জয়দেব দত্ত
কাজলডাঙা যাবো। ককখনো যাইনি সেখানে। রাস্তা ঘাট অজানা। অজানা অচেনা রাস্তা হয়ে যেতে ভাল লাগে। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাতড়ে হাতড়ে যাওয়া। এই যাওয়ার ভেতর এক ধরনের মাদকতা থাকে। নেশায় বুঁদ হয়ে যাওয়া। এমন নেশা মাথায় কার না কাজলডাঙা যেতে ভাল লাগে? তাই আমি এভাবেই কাজলডাঙা যাব। কাউকে কিছু বলা কওয়া না করেই।
এই কাজলডাঙায় যাওয়া আমার অনেক দিন-এর নেশা। যাব যাব করে যাওয়া আর হয় না। বর্ষায় সবে হালে পানি পড়েছে। মাঠ ভর্তি কেজো লোকের থিক থিক ভিড়। লাঙল জোয়াল কাঁধে নিয়ে বর্ষার চাষটুকু সেরে নিই। তারপর ভাদ্র আশ্বিন না হয় চাষের লম্বা ছুটি। সেই ছুটিতেই একদিন হুট করে বেরিয়ে গেলেই হল। সেই আশাতেই বর্ষার কাজকাম সব সারা হল। সারা তো হল। কিন্তু ওদিকে যে ধানের গুছি লকলকিয়ে বেড়ে উঠেছে। সেই সঙ্গে সমান তালে ঘাস। জমিতে নিড়ান চাপান দিয়ে না হয় কাজলডাঙা যাওয়া যাবে, তাতে কি? জমিতে নিড়ান চাপান দেওয়া হল। জমিতে নিড়ান চাপান তো দেওয়া হল, কিন্তু এদিকে যে পোকার উপদ্রব খুব। পোকাতে শুষে নিচ্ছে গাছের পাতা, গোড়ার রস। জমিতে স্প্রে করে পোকা-টকা মেরে না হয় একেবারে নিশ্চিন্ত হয়ে যাওয়া ভাল। কোথাও যাওয়ার ব্যাপারে পেছু টান থাকা ভাল নয়। সেই উদ্দেশ্যে ড্রাম কাঁধে নেওয়া। কন্তু পোকা এত রক্ত বীজের জাত যে সামনে স্প্রে করে পোকা মেরে মেরে যাচ্ছি তো, পেছনে পেছনে পোকা ডিম ফুটে বাচ্চা হয়ে সামনের দিকে ধেয়ে ধেয়ে আসছে। এইভাবে যাই যাই করে কাজলডাঙা যাওয়া আর হয় না। আজ এসবের কিছু বাতিক নেই। যাব তো যাবই। এবং কাউকে কিছু বলা কওয়া না করেই। হুট করে বেরিয়ে যাব।
ঘরে লাঙল জোয়াল গরু বাছুর আছে থাক। ওদেরকে দেখভালের জন্য অন্য লোক আছে। এ পৃথিবীতে তো আমি একা জন্মাইনি। ঘরে যেমন গরু বাছুর আছে, মানুষজনও তো আছে। যখন আছে তখন গরু বাছুর খেতে পাবে ঠিকই। ঠিকই বেঁচে থাকবে তারা। এসবের দিকে এখন আর আমার চিন্তা নেই। এখন আমার চিন্তা কাজলডাঙা যাবার।
যাওয়া মানে তো বেড়ানো। ঘুরে ফিরে দেখা। ঘুরে-ফিরে দেখতে কার না মন চায়? কিন্তু সমস্যাটা হয় এ সংসারটাকে কেন্দ্র করে। সংসারে যে এত মায়া! সে থাকে কোথায়? তার কি নির্দিষ্ট কোনো জায়গা আছে? না-হ। একেই বলে মায়ার বন্ধন। যাব যাব করে যাবার সময় হলেই বার হতে মন কু গায়। এ যেন কচ্ছপের খোলের ভিতরে থেকে মুখ বার করার মতো মনে শখ, একটা পুকুরের বন্দি মুক্ত হওয়ার। আরও আরও অনেক অনেক পুকুর দেখার। সেই উদ্দেশ্যে খোলার ভিতর থেকে মুখ বার করে, পুকুর ছেড়ে কয়েক পা হাঁটলেই, পুকুরটা আবার টেনে নেয় নিজের গর্ভে! ফলত কচ্ছপের মুখটা আবার খোলের ভিতর ঢুকে যায়। এ যেন তাই।
ঠিক এভাবেই আমার গুরুদেব শচিকাকু কোনোদিন আর কাজলডাঙা গেলেন না। কেবল যাব যাব করেই কাটিয়ে দিলেন। অথচ কাজডাঙা নামটা শচিকাকুর মুখেই শোনা। শুনেছি জায়গাটা বেশ। যখনই বার হই মন কিন্তু বাইরের দিকে সায় দেয় না। কেবলই কু গায়। এই যেমন আমার মন কু গাইছে। টেবিল, আয়না, চিরুনি, ঘরের দেওয়াল, দেওয়ালে পেরেক টাঙানো জামা কাপড়, সব আমাকে কেমন টানছে। আর এই টানের কারণেই বোধ হয় শচিকাকুর কাজলডাঙা যাওয়া হল না।
সেই শচিকাকু না যাক আমাকে কিন্তু কাজলডাঙা যেতেই হবে। ঘরের মায়া পড়ে খাক ঘরে। মল্লে তো আর এগুলো সঙ্গে যাবে না। সব পড়ে থাকবে। মনে জোর বাঁধলাম।
পেরেক ঝোলানো শান্তিনিকেতন ব্যাগ। আর ব্যাগের ভিতর একটা খাতা ও খানকতক কলম ফেলে ব্যাগটা কাঁধে তুললাম।
ঘর থেকে বেরিয়ে হন হন চলছি।
আমাদের ঘর থেকে কয়েক পা হাঁটলেই একটা তেমাথা। তেমাথার বাঁ দিকে একটা তালপাতা ছাওনি কালীমাতার ঘর। সেইজন্যই জায়গাটার নাম কালীতলা। কালীতলার ডান ধার বরাবর প্রধানমন্ত্রী সড়ক যোজনা সরুপিচ রাস্তা কেলেঙ্গা সাপের মতো এঁকে বেঁকে চলে গেছে। সেই আঁকা-বাঁকা রাস্তা হয়ে আমি হাঁটছি হন হন।
আর একটু হাঁটলেই মোড়লপাড়া। মোড়লপাড়া হয়ে কয়েক পা হাঁটলেই চৌমাথা। চৌমাথার বাঁ পাশ বরাবর সোজা পিচরাস্তা চলে গেছে সোনামুখী। ডান পাশে অমৃত পাড়া যাবার রাস্তা।
অমৃতপাড়া পিচ রাস্তা নয়। লাল মোরাম রাঙানো সরু কাঁচা রাস্তা।
আচ্ছা কাজলডাঙা যাবার রাস্তা কোনটা? ঝাঁ চকচকে পিচ রাস্তা? না কি লাল মোরাম রাঙানো সরু কাঁচা রাস্তা? কোনটা?
আচ্ছা, কাজলডাঙা কি শহর? হয়তো হতে পারে। আবার নাওতো হতে পারে। হয়তো কোন আধাশহর। কিম্বা শহরতলি, কিম্বা আস্ত পাড়া গাঁ। এ বিষয়ে আমার কোন কাসুন্দি জানা নেই। কেবল শচিকাকুর মুখে কাজলডাঙার নাম শুনেছি মাত্র। শুনেছি কাজলডাঙা যেতে হলে নদী পার হতে হয়। এ পর্যন্ত। এর বেশি কিছু আমার জানা নেই। মোট কথা হলো কাজলডাঙার উদ্দেশ্যে যখন বেরিয়েছি আর পৃথিবীতে কাজলডাঙা বলে যদি কিছু থাকে তাহলে তাকে খুঁজে বার করবই, করব।
আমি বুঝতে পারছি, মন আমার লাল মোরাম রাঙানো সরু কাঁচা রাস্তার দিকেই সায় দিচ্ছে বারে বারে। বাধ্য হয়ে পাগুলো ছুড়ে দিলাম মোরাম রাঙানো রাস্তায়। ধুলো উড়ছে রাস্তার চারপাশে। লাল লাল ধুলো। ধুলোতে আমার পা-এর তল লাল হয়ে গেছে। শুধু কি পা? গা-এর রঙ লাল হয়ে যায়নি কি? চোখ, মুখ, কান, নাক, কপাল, মাথার চুল? সব লাল হয়ে গেছে। যেমন আমি এখন লাল মাটির মানুষ।
আচ্ছা, কাজলডাঙার মানুষগুলো কি লাল? আর সেখানে যারা যায়, তারা প্রত্যেকেই কি লাল মানুষ হয়ে যায়?
লাল মোরাম রাঙানো রাস্তা বরাবর খানিকটা হাঁটলেই সরু একটা 'বোদাই' নদী। বোদাই নদীর চারপাশে সবুজের সমারোহ। এর উপর নির্ভর করেই গাঁ-গঞ্জের মানুষের দিন গুজরান। বোদাই নদীর হাঁটুজল পার হলেই মোরাম রাঙানো রাস্তাটা মরে যায়। তারপর লাল পলির আস্তরণ, গরুর গাড়ির যাওয়ার মতো একটা সরু রাস্তা। সেই রাস্তা হয়ে হাঁটছি টুকটাক।
এই মুহূর্তে আমার নিজস্ব সম্বল বলতে খাতা আর কলম। সেইগুলি আমার কাঁধে ঝোলা ব্যাগের ভেতর আছে। ব্যাগটা টিপে ধরে আছি দু'হাত দিয়ে।
বোদাই পার হলেই বাঁশবন। বাঁশবন শেষ হলেই শুরু হয় শর আর বেতবন। রাস্তার দু'পাশে শরঝাড়। শরের পাতা তীখনো করাতের মতো হাঁ হয়ে পড়ে আছে রাস্তার উপর। করাতপাতার সতর্কতা মাথায় নিয়ে হেলে দুলে হাঁটছি।
শরবন শেষ হলেই শুরু হয় বেতবন। বেতবনের বৈশিষ্ট্য হল একবার কারু কাপড়ে লেগেছে তো পুরো কাপড় খুলিয়ে ছাড়ে। সেই কাপড় খোলা বেতবনের ভেতর আমি হন হন এগিয়ে যাচ্ছি।
রাস্তার দু'পাশে চোখ চালালে দেখতে পাওয়া যায় আলুক্ষেত। আলুরচাপে খেত থেকে গম-যব, সরষের মতো ফসল চাষ প্রায়ই উঠেই গেছে।
আচ্ছা, এর পূর্বে আমি কি কখনো এ রাস্তা হয়ে হেঁটে এসেছি? হ্যাঁ। সে একটিবার মাত্র। সেবার পনেরো বিঘার মতো জমি লিজ নিয়েছিলাম গুড়ভাঙাতে। আলুচাষে খুব লাভ, খুব পয়সা। এইভেবে বড়শি গেঁথেছিলাম। তর্কে-তর্কে। আমাদের 'ঊষা' গোষ্ঠির সদস্যরা এসেছিল। পিকনিক করতে। পিকনিক খেতে খেতে শচিকাকু দাঁত উঁচিয়ে হেসে উঠেছিল খল খল। খলবলিয়ে বেড়ে ওঠা আলুর লত দেখিয়ে বলেছিল, আমাদের কবি সাহিত্যিকদের হতে হবে বেড়ে ওঠা আলুর মতো সবুজ এবং চিকন। খলবলিয়ে বেড়ে উঠতে হবে—আকাশ পানে। রীতিনীতি এবং সামাজিক ধ্যান ধারণার ঊর্ধ্বে নিজেকে বিলিয়ে দিতে হবে সবার অলক্ষ্যে। উপরে লতা, ভিতরে ফল। অর্থাৎ অন্তরমুখী। যত খুঁড়বে—তত ফল। কথা শেষে হো হো হেসে ওঠেন শচিকাকু। তারপর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে নাচ। এঁটো হাতে নাচতে নাচতে গায়ে জড়িয়ে থাকা জামা কাপড় খুলে ফেলেন শচিকাকু।
ন্যাংটো শচিকাকু নাচতে নাচতে আলু পাতা হয়ে গেছেন। কী সুন্দর গা-এর রং। যেমন চিকন, তেমনি সবুজ! বাতাসে মাথার চুলগুলো উড়ছে। যেন বাতাস ঢেউ খেলছে আলুপাতায়। আমার মন বলছে, ওর গাটায় আঙুল বসিয়ে কুড়ে কুড়ে আলু বার করি। আলু তো আর উপরে থাকে না। মাটির নীচে ফল। সেই মাটির নীচে চোখ চালানোর চেষ্টা করি।
শচিকাকু আমাকে ঈশারায় ডাকছেন, আয় আয়-নাচবি আয়...।
আমি শচিকাকুর ডাকে সাড়া দিতে পারিনি। কেন না, আমি তো আর আলু লতা হতে পারিনি।
শর আর বেতঝোড় টপকে টপকে এগিয়ে যাচ্ছি। আমাকে যেতে হবে কাজলডাঙা। যেভাবেই হোক, যে করেই হোক আমাকে যেতেই হবে।
শর আর বেতঝোড় শেষ হতেই আমার চলার পথ শেষ হয়ে গেল। তাহলে পথ কি এখানেই শেষ? দুর ছাই পথের কি কোথাও শেষ আছে? এক পথ শেষ হলে শুরু হয়ে যায় আর এক পথ। এ যেন ঠিক ঐ জীবনের মতো। এক দেহ পাল্টে অন্য দেহ ধারণ করার মতো। রাজপথ শেষ হলে শুরু হয় গ্রাম ও সড়ক যোজনা। গ্রাম ও সড়ক যোজনা শেষ হলেই শুরু হয় মোরাম রাস্তা। মোরাম রাস্তা শেষ হলে শুরু হয় পলি রাস্তা। পলি রাস্তা শেষ হলে, শুরু হয় মেঠো এল পথ।
এখন আমাকে মেঠো এল পথ দিয়ে হাঁটতে হবে।
জমির মাথায় মাথায় সরু সরু এল পথ। সেই এল পথ হয়ে হেলে দুলে হাঁটছি। ডান পা-এর পর বাঁ পা, বাঁ পায়ের পর ডান পা। হিসাবের যদি একটু এদিক ওদিক হয়েছে তো, থোড় বড়ি নিয়ে একেবারে জমির মাঝে।
আচ্ছা কাজডাঙা কোন দিক? পূর্বে-পশ্চিমে, উত্তরে না দক্ষিণে? দূর, পৃথিবীর বিচারে পূর্ব-পশ্চিম বলে কিছু আছে কি? পৃথিবীটাতো গোল। একটা গোলাকার বস্তুর পূর্ব-পশ্চিম বলে কি থাকতে পারে? বিশেষ করে সে ঘূর্ণীয়মান। সূর্যের চারপাশে ঘুরছে। অবিরাম ঘুরছে।
তাহলে কাজলডাঙা কোথায়? কোনখানে গেলে পাওয়া যাবে তাকে?
শুনেছি নদী পার হলে কাজলডাঙা। নদী বলতে কোন নদী? গঙ্গা যমুনা বিয়াস না ব্রহ্মপুত্র?
দুর-পাগল, নদী কি পৃথিবীতে লক্ষ লক্ষ আছে নাকি?
নদী মানে জল আর কাদা বালি। তিনভাগ জল আর একভাগ স্থল। জল আর স্থলের সংমিশ্রণ, নদী।
তাহলে সামনে ঐ সাদা মতো ওটা কি নদী? ঐ নদী পার হলেই কি কাজলডাঙা। সামনের দিকে তাকালাম। তাকাতেই ধোঁওয়ার মতো আকাশ। আকাশে ধোঁওয়া নয়, জলীয় বাষ্প। জলীয় বাষ্প দেখে দেখে হাঁটছি, নদীর সন্ধানে। যদি নদী পাওয়া যায় তো কাজলডাঙা পেয়ে যাব।
ডান পা বাঁ পা করে হাঁটছি। হাঁটার বিরাম নেই। দূরে ধোঁয়াটে আকাশ।
হঠাৎ আবিষ্কার করলাম, কেবল দূরে ধোঁয়াটে আকাশ নয়, আমার মাথার উপর আকাশও ধোঁয়াটে। মনটা আনন্দে ভরে গেল। তাহলে নদী পেয়ে গেছি।
পা-এর নীচে অভ্রের মতো চিকচিকে বালি। বলিতে আমার পায়ের ছাপ পড়ছে। তার মানে পা এর ছাপের ভেতর আমি নদীতে থেকে যাচ্ছি। আমার খুব আনন্দ হচ্ছে। এতদিনে আমি নদী এলাম। নদীতে অবগাহন করছি।
নদীতো এলাম এবং অবগাহনও করছি! কিন্তু কাজডাঙা? সেখানি কোথায়?
নদীর বালির বুকে একখানি পোড়া কাঠ আবিষ্কার করল আমার চোখ। মুহূর্তে আমার বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেল। এই তো সেদিন সকালে গৌরদা ফোন করেছিল আমার ঘুম না ভাঙতেই। ফোনটা বৌদি ধরেছিল। ফোনে গৌরদার কাঁপা কাঁপা কন্ঠস্বরে মরা খবর।... অরুকে তাড়াতাড়ি পাঠিয়ে দেন।
মুখে হাতে জল না দিয়েই সাইকেলে প্যাডেল ঘোরাতে ঘোরাতে একেবারে শচিকাকুর ঘর। ঘরের ভেতর দেখি শচিকাকু নেই, পড়ে আছে তাঁর নিথর দেহ। পা এর নীচে বড় মেয়ে আর মাথার সামনে ছোট হাপুস নয়নে কাঁদছে। কেঁদে ভাসিয়ে দিচ্ছে। শ্মশানের চিতায় শোয়ানো হল শচিকাকুর নিথর দেহ। বুক বরাবর একটা কাঠ চাপা দিলাম। তারপর চিতাসহ শচিকাকু দাউ দাউ জ্বলে উঠলেন।
যে হাত দিয়ে শচিকাকু আমার মাথায় স্নেহের পরশ বুলাতেন, যে আঙুলগুলি দিয়ে সাদা খাতার উপর খস খস কবিতা লিখতেন, সেই হাত—সেই আঙুল দিয়ে নীল নীল আগুন বেরিয়ে বুকের উপর নামানো কাঠটাকে পুড়িয়ে দিচ্ছে।... আমি জানি শচিকাকু আর আমাদের মধ্যে বেশিক্ষণ থাকবেন না। চিতার উপর সাজানো নিথর দেহটা ছাই হয়ে যাবে। সেই ছাই বাতাসে উড়ে চিরদিনের জন্য নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। এতবড় মানুষটাকে চরাচর জুড়ে খুঁজলেও কোথাও পাওয়া যাবে না দুদণ্ড।...
এটা যদি সত্যি হয়ে থাকে, তাহলে শচিকাকুর বুকের মাঝ বরাবর নামানো পোড়া কাঠটা এ নদীতে এল কীভাবে? তলিয়ে যাচ্ছি। নদীর চাপ চাপ ধোঁয়া যেন আমাকে ঢাকা দিয়ে দিচ্ছে। নদীর বুকে যেন জীবাশ্ম হয়ে গেছি। হয়তো পৃথিবীতে আর থাকব না। পৃথিবীতে থেকে যাবে পা-এর ছাপ। নদী যেহেতু এই পৃথিবীর অংশ, সেই নদীতে আমার পা-এর ছাপ আছে। তার মানে পা-এর ছাপ নদীর বুকে থেকে যাবে যুগবৎ। তার মানে আমি নদীর বুকে থেকে যাব। হয়তো নদী হয়ে যাব একদিন।
না আমি নদী হতে চাই না। কাজলডাঙা যেতে চাই। কাজলডাঙা যাব বলেই ঘর থেকে বার হয়েছি, পোড়া পাঠের কাসুন্দি জানার জন্য নয়।
পোড়া কাঠ ছেড়ে নদীর সোজা হাঁটতে শুরু করলাম। কাঁধে শান্তিনিকেতন ব্যাগ। ব্যাগের ভিতর খাতা আর কলম। কাজলডাঙা কোথায় কেমন তা আমার জানা নেই। যদি সেখানে যাওয়া যায় তো তার একটা রূপরেখা খাতার উপর তুলে নেব, এই বাসনা। জোরে জোরে হাঁটছি। পা-এর চাপে বালি ভেঙে ভেঙে যাচ্ছে। শুধু ভেঙে ভেঙে যাচ্ছে না, তিড়িং তিড়িং লাফ দিয়ে মাথার উপরে উঠে যাচ্ছে যখন তখন। সমস্ত দেহ বালিতে ক্যাচ ক্যাচ করছে। মুখের ভেতরেও বালি ঢুকে গেছে। ব্যাগের ভেতরেও। বালির ভারে ব্যাগ কাঁধ থেকে নেমে যাচ্ছে।
না, ব্যাগ কাঁধ থেকে নেমে গেলে চলবে না। ওটা এখন আমার একমাত্র সম্বল। ওকে আমাকে এখন যত্ন করে বয়ে নিয়ে যেতে হবে, তা সে যত কষ্টই হোক।
ব্যাগ ঝেড়ে বালি ফেললাম। কাঁধটা এখন অনেক হাল্কা। মনে হচ্ছে, কাঁধে কিছু নেই, এমনি এমনিই হাঁটছি।
আবার সেই পোড়া কাঠটার কাছে এসে গেছি। ঐ তো সেই পোড়া কাঠটা।
আচ্ছা, এই কাঠটাই কি শচিকাকুর বুকের মাঝ বরাবর নামিয়ে দিয়েছিলাম? না তো, সেই কাঠটা তো শচিকাকুর নিথর দেহটার সঙ্গে ছাই হয়ে বাতাসে মিশে গেছে। তাহলে এই কাঠটা, সেই কাঠ হবে কেন? হয়তো আমার মতিভ্রম হয়েছে। মতিভ্রম ছাড়া আর কি? যে জিনিস পুড়ে ছাই হয়ে যায়, তাকে কি কখনো দেখা যায়? আমার মুখ বেয়ে এক চিলতে হাসি বেরিয়ে এল। মুখ টিপে হাসি থামালাম। হয়তো অন্য কোনো কাঠ।
আচ্ছা, প্রথমবারের দেখা কাঠটা কি দ্বিতীয় বারের দেখা কাঠ? একই কাঠকে কি বারে বারে দেখছি? সে হতে যাবে কেন? হয়তো প্রথম দেখা কাঠটা দ্বিতীয় থেকে আলাদা। হয়তো কোন গাঙের জলে ভেসে এসেছে। এমনটা হয় না কি?
সে হোক বা না হোক, তাতে আমার কিছু যায় আসে না। মোট কথা হল, মনে সন্দেহ হয়েছে। কাঠটা হাতে তুলে নিলাম। ইস, কাঠটা এত হাল্কা!
পোড়া কাঠ যে এত হাল্কা হয়, আমার অভিজ্ঞতা নেই। আমার অভিজ্ঞতা থেকেও কোনো কাজ নেই। কাঠ হাতে হুস করে বালির উপর বসে পড়লাম। বালির ভেতর গর্ত খুঁড়ে সোজা দাঁড় করিয়ে দিলাম। বার্ড পোটার মতো কাঠটা দাঁড়িয়ে রইল নদীতে।
কাঠ দাঁড়িয়ে থাক, আমি চলতে শুরু করি। কেন না, আমার দাঁড়িয়ে থাকলে চলবে না। আমার গন্তব্যে আমাকে যেতে হবে। দ্বিতীয়বার আসার আর সময় নেই। ঘরে কাজ কাম বিস্তর। ভাগ্য ভাল যে বলেকয়ে আসিনি। না হলে আসতে দিত ভেবেছ?
বালির উপর পা চালিয়ে জোরে জোরে হাঁটছি। হাঁটার ক্লান্তি নেই। ঈশ্বর আমার ক্লান্তি ক্ষমা করেছেন। না হলে বালির উপর হাঁটা আর কি চাট্টিখানি কথা?
বালি পার হলে জল। জল মানেই তো নদী না কী? সেই জলের সন্ধানে হাঁটছি। জল পার হলেই কাজলডাঙা।
ডান পা বাঁ পা করে হাঁটছি। কোথাও কোন জন মানুষের চিহ্ন নেই। একটা পাক পক্ষি পর্যন্ত না। সব শুনশান। নদীর বুকে কোন পা-এর চিহ্ন পর্যন্ত নেই। যেন কেউ এখানে আসেনি কখনো। হয়তো আমিই এই প্রথম মানব সন্তান। নদীর বুকের সন্তান। প্রথম চোখ মিলে দেখা সন্তান।
এক অদ্ভুত আনন্দ আমার মনের মধ্যে খেলা করছে! আমি যেন কী! কী একটা! মানব সন্তান নই! পক্ষিশাবক নই! কোন নিশাচর কিছু নই! উদ্ভিদকুল কিছু নই! কী যেন একটা কিছু নদীর বুকে ঘুরে বেড়াচ্ছি।
ঘুরে বেড়াচ্ছি না। নদীর বুকে হঁটছি। কেন না, হাঁটতে হাঁটতে কাজলডাঙা যেতে হবে।
...আবার সেই কাঠটা! এবার আর সেই কাঠটা নদীর বুকে পড়ে নেই। লম্বা বার্ড পোস্টের মতো সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাহলে কি সত্যি সত্যি আমার মতিভ্রম হয়েছে? নাহলে ঘুরে ফিরে সেই কাঠটার কাছে কেন? জোর করে কাঁদতে ইচ্ছা হচ্ছে, মনে হচ্ছে গোঁ গোঁ করে কাঁদি। সকলে শুনুক আমার কান্না।
কিন্তু শোনার মতো তো এখানে কেউ নেই। এখানে শত চিৎকার করে কাঁদলেও কেউ একটাও সান্ত্বনা বাক্য শোনাবে না। কান্নাটাই মিথ্যে হয়ে যাবে। বুঝতে পারছি কাজলডাঙার পথ হারিয়ে ফেলেছি। আমার মাথা ঠিক নেই। মাথাটা ধড়ের উপর আছে তো? সন্দেহ হতেই হাতটা উপর দিকে বাড়িয়ে নিশ্চিত হলাম, হ্যাঁ-ঠিক আছে। মাথা বলতে মুখ, চোখ, কান, নাক, ভ্রু, চুল, চুল সমেত মাথার টেরি, সব ঠিক আছে। কেবল আমি ঠিক নেই।
চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। নিঃশব্দে। চুপি-চুপি। গাছ থেকে ঘুরে ঘুরে পাতা পড়ার মতো। পতনশীল বস্তুর তো কোনো শব্দ নেই। গালগুলো কেবল সর সর করছে। সেই মতো বুঝতে পারছি, চোখ থেকে জল পড়ছে। কেমন একটা ঠান্ডা ঠান্ডা ভাব! গলাটাও ভিজে ভিজে ভাব। দু'একটা ঢোক গিলছি মাঝে মধ্যে। জোরে, কাঁদতে পারছি না। গলা ছেড়ে রা বার হচ্ছে না বলেই মনে হয়। ধারে পাশে কেউ কোথাও তো নেই।
চোখ মুছে দিলাম। চোখের কোণে জমে থাকা জল, ঠেলা পেয়ে দ্রুত নীচে নেমে গেল। চোখ খুলতেই, আমার মত একজন আমার দিকে ধেয়ে আসছে। আয়নার ছবিটার সঙ্গে মেলানোর চেষ্টা করলাম। না, সে মতো নয়। বরঞ্চ মাস খানেক আগে খবরের কাগজের ছবিটার সঙ্গে মিল আছে। কি যেন লেখা ছিল ছবিটার নীচে? হ্যাঁ মনে পড়েছে, 'চলে গেলেন কিংবদন্তি সেতার শিল্পী।' হ্যাঁ-হ্যাঁ আমার দিকে ধেয়ে আসা লোকটা তো কিংবদন্তি সেতার শিল্পী আলি আকবর খাঁ।
কিন্তু খবরের কাগজের ঐ লোকটা আমার দিকে কেন? উনি তো আর বেঁচে নেই। তাহলে মরা লোক হেঁটে আসে কীভাবে?
চোখের জল গোপন করে আমিই প্রথম রা কাটি, আলি আকবর খাঁ সাহেব যে। তা এদিকে কত দূর?
খাঁ সাহেবের সঙ্গে যেন অনেক দিনের চেনা পরিচয়। এদিকে আর কোথা যায় ভাই! কাজলডাঙা যাব বলে ঘর থেকে বেরিয়েছিলাম। অনেক কষ্টে পথ ঘাট ঠিক হল। নদী পেরিয়ে কাজলডাঙা। নদী পার হব কথাটা শুনতেই মাথাটা ঘুরে গেল। চারপাশ নিমেষে যেন বদলে গেছে। আবার আলি আকবরের দিকে মাথাটা ঘুরানোর চেষ্টা করলাম। কৈ, আলি আকবর তো নেই! এই ছিল, গেল কোথায়? একটা মুর্ত্তিমান মানুষ এভাবে বিলীন হয়ে যায় কী করে?
আবার সেই মাথা খারাপ। মাথা খারাপ নিয়েই হাঁটছি। নদী পার হতেই হবে। তাতে সে যে ভাবেই হোক।
আবার কে একজন আমার দিকে ধেয়ে আসছে। সেই পূর্বের লোকটাই কি?
না, এতো আলি আকবর নয়। অন্য কেউ। কোথায় দেখেছি যেন লোকটাকে। চেনা চেনা ভাব। হ্যাঁ, আমাদের পারমানবিক বিজ্ঞানী না? হ্যাঁ হ্যাঁ ঠিকই তো।
তা বিজ্ঞানী এদিকে কোথায়?
কোথায় আর ভায়া? কাজলডাঙা যাবার জন্য ঘর থেকে বেরিয়েছিলাম।
তা যাওয়া হল?
যাব কি ভায়া? যাবার জন্য জলে পা দিয়েছি, অমনি জল বাধা দিল।
জল কী বল্লে?
জল বল্লে, বিজ্ঞান মানুষকে শিখিয়েছে, দু'মুঠো সাদা ভাত জীবন ধারণের পক্ষে যথেষ্ট। বিজ্ঞান মানে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা ব্যাঙ্কে গচ্ছিত রাখা নয়।
জলের কথা যদি সত্যি হয়, তাহলে ধরে নিতে হয়, আমরা বিজ্ঞানমনস্ক নই। বিজ্ঞান মনস্ক-বিজ্ঞান মনস্ক বলে যে চিৎকার করি, তা আসলে অহঙ্কার। তাই কি?
কথাটা ঠিক, কি না—পারমানবিক বিজ্ঞানীর কাছে জানতে চাইলে, বিজ্ঞানী কর্পূরের মতো আমার চারপাশ থেকে মিলিয়ে যায়।
বিজ্ঞানী গেল কোথায়? লোকটাকে খুঁজতে থাকি। কেন এমন হয়? কেন এমন হচ্ছে? স-শরীরে আসা লোকগুলো কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে নাকি লুকিয়ে যাচ্ছে।
আচ্ছা, এই এই মানুষগুলো মানুষ, নাকি মানুষরূপী প্রেতাত্মা? প্রেতাত্মা বলে কিছু আছে কি? যদি প্রেতাত্মা বলে কিছু থেকে থাকে, তাহলে তারা পৃথিবীতে আসে কি? যদি আসে তারা দেখতে কেমন হয়? ঠিক মানুষের মতই কি? ওদের কথাবার্তাই বা কেমন? ঠাকুমা দিদিমার মুখে শুনেছি, ওদের কথাবার্তা নাকি খনা খনা হয়। ওরা মুখ দিয়ে কথা বলে না। নাক দিয়ে বেরিয়ে আসে কথাগুলো।
কিন্তু এই এই মানুষগুলোর কথা বলার সময় মুখগুলো তো বেশ নড়ছিল। ওরা মুখ দিয়ে কথা বলছিল। কী সুন্দর স্পষ্ট ভাষা ওদের মুখে। তাহলে ওরা প্রেতাত্মা নয়।
আকাশটা ঘোর করে অন্ধকার নেমে এল। তার মানে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। নদীর বালির বুক থেকে সূর্যের আলো একটু একটু করে দূরে সরে যাচ্ছে। বালিগুলো আর অভ্রের মত চিক চিক করছে না। এই অন্ধকারে আমি এখন কোথায়? নিজেকে আর খুঁজে পাচ্ছি না। আমার হাত, পা, কাঁধের ব্যাগ কোন কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। আমি আছি কি নেই, তাও খুঁজে পাচ্ছি না। একপ্রকার হারিয়ে গেছি।
হারিয়ে গেছে আমার মাথা, বাস্তব জ্ঞান, জ্ঞানের স্মৃতি। অন্ধকার। সব অন্ধকার! মুঠো মুঠো অন্ধকার! চাপ চাপ অন্ধকার! অন্ধকারের ভেতর তলিয়ে গেছি। হঠাৎ অন্ধকারের ভেতর একটা ডাক এল, অরবিন্দ...।
কান পেতে ডাক শুনি। পরিচিত কন্ঠস্বর। এমন কন্ঠস্বর যেন বহুবার শুনেছি। সেই আদিম যুগে, যে সময় মানুষ মা বাবা চিনতো না, মানুষ থাকতো তালগোল পাকিয়ে, একজায়গায়—সেই সময় আমাকে কে একজন এমন নামে ডেকেছিল।
তারপর মানুষ যখন প্রথম আগুন জ্বালাতে শিখল, তখন আমাকে এই নামে কে একজন ডেকেছিল।
পুরানো প্রস্তর যুগে ডেকেছিল একবার।
নতুন প্রস্তর যুগেও....
আর একবার সেই ডাকের অপেক্ষায় কান খাড়া করে আছি। কেন না, এখন আমার কান খাড়া করা ছাড়া উপায় নাই। এখন আমি চোখ থাকতেও কানা। চারপাশ শুধু অন্ধকার আর অন্ধকার।
হঠাৎ আকাশের বুক চিরে নীলাভ আলো বের হয়ে এল।
এই নীল আমি দেখেছি শচিকাকুর চিতায়। শচিকাকুর বুক, পেট, হাত, হাতের কলম পেশা আঙুল থেকে নীল নীল আলো বের হয়ে, চিতার সাজানো কাঠগুলোকে পুড়িয়ে দিচ্ছে।
নদী চরে এখন যে শচিকাকুর সেই চিতা দেখছি।
হঠাৎ আমার হাতে হাত, কি চিনতে পারছ?
হেসে উঠি? আপনাকে চিনতে পারব না?
ভাবলাম হয়তো ভুলে গেছ?
আপনাকে কি ভোলা যায়? ইতস্তত করতে করতে জিজ্ঞাসা করলাম, এখানে?
তুমি পথ হারিয়েছ না?
হ্যাঁ।
কাজলডাঙা যাবে বলে তো বেরিয়েছ?
হ্যাঁ কাকাবাবু...।
এস আমার সঙ্গে এস।
শচিকাকু সামনে। আমি পিছনে পিছনে।
শচিকাকুর গা থেকে নীলাভ আলো বের হচ্ছে। আমাকে পুড়িয়ে দিচ্ছে না। আলো দেখে দেখে হাঁটছি আমি।
হঠাৎ দেখি সামনে জল।
জল মানে নদী। নদী পার হলেই কাজডাঙা। কিন্তু পার হওয়া যায় কী করে? জল মানে তো আর হাঁটু জল নয়। যেন একানা ওকানা পূর্ণ। এ জলে সাঁতার জানা আর না জানা দুই এক। কাছে তো কোন নৌকা বাঁধা নেই। আর এ জলে নৌকা চালায় বা কে?
শচিকাকু তাড়া লাগালেন, নাও টপ টপ কর।
টপ টপ কি করব?
জামাপ্যান্ট খুল।
জামাপ্যান্ট খুল মানে? ন্যাংটো? তার মানে আমাকে ন্যাংটো হয়ে নদী পার হতে হবে? আমি কি ছোট ছেলে? যে যখন তখন প্যান্ট জামা খুলে জলে নেমে পড়ব? আমার কি লজ্জা নেই?
কোমরের বোতাম ধরে দাঁড়িয়ে আছি। কী করব, কী না করব ভাবছি। এমন সময় জোরে ধমক, দাঁড়িয়ে থাকবে নাকি? খোল...ও..।
বাধ্য হয়ে জামা প্যান্ট খুলে দিলাম। ন্যাংটো আমি। খালি গা এ কাঁধের মধ্যে ঝোলা ব্যাগে জামা প্যান্ট গুছিয়ে নিচ্ছি। ওপারে তো পরতে হবে। তাছাড়াও ব্যাগের মধ্যে আমার শেষ সম্বল ভরা আছে।
শচিকাকু ইশারায় ব্যাগে হাত দিতে নিষেধ করলেন। আমি সে ঈশারা দেখেও যেন দেখলাম না। কেন না, আমার লজ্জা নিবারণের শেষ সম্বল ওটা রেখে গেলে চলবে না।
শচিকাকু আমার বুদ্ধির তারিফ করে হো হো করে হাসলেন, দুর বোকা, কাজলডাঙা গেলে কেউ কি আর ব্যাগ ট্যাগ সঙ্গে নিয়ে যায়?
তাহলে কাজলডাঙা যেতে হলে আমাকে ন্যাংটো হয়ে যেতে হবে? তা না হয় মেনে নিলাম। যেহেতু দূরে-কাছে তেমন লোক-টোক নেই। এ অন্ধকারে দেখছেই বা কে আমাকে? একা শচিকাকু ছাড়া। ওনার কাছে আমার কোন লজ্জা-টজ্জা নেই। বেশ তা হল।
কিন্তু জল? এত জল পার হবে কী ভাবে? দেখি, শচিকাকু যা ব্যবস্থা নেয়।
শচিকাকু তড়বড়িয়ে জলে নেমে গেলেন। তাঁর পিছনে পিছনে আমিও। আশ্চর্য। জলে পা ডুবছে না। ভেসে আছে। জলের মধ্যে শচিকাকু আমি দু'জনেই ভেসে আছি। ভেসে আছি না। জলের উপর দাঁড়িয়ে আছি। জল আমাদেরকে নিয়ে যাচ্ছে ওপারে। এপারের কুল ছাড়িয়ে অনেকটা এসে গেছি। এভাবে যেতে খুব ভালো লাগছে! একেবারে চুপ চুপ যাওয়া। এই যাওয়ার ভেতরে আমাদের কিছু করা নেই।
ওপারে এসে গেছি। এসে দাঁড়িয়ে গেছি। নদী যেন নামতে বলছে। শচিকাকু টুপ করে নেমে গেলেন। আমিও তাই। আমার পা-এর তলে কোন মাটি নয়। কী যেন একটা কিছু মাটির থেকেও নরম। নরম জায়গায় পা রাখতে খুব ভালো লাগছে।
পা-এর তলদেশ দেখি। কী যেন লেখা রয়েছে তলদেশে?
'যে সাঁকোটা এত পলকা, রিস্কা পেরুলেই কাঁপে।
তার নির্মাতাদের ঘর দোর এত বজবুত কেন?'
আর এক পা বাড়াই। বাড়াতেই সেই এক অনুভূতি।
সেখানেও লেখা রয়েছে—
'স্বদেশ কখনো পাঁচতারা হোটেলের প্লেট নয়,
যে কেউ চেটে পুটে খাবে। আর
গঙ্গা ব্রহ্মপুত্র বিয়াস এঁটো হাত ধুয়ে ধুয়ে যাবে'
তারপর আবার একটা—
'মা তোমার দড়ির শিকেটা দাও
দেশ গ্রাম তুলে রাখি, তুলে রাখি
হৃদয়ের পঠন পাঠন।
যেমন করে তুলে রাখতে পিঁপড়ের মুখ থেকে নির্জলা দুধের মাঠা...।'
এইভাবে পা-এর তলদেশের ফলক পড়ে পড়ে নদীর ও'পারে উঠলাম। উঠতেই দেখি শচিকাকু বসে আছেন নিজের আসনে।
শচিকাকুর সারা শরীর জুড়ে নীল আলো।
এতোদিন পর লোকটার সঙ্গে দেখা। লোকটা এতটুকু পাল্টে যায়নি। সেই একই পাতাল ফিনফিরে শরীর। গালগুলো বসা বসা। দাঁত বিনা খয়ের পানের ছাপ। সেই দাঁত বার করে হো হো হাসি।
শচিকাকু সামনের দিকে আঙুল ঠেলে বললেন, ঐ দেখ, ঐ যে নীল আলোটা দেখছ ওটা বিভূতিভূষণের।... তারপর রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, রামকৃষ্ণ, বিদ্যাসাগর, শ্রীচৈতন্যদেব, গৌতমবুদ্ধ, যীশু...।
আমি অবাক! এত নীল আলো এখানে! এত ব্যপ্তি!
চোখ সরাতে পারছি না।
কাকু এটা কি স্বর্গ?
'হ্যাঁ গো! এই-ই তো স্বর্গ। এই-ই তো কাজলডাঙা। নীচে যে ফলকগুলি পড়ে এলে, ঐগুলো স্বর্গে ওঠার সিঁড়ি। কাজলডাঙা আসতে গেলে, স্বর্গের সিঁড়ি বানাতে হয়। যাও ফিরে যাও। ফিরে গিয়ে স্বর্গের সিঁড়ি বানাও গে যাও...।
(কবিতার লাইনগুলি কবি সচ্চিদানন্দ হালদারের)
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন