জয়দেব দত্ত
পৃথিবীটা বড় দুঃসহ। তবুও মানুষের বাঁচার আকুলতা কোথায় যেন লুকিয়ে থাকে। মানুষ বাঁচতে চায়, বেঁচেও থাকে। এই অমোঘ নিয়মটাকে অবহেলা করা হেমলতার সাধ্যে কুলায় না।
হেমলতা ভাবে পৃথিবীটা স্বার্থপর। স্বার্থপর পৃথিবী। ভাবতে ভাবতে তলিয়ে যায় একটা তাজা মূল্যবোধ খোঁজে। খুঁজতে খুঁজতে নিজেকে হারিয়ে ফেলে। আর তখনই ওপর দিকে বুড়ো আঙ্গুল তুলে বলে, 'সব নিজের নিজের নিয়ে থাক। দশের কথা ভাবিস না। হাত পেতে নিতে শিখ। দিস না। ভোগ কর, ত্যাগ করিস না।'
হেমলতা স্বার্থপর পৃথিবীতে বাঁচার কোনো প্রয়োজন আছে বলে মনে করে না। তবুও তার ভেতর বাঁচার এক আশা থেকে যায়। আশাটাকে সে কোনো ক্রমেই ছিঁড়তে পারে না। তেল, নুন, জিরে, হলুদের ভেতরেই তার বাঁচার আশা লুকিয়ে থাকে। সংসারের নিত্যপ্রয়োজেনীয়গুলো তার মায়ার বস্তু। ঠিক যেমন ওর দেহের প্রতি টান, তেমনি সংসারটাও টানের বস্তু। অথচ ও ওর সংসারে কে, নিজেই জানে না। সংসারের কাছে নিজে যে একটা মানুষ সেই দাবিটুকুও রাখতে পারে না। দাবিহীনতা ওকে ভীষণ একাকী করে। তোলে। নিজের কলজেটার কাছে সত্ত্বা নিয়ে নিজেকে নানান ভাবে ব্যাখ্যা করে তবুও সব ব্যাখ্যার মধ্যেই যেন নিজে বাদ পড়ে যায়। আর তখনই জটলা বাঁধে। মাথা ঠিক রাখতে পারে না। কঠোর হতে চায়। কঠোরতার কাছাকাছি হয়, কিন্তু কঠোর হতে পারে না।
হেমলতা স্বার্থক মায়ের স্বপ্ন দেখতে ভালবাসে। সন্তানের ভেতরেই মায়ের মুখ দেখতে চায়। অতি কৈশোরেও দেখতে চেয়েছিল, যৌবনেও দেখতে চেয়েছিল, আজ অতি বৃদ্ধেও দেখতে চায়। তবে চাওয়াটা ওর চাওয়াই রয়ে যায়। বাস্তবের হয় না। বাস্তবে ওর পরিচয় 'পালা মা'। আর এই পরিচয়টা ওর কলজেটাকে খান খান করে।
হেমলতার চার ছেলে। চার ছেলেই সমাজের চারটি স্তম্ভ। বড় ছেলে ডাক্তার, মেজ ইঞ্জিনিয়ার, সেজ ব্যারিস্টার এবং ছোট মাস্টার। চার ছেলের সুবাদেই ঘরে আগন্তুকের সংখ্যা উত্তরোত্তর বেড়ে চলেছে। চার ছেলের চারটি বউ এবং তাদের সন্তান সন্ততি নিয়ে অনেকগুলিই।
চার ছেলের চারটি পৃথক সংসার। এই চারটি পৃথক সংসারেই হেমলতা থাকে। অথচ হেমলতাকে সংসারের কোনো মানুষ হিসাবে গণ্য করা যায় না। 'বুড়ো বোঝা' হিসাবে সে সংসারের কাছে দায়বদ্ধ। ওর সংসারের মধ্যে থাকাটা যেন অপরাধ। ওকে ঘিরেই সংসারের অশান্তি। কারণ সংসারে ওর পেছনে খরচ কম নয়। জিরে, নুন, আদা, গোলমরিচ, খয়ের পান, সুপারী ওর জন্য দরকার হয়। আর এইসব কিনতে ওদের ব্যয় হয় যথেষ্ঠ। সেই জন্য কেউ তাদের মা বলে স্বীকার করে না। বড় বলে ছোটর, ছোট বলে বড়োর। এই নিয়ে উটকো ঝামেলা। চেঁচামেচি, গণ্ডগোল। শেষে হেমলতা 'ভাগের-মা' হয়। এক এক ছেলের ঘরে তিনমাস স্থায়ী হয় তার ভাগ্য।
হেমলতা সুখী হতে চেয়েছিল। সুখের কথা মনে এলেই স্বামীর কথা মনে আসে। ছোট্ট একটা কুঁড়েয় বসে ওরা সুখের স্বপ্ন দেখত। এক ঘর মানুষের স্বপ্ন। সেই ঘরের ভেতর স্বাধীনতা। ইংরেজদের দাসত্ব মুক্তি। স্বপ্ন দেখতে দেখতে ওরা আনন্দে হারিয়ে যেত। আর এই রকম স্বপ্ন দেখার জন্যই হেমলতাকে অনেক ক্ষতি স্বীকার করতে হয়েছে। ভগবানপুর থানায় আগুন জ্বালাতে গিয়ে ইংরেজের তোপের মুখে স্বামীকে প্রাণ দিতে হয়েছে। হেমলতাকে নেটিভ পুলিশের চোখের সামনে নির্ভীক চিত্তে জাতীয় পতাকা ওড়াতে হয়েছে। আর পাওনা হিসাবে পেয়েছে ইংরেজ পক্ষের বুলেট লাথি। এই সব কথা স্মৃতি হলেই হৃদয়টা পাষাণ হয়ে যায়। পিপিলিকার সারি বন্দেমাতরম বলতে বলতে থানায় ঢুকছে। হঠাৎ এক ঝলক আগুন এসে ঝাঁঝরা করে দেয় স্বামীর বুককে। যেই মাটিতে লুটিয়ে পড়া, অমনি মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে তাজা রক্ত। রক্তের মাটি, মাটির রক্ত। তবুও চারপাশের সঙ্গে লড়ে যেতে হয়।
সেদিন স্বামীর মৃত্যু সংবাদে হেমলতা হেসেছিল। সাদা কাপড় পরতে ওর গর্ব হয়েছিল। হাতের শাঁখা হাসতে হাসতে খুলে ফেলেছিল নদীর জলে। আর মনে মনে ভেবেছিল, সে শহিদের স্ত্রী।
আর সন্ধ্যা থেকেই গায়ে কম্বল জড়িয়ে নতুন লেপের ওপর বসে আছে হেমলতা। শীতের রাত। বড় বেশি শৈত্যপ্রবাহ। হিমযুক্ত কুয়াশা চারিদিকে। সাঁই সাঁই করে এদিক ওদিক বাতাস বয়। তাতে শীতটা আরো জাঁকিয়ে পড়ে এবং কষ্টটা আরো বেড়ে যায়। প্রকৃতির নির্মমতা ওকে গ্রাস করে। মনে মনে প্রার্থনা একটু হালকা বাতাসের। বাজার থেকে কিনে আনা নতুন লেপটা আজ ওর জন্য পেতে দিয়েছে ছোট বউমা। আর সেটা খানিক স্বার্থপরতা। বাপের বাড়ি থেকে কেউ এলে লেপের দরকার হয়। সেই জন্যই নিয়ে আসা লেপটা। কিন্তু সেটা এনেই তুলে রাখা যায় না। ব্যবহার করার প্রয়োজন যাতে করে মসৃনতা পায়, তুলোটা বসে। সেজন্য হেমলতা এখন গড়াগড়ি দিয়ে মসৃনতার কাজটা করছে।
কপাট খোলার শব্দ শুনে দরজার দিকে তাকালে দেখতে পেল, ছোট বউ রাতের খাবার এনেছে। হেমলতার জন্য এইটুকু বাড়তি কাজ করতে হয়। রাতে রুটি খায়। আর খাবারটাকে এই ঘরে পৌঁছে দিতে হয়। খাবারের দিকে তাকাতেই মনটা খুশিতে ভরে যায়। রুটির পাশে বাটিতে পায়েস এনেছে। তাহলে পায়েস করেছে। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে মনটা বিষণ্ণতায় ভারী হয়। পায়েসটাই তার বিষণ্ণতার কারণ। বউমা পায়েস করেছে হেমলতার জন্য। এই পায়েসই হেমলতাকে এক সংসার থেকে আর এক সংসারে নিয়ে যায়। তার মানে ছেলেরা পায়েস খাইয়ে তার সংসার থেকে বিদায় জানায় মাকে। রাতে পায়েস খেয়ে পর প্রভাতে অন্য ছেলের ঘরে তিনমাস থাকার ছাড়পত্র। আজ পায়েস আসাতেই হেমলতা বুঝে যায়, ছোটর পালা শেষ। কাল থেকে বড়োর মা হবে হেমলতা।
কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ে। চোখের ঢাকনা বুজাতে চায়। কিন্তু চোখ তা মেনে নেয় না। বাধ্য হয়ে গুঁড়ি মেরে পড়ে থাকে।
দেওয়ালে একটা জীব টিক টিক করে উঠে। হেমলতা ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে। জীবটার অবস্থান নির্ণয় করতে চায়। চারিদিকে চোখ ঘোরায়। খুঁজে পায় না। দেওয়ালের গা ঘেষে উঠে দাঁড়ায়। পায় না। দেওয়াল ঘেষে ঘেষে এগিয়ে যায়। ঘুল ঘুলির কাছে যায়, জানালার কাছে যায়—পায় না। অথচ জীবটাকে দেখার জন্য ভেতরে ভেতরে মরিয়া হয়ে উঠছে। দেখা হলে ভাব করত। কথা বলত। ওর দুঃখের কথা শুনত। নিজের কথা জানাত।
বসে পড়ে। বসতেই আবার টিকটিক। হেমলতা আর ওঠে না। জীবটার প্রত্যুত্তর ফিরিয়ে দিয়ে, বসে বসেই শব্দের অবস্থা খোঁজে।
দূরে একটা পাখির ডাক শুনে হেমলতার মনে ফুর্তি আসে। রাত্রি তিন প্রহর পার হল তাহলে। সেটা জানান দেয় ঐ পাখির ডাকে। রোজ ঐ পাখিটার ডাক শুনে হেমলতা। আর ঐ ডাকই ওর একাকীত্ব ঘোচায়। বন্ধ ঘরটা আর ভাল লাগে না। চার প্রহরের শুরু থেকেই খোলা প্রকৃতির বাতাস ঘন কুয়াশার ঘেরা টোপ টোপকে ঘরের ভেতর। বাতাসের ঝাপটা খেয়ে খেয়ে লম্ফের টুকরো শিসটা মাটিতে নুয়ে হঠাৎ নিভে যায়। আর তখনই হেমলতা ভয় পায়। প্রাণে শেষ হওয়ার ভয়। প্রাণটা এমনি একদিন বাতাসের ঝাপটা খেয়ে খেয়ে ওকে ফাঁকি দিয়ে চলে যাবে না তো। আবার সঙ্গে সঙ্গেই নিজমনে ফিক করে হেসে ওঠে। এখনো প্রাণের ভয়। অবাক লাগে।
ঘন তমিসা ভেদ করে ফুটে ওঠে ভোরের আলো। প্রকৃতির রূপ পাল্টায়। জীবগুলো সতেজ হয়। আবছা আলো জানালা দিয়ে গুঁড়ি মেরে ঢুকে বিছানায় লেপ্টে থাকে, হেমলতার মুখে এসে পড়ে। পড়ে ক্যালেন্ডারের পাতায়। হেমলতা ঘুম চোখে ক্যালেন্ডারের দিকে তাকায়। লাল কালিতে লেখা রবিবারের স্তম্ভের প্রথম অক্ষর—'এক'।
তার মানে আজ পয়লা ফাল্গুন। ছুটির দিন। অফিস কাছারি ছুটি। ছেলেরা সব ঘরে। ছেলেদের এই ঘরে থাকার দিনেই তাকে এক সংসার থেকে অন্য সংসারে বদলি হতে হবে। এতে সে যেন শেষ হয়ে যায়। তবু তাকে লড়ে যেতে হয় শেষ না হওয়ার জন্যই।
একটা তিক্ত শব্দ আসে কানে। রেডিও কিম্বা টেপের। তাহলে বড় নাতি টেপ বাজাচ্ছে। হেমলতার বিরক্ত লাগে। প্রথম সকাল। এই সময় সাধনা করতে হয়। না পারিস তো দেশ নিয়ে গান কর, তা না টেপ বাজাচ্ছে।—'মোল যা'। 'অর্ক, এই অর্ক, টেপটা বন্ধ কর।'
কথাটা অর্কের কানে গেল, কিন্তু কানে রাখল না। সাউন্ডটা আরো বেড়ে যায়।
বাইরে রোদ। হেমলতা লোভ সামলাতে পারেন না। বেরিয়ে আসেন। সূর্যের দিকে মুখ করে গড় ঠুকেন। ঢুলু ঢুলু চোখে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে টুকী। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঠাকুমার প্রণাম দেখে। দেখতে দেখতে এক সময় বলে ওঠে—'ঠাকুমা এই স্বাধীন ভারত আমরা কেউ আর সূর্যকে প্রণাম করি না, আমরা ওকে আমাদের কাজে লাগাই।'
হেমলতার রাগ হয়। স্বাধীন ভারত। কী চেয়েছিল সেদিনের মানুষগুলো? ভারতমাতা তার চার সন্তানের মায়ের মতো হোক? রাগ কমে আসে।
একখিলি পানের জন্য হেমলতার মন টানে। সামান্য ক'টা খয়ের, পান, চুন আর সুপারী দিয়ে ওর পানের নেশা। নেশাটা ছাড়তে পারে না। আর তখনই মনে হয় নেশাটার জন্য ওর সংসারে থাকা। না হলে সংসারে থাকার প্রয়োজন হয় না। নাতি-নাতনির হাত থেকে পান নেওয়ার ভেতরেই সংসারের প্রতি মায়া উসকে ওঠে। আর তখনই বেঁচে থাকার সাধটা ওকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে।
হেমলতা টুকীকে বলে, 'মায়ের পানের সাজ থেকে এক খিলি পান আনতো ভাই।' টুকী পান হাতে ঠাকুমার কাছে আসে। ঠাকুরমার দাঁতে পানের কস দেখে টুকী হেসে খুন। বলে, ঠাকুমা তোমার পানের নেশা মেটাতে বাজারে খয়ের শেষ। মা বলল, এবার কাঁকরের নেশা করতে।' হেমলতার রাগ টগ বগ করে ভেতরে ভেতরে ফুটে। কিন্তু বাইরে প্রকাশ পায় না।
ইস্ত্রি করা সাদা ধবধবে কাপড় হাতে বড় বউ যেন আজকের সূর্য। হেমলতা যেন তড়িৎ পরিবাহি তারে শক খায়। ইয়া বড় শরীরটা সঙ্কুচিত হয়। বড় বউ গুটি গুটি এগিয়ে আসে। আর তাতে হেমলতার দীর্ঘ জীবনটা গুটি গুটি দিগন্তে বিস্তার করে। ছায়া পড়ে জাগতিক বস্তুগুলোর উপর। নদী, জল, পাহাড়, গাছ, পাথর সবাইকে ওর মনের কথা জানায়। কারণ ঐগুলো ওর আপনজন, মায়ার বস্তু।
বড় বউ হাতের শ্বেত বস্ত্রটা বাড়িয়ে দেয়। বলে 'মা কাপড়টা ছেড়ে নিন।' হেমলতা একটা দীর্ঘশ্বাস সংসারের সর্বাঙ্গে ছড়িয়ে দেয়। নিশ্বাসের অদৃশ্য বাষ্পকণাগুলো তীব্র বেগে ছুটতে থাকে। বলে, 'যেতে যখন হবে, দাও!'
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন