কাক বৃত্তান্ত

জয়দেব দত্ত

দেওয়াল ঘড়ির পেণ্ডুলাম ঢং ঢং করে ছ'টা বাজার আগেই কার্নিশে বসে থাকা কাকটা কা কা করে উঠল। রোজ সকাল হলেই কাকটা কা কা শব্দ করে বাসন্তীর ঘুম ভাঙিয়ে দেয়।

জানালার কপাট না খুলেই বাসন্তী জানতে পারে বাইরের আকাশে এখন অন্ধকার সরিয়ে সকালের আলো ফুটে উঠেছে। হয়তো এখনো পূব আকাশে মুখুজ্জেদের দুর্গা ঠাকুরের কাঁসর ঘণ্টার মতো গোল লাল টকটকে সূর্যটা ওঠেনি। হয়তো কিছুক্ষণ পরই পাশের বাড়ির উঁচু ছাত টপকে লাল গন-গনে সূর্যটা অষ্টমীর ক্ষণের মা দুর্গার চোখের মতো ভ্রু ছেড়ে বেরিয়ে আসবে। কাকের কা কা ডাক ঐ কথা মনে করিয়ে দেয় বাসন্তীকে। কেন না, কাক বৃত্তান্ত তার জানা। আর কার্নিশে ডেকে ওঠা কাকটা যে ট্যাঁকচাদা তা সে বিছানায় শুয়ে শুয়েই বলে দিতে পারে। সবই কাক বৃত্তান্ত জানার ফল।

দিনের আলো ফুরিয়ে এলেই সব জড়ো হয় এক জায়গায়। তা সে ঝাঁকড়া বট গাছেই হোক, বা কোন কৃপণ তালুকদারের বাঁশ ঝাড়েই হোক। তারপর অন্ধকার শেষ হলেই সব নিজের নিজের খোল ছেড়ে ডানা ঝেড়ে যে যার দিকে। নিজের স্বজাতির চরে খাবার বিড়ম্বনা না করেই, টুকটাক সরে পড়ে নিজের নিজের চরাচরে। এক একটা চরাচর কয়েকটা কাকের অ-লিখিত বণ্টননামা। যে বণ্টননামাতে কোন জোর জুলুম নেই। আছে শুধু একটা কাক মজলিস। রাজ্যের কাক কা কা করে জড়ো হয় এক জায়গায়। চলে কুশল জিজ্ঞাসাবাদ। রাত কেমন কাটল? শরীর টরীর সব ভাল আছে তো? কেউ কার সঙ্গে ঝগড়া করেনি তো? এই সব কয়েক মিনিট। তারপর ডানা মিলে কা কা রব তুলে সেই নিজের নিজের অলিখিত বণ্টন নামায়। এই হল বাসন্তীর কাক বৃত্তান্ত।

কার্নিশে কাকটা কা কা করলেও বাসন্তী আজ বিছানা ছেড়ে উঠবে না। কারণ তপনের সঙ্গে কাল দু কথা হয়ে গেছে। তপনকে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, দুএকদিনের মধ্যে গ্রামের বাড়ি না গেলে, হয় ওর একদিন, না হলে তার একদিন। তপন অবশ্য সে নিয়ে কোনো বকা ঝকা করেনি। শুধু চোখ মুছে ঘুমোতে বলেছে। বাসন্তী তপনের কথায় চোখ মুদে ছিল ঠিকই, কিন্তু ঘুমাতে পারেনি।

বাসন্তী কতদিন যে গ্রামের বাড়ি যায়নি তার ঠিক নেই। তাই মনটা সব সময় গ্রামের বাড়ি যাওয়ার জন্য উড়ে বেড়াচ্ছে। অথচ পাশের ঘরে সুশীলের স্ত্রী একটু অন্য রকম। শত সাধ্য সাধনার পরও গ্রামের বাড়ি যেতে চায় না। শহরে থাকা কত নিরাপদ! কত সুন্দর জীবন শহরে! ঘরের ভিতর দামি সেন্টের বোতল! নাক টেনে গন্ধ নিতে হয় না; বরঞ্চ গন্ধটাই নাকের ফুটো ভেদ করে আপনা আপনিই ঢুকে যায়। ব্যালকনির একপাশে টবে নামানো থাকে কত কি গাছের চারা! ওদের গায়ে স্নেহের হাত বুলোতে কত মজা! একটা পাতা ছুঁয়ে দেখার জন্য লাফ দিতে হয় না, বরঞ্চ কোমরটা ঢেউ খেলিয়ে নিচে নামাতে হয়। তখন কত আনন্দ! সারা পৃথিবীটা যেন ওর হাতের মুঠোয়। এখানে সব কিছুই ওর নাগালের মধ্যে নাগালের বাইরে কিছু নয়।

কিন্তু বাসন্তী ওতে মন মজে না। দামি পারফিউমের বোতলে ওর এলার্জি। যদি কোনোমন্দে ওর নাকে গন্ধ ঢুকেছে তো বিপদের এক শেষ। বমি টমি করে একশা। ওর নাকে এখনও জংলি ফুলের গন্ধ। খোঁপায় শাল ফুল। তপন মাঝে মধ্যে বাসন্তীর খোঁপা থেকে শাল ফুলের গন্ধ পায়। মাথার খোঁপা হাতড়ে জিজ্ঞাসা করে, কোথায় রেখেছ ফুলটা?

বাসন্তী মুচকি হাসে, ফুল কোথায় রাখব?

তপন উত্তর করে, তোমার খোঁপায়।

বাসন্তী হেসে গড়িয়ে যায়, খোঁপায় কেউ ফুল রাখে না কি?

তপন বলে, তুমি রাখ।

বাসন্তী খোঁপা খুলে দেয়, নাও ফুল দেখ।

তপন বাসন্তীর চুল হাতড়ায়।

বাসন্তী ঠাট্টার ছলে তপনের হাতে চিরুনি ধরিয়ে বলে, নাও চিরুনী-তল্লাসী কর।

তপন চিরুনী দিয়ে বাসন্তীর মাথা ছাড়িয়ে দেয়। দুজনে হাসতে হাসতে বিছানায় গড়িয়ে যায়। বিছানাটা বাসন্তীর ফাটা পা-এর ঘষ্টানীতে এক সময় গুটিয়ে যায়। গুটিয়ে যাওয়া বিছানায় দুজনের জায়গা সংকুলান হয় না। ছুটে গিয়ে জানালার কপাট খুলে। চুপ-চাপ দাঁড়িয়ে থাকে জানালার পাশে। বাইরের বাতাস এসে বাসন্তীর চুলে চুমু খায়। কিন্তু চুলে ঝড় ওঠে না। ওর চুলে জংলি ঝড় মিশে আছে যে।

কাকটা তারস্বরে ডেকে চলেছে কা কা। একটু বিরাম নেই। তপন কুনুই এর গুঁতো মেরে বলে, এই ওঠ। কাকটা কা-কা করে ডাকছে যে।

বাসন্তী বলে, আমি কারু কাকাও নয়, জ্যাঠাও নয়।

বাসন্তী ওঠে। উল্টে রাগটা আরও ঘন হয়ে মাথায় চেপে বসে।

তপন বলে, যাও অভ্যাস যখন করেছ, তখন কিছু দিয়ে থুয়ে শান্ত করে এস।

বাসন্তী তপনের কথায় তেলে বেগুনে জ্বলে যায়, তোমারও তো হাত আছে, তুমিও তো দিতে পার। ফলত তপন বিছানা ছেড়ে ঝেড়ে-মেড়ে ওঠে। দরজা খুঁলে। খুলতেই সূর্যের আলোটা একছুটে ঘরের ভিতর।

বাসন্তী এই মাত্র মুখ থেকে বেরিয়ে আসা কথাটা নিয়ে ভাবছে; তোমারও তো হাত আছে, তুমিও তো দিতে পার। কথাটা বলে সে ভালো করেনি। এমন কথা বলার মেয়ে সে নয়। কোনো মন্দে মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছে। বাসন্তী জিভ কামড়ায়। তবু কথাটার কোনো সুরাহা হয় না। তাই চটপট উঠে পড়ে বিছানা ছেড়ে। জানালার কপাটটা খট শব্দ করে খুলে দেয়। শব্দটা শুনেই কাকটা আরও জোরে ডেকে ওঠে।

বাসন্তী জানালা খুলে কাকটার দিকে তাকায়। হ্যাঁ, ওর অনুমানটা ঠিক। কাকটা ট্যাঁক চাঁদাই বটে। মাথার সামনেটায় এক বাহারি ট্যাঁক। কে যেন মাথায় খামচি মেরে তুলে নিয়েছে মাথার পালক!

কাকটা বাসন্তীকে দেখে জানালার দিকে ঘুরে বসে। হয়তো বাবুর তর সইছে না।

বাসন্তী মুখে বিড় বিড় করে, দাঁড়া, ছটফট করিস না। তবু কাকটা চুপ করে না, ছটফট করে। বাসন্তী দরজার বাইরে আসে কলগেট হাতে। তপনকে দেখতে পায় না। কোথায় গেল? এই ছিল। আচ্ছা তপনের অভিমান হয়নি তো? এমনিতেই তপন অভিমানি মানুষ। কিছু একটা হলেই, চোখের পাতা ভিজিয়ে হুস হাস জল বেরিয়ে আসে। এত জল যে কোথায় থাকে কে জানে। হয়তো কোথাও বসে, পা-এর নীচের মাটি ভিজাচ্ছে। ভ্রু কুঁচকে বাসন্তী দাঁতে ব্রাশ ঘষে।

কাল রাতে মাংস হয়েছিল। মাংসের টুকরো দাঁতে। বাসন্তী ব্রাশ দিয়ে সেই টুকরো বার করছে। আর মনে করছে, কাল রাতের ঝগড়ার কথা। পিঁয়াজ রসুন আদা সমেত মাংসের গন্ধটার মতো ঘরটার চারপাশে ঝগড়ার গন্ধটাও ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।

তোমাকে একটা কথা বলব?

কী?

কত দিন গ্রামের বাড়ি যাওয়া হয়নি বলত?

তা হঠাৎ গ্রামের কথা?

যেতে মন করছে, তাই।

চলে যাও।

চলে যাও মানে?

এই সহজ কথাটার মানে বুঝলে না?

না।

তোমার যাওয়ার সময় কখন হবেটা শুনি। সকাল হল তো, চল দোকানে। ভাগ্য ভাল যে তেমন নাম করা দোকান নয়। চা চপের দোকান। চা চপ ছাঁকতে ছাঁকতেই সকাল থেকে সন্ধে। এর মাঝে সময়টা হয় কী করে শুনি? অথচ এইভাবেই কাটিয়ে দিলাম বছরের পর বছর। একটি বারের জন্য ভেবেছ কী করে আছি? সে শুধু তোমার জন্য। না হলে এমন শুকনো মাটিতে পা দিই কোন আদিখ্যেতায়? এই শহরের আকাশে বাতাসে আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে।

এদিকে গ্রামের হাল হকিকত কিছু তোমার জানা আছে?

হ্যাঁ, সব জানি।

কচুটা জান, গ্রাম এখন অস্থির।

হোক অস্থির। তা-বলে ঘরের ছেলে ঘর যাবে না?

তপন আর তর্ক বাড়ায়নি, চোখ বুজে ঘুমানোর চেষ্টা করেছে।

বাসন্তী ওয়াক তুলে মুখ ধুচ্ছে। কলগেটটা আস্ত ফেনা হয়ে পড়ছে ড্রেনে। ফেনাগুলো অজস্র হয়ে ছোট ছোট পাতলা পাতলা বেলুন হয়ে ফুট-ফাট শব্দ করে মিলিয়ে যাচ্ছে। বাসন্তী ফেনার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে রাতের ঝগড়ার কথা ভাবে। রাতের ঝগড়াটা ছোট ছোট পাতলা বেলুন হয়ে ফুট ফাট শব্দ করে মিলিয়ে যায় না কেন!

বাসন্তী তপনের জন্য কেটলিতে চা চড়ায়। আর স্টিলের ডেকচি থেকে বাসি রুটি বের করে কাকটার দিকে ছুঁড়ে ছুঁড়ে দেয়। কাকটা রুটির টুকরো পেয়ে সন্তুষ্ট। আহা রে, দু টুকরো রুটিতেই সন্তুষ্ট কাকটা! আর কাকের এই গুণটা আছে বলেই এখনো পৃথিবীতে এর অস্তিত্ব আছে। না হলে কবে যে কী হত?

কাকটাকে ভাল করে দেখছে বাসন্তী। কাকটা ট্যাঁকচাঁদা। শরীরটাও কেমন যেন রোগা রোগা। গা-এর পালকগুলো না আঁ্যাঁচড়ানো চুলের মতো। হয়তো বয়স বেড়ে গেছে, নয়তো না খেতে পাওয়ার ফল। বাসন্তীর মনটা তপনের জন্য উনানের কেটলির মত বক বক ফুটছে। কোথায় গেল মানুষটা! বাসন্তী ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে, তপন সিঁড়ি ভেঙ্গে হন্ত দন্ত হয়ে আসছে। কী ব্যাপার, তপন হাঁপাচ্ছে কে?

তপন হাঁপাতে হাঁপাতে বলে, নাও তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নাও।

রেডি হয়ে নাও মানে?

মানে আর কি? আমিও গ্রামের বাড়ি যাব। এবং আজই, এক্ষুনি। কতদিন যাইনি সেখানে।

কতদিন পর গ্রামের বাড়ির আসা। তা নয় নয় করে পাঁচ ছয় বছর পর। এর মাঝে যদিও দু একবার এসেছে, তা ঐ ঠিক খেয়ে দেয়ে হাত ধোওয়ার মতো ব্যাপার। এসেছ বেশ করেছ, আবার ঘুরে চল ঐ একই দিনে।

তার ঐ ঘুরে চলা ছাড়া উপায় বা গত্যন্তর নেই। কেন নয়, তপনের তো আর রাজা উজিরের মতো ব্যবসা নয়। ফুটপাথের একধারে একটা চা চপের দোকান। সেই দোকানের কত ঝকমারি। বাইরে পড়ে থাকে টিনের ডেকচি, উনানের কড়াই। পাশে দু চার জনকে দেখার দায়িত্ব দেয়া থাকে, এই যা। যদি কেউ ওদের চোখ ফস্কে নিয়ে পালিয়ে যায় তো উপোস দিয়ে পড়ে থাকা ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না। ফলত আসা আর যাওয়া, এই ছিল এতদিন গ্রামে আসার রুটিন।

কিন্তু এ বারের আসা একটু অন্য ধরনের। দু-চারদিন ঠাঁই জিরোবার মতো আসা। সেই মতো ব্যবস্থা করে, তপন গ্রামের উদ্দেশ্যে পা বাড়িয়েছে।

বাসন্তী আজ কাপড় ছেড়ে পাটের জোড় পরেছে। তপন বাসন্তীর দিকে অবাক চোখে চেয়ে দেখে। চেনা মানুষকে অচেনা লাগে! বাসন্তী এত সুন্দরী!

বাসন্তী প্রদীপ হাতে টুকটুক হেঁটে চলেছে তুলসী তলায়। প্রদীপের আলোয় বাসন্তী যেন একটা অচেনা প্রজাপতি। আর যে রাস্তাটা দিয়ে বাসন্তী হেঁটে চলেছে, সেটা যেন একটা সরু কঞ্চি। সরু কঞ্চির উপর ভর করে, সোজা দাঁড়িয়ে একটা রঙিন প্রজাপতি। বাসন্তীর এলোচুল পিঠময় ছড়িয়ে পড়ছে। চুলে বাতাস লাগছে। জংলি বাতাস। বাতাসে চুলগুলো পৎ পৎ উড়ছে। যেন প্রজাপতি পাখনা মিলেছে। তপনের লোভ হয়, চুপি চুপি গিয়ে পাখনাগুলো ধরার। কিন্তু সাহস হয় না। যদি প্রজাপতিটা উড়ে যায়!

প্রজাপতিটা তুলসী তলায় দাঁড়াল। দাঁড়িয়ে কী করবে? দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কি পাখনা মিলবে? পাখনা তো মিলছেই; সঙ্গে আবার শূন্যে হাত দুটি ঘুরছে। আর মুখ দিয়ে কি এক ধরনের বিড় বিড় করছে। তপন কান খাড়া করে—

সাঁজ দিলাম সলতে দিলাম

স্বর্গে দিলাম বাতি।

সব ঠাকুরের সাঁঝ নাও মা

লমি সরস্বতী।।

বাসন্তীর প্রণাম সারা হলে তপনের আড়ষ্ঠতা ভাঙে। তপন তখন রাস্তার একপাশে। আকাশে চাঁদ উঠেছে। কাঁসার থালার মতো গোল চাঁদ। যেন বা বাসন্তীর হাতে তেল শালপাতা দিয়ে মাজা কাঁসার চাঁদ! তপন চাঁদের আলোয় গ্রামটাকে দেখছে। তালপাতার ছাওনি দিয়ে ঘেরা কালীতলাটা আর শালপাতার নেই। সে এখন ইঁটের গাঁথুনী হয়ে ঝকঝকে কালীমন্দির। নুনটেদের ভাঙা বাড়িটার টিন উঠেছে, চাঁদ খেলছে। মালতিদের ঘুঁটে দেওয়া দেওয়ালে ঘন আলকাতরার প্রলেপ। গনেশের মাটি খাওয়া হেলে পড়া বেলগাছটা, সিমেন্টের রানা।

তপন গাছ থেকে পাতা খসার মত পিঠে বাতাস পায়। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে, না কোনো পাতা নয়, বাসন্তী। বাসন্তী তপনের কাছে এসে, ঘনঘন নিশ্বাস ফেলছে। তপনের সচল ক্যামেরাটা বাসন্তীর মুখে ঠিকরে পড়ে।

বাসন্তীর মুখে চাঁদ। তপন ফ্ল্যাস টিপে চাঁদ ধরে। এ্যালবামের চাঁদ! মানব দেহটাও তো একটা এ্যালবাম! এতবড় এ্যালবাম আর ভূ-ভারতে দ্বিতীয় আছে কি?

বাসন্তী তপনের পিঠে হাত রেখে বলে, আমাদের কার্নিশে বসা ট্যাঁকচাঁদা কাকটাকে আজ দুপুরে দেখলাম।

তপনের বিশ্বাস হয় না, তা কখনো হয় না কি?

বাসন্তী জোর দিয়ে বলে, হ্যাঁ হয়।

না হয় না। তুমি ভুল দেখেছ।

না, আমি ঠিক দেখেছি।

কী করে ঠিক হয়? এখান থেকে শহর কত দূর জান?

দূর তো কি হয়েছে আসতে পারে না কি?

কী করে আসবে?

আমরা কী ভাবে এলাম?

বাসে চেপে।

ও-ও বাসে চেপে এসেছে।

তপন ফিক করে হেসে ওঠে, মাথাটা তোমার খারাপ হয়ে গেছে।

না, মাথাটা খারাপ হয়ে যায়নি।

তাহলে তুমি অন্য কাক দেখেছ।

না সেই কাকটা, ট্যাঁক চাঁদা।

তপন আর কথা বাড়ায় না। বাসন্তীর কথায় চুপ করে, বাসন্তীকে জিতিয়ে দেয়।

ভট ভট শব্দ তুলে একটা মটর বাইক সামনের দিকে ধেয়ে আসছে। তপন সতর্ক হয়, কার মটর বাইক কে জানে?

মটর বাইকটা তপনের কাছে এসে দাঁড়িয়ে যায়।

তপন বলে কে?

মটর বাইকটা কোনো কথা বলে না। কেবল হেড লাইটটা তপনের মুখে বার কয়েক ঘোরা ফেরা করে সোজা চলে যায়।

বাসন্তী তপনের বুকে কুনুই এর গুতো মেরে বলে, কী ব্যাপার বলত?

তপন সন্দেহাতীত মনে বলে, বাদ দাও।

তপন মোবাইল টিপে দেখে, রাত্রি আটটা। এখন গ্রামে তুসুর সময়। কিন্তু তুসুর সুর ভাসছে কৈ? সুর ভাসছে না দেখে, তপন নিজেই তুসু আওড়ায়—

কলা তলায় সুর বালি

পায়রা গম গম করে গো

পাখ নয় মা পায়রা নয় মা

তুসু খেলা করে গো...।

তপন তুসু আওড়ে রাস্তা বরাবর হাঁটতে থাকল। রাস্তার ডান পাশে একটা প্রকাণ্ড খেলার মাঠ। মাঠের পশ্চিম পাড়ে একটা প্রকাণ্ড বকুল গাছ। চাঁদের আলোয় বকুল গাছের পাতা চিকচিক করছে। কোথাও কোথাও গরুর পা এর ছোটখাট ডোবা। দেখে মনে হয় বিরাট গর্ত যেন। বকুলতলা ছেড়ে তপন রাস্তায় উঠল। রাস্তার পশ্চিম মুখ বরাবর হাঁটছে তপন। রাস্তার দু'পাশে আকন্দ গাছের ঝোপ। আকন্দ গাছে সাদা সাদা ফুল ফুটেছে। আর একটু গেলেই ঝুনঝুনি বন। ঝুনঝুনি বনে বাতাসে ঝন ঝন শব্দ। ঝুনঝুনি গাছের মাথায় সবুজ লতার আস্তরণ। আস্তরণ ঘন হতে হতে এক সময় গোটা বনটাই খেয়ে ফেলে সবুজ লতায়। সবুজ লতার শাখা ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে সাদা সাদা ফুল। কিশোরীর নাক ছাবির মতো। যে জায়গায় নাক ছাবি বেশি, সেই জায়গায় সূর্যের আলোও প্রবেশ করতে পারে না, চাঁদের আলো তো দূর অস্ত! তাই সেই জায়গায় বাঘ বা ভালুক লুকিয়ে থাকে তো, তপনের তখন প্রাণটা মাটিতে নামিয়ে দিয়ে, জোড় হাত করে দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া কোন উপায় থাকবে না।

এ রাস্তা তপনের খুব জানা চেনা রাস্তা। চোখ মুদেই রাস্তার সব হাল-হকিকত বলে দিতে পারে, কিন্তু দুই এক জায়গায় তপনের অভিজ্ঞতা সব কিছু ঠিকঠাক মিলছে না। এই যেমন রাস্তার পাশে বেল গাছটার কথা। বেলগাছটা ছিল, কিন্তু এখন নেই। গেল কোথায়? না, রাস্তার এক পাশে লাশ হয়ে পড়ে আছে গাছটা। রাস্তার ডানপাশে প্রকাণ্ড শাল গাছটা কৈ? সেও কি বেওয়ারিশ লাশ হয়ে পড়ে আছে না কি কোথাও? তপন অনুসন্ধানী চোখে রাস্তার দুপাশ দেখে দেখে যাচ্ছে। হ্যাঁ অনুমান ঠিক, একটু দূরে রাস্তার একপাশে পড়ে আছে গাছটা। থাক পড়ে।

তপন হাঁটছে। সামনে দিকে আর একটু গেলে, একটা কুনুই বাঁক। সেই বাঁকের মুখে রাস্তাটা আড়াআড়ি ভাবে কাটা। কাটা দেখে তপনের রাগ মাথায় উঠে; রাস্তাটা কি মগের মুলুক হয়ে গেল না কি?

তপন একটা ছোট লাফ দিয়ে রাস্তার ঐপার পেরিয়ে গেল। রাস্তা বরাবর হাঁটছে তপন। রাস্তার ডানপাশে বড় বড় গাছ দিয়ে ঘেরা একটা ফ্রি প্রাইমারী স্কুল। প্রাইমারী স্কুলে আলো জ্বলছে। কী ব্যাপার! কীসের আলো! তপন আরও কাছে যায়। কাছে গিয়ে দেখে, কয়েকজন পুলিশ সেখানে। তপনের পুলিশকে ভয়। পুলিশে ছুলে আঠারো ঘা!

ফলত তপন বাধ্য হয়ে পেছু ঘুরে। ঘোরা সময় তপনের হাতে কী একটা যেন ঠেকে।

তপনের গা শিউরে ওঠে। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে তপন, না শিউরে ওঠার মতো তেমন কিছু নয়, বাসন্তী। বাসন্তীও তপনের পেছন পেছন হেঁটে এসেছে, তপন তা খেয়াল করেনি। ঘর মুখে দ্রুত হাঁটছে তপন আর বাসন্তী।

পেছন দিকে আবার একটা তীব্র আলো ছুটে আসছে তপনের দিকে। আলোটা এসে তপনের কাছে দাঁড়িয়ে গেল। আবার চলে গেল। বাসন্তী তপনকে পেছন থেকে গুঁতো মারে।

তপন হালকা স্বরে বলে বাদ দাও।

তপন হাঁটতে হাঁটতে ভাবে, বাসন্তীর সাহস বেড়েছে বলতে হয়। বাসন্তী তখন ছোট। সবে স্কার্ট ছেড়ে চুড়িদার পরতে শুরু করেছে। আর তপনের জন্য জাল বুনতে শিখেছে খানিকটা। কিন্তু সেই জালতো যার তার সামনে মিলে ধরা যায় না। একটু লজ্জা সরমের ব্যাপার আছে না। জানা জানি হয়ে গেলে যে বিপদ। তপন অবশ্য চোখের চাওনিতে খানিকটা জেনে ছিল। কেন না, সেও তো জাল বোনার কম কারিগর ছিল না তখন। সেই জালের জোড়া লাগাতে বাসন্তীকে চুপচাপ ডেকেছিল ঝুনঝুনির বন-এ। তপন সন্ধ্যার অনেক আগে থেকেই ঝুনঝুনি বনের ভিতরে ঢুকে বসেছিল। বাসন্তী গিয়েছিল অনেক পরে। তপনের তখন মরার অবস্থা! বাসন্তীও ঝুনঝুনির বনে ঠোঁটে ঝন ঝন শব্দ তুলছিল।

তপন হাসতে হাসতে রাস্তার পাশে বসে গেল। বাসন্তীও তপনের পাশে।

তপন বলে, বাসন্তী তোমার ঠোঁটটা একবার ছুঁয়ে দেখব?

কেনে?

সেই ঝুনঝুনির বনের ঝন ঝন শব্দ হয় কি না?

বাসন্তী হেসে ওঠে, এখনো সেই কথা তোমার মনে আছে?

তপন বলে, থাকবে না, জীবনের প্রথম দিনের কথা কার না মনে থাকে?

বাসন্তী লজ্জায় মরে যায়! শেষে তপনের বুকে আশ্রয় নেয়। বলে, আর যে দিন প্রথম দুজন ধরা পড়ি গনেশ বাবাজির চোখে?

তপন আঁৎকে ওঠে। সে একদিন গেছে, ঝুনঝুনি বন থেকে যেই বার হয়েছি, অমনি দেখি সামনে গজদন্ত।

বাসন্তী বলে, আমি তো তখন কেঁদেই ফেলেছিলাম। নিঘ্যাত মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে। দু হাত জোড় করে মিনতি করেছিলাম, বাবা গনেশ আমরা দুজন দুজনকে ভালোবাসি। আমাদেরকে মের না। কে বলে, বনের পশু মানুষের কথা বুঝে না? কৈ আমাদেরকে সেদিন তো কিছু করেনি!

তপন প্রণাম ঠুকে বলে, ওরা বনের জ্যান্ত দেবতা!

বাসন্তী নীরব হয়ে যায়। চোখ মুদে কী সব ভাবতে শুরু করে।

তপন জিজ্ঞাসা করে, কী সব আকাশ পাতাল ভাবছ?

বাসন্তী কোনো উত্তর করে না।

তপন বলে, একটা কথা বলব বাসন্তী?

কি?

এত অল্প রাতে, গ্রামটা এখন মাঝরাতের আদল কেন?

বাসন্তী নিঃশ্বাস ফেলে।

রাস্তায় লোকজন কৈ?

লোক আছে কোথায়? গ্রাম তো এখন পুরুষ শূন্য।

কেন?

কেন আবার কি? মা-এর মুখে কিছু শুননি?

হ্যাঁ। তাই বলে...

জান, আজ দুপুরে মীনাক্ষীদের বাড়ি গিয়েছিলাম। বাড়ি গিয়ে দেখলাম মীনাক্ষী আর ওর মাকে। গরু বাছুর সব বনে।

তপন কোন কথা বলে না।

মীনাক্ষীকে দেখে মনে হল কার্নিশে বসে থাকা সেই ট্যাঁক চাঁদা কাকটা। মাথার চুল উড়ে বেড়াচ্ছে যত্রতত্র। না খেতে পেয়ে শরীর কাঠ। মাথার ট্যাঁকে কে যেন খামচি মেরে তুলে নিয়েছে একমুঠো চুল!

তপন অবাক!

রাস্তার বুকে আলো ছুটে আসছে। যেন বা কয়েকটা উল্কা পিণ্ড। পৃথিবীটা খান খান হয়ে যাচ্ছে। খান খান হয়ে যাচ্ছে চাঁদের আলো।

আলোটা তপনের কাছে এসে দাঁড়াল।

তপনের তখন অন্য ধারা!

বাসন্তী আলোটার কাছে হাত জোড় করে দাঁড়াল। ঠিক যেমন একদিন গণেশ বাবাজীর সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। মিনতি মুখে, নানান কাকুতি মিনতি করল। আলোটা কোন কথা শুনল না। উল্টে কথা শোনাল, ইউ আর আণ্ডার অ্যারেষ্ট। আপনাকে আমরা মাওবাদী সন্দেহে গ্রেফতার করলাম।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%