খেলার মাঠ

জয়দেব দত্ত

ডেডেং ডেডেং ডেংটি পেটাং। নাকটি পেটেং। ঢাকে বাদ্যি শুনে ঋভু আর দেবু সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে এল। নেমে এসেই ছুট। আজ কার্তিক পুজো। স্কুল বন্ধ। কী মজা। প্রতি বছরই এই দিনটায় একটা টুর্নামেন্টে হয়। ক্রিকেট টুর্নামেন্ট। গত বছরও হয়েছিল। মোহনপুরের সঙ্গে। ঋভুরা প্রায় হেরেই গিয়েছিল। একশো কুড়ির বিনিময়ে মোহনপুর করেছিল একশো দশ। হাতে ছিল চার-চারটি উইকেট। কিন্তু হঠাৎ দত্তদের গরুর গাড়ি ক্যা-কুচ কুচ শব্দ তুলে মাঠের মাঝখানে ধান উঠলে খেলা পণ্ড হয়ে যায়। মোহনপুর জিতেও জিততে পারে না। খেলার অন্তিম লগ্নে এসে ভস্মে ঘি। মোহনপুরের ছেলেরা অবশ্য না জেতার ক্ষোভটা বুকের ভিতর রাখেনি। উগরে দিয়ে নানা কথা বলেছিল—এই তো তোদের গাঁয়ের লোক, ছিঃ, ছিঃ. মাঠের ধান তুলে দিল।

এ বছর মোহনপুরকে হারাবই হারাব। এমন একটা জেদ মাথায় নিয়ে ঋভু আর দেবু সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে ছুটতে শুরু করেছে। দেবু আগে আগে, ঋভু পেছন পেছন। মাঠে এসে দাঁড়াতেই দেবু থ। কী রে ঋভু, আবার যে এ বছরও...।

ঋভু কোনও কথা বলে না। শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে মাঠের মাঝখানে দত্তদের গরুর গাড়িটাকে। গাড়িটা আঁটিধান বোঝাই করে মাঠের ঠিক মাঝখানটিতে নামানো আছে।

—একদিনও আর তর সইল নাই।

ঋভু কোনও সাড়া দেয় না।

—বলিহারি গ্রামের মানুষজনকে। দেবু বলল, ঋভু সাড়া দেয় না।

—মানুষের এত হিংসা কেনে বলত?

ঋভু উত্তর করে না।

—তাহলে আজ কোথায় খেলবি? দেবু জিজ্ঞাসু চোখে ঋভুর দিকে তাকিয়ে থাকে।

ঋভু কোনো উত্তর করে না। ঋভুর বুকে একশো ডিগ্রি তাত ফুটছে। চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে আসছে। গরম জল, ভাপ উঠছে। ঋভু রেগে গেলে এমনই হয়। কথা বলে না। দেবু ঋভুর কান্না দেখে চুপ করে যায়। আর ঋভুর দিকে তাকাতে পারে না।

ঋভু আমার মাথায় একটা প্ল্যান এইচে, শুনবি?

ঋভু ডুকরে ওঠে, কী?

তোদের আমতলায় জমিটা ফাঁকা আচে না?

হ্যাঁ।

জমিটা বাগিয়ে গুছিয়ে খেললে হয় না?

ঋভু চটপট রাজি হয়ে যায়, চ-ও।

চ তো চ। দুজনে কান্না-টান্না ফেলে দে ছুট।

পেল্লায় মাপের আমতলার জমি। ধানের নাড়া আর এবড়ো খেবড়ো মাটি নিয়ে পরিচিত সংসার। সেই পরিচিত সংসারের বুকে ছেলেপুলের দল কোদাল চালিয়ে মাঠ তৈরি করবে—এ আর বেশি কি?

ছেলেপুলের দল ফোড়-কোদাল হাতে নিয়ে লেগে গেল মাঠ তৈরির কাজে। বর্ষার কেঁচো-কাঁকড়ির দল চিরিক চিরিক মাটি তুলে রেখেছে ধানের গোড়ায়। সেই মাটি এখন শুকনো কাঠ। মাটিতে ফোড় বা কোদাল নামালে টং টং শব্দ। হাতে ফোস্কা পড়ে।

প্রেম কাজ জানে না। টুক করে বসে পড়ে। আর অমনি ঋভু প্রেমকে দেখে ফেলে। প্রেম বসে গেলি না কী রে?

প্রেম তড়বড়িয়ে উঠে যায়—কই না তো।

মিথ্যাকথা। ছেলেপুলের দল হো হো করে ওঠে।

প্রেম লজ্জায় মরি মরি। তাড়াতাড়ি কোদাল হাত দেয়।

এমন সময় দেবুর বাধা, তোকে আর কোদাল ধরতে হবেক নাই। তু বরঞ্চ ঘর থেকে একটা বালতি এনে পিচে জল ছড়া।

প্রেম ছুটে ঘর যায়। বালতি আনে। বালতি হাতে পুকুরঘাটে। ঘাট থেকে জল। মনে মনে ভাবে, তাও আবার হল! এবার জল বহে বহে মর। কেনে যে বলতে গেলাম ছাই! না বললে তো আর এমন শাস্তি পেতে হত নাই।

প্রেম বিরক্ত। ঠাং শব্দে বালতি নামায়। বালতির জল ছলাৎ ছলাৎ মাটিতে পড়ে। প্রেম হাঁপিয়ে যায়। আকাশ ফোড় হাতে ধানের শুকনো নাড়া তুলছিল। প্রেমকে দেখে বলে, এর মধ্যেই হাঁপিয়ে গেলি নাকি রে?

প্রেম অস্বীকার করে, কই না তো?

আকাশ প্রেমকে ভেংচি কাটে, কই না তো!

প্রেম হারতে চায় না। বাপনকে সাক্ষী রাখে, বাপন আমি হাঁপাচ্ছিরে?

বাপন প্রেমের হয়ে মিথ্যা সাক্ষী দেয়, না তো।

প্রেম আকাশকে রাগ উগরে দেয়, তু শুধু শুধু আমাকে হাঁপাতেই দেখিছিস। প্রেম বালতিতে হাত দেয়।

দেবুর আবার বাধা। তোকে আর বালতিতে হাত দিতে হবেক নাই। তু বরঞ্চ ঘর থেকে একটা কাটারি এনে কঞ্চিগুলো কাটগা যা।

প্রেম দেবুর কথায় ওঠে আর বসে। কোনও কথা না করতে পারে না। ঘরে ছুটে যায় কাটারি আনতে। কাটারি হাতে বাঁশ গাছে যায়। বাঁশগাছে উঠে ঠক ঠক কঞ্চি কাটে। আর ভাবে, গোটা দলটা আমার শত্রু কেনে কে জানে? এত ছেলে থাকতে সেই আমাকে দিয়ে সব কাজ, প্রেম এটা কর, ওটা কর—গুষ্টি মাথা কর। প্রেম কঞ্চি কাটছে ঠক ঠক...। এই কঞ্চি পুঁতে পুঁতে চার-এর সীমানা করা হবে।

মাঠ তো নয়, যেন মেলবোর্ন। মাঠের দক্ষিণ ধার বরাবর ফাইভ স্টার হোটেল। হয়ে দাঁড়িয়ে একটা বটগাছ আর একটা অশ্বত্থ গাছ। মাঝখানে সুইমিং পুল হয়ে লম্বা পদ্মপুকুর। রোদে পুড়ে পুড়ে দগ্ধ হয়েছো তো কুঁদি মেরে ঝাঁপ মার পুকুরের জলে। তাইলেই ব্যাস; সব জ্বালা জুড়িয়ে যাবে। তখন কি মজা, কি মজা।

কি মজা বলতে বলতে বল হাতে মাঠে নেমে পড়ল মোহনপুরের দল। থুড়ি মোহনপুর না অস্ট্রেলিয়া। একাদশ মাঠে ঢুকে গেছে। ক্যাপ্টেন পন্টিং ফিল্ডিং সাজাচ্ছে। মিড অন, মিড অফ, মিড উইকেট, ফাইন লেগ, থার্ড ম্যান...।

ব্যাট হাতে ঋভু আর দেবু মাঠে নামে। থুড়ি, ঋভু-দেবু না। শচীন-সৌরভ। গেঁড়া ঋভু হল শচীন আর লম্বা ডেঙা চোখ মিটমিট দেবু সৌরভ।

গত বছর খেলার মাঠ না থাকায়, খেলা অন্তিম লগ্নে এসে ভণ্ড হয়ে গেছে। কিন্তু এ বছর সেইটা হওয়ার জো নেই।

নিজে হাতে তৈরি করেছে মাঠ। এই মাঠে যে ভাগ বসাতে আসবে, তার জন্য তৈরি আছে, দু-দিনের ছ-ছয়টা উইকেট। এ বছর মোহনপুরকে ফুটানিটা দেখিয়ে দিব-দ্যাখ, আমাদের ইলেম কত?

শচীন স্ট্রাইক করছে আর সৌরভ নন স্ট্রাইকে দাঁড়িয়ে পায়ের প্যাড ঠিক করছে। দূর ছাই—একে কি আর প্যাড বলে? ঘরের এক কোণে পড়ে থাকা ঠাকুমার ঘাট যাওয়ার কাপড়টা ছিঁড়ে কুটি কুটি করে লুকিয়ে লুকিয়ে পকেটে ভরে পায়ে পেঁচিয়ে প্যাড। ভাগ্য ভালো যে ঠাকুমার চোখে পড়েনি। পড়লে গুষ্টিশুদ্ধ লোকে পিণ্ডি চটকে তুষ্টি করে ছাড়ত। চোখে পড়েনি বলে যে আর পড়বে না সে কথা কে বলে? যখন ঘাট যাবে, তখন? তখন কী হয়? সে যখন যা হওয়ার হবেক, এখন তো খেলি। আকাশের যা বলের জোর, একশো সত্তর কিলোমিটার। পায়ে লাগলে বাপের নাম ভুলিয়ে ছাড়ে। এই পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে প্যাড, মন্দ না।

শচীন ঋভু ব্যাট মাটিতে ঠুকছে। বল হাতে ব্র্যাডলি পদ্মপুকুর প্রান্তে দাঁড়িয়ে। শুধু কি দাঁড়িয়ে আছে? মুখের একদলা থুতু নিয়ে বলে পালিশ দিচ্ছে না? হ্যাঁ তো তাই-ই। প্যান্টেও খসর খসর বল ঘষছে। ওভারের প্রথম বলেই কীভাবে ঋভুকে প্যাভিলিয়নের পথ দেখাবে, তার ফন্দি আঁটছে। শচীনও ব্যাট হাতে তিনটি উইকেট-কে গার্ড করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। বল এসে উইকেটে ঢুকলেই হল? আসুক না একশো সত্তর কিলোমিটার বলকে ব্যাটের ডগায় ঘা মেরে ব্র্যাডলিকে পিটিয়ে দর্শকের হাতে ফেস্টুন বানিয়ে ছাড়ব না? আর এদিকে গতর কুঁড়ে প্রেম ঋভুদের একাদশে চান্স না পেয়ে দিব্যি মন খারাপ করে বসে আছে নাকি? না, না, সে গুড়ে বালি। ব্যাট-বল ছাড়াও একটা বিশেষ গুণ ওর দখলে, সে কথাটা বুঝি জানা নেই?

প্রেম যখন হাতে ছয়-ছয়টি আমড়া আঁটি নিয়ে স্টিভ বাকনার। স্টিভ বাকনার হাত দুটি দু'দিকে মেলে হাঁক দেয়, বি রেডি। রাইট হ্যান্ড ওভার দি উইকেট।

ব্র্যাডলি পদ্মপুকুর প্রান্তে দাঁড়িয়ে। মুহূর্তে দৌড় শুরু করেছেন তিনি। ওভারের দ্বিতীয় বল, জোরে মিড উইকেটের ভেতর...। ঋভু পা সামনে বাড়িয়ে টুক করে খেলে নিল। এ বলেও কোনও রান এল না।

ওভারের তৃতীয় বল। একেবারে মিড উইকেটের ভেতর। শচীন জোরে ব্যাট চালাল। বল চলে যাচ্ছে ধানের নাড়া টপকে টপকে ... অদ্ভুত ড্রাইভ। কিন্তু না, শত চেষ্টা করেও সাইমন্ড বল ধরতে পারলেন না। ফোর।

ইন্ডিয়া এখন তিন বল, চার রান—কোনও উইকেট না।

ওভারে চতুর্থ বল। পদ্মপুকুর প্রান্ত থেকে ছুটে আসছে লি। জোরে হাত ঘুরিয়ে ছুঁড়ে দিল। ফুলটস... শচীন অনড্রাইভ। ব্যাটের ডগায় লেগে বল চলে যাচ্ছে আকাশ পথে ফাইভ স্টার হোটেল প্রান্তে...। বল বটগাছের মাথা টপকে একেবারে পদ্মপুকুরের জলে। সিক্স। বিগ সিক্স।

ইন্ডিয়া চার বলে দশ রান, খানিকটা ঝুলিয়ে দিল। ঋভু মারতে গিয়েও মারল না। এ বল ব্যাটম্যানকে খানিকটা ঠকিয়ে দিয়েছে। মারলে হয়তো শচীনের বিপদ হতে পারত। কিন্তু না, সে তো করেনি। ফলত বল উইকেটরক্ষকের হাতে ধরা পড়ে ফিরে যাচ্ছে লি-এর হাতে। এ বলে কোনও রান এল না। রান সংখ্যা যা ছিল, তাই দশ। পাঁচ বলের বিনিময়ে দশ রান। কোনও উইকেট না হারিয়ে।

ওভারের ষষ্ঠতম বল করার জন্য প্রস্তুত লি। শচীন দুটি চোখ লি-এর দিকে ঠেলে দিয়ে মাটিতে ব্যাট ঠুকছে। এমন অবস্থায় দত্তগড়ে (দত্তদের ছোট পুকুর) থেকে গুটি গুটি পায়ে উঠে আসছে উত্তমের বউ। মাথায় এক ঝুড়ি ফলের মতো ভিজে জামাকাপড়।

স্টিভ বাকনার দু'দিকে হাত মেলে মাঠের ভেতর। সকলে চুপ। শেষে ঋভু উত্তমের বউয়ের সামনা-সামনি হয়। এ কী ব্যাপার?

—কী ব্যাপার আবার?

—তুমি মাঠের মধ্যে কেনে?

—কেনে? কী হয়েচে তা?

—কী হয়েছে তা? তুমি দেকতে পাও নাই, আমরা খেলচি?

—খেলচিস তো কী হয়েছে?

—কী হয়েচে না তোমার মাথায় ওগুলো কী?

—জামাকাপড়।

—ওইগুলো এখানে কী করবে?

—মিলব। আবার কী করব?

—মিলবে?

—হ্যাঁ মিলব।

—মিল তো দেখি।

—কেনে তু কী করবি? মারবি নাকি?

—না মারব কেনে? সব ছুঁড়ে ফেলে দুবো।

—ফেল তো দেকি।

—তুমি মেল-ও

—এই তো মিলচি। উত্তমের বউ ঝুড়ি থেকে ভিজে জামাকাপড় মাঠে মিলতে থাকে।

ঋভুও সুবোধ বালকের মতো চুপিসাড়ে দাঁড়িয়ে থাকে না। উত্তমের বউ-এর হাতে মেলা ভিজে জামাকাপড়গুলো দূর থেকে ছুঁড়ে ফেলে দেয়।

উত্তমের বউ কেরোসিনের মতো দপ করে জ্বলে ওঠে; এত সাহস তুর! তবে রে এ...। ঋভুর গালে জোর একটা চড় বসিয়ে দেয়। তুদের খেলার মুকে আগুন...

ঋভু কেঁদে ওঠে।

দেবু ননস্টাইকে দাঁড়িয়ে যে মরা কাঠ। মোহনপুরের ছেলেগুলো যে দেবুকে চারদিকে ঘিরে ধরেছে, আর বলছে এই তো গাঁয়ের লোক। ছিঃ ছিঃ... দেবু দু হাত চাপা দেয় কানে। ঋভু কাঁদছে। কাঁদছেই।

দেবু ঋভুর কাছে আসে, আর কাঁদিস না ঋভু। শোন সামনের বছর দামোদরের চরে যাব। চরটা তো আর কেউ কাড়তে নারবেক।

ওই চরে উইকেট পুঁতে মোহনপুরকে হারাবই হারাব।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%