জয়দেব দত্ত
বাবনের সঙ্গে এখন আর কথা বলাবলি নেই। বাবন আমাকে কথার ছলে নির্জীব বলায়, আমার রাগ হয়েছে। সেই রাগের কথা আমি বাবনকে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছি।
সেই তখন থেকে বাবনের সঙ্গে আমার আর কোনো কথাবার্তা নেই। বাবন আমাকে নির্জীব না বলে অন্য কোনো আখ্যা দিতে পারতো। শুকোর, গাধা, গরু, ছাগল, নেংটি ইদুর কিম্বা গিরগিটি, টিকটিকি বললেও আমার রাগ হত না; কেননা এই গুলো আমাদের সমাজে অছ্যুৎ হলেও, মূল্য আছে। কেন না, এদের প্রাণ আছে। নিষ্প্রান তো নয়। তা না একেবারে সরাসরি নির্জীব! নির্জীব মানে তো প্রাণহীন। প্রাণহীন কোনো বস্তুর এ পৃথিবীতে কোনো অস্তিত্ব আছে কি? না। তার মানে আমি থেকেও নেই। বেঁচে-ও মরে থাকা! এমন সম্বোধনে কার না রাগ হয়? আমার রাগ হয়েছিল বিস্তর। মুখের সামনে কুকথা বলে দিয়ে ছিলাম বাবনকে। বাবন অবশ্য কিছু বলেনি । কেবল মিট মিট করে হেসে চলে গিয়েছিল। না ঠিক যাওয়া নয়, বেরিয়ে গিয়েছিল। আমি বার করে দিয়েছিলাম ঘর থেকে।
সেই থেকে বাবন আর আমার সঙ্গে কথা বলেনি। আমিও না। এমন কদর্য হীন সম্বোধনের উচিৎ টের পাওয়া ভাল। টেরও পেয়েছিল যথেষ্ট।
সেই বাবন আজ আর নেই। লরির তলে চাপা পড়েছে। খবরটা আমার স্ত্রী অনুভা দিয়েছিল। আমি কাজ থেকে ফিরতেই অনুভা হাইমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে আমাকে বলেছিল বাবন আর নেই। নেই মানে? কয়লা সমেত লরির তলে আটকে গেছে।
আমি অনুভাকে ছাড়িয়ে নিঃশ্বাস ফেললাম। রাস্তায় যা যানজট!
গোটা গ্রামের মানুষ হলবলিয়ে ছুটে এল। লরির থেকে উদ্ধার করা হল বাবনের নিঃষ্প্রাণ দেহটাকে। শ্মশানে দেহটাকে দাহ করা হল চুপ চাপ। পরের দিন বিকালে শোক মিছিল। অনুভা মনে করিয়ে দিল ফটোর কথা।
শুনে আমি আঁৎকে উঠি হ্যাঁ তাই তো! বাবনের ফটো কোথাও নেই।
বাবনের মা কাঁদতে কাঁদতে সেই কথা অনুভাকে বলেছে।
আজ বিকালে বাবনের একটা ফটোর দরকার। ফটোতে মালা পরাতে হবে তো। বাবনের মৃত ফটো কার্ত্তিক ঘনশ্যামরা মোবাইলে অনেক তুলেছে। কিন্তু তাতে বাবনের সম্পূর্ণ অবয়বটা আসেনি। কেন না, বাবন তো লরির চাকায় আটকে গেছে। ফলত গায়ের মাংস গায়ে ছিল না। গায়ে একফোঁটা রক্তই ছিল না তো মাংস। ফলত ঐ ফটো থেকে বাবনকে চেনা যায় না। এমন বিকৃত!
বিকৃত ফটোতে মালা দেওয়া যায় না। একটা সাবলীল ফটো চাই।
পাই কোথা, পাই কোথা করতে করতে আমার মোবাইল ঘাটি। হ্যাঁ, মোবাইলের ভেতর বাবনের একটা ছবি রয়েছে। বাবন হাসছে সেই ছবিতে। এই হাসি ভরা ছবি ভাল। তাতে ফুলের তোড়া মানায় বেশ। কম্পিউটারে ঢুকিয়ে বাবনের হাসিমুখ বার করলাম।
প্রথম শোক পালন-মৌন মিছিল। সারি সারি দাঁড়িয়ে লম্বা লাইন। গ্রামের ছেলে মেয়ে বুড়া-হাবড়া সকলে লাইনের উপর হামলে পড়েছে। অন্তরের ভালবাসা মৌন হাঁটা ভেতরে ঢেলে দিচ্ছে মৃত বাবনকে। আমি সবার আগে আগে বাবনের ফটো বুকে নিয়ে মনমরা হাঁটছি। রাস্তার পাশে চালাঘর থেকে যে এখনো লাইনে হাঁটতে পারেনি, সেই সুটসাট ঢুকে যাচ্ছে লাইনের ভেতরে। গোয়ালের গরু বাছুর, ছাগল-ভেড়া ডাঙ্গা ডহরে হাঁস-মুরগী, গিরগিটি, টিকটিকি ছুঁচো, ইঁদুর; জল ডোবা থেকে সাপ ব্যাঙ সব সুট সাট ঢুকে যাচ্ছে লাইনের ভেতর। লাইনটা বড় হচ্ছে। আরো বড়। বড় থেকে বড়তর।
আমাদের গ্রাম ষোলআনার ক্লাব ঘরে মিছিলটা শেষ হল। মৌন মিছিল শেষ করে শুরু হবে স্মৃতিচারণা। যার যা স্মৃতি, সব ঢেলে দিবে ক্লাব ঘরে। লম্বা লম্বা লাইন দিয়ে সব দাঁড়িয়ে আছে ক্লাব ঘর সংলগ্ন জায়গায়। সকলে কাঁদছে। হুস হাস শব্দ বেরিয়ে আসছে বুক থেকে। মনে হচ্ছে, আমাদের পুরো গ্রামটা পৃথিবীর মানচিত্র থেকে ছিটকে গেছে। গ্রামটা আর পৃথিবীর সঙ্গে জোড়া লেগে ঘুরছে না। থিতু হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে এক জায়গায়। সবার চোখের জল চুঁয়ে পড়ছে মাটিতে। মনে হচ্ছে, মাটিটাও কাঁদছে। মাটিটা ভিজে যাচ্ছে ক্রমশ।
আমি বুকের থেকে বাবনের ফটোটা টেবিলে দাঁড় করালাম। টেবিলে নামানো আছে ফুলে মালা। বাবনের ফটোতে পরাতে হবে। সকলে এক বাক্যে সায় দিল, মালাটা তুমিই পরাও অমুকদা। বাবন আমার বন্ধু। ঘনিষ্ট বন্ধু। হয়তো এই কদিন কথা না, এই যা, তাতে কী?
আমি ফুলের মালাটায় হাত দিলাম। টেবিলটা নড়ে গেল। বাবনের ফটোটাও। আচ্ছা, বাবনের ফটোটা কি প্রাণ পেল? ধুর, সে তো মরে গেছে! মরা ফটো নির্জীব! নির্জীবের পৃথিবীতে কোন অস্তিত্ব আছে কি? না। আমি যেন সম্বিত হারিয়ে ফেললাম। আমার নিঃশ্বাস পড়ল বাবনের মাথায়। নিঃশ্বাসে বাবনের চুলগুলো ঢেউ খেলছে টেবিলে।
টেবিলে পড়ে থাকা মালাতে তাড়াতাড়ি হাত চালিয়ে বাবনের গলায় পরিয়ে দিলাম। অমনি বাবন আমাকে হাসতে হাসতে বলে উঠল, এমন নির্জীব বস্তু নিয়ে এত মাতামাতি কিসের?
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন