জয়দেব দত্ত
চড়িটার নাম মুচিবামনে। দূর চড়ির নাম কখনও মুচিবামনে হয়। চড়ি নয়, চড়ি নয়, চড়ি সংলগ্ন পুকুরটার নাম মুচিবামনে।
সেই কোন আদিকালে মুচির মেয়ের সঙ্গে বামুনের ছেলের ভাব। সেই নিয়ে গ্রামছাড়া। মুচির মেয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল, কোথায় যাবে ঠাকুর, যেখানে যাবে সেখানেই তো মানুষ!
বামুনের ছেলে হাসতে হাসতে বলেছিল, পিরিতি নগরেবসত করিব, পিরিতি মিলাবে তথা..।
তো সেই পিরিত মিলানোর জন্য, মানুষজনহীন আদি ভূখণ্ড জঙ্গলবেষ্টিত ঢাউস জায়গাটা বেছে নেয় দুজন। শুধু বেছে নেয় না, পিরিত করতে করতে হুশহাশ কোদাল চালিয়ে চালিয়ে পুরো পুকুরটাই কেটে ফেলে একসময়। সেই পুকুরের নাম মুচিবামনে। হয়তো পুকুরপাড়ে বারশুলি মায়ের মন্দির নেই ঠিক কথা, কিন্তু ঢাউস চড়িটা তো আছে। সেই চড়িটাকে মুচিবামনে বলা যায় না কি।
এলাকার ন্যাংটো পদে চড়ুই ছাগুলো একপ্রকার অলিখিত বণ্টবনামা করে নিয়েছে। চড়িটা বণ্টননামা করে নিয়েছে। চড়িটা সাইকেল শিক্ষার উপযুক্ত জায়গা কিনা। সাইকেলের হাফ প্যাডেলে পা গলিয়ে শুধুই খ্যাচ খ্যাচ। শুধুই খ্যাচ খ্যাচ কি, আর চেন কাবারে চেনের ঘর্ষণ, ঘ্যারর ঘ্যার ঘ্যারর ঘ্যার শব্দটা। ওটা কি শুনে মনে হয় না, পাড়ার বাদ্যকর পোল ডোম ঠ্যাং ম্যাং তুলে সানাইয়ের সুর বাজাচ্ছে।
ন্যাংটো ছাগুলো যখন সাইকেলে পোল ডোমের সানাইয়ের সুর তুলে চড়ি থেকে নীচে নামে, তখন যদি কেউ দৈবাৎ ছামুতে এসে পড়ে, তার কোপালে নির্ঘাত ফের লিখেছে বলে কথা। কারণ, তখন তো আরছাগুলো আর ছা নয়, এক একটি উড়োজাহাজ তখন। আর উড়োজাহাজের ডানায় পানায় ঘা লাগলে যা হয়। একেবারে ধড়াস করে মৃত্যুর দরজায়।
কিংবা কোনো মানুষজন নয়, রাস্তায় পাশে যে ইলেকট্রিক পিলারটা দাঁড়িয়ে আছে, যার পেটের মাঝখানটিতে সাবধান সাবধান লেখা। হয়তো সেই পিলারটাকেই দিল জোরসে ধাক্কা। পিলারটা তখন ভেঙে চুরে ঝরঝর করে, ঝরে পড়ল নীচে। আর তার উপরে যে যে তারগুলো, সেই তারগুলো পিরিক পিরিক শব্দ তুলে, সারা আকাশটাকে আগুন ধরিয়ে দিল। তখন তো সারা পৃথিবীজুড়ে লোডশেডিং।
তখন হয়তো বাসিবুড়ি মুচিবামনের জলধারে দাঁড়িয়ে ঝাঝা থেকে হাঁসছাগুলো খুলে, হাঁসছা চরাচ্ছে। হাঁসছাগুলোকে কি চরাচ্ছে! বরঞ্চ কেমন নিজে নিজেই পুক পুক ডুবি দিচ্ছে জলে।
আচ্ছা, মুচির মেয়ে আর বামুনের ছেলে এমনিভাবেই ডুব দেওয়ার জন্য কি পুকুরটা কেটেছিল। বলা তো যায় না, তখন হয়তো এমনই একটা ঝাঝা ঢাকা নিয়ে দুজন উদোম পড়ে থাকত। তখন তো আর মানুষজন ঘরদুয়ার বানাতে জানত না। সেই কোন আদিকালের কথা। এখন কি আর মনে থাকে। হয়তো পুকুরপাড়ে ঝাঝার ভিতর ঢাকা থেকে থেকে ছাগুলো বেতে যেত। আর সেই বাতের টনটনানি সহ্য করতে না পেরে, ঝাঝা মাঝা ফেলে, দুদাড়ে বেরিয়ে আসত জলে। এসে পুক পুক ডুব দিত।
পুকুরের জলে হাসছাগুলো পুক পুক ডুব দিচ্ছে। আর তা দেখে বাসিবুড়ি মিটিমিট হাসছে।
বাসিবুড়ি মিটমিট হাসলেও ওর হাতের কবজির বাঁধনটা কিন্তু মোটেই হালকা হচ্ছে না। কেন হবে? ওর হাতে একটা বিশাল মাপের শক্ত ঢেলা ধরা আছে যে। না ধরলে উপায়? পুকুরের চারধারে চিল চক্কর মারছে যে। একটু চোখের ফাঁক হয়েছে তো সঙ্গে সঙ্গে ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে যাবে কোন রাজ্যে। তখন খুঁজলেও হাঁস ছা-এর টিকিও পাবে না।
ডাঙাতে তো অতটা ভয় ডর নেই। ডাঙাতে তো হাঁস ছা চরে না। মুরগি চরে। তাও মায়ের খুঁটে খুঁটে বাঁধা থাকে সবসময়য়। মা মুরগি তো আর দশ হাত বিশ হাত দূরে দূরে থাকে না। খুব কাছে কাছে থেকে থেকে, পা দিয়ে মাটি ইচারে ইচারে, খুঁটে খুঁটে খেতে শেখায়। একটু বিপদ বুঝেছে তো ডানাপানা মিলে, পেটের ভিতর ঢুকিয়ে নেয় ছাগুলোকে। তাতেও যদি লোভের শিকার হয়ে কোনো চিল ছোঁ মেরেছে তো মা মুরগি সঙ্গে সঙ্গে ডানাপালা মেলে, উড়ে উড়ে ওর গুষ্টির ষষ্টিপুজো করে, তবে দম। কিন্তু মা হাঁস তো তেমন নয়, ডিম থেকে বাচ্চা বের করে, বেমালুম কেটে পড়ে। তাই বাসিবুড়িকে মা সেজে, হাতে ঢেলা নিয়ে সবসময় রেডি থাকতে হয়। হাতে ঢেলা নিয়ে, দাঁত বার করে, চিলের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে ছড়া কাটে, আলিক শালিক ছড়াছড়ি। চিল শুকুনে বিবাদ করি। বাসিবুড়ির বরাবরই চিলের সঙ্গে বিবাদ। বিবাদ তো চিলের কি। চিল তো আর বাসিবুড়ির মুখে ছড়া শুনে রাগ টাগ করে উপোস দিয়ে পড়ে থাকে না। রবয়চ মুচিবামনের চারপাশে চক্কর মারে আরও বেশি। তারপর ক্লান্ত হলে পশ্চিমদিকে ওই যে হাঁড়া তালগাছটা, যার হাড়ির মতো বড়ো বড়ো তাল, তার মাথার ঠিক মধ্যিখানটিতে ঝপাং করে উড়ে এসে বসে। পুরো তালগাছটা তখন নড়ে যায়। তালগাছটাতো বহু উঁচু তাই বাসিবুড়ির হাতের ঢেলা সবসময় পৌঁছোয় না। নেহাত কালেভদ্রে হয়তো একটা কি আধটা পৌঁছায়। তাও বেশিরভাগ সময়, ঢেলাটা ভেঙে হাজার খণ্ড হয়ে তালপাতার গায়ে ঠেকে। তখন খুরুক খুরুক শব্দ হয় মাত্র।
তবে দু-একটা ঢেলা যে চিলের গায়ে ধাব্বিস করে পড়ে না এমন নয়। যখন পড়ে, তখন চিলের কি হাল, সে দৃশ্য তো আর কেউ চোখে দেখে না। ধাব্বিস শব্দটাই কেবল কানের ভিতর এফোড় ওফোড় করে। বাসিবুড়ি ঢেলা হাতে রেডি আছে চিল মারার জন্য। কিন্তু কোন চিলটা মারবে। চিল তো আর একটা নয়। অজস্র চিল চক্কর মারছে বাসিবুড়ির মাথার উপর। তাই খুব সতর্ক হয়ে আছে। ছোঁ মেরেছে তো, আর উপায় নেই।
হঠাৎ জলে ঝপাং শব্দ। কী হল! কী ঘটল ব্যাপারটা! জলটা দুফাঁক হয়ে গেল যে। হাই রে, হাই হাই রে, চিলটা ছোঁ মেরেছে। ছাগুলো আড়াই তাড়ায় এদিক ওদিক ছোটাছুটি করছে। দু একটা আবার মুখে বিকট শব্দ তুলে, বাসিবুড়ির দিকে দুদ্দাড়ে ছুটে আসছে। বাসিবুড়ি দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে গলা ফাটাচ্ছে, ওলো, আটকুড়ির চিল আমার ছ'টা তুলে নিলেক লো। হাটি হাটি, ধর ধর ধর ধর...।
ধর ধর ধর তো! কিন্তু কে আর ধরে। চিলটা কি ততক্ষণ ধরা দেবার আশায়, জলের ধারে আছে? সে তো এতক্ষণ হায় তালগাছের মাথায় পয়তাড়াং দিয়েছে।
বাসিবুড়ি হাড়া তালগাছের মাথা লক্ষ্য করে, পাঁই পাঁই ঢেলা ছুড়ে। গাছটা তো খুব উঁচু তাই সব ঢেলা ওর মাথায় পৌঁছায় না। নেহাত একটা কি দুটো পৌঁছাচ্ছে। তাও পৌঁছোনোর আগেই ঢেলাটা হাজার খণ্ড হয়ে তালপাতার গায়ে ঠেকেছে। আর তা থেকে খুরুক খুরুক শব্দ বার হচ্ছে, এই পর্যন্ত।
তাহলে কি বাসিবুড়ি গাছতলায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সারাদিন ঢেলাই ছুড়বে। তা কি হয়। ওর সংসারে আর কি কোনো কাজ নেই। আছে তো। বিস্তর আছে। কত বাসি কাজ পড়ে আছে ওর সংসারে।
তাই খলবল খলবল জল থেকে উঠে, ভিজে কাপড় নিয়েই ঘরে ঢুকল। ঢুকল তো ঢুকল, আর ঘর থেকে বার হচ্ছে না। ঘরের ভিতর কাপড় ছাড়ছে। আর মনে মনে কাজের কথা ভাবছে।
ওর সংসারে কাজ কত কাজ। ওর স্বামী ওর নামে বিঘা পাঁচেক জমি রেখে গিয়েছে যে। আর সেই জমি ওকে নিজ হাতে দেখভাল করতে হয়। নাহলে কে করবে। ও ছাড়া সংসারে কে বা আছে। স্বামী বেঁচে থাকতেও ওকে নিজ হাতেই চাষবাস দেখভাল করতে হয়েছে। স্বামী ওর কাছে ছিল নাকি। টাটানগরে দলমা পাহাড়ের নীচে, পাথরগদিতে পাথরের থালা বাটির ব্যবসা ছিল। বছর সালে একবার কি দুবার আসত। যখন আসত, আদর সোহাগ প্রেম পিরিতিতে ভরিয়ে দিত। আর যখন আসত না, তখন চিঠি আসত। চিঠি পেয়ে সে কি কান্না! যদি না আসবে, তবে কিসের জন্য কার অপেক্ষায় পথ চেয়ে বসে থাকা! সে শুধু তোমার জন্য। তুমি একটিবারের জন্য এস। আমার কথা মনে করে যদি না আসবে, তবে খোকার মুখ মনে করে এস। তুমি এস এস এস...। তোমার পায়ে ধরছি। চিঠি নিয়ে কান্নায় সিথেন ভিজিয়ে দিত, মানে বালিশ।
চিঠি পেয়ে স্বামী পাথরগাদি থেকে, গড়িয়ে গড়িয়ে উলটে উলটে পড়িমরি ছুটে আসত। শুধু আসত না, ব্যাগের ভিতর খোকার জন্য কত কি আনত। জামা প্যাণ্ট আরও কী সব খেলনা পুতুল। পুতুলের কাপড় আনত রং বেরংয়ের। তবে সেসবে বিদেশের কোনো ছাপ থাকত না। কারণ, বিদেশির ছাপ ছিল বাসিবুড়ির ঘোর আপত্তি। তখন তো স্বদেশীর সময়।
খোকার মুখ মনে করে, ঘুপচি ঘরে দম বদ্ধ করে থাকত। তবে সে থাকা বেশিদিন টেকেনি। একদিন কলেরা এসে টুক করে তুলে নিয়ে গেল খোকাকে। তারপর পাথাগদিতে পাথরের থালাবাটিতে শুইয়ে, স্বামীকেও একদিন। সেই থেকে বাসিবুড়ি একা, শুধু একা।
একা কি, একা কি! এত বড়ো একটা গ্রাম আছে না। গ্রামটা তো আর জনশূন্য নয়। বানের জলের মতো হদ হদ করে বাড়ছে তো গ্রামের মানুষগুলো। তাহলে একা হয় কী করে।
বাসিবুড়ি ঘরের ভিতর কাপড় ছাড়ছে। দূর এটাকে কি আর ঘর বলা যায়। মাটির ছেয়া দিয়ে কোনরকম এক কুঠুরি। তাও ছেয়াগুলো হেলে গিয়েছে। বাঁশের তাড়া লাগিয়ে কোনোরকম হেলা মুখবন্ধ আছে। নাহলে কবে যে উলটে যেত খেঁচাকার্তিক। হোক খেঁচাকার্তিক, না হয় বাঁশের তাড়া লাগিয়ে কোনোরকম বেঁচেবুঁচে আছে তবু তো স্বামীর স্মৃতিটা এখনও জ্বলজ্বল করে জ্বলছে।
বাসিবুড়ি ভিজে কাপড় ছেড়ে, ভিতর থেকে দরজার গোড়ায় দাঁড়ায়। এমন সময় ডাক, কত্তা আ আ আ।
বাসিবুড়ি রা কাটে, যাই-ই-হ-ই।
দরজা খুলতেই দেখে, তার ছামুকে মা কালীর মতো চুলগুলো পিঠময় ছড়িয়ে গোলগাল মুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে কাছে ভানুর বউ ময়না। কেবল জিভটা বাড়ানোর বাচক। অর্থাৎ অপেক্ষা।
ময়না একপ্রকার বাসিবুড়ির কোলে সিঁধিয়ে গেল। বলল, দাও দাও কর্তা। ভিজে কাপড়টা আর তোমাকে থর থর কাঁপতে কাঁপতে মিলতে হবেক নাই, আমাকে দাও।
বাসিবুড়ির হাত থেকে জোর করেই কেড়ে নিল কাপড়টা। তারপর সোজা ছাঁচতলে ছাঁচের ফাঁকে ফাঁকে গুঁজে দিচ্ছে কাপড়টা। আর মুখে গুনগুন গান করছে।
গান শুনে বাসিবুড়ির গা জ্বলে গেল। বলল, খুব তো রসের গান করছিস, ধান কাটতে লোক দেকেছিস?
ময়না বলল, দেখেছিলাম তো।
দেখে তো ছিলি, কিন্তু কই তারা? কখনও কাজে আসে নাই কেনে?
ময়না বলল, আমি বলি কি কত্তা, এবছর আর ধান কাটতে হয় না। বাসিবুড়ি ময়নার কথা বলার ঢং দেখে রেগে গেল। বলল, কেনে, কেনে?
ময়না বলল, সন্দেবেলায় সবাই কথা দিল যাচ্ছি বলে। সকালবেলায় যেয়ে দেকছি পাখি ফুড়ুত...
বাসিবুড়ির চোখেমুখে বিস্ময় ফুঠে উঠল! বলল, ফুড়ুত কি লো! তাইলে কি হবেক-ক-ক-ক।
কি হবেক আবার! কেউ না কাটলে, আমি একাই কাটব।
তু একা পারবি?
একদিনে পারব নাই ঠিক কথা, একমাসে তো পারব তারপর আজ সন্দেবেলা হোক, সবাইকে যা বলার বলব না, পেটে নাড়ির পাক ঢুকিয়ে দুব।
না না, অমন করে বলিস না। একটু কাকুতি মিনতি করে।
কাকুতি মিনতি মানে, দরকার হলে পাগুলো জড়িয়ে ধরব।
ময়না আর কিছু না বলে, বাঁশের ফুঁকচং থেকে কাস্তে বার করে কাস্তের ডগ দিয়ে মাথা চুলকাতে চুলকাতে মাঠে চলে গেল। আর বাসিবুড়ি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ময়নার মাঠে চলে যাওয়া দেখতে থাকল। কেমন দ্রুত যাচ্ছে মেয়েটা, কেমন দ্রুত। ময়না যাবার আগে কি যেন বলে গেল, দরকার হলে পাগুলো জড়িয়ে ধরব। হ্যাঁ, তাই জড়িয়ে—ধরিস কেমন, তাই জড়িয়ে ধরিস। শুধু পাগুলো নয়, দরকার হলে আস্ত মানুষটাকেই জড়িয়ে ধরবি, যেন বেরিয়ে যেতে না পারে।
বাসিবুড়ি এরই জন্য ময়নাকে নিজের আঁতের থেকেও বেশি ভালোবাসে। তাছাড়া এত ভালোবাসার আর একটা কারণ আছে। আর সেটা হল ময়নার কাচা সংসার। কোলে দুটি ছেলে ও একটি মেয়ে। স্বামী কদিনের জন্ডিসেই স্বর্গে চলে গিয়েছে। অল্প বয়সে বিধবা হোক বিধবা, তবুও মেয়েটার স্বভাব চরিত্র ভালো। করিতকর্মাও বটে। শুধু কাজেই করিতকর্মা নয়, মুখটাতেও সবসময় মধু ঢালা থাকে। ও যখন কথা বলে ডাকে, তখন প্রাণটা যেন জুড়িয়ে যায়—। কারণ এই কত্তা তো আর সেই কত্তা নয়, এ হল সম্পর্কের কত্তা। অর্থাৎ, ঠাকুমা বা দিদিমা।
তবে ওর মুখে মধু ঢালা থাকলেও বুদ্ধিটা কিন্তু মোটা। একদম নিরেট পাথর দিয়ে তৈরি যাকে বলে আর কি। এই জন্য বাসিবুড়ি মাঝেমধ্যেই ওর প্রতি রেগে যায়। আর যখন রেগে যায়, তখন মনে হয় ওর বুকে পাথর ছুড়ে মারে। কিন্তু পারে না। ওর বুকেও যেন একটা পাথর আটকে আছে। মারতে গেলেই বিকট শব্দ করে। সেই শব্দ বাসিবুড়ির পুরোনো আঁতে জোরসে ধাক্কা মারে। কেন মারবে না, ময়নার কোলে তিন তিনটে 'ল্যাগড়া গ্যাগড়া' হলেও আজও আঁচ ধরে টান মারে। কিন্তু বাসিবুড়ির সবেধন নীলমণি! তাও আজ আর নেই।
ময়না মাঝেমধ্যেই একে তাকে হুটহাট ডেকে এনে হাজির করে। বলে, কত্তাই তুমার জমিগুলো চাষ করব বলছে। এক সিজনের চাষ বিঘা প্রতি দুহাজার নগদ পেমেণ্ট, দিবে?
নগদ পেমেণ্ট শুনে বাসিবুড়ির চোখ মুখ লাল হয়ে যায়। সাথকে সাথ মুখের সামনে না বলে দেয়।
না শুনে লোকটা পালাবার পথ খুঁজে পায় না।
হুটকো ঝামালা। কোনো কিছু বলা কওয়া না করেই, একেবারে ছট করে ঝামালাটা এনে হাজির করে ময়না।
তারপর লোকটা চলে গেলে, বাসিবুড়ি রাগে কাঁপতে কাঁপতে, ময়নার পুরু জাং এর মোটা চামড়ায় চিমটি কেটে বলে, জমি নয় পরকে। আর আগুন নয় ঘরকে বুঝলি? কি বুঝলি?
ময়না বোকার মতো ঘাড় নাড়ে, হু বুঝলাম।
বাসিবুড়ি বুড়ো আঙুল নেড়ে বলে, কচুটা বুঝেচিস। কাউকে জমি দিয়ে ঘরে আগুন আনিস না।
ময়না আবার সেই বোকার মতো ঘাড় নেড়ে বলে বুঝলাম কত্তা এতক্ষণে সব বুঝলাম।
সেই বোকার মতো ঘাড় নাড়া মেয়েটা, এইমাত্র ধান কেটে ঘরে এল।
কাস্তেটা বাঁশের ফুঁকচঙে রাখতে রাখতে বলল, কত্তা ধানগুলো খুব ঝুনে হয়ে গিছে। ধানের শিষ থেকে টুং। পড়ছে, টুং তাড়াতাড়ি কাটতে না পারলে, মাঠের ধান মাঠের থাকবেক।
বাসিবুড়ি বলল, তাড়াতাড়ি করতে তো তুই লো। আমাকে বলচিস কেনে?
ময়না বলল, বেশ বেশ, তাইলে আমিই লোক আনতে যাচ্ছি। দেকি, কাল কেমন না লোক আসে!
ময়না দেমকি পায়ে ধপ ধপ শব্দ তুলে চলে গেল।
আর ঠিক সেই সময় আকাশে ঝড় তুলে রাস্তার ধুলো মুলো পরিষ্কার করে, একটা গাড়ি পেরিয়ে গেল। শুধু পেরিয়ে গেল না, বাসিবুড়ির বুকে দাগা দিয়ে গেল। পরনের কাপড়টা ঝড়ের দাপটে খুলে নিয়ে গেল খানিকটা। হাতে করে শক্ত করে ধরে থেকে কোনোরকম লজ্জার হাত থেকে বেঁচে গেল।
ঠিক এমনিভাবে খোকা মায়ের বুকে দুধ খেতে খেতে, টেনে খুলে নিত কাপড়টা। খোঁকাকে ধমকে ধমকে কোনরকমে আটকে রাখত।
বাসিবুড়ি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। ভ্যাল ভ্যাল করে তাকিয়ে দেখল গাড়িটাকে। গাড়িটা কেমন সবুজ। আর যেমন সবুজ, তেমনি উঁচু। তার খুঁটির তার ঠেকব ঠেকব করছে গাড়িটা। এই প্রথম এমন উঁচু গাড়ি রাস্তায় বার হল। আহা, গাড়ি, গাড়ি বটে একখানা!
সকাল হতে না হতে দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ, ঠক ঠক, ঠকাং ঠকাং...।
বাসিবুড়ি পড়ে পড়েই রা কাটল, এই দাঁড়া, দরজাটা ঠুকিস না, ভেঙে যাবেক।
ময়না ধমকে উঠল, ভাঙুক, ভেঙে দুব।
ভাঙতে তো সবাই পারে। গড়ে দে একখানা।
গড়ব তো।
ভারী মুরদ।
ময়না খল দাঁতে খিলখিল হেসে উঠল। বলল, মুরদ ছিল বলেই তো আমার মরদ করে ছিলগো কত্তা।
ডাক তোর মরদকে।
ডাকব তো।
কপাটের ক্যাচ-অ-অ শব্দ করে বাসিবুড়ি ঘর থেকে বেরিয়ে এল।
ময়নার দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে বলল, তুই একা যে লো!
ময়না বলল, একা নয় তো লোক পাব কোথায়? লোক আনতে হলে তো শ্মশান যেতে হবেক। চল, যাবে কি। দুজন আড়াই তাড়াই দিয়ে ডাকব দুজনকে। তুমি ডাকবে তুমার লোককে, আমি ডাকব আমার লোককে। আমাদের ডাক শুনে দুজন কাঠকয়লা থেকে বেরিয়ে আসবেক।
ময়না হেসে কুটিকুটি।
ময়নার কুটি কুটি হাসি দেখে, বাসিবুড়ির গা গিরগির করে উঠল। বলল, তু ঢেমনির হাসি দেখে, আমার গা জ্বলে যায়।
তাহলে জ্বল ঢেলে নাও।
হ্যাঁ, তা ঢালম বৈকি। আমি বুড়ি মানুষটা সকালবেলায় গায়ে জল ঢালবু! আর তু বসে বসে লগড় দেখবি না! দিসতো লা...বলেই বাসিবুড়ি ঘটির জল নিয়ে ময়নার দিকে তেড়ে গেল।
ময়না ভয়ে তরাসে লাফিয়ে উঠল, না না...না, থাক থাক থাক থাক না।
পরিবেশ স্বাভাবিক হতেই ময়না বলল, জানো কত্তা, গাঁয়ের লেবারগুলোর না, এখন পোষমাস। আর পোষমাসে ইঁদুরের দশটা বারটা সাঙা হয়, তা তো তুমি জানো!
তার মানে?
তুমি সব কথাতেই মানে মানে কর কেনে বল তো কর্ত্তা? এখন গাঁয়ের লেবারগুলোর পোষমাষ নয়! এই পোষমাসে এক একটা ইঁদুর গাড় কুড়ে কতদূর যায় বলতো। তেমনি আমদের লেবারগুলো এক একজন গাড় কুঁড়ে কতদূর যাচ্ছে জানো।
গাড়গুলো জল ঢেলে বুজিয়ে দে লো।
জল ঢালার মতো গতর আমার নাই। তুমি বরঞ্চ সেকালের মানুষ। নদী থেকে ঘড়া ঘড়া জল আনতে পারলে তুমিই জল ঢাল।
ঠিক আছে নে, আজ বিকালে আমি নিজে কলসি কাঁখে যাব।
তাই যাও! কত্তা, তাই যাও। তুমি নিজে গেলে, দুএকটা লোক আসে তো আসুক! ময়না কাস্তে হাতে কাজে বেরিয়ে গেল।
বাসিবুড়ি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ময়নার কাজে যাওয়া দেখছে। কি তনছটে মেয়ে রে বাবা, কি তনছটে! মাঠের বড়ো বড়ো আল, তিন টপকে পেরিয়ে যাচ্ছে। কত বড়ো বড়ো ছেয়া!
বাসিবুড়ি মনে মনে ভাবছে, ময়নার সঙ্গে সেও কাস্তে হাতে কাজে চলে যাবে নাকি। পরক্ষণেই মন কু কাটল, ওর পিছন পিছন খাটি নয়ে যাবে কে? মাঠে গেলে তো ও আর বেঁচে ফিরে আসবে না!
তাছাড়াও বাসিবুড়ির ঘরে কাজের ঝুড়ি পড়ে আছে। ঘরে ঝাঝায় ঢাকা আছে এক পাল হাঁস। সেই হাঁসগুলো চ্যাঁচিয়ে গাঁ-গোল করছে। গালাগাল দিচ্ছে। বলছে, এ বুড়ি মাথা থেকে ঝাঝাটা তুল। এত বেলা হয়ে গেল দেখতে পাচ্ছিস নাই। এখনও না তুললে চরে খাব কখন?
হাঁসের এই কথাবার্তা কেউ বুঝুক আর না বুঝুক বাসিবুড়ি অন্তত বোঝে। কেন না, এদের নিয়েই তো ওর বেঁচে থাকা। নাহলে এই ত্রিভুবনে ওর আপনার বলে আছেটা কে।
হাঁসের মতো একপেট খাবার খেয়ে বাসিবুড়ি দরজার গোড়ায় বসল। বসতেই সেই গাড়িটা সেই খুব উঁচু গাড়িটা তার খুঁটির তার ঠেকব ঠেকব গাড়িটা রাস্তা হয়ে পেরিয়ে যাচ্ছে। বসে বসে দেখছে গাড়িটাকে। দেখছে না, চোখ দিয়ে চাটছে। আহা, গাড়ি গাড়ি, গাড়ি বটে একখানা।
ময়না, মানে আমাদের ময়নামতী রোদে সারাদিন ধান কেটে, উলুর ঝুলুর দেহ নিয়ে বাসিবুড়ির ভাঙা উঠানে হাঁফ ছাড়ল। বলল, এই তিন সন্ধেবেলায় চৌকাঠে বসে রইচ যে। জানো না, বসতে নাই?
বাসিবুড়ি হাই তুলল। বলল, বুড়ো বয়সে আর অত নিয়ম মানতে নারি।
ময়না ধমকে উঠল, মানতে হবেক। বলেই বাসিবুড়ির হাত ধরে জোরে হ্যাঁচকা টান। চল, বসে যদি হয় মুচিবামনের চড়িটাতে বসি গা। বসে বসে রাস্তায় লোক গুনব, রাম দুই তিন চার...
বাসিবুড়ির মন না থাকলেও উপায় তো নেই। ময়না যখন হাত ধরে হ্যাঁচকা টান মেরেছে। সেই টানে না গেলে যে বাসিবুড়ির হাতটা ছিঁড়ে যাবে। তাই বাসিবুড়ি ময়নার সঙ্গে সঙ্গে গেল। গিয়ে বসল মুচিবামনের চড়িটার পাশাপাশি দুজন। যেন দুটি বোন। না না, দুটি বোন নয়, একটাই বোন। মাঝামাঝি দুটি ভাগ করা। একটা ধড়, দুটি মাথা।
ময়না হাসতে হাসতে বলল, কলসি কাঁখে নদী গেইলে নাকি?
নদী কেনে যাব লো, কোন দুখে? গাঁয়ের পুকুর ডোবাগুলো আছে না। সেই পুকুর থেকে জল তুলে কলসি কলসি গাড়ে ঢেলেছি। কিন্তু এক একটা গাড়মুখে যে আজসে গাড় সে কথা কে জানতো! এক গাড়ে জল ঢাললে, অন্য গাড়ে ভক ভক জল বেরোচ্ছে।
ময়নার গলা থেকে আপশোশ বেরিয়ে এল, তাহলে কি হবেক গো কত্তা। ধানগুলো যে খুব ঝুনে গিয়েছে। দু-একদিনের মধ্যে কাটতে না পারলে, মাঠের ধান মাঠেই থাকবেক।
বাসিবুড়ি হাল ছেড়ে দিল। বলল, উ কথা আর ভাবতে নারি...।
ময়না ধমকে উঠল, আর ভাবতে হয় না। চল, শ্মশানে যাই। শ্মশান যেয়ে দুজন দুজনকে...
বাসিবুড়ি বলল, ডাকলেও কি ওরা আসবেক বলচিস? আর এলেও ওরা কাস্তে ধরবেক?
কেনে ধরবেক নাই?
ওই মানুষটা যে কোনোদিন কাস্তেতে হাত দেয় নাই।
সেদিন নাই বা দিল, আজ এলে দিবেক।
এমনসময় সেই খুব উঁচু গাড়িটার আসার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। গাড়ির শব্দে ময়নার কথাগুলো ঢাকা পড়ে যাচ্ছে।
বাসিবুড়ি ভাবছে, গাড়িটা এত ঘন ঘন টিপ দিচ্ছে কেন! যেই না ভাবা, অমনি গাড়িটা রাস্তায় ঝড় তুলল। ঝড় তুলে রাস্তা দিয়ে পেরিয়ে যাচ্ছে। না, পেরিয়ে যাচ্ছে না চিলের মতো উড়ে যাচ্ছে, বিশাল বড়ো চিল!
আকাশের বুকে ওড়া ছোটো ছোটো চিলগুলো সব একত্রিত হয়ে রাস্তার বুকে একটা বিশাল মাপের চিলের আকার নিয়েছে।
চিলটা রাস্তা থেকে উড়ে নিকুঞ্জের পানগুমটির মাথায় ঝুপ করে বসল। বসতেই ঢাকা পড়ে গেল গুমটিটা।
ময়না হাসতে হাসতে গড়গড় করছে, কত্তা, তুমি চিঠি লিখলে, তুমার মরদ কেমন পাথরগদি থেকে গড়িয়ে গড়িযে উলটে উলটে পড়িমরি ছুটে আসতে বলত।
ময়না গড়গড় করে হাসছে আর বাসিবুড়ি টপটপ করে চোখের জল ফেলছে।
মযনা বলল, একটা কথা বলব কত্তা?
বাসিবুড়ি বলল, একটা কেনে তু হাজারটা বল। তুর মুখের কথা শুনতে খুব ভালো লাগছে। বল, বলে যা। মোটেই বলা বন্ধ করিস না। ময়না বলল, জানো কত্তা, দ্যাশে ধান কাটা গাড়ি আইচে। শুধু কাটা নয়, কাটা পিলাশ ঝাড়া। একসঙ্গে দুটি কাজ। এখন আর ধান কাটতে মানুষের দরকার নাই। ওই তো ছামুতে দাঁড়িয়ে রইচে গাড়িটা। নিকুঞ্জের পানগুমটির মাথায়। ডাকব গাড়িটাকে? দেক, ডাকলেই কেমন ছুটে...
বাসিবুড়ি ময়নার মুখটা টিপে ধরল। আর কথা বলতে দিল না। নিজেও আর কথা বলছে না। বলতে পারছে না। চোখ দিয়ে ধোঁয়া দেখছে কেবল। সব ধোঁয়া এমনকি, কাছের মানুষটাও ধোঁয়া হয়ে গিয়েছে।
ময়না মানে আমাদের ময়নামতী ধোঁয়া হয়ে উড়ে যাচ্ছে দূর থেকে দূরে। আরও দুরে। যেখান থেকে ময়নাকে চেনা যায় না। ডাকলেও সাড়া দেয় না ময়না। তার জায়গায় গাড়ি ছুটে আসে। কি যুগ এল রে বাবা দেশে।
বাসিবুড়ির হাতটা ক্রমশ নীচে নেমে যাচ্ছে। নীচ থেকে আরও নীচে। নীচে গিয়ে হাতটা কিসে যেন ঠক করে ঠেকল। সোনার চাপে কি! দূর সোনা থাকে তো সোনার খনিতে। মুচিবামনেতে সোনা থাকে কি! বরঞ্চ মুচিবামনেতে খানাখন্দে দু-একটা ঢেলা পড়ে থাকে। মাটির ঢেলা। সেই মাটির ঢেলাটা খপ করে ধরে নিল বাসিবুড়ি। আর ধরেই পাঁই করে ছুঁড়ে দিল গাড়িটার গায়ে।
ঢেলাটা গাড়িটার গায়ে ধাবিস করে পড়ল কি! পড়ে, গাড়িটার ইঞ্জিন মিঞ্জিন, কাচ মাচ ভেঙে চৌচির হয়ে রাস্তার পাশে এগারো হাজার ভোল্টেজের ইলেকট্রিক পিলারটার মতো ঝরঝর করে ঝরে পড়ল কি! নাকি হাড়া তালগাছের তালপাতার খুরুক খুরুক শব্দ হল কেবল!
এখন তো ত্রিসন্ধেবেলা। এই ত্রিসন্ধ্যাবেলায় সব শব্দই প্রায় একইরকম।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন