সাগরিকা রায়

'ছায়া ছায়া মানুষগুলো সত্যি সত্যি ঘরের চারপাশে ছুটোছুটি করে। কারও মুখ স্পষ্ট নয়। শরীরও। অথচ, ওদের অস্বীকার করা যায় না। আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি যে!'
পরলোক নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। সুমনদার কথা শেষ হতে ঘরের ভেতরে নীরবতা নেমে এল। অমল মল্লিক সূর্য সেন কলোনি থেকে দেশবন্ধুপাড়ায় চলে এসেছে। গতকাল। আড্ডায় হাজিরা দিতে দেরি করে ফেলেছে সে। ঘরের ভেতরে পা দিয়ে স্বাভাবিক ভাবেই অবাক হল। সাধারণত এই ধরনের নীরবতা এই আড্ডাঘরে বেমানান। সম্ভবত সব আড্ডা ঘরেই। সাইকেলের চাবিটা প্যান্টের পকেটে ঢোকাতে ঢোকাতে গলা খাঁকারি দিল অমল—আরে, কী ব্যাপার? এনি প্রব? কেউ অসুস্থ নাকি?
চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে থাকা মৃদুল হেসে উঠল,—অমলদা, দেরি করে ফেলেছেন। জম্পেশ আড্ডা চলছে। বসে পড়ুন ফটাফট। আর কোনো কথা বা টুঁ শব্দ নয় মনে রাখবেন। সুমনদা কৌতূহলী চোখে অমল মল্লিককে দেখছিলেন। এই আড্ডায় তিনি নতুন। সবার সঙ্গে পরিচয়পর্ব চলছে মাত্র।
মৃদুল পরিচয় করিয়ে দিল,—অমল মল্লিক। এখানকার বয়েজ স্কুলের হিস্ট্রির এনসাইক্লোপিডিয়া। মানে টিচার। আর ইনি, অলয়দার বড় জামাইবাবু। আমরা অলয়দার দেখাদেখি সুমনদা বলেই সম্মোধন করি। এক সময়ে ফুড সাপ্লাই ইনস্পেকটর ছিলেন। বর্তমানে রিটায়ার করে আমাদের আড্ডাঘরে জয়েন করেছেন। প্লাস, একটি এনজিও-র সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। এনজিও-র নাম ডানা। ক্লিয়ার? মৃদুল মুচকি হাসে। অমল মৃদুলের দাদার ক্লাসমেট।
—সুমনদা, থামবেন না। তারপর কী হল? জয় অসহিষ্ণু হয়ে পড়ছিল। আসলে পরলোক নিয়ে ও বড্ড ভাবে। ওর কাছে এটা যথেষ্ট ইন্টারেস্টিং সাবজেক্ট। এর ওপরে প্রচুর পড়াশোনাও করে বলে শুনেছি। শ্মশান টশানেও যায়। আত্মা সম্পর্কে ওর কৌতূহল সর্বজনবিদিত।
—আমার একটা অভ্যেস আছে। সুমনদা একটু হাসলেন-আমি রহস্য পছন্দ করি না। যে জিনিসটা আমার কাছে অস্পষ্ট ঠেকছে, আমি তার ছাল বাকল খুলে দেখতে চাই। মনে আছে, সেবারে বর্ধমানে গিয়েছি। বাড়ির সকলেই যাত্রা দেখতে যাবে বলে তৈরি হয়েছে। আগে থেকেই ঠিকঠাক প্রোগ্রাম। আমি পৌঁছতে সকলেই খুশি, কিন্তু শাশুড়ি-মা একটু থতমত খেলেন মনে হল। সন্ধের মুখে শুনতে পেলাম উনি বলছেন—জামাই বলে কথা। তাঁকে ফেলে সবশুদ্ধ যাত্রা দেখতে যাওয়াটা ভালো দেখায় না। আমি থাকছি। তোমরা সকলে যাও দেখে এসোগে।
কথাটা শুনে ফেলে লাফিয়ে পড়ে রীতিমতো জুলুম করে সবাইকেই যাত্রা দেখতে পাঠিয়ে দিলাম। শখ হয়েছে যাত্রা দেখার, সেটা বরবাদ হবে কিনা আমার জন্য? তো, ওঁরা সব চলে গেলেন। দরজা-টরজা বেশ করে সেঁটে আমি ঘুমোতে গেলাম।
অনেক রাতে ঘুমটা ভেঙে গেল! ঘর অন্ধকার। ক'টা বাজে বুঝতে হলে টেবিলের ওপর থেকে ঘড়ি নিয়ে আসতে হবে। মোট কথা বিছানা ছেড়ে উঠতে হবে। মাথার কাছের জানালা খোলা ছিল। বহুদূর থেকে অস্পষ্ট... অতি অস্পষ্ট ক্ষীণ গান ভেসে আসছে। সে সময় যাত্রা বেশি রাতে শুরু হত। শেষ হতে ভোর হয়ে যেত।
সমস্ত বাড়িতে আমি ছাড়া দ্বিতীয় প্রাণী নেই। গভীর ঘুম ঘুমিয়েছি। শরীর ঝরঝরে লাগছে। মনে হচ্ছিল আজ আর ঘুম আসবে না। শীতের রাত। উঠে দরজা খুলে বারান্দায় দাঁড়াব, সে উপায় নেই।
জানালা দিয়ে হু হু হাওয়া আসছে। লেপ ছেড়ে উঠতে ইচ্ছে করছে না। খুব ঠান্ডা হাওয়া আসছে। ওরা যাওয়ার আগে জানালা বন্ধ করতে ভুলে গেছে। আর আমিও ঘুমোনোর আগে লক্ষ্য করিনি। উঠে জানালাটা বন্ধ করতেই হবে। চাদরে জড়িয়ে পটিয়ে উঠলাম। জানালার পাল্লা ধরে টানতেই দেখি, একজন কে বাগানের মাঝে দাঁড়িয়ে হাত-পা নেড়ে কিছু বলতে চাইছে আমাকে!
কে রে বাবা! আমাকে বলছে নাকি? কথা বলছে কি না, বোঝা যাচ্ছে না! কেবল হাত-পা নেড়ে যাচ্ছে! ইশারায় কিছু বলতে চায়? আমার কিন্তু কেমন লাগছিল। বলতে পারো, সন্দেহ হচ্ছিল। আমি যে এসময় জানালার কাছে আসব, এই লোকটি তো জানত না! তাওলে এ কে? কাকেই বা ইশারা করছে? বাড়িতে কেউ নেই!
এখন যেভাবে তোমাদের ঘটনাটি বলছি, তাতে কিন্তু সেদিনের সেই মুহূর্তের অবস্থাটা বোঝাতে পারব না। আমি ভীতু নই। সেই সময়ে জানালার কাছে দাঁড়িয়ে আমার সমস্ত শরীর এক খণ্ড পাথরের মতো হয়ে গেল। নিস্পন্দ। অসাড়। আমার শরীরে তাপ নেই। বুঝতে পারছি না আমার সামনে দিয়ে হাজার হাজার বছর পেরিয়ে যাচ্ছে কিনা!
এভাবে কতক্ষণ ছিলাম জানি না। এক সময়ে কোন এক রাত চরা পাখি চেঁচিয়ে কেঁদে উঠল কোথায়! সেই ডাক কানে আসতেই সম্বিত ফিরে পেলাম। আর আমার ভেতর থেকে সেই পুরনো আমি বেরিয়ে এল। ও কে? আমাকে দেখতে হবে! একটা সড়কি ছিল দরজার কোণে। ওটা সবসময় ওখানেই থাকে। রাতবিরেতে কোনো প্রয়োজন হতে পারে ভেবে আমার শ্বশুরমশাই এই ব্যবস্থা করেছিলেন।
সড়কি হাতে নিয়ে দরজা খুলে বের হলাম। আওয়াজ দিলাম। হেই হেই! দাঁড়া। আমার দরজা খোলার আওয়াজেই ব্যাটা পালিয়েছে ঠিক। কিন্তু অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখি, সে স্থির দাঁড়িয়ে আমাকে দেখছে! শীত মেরুদণ্ড বেয়ে নামতে শুরু করল। আমি দু-পা এগিয়ে যেতে সে হাত পা নাড়তে শুরু করেছে!
অশোক নামে আমার এক বন্ধু ছিল। ও সুইসাইড করেছিল। স্বপ্নে নিজের মায়ের কাছে আসত। এসে গলায় হাত দিয়ে কষ্ট বোঝাত। হাত নেড়ে নেড়ে মাকে কত কথা বলতে চাইত। কিন্তু গলায় ব্যথা বলে বলতে পারতো না! সেই রকমের কিছু কি এসে দাঁড়িয়েছে আমার সামনে! অতৃপ্ত আত্মা!
না। আমি ভয় পেয়ে মরতে রাজি নই। একটা বিকট চিৎকার করে ছুটে গেলাম ওকে লক্ষ্য করে। সড়কি দিয়ে ওর ভয় দেখানোকে ফুঁড়ে দেব।
—তারপর? রুদ্ধশ্বাসে প্রশ্ন করে সুব্রত।
—আর কী! উঠোনের ওপরে যে সুপুরি গাছের চারাটি রয়েছে,আমি জানবো কী করে? বাতাসে দোল খাচ্ছিল ব্যাটা। আর আমি কিনা...!
—ইস, বেকার গেল আপনার চিৎকারটা! মৃদুল চিমটি কাটে।
সুমন হাসলেন। সুমনের হাসি দেখে লজ্জা পেল মৃদুল। সুমনের কাছ ঘেঁষে বসল,—বলুন সুমনদা। আপনি যা বলতে যাচ্ছিলেন...!
সুমন একইভাবে বসে আছেন। চোখের পাতা নড়ছে না। কেবল ঠোঁট নড়ে উঠল,—ভূত কী? ভূত কাকে বলে?
মৃদুল জবাব দেওয়ার দায়টা নিজের ঘাড়ে নিল—ভূত মানে, কোনও মৃত ব্যক্তির আত্মা যখন অশরীরী হয়ে জীবিতদের মধ্যে ফিরে আসে...তখনই তাকে ভূত বলে।
—হয়তো। কিন্তু এখন ধারণা পালটে যাচ্ছে মৃদুল। ভূত একটা অস্তিত্বমাত্র। টিভির ছবি যেমন। অমল মল্লিক জবাব দেন।
—আপনি হয়তো আমার মনের কথাই বলেছেন। সুমনদা অমল মল্লিকের দিকে তাকান—আমার ধারণা ভূত একটি ছায়াময় অস্তিত্বমাত্র। অন্তত আমার অভিজ্ঞতা সে কথাই বলে। ...মাত্র কুড়িবছর আগের ঘটনা। আমি তখন ডুয়ার্সে আছি। একটা ছোট্ট নির্জন জায়গায় রয়েছি। প্রচুর আলো বাতাস, রোদ, মেঘের মধ্যে বাস করছি।
নিখিলবাবু আমার অফিস কোলিগ। আমার জন্য উনি একটি ভাড়া বাড়ি ঠিক করে রেখেছেন। নতুন জায়গা। নিজে দেখেশুনে বাড়ি ঠিক করব, সে উপায় নেই। কাউকে চিনি না। সুতরাং খুশি মনেই সে বাড়িতে গিয়ে উঠলাম মালপত্র নিয়ে। বছর তিনেক থাকতে হবে। বদলির চাকরি।
অভ্যেস আছে এভাবে থাকার, মানিয়ে নেওয়ার। যাকে বলে অ্যাডজাস্ট করে নেওয়া আর কি! নানান জায়গায় যেতে হয়। বসবাস করতে হয়। ভবিষ্যতেও থাকতে হবে।
যাই হোক, ভাড়াবাড়িতে উঠে প্রথম দিনেই কী রকম একটা অস্বস্তি হল। ঠিক বলে বোঝানো যাবে না।। মন হঠাৎ খারাপ হয়ে গেল। বড্ড লোনলি ফিল হতে লাগল। যেন এই দুনিয়ায় আমি একেবারেই একা একটি মানুষ। যার নিকটজন বলতে কেউ নেই। কিচ্ছু নেই। অথচ মন খারাপ হওয়ার সত্যি কোনো কারণ ছিল না!
হাত পুড়িয়ে রাঁধার ইচ্ছে নেই বলে দূরের এক হোটেলে খাওয়ার ব্যবস্থা করেছি। ওখানে হোম সার্ভিস বলে কিছু নেই। দুপুরে হোটেলে খেয়ে এলাম। মন্দ নয় রান্না। ঝালটা একটু বেশি। ভাবলাম, রাতের খাবারে ঝাল যাতে কম দেয়, সেটা বলে রাখি। পরে বলতে ভুলে গেলাম। ভাড়া বাসায় ফিরে ঘরের তালা খুলছি, বাড়িওলি মাসিমাকে দেখলাম জানালা দিয়ে উঁকি মেরে আমাকে দেখছেন। হেসে বলি-কি মাসিমা, খাওয়া-দাওয়া হল?
মাসিমা কীরকম একটু যেন থতমত খেলেন বলে মনে হল। পরক্ষণেই সামলে নিলেন- হ্যাঁ,—তা বাবা, তুমি কি হোটেলেই খাবে?
—হ্যাঁ, রাঁধতে ভালো লাগে না।
—একটা রান্নার লোক রেখে নিলেই পারো। একজন আছে। রাঁধে ভালো। ঘর ঝাঁটপাট দেবে। লাগলে বলো।
ভাবলাম, মন্দ কী? একজন কাউকে পাওয়া গেলে আমার পরিশ্রম বাঁচে। ঠিক করলাম, দুদিন পরেই মাসিমাকে জানিয়ে দেব নাহয়।
দরজা খুলে ঘরের ভেতরে ঢুকেছি,কী যে সুন্দর গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে ঘরের মধ্যে! কী ব্যাপার? কীসের গন্ধ? আমি তো ধূপ জ্বালিনি! নাক টেনে শুঁকেও বুঝতে পারলাম না। মনে মনে হাসলাম। পরি বা জিন-টিন কিছু ঢুকেছিল নাকি ঘরে?
অদ্ভুত হল, খুব ঘুম পাচ্ছিল। দুপুরে ঘুমনোর অভ্যেস নেই কোনও কালে, হঠাৎ করে তীব্র ঘুম পেতে লাগল। ঘুমিয়েও পড়লাম। দিন দুপুরে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলাম।
ঘুম যখন ভাঙল, ঘরের ভেতরে অন্ধকার নেমে এসেছে! কিন্তু ঘরের ভেতরে কোথাও একটা আলো আছে, যার প্রভা সমস্ত ঘরটিকে হালকা আলোকচ্ছটায় ভরে রেখেছে। অথচ, আলোর উৎসস্থলটিকে দেখতে পাচ্ছি না। কিন্তু বুঝতে পারছি আলো আছে এখানে। মানে মানসিক অবস্থাটা এই রকমই। খুব মায়াময় গন্ধ ভাসছে ঘরের ভেতরে। চেনা চেনা গন্ধ। কিন্তু ধরতে পারছি না কীসের গন্ধ।
আশ্চর্যের ব্যাপার হল আমি উঠে বসলাম যখন, দেখি আমার জিনিসপত্র কিছু ঘরে নেই! বুঝতে পারছি না, আমি কি ঘরের দরজা খুলেই ঘুমিয়েছিলাম? চুরি হয়ে গেছে সব? ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি, দরজা আগের মতোই বন্ধ। তাহলে? বুঝুন আমার মনের অবস্থা! এই ঘরে কে ঢুকেছিল?
আলো আর ছায়ার অপূর্ব মিশ্রণ ঘটেছে এখানে। ক্রমেই আলোর ভাগ কমে আসছে। অন্ধকার গাঢ় হয়ে উঠছে। ঘন হচ্ছে। সেই অন্ধকারে ছায়া ছায়া কাদের যেন আবির্ভাব ঘটল! এরা কারা... কখন ঘরে ঢুকেছে?
আমি বুঝতে পারছি না ঠিক কখন থেকে এদের দেখছি। আমি অনেকক্ষণ ধরেই কি এই ছায়াদের দেখেছি? নাকি এরা এই কিছু সময় ধরে এখানে এসেছে? জানি না! মনে হচ্ছে যেন অনন্তকাল ধরে আমি একই জায়গায় বসে আছি!
দেখছি ছায়া ছায়া মানুষ ঘরের চারপাশে ছুটোছুটি করছে! ছুটোছুটি? না কি ভাসছে বাতাসে! ওদের পা কি মাটিতে পড়েছে? হালকা হালকা ঘুরে বেড়াচ্ছে ঘরের এদিক থেকে ওদিকে! কারও মুখ স্পষ্ট নয়। সকলে যেন ধোঁয়া দিয়ে তৈরি। আরও আশ্চর্যের ঘটনা হল, আমার উপস্থিতি সম্পর্কে কেউ সচেতন নয়! আমি যে এখানে,এই খাটে মানে চৌকিতে বসে আছি, কেউ জানেই না! দেখতেই পাচ্ছে না আমাকে!
ওরা কী করছিল? জানি না। মনে হচ্ছিল, ওরা সবাই যেন খুব খুব ব্যস্ত। প্রচণ্ড ব্যস্ত। এই ব্যস্ততাটা ঠিক কী রকম জানেন? মনে করুন, বাড়িতে হেভিওয়েট গেস্ট আসবেন। তার জন্য যে প্রস্তুতি নেয় মানুষ, সেই রকম ব্যস্ততা। ভাবলাম, এরা কারা? এই ঘরে কী করছে?
মাসিমা আমাকে এই ঘর ভাড়া দিয়েছেন। এরা পারমিশন না নিয়ে ঢুকেছে কেন? মোট কথা ভীষণ রাগ গুমরে উঠছিল আমার মধ্যে। তাছাড়া এমন ঘটনার কথা আমরা অনেক শুনেছি। এই ঘরে নিশ্চয় এমন কোন অপার্থিব প্রাণীর আবির্ভাব হয়। নাহলে এমন ঘটনা ঘটে যাচ্ছে কেমন করে?
সেই মুহূর্তে নিশ্চিন্তে বসে এতসব কথা ভাবছিলাম কী করে জানি না। অসম্ভব ঠান্ডা ঘর। ভীষণ শীত করছে আমার। একবার মনে হল আমি যে ঘরে বসে আছি, এটি জলের তলে! সোঁদা গন্ধ পাচ্ছি বুকের ভেতর থেকে! শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। ঘোর লেগে যাচ্ছে!
সব তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছিল। এই সময় কেউ একজন আমাকে ভেদ করে চলে গেল যেন নাকি আমার কাঁধ ঘেঁষে ভেসে গেল! আমি চেঁচিয়ে উঠলাম,—এই! এই! কে? তোমরা কে? কী হচ্ছে আমার ঘরে?
কিন্তু কিচ্ছু হল না। আমার গলার স্বর কারও কানে ঢুকেছে বলে মনে হল না। যেমনটি চলছিল, তেমনই চলল। এরা কি ডাকাত? তাহলে আমাকে কেন দেখতে পাবে না? নাকি না দেখার ভান করে যাচ্ছে? না, সেটাই বা হয় কী করে!
আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছিলাম ক্রমশ। ভীষণ ঠান্ডা, সেই মধুর গন্ধ, শিনশিনে অনুভূতি, আলো, ছায়া ছায়া প্রাণীদের হাঁটা চলা...সবটা মিলিয়ে অসাড় হয়ে পড়ছিলাম। যেন অযাচিত ভাবে অন্যলোকে ঢুকে পড়েছি আমি। কার একটা সুগন্ধি হাত আমাকে আলতো ছুঁয়ে গেল! স্পষ্ট শুনতে পেলাম কেউ একজন হালকা পায়ে চলে গেল। রিনরিনে হাসির শব্দ!
ভয়? পেয়েছিলাম সেদিন। তীব্র ভয় পেয়েছিলাম। বুক কেঁপে উঠেছিল। হাসির শব্দে কেমন আকর্ষণ ছিল, সে বোঝানো যাবে না! যে এসেছিল, সে আমাকে ইশারা করে আড়ালে চলে গেল। বলে গেল ইশারায় আড়ালে যেতে! যেন কিছু গোপন কথা আছে!
আমি উঠে তাড়াতাড়ি করে তার পিছু নেব বলে খাট থেকে নেমে চারদিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে দেখি, কোথাও সে নেই! আমাকে ডেকে সে নিজে কেন লুকিয়ে পড়ল!
বুঝতে পারছি না আমি কি কোনো মায়াবী দুনিয়ায় ডুবে যাচ্ছি? কারা আমাকে নিয়ে মেতে উঠেছে মজার খেলায়! অযথাই ঘরের একপাশ থেকে অন্যপাশে ছুটোছুটি করতে থাকি।
নিজের অসহায় অবস্থা দেখে নিজেরই কান্না পাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল খুব আপনজন আমার থেকে দূরে লুকিয়ে আছে! পাগল পাগল লাগছে! কী করব, কাকে বলব, কিছু মাথায় আসছে না!
আস্তে আস্তে ঝিমিয়ে পড়তে শুরু করলাম। খুব ঘুম পাচ্ছিল। যেন নিজের হাত দেখতে পাচ্ছি না এমন ভাবে চোখ বুজে আসছে! হিপনোটাইজড হয়ে পড়েছিলাম।
এভাবে কতক্ষণ কেটে গেছে, জানি না! কে যেন আমাকে বহুদূর থেকে ডাকছিল। কারা নরম ধোঁয়াটে আঙুল ছুঁইয়ে রেখেছে আমার গায়ে। সেই আঙুল আমার রক্ত-মাংস ভেদ করে ঢুকে পড়েছে ভেতরে, আরও ভেতরে। আঙুলের স্পর্শ বরফের ছুরির মতো ঠান্ডা, ধারালো, যন্ত্রণাদায়ক।
যন্ত্রণায় আমি চিৎকার করে উঠলাম। কেউ বোধহয় আমার যন্ত্রণাকাতর চিৎকার শুনতে পেল না। ক্রমশ আমি অতলে তলিয়ে যাচ্ছিলাম। চোরাবালি স্তুপ করা আছে। আমি তার ভেতরে ডুবে যাচ্ছি, এমন অনুভূতিতে অসাড় হয়ে পড়ছিলাম। মৃত্যু খুব কাছ থেকে আমাকে ডাকছে,—আয়!
এই আয়-ডাক ক্রমশ কাছে, খুব কাছে এসে আমার সামগ্রিক চেতনাকে তীব্র নাড়া দিচ্ছিল। আমি জেগে উঠছিলাম বা আমার সমস্ত চেতনা ফিরে আসছিল। অনুভব করলাম কেউ আমাকে ডাকছে। আমার গায়ে তার স্পর্শ টের পেলাম। আমাকে ধাক্কা দিচ্ছে জোরে জোরে!
প্রথমটা কিছু বুঝতে পারিনি! চোখ মেলে কিছু চিনতে পারছিলাম না। খুব ধীরে মানুষের অবয়ব সামনে আসছিল স্পষ্ট হয়ে। কেউ একজন মুখের ওপর ঝুঁকে আছে,—শুনছেন? এই যে!
কে এক অচেনা মানুষ আমাকে ডাকছে! কেন ডাকছে? কে এ?
—চোখে মুখে জলের ছিটে দাও। কে বলে উঠল।
ঠান্ডা জলের ঝাপটায় আমি নিজেকে ফিরে পাচ্ছিলাম।
—কী হয়েছে আমার? বোধহয় নিজেকেই প্রশ্ন করছিলাম।
—একটু অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। কে যেন জবাব দিল,—এখন কেমন বোধ করছেন?
—অসুস্থ? আমি? না তো! আমি তো এ ঘরে...! পুরোটা বলতে গিয়ে এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিল।
ডাক্তার নিয়ে এসেছিলেন আমার বাড়িওলা। স্থানীয় লোক। বয়স্ক। সৌম্য চেহারা। দেখলেন আমাকে। কী ওষুধ দিয়েছিলেন, এখন আর মনে নেই! গরম দুধ খাওয়াতে বলেছিলেন।
আমার কিন্তু আচ্ছন্ন ভাবটা কাটেনি দুদিন ধরে। কেমন ঘোর লাগা অবস্থায় চলা ফেরা করতুম। কিছু ভালো লাগত না। যেন আমি অন্য জগতের। জোর করে আমাকে এখানে ধরে রেখেছে। আমার সঙ্গে মামুলি কথা ছাড়া অন্য কিছু জানতে চায়নি কেউই।
তিনদিনের দিন স্নান করে বেরিয়েছি বাথরুম থেকে, একটু ঝরঝরে লাগছে। মাসিমা ডেকে বললেন,—চা খাবে? চা করছি। এসো। আজ রবিবার। তাড়াহুড়ো নেই। আর হোটেলে খেতে যাবে না কয়েকদিন। আমার রান্না খাও।
শুনে কান্না পেল বুড়ো বয়সে। মা এমন ভাবেই তো বলতেন। যাই হোক, চা খাচ্ছি, বাড়িওলা মেসো কিন্তু কিন্তু করে জিজ্ঞাসা করে ফেললেন,—কিছু যদি মনে না করেন, কী হয়েছিল সেদিন?
—হোটেলে খেয়ে এলে, আমার সঙ্গে কথা বললে তারপরে কী কাণ্ড! মাসিমা চোখ কপালে তুললেন।
—কী কাণ্ড? আমি জানতে চাইলাম।
—আরে, সন্ধে পেরিয়ে গেল রাত হল তোমার দরজা আর খোলে না! আমি ওনাকে জানালাম। উনি ডাকাডাকি করলেন। দরজায় ধাক্কাধাক্কি...কোনো সাড়া নেই! বোঝো আমাদের অবস্থা! পাড়ার লোক ডাকতে হল! বুঝতে পারছি না কী ফ্যাসাদ বাঁধিয়ে বসেছ! ক্লাবের ছেলেরা এসে দরজা ভেঙে ফেলল। মাসিমা সবিস্তারে জানান। দরজা ভাঙার পরে দেখা গেল, সুমনদা বিছানায় শুয়ে আছেন। গোঙাচ্ছেন। শরীর ঠান্ডা।
একটু দম নিলেন সুমনদা। জল খেলেন। অন্যমনস্ক চোখে ফের শুরু করলেন,—এই ঘটনার পরে আমি ছুটি নিয়ে বাড়িতে চলে গেলাম। দিন পনেরো পর ফিরে আসি। শরীর তখনও বেশ দুর্বল। মনমরা হয়ে থাকি! কী যে হয়ে গেল আমার মধ্যে! নিজেই বুঝতে পারছি না।
একা থাকতে খুব ভয় হয়। সন্ধের আগেই জোরালো আলো জ্বেলে দরজা জানালা বন্ধ করে থাকি। বন্ধুদের ঘরে ডাকি। বন্ধু বলতে আমার মধ্যে দুজন। মাসিমা, মেসো আসেন। কিন্তু রাতে আমি একা! আলো জ্বেলে জেগে থাকি। ওহ! সে এক সময় যা গেছে! আজও সেকথা মনে পড়লে গায়ের লোম খাড়া হয়ে ওঠে। সুমনদা থামলেন। কিন্তু রহস্য উন্মোচিত হল না। উনি কী দেখেছিলেন সেদিন? স্বপ্ন? হয়তো তাই।
—স্বপ্ন? আমি জানি না ভাই! স্বপ্ন কি জেগে দেখা যায়? কেউ দেখেছে? বিছানায় বসে থেকে স্বপ্ন দেখা? প্রায় দশ-বারো মিনিট ধরে?
—কেন নয়? অনেক বেশি সময় ধরে স্বপ্ন দেখেছে এমন অনেকেই আছে। জিজ্ঞাসা করে দেখুন। মৃদুল বাকিদের দিকে তাকায় সমর্থনের আশায়।
—কিন্তু বল তো, স্বপ্ন হলে কি এমন নিখুঁত ভাবে দেখা যায়? জয়ন্তর চোখ দুটো চশমার আড়ালে চকচক করে। ঠিক কথা। যেভাবে সুমনদা ঘটনাটার বর্ণনা করলেন, তাতে মনেই হয় না এটা স্বপ্ন ছিল! আবার একে সত্যি বলে ভাবতেও অস্বাভাবিক লাগছে!
—আসলে কী হয়েছিল জানো? জীবনে দ্বিতীয়বার অমন ঘটনার সম্মুখীন হইনি। স্বপ্নও দেখিনি। তাই ঘটনাটাই ভুলে যাওয়া উচিত ছিল। স্বপ্ন হলে ভুলে যেতাম। মানুষ তো কত ভয়ঙ্কর স্বপ্ন দেখে থাকে। প্রথম কিছুদিন মনে রাখে। পরে অবধারিতভাবে ভুলে যায়। মনে থাকলেও ধীরে ধীরে অস্পষ্ট হয়ে যায়। পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মনে রাখা যায় কি? যায় না। আমার ক্ষেত্রে তা হয়নি! জানি না তোমরা কী বলবে!
—আপনি কখনও জানতে চাননি? ঘটনাটি ওই ঘরে কেন হল! মানে, এরকম শোনা যায় তো! কোনো ঘরে যদি আত্মা থাকে, তবে এসব কাণ্ডকারখানা হয় বলে শোনা গেছে। অলয়দা মতামত জানাল। এতক্ষণ চুপচাপ থেকে শুনছিল। সুমনদা অলয়দার জামাইবাবু যখন, ঘটনাটা নিশ্চয় আগে শুনেছে। আড্ডার মেজাজ ধরে রাখতে প্রশ্নটা করেছে। আমার সেটা মনে হল।
—আমি মাসিমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম। উনি অবাকই হয়েছিলেন। এমন কোনো অশুভ কিছু ও ঘরে হয়নি বলেই তিনি জানেন। মেসোমশাইও কিছু জানেন না। কোথাও, কারও কাছ থেকে কোনও সদুত্তর পাইনি।
ব্যস? আপনি বাইরের লোকদের জিজ্ঞাসা করতে পারতেন! হয়তো ভাড়াটে হারাবার ভয়ে ওঁরা কিছু লুকোচ্ছেন!
—হয়তো। আমি কিচ্ছু বুঝতে পারিনি। মাসিমাকে অবিশ্বাস করতে পারিনি। ওই বাড়িতে বহুদিন ছিলাম। অন্য ঘরে। সেই ঘরে কেন ছিলাম না জানতে যদি চাও, তো বলি, অস্বস্তি যায়নি আমার তখনও। একা ও-ঘরে থাকতে পারতাম না। সত্যি বলতে আমার মধ্যে ত্রাস সঞ্চিত ছিল ওই ঘর নিয়ে।
মাসিমা ওই ঘরটিতে তালা মেরে রেখেছিলেন। পরে একদিন পুজো টুজো দিলেন। কয়েকদিন পরে ভাড়াটে এল। স্বামী স্ত্রী। ভালোই ছিলেন ওঁরা ও-ঘরে। কোনো ঝুট ঝামেলা হয়নি।
মাসিমা আমাকে বলে রেখেছিলেন, আমি যেন কোনো কথা না বলি ওঁদের। আর আমিও ভাবলুম, দেখা যাক,ওঁরা ভয় পান কিনা। কিন্তু দুবছরের মধ্যে কিচ্ছু হল না। ভাড়াটেরা ভালোই ছিলেন ওখানে। সুমনদা থামলেন।
অমল মল্লিক নিবিষ্ট চোখে সুমনদাকে দেখছিলেন। কিছু বলতে মুখ খুলেছিলেন। সুমনদা চোখ তুলে তাকাতে চুপ হয়ে গেলেন।
সুমনদা অল্প হাসলেন,—ঘটনাটা হয়তো সত্যি আমি একদিন ভুলে যেতাম। কিন্তু ভুলতে পারলাম না! আমার ছেলের বিয়ের দিন...! চারবছর আগের ঘটনা। দীর্ঘ চব্বিশ বছর পর আমি যেন ডুয়ার্সের সেই ভাড়া বাসায় ফিরে গেলাম।
সেদিন খুব ঠান্ডা পড়েছে। শীতকাল এমনিতেই। ঘরদোর সাজানো গোছানো চলছে। নতুন বউ এসে যে-ঘরে থাকবে, সে ঘর রংচং করা হয়েছে। আসবাব গোছানো চলছে। নতুন রঙের মধ্যে কোনও একটা সুগন্ধী আছে। মন কেমন করা গন্ধে আবিষ্ট হয়ে পড়ছি। কেন জানি না, গন্ধটা আমার কাছে চেনা চেনা লাগছে! এই গন্ধ আমি আগেও পেয়েছি...!
লোকজন কাজ করছে। ছুটোছুটি চলছে ঘরের মধ্যে। আমার খুব শীত করছিল। এক পাশে দাঁড়িয়ে দেখভাল করছি। নতুন বউ-এর জন্য একখানা বেডসাইড ল্যাম্প আনা হয়েছে। তাকে দেখা যাচ্ছে না। একটু আড়ালে আছেন বাতি মহাশয়। কিন্তু তার শরীর থেকে বিচ্ছুরিত আলো ঘরের মধ্যে ছড়িয়ে আছে।
একটা স্বপ্নিল আলো! সেই আলো-ছায়ার মধ্যে যারা কাজ করছে, তাদের স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। ছায়া ছায়া! কারও মুখ স্পষ্ট নয়। অথচ তাদের অস্বীকার করাও যায় না। ছায়া ছায়া মানুষগুলো ঘুরে ফিরে বেড়াচ্ছে খুব ব্যস্ততা নিয়ে! অদ্ভুত ভাবে চেনা একটা ছবি আমার সামনে! হুবহু এই ছবি আমি দেখেছিলাম মাসিমার বাসায়!
অনেক বছর পেরিয়ে সেই সন্ধে ফিরে এল আমার সামনে! এই ছবিই আমি দেখেছিলাম! জানি না কী করে সম্ভব হল এটা! অনেক বছর আগে একা নির্জন ঘরে ভবিষ্যতের ছবি নেচে উঠেছিল আমার সামনে! আমি বুঝতে পারিনি। ভয় পেয়েছিলাম। কী করে এমন হয়েছিল? জানি না। কে যেন ভবিষ্যৎ, বর্তমান, অতীত...সব কিছু গুছিয়ে রেখেছে আমাদের জন্য।
সুমনদার কথার জবাব দেওয়ার কিছু ছিল না। আড্ডাঘর নিশ্চুপ হয়ে আছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন