কাণ্ডটা আজ খুঁজে পাওয়া যায় না। আসলে নকলে মিশে একাকার।

বটগাছের 'তেরছা' পড়ছে বিডিওর টাঁকে। আর টাঁক তো খুব। সেই বলে না, ছাদেতে লোক নেই, বাম্পারে ঝুলছে। বিডিওর হয়েছে তাই। পুরো ছাদটা একদম ফাঁকা, ক'জন মাত্র ঘাড়ে ঝুলছে। ফলে টাকে রোদের তেরছা পড়ছে। টাঁক জ্বলে আগুন।

বিডিও কোমরের গামছাটা টাঁকে চূড়া বেঁধে নিল। 'মাথায় চূড়া দে মা বেঁধে, হাতেমুরলি...' আর মুরলির তো খুব। ফপরা বাঁশের খ্যাংরা ঠেঙাটা, কাঁধের দুপাশে ফেলে, বিডিও মুখে ফুঁক দিচ্ছে। ফুঁক দিয়ে বাঁশি বাজাচ্ছে, এ বাঁশি বাজে না কেন, আর যেন সই না। সত্যিই বিডিওর বাঁশি বাজছে না। তাই ওর জ্বালা সইছে না। কী করে সইবো, ওর মন যে রাধা রাধা করছে। রাধা কি ওর বাঁশি শুনে আসছে। দুর, রাধা আসবে কেন, এটা কি যমুনা, যে বাঁশি শুনে রাধা জলকে যাবে। এটা তো কারকডাঙ্গা। কারকডাঙ্গায় কি রাধা আসে। কারকডাঙ্গায় বাঁশি শুনে, হয়তো দশ বিশজন রাখাল বালক আসতে পারে। সেই ঘাড়ে লম্বা চুল, হাতে বাঁশি রাখাল।

কিন্তু এখন কি রাখাল বালক চোখে দেখা যায়। রাখাল বালক কোথায়, কয়েকটা গরু বাগাল হয়তো চোখে পড়ে। তাও এখন আর কেউ গরু চরাতে আসছে না। না এসে, মিড ডে মিলের ভাত খাচ্ছে। বললাম না, পরিবর্তন, পরিবর্তন। দেশে পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে।

চার

না, কেউ মরছে না। যে একবার জন্ম নিচ্ছে, বেঁচে থাকছে চিরকাল। বিডিও দু'হাত তুলে লাফাচ্ছে, বেঁচে থাকার কী আনন্দ, কী আনন্দ। সত্যিই তো, বিডিও নয় নয় করে, একশোটা বছর বেঁচে গেল। তাই গ্রামের বুড়ো হাবড়া থেকে 'আদি' করে, জোয়ান মদ্দজোয়ান, এমন কি মহিলারা পর্যন্ত গ্রাম ষোলআনায় মিটিং করে, বিডিওর মুখেভাতের দিন ঠিক করে ফেলেছে।

তাই রাতভোর থেকে, দূর দূরান্ত গ্রাম থেকে লোক আসতে শুরু করে দিয়েছে। কুটুম, কুটুম্বের কুটুম কেউ বাদ যাচ্ছে না।

যারা কাছের মানুষ, তারা হাঁটা পথেই হেঁটে হেঁটে আসছে।

যারা খোঁড়া ভাংড়ো, তারা ল্যাংচে ল্যাংচে আসছে। আর যারা একেবারেই অচল, তারা কারু পিঠের উপর ভর করে, 'হিয়াখলসায়' দুলতে দুলতে আসছে। আর যারা দূরের মানুষ, তারা হয় মটর সাইকেলে, নয়তো 'ছোটহাতি' গাড়ি ভাড়া করে, উড়ে আসছে।

মানুষজন যত না মুখে কথা বলছে, তার থেকেও কানে কানে কথা বলছে বেশি। হ্যাঁ, হ্যালো হ্যালো...

হ্যালো।... কুথায় আসচিস তুই?

আসচিস কিরে, এসে গেচি। এই তো তোদের জুনিয়ার ইস্কুলটার কাচে...। হ্যাঁ, ইস্কুলটাতেই নেমে যা। নেমে দেখ, সামনে একটা টিপকল আচে, টিপকলটা টিপে হাত পা ধুয়ে নিয়ে, বই খাতা খুলে বসে বসে পড়। বুঝতেই তো পারচিস, ঘরে জায়গার অভাব।

হ্যাঁ, সে বুঝতে পারচি নাই। ঘরে জায়গার তো অভাব হবেক, কত লোক। আমার কতা ভাবিস না, আমি ঠিক ম্যানেজ করে নুব।

হ্যাঁ, তাই নিস, তাই নিস ভাই। তাই নিস বোন। ইস্কুলটা ভর্ত্তি হয়ে গেলে, গোডাউনটা তো ফাঁকা রয়েছে...। হ্যাঁ, হ্যাঁ... ওকে, ওকে-কে—কে-এ।

আমতলা, বেলতলা সব জায়গায় মোবাইলের রিং টোন বাজছে, ও টুনির মা, তোমার টুনি কথা শুনে না। দিনে রাতে মিসকল মারে ফোন করে না...।

বিডিও ওর বুড়ো ধাড়-ছাগলটাও টুনির মায়ের গান শুনছে। শুনতে শুনতে কানে গুজে নিল মোবাইলটা। হ্যাঁ হ্যাঁ, বেশ আচি, ভাল আচি, বহাল তবিয়তে আচি। কেনে থাকব নাই বলত। দেকচিস নাই, আমার মুনিব একশোটা বছর জিন্দা থেকে কেমন মুখে ভাত খাচ্ছে। আমরাও পাতপেড়ে ভাত খাব। তুই চলে আসতে পারিস।... আর জানিস তো ক'টা বছর পর আমারও মুখে ভাত হবেক। তখন তোরা আমার মুখে ভাত গুজে দিবি। কি আনন্দ, কি আনন্দ! বেঁচে থাকার কী আনন্দ! কলতলা থেকে, রান্নাশাল থেকে স্বরূপকে ফোন করছে, তুই আসচিস তো? আসচো তো? আসছেন তো? স্বরূপ ও প্রান্ত থেকে না বৈ হ্যাঁ বলছে না কখনোই।

সেই নিয়ে, নানা মুনির নানা জল্পনা। মুড়োপিসি অর্থাৎ মুড়োপাড়ায় যে মেয়েটার বিয়ে হয়েছে, সে তো রাগে আগুন। চোখে মুখে আগুন জ্বেলে, বলতে গেছে, প্রায় একপ্রকার জোর করেই, একজনের কান থেকে খুলে নিল মোবাইলটা। তারপর মুখগুঁজে বলল, স্বরূপ, স্ব-রূ-প-রে-এ...। দূর ঢেঁড়, টাওয়ারের প্রবলেম!

না পিসি, টাওয়ারের প্রবলেম নয়। আমি বেশ শুনতে পাচ্ছি। জানো আমি ফিস করলেই...।

হ্যাঁ, সে তো আমি জানি। তুই কত কানখড়কা, সে আমার জানা নাই আবার। বল, তুই আসছিস তো?

না পিসি, আমি যাচ্ছি নাই।

হ্যাঁ, তো আসবি কেনে? বুড়োদাদু, তোর কে? তোকে গু খেয়ে মুত খেয়ে মানুষ করেছে তো। মনে আচে, তুই যখন ছোট ছিলি, ফুচ করে গলে যেতিস। সেই নিয়ে দাদুর কত আদিখ্যাতা! তোকে কোলে নিয়ে আদর করত, নুনুতে চুমু খেত। সোনা আমার মানিক আমার বলত তোকে।

হ্যাঁ বলত তো, বেশ বলত, খুব বলত...।

বলত বলেই তো তু আসবি নাই। কেনে আসবি? তুই এখন বড়লোক হয়ে গেছিস। কত বড় বড় লোকের সঙ্গে মেলামেশা তোর। কত কী খাস। রাজভোগ খাস, সীতাভোগ খাস, ব্রিরিয়ানী খাস। আমাদের মোটা চালের ভাত, তুর বেতে রুচবেক কেন?

না পিসি, এখনো আমার মোটা চালের ভাত বেশ লাগে। কিন্তু কোথায় পাব? সব তো উচ্চফলনশীল। এখনও আউস চালের ভাত বেশ মনে পড়ে। কত মোটা ভাত! কত মোটা তার ফ্যান! সেই ফ্যানের সঙ্গে নুন ছড়িয়ে, ফ্যানভাত! আর তোমার হাতে শালপাতা দিয়ে মোড়া পনকাশাক। তার সঙ্গে মশলা মিশিয়ে, নুন ছড়িয়ে, পোয়ালের আগুনে সেঁকা, শাকপোড়া, তার স্বাদই আলাদা। এখনও সেই স্বাদ আমার মুখে লেগে আছে। আমি রোজ চেটে চেটে খাই।

হ্যাঁ, চেটে চেটে খাস বলেই তো তুই আসছিস নাই!

কেনে আসছি নাই জানো? তোমরা থাক গুর ছাগল নিয়ে। আর আমি থাকি উঁট নিয়ে। সেই লম্বাগলা, ঘাড়ে কুজ...।

জানি তো, উঁটের লম্বা গলা, ঘাড়ে কুজ। সেই লম্বা মতো জন্তুটার পিঠের উপর বসে থাকিস তুই। আমাদের মতো ছোটো ছোটো মানুষদের কাছে আসবি কেনে?

মুড়োপিসি রাগে কাঁদতে কাঁদতে মোবাইলটা বন্ধ করে দিল।

আর এদিকে হৈ হট্টগোল শুরু হয়ে গেল বিডিওর মাঝ উঠানে। বিডিওর মামাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। খুঁজ, খুঁজ! খুঁজ, খুঁজ তো! বিডিওর তিনকালে মামা থাকলে তবে তো খুঁজ। তিনকালের মামা বলে কেউ ছিলনি। যদি বা ছিল, সে মরে পচে হেজে গেছে এদিন।

তাহলে বিডিওর মামা কে হবে? সেই নিয়ে চলছে মিটিং। মিটিং-এ সভাপতির সম্মতিক্রমে ঠিক হল, মামা আর কেউ নয়, মামা হল, আমাদের ফ্রি প্রাইমারি ইস্কুলের প্রধান শিক্ষক—-শ্রী শ্রী পোড়া মাষ্টার, থুড়ি, পোড়ামাষ্টার নয়, শ্রী শ্রী শশিকান্ত ঘোষ মহাশয়, ডবল এম.এ.। কেননা শশিকান্ত তো আড়ালে আবডালে, কখনো সখনো বিডিওকে মামা বলে ডাকত। সেই মামা একন 'কালবৈগন্যে' অর্থাৎ কালের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে, ভাগ্নে হয়ে গেল এক ডাকে! তবে আর বলছি কি, পরিবর্তন, পরিবর্তন এসেছে সমাজে।

শশিকান্ত সোনার চামচ হাতে রেডি। দুর ছাই, সোনার চামচ কোথায়! ওটা তো পিতলের। কোন মানধাতা আমলে, ওর কোন পূর্বপুরুষ কড়িকাঠে রেখে গিয়েছিল চামচটা। সেই থেকে আর নড়চড় হয়নি। এই প্রথম নড়ল চামচটা। তাই জং ধরে গেছে ওর সর্ব্বঅঙ্গে। তাকে তেল শালপাতা দিয়ে, থ্যাকালে থুকুলে মেজে ঘষে ঝকঝকে। দেখলেই লোভ হয় চামচটার। এত ঝকঝক করছে।

বিডিও উঁই ঢিপি হয়ে বসে আছে মুখেভাতের আশায়। তবে এই উঁইঢিপি সেই উঁইঢিপি নয়, এ অন্য উঁইঢিপি। ঠিক যেন, বুড়ো শিবতলার, বুড়োশিব বসে আছে। তবে শিব ঠাকুরের মত পেটটা অতটা উঁচু নয়। খিদের চুঁই চাঁই করা, চুপসে যাওয়া পেট।

আর মাথাতেও জটা নেই। একবাহারি টাঁক আছে শুধু। টাঁক জুড়ে তেল চকচক করছে। গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ছে তেল। কেন পড়বে না, গ্রামের 'আইডিগরে' মেয়েগুলো কুলুর ঘানিতে বার কয়েক ডুবিয়ে এনেছে কি এমনি এমনি!

বিডিওর মাঝ উঠানটা লোকে লোকারণ্য। তিল ফেলার জায়গা পর্যন্ত নেই, তো পা ফেলা। গ্রামের 'আইডিগরে' মেয়েগুলো, নাতিনীগুলো কোন মতেই কাছ ছাড়া করছে না। সব গোল করে ঘিরে ধরে আছে। মুখে ভাত বলে কথা। কম অনুষ্ঠান কি!

বিডিওর মুখের সামনে এক থালা ভাত উড়ে এল। সাদা সাদা ভাত। বোধহয়, দেরাদুন চালের হবে।

দূর, দেরাদুন চালের হবে কেন। দেরাদুন তো অনেক দূরে। কাছে ভীতে আমতলার জমিটা আছে না। সেই জমিটাতে তো ধান লাগিয়ে ছিল। মিনিকেট চালের ভাত এল বিডিওর মুখের সামনে।

বিডিওর চোখ মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। আর ঠিক তখনই শশিকান্ত ভাত ভর্তি পিতলের চামচটা ঠেলে ভরে দিল বিডিওর মুখে।

এতক্ষণ স্বরূপ কোথায় ছিল, কে জানে, রি রি করে তেড়ে এল। এসেই যাত্রার ডায়ালগ মুখস্থ বলল, কোথায়, কো-থা-য় সেই হিড়ম্ব...। সভায় যারা সভাসদ ছিল, তারা কেউ কেউ স্বরূপের আকস্মিক আবির্ভাবে, ভয়ে ময়ে প্যান্টে মুতে দিল। কারণ এখন তো আর স্বরূপ স্বরূপ নয়, পুরোদস্তর ভীম সেজে গেছে। ভীম সেজে হিড়ম্বকে খুঁজছে।

ভীমের পদ ভারে নাকি কে জানে, উঠানে ঝড় উঠল। ঝড়ে মেয়েদের মাথার চুল উড়তে থাকল। ছেলেদের জামার কলার, পৎ পৎ ধাক্কা মারতে থাকল গা-গতরে।

তবে এ ভীম তো আর গদা হাতে ভীম নয়, এ ভীম এসেছে একটা খবরের কাগজ হাতে। কাগজটাকে গোল করে রোল পাকিয়ে ভীম সেজেছে।

মুড়োপিসি ভীম দেখে তো আনন্দে টগবগ। চোখের জল মুছতে মুছতে বলল, স্ব-রূ-প তু এ-লি-ই-ই।

আসব নাই, আসব নাই করে এল। সেই এল যখন, তখন গলায় একটা স্ট্যাথিস্কোপ ঝুলিয়ে আসবে কোথায় তা না, হাতে একটা খবরের কাগজ গোল করে রোল পাকিয়ে, একেবারে ভীম সেজে সকলকে তাক জাগিয়ে দিল! সারপ্রাইজ দিল সকল সভ্যগণকে। তারপর কখন যে ফুচ করে গলে গেল দাদুর কোলে, সে দেখা, আর কেউ দেখল না। সে না দেখুক, স্বরূপ যে দাদুর কোলে বসে, দাদুকে খবরের কাগজটাকে দেখাচ্ছে, সেটা সকলেই দেখতে পেলে। স্বরূপ বলল, দাদু দেখ দেখি, এটা কিসের ছবি?

বিডিও দেখছে খবরের কাগজটাকে। কাগজে একগাদা উঁটের ছবি। উঁটগুলো ঘুমচ্ছে। এমন ঘুম ঘুমুচ্চে, কোনোদিন জাগবে না আর!

স্বরূপ বলল, জানো তো দাদু, এইগুলো সব বিদেশি উঁট। সব বুড়ো হয়ে গেছে। বুড়ো হয়ে গেলে দিক হবে, এখন তো আর কেউ মরছে না। যে একবার জন্ম নিচ্ছে, সে বেঁচে থাকছে চিরকাল। ফলে বসে বসে অন্ন ধ্বংস হচ্ছে কেবল। কিন্তু উঁটের মালিকরা তার ধকল সইবে কেন? তখন তারা উঁটগুলোকে দ্বীপে ছেড়ে দিয়ে এল। কিন্তু উঁটগুলো তো দ্বীপে শুধু মুখে বসে ছিল না। তারা ফসল খেয়ে নষ্ট করছিল। তাই সে দেশের সরকার উঁটগুলোকে একযোগে গুলি করে মেরেছে।

বিডিও মুখের ভাতগুলো চিবল কি চিবল না, গিলল কি গিলল না, বোঝা গেল না। শুধু এটুকু বোঝা যাচ্ছে, বিডিও তাকিয়ে আছে মরা উঁটগুলোর দিকে। ওর চারপাশে যারা ওকে গোল করে ঘিরে ধরে আছে, তারা যেন কোন মানুষ নয়, এক একটা বন্দুক যেন। ওর দিকে তাক করা।

বিডিও টাঁক বেয়ে কুল কুল ঘাম ঝরছে। ঘামে চান করছে। তারপর কি মনে রে, হঠাৎ বিডিও খবরের কাগজটাকে টোকা মেরে উড়িয়ে দিল। তাচ্ছিল্যের সুরে হুংকার দিয়ে বলল, আরে রাক তুর গুলি! এই দেশটা তো আর বিদেশ নয়। এ হল ভারতবর্ষ। এখানে ভাতের পরিবর্তে কেউ কোনোদিন গুলি খেয়েছে কি!

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%