পুটি এবং তার বাবা

জয়দেব দত্ত

দুপুরটা যেন কিছুতেই গড়াতে চায় না। সেই কখন বেলা একটার সময় সমর বাড়ুজ্জের ঘর থেকে এক পেট ভাত ভরিয়ে এসে বসেছে, এখন একটা পনেরো। একটা একটা মিনিট যেন এক একটা ঘণ্টা। 'রথতলায়' 'বর্ধমান প্রতীক্ষালয়ে' দেওয়ালে ঠেস দিয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে আয়েস করে অলস বেলায় গরুর জাবর কাটার মত পেটের ভেতর থেকে গরম ভাত উগরে জাবর কাটে পঞ্চা। আর তার ফাঁকে ফাঁকে ফলের দোকান থেকে উড়ে আসা মাছি পায়ের ক্ষতে এসে বসলে, হাত নেড়ে তাড়ায়। কখনো কখনো গায়ে লেপ্টে থাকা বৌ-এর শতছিন্ন কাপড়টা গা পর্যন্ত টেনে নামায়। মাছিগুলো মুখে একরাশ বিরক্ত দেখিয়ে ভোঁ ভোঁ শব্দে উড়ে যায়।

বাঁকুড়া বর্ধমানগামী বাস আসার প্রতীক্ষায় বসে আছে পঞ্চা। কিন্তু বর্ধমান যাবে না। যাবে পাত্রসায়ের। আবার পরের বাসে সোনামুখী। বর্ধমানগামী বাসের কনডাক্টরটা ভাল। একটু দয়ার চোখে দেখে পঞ্চাকে। পুরানো সম্পর্ক। অনেক দিনের। ভোলা যায় না। ভোলেওনি। পঞ্চার জন্য দু'টাকার একটা কড়কড়ে নোট আলাদা পকেটে রাখে। পঞ্চা কনডাক্টরটার একটু গা ঘেষে দাঁড়ালেই কনডাক্টরটা কড়কড়ে নোটটা সহ হাত বাড়িয়ে দে পঞ্চার দিকে। তখনই পঞ্চার মুখটা হাসিতে ভরে যায়। তারপর এর ওর কাছে ঘুরে ফিরে না হলেও এক টাকা। এটাই ওর রাতের খরচ। হাফ বোতল।

জ্যৈষ্ঠের দুপুর, তাই রাস্তায় ভিড় নেই। দোকানপাটও বন্ধ। 'কাশীনাথ হিন্দু হোটেল'টা খোলা। হোটেল তো দুপুর বেলাতে খোলা থাকে। তাই আশে পাশের হোটেলগুলোও খোলা। সেই সব হোটেলগুলো থেকে দু-চারজন লোক বেরিয়ে গেলে রাস্তার নীরবতা ভাঙে। পানের গুমটিগুলো সব বন্ধ। রোদের আঁচ গুমটির টিনের চালে পড়লে, ছোট্ট শহরটার তাপ বাড়ে। সেই তাপ পঞ্চার খড়কুটো সার দেহটাকেও ছাড়ে না।—না ছাড়ে তো না ছাড়ুক, তাতে তার কী যায় আসে? তারও তাপ বাড়ুক। তা'পে জ্বলে উঠুক সারা শহর। একেবারে ভস্ম হয়ে যাক। শেষ হয়ে যাক। তবু সে এখান থেকে এক পা-ও নড়বে না। এই রকম একটা বিরক্তকর ভাবনা আসতেই কানে গুঁজে রাখা আধপোড়া সিগারেটটা চটাং শব্দ করে ধরাল পঞ্চা। উত্তপ্ত সিগারেটের টানে পঞ্চার মন থেকে গ্রীষ্মের ভয়াভয়তা ওড়ে যায়।

এখন আর পেট সামলানোর কথা চিন্তা করতে হয় না পঞ্চাকে। সামনে ইলেকস্যান। পুরসভার ভোট। নেতাদের সঙ্গে দেখা হলেই কেল্লা ফতে।—আমি থাকতে তোর কী ভাবনা পঞ্চা। খিদে পেলেই আমার ঘর যাবি। তোর বৌদি-ভাইঝিরা থাকে, কোনো অসুবিধা হবে না। যাবি আসবি খাবি। নিজের ঘরের মতো। সত্যিই তাই, নিজের ঘরের মতো। বাড়া ভাত। কত কী তরকারি। হরেক রকমের। পটল ভাজা, মাছ, মাংস, ডিমও কোনোদিন বাদ যায় না। একেবারে বহাল তবিয়তে খাওয়া। খেয়ে হাত ঝেড়ে উঠতে না উঠতেই তাড়া তাড়া বিড়ির বাণ্ডিল থেকে বিড়ি আসে। আজ আবার ভাগ্যটা উঁচু দরে। বিড়ির পরিবর্তে সিগারেট। পঞ্চা জানে এই রকম বহাল তবিয়ত ব্যবস্থা ইলেকস্যান না যাওয়া পর্যন্ত অটুট থাকবে। তার পরের ভাবনা আর ভাবে না। সে যা হবার হবে। য'দিন থাকে খাই। এখন যা পাওয়া যায় তাতেই বকবক খুশি। নেতারা যে তাকে ভাই জ্ঞানে সমীহ করে তাতেই প্রাণে জোয়ার আসে। আর জোয়ার আসবেই বা না কেন? নেতা মানে দেশ শাসক। দেশের শাসন ব্যবস্থা পুরোটা যাদের হাতে, তাদের একটু করুণার দৃষ্টি পাওয়া কি আর কম পাওয়া! ওদের নেতা বানাতে পঞ্চাও তো কম কিছু করেনি। ভোটের প্লাকার্ড টাঙ্গিয়েছে, চুরি করেছে। ধরা পড়ায় জেল পর্যন্ত। এও কি আর কম কিছু।

ভস ভস করে মুখের ধোঁয়া ছাড়ে পঞ্চা। ভেতরে ভেতরে স্বপ্নের লক্ষপতি জানোয়ারটা জেগে ওঠে। কাপড়টা পা পর্যন্ত উঠে গেছে। খবরটা জানতে পেরে চিরুনি তল্লাসী মাছিগুলো ভনভনিয়ে উড়ে আসে। আবার কাপড়টা টেনে পা পর্যন্ত নামায়। এই কাপড়টা আছে বলেই পঞ্চার এক ধরনের স্বস্তি। না থাকলে মাছিগুলো ওকে বিরক্ত করত। তাই কাপড়টার প্রতি এক ধরনের মায়া তৈরি হয়ে আছে পঞ্চার। তাছাড়াও আর একটা কারণে কাপড়টার প্রতি মায়া। সেটা হচ্ছে ভেক ধরা। ভেক না ধরলে ভিক্ষা জুটে না, একথাটা খুব ভালভাবে জানা তার। তাই ভেক ধরতে কাপড়টা তার খুব জরুরি।

পঞ্চা। পঞ্চানন কর্মকার। বাপের নাম ভূতনাথ কর্মকার। এই পঞ্চা ছাড়াও আর একটা সৌখিন নাম অবশ্য তার আছে—সুশোভন। কিন্তু কেউ তাকে ঐ নামে চিনে না। জানে না। ডাকে না। বাপের দেওয়া নাম বাপের মুখেই মিলিয়ে গেছে। আজ পঞ্চা বললেই লোকে বুঝে নেয় তাকে। এক সময় কত গণ্যমান্য লোক তাকে কত খাতির করত। পঞ্চার হাতে মিষ্টি খেয়ে তারিফ করেনি এমন লোক দেশে ভার। মিষ্টির কড়ায়ে বসলেই, টেবিল থেকে উড়ে আসত—আঃ মিষ্টি নয়রে, স্পঞ্জের একটা কিছু! চাপ দিলেই চুপসে যায়, ছেড়ে দিলেই আবার যে কে সেই! এর একটা অন্য কিছু নাম দে পঞ্চা। রসগোল্লা নামে মানায় না। দেশের মানুষ নতুন একটা কিছুর নাম জানুক। কথাগুলো শেষ হলেই পঞ্চার মুখের ভেতর গুরুগম্ভীর হাসিটা বুক ঠেলে বেরিয়ে আসতো। সাবাস পঞ্চা! সাবাস! বাপের সুপুত্তুর! সুশোভন! তখন শহর জুড়ে পঞ্চার কত নাম! না ঠিক শহর নয়। আধা শহর বলত লোকে। নাকি মিনি শহর। কেউ কেউ বলত বড় গেরাম। কত বড় গেরাম গো! সোনামুই গেরাম! পঞ্চা আমাদের সোনামুই গেরামের মুক গো! তারপর গ্রামটা ধনে জনে বাড়তে থাকল। পঞ্চার নামও বাড়তে থাকল শহর জুড়ে। দেশে ডাক এল। দুর্গাপুর, আসানসোল, বাঁকুড়া, বর্ধমান, পুরুলিয়া, মেদিনীপুর ইত্যাদি ইত্যাদি। শরীরে পঞ্চার তাগদ এল। কবি সাহিত্যিকরা পঞ্চাকে নিয়ে কবিতা লিখল। গান হল। জনে মানে শিক গাঁথল মতলববাজ মানুষ। ভুবন বাড়ুজ্জের পোকা খাওয়া দাঁতে খিল খিলিয়ে উঠেছিল হাসি। কিছুটা উৎকণ্ঠা। —তোর একাজে কত আসে পঞ্চা?

—সে আর কত হবে গো, দিন গেলে নয় টাকা।

—এ টাকায় তোর সংসার চলে?

—তোমাদের আশীর্বাদে কোনো রকম।

—তোর মেয়েটার কত বয়স রে?

—তা নয় নয় করে বারই পা।

—মেয়ের জন্য ভাবছিস কিছু?

—কী আর ভাববোগো? গরিবের ছা...

—এই গরিব গরিব করেই কেবল চেঁচিয়ে যা। গরিবটাই তোদের সাধের রে। পোষ বানানো বুলি...।

—পোষ বানানো বল না গো ভুবনদা।

—নয়তো বলব কী? বড় হওয়ার চেষ্টা করেছিস কোনদিন?

—কী করেই আর করি?

—কী করেই আর করি! ভেঙে ওঠে ভুবন বাড়ুজ্জে। পোকা খাওয়া দাঁত উদম করে ফুলে ওঠে মাড়ি। ভুবনের ছল চাতুরিতে জখম পঞ্চা। ভুবনকে নেতা বানানো আর নিজেকে কন্যাদায়ের হাত থেকে বেঁচে ওঠার যন্ত্রণা লাঘব করার উদ্দেশ্যে পুলিশের চোখকে ধুলো দিয়ে ভোটের ব্যালট বাক্স হাত দেয় পঞ্চা। কিন্তু পুলিশের চোখ এড়ানো যায় না। এড়ায় না। ফলে ধরা পড়ে যা হয় তাই। জেল। কয়েকটা বছর জেল খেটে ফেরে চোর পঞ্চা। কিন্তু কারিগর পঞ্চা আর ফেরে না। কাজে মন নেই। হাতে কাজও নেই। কে আর আগের মতো ডাকে? কেউ ডাকে না। না সোনামুখী, না বাঁকুড়া না বর্ধমান। কেউ না। ওদের ডাকার অপেক্ষাতেও নেই পঞ্চা। ডাকলে যে কাজ করবে সে কথা কে বলে? কারিগর শব্দটা ওর দেহ থেকে মুছে দিতে চায়। ঝেড়ে দিতে চায়। ফেলে দিতে চায়। কাজ করব না এই রকম একটা ভূত চাপে মাথায়। অথচ এই না করার কোনো সঙ্গত যুক্তি নেই। করব না। করব না। আমার ইচ্ছা আমি করব না। ব্যাস। এটাই তার নিজের প্রশ্নের কাছে সাফ উত্তর। তাহলে তুমি করবেটা কী বাবা পঞ্চা? ভিক্ষা করব। শহরে শহরে, দোকানে, দোকানে, বাসে বাসে। একটা পয়সা দাওগোবাবু বলে হাত বাড়ালেই তো অনেক পয়সা উড়ে আসে। এতে লজ্জার কি?

—ঐ পয়সাতে তোর সংসার চলবে তো?

—আমার সংসার নেই। নিজের ভেতরের প্রশ্নগুলো নিজের ভেতরে উত্তর হয়ে মিলিয়ে যায়।

মদের নেশায় টইটম্বুর হয়ে দাবনা গেদে দেওয়ালে ঠেস দিয়ে বসলেই, বৌ মালতির কণ্ঠ থেকে বেরিয়ে আসে একরাশ হা-হুতাশ।

—আর পারছি না গো। এবার যা হোক কিছু একটা কর।

প্রথম প্রথম বৌ-এর হা-হতাশে রা কাটত না পঞ্চা। নীরবের শত্রু নেই। থাম্বা বা পিলারের কেউ শত্রু থাকে না। কেন না, ওরা কথা বলে না। মুক, অসাড়। পঞ্চাও ঘরের লোনা ধরা থাম্বা বনে থাকতে চায়। তাই মালতির হাজার কাকুতি-মিনতির পরও মুখে রা ফোটাতো না পঞ্চা। কিন্তু মানুষের অন্তরতম স্বভাবকে দূরে ঠেলে রাখা বড় দুঃসাধ্য। মনের অবচেতনে কেবলই সে বাহিরেতে চায়। কথার বাঁকে বাঁকে উঁকি মারে। বুকের ভেতর প্রতিকারের জেদটা শিকড় ছড়িয়ে বাড়তে থাকে।

যৌবন মেয়েকে গ্রাস করেছে। এ'কথা মিনতির মতো পঞ্চার চোখেও ধরা পড়ে। মেয়ে নাইতে গিয়ে ফিরে আসলে সেই দৃশ্য ধরা দেয়। কিম্বা কলসী কাঁখে জল আনলে, কলসীর ভারে জামা টান হয়। আর তখনই মেয়ের বাড়ন্ত শরীর নতমুখে যৌবনের কথা বলে। অল্পক্ষনের জন্য হলেও মেয়ের মায়া ভরা মুখটা পঞ্চাকে বিদীর্ণ করে। তারপর একটা দীর্ঘ-শ্বাসের শেষে মেয়ের মায়া মায়া মুখটা তীব্র বিরক্তিতে পঞ্চার কাছ থেকে দূরে সরে যায়।—মেয়ে হয়ে কি আমার মাথা কিনে রেখেছিস? তুই যা খুশী কর। তোর খুশী অখুশীতে আমি নাই। তোর পায়ে আমি তো আর শিকল বেঁধে রাখি নাই। পারিসতো ভাব-টাব করে কেটে পড়।...

—কৈ গো কিছু করছ না যে। আর কত দিন আমার হাড় চিবোবে? মালতির কথায় রাগ হয় পঞ্চার। মনে মনে বলে—যতদিন বাঁচব ততদিন তোর হাড়মাস খাব।

—লক্ষ্মীটি শোন আমার কথা। একটু বোঝবার চেষ্টা কর। কিছু একটা না করলে কী করে চলে? এতগুলো পেট সামলাব কী করে? কেন তুমি কিছু করছ না? আমি কি তোমাকে কোনো দিনের জন্য ভুল বুঝেছি? আমিতো জানি তুমি ইচ্ছা করে চুরি কর নাই। না বুঝে করেছ। ভুবন বাড়ুজ্জে তোমাকে এমন খারাপ কাজে নামালেক। আমার সোনার সংসারটা জ্বলে গেল ওর লেগে। মাথায় বাজ পড়ুক। আর কিছু বলব নাই, মাথায় বাজ পডুক।

মালতি পঞ্চার মাথার পাকা চুল খুটতে খুটতে ডুকরে ওঠে।

পঞ্চা একটা কালো মিসমিসে পাথর।

—কত লোক তো জেল খাটে। তারাতো তোমার মতো অমন হয় না। তুমি যেন দিনকে দিন কেমন হয়ে যাচ্ছ। তোমার কত মানসম্মান ছিল। কত লোক তোমার খোঁজ করত। কেউ যদি এসে বলত, অমুক আছে গো? আনন্দে হারিয়ে যেতাম, নিজেকে তোমার বৌ ভেবে। আবার নতুন করে সব কিছু গড়তে পার না?

পঞ্চা নীরব।

মালতি পঞ্চার মুখের সামনে আসে। —কী গন্ধ তোমার মুকে?

মনে হয় একটা বোতল পুরো খেয়েছ। লক্ষ্মীটি অত খেয় না, হাড়গুলো বেরিয়ে গেছে। কম করতে করতে একেবারে ছেড়ে দাও। মালতির নরম হাত পঞ্চার দেহে আকলি কাটে।

পঞ্চার মুখ আষাঢ়ে মেঘ।

—পুঁটির কথা ভাবছ কিছু? মেয়েটা যে থুবড়ী হয়ে গেল। আর কেউ বিয়ে করবে করবেক?

—না করলে আমার কী গেল?

—সে কি, সংসারটা যে তোমার।

—আমার কোনো সংসার নেই।

অমন কথা বল না। বলতে নাই। লক্ষ্মীটি আমার কতা পায়ে ঠেল না। তুমি সব কিছু ভুলে যেয়ে আবার নতুন করে কাজ শুরু কর। কারিগর হও। দেখবে দেশ জুড়ে তোমার কত নাম! দেখবে কত লোক খাতির করবেক তোমাকে। আবার কত কত লোক আমার কাছে তোমার খোঁজ করবেক, অমুক আছে গো...?

সজোরে একটা লাথি এসে পড়ে মালতির পেটে। মালতি উল্টে পড়ে। পুটি রাগে গরগর করতে করতে যৌবন ভরা কলসী কাঁখ থেকে নামাল।

—তোমার লাজ লজ্জা বলে কিছু নাই? মা-টা পরের দুয়ারে খেটে খেটে মরছে, আর তুমি মদ গিলে...

—বেশ করেছি।

—খুব পৌরুষ ফুলিয়েছ। অলস মাথা শয়তানের কারখানা।

—এই যা তা বলবি নাই বলে দিচ্ছি।

—তোমার লাজ নাই? লজ্জা নাই? বৌকে খেতে দিতে পারে না। মেয়েকে খেতে দিতে পারে না।...।

—আমার বৌ নাই। আমার মেয়ে নাই।

—হ্যাঁ আমি উড়ে এসেছি।

পঞ্চা রা কাটে না।

—কী দরকার ছিল জন্ম দেওয়ার? জন্ম দেওয়ার আগে তুমি কি আমার অনুমতি নিয়েছিলে?

পঞ্চা মেয়ের কথায় হেরে যায়। কথার পিঠে আর কথা জুড়তে পারে না। কি বিচ্ছিরি কথা। জন্ম দেওয়ার আগে কেউ কারু অনুমতি চায় নাকি? একি মাটির ঠাকুর গড়া? স্বপ্নে দেখা দিয়েছে বলেই ঠাকুর গড়েছি। তা-তো নয়। দুটো শরীর কতবার স্বর্গসুখ ভোগ করলে, তবে একটা জীব। পঞ্চার মাতাল মাথায় কথাগুলো বার বার ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায়।

—বেরিয়ে যাও। বেরিয়ে যাও আমার সামনে থেকে। এ মুক যেন আর দেখতে না হয়। অমন বাপের প্রায়ছিত্ত করি। মালতি কাঁপা কাঁপা গলায় বলে, অমন করে বলিস না পুটি। ওকে আসতে আসতে যেতে বল।

পুটি এত দিন কিছু বলেনি। বাপের কাজে অকাজে চোখ দেয়নি। কিন্তু আজ আর ছাড়বে না। এত বড় মেয়ের চোখের সামনে তার মাকে পড়ে পড়ে বাপের লাথি খেতে দিবে না।

—এখনো বসে রইলে যে। বেরিয়ে যাও বলছি। অমন বাপের মুকে আগুন...

—তাই যাচ্ছি। থাক তোরা মা বেটিতে। আর এমুক করছি নাই। একটি মাত্র পেট। সে যেমন করেই হোক চালিয়ে নিব। ভাবচিস আমার খাবারের অভাব। দেকি এ ঘরে না এসে কেমন না চালাতে পারি? মুখে বিড়বিড় করতে করতে গায়ে জড়ানো বৌ-এর শতছিন্ন কাপড়টা কাঁধে তুলে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে পঞ্চা। সেই থেকে আর ঘর ঢুকেনি।

এক বিছানার মানুষ দিনান্তে যদি একবার দেখা না মিলে তাহলে কাছের লোকের কাছে একটা শূন্যতা সৃষ্টি হয়। মালতি বলে—মানুষটা ঐ রকম ছিল না রে! ভাল মানুষ! কিন্তু কী করে যে কী হয়ে গেল। সবই বিধাতা...। তুই একবার যা মা, তোর বাবাকে ডেকে আন।

পুটি বারে বারে গেছে কিন্তু ফিরেনি।

'প্রতীক্ষালয়ে' বসে বসে পঞ্চা কাশীনাথ হিন্দু হোটেল'-এর ভেতর চোখ চালাল। এই চেখ দুটিতো তার অবশিষ্ট আছে। বাকি সব অঙ্গ বিকল প্রায়। চোখগুলো এখনো বেইমানি করেনি বলেই এখনো ওর পৃথিবীতে বেঁচে থাকা। মা দুর্গা পট আঁকা ক্যালেন্ডারটার নীচেই ইলেকট্রনিক্স দেওয়াল ঘড়িতে তিনটা পনেরো। পঞ্চা চমকে ওঠে। তিনটে দশেতো বাস ছিল। এল না কেন? বাসটা এল না মানেই ভাল কনডাক্টটরটা এল না। তাহলে রাতের খরচ? এসব ভাবতে ভাবতে মনটা বিষণ্ণতায় ভরে যায়।

আকাশ কালি মেঘ জ্যৈষ্ঠের রোদকে ঢেকে দেয়। পেছনে পেছনে হয়তো বৃষ্টি। রাস্তায় ধুলোর ঘূর্ণি উড়াতে উড়াতে ছুটে আসে একটা ভেড়ুল। পঞ্চা সামনে বেশ কিছুক্ষণ থিতু হয়। পঞ্চা চোখ বন্ধ করে। সঙ্গে সঙ্গে বাসটার কথা মাথায় চেপে বসে। —কেন এল না? কনডাক্টর লোকটা ভাল। প্রতিদিন তাকে দুটো টাকা দেয়। আর দেয় বলেই ওর ঘর যাওয়ার প্রয়োজন হয় না। নিজের জগতে নিজেই বিচরণ করতে পারে।

ধুলো বালি পরিষ্কার করে ভেড়ুলটা মিলিয়ে গেল। পঞ্চা চোখ মিলে তাকাল রাস্তার দিকে। রাস্তায় পুটি। পুটিকে দেখেই পঞ্চা চাটায় গুটানোর মতো গুটিয়ে যায়। রাগে চোখ দুটো জ্বলে ওঠে।

—আবার এয়েচিস কেনে?

—তোমাকে নিয়ে যেতে।

—আমি যাব নাই।

—চল না বাবা।

—আমাকে বিরক্ত করিস না। আমি যাব নাই।

—মা কাঁদছে। কাল পরশু খায় নাই। এত করে বলেছি খেতে, বলছে তুমি না গেলে খাবেক নাই।

—আমি তোদের সংসারে কে?

—তুমি আমার বাবা।

—না আমি তোর বাবা নই। আমাকে বাবা বলে ডাকিস না। আমি বাবা নই। আমি বাবা নই...। পঞ্চা ডুকরে ওঠে।

—অমন কথা বল না বাবা। তুমি ছাড়া আমাদের সংসারে আর কেউ নাই।

পুটির ঠোঁট ফুলে ওঠে। জোরে হর্ণ দিয়ে বর্ধমানগামী বাসটা দাঁড়াল। পঞ্চা পুটিকে ঠেলে দিয়ে বাসের দিকে ধেয়ে যায়। পুটিও বাবার পেছন পেছন। পঞ্চা তড়তড়িয়ে ওঠে যায় বাসে। পুটি বাবার গায়ে লেপ্টে থাকা মায়ের শতছিন্ন কাপড়টা টেনে ধরে বাধা দেয়।—যেওনা বাবা। নেমে এস...। বাসটা একটা জোরে ঝাঁকুনি দিয়ে চলতে শুরু করে। পুটি স-জোরে টেনে ধরে আছে বাবার গায়ে লেপ্টে থাকা কাপড়টা। যেতে দিবে না। বাসটাকে গায়ের জোরে আটকে দিবে। যেওনা। যেওনা। বাবা তুমি নেমে এস। বাবা তুমি...। বাসটা ছুটছে সামনের দিকে। পুটি দাঁড়িয়ে আছে। বাবার গায়ের শতছিন্ন কাপড়টা তার হাতে। পুটি জানে, এই কাপড়টা দিয়েই তার বাবার পায়ের দগদগে খতটা মশা মাছির হাত থেকে রক্ষা করে। কিন্তু আজ আর পাবে না। হাত নেড়ে নেড়ে এক সময় বাবার জীবনটাই হয়তো...। একটা তীব্র যন্ত্রণা নিয়ে পুটি দাঁড়িয়ে রইল চলমান বাসটার দিকে চেয়ে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%