হারমোনিয়াম

জয়দেব দত্ত

কাউকে কিছু বলা নেই, কওয়া নেই, হঠাৎ একেবারে হুট করে একটা নতুন হারমোনিয়াম কিনে, গোটা গ্রামের লোকগুলোকে 'তাক' লাগিয়ে দিল নারানদা। 'তাক' লাগবে না! যে কিনা দিনে দু'বেলা দু'মুঠো সাদা ভাত ভাল করে খেতে পায় না, একটা ভাল কাপড় পরতে পায় না, সে কিনা এত এত গাঁঠের কড়ি ব্যয় করে, হুট করে কিনে নিল হারমোনিয়ামটা। কিনলো তো কিনলো, আবার গোটা গ্রামে খবরটা চাউর হয়ে গেল 'তিলেক ঘড়িতে'। আর যেই না চাউর হওয়া, অমনি বানের জলের মতো হদ হদ করে লোকগুলো উড়ে এসে নারানদার মাঝ উঠানটা ভরিয়ে দিল। অবাক কাণ্ড, অবাক!

সত্যি করেই নারানদার মাঝ উঠানটা লোকে ভরে গেছে। লোকে লোকারণ্য যাকে বলে আর কি! এত লোক যে এইটুকু গ্রামে কোথায় ছিল কে জানে! যেই না শুনেছে নারানদার হারমোনিয়াম কেনার কথা, অমনি চ তো চ, দৌড় তো দৌড়! দৌড়তে দৌড়তে একেবারে সোজা নারানদার উঠানে। উঠানে এসে হাঁপাচ্ছে লোকগুলো। নাক দিয়ে গরম নিঃশ্বাস বার হচ্ছে কেবলই। বুকগুলো তিড়িং তিড়িং লাফাচ্ছে। মনে হচ্ছে, গোটা পৃথিবীটা কাঁপছে যেন! কি হয়, কি হয়!

দলের মধ্যে যারা বাচ্ছা কাচ্ছা, তারা প্রথম অসুবিধাটা টের পায়। ভিড়ের চাপে ওদের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম। কেউ কেউ বাঁশির 'ধ্যাবড়া' সুর তুলে আকাশ ফাটাচ্ছে, আকাশ। কালোবুড়ির ন'নম্বর পলাটা নাকে মুখে সিগনী ফিগনী লেপ্টে, ভিড়ের চাপে 'জাঁকাটিপা' হয়ে, গলা থেকে কান্না যেন বার করতে পারছে না। পিঁ পিঁ শব্দ বার করছে কেবল। পুটোর 'কোলেরটা' যার পেটটা পাঁচ নাম্বার রাশিয়ান ফুটবলের মতো গোল। সেই গোল পেটটা দুমড়ে মুচড়ে চুপসে গেছে। আহা, গেল, গেল বোধ হয় বাষ্ট হয়ে! না বাষ্ট হয়ে গেল না, লিগ হয়ে গেল যেন, লিগ! এতটুকু হাওয়া নেই পেটে। হাওয়ার জন্য ছাটা 'কোঁকাচ্ছে'! হাওয়া চাই, হাওয়া! হাওয়া-বাতাস!

শুধু কোলের ছা'গুলোরই কি হাওয়া-বাতাস চাই, আর দলের মধ্যে যারা বেঁটে খাটো, তারা বুঝি মুখে পেটে হাওয়া-বাতাস ভরে, খুব সুখে শান্তিতে আছে! মোটেই তা নয়। বেঁটে খাটোগুলো কেউ কারু পেটের চাপে, কেউ কারু বুকের চাপে 'জড়োপুটুলি' হয়ে, ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি। কিন্তু মোটেই কেউ মুখে রা কাটছে না। কেবল হাত দিয়ে একে অপরকে ঠেকাচ্ছে। ঠেলে কি আর পাহাড়কে নড়ানো যায়! ফলে পাহাড় নড়েও না, দুলেও না। না নড়ে, না দুলে এক জায়গায় স্থির হয়ে গেছে, স্থির।

আর মেয়েদের দিকটা কেবল 'ক্যালব্যাল' 'ক্যালবাল' করছে। পুকুরপাড়ে একপেট গুগলি' ভরে হাঁসের দল, যখন সুখ নিদ্রায় বিভোর থাকে, তখন হঠাৎ কোনকিছু দেখলে বা শুনলে, হাঁস যেমন সমস্বরে প্যাঁক প্যাঁক ডাক ডাকে, এই একবার তো উ একবার, উ একবার তো ই একবার, চলে ডাকের প্রতিযোগিতা, কে কত গলা ফাড়তে পারে। মেয়েদের দিকটাও তাই। শুধুই 'ক্যালব্যাল', 'ক্যালব্যাল'।

মেয়েদের মধ্যে কেউ মাথার চুল বেঁধেছে, কেউ বাঁধেনি। যারা চুল বেঁধেছে, তারা এক প্রকার বেঁচে গেছে। আর যারা বাঁধেনি, তারা মরার ফাঁস গলায় বেঁধেছে। চুলগুলো মাথা থেকে নেমে মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। হয়তো কেউ মাটির উপর না, চুলের উপরই দাঁড়িয়ে আছে। দাঁড়িয়ে আছে, দাঁড়িয়ে আছে। ফলে মাথা নাড়তেও পারছে না, চাড়তেও পারছে না। এক জায়গায় সোজা দাঁড়িয়ে আছে। ঘাড়টা দপ দপ করছে, দপ দপ!

কারু ব্লাউজের সেফটিপিনে একগোছা চুল উড়তে উড়তে হয়তো ঢুকে গেছে। বেরুচ্ছে না, কিছুতেই বেরচ্ছে না। টানছে, টানছে, টানছে তো টানছেই। কিন্তু চুল ছিঁড়ছে না। মাথাটা ছিঁড়ে যাচ্ছে যন্ত্রণায়। তখন এর তার পিঠে তাল পড়ছে দমাদম। ভাদ্র মাসের পাকা তাল।

গ্রামের বৌ ঝিগুলো দু'একজন তো হয়তো চুলগুলো 'ক্ষার' এ দিয়েছিল। মানে, নারাঙ্গার মাটি কিম্বা তিল এর পাতা অথবা এ্যালোব্যারার পাতা চটকে মাথা ঘষে ছিল। হাওয়ায় চুলগুলো উড়ছিল পৎ পৎ করে। উড়তে উড়তে এর তার চোখে মুখে ঝাপটা মারছে। কারু কারু চোখ কানা হয়ে যাওয়ার উপক্রম। চোখ থেকে জল পড়ছে দর দর করে।

আর যারা চুলগুলো 'ক্ষার'এ দেয়নি রুখু শুখু ডুবে এসেছে, তাদের চুলগুলো ভিজে সপ সপ করছে। চুল থেকে টপ টপ জল পড়ছে মাটিতে। মাটি ভিজে ভিজে যাচ্ছে। চুলগুলো গুমে পচে বটকা গন্ধ ছাড়ছে। গন্ধটা নাকের ফুটো হয়ে ঢুকে যাচ্ছে। ব্রহ্মতালুতে। ছিঃ ছিঃ ছিছি। ওয়াক, ওয়াক! কেউ কেউ বমি করছে।

লোকের ভিড়ে উঠানটা ঘন হয়ে গেছে। অন্ধকারের মতো ঘন। অন্ধকারটা কি চাকতির আকার নিচ্ছে। বন বন ঘুরছে চাকতিটা! বলা তো যায় না, নারানদার ব্যাপার স্যাপার। কখন কি হুট হাট করে বসে! তখন সারা পৃথিবী জুড়ে গন্ডোগোল।

এই রকম আর একবার গন্ডোগোল পাকিয়ে ছিল এই গ্রামে। হঠাৎ একবার সাইকেলে কিনে এনে হাজির করেছিল মাঝ উঠানে। চাপতে জানে না, চালাতে জানে না, সাইকেল নিয়ে কি করবে, কি করবে। নারানদা কোন উত্তর দেয়নি। কেবল দাঁত ফেড়ে হেসেছিল। সেবার অবশ্য সাইকেল কেনাতে গ্রামের লোকের সুবিধা হয়েছিল বিস্তর। যাদের সাইকেল থাকেনি, তারা সাইকেলে চেপে হিল্লিদিল্লি ঘুরেছিল। সেই সাইকেল এখন আর সাইকেল বলে কিছু নেই। কঙ্কাল হয়ে পড়ে আছে ঘরের এককোণে।

আসলে নারানদার মাথার ঠিক মধ্যিখানটাতে যে 'গ্যাদি' আছে, সেই 'গ্যাদি'তে একটা চোঙ বসানো আছে। চোঙটা নড়ে গেলেই যত রাজ্যের সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম কারসাজি বিদ্যা এসে হাজির হয় সুটসাট।

এই তো সবেমাত্র বছর কয়েক আগে, ত্রিশ কিম্বা চল্লিশ বছর আগে, কি তারও একটু আগে, কি পরে, নারানদা খয়েরবনীতে ধান রোপনের কাজে গিয়েছিল। সেবার বীজতলায় বসে বীজ টেনে ছিল প্রচুর। সারি সারি বীজের আঁটি, ভগবতীর মেলায় কাটা পাঁঠার 'মুড়ো'র মত নামনো ছিল এখানে সেখানে। তা দেখে বীজের মালিক মোড়ল মশাই এর কি ফূর্তি। খুশি খুশি মনে, কাঁধে মুড়ির বস্তা এনে, এলের উপর ধপ করে নামিয়ে ছিল।

নারানদা মুড়ির বস্তা দেখে বলে, ও কটা মুড়িতে কি হবেক মোড়ল মশাই?

ক'টা মুড়ি মানে, মাপা বাইশ সের মুড়ি আছে!

বাইস সের মুড়ি আমার তাতে কুলবেক নাই।

বলিস কিরে, এই মুড়িগুলো তুই খেয়ে নিবি?

হ লুব, দরকার হলে তুমাকেও খেয়ে নিতে পারি।

তবে তু খা তো।

খা তো খা, আর বলে কে! নারানদা ছুটে এসে মুড়ির বস্তাটা বীজ বাড়ির জলে ফেলে দেয়। মুড়িগুলো, ফট ফট শব্দে ভিজতে থাকে। ভিজে মুড়ির বস্তাটা মাথার উপর তুলে, এলের উপর ধোপানীর কাপড় কাচার মতো বস্তাটা তুলতে আর ফেলতে থাকে। মুড়িগুলো বস্তার এককোণে জড়ো হয়ে যায় মুহূর্তে। তাতে হাত ডুবিয়ে নারানদা গপাগপ গিলতে থাকে। ততক্ষণে পুরো খয়েরবনী গ্রামটা মোড়ল মশাই এর ধ্যাবড়া এলে বসে গেছে। ভাগ্যে মোড়ল মশাই নিজে বসেনি। নারানদার গপাগপ খাওয়া দেখে, ভয়ে ময়ে আগে ভাগেই কেটে পড়েছিল। নাহলে মুড়ির সঙ্গে সঙ্গে মোড়ল মশাইকেই যে পেটের ভিতর ঢুকিয়ে নিত না, সে কথা কে বলে! এমন রাক্ষসে খিদে নারানদার!

এখনও নারানদা দাওয়ায় বসে বসেই ছেলে ছকরাগুলোকে মাঝে মধ্যে তাতায়। এ তুমরা আমার সঙ্গে কেউ চাবুলি কর না বলে দিচ্ছি। নাইলে যে যেটাতে বসে আছে, চিটিয়ে দুব।

হয়তো কেউ বসে আছে পিঁড়ের উপর, পিঁড়েটাই হয়তো চিটিয়ে দিল তার পেছনে। কিম্বা পিঁড়ে নয়, পিঁড়ে নয়, গরুর গাড়ির ভাঙ্গা, 'পাই'টাতে বসে আছে। তো 'পাই'টা চিটিয়ে গেল পেছনে। কিম্বা কেউ হয়তো 'পাই' নয় পিঁড়ে নয়, ফুঁ দিয়ে সিমেন্টের দাওয়াতে বসে আছে 'দামনা' 'মামনা' গেদে। বসে বসেই ঝিমচ্ছে, তো পুরো সিমেন্টের দাওয়াটাই ছিল তার পেছনে চিটিয়ে। এবার বোঝ ঠেলা, কত ধানে কত চাল! সামলাও! ভারী বস্তুটাকে টেনে টেনে মর, হালের বলদের মতো চরকী ঘুর, চরকী!

এই জন্য গ্রামের লোকগুলো নারানদাকে খুব ভক্তি শ্রদ্ধা করে। ভয়ে ভক্তি যাকে বলে আর কি! সেই 'ডাকপুরুষে'র কথা আছে না, 'ধূমকে গেরাম ডরায়', মানে বদলোককে গোটা গ্রাম শুদ্ধ ভয় করে, সেই রকম আর কি!

গোটা গ্রাম শুদ্ধ নারানদাকে ভয় করলেও নারানদা তো আর কাউকে ভয় ডর করে না। তাই সে মাঝে মধ্যে নিজের মাঝ উঠানে তিড়িং তিড়িং লাফায়। আর হাঁক পাড়ে, আই কে আচিস আই, লগড় দেখবি তো আই। বলেই মাছ ধরা 'পলুই'টা হাতে তুলে কলতলায় দৌড় দেয়। কলের হ্যান্ডেল টিপে টিপে পলুই-এ জল ভরে, জল। এক 'পলুই' জল! ততক্ষণে মাঝ উঠানটা লোকে ভরে যায়। তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে। আর ভোঁ হয়ে যায়! হ্যাঁ তাই তো, সত্যিই বটে তো ব্যাপারটা, 'পলুই'টাতে তো জল ভরা রহেছে! বলিহারি নারান, বলিহারি তুর গাঁড়াকল তুর ক্ষুরে নমস্কার, নমস্কার।

মা কাকিমারা নারানদার ক্ষুরে নমস্কার জানাতে জানাতে ভিড় পাতলা করে।

আজও ঠিক ঐভাবেই ভিড়টা পাতলা হচ্ছে ক্রমশ। মানে, মেঘে কেটে যাচ্ছে, মেঘ কেটে গেছে। আর মেঘ কেটে গেলে যা হয়, মেঘের আড়াল থেকে সূর্য উঁকি মারে।

জগন্নাথ দাঁড়িয়ে ছিল সজনে গাছটার আড়ালে। না দাঁড়িয়ে ছিল নয়, ভিড়ে ঢাকা চিল। ভিড়টা সরে যেতেই জগন্নাথের মুখটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। জগন্নাথ হাসছে খ্যাল খ্যাল করে। মেঘ সরে গেলে সূর্য যেমন হাসে আর কি!

জগন্নাথ পা-টি পা-টি করে এগিয়ে আসছে নারানদার হারমোনিয়ামটার কাছে, নারানদার কাছে। হারমোনিয়ামটা লম্বালম্বি শোয়ানো রয়েছে পুরো উঠান জুড়ে। আর নারানদা, ঠিক তার পেছনটাতে ভুঁই ঢিপি!

জগন্নাথ বলে, হারমোনিয়ামটাতো কিনলে নারানদা?

নারানদা বলে, না কিনলে, কে মাগনায় দিবেক বল?

না, মাগনায় তো কেউ দিবেক নাই। বুঝেছি গাঁঠের পয়সা খচর করে কিনেচ। তা কিনে হবেক কি?

কেনে, গান হবেক।

জগন্নাথ হেসে ওঠে, গান?

হ, গান।

কে করবেক?

কেনে, আমি করব। আ-মি-ই-ই। নারানদা গলায় জোর বাড়ে।

তু-মি-ই-ই-ই! জগন্নাথের হাসি আরো চওড়া হয়।

কেনে, পারব নাই?

না, পারবে নাই।

কেনে পারব নাই?

তুমার তো গোড়াতেই গলদ।

কিসের গলদ?

ঐ চার নাম্বারটাতে।

কোন চার নম্বর?

সা-রে-গা-মা।

হল-বা।

হল-বা? আচ্ছা নারানদা, তুমি কোনোদিন মা শব্দটা উচ্চারণ করেছ?

নারানদা অনেকক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর মাথা নাড়ে, না।

মা বলে ডেকেছো কোনদিন?

না, তা ডাকি নাই।

তাইলে? গান করতে হলে তো সা-রে-গা-মা বলতে হবেক।

কেনে বলতে হবেক?

বাঃ, তাইলে গান করবে কি করে?

করব।

কী করে করবে?

সে পথ আচে।

কী সেই পথ?

যখন করব, তখন দেকবি।

জগন্নাথ নীরব। দু'জনের নাক দিয়ে হুস হুস নিঃশ্বাস বার হচ্ছে কেবল।

আবার জগন্নাথ কথা বলে, নারানদা তুমার মাকে মনে পড়ে?

নারানদা সাফ উত্তর দেয়, না।

মাকে দেখেচ কোনোদিন?

না।

তুমার মা বেঁচে আছে?

উ জাতটার মরণ নাই কোনদিন। উরা হল বেড়াগাছের জাত।

দেখা হলে মা বলে ডাকবে?

নারানদার গলায় বিরক্ত ঝরে পড়ে। না, উ মাগীটাকে কোনোদিন লাকাড়'বই নাই।

দুই

হারমোনিয়ামটা কেনার পর থেকে নারানদা এখন টোটাল অন্য-মানুষ! অন্য মানুষ, অন্য মানুষ! সাধক মানুষ যাকে বলে আর কি। গান সাধক।

তা গান সাধনা করতে হলে তো এমনি এমনি হয় না। নিদেনপক্ষে একজন গুরুজি দরকার। কে হয় গুরুজি, কে হয় গুরু। ছাই ফেলতে সেই ভাঙা কুলো। কত কুলো তো মানুষের 'হদফেলায়' সারকুড়ে, আস্তাকুড়ে পড়ে থাকে। ঠিক সেই রকমই মানুষের 'হদ ফেলায়' পড়ে থাকা একটা কুলো হাতের সামনে পেয়ে গেল নারানদা। কুলোটা আর কেউ নয়, এই গ্রামেরই একজন 'মাঝবয়সি' যুবক শ্রীশ্রী মানিক চন্দ্র মণ্ডল মহাশয়। যদিও সেই মানুষটির সারা অঙ্গ প্রত্যঙ্গে শ্রী বলে কোনো কিচ্ছু নেই, গোটাটাই বিশ্রী। শরীরের উপর থেকে নীচে পর্যন্ত লম্বা লম্বা ফাটা ফাটা দাগ। কুলুর ঘানিতে হাজার ডুব দিয়েও সে দাগ মিলানো যায়নি। সেই ফাটা মানিক এখন নারানদার গানের গুরু।

গুরু মিলে লাখে লাখে, শিষ্য মিলে কটা! একটাও নয়। সারা জীবন গানের চর্চা করে একটাও শিষ্য মিলাতে পারেনি মানিক মোড়ল। তা হাতের সামনে নিজে নিজে যখন চাইচে, না বলতে শিকার এসে ধরা দিয়েছে। এমন আধার ছাড়ে কেউ! তাই ফাটা মানিকও উঠে পড়ে লেগেছে, নারানদার গানের সহযোগী হিসাবে।

তবে সাবধান, খুব সাবধান, এক্কেবারে কানে কামড়ে বলে দিয়েছে নারানদা, তার গানে কোথাও যেন কোনো মন্দে, কোনো অছিলায় মা এসে না পড়ে। মা ডাক কখনো ডাকবে না নারানদা। কেন ডাকবে?

সব শুনে সব বুঝে ফাটা মানিক মগজে বার কয়েক ধোঁয়া দিয়ে, মগজ থেকে টেনে হেঁচাড়ে বার করল রাগ, রাগ ভূপালি। বলল, নে নারানদা, তোকে আর মা বলতে হবেক নাই। তু ভূপালি রাগ ধর। বল, সা-রে-গা-পা-ধা-নি-সা, সা-নি-ধা-পা-গা-রে-সা। নারানদাও মানিক মণ্ডলের সঙ্গে গলা মিলাল, গলা।

নারানদার কণ্ঠে গান তো নয়, গলা তো নয়, যেন কাঁসা বাজছে গোটা গ্রামজুড়ে। এলাকার সকল মানুষ কানে তুলো নিল। কিন্তু মানুষ তো কানে তুলো নিল, মানুষের ঘরে পোষা কুকুর বিড়ালগুলি। কুকুরগুলো একবার শুকনো পুয়ালচুনীতে আর একবার গোহাল ঘরে ঢুকছে বেরচ্ছে। শান্তি নেই, শান্তি নেই! দুদণ্ড শান্তি নেই!

রাস্তার একটাও খড়কুটোও পড়ে টড়ে নেই। গাছের পাখপাখালি খেতে খামারে যত কিছু খড়কুটো পড়েছিল, সব বাসায় তুলে ডাঁই করেছে। বাসার হাঁ মুখ বন্ধ করে দিয়েছে। তাতে মরণ হয় সেও স্বীকার, তবু কিছুতেই আর হাঁমুখ খোলা যাবে না। যাবে না।

গর্তের ইঁদুর শনের 'নুড়ি' আর পাটের 'কুঁদুড়ি' টেনে টেনে সব গর্তে ঢুকিয়ে দিয়েছে। তবু কানগুলো বেঁচে থাক, বেঁচে থাক!

দিন নেই রাত নেই, 'মাসাদরুনে' চলছে নারানদার গানের সাধনা। আর এতে সব থেকে বেশি অসুবিধায় পড়ে গেছে রাজু আর রাজুর বৌ রিঙ্কু। তারা তো আর সব সময় কানে তুলো দিয়ে থাকতে পারে না। হাজার হলেও সংসারে তাদের তো কাজ কাম আছে। কাজ কাম না করলে, পেটের ব্যাপারটা চলবে কী করে!

নারানদার গানের গলা শুনে রাজু আর রিঙ্কুর খুব ভোর ভোর ঘুম ভেঙে গেল। ঘুম হয়েছে কোথায়, যে ঘুম ভাঙবে! 'একচটকা' ঘুমিয়ে সারা রাত দু'জন বিছানায় এপাশ ওপাশ করেছে শুধু। আর বাবার গান শুনেছে।

ভোর ভোর ঘুম ভাঙতেই দু'জন মাঠে চলে গেল। মাঠে পরিত্রাণ। মাঠে তো আর বাবা গান করতে আসবে না। যতক্ষণ মাঠে থাকা যায়, ততক্ষণ শান্তি।

মাঠে এসে রাজু আর রাজুর বৌ দু'জনই ভোঁ। শশার মাচাটা দড়ি ফড়ি ছিঁড়ে উল্টে পড়ে গেছে। দড়িগুলো পুরনো ছিল। পড়েছে তো ভালই হয়েছে। যাক, কাজ পাওয়া গেল। রাজু কোমরে গামছা বেঁধে, তিড়িং করে লাফ দিয়ে কাজে লেগে গেল। আর রাজুর বৌ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে না কী রাজুকে। ক্ষেপেছ, রাজুকে কি দেখেনি, যে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে হবে। রিঙ্কু মুখে খৈনী ভরে, মুখ বন্ধ করে, রাজুর সঙ্গে কাজে লেগে গেল। একটাও কথা বলছে না দু'জন দু'জনকে। সারারাত যা কানে শুনে রেখেছে, তাতেই কান ভর্তি।

রাজু শশার মাচাটা টেনে সোজা করে, দড়ি দিয়ে বাঁধছে, আর রিঙ্কু দু'হাতে শক্ত করে টিপে ধরেছে। রাজু বাঁধছে, আর রিঙ্কু ধরছে। রিঙ্কু ধরছে, আর রাজু বাঁধছে। এইভাবে বাঁধা আর ধরা, ধরা আর বাঁধা, করতে করতেই সূর্যটা টুপ করে ডুবে গেল। কোন শব্দ হল না। উল্টে রাজুর পেটটা শব্দ করে ডেকে উঠল, কলকল...কলকল। রিঙ্কু বলল, তুমার পেট ডাকচে।

রাজু বলল, ডাকবেক নাই, সন্ধে হল, দেকেচ?

রিঙ্কু আঁৎকে উঠল, হ্যাঁ তাইতো, ঠিকই তো, সন্ধে হয়ে গেল তো! চল চল চল-ও-ও-ও।

রাজু বলল, আর চলতে হবেক নাই, আমাকে তুলে নিয়ে চল।

রিঙ্কু বলল, অতবড় জুয়ানটাকে তুলতে পারি নাকি?

রাজু বলল, কেনে পারবে নাই, তুলে দেখ, না খেয়ে খেয়ে কেমন হালকা হয়ে গেছি।

রিঙ্কু আর 'থিরবির' মানল না। রাজুকে জাপটে ধরল। তুলল উপর দিকে। হ্যাঁ, তাই তো গো, সত্যিই গো, খুব হালকা হয়ে গেছে যে!

রাজু হাসতে হাসতে বলল, না খাওয়ার ফল। বাবার গান শুনে শুনে কতদিন খেতে পারি নাই জানো!

রিঙ্কু বলল, চল আজ খাবে চল, পেট ভরে খাবে।

রাজু আগে, রিঙ্কু তার পেছন পেছন। একই রাস্তায় দু'জন 'দু'মানুষে' হাঁটছে। স্ত্রী-পুরুষে। রাজু হাঁটতে হাঁটতে টলে টলে পড়ে যাছে। রিঙ্কুও রাজুর দেখে দেখে টলছে। খিদেয় গা টলা যাকে বলে আর কি!

টলতে টলতে ঘর পৌঁছে গেল। পৌঁছেই ভাতের হাঁড়িতে ভাত।

এইরে, ভাত রাঁধা নাই তো! রিঙ্কু জিভ কাটে।

রাজু বলে, মুড়ি বাড়।

রিঙ্কু মুড় বাড়ে এক কাঁসা।

রাজু জল ঢেলে মুড়ি খাচ্ছে। ন্নানা, মুড়ি খাচ্ছে না, মনে হচ্ছে কাঁসাটা সহ ধরে খাচ্ছে। এমন রাক্ষসে খিদে।

এমন সময় ও ঘর থেকে বাবার গান ভেসে আসছে, সা-রে-গা-পা-ধা-নি সা/সা-নি-ধা-পা-গা-রে সা..। ভূপালি।

রাজু এক মুখ খাবার ভরে বাবাকে হাঁক পাড়ে, এ বাবা, গান বন্ধ কর, বন্ধ কর বলছি।

রিঙ্কু ভয়ে তরাসে বলে, উ গান করুক, তুমি খেয়ে নাও।

রাজু বিরক্ত। কানের কাছে সা-রে-গা করলে খাওয়া যায়? খাওয়া যায় না, তবুও কোন রকম খেয়ে নেয় রাজু। খেয়ে নিয়ে হাত ধুয়ে বিছানায় রাজু। রাজুর পাশে রিঙ্কু। আর তার মাঝে সা-রে-গা।

রিঙ্কু বলে, বাবাকে গাঁয়ের লোক কত ভয় করে বলত?

রাজু বলে, হ-ভয় তো করে।

কিন্তু কেনে? বাবা কি ম্যাজিক জানে?

ম্যাজিক!

হ-ম্যাজিক। ম্যাজিক না জানলে, কেউ পলুই এ জল ভরতে পারে?

রাজু হেসে ওঠে, পলুই-এ জল!

হ-জল।

তুমি নিজে চোকে দেকেচ?

নাই বা দেখলাম, কিন্তু লোকে তা বলে।

লোকে যদি বলে, তুমার কানটা নাই, কাকে ছিঁড়ে নিয়ে চলে গেছে, তুমি বসে বসে কাঁদবে?

না, করব নাই।

কিন্তু গোটা গাঁয়ের লোক যে বাবাকে ভয় করে। ভয়ে ছুটে পালায়।

ওরা ভীতু, তাই পালায়।

বেশ, গোটা গ্রামের লোক না হয় ভীতু। তুমি একাই না হয় সাহসী। কিন্তু খয়েরবনীতে বাবা যে বাইস সের মুড়ি খেয়েছিল, সেটাকেও কি তুমি মিথ্য বলবে?

তা কেন বলব? কিন্তু বাইস সের মুড়ি খেয়ে বাবার কি অবস্থা হয়েছিল। সেটা কি তুমি চোকে দেকেচ? হরদম পুকুর আর ঘর করেছিল বাবা!

ইস, বাবা ভাগ্যে সেবার মরে যায় নাই তো!

মরে যাওয়াই ভাল ছিল। অমন পেঁদোফুটুনী লোক বেঁচে থেকে কি লাভ!

রিঙ্কু আর রা করে না। উল্টে নাক দিয়ে গড় গড় শব্দ করে, গড় গড়-গড় গড়।

রাজু ধরফড় ওঠে রিঙ্কুর নাক দাবা দিয়ে ধরল। তাতে রিঙ্কুর নাক-ডাকা বন্ধ হল। নাক ডাকা তো বন্ধ হল কিন্তু বাবার সা-রে-গা? সেটা কি রিঙ্কুর মতো নাক দাবা দিয়ে বন্ধ করতে পারল রাজু? না, মোটেই নয়, বরঞ্চ রাত যত বাড়ছে, বাবার গানের গলা আরও উপরে চড়ছে, চড় চড়।

রাজু আর শুয়ে থাকতে পারে না। বাবাকে হাঁক পাড়ে, এ বাবা, গান বন্ধ কর, বন্ধ কর বলচি।

বাবা রাজুর কথায় থড়ায় কেয়ার। যেন শুনতে পাইনি, শুনতেই পাইনি। রাজু দড়াম শব্দ করে কপাটটা বন্ধ করে দেয়। তবুও শব্দ বাধা মানে না, বাধা মানে না। হল বল ঢুকে পড়ে ঘরের ভিতর। ভিতর ঢুকে রাজুর কানে গোল করে, গোল।

রাজু আর ঘরের ভিতর থাকতে পারে না। বাইরে বেরিয়ে আসে। বেরিয়ে হাঁক পাড়ে, এ বাবা তু গান বন্ধ করবি কি? না দাঙ্গা করবি?

নারানদা এবার রা কাটে, দাঙ্গা বলতে তু কি বলতে চাইচিস বলত?

দাঙ্গা। দাঙ্গা মানে মারপিট।

তু মারপিট কর। কর, কর, কর।

রাজু আর রাগ সামলাতে পারে না। উঠানের 'বাতাকাপড়ী'টা তুলে সজোরে বসিয়ে দেয় বাবার পিঠে। বাবা এক ঘাতেই কাত!

হাস বা মুরগীর ডানাপানা ধরে, পিঠের শিরদাঁড়া বরাবর যদি এক ঘা দেওয়া যায় তখন তার পেছনটা কেবল তির তির কাঁপে। বাকি অঙ্গ সব নীরব স্থির। তেমনি নারানদার পেছনের পাগুলো কেবল তির তির কাঁপছে।

হারমোনিয়ামটার উপরে সদর্পে জ্বলতে থাকা লন্ঠনটা লাঠির ঘা এ ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেছে। তাহলে নারানদার পিঠের শিরদাঁড়াটা ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেল নাকি। নারানদা কি মরে গেল! না, না মরতে মরতে বেঁচে গেল কোন রকম, মরতে মরতে বেঁচে গেল।

নারানদার হারমোনিয়ামটার উপর বাম হাতের জোর খাটিয়ে কোনো রকম শিরদাঁড়াটা সোজা করল। শিরদাঁড়াটা মটমট করে উঠল। তাহলে কি শিরদাঁড়াটা সত্যিই ভেঙে গেছে? ভাঙল তো কি! নারানদা তো এখন মরতে বসেছে। আজ ও মরবে। নির্ঘাত মরবে।

হারমোনিয়ামটা কাঁধে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল, উঠানে। উঠানটা অন্ধকার। অন্ধকারে শিশির পড়েছে। শিশির নয়, শিশির নয়, কুয়াশা। ধোঁয়ার মতো কুয়াশা নারানদার দিকে ধেয়ে আসছে। কুয়াশায় ভিজে গেছে উঠান। উঠানের আঁজির গাছ, লাউমাচা, লঙ্কাগাছ, ধনে শাক, পুঁই শাক সব ভিজে টইটম্বুর। মনে হচ্ছে, কুয়াশায় ভিজতে ভিজতে সব মরে গেছে। মরা পৃথিবী যেন! এই মরা পৃথিবীতে থেকে কি লাভ। লাভ নেই, লাভ নেই, মোটেই লাভ নেই, রবঞ্চ মরে যাওয়া ভাল। তাই মরবে নারানদা।

কিন্তু মরতে হলে এই লোকজনের উঠানে কেন? একটু 'নিরিবিলি' জায়গায় তো মরা যায়। 'নিরিবিলি' জায়গার কি পৃথিবীতে অভাব আছে। অভাব নেই, অভাব নেই।

নারানদা 'নিরিবিলি' জায়গার সন্ধানে উঠান ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এল। উঠানের পর বাঁশঝাড়। বাঁশ ঝড়ের পর জট পাকানো তেঁতুল গাছ। তেঁতুল গাছের পর নারাঙ্গা। নারাঙ্গার পর নামোবাড়ি। নামোবাড়ি মানে নিচু মাঠ। নিচু মাঠে জল নেই। কেবল কুলেখাড়া কাঁটা আছে আদিগন্ত। দু'এক জায়গায় মরে শুকিয়ে তাঁত হয়ে গেছে। কেবল কাঁটার ধার মুখে হাঁ হয়ে আছে। নারানদার পায়ে ধার মুখ ফুটছেও পট পট। তা ফুটুক, নারানদা তো ফুটতেই এসেছে। কুলেখাড়া কাঁটা পেরিয়ে সরু রাস্তা। সরু রাস্তার পর নদী, বোদাই নদী। বোদাই নদী মরে গেছে। পড়ে আছে সাদা সাদা মরুবালি। সেই মরুবালির উপর পা চালিয়ে হাঁটছে নারানদা। বালিতে নারানদার পায়ের ছাপ পড়ছে। নারানদা হয়তো থাকবে না। বালিতে নারানদার পায়ের ছাপ থেকে যাবে। হারমোনিয়ামটাও থাকবে না। কী করে থাকবে, হারমোনিয়ামটার জন্যই তো এতসব।

বোদাই পার হলেই কৃষিজমি। কৃষিজমি আর এল রাস্তা। সরু এল ধরে হাঁটতে গা টলে যায়। টলুক, টলল তো কি! তাই টলতে টলতে নারানদা, মদের ঘোরে মাতালের মতো। হ্যাঁ নারানদা মাতালই তো, তবে মদের ঘোরে মাতাল নয়, মরার ঘোরে মাতাল।

এল রাস্তা শেষ হতেই একটা বহু পুরনো ঝাকড় মাকড় নিম গাছ। নিম গাছের আশে পাশে আরো, আরো নাম না-জানা কত কি গাছ! লতাপাতায় ভরে আছে সে সকল গাছের মাথা। কিন্তু আশ্চর্য, নিমগাছের সামনেটা ফাঁকা, ফাঁকা! শুধু একটা খড়ের ম্যাড় দাঁড়িয়ে রয়েছে যেন, মনে হচ্ছে মাটিতে কি যেন একটা রাখছে, রাখার জন্য কোমর নুইয়েছে। আসলে তা নয়, তা নয়। একরাতের কালী তো। যে রাতে পুজো, সে রাতেই প্রতিমা গড়া। পুজো শেষে প্রতিমা বিসর্জন। তারপর নিমতলায় উড়ে আসে ম্যাড়টা। উড়ে এসে পড়ে থাকে, পড়েই থাকে, দিন ভর, রাতভর; বছর ভর। ম্যাড়ের পাটাতেই উঁই লাগে বিস্তর, উঁই এ পাটা খেয়ে দেয়। তাই নুয়ে থাকে ম্যাড়টা। কিন্তু ম্যাড়ের কিসস্যা গেয়ে কী লাভ! লাভ নেই, লাভ নেই, বরঞ্চ লস!

কুয়াশা ঘেরা রাত্রি। নিমগাছটা কুয়াশায় ভিজে গেছে। পাতা থেকে জল পড়ছে টপ টপ, টপ টপ। গাছের ডাল থেকে জল 'দুদাড়ে' নামছে নদী হয়ে। ও সব নদী উদী দেখে কী লাভ, নারানদা তো আর নদীতে জল খেতে আসেনি। ও মরতে এসেছে। নর্ঘাত মরতে। মরবে না তো কী! নিজের ছেলের হাতে মার খেয়ে মরার চেয়ে, গলায় দড়ি নিয়ে মরা ঢের ভাল, ঢের ভাল। আর মরতে হলে এই নিমগাছে মরবে এখানে মরলে ভূতের বাবাও টের পাবে না। মরে পচে ভূত হয়ে গন্ধ ছড়ালে, লোকে নাক দামা নিয়ে পেরিয়ে যাবে সুটসাট। কিসের গন্ধ, কোথা থেকে আসছে গন্ধটা, কেউ জানবে না। জানার চেষ্টা করবে না। কেন করবে? উৎকট গন্ধ থেকে সকলেই যেতে পারলে বাঁচে। গরু, মোষ মরলে, এখানে ফেলে দিয়ে গেলে এমন গন্ধ তো কত ওঠে, কত! নারানদা খড়ের ম্যাড়টার কাছে হারমোনিয়ামটা নামাল। নামিয়ে গাছটাকে দেখছে, শেষ বারের মত দেখছে। কিন্তু গাছটা দেখতে পাচ্ছে না। কী করে দেখবে। চারিদিকটা যে অন্ধকার। তার উপর ঝম ঝম করে কুয়াশা পড়ছে। এই কুয়াশায় নিজেই নিজেকে দেখতে পারছে না তো গাছ! তাই গাছটাকে হাত বুলিয়ে বুলিয়ে দেখছে। গাছে ছাল উঠেছে বিস্তার। ছালগুলো ভিজে গেছে। ভিজে ফেঁপে গেছে। ফেঁপে ভালই হয়েছে। এই ভিজে ফাঁপা ছাল এ পা লাগিয়ে উঠতে অসুবিধা। তরতর করে ওঠা যাবে গাছে।

নারানদা ছালে পা লাগাল। পা লাগিয়ে উঠছে তরতর। ছালটা খসে গেল গাছ থেকে। তার মানে নারানদাও খসে গেল। খসে নীচে। নীচে তো কী হয়েছে? পারিব না এই কথাটা বলিও না আর। একবার না পারিলে দেখ শতবার। তো শতবার দেখতে হল না। মোটে দুবার, দুবারের চেষ্টায় নারানদা গাছে উঠে গেল। গাছের ডাল ধরে বসে আছে নারানদা। না শুধু বসে নেই, বসে বসে ডালে দড়ি বাঁধছে। আর দড়িতে ফাঁস করছে। ফাঁসটা তো গলায় পরতে হবে। ফাঁস বাঁধতে গিয়ে দেখল দড়িটা ভিজে গেছে। ভিজে ভালই হয়েছে। ভিজে দড়ি খুব পিছল হয়। তার মানে নির্ঘাত মৃত্যু। মরতে মোটেই কষ্ট হবে না। ফাঁস লাগিয়ে ঝুলে পড়লেই 'বিন্তি কাবার'!

না, ঝুলতে হল না, নারানদা কী করে কী গাছ থেকে ধপ করে মাটিতে পড়ে গেল। আর পড়ল পড়ল, হারমোনিয়ামের পেছনটাতে। তাও ঘাড়গেদে বা একপাশ হয়ে নয়, সোজা হয়ে পড়ল। যেমন করে গাছে বসেছিল, অবিকল ঠিক সেই রকম।

আর একটু পেছনে পড়লে, পাঁঠা বলির খুটোটা ছিল। সেই খুঁটোটা নারানদার নীচে থেকে মাথা পর্যন্ত সোজাসুজি ঢুকে যেত।

যাক, নারানদা খুঁটোর উপর পড়েনি। হারমোনিয়ামের পেছনে পড়েছে। পড়ে বসে আছে। বসে বসে দেখছে ম্যাড়টাকে। দেখতে পাচ্ছে না। কি করে দেখবে? চারিদিকটা অন্ধকার। অন্ধকার, অন্ধকার আর অন্ধকার! মাটি ছুঁয়ে ছুঁয়ে যেন অন্ধকার ছড়াচ্ছে। অন্ধকার গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ধরিত্রী। হুঁস নেই, হুঁস নেই, বেহুঁসে যেন ঘুমাচ্চে প্রকৃতি।

মেঘ কেটে গেলে যেমন দূর আকাশে একটা দুটো তারা দেখা যায়, টিমটিম টিমটিম। তেমন ম্যাড়টাও, দূর, বহু দূর হতে একটা দুটো আলো ছাড়ছে, টিমটিম, টিমটিম! না, আলো নয়, জোনাকি। জোনাকিগুলো সংখ্যায় বাড়ছে। একটা নয়, দুটো নয়, দশটা, বিশটা, ত্রিশটা, পঞ্চাশটা, একশোটা, হাজারটা, সহস্র সহস্র, কোটি কোটি। আলোর জ্যোতিতে আর দেখা যায় না ম্যাড়টা। কী করে দেখা যাবে! এখন তো আর ম্যাড়টা ম্যাড় নেই, মানুষের আদল নিয়েছে। দুটি মানুষের। একটা পুরুষ, আর একটা নারী। কালো পোচ যাদের সর্বাঙ্গে। লোহার মতো গড়ন যাদের!

হঠাৎ দুই নারী-পুরুষের মধ্যে কী হল কে জানে, পুরুষটা খড়ের চাল থেকে মুসুরী বেড়নো লাঠিটা টেনে নিয়ে, নারীকে পিটাচ্ছে দুমদাম। দুমদাম। লাঠিটা ভেঙে গেল নারীর লোহার মতো গড়নে।

স্বামীর হাতে মার খেয়ে স্ত্রী হাঁটুর উপর কাপড় তুলে এক মাসের ছেলেকে বুকে নিয়ে, ভরে ময়ে ছুটছে! ছুটছে, ছুটছে, ছুটছে! পেছন থেকে তাড়া করছে স্বামী। যেন বাঘে হরিণে রেষারেষি দৌড়াচ্ছে। রেষারেষি!

শেষে হরিণের নাগাল না পেয়ে বাঘ হুংকার ছাড়ল, এই তু যাচ্ছিস যা, আমার ছেলেকে রেখে যা।

মা ভয়ে ময়ে বুকের ছেলেকে ফেলে দিল কুলঝোড়ে। তারপর মা কাঁদতে থাকল, কাঁদতেই থাকল। রাতভর, দিনভর, মাসভর, বছরভর, বছর বছর!

নারানদা হারমোনিয়ামটার উপর শুয়ে গেল। শুয়ে শুয়ে হাত পা ছুঁড়ছে। ছোট ছোট হাত পা, কচি কচি! কচি কচি!

হাত পা ছোড়ারই দরুন না কী কে জানে, হারমোনিয়ামটা বেজে উঠল প্যাঁ! আর তখন, সেই তক্ষুনি নারানদা খাড়া হয়ে বসল হারমোনিয়ামটার পেছনে। গেয়ে উঠল গান। তবে আর এবার রাগ ভুপালি নয়, সরাসরি গেয়ে উঠল গান, মা-আ-আ-আ।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%