জয়দেব দত্ত
আমাদের খামারে নুদি দিদিরা যখন ধাসা খেলত, তখন আমার ড্যাব ড্যাব করে চেয়ে দেখা ছাড়া কোন উপায় থাকত না। নুদি দিদি। ওরফে নন্দনারানী রায়। হ্যাঁ সত্যিই রায়ই বটে। বর্ধমান মহারাজ আফতাবচন্দ্র মহাতাবের দেওয়া 'রায়' উপাধির উত্তরসূরি নন্দরানী রায়। নন্দরানীর পাশে রায় উপাধী মানায় বেশ।
সেই নুদিদিদি যখন লম্বা লম্বা ঠ্যাং নিয়ে কুলগাছ থেকে ডাঁসা ডাঁসা কুল পেড়ে আঁচল ভর্তি করে, আঁচল থেকে খপ খপ করে কুল মুখে ভরে চিবাতে চিবাতে এসে মহারানীর পান খাওয়া মুখের মত ফস করে বলে বসে, 'এই আমিও খেলব' তখন নুদিদিদিকে খেলায় নেওয়া ছাড়া কোন গত্যান্তর থাকে না। কেন না, নুদিদিদি তো 'রায়'। তাছাড়া এ তল্লাটে রায়দের একটা প্রতাপও আছে। হাজার হলেও তো মহারাজ আফতাব চন্দ্র মহাতাবের দেওয়া 'রায়' উপাধি। আর তিনি তো আর যাঁকে তাঁকে যা তা উপাধি দেন না। রীতিমত সৎজন ছাড়া। নুদিদিদি নাইটির কাপড় হাঁটুর উপর তুলে কোমরে 'বেজিয়ে' নিয়েছে। মানে বেঁধে নিয়েছে। এমন বাঁধনে নুদিদিদিকে মানায় বেশ। রণং দেহি মূর্তি। খেলাটাও তো একটা যুদ্ধ। আর যুদ্ধ মানে জয় পরাজয়। হয়তো এই জয় পরাজয়ে ঢাল বা তরোয়াল নেই। আছে একটা খেলোয়াড়সুলভ মূর্তি। হয়তো 'ধাসা' খেলাটা এখন আর ফুটবল কি ক্রিকেট কি হকি খেলার মতো জনপ্রিয় নয়। আর আমাদের নুদিদিদিও সানিয়া মির্জা নয়। ও শুধু আমাদের নুদিদিদি। স্রেফ নন্দনারানী রায়।
আমি দর্শক আসনে ধাসা ঘরের চিক ছুঁয়ে বসে আছি। বসে বসে খেলা দেখছি। আমার বসে বসে খেলা দেখা ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। কেন না, আমি ওদের থেকে অনেক ছোট। আর শুধু ছোট বলেই নয়, ওদের চোখে খেলার ব্যাপারে আমি একটু অপটুও বটি। আমার পাশে গানপাগল রমানাথ। পাড়ার ছেলেরা গানওয়ালা বলে ক্ষেপায় তাকে। রমানাথ হল গানওয়ালা। আর আমি হলাম 'গড়ওঠা গুড়ুরাম।' আমার লাইমুন্ডির ঠিক এক ইঞ্চি উপরে একটা উঁইঢিবি। সেই হলাম 'গড়ওঠা গড়ুরাম।'
আমি গড়ুরাম আর রমানাথ গানওয়ালার পাশাপশি দুটি গুণ। আর একটি গুণ আমাদের দুজনার ভেতর এক হয়ে আছে। সেটা বলা যাবে না। বললে সকলে হেসে উঠবে। না, গোপন জিনিষ, গোপনে থাকা ভাল। প্রকাশ হয়ে গেলে মুস্কিল। তখন গর্তে মুখ লুকানো ছাড়া আর কোন উপায় থাকবে না। না থাক তবু বলা ভালো।
আমি 'সিজেমুতরো'। মানে রাতে বিছানায় মুতি। যখন মুতি, তখন মনে হয় বাইরে মুতছি। মোতা হয়ে গেলে বিছানা ভিজে যায়। তখন আমার হুঁস ফেরে। মা আমার আগেই বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ে। উঠেই দুমদাম চড় চাপ্পড়। মা-এর হাতে চড় খেয়ে চুপ করে বসে থাকি। চুপ করে বসে থাকা ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। কেন না, বাবা জানতে পারলে, মা-এর 'উতো' দেওয়া উনান থেকে (উনানের শুকোতে দেওয়া) কঞ্চি টেনে সপাসপ বসিয়ে দেবে গাএ। সারা গা 'কালসিটে' পড়ে যবে। মানে কালো কালো লম্বা লম্বা দাগ। দুতিন দিনের পরও মিলবে না সেই দাগ। বন্ধুরা সবাই দেখে আমার অপগুণটির কথা জেনে ফেলবে। ফলত মা-এর হাতে চড় চাপড় খেয়ে বসে থাকি চুপচাপ। আমার সারা গা মুতে ভিজে গেছে। মুজে ভিজে গেছে গায়ের জামা, পরনের প্যান্ট, গায়ের চাদর, বিছানা। পরনের প্যান্ট খুলে ফেলে ন্যাংটো হয়ে থরথর কাঁপছি। আমার পাশে নাক ডেকে বাকি সব ঘুমাচ্ছে। আমি ঘুমাতে পারছি না। কী যে অবস্থা হচ্ছে, তখন, সে কথা এক রমানাথ ছাড়া আর কেউ বুঝবে না। কেননা রমানাথও তো আমার মতোই 'সিজেমুতরো'।
সেই রমানাথ আর আমি পাশাপাশি বসে আছি দুজন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে। যদি কোনো ফিচকেল কিষাণ আমাদের কাঁধের উপর হালের 'জোয়াল' জোড়া এনে জুড়ে দেয় তো তখন আমাদের হালের বলদ হয়ে কিষাণের 'পাচন' এর বাড়ি খেয়ে পন পন ঘোরা ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না। এমন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বসে আছি আমরা। নুদিদিদি লম্বা লম্বা ঠ্যাং। নুদিদিদি ছুটতে ছুটতে ধাসা দিচ্ছে। ধাসা।
নুদিদিদির ধাসা দেওয়া দেখে আমারও ধাসা দিতে ইচ্ছা করছে। নুদিদিদির লম্বা লম্বা পাগুলিকে দেখে আমার হিংসা হচ্ছে। যদি পাগুলি পেতাম, তাহলে আমিও ধাসা খেলতে পারতাম। তাহলে আমিও ছুটতে ছুটতে ধাসা দিতাম। ধাসা।
নুদিদিদি মনে হয় আমার কথাটা বুজতে পেরেছে। তাই জোরে হাঁক পাড়ছে, আর খেলব নাই। খেলব নাই।
নুদিদিদির মুখে হাঁক শুনেই, আমরা চিকের গা ধরে বসে থাকার দল আনন্দে ধেই ধেই করে নেচে উঠি।
নুদিদিদি আমাদের নাচ দেখে ধমকে ওঠে, এই শোন, তোরা ঝিঙে খেল।
নুদিদিদির ধমক খেয়ে আমরা ঘুরে দাঁড়ালাম, হ্যাঁ দিদি আমরা ঝিঙে খেলব। ঝিঙে।
ঝিঙে কথাটা বার হয়েই আর রা বার হয় না আমার। ঝিঙে খেলতে হলে একজনকে ফড়ি হতে হয়। কিন্তু কে ফড়ি হবে? ফড়ি কেউ হতে চায় না। ফড়ি মানে ফড়ি। ফড়ির আর কোন দ্বিতীয় প্রতিশব্দ নেই। যাকে বলে ফড়ি আর কী! আমার মাথায় চিন্তার জট পেকে যাচ্ছে। কে ফড়ি হবে? সেই চিন্তার জট নুদিদিদিই খুলবে বলে মনে হচ্ছে। কেন না, ততক্ষণে নুদিদিদি বিচুটি বন টপকে টপকে আকোড় ঝোড়এ ঠেকেছে। আকড় ঝোড় থেকে টপাটপ আকড় পাতা তুলছে। গাছ থেকে ডাঁসা ডাঁসা কুল পাড়ার মতো। ঐখান থেকে হাঁক পাড়ছে, কত জন?
আমি উত্তর করলাম, পনেরো জন।
নুদিদিদি চটাপট প্রশ্ন করল, মানুষ গুনলি না গরু গুনলি?
আমি উত্তর দিলাম, গরু।
মানুষ গুনলে গরু বলতে হয়। এটাই নিয়ম। না বললে গৃহস্থের অকল্যাণ।
নুদিদিদি মুখে আস্ত একটা ডাঁসা কুল ভরে গুনে গুনে আকড় পাতা তুলে আনছে। পনেরোটি। এর মাঝে একটা পাতা ছেঁড়া।
আমরা 'ন্যাংটো' পোঁদে চটুই ছা এর দল নুদিদিদির হাত থেকে একটা একটা পাতা টানব। এর মাঝে যে ছেঁড়া পাতাটা টানবে, সে হবে ফড়ি।
আমি খুব সতর্ক আছি ছেঁড়া পাতা না টানার। ছেঁড়া পাতা টানলেই ফের। তখন দুর্গতির সীমা থাকবে না। দুর্গতির বোঝা টানতে টানতেই শেষ। একেবারে অক্কা পেয়ে যাব।
না, আমি ছেঁড়া পাতা টানব না। কী জন্য টানব? ছেঁড়া পাতা না টানার মতো বুদ্ধি আমার আছে। আমাকে এমনি কি আর 'হেঁড়ে মাথা' বলে ডাকে? আমার মাথাটা হাঁড়ির মতো মোটা। অতবড় মাথা এ তল্লাটে খুব কমই আছে। আর যাদের আছে, তারা সবাই আমার মতো বুদ্ধিমান। মাথায় বুদ্ধি থাকবে না তো কি গোবর থাকবে?
আমি বুদ্ধি মাথা নিয়ে নুদিদিদির হাত থেকে সর্বপ্রথম পাতা টানার কথা ভাবি। পনেরোটা পাতা থেকে দেখেশুনে একটা ভাল পাতা টেনে নেওয়া কত সহজ, দুটি পাতা থেকে একট ভাল পাতা টানা অত সহজ নয়। ফলত আমি পাতা টানার মত প্রকাশ করি।
নুদিদিদি, জি আজ্ঞে বলে গুটি গুটি পায়ে আমার কাছে মুচকি হেসে দাঁড়ায়। আমি সেই মুচকি হাসিতে ঘায়েল না হয়ে দেখে শুনে পরখ করে পাতা টানি।
নুদিদিদি হো হো করে হেসে ওঠে। সেই হাসি দেখে আরো সকলে। আমি অবাক! আমার ভাগ্যে ছেঁড়া পাতা! এই ছিল! এই ছিল আমার ভাগ্যে!
আমি ফড়ি সেজে দাঁড়িয়ে গেলাম চিকে। চিক থেকে সরে 'বের' 'বের' দিলাম। সকলে বেরিয়ে গেল ধাসা ঘর থেকে। না, ঝিঙে ঘর থেকে। তারপর এ-ঘর ওঘর লাফিয়ে লাফিয়ে 'নুন' ঘর হয়ে একেবারে ঝিঙে ঘর-এর ভেতর। এক এক বার ঝিঙে ঘরে ঢুকছে আর আমি এক একটা 'ঢাল' খাচ্ছি। এভাবে দশ 'ঢাল'-এ এক গেম। এক গেম খেয়ে আমার পেট ভরে গেছে। 'আটু পাটু' লাগছে। নাও, এবার সামলাও।
ছেলে ছোকরার দল আমার বিয়ে দেবে। পাইক, বরকন্দাজ সব আমার সঙ্গে যাবে।
আগে থেকে পাল্কি রেডি ছিল। রেডি ছিল পাল্কি বহনকারী কাহারদের দল। তবে এ পাল্কি সে পাল্কি নয়। আর এ কাহারেরা সে কাহার নয়। পালকি বলতে স্রেফ দু'টি বাঁশের খুঁটি। সে আমাদেরই বেগুন বাড়ির 'রদ' থেকে টেনে ছাড়িয়ে নেওয়া।
খুঁটি দুটির দু'দিকে দুই দুই চারজন কাঁধ নিয়ে দঁড়িয়ে আছে। আমকে লাফিয়ে চেপে যেতে হবে ঐ খুঁটির উপর। আমি বর। পাল্কির উপর চেপে আছি। চেপে আছি না, আমাকে বহন করে নিয়ে যাচ্ছে, ছাদনা তলায়। আমার পেছন পেছন বরকন্দাজের দল। বাজনদাররা বাদ্যি বাজাচ্ছে, শুকনো বাঁশ 'পেটকো'ই (কচি বাঁশ এর সুরক্ষিত ছাল)। আকড় পাতা ছিঁড়ে বাঁশি বাজাচ্ছে ডোম। কেউ খালি হাতে যায়নি। ভিজে পোয়ালচুনী মাথায় 'বেড' নিয়ে যাচ্ছে। মাটির ঢেলা হাতে পুকুরের মাছ। সকলকে পেটপুরে খাওয়াবে বিয়ে বলে কথা!
আমাকে ছাদনা তলে নামিয়ে দিল। এ ছাদনা তলা যে সে ছাদনাতলা নয়। ঐ যে পুকুরপাড়ে ঈশান কোণে একটা ঝাঁকড়া মতো খেজুর গাছ আছে না; সেই খেজুর গাছের তলে আমার ছাদনাতলা। ছাদনা তলে আমার বউ কৈ? আমি এদিক ওদিক তাকাই। দেখি, আমাদের নুদিদিদি একটা খড়ের আটিকে আমার বউ সাজিয়ে হাসতে হাসতে আসছে। আমার বউও কি হাসছে তাহলে? না, আমার বউ বড় লাজুক। চুপটি করে এসে, খেজুর গাছে ঠেস দিয়ে মুখ নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের মিনতা দিদি, ডাক নাম মিনি, আঁচল ভর্তি ধুলো এনে, আমার বউ-এর গা-এ ছুঁড়ে দিল, নাও বউ পাউডার মাখো। দেখে দেখে রমানাথ, মানে গানওয়ালা রমানাথ, তার 'সিজেমুতি'টা চাপা রেখে, প্যান্টের বোতাম খুলে, দম দিয়ে দিয়ে মুতে দিল আমার বউ-এর গায়ে, নাও বউ চান কর। চান হয়ে গেলে, আমাকে ঠেলে ঠেলে নিয়ে যায় বউ-এর কাছে, নাও বউ এর মুখ দেখ।
বউ-এর গা ধরে দাড়িয়ে আছি আমি। আমার কাছ থেকে দশ হাত মেপে একটা লম্বা চিক করে, চিক বরাবর দাঁড়িয়ে যায় সকলে। এক দুই তিন বলার সঙ্গে সঙ্গে দৌড় শুরু করবে সকলে। আমাকে দৌড়ে ওদের মধ্যে একজনকে ছুঁতে হবে। না ছুঁতে পারলে আমার শাস্তি। শাস্তি বলতে আমাকে কান মুলে খাটাবে ওরা।
না, আমি ওদের মধ্যে কাউকেই ছুঁতে পারিনি। আমি ছোঁওয়ার আগেই ওরা আমার ঝিঙে ঘরে ঢুকে গেছে। ফলত ওরা আমাকে 'খাটা খাটুনী' খাটাবে। খাটা খাটুনী বলতে পায়ের নীচে মাথা হেঁট করে, পায়ের ফাঁক বরাবর হাত চালিয়ে, নিজের কান নিজে মলা খেতে খেতে আমাকে ঝিঙে ঘর পর্যন্ত যেতে হবে। না গেলে রেহাই নেই।
আমি আমার ছাতনা তলায় বউ-এর গা ছুঁয়ে, মাথা হেঁট করে, পা-এর ফাঁক বরাবর হাত চালিয়ে, নিজের কান নিজে মলা খেতে খেতে জড়বৎ হাঁটছি। এভাবে হাঁটতে আমার কষ্ট হচ্ছে! ভারি কষ্ট! আমার তলপেটটা খেঁচে ধরে আছে। লাইমুন্ডির এক ইঞ্চি উপরে উইঢিবিটা খচাম খচাম উঠছে নামছে! নাক দিয়ে গরম নিঃশ্বাস বার হচ্ছে! যেন কারখানার চিমনি। কানের লতিটা তাপ ছাড়ছে! তাপ!
নুদিদিদিগো, তোমার ক্যারিশমাকে ধন্য! তোমার ঐ মুখে খপ করে ভরে নেওয়া ডাঁসা কুলটা, একটা কানের লতিতে এসে, কেমন পেকে গেছে! তুমি একবার, কেবলমাত্র একটি বারের জন্য, হাত দিয়ে দেখ, কী যন্ত্রণা!
আমাদের গাঁয়ের মধুছন্দাকে এ তল্লাটে কে না চেনে। সেই উপর পাড়ার শ্যামলা রঙের হাড়মোটা মেয়েটা। গাছের 'কুঁদোর (গাছের গুঁড়ি) মতো 'গড়ন' (গঠন) যার। মিস্ত্রি যেন 'কুঁদে কুঁদে' গড়েছে। মানে ঠুকে ঠুকে। কোথাও হাড়গোড় বেরিয়ে নেই। যেন 'আগা-গোড়া' সমান। সেই মেয়ে মধুছন্দা।
মধুছন্দা! যেন বাপ-মা-এর যুগল মিলন নাম। বাবার মধু আর মা-এর ছন্দা নিয়ে মধুছন্দা। এমন নামের মেয়ের গায়ে একটা মিষ্টি গন্ধ থাকে। আছেও। দেখলেই চেটে খেতে ইচ্ছা করে। আর ইচ্ছেটা হবে না কেন? আমাদের চৌমাথার মোড়ে যে ওদের একটা মিষ্টির দোকান আছে। সেই দোকানের কত সেল। সব সময় খদ্দের মাছির মতো উড়ে বেড়াচ্ছে। বিস্তর পয়সা ওদের। 'কলঙ্গা' (কুলুঙ্গি) 'জানলা'য় সবসময় পয়সা ফেলা ছড়ানো থাকে। ওর বাবা কত কী ফল এনে, ওর মুখে যে গুঁজে দেয়। তাহলে ওর গা থেকে মিষ্টি মিষ্টি গন্ধ বার হবে না?
ওর গা থেকে মিষ্টি মিষ্টি গন্ধ বার হলেও, ওর বাবার মুখটা মিন্তু মোটেই মিষ্টির মতো নয়। খানিকটা ওলের মতো। তাই আমি ঐ লোকটাকে ওল মুখো বলে ভাবতে ভালবাসি।
সে যাই হোক, এখন আমার ঐ লোকটাকে নিয়ে কাজ নয়। আমার কাজ মধুছন্দাকে নিয়ে। মধুছন্দা আমার চারপাশে ঘোরাফেরা করে। অন্তত আমার সেটা মনে হয়। মধুছন্দা যেন একটা ঘুরঘুরে পোকা। ঘুরঘুরে পোকা যেমন মাটি চেলে চেলে ঘর বানায় মাটির উপরটা যেমন উল্কে থাকে, ফাটা ফাটা ভাব। অথচ ভিতরে ভিতরে পথ। দেখলে সহজে ঠাওর হয় না। কতটা পথ গেছে এঁকে বেঁকে? তারপর একটু ভিজে আস্তরণ পেলেই, মাথা গুঁজে দিব্বি হলবল করে 'সেঁধিয়ে' (ঢুকে) যায় মাটি আরো গভীরে। মধুছন্দাও ঠিক যেন তাই।
এই যেমন পদ্মপুকুরের বাঁধানো ঘাটে আমি চান করতে গেলেই হল। ঠিক আমার সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে। আমার পেছন পেছন বালতির টং টং শব্দ তুলে ওর আসা চাই। কোনোদিন এ নিয়মের ব্যতিক্রম হয় না। আমি আমার ময়লা ত্যালত্যালে গামছাটা, কিংবা গায়ে 'ঘেমো' গন্ধ ওঠা স্যান্ডো গেঞ্জিটা নিয়ে সানের উপর সাবান নিয়ে বসেছি তো, সঙ্গে সঙ্গে মধুছন্দা আমার হাত থেকে সাবানটা কেড়ে নিয়ে, হ্যাঁ একপ্রকার কেড়ে নিয়েই মুখ ফস্কে বলে বসে, পুরুষ মানুষের ঢং কত। কথাটা শুনেই আমার ভেতরে জ্বলে বিদ্যুৎ খেলে যায়, পুরুষ মানুষ! এখনো আমার ভাল করে গোঁফ দাড়ি বার হয়নি! রেখা দেখা দিয়েছে মাত্র। এর মধ্যেই আমি পুরুষ মানুষ! তা তোমারও কি সুপারীর 'মচা' মানে মুকুল ছেড়েছে নাকি? হ্যাঁ, দেখে তো তাই মনে হচ্ছে! উঁচু উঁচু বুক/আঁখিতে নাই সুখ... ব্যাপারটা কি তাই? তা হোক আর নাই হোক, আমার কিন্তু পুকুর ছেড়ে ঘরের দিকে দৌড় দিতে ইচ্ছা করে। মনে হয় এক ছুটে নিয়ে আসি রান্নাঘরের মাচার উপর তুলে রাখা ময়লা ঝুলধরা কালো ক্যাদক্যাদে ছিপটাকে। ছিপের সুতোয় কাঁটা থাকা আর না থাক; কেবল সুতোটাই লম্বা 'দিগদড়া'র মতো জলে ভাসিয়ে ছিপ হাতে পুকুরপাড়ে বসে থাকতে। তক্ষুনি হয়তো সেই ধোপানি আমার দিকে ভ্যাল ভ্যাল করে চেয়ে থাক আমাকে প্রশ্নবান ছুড়ে মারবে—ঠাকুর আমি ঘাটে এলেই তুমি ছিপ হাতে আসো কেন?
আমি ছিপ ফেলে দু'হাত শূন্যে তুলে তাকে উত্তর করব, রজকীনী প্রেম নিকশিত হেম/কাম ও গন্ধ নাহি তায়।
ঠিক সময়, মানে ঠিক সেই মাহেন্দ্রক্ষণে প্রায় প্রতিবারই আমার ময়লা ত্যালত্যালে গামছাটা, কী ঘেমো গন্ধ ওঠা স্যান্ডো গেঞ্জিটা ধোপ দুরস্থ হয়ে আমার হাতে উড়ে আসে। তার মানে, অনেক হয়েছে, এবার চান সেরে বাড়ি যাও। ফলত চান সেরে বাড়ি যাওয়া ছাড়া আমার আর কোনো উপায় থাকে না।
উপায় থাকে না বললেই হল, ওর সঙ্গে কি কেবল আমার ঘাটে দেখা? আর কি কোথাও দেখা সাক্ষাত হয় না? এই তো একটু আগে এই রাস্তা দিয়ে ও দোকান গেছে। নুন তেলের দোকান। মা-এর রান্নার জোগাড় আনতে।
আমি দাঁড়িয়ে আছি ওর অপেক্ষায়। আজ ব্যাপারটা পরিষ্কার করে দেব। উভয়ে জানাজানি হয়ে যাবে। এমন অবস্থায় মহারানী গজ গমনে আসছেন। ওর গমন দেখে আমি পাল্টে যাচ্ছি। পাল্টে যাওয়াতে আমার দোষ কোথায়? ওইতো আমাকে পাল্টে দিয়েছে। আমার বুকের ভিতর সরু হয়ে আঁকা বাঁকা পথ তৈরি করে, ঘুরে বেড়াচ্ছে যত্রতত্র, একটুখানি ভিজে আর্দ্র মাটির অপেক্ষা। ভিজে আর্দ্র মাটি পেলেই চ্যাঁ করে ঢুকে যাবে আঠারো মোকামে। আজ আমি ওকে সেই ভিজে আর্দ্র মাটির সন্ধান দিব। তোমাকে আর বুক চেরে পথ খুঁড়তে হবে না। হবে না।
এমন অবস্থায়, আমার দিকে কটমট চেয়ে মধুছন্দা ধমকে উঠল, আমি পথে বেরলেই, তুমি আমার দিকে অমন হাঁ করে চেয়ে থাকো কেন বলতো?
কথাটা শুনেই আমি যেন ঘর ছাওয়া 'বাড়ুই'। নীচ থেকে উড়ে আসা খড়ের আঁটি ধরতে না পেরে, টাল টামাল খেয়ে খড়ের আগে উঁচু ঘর থেকে গড়িয়ে গড়িয়ে নীচে পড়ছি।
সেই থেকে তিনদিন ঘর থেকে বার হতে পারিনি। আমার কলজেটা লজ্জায়, নিজের প্রতি ঘৃণায় এবং আক্রোশে পুড়ে যাচ্ছে। আমি যেন তেল ফুরিয়ে প্রদীপের সলতের মতো। কেমন একজাতীয় গন্ধ বার হচ্ছে শরীর জুড়ে।
ক্রমে চারদিনের দিন বার হলাম ঘর থেকে। বার হয়ে একেবারে সরাসরি পুকুরের ঘাটে। তাও আবার সময় পাল্টে সকাল দশটার জায়গায় বিকাল তিনটে। কিছুতেই যেন দেখা না হয়ে যায়। যদি দেখা হয়ে যায় তো আমার মরণ।
আমি শান বাঁধানো ঘাটে নেমেছি। তো আমার পেছন পেছন সেই মধুছন্দা! সেই টং করে বালতি নামানো মধুছন্দা! আমার হাত থেকে ময়লা ক্যাদক্যাদে গামছা কেড়ে নেওয়া মধুছন্দা! আমাকে রাস্তায় দাঁড়িয়ে অপমান করা মধুছন্দা!
আমার পেছনে মধুছন্দা এসে দাঁড়িয়েছে। বালতি হাতে। আমি জলে তার ছবি দেখতে পাচ্ছি। আমার হৃৎপিণ্ডটা লাফাচ্ছে। লাফাতে লাফাতে এক্ষুনি বন্ধ হয়ে যাবে। তখন আমি মরে যাব। ফুরিয়ে যাব। আমার দেহটা থেকে যাবে শান বাঁধানো ঘাটে। তখন এ ঘাটে কেউ আসবে না।
আমি বেঁচে আছি কি নেই, বুঝতে পারি না। আমার দেহটা জলে পড়ে যায়। দেহটা জলে ভাসছে কলার ভেলার মতো।
মধুছন্দা আমার কলার ভেলা দেখে আসছে। হো হো।
পদ্মপুকুরের জলে মধুছন্দার হাসি মিশে যাচ্ছে। ঠিক যেমন রোদে জল গরম হয়; গরম মিশে যায় উপর থেকে নীচ পর্যন্ত।
হাসতে হাসতে মধুছন্দা হঠাৎ বলে ওঠে, তুমি এত ভীতু গড়াদা?
হ্যাঁ, মধুছন্দা আমাকে গড়াদা বলেই ডাকে। বয়সে আমি ওর থেকে দু'বছরের বড় যে।
তোমার অত ভয় কীসের সামান্য একটা মেয়েকে!
কীসের আবার বলে জল থেকে উঠে দাঁড়াই, মধুছন্দার সামনা সামনি হই। ওর চোখে চোখ রাখি। ওখানেও একটা পদ্মপুকুর। আর সেইপুকুরে একজন জলে নেমে দাঁড়িয়ে আছে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে পুকুরটাকে। সামান্য, অথচ কী গভীর!
পুকুরটার মাটির উপরে তল থেকে চার পাঁচ কিলোমিটার গভীরে পাললিক শিলা। তার নীচে পনেরো কুড়ি কিলোমিটার পুরু গ্রানাইট। তারও নীচে পনেরো কুড়ি কিলোমিটার ব্যাসল্ট। ভূমিকম্প সাধারণত হয় এই ব্যসল্ট আর গ্রানাইট শিলার স্তরে। প্রথম তিনটি স্তরের পরে রয়েছে অতি ঘন এবং কঠিন শীলা ম্যান্টল। এটি তিনহাজার কিলোমিটার পুরু। তারও নীচে রয়েছে কোর এলাকা। এই কোর এলাকায় রয়েছে দু হাজার কিলোমিটার পুরু গলিত লোহার আবরণ। তারও নীচে একেবারে শেষ ধাপ রয়েছে তিন হাজার কিলোমিটারে ব্যাসের একটা নিকেল ও লোহার তৈরি গোল বল। সেই গোল বলটা আমাকে টানছে। চুম্বকীয় শক্তিতে আমি ভেতরে ঢুকে যাচ্ছি। ঢুকে যাচ্ছি না, ঢুকব ঢুকব করছি। আমার সারা দেহ কাঁপছে। থর থর, থর থর।
হঠাৎ টং শব্দে একটা জোরে বিস্ফোরণ। বিস্ফোরণে আমি কক্ষচ্যুত। তাকিয়ে দেখি, আমাদের মালতি বৌদি। মালতি বৌদি হাতের বালতি নামিয়ে দাঁতে 'গুড়াকু' ঘষছে। আর মুখের দলা দলা পিচ ফেলে পায়ের তলে মাটি লালে লাল করছে। ঐ লালটা আমার মুখেও এসে মিশছে খানিকটা। আমার মুখটা লালে লাল হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। মালতি বৌদি আমাদের দু'জনার সব হালহকিকত কি জানতে পারল? যদি জানতেই পারলে বৌদি, একটু দূরে দাঁড়ালে না কেন? তাহলে তো আর আমার এত তাড়াতাড়ি রণে ভঙ্গ হত না। দিলে তো বৌদি, আমার সব রস ভঙ্গ করে।
আমি একটা ঘর ছাওয়া বাডুই। কঠিন রোদে আমার রসভঙ্গ হয়েছে। কিন্তু মধুছন্দা তো আর ঘর ছাওয়া বাড়ুই নয়। বরঞ্চ সে একটা ভিজে খড় আটি। নীচ থেকে ঠেলা পেয়ে উপর দিকে উঠছে। ওঠার সময় সে কাউকে পরোয়া করে না। ঘর ছাওয়া বাডুই ওকে ছুঁতে পারল কি পারল না, তাতে ওর কিছু যায় আসে না। বরঞ্চ ওর গায়ে লেগে থাকা জল ছিটিয়ে দিয়ে যায় এদিক ওদিক, এমন বেপরোয়া!
মধুছন্দা বেপরোয়া হয়েই জলে খল বল নেমে গেল। নামতে নামতে আমার কানের কাছে বলল, আজ সন্ধ্যায় পদ্মপুকুরের ঐ পারে।
মধুছন্দার মুখ নড়ল না, কেবল কথাগুলো বার হল। যেমন করে ভিজে খড়ের আঁটি উপরে উঠতে উঠতে জল ছিটায় আর কি! যার গায়ে লাগে সেই কেবল বুঝতে পারে। এ কেবলমাত্র আমি, যে মধুছন্দার কথাগুলো বুঝলাম। মালতি বৌদি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কেবলমাত্র মধুছন্দার খলবল, জলে নামা দেখল, আর কিছু দেখেনি।
ভিজে গামছা পরে ঘরমুখো হাঁটছি আমি। আর আমার মন পড়ে আছে সন্ধ্যা সাতটার দিকে। সন্ধ্যা সাতটার সময় মধুছন্দা আমাকে ডেকেছে। তাও আবার পদ্মপুকুরের ঐ পারে।
সন্ধ্যা সাতটার পদ্মপুকুরের মহিমা এ তল্লাটের কার না জানা? রাজ্যের যত বাঁশবন ঐ পারে। পৃথিবীর যত অন্ধকার ঐ বাঁশবনে। এ এলাকায় যখন 'মেঘের বাত' হয় (জ্যৈষ্ঠের সাত আষাঢ়ের সাত/তবে জানবে মেঘের বাত) তখন এ এলাকা হয়ে যায় ভূতুমপুরী। বাতাসে ঝড় ঝড় বাঁশের শব্দ! ব্যাঙের একটানা কড় কড় ডাক। জোনাকির ছোট ছোট আলো নিয়ে এ ঝোড় থেকে ও ঝোড় উড়ে বেড়ানো; মনে হয় কোন এক প্রাগৈতিহাসিক যুগের সূচনা। জ্যোৎস্নার আলোয় ফাঁকা মাটির হাঁড়ি গড়াগড়ি খায় উপর থেকে নীচ, নীচ থেকে উপর। গড় গড়, গড় গড়...। বাঁশবনের আড়ালে, পদ্মপুকুরের জলে কে যেন কলসিতে জল ভরে, ভর ভর, ভর ভর...। বাঁশবনে ছেলে কাঁদে, কুঁয়া কুঁয়া...। বাঁশবনের গা ধরে বেলগাছ। বেলগাছের নীচে সাদা থান পরে দাঁড়িয়ে থাকে বিধবা। দাঁড়িয়ে থাকে। শুধু দাঁড়িয়ে থাকে।
এমন অন্ধকার ঘনঘটা ভূত পেতনি সম্বলিত বাঁশবন পদ্মপুকুরের ঐ পারে। সন্ধ্যা হলে কে যায় ওদিকে?
আমাকে যেতে হবে সেই অগম পথে। কেন না, মধুছন্দা আমাকে ডেকেছে সেখানে। আমার না যেয়ে উপায় নেই। মধুছন্দা ডাকলে, আমি মরণের পথেও যেতে রাজি।
দিনের আলো শেষ হলেই বেরিয়ে পড়ি পদ্মপুকুরের পথে। আমাদের ঘর থেকে মাঠ পার হলেই পদ্মপুকুর। ঘরের চৌহদ্দি পার হয়ে মেঠো রাস্তা ধরে হাঁটছি। মেঠো রাস্তা শেষ হলেই, পদ্মপুকুরের দু'পার যাওয়ার জন্য দুটি রাস্তা। ডান দিকে গেলে সান বাঁধানো ঘাট। আর বাম দিকে গেলে প্রথমে পড়বে একটা বট গাছ। তারপর একটা অশ্বত্থ। অশ্বত্থ গাছ পার হলেই ভুস ভুস বেরিয়ে আসে। অশ্বত্থ গাছের ছায়া থেকে পা তুললেই আকোড় গাছ, না আকোড় ঝোপ। আকোড় ঝোপের ভিতর 'বিয়াই পাঁশ'-এর আস্তা। গ্রামের বউ ঝিদের ছেলে পুলে হলে, বউ-ঝিদের গা-এর রক্তরস ছাই দিয়ে ডেকে, ভিজে রক্ত মাখা কানি চুনি মাটির হাড়ির ভেতর ভরে ডাঁই করে ফেলে আসে আঁকড় ঝোড়ের ভিতর। সেই হল 'বিয়াই' পাঁশ' আর 'বিয়াই পাঁশের হাড়ি'। ছেলেরা দিনের বেলায় 'টিক টিক' খেল খেলে। আর তাতে ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যায় হাড়ি। সেই হাড়ির খলাম কুচিতে কারু পা পড়েছে, তো সঙ্গে সঙ্গে পা ফুলে উদম। গোল গোল ফোস্কা পড়ে পায়ের তলে। 'মাসা দরুনে' চলে সেই ফোস্কার টন টন দপ দপ জ্বালা।
আমি খুব 'সন্তর্পণে' পা ফেলে চলেছি আঁকড় ঝোড়ের ভিতর। সরু রাস্তার দিকে চেয়ে চেয়ে 'বিয়াই পাঁশ' দেখে দেখে। একটুখানি কালো ভুস ভুসে আকার দেখেছি তো সঙ্গে সঙ্গে লাফ, লাফ দিয়ে সাদা জায়গায়। এই লাফ দেওয়ার সময় আমাকে সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়। জোরে লাফ দিলে হয় না। কেন না, জোরে লাফ দিলে পায়ের শব্দ হবে। তখন লোক জানাজানি হবার ভয়। বলা তো যায় না, কোন ঝোড়ে কে কী অছিলায় বসে থাকে? মধুছন্দা আমাকে গোপনে ডেকেছে। আমাকে গোপনেই দেখা করতে হবে। আমি ছাড়া যদি আর কারু আমার মতো কোনো গোপন ব্যাপার থেকে থাকে তো আমি তার চোখে ধরা পড়ে যেতে পারি। যাতে ধরা না পড়ি তার জন্য আমাকে দুমদাম লাফ দিয়ে চললে হবে না; একটুখানি সতর্কে লাফ দিতে হবে। এবং আমি সেই মত লাফ দিয়ে দিয়ে চলেছি।
বাতাসে শুকনো পাতা ঝরে পড়েছে। পাতা ঝরার দিন। বৈশাখের প্রথম সপ্তাহে যা হয় আর কি! আমার চলার পথটা কাঁথার মতো পুরু হয়ে গেছে। শুকনো কাঁথা, বাঁশ পাতা শুকিয়ে গেলে যা হয় আর কি, কেবল স্লিপ কাটে। হাঁটতে গিয়ে স্লিপ কেটে পড়ে যাওয়ার ভয়। কিন্তু আমি স্লিপ কেটে পড়ে যাচ্ছি না। পড়তে পড়তে হেলতে হেলতে ঠিকই দাঁড়িয়ে যাচ্ছি। কেন না পড়ে গেলে দুম করে শব্দ হবে। আর সেই 'দুম' শব্দ শুনে যদি কেউ ছুটে চলে আসে তো পুরো ব্যাপারটা জানাজানি হয়ে যাবে। তখন সকাল থেকে প্রতিটা মানুষের মুখে একটা কথাই খোলাম কুচির মতো লেগে থাকবে সর্বত্র। আর সেই খোলাম কুচিটা যদি আমি বা মধুছন্দা হয়, তাহলে আমার বাঁচার রাস্তা থাকবে না। যদিও আমি অন্ধকারকে ভয় খাই না। ভয় খেলে এমন 'অগম ভূতুমপুরী'তে আসতে পারতাম না। কিন্তু মধুছন্দা তো ভয় খায়। ওর ভয়ে আমার ভয়! যদি মধুছন্দা হুট করে কিছু করে বসে, তখন আমি বাঁচতে পারব না। এখন আমি বেশ বুঝতে পারছি, মধুছন্দা ছাড়া আমার বাঁচা সম্ভব নয়। এখন আমার যা কিছু সব ওকে নিয়ে। মানে সব, সব কিছু।
একটু খানি এগিয়ে গিয়ে দেখি, সেই গাছটার নীচে, সেই বেলগাছটার নীচে গায়ে কাপড় জড়িয়ে একজন দাঁড়িয়ে আছে। শুধু দাঁড়িয়ে আছে। মুহূর্তে আমার সারা গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। যেন আমি সজারু মানুষ। সজারু যেমন ভয় পেলে সারা গায়ে কাঁটা ছড়িয়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে চুপচাপ। এসো কার সাহস দেখি, আমাকে ছোঁও। আমিও যেন ঠিক তেমন। আমার সারা গায়ে কাঁটা ছড়িয়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে আছি চুপচাপ। কিন্তু আমি ভয়ে থর-থর কাঁপছি। আমার তো আর কাঁটা ছড়ানোর অভ্যাস নেই। বরঞ্চ কাঁটাগুলো আপনা আপনি ছড়িয়ে গেল এই যা মঙ্গল।
কাপড়টা আমাকে হাত নেড়ে ডাকছে। আমি বাঁচব তো? শুনেছি, শাকচুন্নি এভাবে হাত নেড়েই ডাকে। কোন কথা না বলে। তারপর কাছে গেলে, সাহস নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলে কিছু নয়; আর না পারলে শরীরের রক্ত শুষে 'বিন্তি কাবার'।
কাপড়টা এখনো আমাকে হাত নেড়ে ডাকছে। আমি কাঁটা গায়ে দিব্বি নিই। আজ তোর একদিন কি আমার একদিন!
কাপড়টারই কাছে যেতেই আমার চক্ষু ছানাবড়া। মধুছন্দা! তাহলে এতক্ষণ আমাকে হাত নেড়ে মধুছন্দা ডাকছিল। মেয়েটার সাহস আছে বলতে হয়। মধুছন্দা এতক্ষণ কাপড় পরে দাঁড়িয়েছিল। ঘাট বসার আছিলায় কাপড় পরে ঘর থেকে বার হয়েছে।
আমার চোখগুলো টর্চের মতো জ্বলছে। টর্চের আলোয় ধরা পড়ছে মধুছন্দার চোখ মুখ, কান, নাক, ঠোঁট। সব তির তির করে কাঁপছে। কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, 'এত পরে!'
—এসেছি তো অনেকক্ষণ।
—তাহলে আসনি কেন?
—এই তো এলাম।
—মধুছন্দার মুখ দিয়ে যেন আর কথা বার হচ্ছে না। মধুছন্দা যেন পড়ে যাচ্ছে। ও যেন 'মধুনী' থেকে গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ে যাওয়া এক আঁটি ভিজে খড় মাত্র। আর আমি যেন মধুনীর উপর চেপে বসা এক 'ঘর বাড়ুই'। হাত বাড়িয়ে উড়ে আসা খড় আঁটি লুফে নিলাম। ডান হাত থেকে বাম হাত। তারপর বাম হাত থেকে ডান হাত। তারপর খড়ের আঁটিগুলো ঝেড়ে ঝুড়ে 'মাউসে পুয়াল' বার করে ঠিক ঠাক গুঁজে দিচ্ছি, 'মধুনী'র 'মড়কচা'ই। আর তা করতে আমার গায়ে জলের 'ছিটা' লাগছে।
মধুছন্দা আমাকে জিজ্ঞাসা করল, তুমি আমাকে ভালবাস তো গড়াদা?
হ্যাঁ, ভালবাসি বইকি। না বাসলে এমন অগম ভূতমপুরীতে আসব কেনে?
গড়াদা, আমি তোমাকে ভা-ল-বা-সি গড়াদা। খু-ব, খু-ব, খু-ব। মধুছন্দা আমাকে জাপ্টে ধরেছে।
আমি ঘুরঘুরে পোকার মতো মধুছন্দাকে চিরে চলেছি। খুব সুর করে আঁকা বাঁকা পথে। আমার আঁকা-বাঁকা হাঁটার দরুণ মধুছন্দার গা'টা কেবল উস্কে উস্কে উঠছে। আসলে আমি কোথাও যাবার পথ খুঁজছি। যাব কোথায়? কী আছে সেখানে?
এই তো পেয়ে গেছি, সেই নরম আর্দ্র জায়গা। আমি নীচের দিকে ঢুকে যাচ্ছি ক্রমশ। মাটির উপরের তল থেকে চার-পাঁচ কিলোমিটার পাললিক শিলা। তার নীচে পনেরো কুড়ি কিলোমিটার পুরু গ্রানাইট। তারও নীচে পনেরো কুড়ি কিলোমিটার ব্যাসাল্ট। প্রথম তিনটি স্তরের পরে রয়েছে তিন হাজার কিলোমিটার পুরু অতি ঘন এবং কঠিন শীলা ম্যান্টল। তারও নীচে রয়েছে কোর এলাকা। এই কোর এলাকায় রয়েছে দুই হাজার কিলোমিটার পুরু গলিত লোহার আবরণ। তারও নীচে একেবারে শেষ ধাপে রয়েছে, তিন হাজার কিলোমিটারের ব্যাস বিশিষ্ট একটা নিকেল ও লোহার তৈরি গোল বল। যা আমাকে নিজর দিকে টানছে। ঐ জায়গায় ঘর বানিয়ে আমি এখন দিব্বি আছি।
পরেরদিন সকালবেলা হুলুস-থুলুস কাণ্ড। সেই ওল মুখো লোকটা আমাদের সব ব্যাপার জানতে পেরেছে। তাই মধুছন্দাকে ঘরের ভেতর চাবি দিয়ে আটকে রেখেছে।
তা রাখুক। কতক্ষণ রাখতে পারে দেখা যাক। গাছের 'কুঁদোর' মতো গড়ন যার, সে মধুছন্দাকে কি আর বেশিক্ষণ চাবি তালা দিয়ে আটকে রাখতে পারে? বিশেষ করে ও যখন আমাকে খড় ভিজে জল দিয়েছে, সে কথা কি সহজে ভোলা যায়? না, ভুলবার মেয়ে নয় মধুছন্দা!
তার দু'দশদিন পর এক ভোরে হঠাৎ ব্যান্ডপাই বাজনা। সঙ্গে উলুর ধ্বনি। শাঁখ বাজছে করুণ সুরে। কী ব্যাপার? কী?
নিশি জল।
কার নিশিজল? খড়জল টড়জল বাদ দিয়ে কার নিশিজল?
মধুছন্দার।
না, মধুছন্দার হতে পারে না। মধুছন্দার নিশিজল তোলা হয়ে গেছে। আমি তার সাক্ষী প্রমাণ। মধুছন্দা আমাকে ছেড়ে কাউকে বিয়ে করতে পারে না। মধুছন্দা আমার।
আমি বসে আছি জানলার পাশে। আমাদের উপরের জানলার পাশে বসে থাকলে, জানালার ও পাশে লাল মোরামের রাস্তাটা দেখা যায়। রাস্তা দিয়ে লোক পারাপার হচ্ছে। লাল মোরামে রাঙানো রাস্তাতে নতুন নতুন লোকগুলোও লাল হয়ে যাচ্ছে। রাস্তায় লাল লাল ধুলো উড়ছে। সেই ধুলোতে লাল হয়ে যাচ্ছে লোকগুলো।
মধুছন্দা ওর কাকিমার ভাই-এর সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধেছে। মামা-ভাগ্নির মিলন। তাড়াহুড়ো করে কাজ করলে যা হয় আর কী! সম্পর্কের ঠিক ঠিকানা থাকে না।
আমি বসে আছি জানলার পাশে। বসে বসে জানলার ওপাশে মামা ভাগ্নির গাঁটছড়া বাঁধা দেখছি। আমার চোখটা ক্রমশ লাল হয়ে যাচ্ছে। ঠিক ঐ মালতি বৌদির গুড়াকু লাগানো মুখের থেকে দলা দলা পিচের মতো লাল।
আমাদের দু'ভাই এর কোলে এক বোন। বড় আদরের। বোনটার জন্মের পরই বাবা মারা যান। অনেক দুঃখ করে বোনটাকে কোলে নিয়ে 'অপয়া বেটি আমার' বলে আদর করত। আদর করতে করতে মাও একদিন চলে গেল বাবার কাছে। আমাদের সংসারটা ভেসে গেল সেই থেকে। আমরা একেবারে গার্জেনলেস হয়ে গেলাম!
এখন আমাদের সংসারে আমিই সর্বময় কত্তা। মানে, বাবার জায়গায় আমি। একপ্রকার বলতে গেলে, আমি বাবা মা দুইই। আমাকে এখন সবদিক সামলে সুমলে চলতে হয়। আমাকেই না বাবা প্রথম জন্ম দিয়েছেন? আর তখন থেকেই বাবা কিছু না বলেও অনেক কিছু বুঝিয়ে দিয়ে গেছেন। এই যেমন ভাই বোন স্কুলে গেলে তাদের জন্য রান্নার ব্যবস্থা, বাসন মাজা, কুটনো কুটা, আনাজ পাতি বানানো সব। স্কুল থেকে ফিরলে পর হ্যারিকেন লন্ঠন জ্বালানো। পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে গেলে, ঘুম নেতিয়ে যাওয়া ছেলেকে মুখে আঙুল ভরে ভরে খাওয়ানো। খাওয়ানোর পর বিছানায় শুইয়ে দেওয়া পর্যন্ত সব, সব করতে হয় আমাকে। আমি ছাড়া এ কাজ কে করবে? ঘরে তো অন্য কেউ নেই, থাকলে সে করত। যখন নেই, তখন আমাকেই করতে হয়। আর বাবা তো এজন্যই আমাকে বড় করে রেখে গেছেন।
ভাইটা খুব বইপোকা। ভাইটা যতখানি বইপোকা, বোনটা ততখানি ফাঁকিবাজ। পড়তে বসলেই চোখ ঢুলু ঢুলু। বোনটা এই ঢুলু ঢুলু চোখটা পেয়েছে মা-এর কাছ থেকে। বাবা মনের খেয়ালে একটু বিজ্ঞ বিজ্ঞ কথা বলেছেন তো সঙ্গে সঙ্গে মা ঘুমে কাত। এত ঘুম যে মায়ের চোখে কোথা থেকে আসতো বাবা ভেবে কুল পেতেন না। আর পেতেন না বলেই, মাঝে মধ্যেই বাবা বকা-ঝোকা শুরু করে দিতেন। কিন্তু তাতেও মা-এর হেলদোল ছিল না। কেবল মুখে হাই তুলত বড় বড়। এতে বাবা আরও বিরক্ত।
আসলে আমার বোনটা হয়েছে ঠিক মা-এর মতো। হাবে ভাবে একেবারে হুবহু মা। হয়তো মা শেষ স্মৃতিচিহ্নটুকু রেখে গেছে আমার বোনের কাছে। তাই তো বোনকে দেখেই মা-এর যন্ত্রণা ভুলি।
কিন্তু ভাইটা মোটেই মা বা বাবার মতো নয়। ভাইটা একেবারে ভাই-এর মতো। ওর সঙ্গে আমাদের বংশের কারু কোনো মিল নেই। হয়তো দাদু দিদিমা কিংবা আরও কোনো পূর্বপুরুষের সঙ্গে মিল থাকতে পারে। নিজ চোখে দেখিনি তো তাঁদেরকে। কতটুকুই বা আমার অভিজ্ঞতা?
আমাদের গ্রামের সুবল খুঁড়োর ছেলে ভৃগুরাম পাঁচ খবরে ওস্তাদ। ওর কাজই হল সকাল থেকে এর তার কাছ থেকে ঘুরে ফিরে সংবাদ সংগ্রহ করা। তাই গ্রামের লোক ওর একটা বাড়তি নাম সংযোজন করেছে। আর সেটা হল, 'অল ইন্ডিয়া রেডিও'। সেই 'অল ইন্ডিয়া রেডিও' সকাল আটটা বাজতে না বাজতেই আমাকে একটা সংবাদ পরিবেশন করেছে। আমার ভাই শ্রীমান অরূপ রতন নাকি জয়েন্টে পঁচিশ র্যাঙ্ক করে সকলকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। কথাটা আমি প্রথম প্রথম আমলই দিইনি। অমন মিথ্যা সংবাদ কত যে ওর মুখে মুখে রাষ্ট্র হয়ে যায়। অমন কথাটা বিশ্বাস করব, তেমন মনের জোর কোথায়? ছেঁড়া কাঁথা ভাগ্য নিয়ে তো রাজপ্রাসাদের স্বপ্ন দেখা যায় না। আর দেখাটাও বেমানান। তাই কথাটা এতটুকু 'আমল' দিইনি।
ঘাসের বোঝাটা মাথায় নিয়ে আমাদের তালতলায় যেই হাজির হয়েছিল, অমনি দেখি আমাদের ঘরে লোকে লোকারণ্য। কী ব্যাপার!' ভাবতে ভাবতে ঘাসের বোঝাটা মাথা থেকে নামিয়ে ভিড়ের কাছে যাই। ভয়ে বুকটা কাঁপছে। হাত পা গুলো যেন অসাড় হয়ে গেছে। পুরো শরীরটা ভারী হয়ে নীচের দিকে ঢুকে যাচ্ছে ক্রমশ। মাথার চুলগুলো সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে কেবলই। চোখের তারাগুলো কেমন যেন ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। যেন কাউকে দেখতে পাচ্ছি না। সবই যেন ধোঁয়া ধোঁয়া। ভাইটা চুরি টুরি কিছু করেনি তো? বলা তো যায় না, সেই পুরেনো স্বভাবটা যদি আবার পেয়ে বসে! সেই ছেলেবেলার স্বভাবটা? ঘোষদের 'হূতড়ো' (হাঁসমুগির ঘর) থেকে ডিম বার করে দোকানে দিয়ে আসার স্বভাব!
ভিড় ঠেলে সামনের দিকে এগিয়ে যাই। সামনে গিয়ে দেখি, আমাদের নবাসন হাইস্কুলের কয়েকজন মাস্টার মশায়কে। কাকে যেন খুঁজছেন ওনারা? আমাকে যে খুঁজছেন না, সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই বুঝতে পারি। ভাইকে খুঁজছেন। কিন্তু কেন? কী করেছে ভাই? কারু কোন কলম টলম? কিংবা ভূগোলের ক্লাসের পৃথিবী নামক গ্লোবটাকে ব্যাগের ভিতর ভরে এনে মাটির ভিতর পুঁতে রাখেনি তো? ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, ভাই কী করেছে স্যার? কারু কোন কিছু...
আমাকে কোন স্যারই কোন উত্তর দিলেন না। কেবল আমার দিকে চেয়ে রইলেন।
আমার বুকটা এখনো কাঁপছে। কথাগুলো আরো বেশি কেঁপে কেঁপে উঠছে। ভাই কী করছে স্যার?
অষ্টরম্ভা করেছে! তোমার ভাই জয়েন্টে পঁচিশ র্যাঙ্ক করে আমাদেরকে তাজ্জব বানিয়ে দিয়েছে। পাকড়াও তাকে।
আমি আমার ভাইকে পাকড়াও করার জন্য রাস্তা দিয়ে ছুট দিচ্ছি। ভাই মাঠে ছাগলকে 'দিকদড়া' দিতে গেছে। গেছে তো গেছে, আর আসেনি। আমাকে আনতে যেতে হচ্ছে।
পাকড়াও তাকে; কথাটা বেশ বললেন নতুন স্যার! মানে ভূজঙ্গবাবু। ভূজঙ্গবাবুর বলার ধরনটা বেশ! সরু পারা মুখ। পেটের তলটা এক ইঞ্চি খোঁদল। হয়তো না খেয়ে খেয়ে অমন খোঁদল হয়ে গেছে। সেইসব খোঁদল 'ভরাটি' (পূর্ণ) হয়ে যাবে একসময়। সবে তো নতুন এসেছেন এখানে।
আমরা যারা গরু বাছুর কিনি, লেজ মুলে দেখে নিই, গরুটার রাগ আছে কি না। রাগ থাকলে দাম দুম করে কিনে নিই। তাতে দেহে কিছু না থাক। আমাদের 'বানে' দু'দাবা খোল মাখানো 'চুবি' খেয়েছে তো ঠিকই গায়ে গা লেগে যাবে।
ভূজঙ্গ স্যারও যখন আমাদের স্কুলে মাস্টারমশাই হয়ে এসেছেন তখন পেটের খোঁদল ঠিকই ভরাট হয়ে যাবে একদিন।
আমি ভূজঙ্গবাবুর কথা মতো ভাইকে মাঠে পাকড়াতে যাচ্ছি। ভাই মাঠে ছাগল নিয়ে গেছে।
মোটা রাস্তা শেষ হলেই পদ্মপুকুরের পাড়। পদ্মপুকুরের ডানপারে সান বাঁধানো ঘাট। সান বাঁধানো ঘাট শেষ হলেই, ডান হাতে ধানি জমি। ধানি জমির পরই দু'একটা মাঠ ফাঁকা। সেই ফাঁকা মাঠে ভাই ছাগল চরাতে গেছে।
আমি এখন কুল ঝোড়, বেল ঝাড় কিছু মানছি না। ভূজঙ্গবাবুর অর্ডার ভাইকে পাকড়ে আনতে হবে। হাতের সামনে ভাইকে পেয়েও গেছি। ধানের বস্তার মতো ভাইকে পিঠে তুলেও নিয়েছি এক লহমায়।
ভাই পিঠ থেকে নামার চেষ্টা করছে। কিন্তু আমি ছাড়ছি না। জলে মাছ যেমন হাত ফেস্কে গেলে আর নিজের নয়, তেমনি আমার ভাই। স্বহায় সম্বল ভাই আমার।
ভাইকে মাস্টারমশায়দের সামনে হাজির করলাম। মাষ্টারমশায়রা ভাইকে দেখে খুশি। খুশি হয়ে আশীর্বাদ করলেন প্রচুর। বড় হও, বড় হয়ে কাজে লাগো। ইত্যাদি নানারকম।
কিন্তু বড় হওয়া কি চাট্টিখানি কথা? বড় হতে গেলে এলেম চাই। এলেম মানে তো পয়সা। সেই পয়সা নিয়ে আমরা দুভাই মহা ফাঁপড়ে পড়েছি। শুধু দু'ভাই কি? আর একটা বোনও যে আছে। সেও তো আমাদের সংসারে একজন। তাকে বাদ দিয়ে চলি কী করে? পয়সার ব্যাপারে তারও দু'একটা যুক্তি আছে।
আমরা দু'ভাই যখন ভর্তির ব্যাপারে আকাশ পাতাল ভেবে চলেছি সে ভাবনা দানা বাঁধছে না। তখন আমাদের মা-মরা বোনটা একটা আর্জি নিয়ে এল আমাদের আলোচনার টেবিলে। টেবিলটা পুরো নড়ে গেল বোনটার কথায়।
দাদা, সোনামুখী যেতে ডানদিকে ঐ যে খাল মতো জমিটা। শুশনি ডোবা না কী নাম। ধান রুইলে, সার দিতে হয় না। পাঁকে ভর ভর করে। পাঁক ফুঁড়ে তর তর গাছ বাড়ে। মুঠো ভর্তি গাছ। ধান পাকার আগেই পুরো গাছ শুয়ে যায়। শুয়ে শুয়ে শিষ ওঠে। নৌকার মতো বড় বড় বাঁকা বাঁকা শিষ। কাস্তেতেও শিষ কাটা যায় না। চটিয়ে কাটতে হয়। সেই জমিটা, দাদা বিক্রি করে দিলে হয় না?
ভাই ধমকে ওঠে, ওটা বিক্রি করে দিলে খাবি কী?
আমাদের বোন রেবা, মানে রেবতি আকাশে উড়তে উড়তে যেন 'গোঁত' খায়। ঘুড়ি যেমন 'গোঁত' খেয়ে 'ঠক' শব্দ করে মুখ 'গোঁজ' করে পড়ে থাকে এক পাশে। রেবারও এখন যেন তেমন অবস্থা। অরূপরতনের ধমক খেয়ে পড়ে আছে টেবিলের এক কোণে।
আমি আবার হাত দিয়ে বুকে ধরে ঘুড়িটা শূন্যে ছেড়ে দিই। ঠিকই বলেছে রেবা; ঐ জমিটা ভাল।
অরূপ করুণ সুরে ছোট প্রতিবাদ করে, কিন্তু খাবে কী দাদা?
তুই পাশ করে ফিরে এলে, মিহিদানা খাব।
আমার কথার উত্তরে অরূপের কিছু 'চুগু-বগু' খাটে না। কোনদিন খাটায়ও না।
যখন যা বলেছি, চোখ বুজে মেনে নিয়েছে সব। এ ব্যাপারে আমার ভাই বা বোনের কোন তুলনা নেই।
ফলত রেবার কথাটাও ঠিক হল। শুশনি ডোবাটা বিক্রি করে দিলাম জলের দামে। একেবারে ফসল সমেত।
সেই পয়সায় ভাই ভর্তি হল ইঞ্জিনিয়ারিংএ। আর একটা মোবাইল কিনলাম সেকেন্ড হ্যান্ড। অতবড় সংসারে একটা বোমাইল না থাকলে হয়? বিশেষ করে, ভাই বাইরে গেছে না। কখন কী হয় না হয় বলা তো যায় না।
ভাই পাশ করে চাকরি পেল। আর এদিকে রেবা, মানে রেবতি, মানে আমাদের দু'ভাই-এর একমাত্র বোন জন্ডিস কেসে ধরা পড়ে গেল।
কথাটা শুনে ভাই টেলিফোনে হাউ মাউ করে কেঁদে উঠল। আমি মোবাইলের সাউন্ড কমিয়েও ভাই-এর কান্না বন্ধ করতে পারছি না। ভাই কাঁদছে।
হেপাটাইটিস বি পজেটিব বলে কথা! আমি ও সকলের কিছু বুঝি না।
ভাই বোঝে। ভাই ডাক্তার না হলেও ইঞ্জিনিয়ার তো বটে।
আমি বললাম, ভাই, ডাক্তার বোনকে নড়াচড়া করতে দিচ্ছে না। বিছানাতেই সব। আমি রাত জেগে জেগে ক্লান্ত। ঢুলে পড়ে যাচ্ছি। এদিকে পয়সা পাতিও নেই। তুই একবার আয় ভাই। না হলে বোনটা বাঁচে না।
ভাইটা উত্তর করল, দেখছি দাদা দেখছি, যেতে তো হয়। এ আর বলা কথা কি? কিন্তু চাকরি মানে হাত পা বাঁধা। দাসত্ব ছাড়া আর কি? আমি বললাম হ্যাঁ ভাই আয়। তুই যে করেই হোক আয়। একবার অন্তত আয়। একবার।
মোবাইলটা কেটে গেল। টাওয়ারের গোলযোগ। আর টাওয়ারকেই দোষ দিই বা কী করে? মেঘের যা অবস্থা।
ডাক্তার বোনকে চিবিয়ে খেতে বারণ করেছে। এমন কি আপেল লেবু পর্যন্ত না। আপেলকে ছেঁচে রস করে গলায় ঢেলে দিতে হচ্ছে। আখের রসের মতো। সেই রস বোন ঢক ঢক করে খাচ্ছে।
বোতলের রক্ত বোনের শরীরে গেলেই কিছুক্ষণের মধ্যেই রক্ত জমাট বেঁধে যাচ্ছে।
বোন নাক দিয়ে নিঃশ্বাস নিতে পারছে না। বোনের নাকে অক্সিজেন চালু রাখতে হচ্ছে সবসময়।
হয়তো বোন আর বাঁচবে না। হয়তো যমের ডাক এসেছে। আমাদের কালী থান থেকে ধুলো মাটি এনে বোনের মাথায় মাঝে মধ্যে ছড়িয়ে দিচ্ছি। আমরা মা-এরই সন্তান তো সব। যার দেওয়া, তার হাতে সঁপে দিয়ে, আমি নিশ্চিন্ত মনে বোনের পাশটিতে চুপ করে বসে থাকছি। যা হয় হোক!
বোনটা এ যাত্রায় কোনোভাবে বেঁচে গেল। হেপাটাইটিস বি পজেটিভ যদিও মৃত্যুর জন্য কম কিছু নয়। তবুও বোনটা তিরিশের নীচে বয়স হওয়ায় কোন রকমে রয়ে গেল। এমন ঘটনা নাকি লাখে দু'একটা হয়। ডাঃ নীলাঞ্জনবাবুর অন্তত সেই রকমই অভিমত।
যাক, বোনটা কোন রকমে বেঁচে গেল। কিছু খরচ পাতি হয়েছে, এই যা। তা হোক! তবুও তো কারু কাছে হাত পাততে হয়নি। অরূপরতনও আসতে পারেনি অফিসের কাজের ঝামেলায়। ফোনে খবর নিয়েছে একশো বিশ বার। আর নেবে না কেন? ভাইটা তো আমাদেরই। আমি ওকে হাড়ে হাড়ে চিনি। বোন বলতে অজ্ঞান! আমাদের দু'ভাই-এর দশটা নয়, বিশটা নয় একটি মাত্র বোন! বড় আদরের ছোট বোন!
সেই বোনের জন্য আমি হাসপাতালে বসে বসেই আমাদের আমতলার চৌকো জমিটা জলের দামে বিক্রি করে দিলাম। ভাই অবশ্য না বলেনি। যখন সে আসতে পারছে না, তখন না দিয়ে উপায় কী? ভাই-এর চাকরিটা থাকলে অমন জমি কত ঘুরিয়ে নেব! বোনটা রোগ থেকে সেরে 'গু পারা' দেখতে হয়েছে। দেখলেই আদর করতে ইচ্ছা হয়। আমি তো বড় দাদা! কেবল আমি কেন, যে কেউ পথের পথিক দেখলেই আদর করতে ইচ্ছা হবে। সৌন্দর্যের এমন ঘন বিন্যাস ওর মধ্যে!
সেদিন মুখুজ্যেদের অবনী এসেছিল আমাদের কাছে। আমাদের আষাঢ়ে আমগাছের আম খেতে। আম খেতে খেতে আমাদের রেবাকে এক ঝলক দেখেছিল, কিন্তু চোখ ফেরাতে পারেনি। মুহূর্তে লোভী অবনী আম খাওয়া বন্ধ করে বলে বসল, আমাদের সবুজের সঙ্গে বেশ মানাবে!
হামার হাতে তোর বোনকে বিক্রি কর গড়ুরাম।
আমি হ্যাঁ না কিছুই বলতে পারিনি।
ততক্ষণে অবনী আমার সামনে হাত পেতে দাঁড়িয়ে গেছে। এই আমি হাত পাতলাম ভাই। আমাকে ভিক্ষা দে। এমন সোনাবরণ পাত্র, অমন হরিণী ছাড়া কি মানায়!
না করতে পারলাম না। তাই হবে অবনী, তাই হবে। তোর ছেলে সবুজের সঙ্গে আমার বোন রেবার বিয়ে দেব। রেবা মানে রেবতী সান্যাল। মানে আমাদের দু'ভাই-এর বড় আদরের বোন।
বোনের বিয়ের খবরে শ্রীমান অরূপরতনের যে কী আনন্দ সে কথা কী বলব? মুহূর্তে কাকে কাকে নিমন্ত্রণ করতে হবে, কী লেখা হবে নিমন্ত্রণ কাগজে, খাবারের কী কী মেনু হবে, চটজলদি মোবাইলের ও প্রান্ত থেকে লিস্ট করে ফেলল।
আমি জিজ্ঞাসা করলাম, এবার আগে আগে আসছিস তো?
হ্যাঁ দাদা, সে তোমাকে ভাবতে হবে না। এবার সব কাজ আমার। তুমি শুধু বসে থাকবে।
হ্যাঁ, ভাই তাই যেন থাকি। বোনের অসুখে বড় দুর্বল হয়ে গেছি রে। তুই আগে আগে এসে সব কাজ সামাল দে। অনেক কাজ বাকি পড়ে আছে। কিছুই তো করা হয়নি।
মোবাইলটা জোর বাজছে; বললাম তো, এবার থেকে তোমার সম্পূর্ণ রেস্ট।
হ্যাঁ, তাই যেন হয় ভাই। তাই হয় যেন।
ভাই আজও এল না। কেন এল না, বুঝতে পারছি না? মোবাইলে সুইচ টিপলে ভাই কথা বলছে না, মোবাইলটা বলছে, দি বিএসএনএল নাম্বার ইজ নট কমপ্লিটেড এট দ্য মোমেন্ট।
ভাই-এর কী হয়েছে? নাম্বার ইজ নট কম্পিলিটেড, কেন?
আমি মনমরা বসে আছি, আমাদের 'বাথান'-এর একটা খুঁটিতে হেল দিয়ে।
একটু পরেই রেবা তার শ্বশুরঘর যাবে স্বামীর সঙ্গে। রেবা কোনদিনই আমার চোখের আড়াল হয়নি; আজ সে চলে যাবে বহুূদূর। আমি তাকে তাড়িয়ে দিয়েছি।
আমার চোখ দিয়ে জল পড়ছে টপ টপ। আমার মতো হালের বলদগুলোও চোখের জল ফেলছে। কারণ, একটু পরই ঐগুলোও আমাকে ছেড়ে চলে যাবে। আমি ঐগুলোকে বিক্রি করে দিয়েছি চড়া দামে। না বিক্রি করে উপায় ছিল না। বিয়ের খরচপাতি তো কম নয়। শেষ সম্বল দু বিঘা ধানি জমিও বন্ধক দিয়ে দিয়েছি। ঐগুলো বন্ধক এবং বিক্রি করে বোনের দায় থেকে মুক্তি পেয়েছি। তাই আমি বাথানের বাতাস নিচ্ছি চোখে জল ফেলে। রেবা এবং সবুজ আসছে আমার সামনে। কী সুন্দর রাজযোটক! এমন মিলন ঘটায় কে? আমি চোখ ফেড়ে ফেড়ে রেবাকে দেখছি। রেবা মানে রেবতি সান্যাল। না, এখন সান্যাল নয়, মুখার্জী। হোক মুখার্জী তবুও সে আমার বোন। আমাদের দু'ভাই-এর বোন। দশটা নয়, বিশটা নয়, একটা মাত্র বোন আমাদের। বড় আদরের ছোট বোন!
রেবতি আমাকে প্রণাম করল। আর কেঁদে ভাসিয়ে দিল আমাকে জড়িয়ে ধরে। দাদা, আমাকে মরতে দিলে না কেন? না মরে, আমি তোমাকে ভিখারি করে দিলাম। পথের ভিখারি।
রেবতির সঙ্গে আমাদের হালের গরু জোড়া দুটোও কাঁদতে থাকল। ওরা আমাকে কিছু বলছে নাকি জানি না। ওদের কথা তো কিছু বুঝি না। কেবল কাঁদলে বুঝতে পারি, ওরাও কাঁদছে। ওদেরও তো রেবার মতোই যাবার সময় হয়ে গেছে।
কেবল আমি খুঁটি ধরে বসে আছি, এই যা! এত বড় ঘরটার খুঁটি ধরে!
এখন নদীর ধারে বসে আছি। জমি জায়গা, ঘরবাড়ি-গরু বাছুর সব বিক্রি করে। হাত দুটি উপর দিকে তুলে, মাথা ন্যাড়া শ্রীচৈতন্যদেব আমি। তবে দ্বারে দ্বারে রাস্তায় রাস্তায় গৌরহরির নাম বিলানো শ্রীচৈতন্যদেব নয়। এ এক অন্য শ্রীচৈতন্য দেব। বসে বসে নদী দেখা শ্রীচৈতন্যদেব।
নদী মানে জল। অথৈ জল। সে জলে ভেসে যায় কত কী? জলের চোটে ভিজে থলথলে সবুজ পানার দল ভেসে যায়। কারুর পায়ের ছেঁড়া জুতো চটি ভেসে যায়। পোড়া কাঠ, শব বহনকারী খাটের বাজু দড়ি সুতো ভেসে যায়। ছেঁড়া বালিস, মশারি লেপ ভেসে যায়। ট্রেনের পরিত্যক্ত বগি ভেসে যায়। জাহাজের ভাঙ্গা ফুটো পাটাতন ভেসে যায়। আর তার আঘাতে নদীর চরে পাড় ভাঙে।
আমি বসে আছি নদীর চরে। নদীর চর ছাড়াতো আমার আর কোথাও থাকার মতো জায়গা নেই। তাই আমি চরে বসে। না, ঠিক বসে নেই, হাঁটু ভাঁজ করে খানিকটা মাথা হেঁট। মাথা হেঁট করতে করতে এক সময় শুয়ে পড়ি। শুয়ে শুয়ে নদী দেখি।
বুক ঠেলে একটা কাশি বার হল। কাশি আর বন্ধ হয় না। যেমন একটা কাশির সঙ্গে আর একটা কাশির 'লেজুড়' বাঁধা। লেজ ধরে ধরে বুক ঠেলে বেরিয়ে আসছে! সাঁই সাঁই শব্দ হচ্ছে। মনে হচ্ছে বুকের ভেতর একটা ট্রেন চলছে। মেট্রো রেল। আর তখনই মনে হচ্ছে, কে যেন টানছে আমাকে! তাহলে কি, সেই দুহাজার কিলোমিটার ব্যাস বিশিষ্ট নিকেল ও লোহার তৈরি গোল বল? না, এ টান যেন সে টান নয়। সে টান হলে আমাকে হাঁটতে হতো সরু আঁকা বাঁকা পথের ভিতর দিয়ে। তারপর নরম আর্দ্র পেলে চ্যাঁ করে কোর এলাকা ছেড়ে গোল বলটাতে। না, এ টান যেন সে টান নয়। এ টানের সঙ্গে যেন সে টানের আশমান জমিন ফারাক। এ টান যেন আমাকে সরাসরি টানছে। আমি সরাসরি টানে মিশে যেতে চাই। কেন না, আমি এখন ঐ টান থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে দিয়েছি। আর দিয়েছি বলেই নদীর চরে এসে বসে আছি, চুপচাপ। নদীর চরে বসে থাকার জন্য আমার কোন পিছুটান নেই। আমার ভাই শ্রীমান অরূপরতন আমাকে ছেড়ে অনেকদিন আগেই চলে গেছে। ভাইটা ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করার পর অনেকদিন অনেক কাজই আমাকে না বলে করেছে। এমনকি শেষের কাজটুকু করার জন্য আমাকে কোনো কিছু বলার প্রয়োজন বোধ করেনি। একেবারে আচমকা, আচমকাই ডিশিসন। ভাবা যায়!
কিন্তু আমার বোন রেবা, মানে রেবতি, মানে রেবতি সান্যাল নয় মুখার্জী। সে তো আমাকে না বলে কোনো কিছু করেনি। যখন যা কিছু করেছে বা করতে চলেছে, আমাকে আগে বলেছে, মানে আগে আমার অনুমতি নিয়েছে, তারপর কাজ। কিন্তু শেষের কাজটি আমাকে বলে করল না। হয়তো আমি অনুমতি দিতাম না। সেই ভয়ে, বোনটা অমার সেই ভয়েই, আমার অনুমতি না নিয়েই চলে গেল। এইটুকু আক্ষেপ রয়ে গেল আমার।
এখন আমার নদীর চরে বসে থাকতে কোনো পিছুটান নেই। আমি এখন বসে আছি একটা মাত্র টানের অপেক্ষায়। আর সে টান আমার সামনের দিকে যাবার।
কাশছি খক খক, খকাং খকাং। কাশির বিরাম নেই। বুকের ভেতর মেট্রো রেল চক্কর মারছে। চোখগুলো বন্ধ হয়ে আসছে। চোখ বোজার অবস্থায় দেখতে পাচ্ছি, নদীতে সবুজ পানা ভেসে যাচ্ছে। ভেসে যাচ্ছে, ছেঁড়া জুতো চটি, খাট-খাটের বাজু, দড়ি সুতো, পোড়া কাঠ, ছেঁড়া বালিশ, মশারি-লেপ, পরিত্যক্ত ট্রেনের বগি, জাহাজের পাটাতন উল্টাতে উল্টাতে পাক খেতে খেতে আসছে আমার দিকে ধেয়ে। ঐ জাহাজের পাটাতনে আমি এক্ষুনি চেপে যাব! কী ব্যাপার, রেবা, অরূপরতন, নুদিদিদি, সিজেমুতরো রমানাথ তোরা আমার কাছ থেকে এত দূরে সরে যাচ্ছিস কেন? কেন? কেন? বেশ তো আসছিলি নদীতে ভেসে ভেসে, আমাকে নিয়ে যেতে। আসতে আসতে এলি না কেন? ঘুরে গেলি। কী ব্যাপার কী?
জাহাজের পাটাতনটাও এল না। আস্তে আস্তে ঘুরে গেল। আমি কি নদীর চরে বসে থাকব?
আমার মুখ দিয়ে আঁজলা বার হচ্ছে। মুখ দিয়ে কে যেন জল ঢালছে। এ কি মধুছন্দা? মধুছন্দা আমাকে একদিন খড় ভিজে জল দিয়েছিল। আজ খড় ভিজে জল নয়, খড় ভিজানোর জন্য বালতি বালতি জল ঢালছে আমার মুখে।
তাহলে আজও কি আমি ফড়ি সেজে রয়ে যাব নদীর বুকে!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন