নতুন কর্মজীবন

জয়দেব দত্ত

তক্তাপোষের উপর বসতেই মানস টের পেল, সে ঘেমে উঠেছে। সারা গা-এর বিন্দু বিন্দু ঘাম তার পরনের পাঞ্জাবিটাকে ভিজিয়ে দিয়েছে। মানস ফ্যানের স্পিড বাড়িয়ে তক্তাপোষের উপর পা ছড়িয়ে বসল। মাথার উপর বন বন বোঁ শব্দে ফ্যানটা ঘুরছে, ঘুরছেই। কিন্তু মানসের গা থেকে ঘাম কমছে না, বরঞ্চ বাড়ছে, বাড়ছেই। কেন এমন হয় বুঝতে পারে না। মাসটা তো বৈশাখ বা জ্যৈষ্ঠ নয়; পৌষ মাস। কনকনে শীতের সময়ে এত ঘাম কেন? এই মাত্র সাইকেল চালিয়ে এসে বসল। অনেকদিনের অভ্যাস সাইকেল চালানো, সেই কোন ছোটোবেলা থেকে। স্কুল-কলেজ সাইকেলে করেই গেছে, তারপর মাস্টারি পাওয়ার পর থেকে এখনো। মাস তিনেক হল সে রিটায়ার করেছে। এতদিন সে পাত্রহাটি গ্রামের প্রাইমারি স্কুলে মাস্টারি করেছে। এখন প্রত্যেকদিন সাইকেলে করে পাত্রহাটি যায় না ঠিকই, তবে বাজার গেলে কিংবা সিনেমাতলায় কোনো বন্ধুর সঙ্গে আড্ডা দিতে গেলে সাইকেলে করেই যায়। কাজেই সাইকেল চালানোর অভ্যাস তার যথেষ্ট আছে। তাহলে এত দরদর ঘাম কেন?

এখন মানস পাত্রহাটি না গেলেও পাত্রহাটির লোকজন হুটহাট এসে পড়ে। এই যেমন মদন গয়লা আসে। মানস তার কাছে রোজ এক সের দুধ নেয়। লোকটা বড্ড বেশি বকে। সময়ে অসময়ে হুট করে বলে বসে, মাষ্টারমশাই আপনি রাজি হলেই ফেয়ারয়েলের দিনটা ঠিক করে নিই। মানস তখন বিপদে পড়ে যায়।

না না, ওসবের কোন দরকার নেই, এই তো বেশ আছি।

বাধ্য হয়ে মদন গয়লা ক্যানের হটাং হটাং শব্দ তুলে মুখ ফিরিয়ে চলে যায়।

কিন্তু মদন গয়লা চলে গেলেই তো আর সব কিছুর শেষ নয়, তারপর মুড়িভাজনী আছে। সেও তো সপ্তাহে সপ্তাহে বস্তা ভরে মুড়ি দিয়ে যায়, তারও তো কিছু আবেদন নিবেদন থাকতে পারে না কি? তা বলুন মাষ্টারমশাই কবে ফিয়ারয়েলটা নিচ্ছেন?

আর ফিয়ারয়েল ফিয়ারয়েল বলে বিরক্ত কর না তো?

মুখে মুখে এমন একটা ধমক খেয়ে মুড়িভাজনী সরে পড়ে। পাত্রহাটির গ্রামের সরু-মোটা সাণ্ডা-গুণ্ডা ইয়াং ছেলের দল, তারা ছাড়ার পাত্র নয়। সকলে সমস্বরে 'হুক্কা-হুয়া' রব তুলে বলে বসল, না মাস্টারমশাই আমরা ও কথা মানছি না। আমাদেরও তো কর্তব্য বলে একটা জিনিস আছে। শুনুন, সামনের ৪ঠা জানুয়ারি আমরা আপনার ফিয়ারয়েলের দিন ঠিক করেছি। আপনার আমন্ত্রণ রইল।

ব্যাস। ব্যাসতো ব্যাস, হয়ে গেল।

আজ এই মাত্র সেই আমন্ত্রণ রক্ষা করে মানস তক্তাপোষে বসেছে। আর বসতেই দরদর ঘাম। সহকারি পুরানো মাষ্টারমশাইরা মানসের নামে একটা স্মারকলিপি লিখেছে। মানস সেটা সঙ্গে করে আনেনি। কেউ দিয়ে যাবে ক্ষণ। কিন্তু ওর এক্স ছাত্র সাগর মঞ্চে উঠে মাইকের সামনে আপ্লুত হয়ে কীসব ছাই-ভস্ম বলে গেল, আমাদের মাস্টারমশাই মহান...। মানসের তখন থেকেই বুকের ভিতর কম্পন শুরু হয়েছে। সারাজীবন মাস্টারিতে সে ফাঁকি দিয়েছে। জীবনে টাকা, বাড়ি, ঘর-দোয়ার আর নিজের বউ-ছেলেমেয়েদের কথা ছাড়া অন্য কিছু ভাবেনি। এই তো ওর বড় ছেলে সুমন মিউনিসিপ্যালিটিতে মাস্টার পোস্টে কাজ করে। কাজটার পাকা ব্যবস্থা হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু অন্তিম সময়ে সরকারটা গেল বদলে। ফলে বিরোধীদের দলে সুমনকে কুঁচে হয়ে থাকতে হয়। সুমনের চিন্তায় মানসের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। এইভাবেই ঘুম আর জাগরণের মধ্য দিয়েই জীবনটা চলছে। অথচ সাগরদের কাছে সে আজ মহান। মানসের চোখের কোণে জল এসেছিল, গড়িয়ে পড়ছিল বুকে। তারপর স্থির থাকতে পারেনি। চেয়ার ছেড়ে, সাইকেলে চড়ে সোজা ঘর এসেছে। ঘরে এসে তক্তাপোষে বসে ঘাম।

ফ্যানের স্পিডটা শেষ জায়গায় এসে পৌঁছেছে। তবুও ঘামটা মরেনি। এ এক যন্ত্রণা! বুকের ভিতর কী যেন একটা হচ্ছে। কেন হচ্ছে কিছুতেই বুঝতে পারে না। বাধ্য হয়ে ফ্যানটা অফ করে দেয়। দরজা বেয়ে সূর্যের আলো ঘরের ভিতর। সূর্যটাও যেন গিলতে আসছে। দরজাটা বন্ধ করে দেয়। জানালা বেয়ে উত্তরের বাতাস আসছে। বাতাসটা যেন বিচুটি ফল। জানালাটা বন্ধ করে দেয়। ঘরের ভিতর ইলেকট্রিক বাতি উত্তাপ ছাড়ছে। না, এও ভাল নয়, বাতিটা অফ করে দেয়। অন্ধকারে তক্তাপোষের উপর লেপ মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ে। লেপের ভিতর অজস্র ছারপোকা। লেপটা গা থেকে ফেলে দেয়। চারদিক অন্ধকার, অন্ধকার। অন্ধকারে বিষুবরেখা নেই, কর্কট বা মকরক্রান্তি পালিয়ে গেছে, ছায়াপথ কোথায়? মানস বাতিটা জ্বালিয়ে দেয়, কিন্তু ভাল লাগাটা ফিরে পায় না। কী হল মানসের? জানালাটা খুলে দেয়, বুক ভরে বাইরের বাতাস টানে। কিন্তু না। জানালা ছেড়ে বেরিয়ে আসে। বই-এর আলমারিতে হাত দেয়। নিজের কবিতার বই, 'এজন্ম আমি চাইনি' হাত দিয়ে টানে। পৎ পৎ পাতা উল্টায়। বিশ্রী লাগছে নিজেকে। কিচ্ছু ভাল লাগছে না। ভাল লাগা মনটা কে যেন চুরি করে নিয়ে গেছে। কোথায় পাওয়া যাবে তাকে? আচ্ছা আজ সকালে গাছে জল দিতে বাগানে গিয়েছিল। সেখানে ফেলে আসেনি তো? মানস হুড়মুড়িয়ে দরজা খুলে বাগানে গেল। বাগানের চারপাশে নারকেল গাছ। গেটের দু'পাশে সুপারি। উত্তরে একটা চিঁড়ে মুড়কির গাছ। খাতড়া বেড়ানোর সময় ওর মাসতুতো দাদা পাথরের পাহাড় দেখার কথা বলেছিল। একটি মাত্র পাথর দিয়ে পাহাড়টা তৈরি। নাম সোনামুনি পাহাড়। কুড়ালপাহাড়ী গ্রামে আছে সেটি। পাহাড় তো নয়, যেন উল্টানো একটা বড় গামলা। সেই গামলার উপর বসে গল্প হচ্ছিল পাঁচ-সাতজনের। গামলাটা দিনকে দিন মাটির ভিতর ঢুকে যাচ্ছে। আগে এটা আরো অনেক উঁচু ছিল। গামলার নীচে একপাশে আছে সোনামুনি দেবী। তার নামেই পাহাড়টা। দেবী বড় জাগ্রত। আগে লোকে ভক্তি খাতির করত খুব। এখন লোকের তুচ্ছ তাচ্ছিল্যতায় দেবী বিরক্ত। ফলত সোনামুনি রাগে নীচের দিকে নেমে যাচ্ছে। আবার সময় হলেই পাতাল ফুঁড়ে বেরবে একদিন। গামলার উপর বসে সোনামুনির গল্প জমে উঠেছিল পুরোদমে। এমন সময় একটা সাধু হাতে চারা নিয়ে এসে বলেছিল, নে ধর, এর নাম চিঁড়ে-মুড়কি। এ যে গাছটা দেখছিস, আগে ওর চিঁড়ে-মুড়কি হত। দেশ থেকে লোক আসতো সোনামুনির কাছে, তারা সকলেই ঐ গাছের চিঁড়ে-মুড়কি খেত। আর চিঁড়ে-মুড়কিই ছিল সোনামুনির একমাত্র ভোগ। নে ধর, ওরই ফসল নিয়ে ঘরে পালন করবি। সেই থেকে এই চিঁড়ে-মুড়কির গাছটা বাগানে এনে পালন করেছে।

মানস চিঁড়ে মুড়কি গাছটার কাছে গেল। বসল। কিন্তু ঘামটা মরল না। দরদর বেগে ঘাম নীচে চুঁয়ে পড়ছে। ওঃ, ঘামের কী গন্ধ। যেন শত সহস্র শতাব্দীর জমে থাকা উৎকট গন্ধময় ঘাম। তার পুরু চামড়ার আস্তরণ ভেদ করে বার হতে চাইছে। ভাল লাগছে না, কিছুতেই ভাল লাগছে না। তার হারিয়ে যাওয়া বস্তুটাতো বাগানে নেই। সকালে জল দিতে এসে তাকে তো বাগানে ফেলে যায়নি। তাহলে কোথায় ফেলে এসেছে তাকে? আচ্ছা, একবার চিন্ময়-এর কাছে খোঁজ নেওয়া যাক। চিন্ময় কিন্তু চোরের কম নয়। ওকে বিশ্বাস করা যায় না। হয়তো কোন ফাঁকে 'সিঁধ কাঠি' হয়ে ওর বুকের ভিতর থেকে মহামূল্যবান বস্তুটি চুরি করে নিয়ে গেছে।

চিন্ময় খুব রোগা। মাথার ফিড়িং ফাড়িং চুলগুলো নৌকার মতো সোজা ঘাড়ে এসে নেমেছে। কিন্তু ঘাড়ে চুলগুলো নৌকার মত নামলে কি হবে, চিন্ময় এমনিতে কিন্তু খুব পরিশ্রমী। এখন হয়তো পত্রিকার প্রুফ নিয়েই ব্যস্ত। সামনের বইমেলায় প্রকাশ করবে, এমন একটা সংকল্প। আর এখনকার লেখকরাও হয়েছে তেমন। জগন্নাথবাবুর লেখাটা তো এখনও এসে অফিসে পৌঁছাল না। আর এতে জগন্নাথবাবুর একার দোষ কি? মানস তো আর চিন্ময়ের থেকে তিন-চারশো কিলোমিটার দূরে থাকে না, থাকে মাত্র তিন-চার হাত দূরে। একটা জোরে ডাক দিলেই এসে মুখ থুবড়ে পড়বে চিন্ময়ের হাতে। তো সেই মানস এখনো লেখাটা জমা দেয়নি। সেই তিনমাস আগের থেকে আজ দিই কাল দিই করে করে এই পর্যন্ত। ঐ যে বললাম না, সব ঐ তিনের কাছে জব্দ—টাকা, ঘরদোর আর বউ-ছেলেমেয়ে। এর বাইরেও একটা জীবন, যে জীবনে দেওয়া নেওয়ার হিসাব নেই। নেই মানসম্মান আর যশের মোহ, পরম প্রেমময় সচ্চিদানন্দ। সে জীবন এখন শুধু দার্শনিকতা, দার্শনিকতা।

মানস এসব দার্শনিকতার মধ্যে নেই। সে এখন নিজের চুরি যাওয়া মহামূল্য বস্তুটা নিয়েই শশব্যস্ত। হয়তো চিন্ময়ের কাছে পাওয়া যাবে সে ধন।

মানস চিন্ময়ের কাছে এসে দাঁড়াল। চিন্ময়ের ঘরে। চিন্ময় প্রুফ দেখা শেষ করে, হাতে মুখে জল নিয়ে লম্বা তারের আলনায় টাঙিয়ে রাখা গামছায় মুখ হাতের জল মুছছে।

মানস ডাকল, চিন্ময়।

চিন্ময় মানসের ডাকে চোখে ফিরাল, আরে, আসুন আসুন...

মানস চিন্ময়ের ডাকে ভিতরে এল না; বেরিয়ে এস।

কোথায় যাবেন, বনে? চলুন অনেকদিন বন যাওয়া হয়নি।

চিন্ময় খুশির জোয়ারে আটখানা।

মানস আগে আগে চিন্ময় তার পেছনে। রেললাইন পেরিয়ে বন। মানস রেললাইন পার হতে ট্রেন চলার শব্দ পেল। আশ্চর্য, ফাঁকা ভূখণ্ডে কোথায় ট্রেন? মানস তার নিজের মাথায় হাত দেয়, মাথাটা খারাপ হয়নি তো? দূর ছাই, মাথাটা খারাপ হতে যাবে কেন; ট্রেনটা যে তার বুকে চলেছে। একটা বিশাল সিগন্যাল তুলে ট্রেনটা প্ল্যাটফর্ম অতিক্রম করছে। মানস ঝট-পট রেললাইন পার হয়ে বুকে ট্রেন চলার বিপদ থেকে মুক্তি পায়।

বনে ঢুকে মানস একটা শালগাছের নীচে বসল। শালগাছের নীচে রাঙা মাটি। রাঙা মাটির শুকনো ঘাসের গেঁড়ো আর শালের পাতা-চোতা খেয়ে খেয়ে উঁই পোকাগুলোন কোথায় পালিয়েছে। উঁই খাওয়া শুকনো একটা পাতা তুলে চিন্ময় বলল, মানসবাবু আমাদে পত্রিকার ঠিক এমন অবস্থা। অন্যদিন মানস চিন্ময়ের কথায় এক চিলতে হাসি হেসে লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠত। কিন্তু আজ সেই রকম ভাবগতি বোঝা গেল না। বোধ হয় বুকের ভিতর সেই ট্রেনটা আবার চলতে শুরু করেছে। এমন সময় একটা পাখি গাছের উপর উড়তে গিয়ে পিচ করে হেগে দিল। হাগাটা এসে পড়ল মানসের হাঁটুর উপর ধুতিতে। চিন্ময় জিজ্ঞাসা করল, কি পাখি বলুন তো ওটা?

মানস আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল, পাখি দেখতে পেল না। উল্টে দেখতে পেল সেই ট্রেনটা। ট্রেনটা হুস-হুসিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে সিগন্যাল ভুলে প্ল্যাটফর্ম অতিক্রম করছে। সারা গা ভিজে যাচ্ছে ঘামে।

না, চিন্ময় তো তার মহামূল্যবান রত্নকে চুরি করতে পারেনি। তাহলে তার রত্ন কোথায়? কে তাকে নিয়ে গেছে? আচ্ছা, অহলা মেছেনি; সেও তো চুরি করতে পারে নাকি? যৌবন বয়সে সেও তো কতবার মন চুরি করে ধরা পড়েছে। শুধু যৌবন বয়সে, এখনো কি মাঝে মধ্যে করে না? ব্যাগ নিয়ে বাজারে গেলে পোওয়া খানেক কি সেরখানেক পুঁটি বা মৌরালা মাছ ব্যাগের ভিতর ঢুকিয়ে দিয়ে, মনটা টুক করে নিজের আঁচলের ভিতর কুড়িয়ে নেওয়া বুঝি চুরি নয়?

মানস হন্ত-দন্ত হয়ে ধুতিটা হাঁটুর উপর তুলে অহলা মেছেনীর দোরগোড়ায় পৌঁছায়। দোরগোড়ায় ধুতিটা হাঁটুর নীচে নামিয়ে কোঁচাটা ঠিক করে নেয়। তারপর আগুড় ঠেলে ঘরের ভিতর। অহলা মেছেনী বুকে ব্লাউজের বোতাম খুলে ভাত খাচ্ছে। দুর ছাই, 'ডোম ঘরে পেছে নাই, কেওট ঘরে মাছ নাই' তো মাছ-ভাত কোথা? একবাটি লঙ্কা ছেনে, তাতে পিঁয়াজ মিশিয়ে লাল টকটকে করে ভাত খাচ্চে, আর হু-হা-হু-হা করছে। পিঁড়ে দিয়ে মানসকে বসতে দিবে কি ছাই! নিজেই যে ঝালে মরে! বাধ্য হয়ে মানস অহলার ঘর থেকে বেরিয়ে এল।

না না, অহলা তো আজ আর তার কিছু চুরি করে এনে বুকের ব্লাউজের ভিতর লুকিয়ে রাখেনি। বুক তো তার উদমই ছিল। তাহলে সেই চুরি যাওয়া ধন কোথায়? কার কাছে? চিন্তা করতে করতে মানস আবার কখন যে সে তার বাগানে এসে ঢুকে পড়েছে, খেয়াল করেনি। চিঁড়ে-মুড়কি গাছটা একরাশ ডালপালা নিয়ে সোজা দাঁড়িয়ে আছে। মানস আবার চিঁড়ে-মুড়কি গাছটার তলে এসে বসল।

সূর্য পশ্চিমে হেলে মাটিতে ঠিকরে পড়ছে। দোপাটি দুলছে। আর চামেলী চেয়ে আছে দোপাটির দিকে। রজনীগন্ধা সুবাস ছড়িয়ে পাতলা লিকলিকে মেয়ের মত এক ঠ্যাং-এ দাঁড়িয়ে আছে। মানস সে সব কিছু দেখতে পাচ্ছে না, শুধু কানের ফুটো দুটো হয়ে হুড়-মুড়িয়ে ঢুকে পড়ছে, ট্রেনের সেই সিগন্যালটা। ট্রেনটা মুঠো মুঠো ধোঁয়া ছেড়ে প্ল্যাটফর্ম অতিক্রম করছে। সারা আকাশ চাপ চাপ কালো ধোঁয়া। ধোঁয়া-ধোঁয়া-ধোঁয়া। শুধু ধোঁয়ার আস্তরণ। গা বেয়ে দরদর ঘাম পড়ছে। ঘামে ভিজে যাচ্ছে পাঞ্জাবিটা। মানস একটা হ্যাঁচকা টানে পাঞ্জাবিটা ছিঁড়ে ফেলে মাটিতে। পরনের ধুতিটা টেনে ছুঁড়ে দেয় আস্তাকুঁড়ে। কপালটা ঠুকতে থাকে চিঁড়ে-মুড়কি গাছের শিকড়ে ঠক ঠক...।

এমন সময় গাছের উপর হুড়-মুড় হুড়-মুড় শব্দ। মানস গাছের উপর চোখ তুলে তাকাল। চিঁড়ে-মুড়কি গাছের মগডাল থেকে হুড়-মুড়িয়ে নেমে আসছে একটা সাধু। চোখ রক্ত বর্ণ। আগে একে কোথায় যেন দেখেছে। হ্যাঁ হ্যাঁ, সেই সাধুটাই তো, সেই সোনামুনি পাহাড়ে...

সাধুটা চিমটে উঁচিয়ে মানসের দিকে তেড়ে এল, বল কী খুঁজছিস?

মানস কোনো উত্তর দিতে পারে না, শুধু থর থর কাঁপতে থাকে।

সাধুটা মানসের চুলের মুঠি ধরে। তোকে চিঁড়ে মুড়কি গাছটা দিয়েছিলাম এ'জন্যে?

মানস নীরব।

সাধুটা আবার জিজ্ঞাসা করে, বল কী খুজছিস?

মানস চারদিকে ভেবে দেখে। কোনো উত্তর দিতে পারে না। থরথর কাঁপতে থাকে।

সাধুটা হো হো হাসতে থাকে, হাসতে থাকে। তুই কি খুঁজছিস তুই নিজেই জানিস না।

সাধুটা তার বগলের ঝাঁপি থেকে একটা পুঁথি বার করে, নে ধর। তোর হারিয়ে যাওয়া জিনিসটা এখানে সেখানে খুঁজলে কী খুঁজে পাস, ওটা যে আমার ঝাঁপির ভিতর। মহাভারতে অর্জুনকে কী বলেছিলাম জানিস?

না।

আমাকে অনুসরণ কর। কেন জানিস?

নিজেকে জানার জন্য। আর নিজেকে জানতে গেলে কী করতে হয় জানিস?

না।

নিজেকে ভালবাসতে হয়। নিজেকে ভালবাসতে গেলে কী করতে হয় জানিস?

না।

নিজের কর্মকে ভালবাসতে হয়।...নে ধর বইটা। আজ থেকে শুরু হোক তোর নতুন কর্মজীবন।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%