টান

সাগরিকা রায়

‘তার মানে, তুমি ভয় পেয়েছিলে ঝর্ণা হোটেলের স্বপ্নটা দেখে? সুপর্ণা চিমটি কাটল। শুভব্রত একটুক্ষণ চুপ করে থাকল। আমরা ওদের দিকে তাকিয়ে। এখনই না খণ্ডযুদ্ধ বেঁধে যায়। শুভব্রত অবশ্য কোনও স্কোপ দিল না—'আমার স্বপ্নটা এখনও শেষ হয়নি। রাস্তায় যেতে যেতে এমনিই কৌতুহলী হয়েই কুলিকে জিজ্ঞাসা করলাম—ঝর্ণা হোটেল চেনো?

কুলি ঘাড় নাড়ে—হ্যাঁ জি!

—কোন দিকে?

ঘাড় বাঁকিয়ে ডানদিকের সরু রাস্তাটা দেখাল কুলি।

—উধার! পর, আজ তো বন্ধ হ্যায় হোটেল!

—কিঁউ?

—মালিক কা দেহান্ত হুয়া না!

—কব?

—আজই! দো পহরমে!

সেদিন দুপুরবেলা হোটেলের মালিকের মৃত্যু হয়েছে। আর আমি শহরের নবাগত মানুষটি সেকথা জেনে ফেললাম সন্ধের স্বপ্নের মধ্যে। এর কী ব্যাখ্যা দেওয়া যায় রতনদা?

রতনদা জবাব দিলেন না। বস্তুত এসব প্রশ্নের জবাব কেউ দিতে পারে না। অমলদা মাংকিক্যাপের ভেতরে মুখ লুকিয়ে চোখ বুজে আছেন। কোন ভাবনায় বুঁদ হয়ে আছেন কে জানে। মানুষটা স্বল্পভাষী। যেটুকু বলেন, ভেবেচিন্তে। ভাবলাম অমলদাকে ডেকে প্রশ্নটা করি। এই মাত্র যে প্রশ্ন করেছে শুভব্রত। রতনদাকে।

'এর জবাব আমারও জানা নেই। কত কী ঘটনা ঘটে যায় আমার চারপাশে। যার কোনও ব্যাখ্যা নেই। ভেবেছিলাম সেসব কথা আর প্রকাশ্যে আনব না। কিন্তু, মনে হচ্ছে বলেই ফেলি। কতকাল আর লুকিয়ে রাখব!'

'সাংঘাতিক কিছু নাকি?' সুপর্ণা শালের ভেতরে নিজেকে ঢেকে নিয়েছে। ওর কথাগুলো অস্পষ্ট শোনাল।

'সাংঘাতিক? তা বলতে পারো। যদিও আমার পিসিমাও খুশি ছিলেন না। জীবনটা তাঁর অভিশপ্ত বলে মনে করতেন তিনি।' তাহলে খুলেই বলি।

প্রায় তিরিশ বছর আগেকার ঘটনা। আমরা তখন থাকি কলকাতায়। দমদমে। নাগের বাজারে। ভাড়া বাড়িতে থাকতাম। আমি, বাবা, মা, দিদি, আর পিসিমা। ছেলেবেলায় বিয়ে হয়েছিল পিসিমার। অল্প বয়সে বিধবা হয়ে আমাদের কাছে ফিরে এসেছিলেন। আমার জন্মেরও আগের কথা সেসব।

মনে আছে পিসিমাকে খুব নিঃসঙ্গ মনে হত মাঝে মাঝে। ছাদে উঠে সন্ধেবেলা চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতেন। অনেকবার ডাকলে তবে চমকে উঠে সাড়া দিতেন। মা বলতেন—সংসার করতে পারেনি। অথচ মনের ভেতরে সে ইচ্ছেটা পুরোপুরি ছিল। তাই পিসিমা ওরকম অন্যমনস্ক। হয়তো, তাঁর ফেলে আসা সংসার, স্বামী নিয়ে ভাবতেন! এভাবেই কেটে যেত।

কিন্তু একদিন একটা কাণ্ড হল। আমার মা কোনও একদিন রাতে শুনতে পেলেন পিসিমা কাঁদছেন। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন পিসিমার ঘরটা ছিল আমার ঘরের পাশেই। সেখানে ঠাকুরের আসন ছিল। আমার দিদি বকুল পিসিমার সঙ্গে ঘুমত। মা ঘরে ঢুকে দেখেন পিসিমা ঘুমের ভেতরে, বোধহয় স্বপ্ন দেখে কাঁদছেন। ডাকাডাকি করার পর পিসিমা জেগে উঠলেন। কথাবার্তায় বাবা, দিদি, আমি সবাই জেগে উঠেছে। কী হল পিসিমার? পিসিমা ঘুম ভেঙে খুব অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন। প্রথমে কিছুই মনে করতে পারেন না। তারপর বোধহয় সামলে নিলেন। বাবার দিকে তাকিয়ে বললেন, 'অমুকে নিয়ে বড্ড বাজে স্বপ্ন দেখেছি রে। ওকে একটু সাবধানে রাখিস!' অমু অর্থাৎ আমি। অমল।

মা-র মুখ শুকিয়ে গেল। কী সর্ব্বোনাশ। কী স্বপ্ন গো? বাবা অবশ্য কড়া ভাবে ম্যানেজ করলেন—'দেখ, স্বপ্ন দেখেছ ঠিক আছে। কিন্তু, এসব নিয়ে বাড়াবাড়ি কোরো না। সারাক্ষণ আজেবাজে ভাবনা ভাবো। নানান দুশ্চিন্তা করো। এসব স্বপ্ন তোমরা দেখবে না তো কে দেখবে?'

বাবার ধমকে তৎক্ষণাৎ কাজ হল। সবাই যে যার মতো শুয়ে পড়ল। কিন্তু মা ভোলেনি। পরদিন ভোরেই পিসিমাকে ডেকে মা বুদ্ধি দিল—যাও গিয়ে জলের সামনে দাঁড়িয়ে স্বপ্নটা বলে দাও। মা গঙ্গার নাম নিও।

পিসিমা মা-র কথা শুনে চলে গেলেন। জলের সামনে দুহাত জোড় করে দাঁড়িয়ে বিড় বিড় করে কী যেন বলছিলেন পিসিমা। আজও সে দৃশ্যটা চোখের সামনে ভাসছে। ঠান্ডার মধ্যে ভিজে পায়ে জল ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে আছেন পিসিমা। আমার মঙ্গল কামনায় প্রার্থনা করছেন। পরে সন্ধের দিকে বাবার অনুপস্থিতিতে মা পিসিমাকে স্বপ্নের জিজ্ঞাসা করেছিল। পিসিমা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলেছিলেন, 'বড় বাজে স্বপ্ন! বলতে মুখে বাধে। তবে, ওকে জলের সামনে যেতে দিও না।'

অর্থাৎ, আমি জলে পড়ে হাবুডুবু খাচ্ছি—এই রকম একটা স্বপ্ন দেখেছেন পিসিমা। স্নেহে অন্ধ বলেই এত ভয় এদের। মনে মনে হেসেছিলাম। বিজ্ঞান টিজ্ঞান ভালো করে জানে না। তাই এত ঝামেলা!

এই ঘটনার দিন দশেক পরের ঘটনা। আমি, পঞ্চসায়র-এ বেড়াতে গেছি। অলক্তর দাদু ওখানে বাড়ি করেছেন। গৃহপ্রবেশের নিমন্ত্রণ। জায়গাটা খুব সুন্দর। গড়িয়াতে! পাঁচটি সায়রের সমাবেশ। সায়র অর্থ লেক। পুকুর। তখন ঠান্ডা পড়েছে। ভোরবেলায় পুকুরের জল থেকে বাস্প উঠত। গরম ধোঁয়া যেন। রহস্যময় মনে হত।

একদিন ঠিক হল অলক্ত আর আমাদের আর একজন বন্ধু মঞ্জিল মিলে সাঁতার কাটবে। আমার কাজ হবে ওরা কতক্ষণ সাঁতার কেটেছে তার সময়টা নোট করে রাখা। অলক্তর দাদুর একটি স্টপওয়াচ ছিল। সেটা, কী করে যেন হাতিয়ে আনল। ওটা থাকল আমার হাতে। আমি চেঁচালাম—স্টার্ট!' ওরা ঝপাং করে ঝাঁপিয়ে পড়ল। পুকুরের ঠান্ডা জলে।

ওরা দুজনে সাঁতার দিচ্ছে নানা ভঙ্গিমায়। আমি পাড়ে বসে শীতে কাঁপছি। গায়ে সোয়েটার। পায়ে মোজা। তো, ছেলেবয়সে মানুষ অনেক কিছু হিসেব করে চলে না। বয়সটা আমাদের কম ছিল। কৈশোর পার হয়েছি সদ্য। গোঁফের রেখা দেখা দিয়েছে।

আমি পাড়ে দাঁড়িয়ে ওদের উৎসাহিত করার জন্য চেঁচাচ্ছি, 'দারুণ হচ্ছে! দুর্দান্ত...বাঃ বা!' ইত্যাদি আবেগ সূচক বাক্য উৎসারিত হচ্ছে আমার গলা থেকে। এই সময়ের অলক্ত আর মঞ্জিলের মধ্যে সামান্য বাক্যবিনিময় হতে দেখলাম। তবে, শুনতে পেলাম না। আরও দেখলাম, আলক্ত সাঁতরে পাড়ের কাছে এসে ইসারায় আমাকে ডাকছে। কী ব্যাপার? কিছু চাই নাকি?

এগিয়ে গিয়ে কোমর ভাঁজ করে নীচু হলাম। ও হাত বাড়াল। উঠতে চাইছে? শরীর খারাপ নাকি? আমার হাত ধরে উঠবে? আমি হাত বাড়ালাম। ও শক্ত করে আমার হাত ধরল। তারপর এক হ্যাঁচকা টানে একেবারে জলের ভেতরে আমি। দুজনে জোরে ভেসে উঠেছে—পাড়ে বসে কাঁপুনি? 'আসল কাঁপুনি কাকে বলে দ্যাখ এবার।'

সাঁতার জানি না। এক্ষুনি ডুবে যাব। মৃত্যুর সম্মুখীন হয়ে বাঁচার আকাঙ্খায় মানুষ কী কষ্ট যে পায় সেইদিনেই বুঝতে পেরেছি। এই সময় একটা লোক গরু নিয়ে যাচ্ছিল লেকের পাশ দিয়ে। সে বুঝতে পারল আমার অবস্থাটা। চিৎকার করে সে নিজেই জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ততক্ষণে ওরা দুজনেই ঘটনার গুরুত্ব বুঝে ফেলেছে। তিনজনে মিলে আমাকে টেনে পাড়ে তোলে।

জলটলও খেয়ে ফেলেছিলাম যথেষ্ট। তো, ঘটনা হল, আমার পিসিমা। সেদিন থেকে পিসিমাকে আমি অন্যভাবে দেখতে শুরু করলাম। বাবা যদিও এসব মানেন না, 'কাকতলীয়...সমাপতন...' বলে স্বপ্নের গুরুত্বকে হালকা করে দিলেন, কিন্তু আমার মনে হয় বাবার মনের কোণেও একটু রেখাপাত করেছিল। আমার মা আর পিসিমা স্বয়ং ভীষণ আতঙ্কিত হলেন। বাড়িতে পুজো আচ্চা চলল। এখানেই শেষ হল না! কয়েকদিন পরই, তখন ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ, সরস্বতী পুজোর দিন সকালে উঠে পিসিমা বলেন—অমু! আজ নিজে হাতে খিচুড়ি ভোগ রাঁধবি বাবা?'

'ভোগ রান্না? আমি? আমি তো...—' জানি আমি তোকে সব দেখিযে দেব। রাঁধ। মা সরস্বতী খুব খুশি হবেন। দেখিস।'

ব্যাপারটা বেশ অ্যাডভেঞ্চারাস! নতুন একটা কাজ, যেটা কখনও করিনি, ভবিষ্যতেও করব কিনা ঠিক নেই, সেই কাজে আগ্রহ হল। কাঁচা হলুদ বাটা মেখে স্নান সেরে জামাকাপড় পরে রেডি আমি। পিসিমাই দেখিয়ে দিলেন। আমি রাঁধলাম। পুজো করলাম নিজেই। সেবার আর পুরোহিত ডাকা হল না। পিসিমার অনুরোধে মা আমাকে পুজো করতে দিলেন। পঞ্জিকার মধ্যে নিয়মকানুন থাকে দেখ! পঞ্জিকা খুলে পিসিমা আমার হাতে দিলেন। আমি দেখে দেখে মন্ত্র পড়ে চলেছি—

'যা দেবী সর্বেভূতেষু...'

পুজো হল। প্রসাদটসাদ খাওয়া হল। রাতে পিসিমা সন্ধ্যারতি দেওয়ালেন আমাকে দিয়ে। কদিন পর পরীক্ষা। মন দিয়েই পুজো করলাম। পরীক্ষার দিন হল এক ফ্যাসাদ। আমার অ্যাডমিড কার্ড গেল হারিয়ে। ওফ! সে কী দুশ্চিন্তা। মা, বাবা সবাই প্রায় পাগল হয়ে গেল। আমি পিসিমার কাছে মনের ভার লাঘব করতে গেলাম।

পিসিমা পায়েস রাঁধছিলেন। কোনওরকম দুঃশ্চিন্তার লক্ষণই নেই। ভাবলাম পিসিমা হয়তো ব্যাপারটার গুরুত্ব জানে না। বললাম, 'পিসিমা। আমার বোধহয় পরীক্ষাটা দেওয়া হবে না। কার্ডটা পাওয়া গেল না! কী করব যে!'

পায়েসের কড়ায় হাতা নাড়তে নাড়তে পিসিমা ধমক দিলেন, 'উল্টোপাল্টা বলবে না! তৈরি হও। আর তো মাত্র আড়াই ঘণ্টা! তারপরই পরীক্ষা তোমার! যাও।'

আরে! তুমি তো কিছুই বুঝতে পারছ না! একটা কার্ড দরকার। অ্যাডমিট কার্ড। ওটা পাচ্ছি না কোথাও। আমার টেবিলের ড্রয়ারেই ছিল। অথচ কোথায় যে গেল! কার্ডটা না হলে হলে ঢুকতে দেবে না।'

'যাও অমু! বাকি পড়া করে নাও। ঠাকুরের ওপর বিশ্বাস রাখ দেখি।'

তাঁকে কিছুতেই বোঝাতে না পেরে আমি উঠে পড়লাম। অরণ্যে রোদন করে আর কী হবে।

উঠে চলে যাচ্ছি, পিসিমা পায়েস রাঁধতে রাঁধতে অদ্ভূত কথা বললেন, 'তোমার চিন্তা কী? পাস করে গেছো ভালোভাবে। কার্ড পাবেই দেখো।'

থমকে দাঁড়ালাম, 'মানে?'

'কিছু নয়! কার্ড তুমি পাবে। হ্যাঙারে যেসব শার্টগুলো ঝুলছে সেগুলোর পকেট খুঁজে দেখেছ? হাসলেন পিসিমা। হাসলে পিসিমাকে একদম ছেলেমানুষের মতো লাগত। সরল। আমি বিস্মিত হলাম 'শার্ট'? কোন শার্ট?

'কতগুলো শার্ট তো ঝুলছে। দেখো না বাপু খুঁজে। কে বলতে পারে? কথায় তো বলে, যেখানে দেখিবে ছাই উড়াইয়া দেখ তাই, পাইলে ও পাইতে পার অমূল্য রতন।

আমি এক পা এক পা করে এগোলাম অমূল্য রতন খোঁজার আশায়। ওই জায়গায় হাত দিইনি। তাছাড়া, সবই তো খুঁজেছি।

মোট ছ'খানা শার্ট ঝুলছে। একটা একটা করে শার্ট টেনে নিচ্ছি, পকেট হাতড়ে ফের রেখে দিচ্ছি। ছ'নম্বর শার্ট খানা ধরতেই শরীরে তরঙ্গ খেলে গেল। এটাই লাস্ট শার্ট। যদি এটাতে না পাই?

পকেটে হাতড়ে অ্যাডমিট কার্ডটা বের করে আনলাম। পিসিমা কী করে জানলেন ব্যাপারটা?

বাড়িতে এই খবর ছড়িয়ে গেল। আমি অ্যাডমিট কার্ড পেয়েছি। পিসিমা গুণে বলেছেন কার্ডটা ওখানে আছে।

'আমি গুণতে জানি না রে। সেদিন ... সরস্বতী পুজোর আগের দিনই একটা স্বপ্ন দেখেছিলাম। অমু খুব কাঁদছে। ও পরীক্ষা দেবে। কিন্তু পেনটা কোথাও খুঁজে পাচ্ছে না। আমি খুব খুঁজছি। খুঁজতে খুঁজতে হয়রান হয়ে শার্টগুলো যেখানে ঝুলছে, সেখানে দাঁড়িয়ে কী করব ভাবছি। দেখি পেনটা আমার হাতে। পরদিন পুজো। অমুকে দিয়ে পুজো দেওয়ালাম। ভোগ রাঁধালাম। মা সরস্বতী তুষ্ট হলেই সব হয়। আমার মন বলছে ওর পরীক্ষা ভালো হবে। দেখো তোমরা।'

এই স্বপ্নেরও কোনও ব্যাখ্যা নেই। পিসিমা-ই বা স্বপ্নটা কেন দেখলেন? বরং হিসেব মতো অমলদারই দেখার কথা। অথচ নিখুঁতভাবে স্বপ্নটা এল।

'আসলে কী হয় জানো, অনেক কিছু এখনও পৃথিবীতে হয় যার ব্যাখ্যা আমরা দিতে পারি না। কখন ব্যাখ্যা দিই, সেটা যদিও আমাদের নিজস্ব কষ্টকল্পিত ব্যাখ্যা।' অমলদা থামলেন। রতনদা ঘাড় নেড়ে সায় দিচ্ছিলেন অমলদার কথায়।

'আপনার পিসিমার আর কোনও ঘটনা নেই?' সুপর্ণা শুনতে চাইছিল। অমলদা হাসলেন,'অজস্র আছে। আমরা পিসিমাকে বলেছিলাম তোমার নাম গিনেস বুকে ঢোকানো যায় কিনা দেখতে হবে।'

পিসিমাকে পরের দিকে বাবাও সরাসরি বিশ্বাস করতেন। আমার দিদির বিয়ের সময় সেটা বুঝতে পারলাম। বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। পাকা দেখাও হয়ে গেল। বাবা পিসিমাকে ডাকলেন, 'বিরাজ, একবার আয় তো!' আমরা ভাবলাম কী ব্যাপার? বাবা এবং পিসিমা ভাইবোন হলেন এমন অন্তরঙ্গভাবে গল্প করতেন না। পিসিমা জপ করছিলেন। জপ শেষ করে গিয়ে দাঁড়ালেন। 'বলো দাদা।'

'বিরাজ, মেয়েটার তো বিয়ে ঠিক করলাম। কী রকম হল কে জানে! তুই কিছু বুঝতে পেরেছিস?'

অর্থাৎ, তুই শুভাশুভ কোনও স্বপ্নটপ্ন দেখেছিস কিনা?

পিসিমা ঘাড় নাড়লেন, 'না দাদা! কিছু বুঝিনি। মনে হয় ভাল হবে।'

বিয়ে হল। দিদি ভালোই আছে। হাওড়ায় শ্বশুড়বাড়ি। জামাই ভালো পাত্র। সব ঠিকঠাক আছে। একবার হল কী জামাই এসেছে আমাদের বাড়িতে। পিসিমা আশীর্বাদ করলেন। বললেন, 'বাবা, কালকেই চলে যেও না! দুটো দিন থাক।' অশোকদা রাজি নন। জরুরী কাজ আছে। দিদিকে পৌঁছে দিয়ে পরদিন তাঁর ফিরে যাওয়ার কথা। পিসিমার কথা ফেলতে না পেরে নিমরাজি হলেন, 'ঠিক আছে। কিন্তু আমার পক্ষে একটু অসুবিধে হল!'

সে হোক গে! অসুবিধে-টিধে জামাই বুঝবে। কিন্তু সে একদিন রয়ে গেলে সবাই খুশি। বাবার চিতল মাছ নিয়ে এলেন। আর মুরগি! দমসে রান্না-বান্না হল। খাওয়া-দাওয়া হল। পরদিন ভোরে উঠে মা দেখেন পিসিমা জলভরা চৌবাচ্চার সামনে দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করছেন। এ দৃশ্য মোটামুটি ভাবে বাড়ির সবারই পরিচিত। মায়ের অবস্থা বুঝতে পারছ! পিসিমা জলের সামনে দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করছেন, মানেটা হল, দুঃস্বপ্ন দেখেছেন। গঙ্গার সামনে দাঁড়িয়ে স্বপ্ন মিথ্যে হওয়ার প্রার্থনা জানাচ্ছেন।

মা ভয়ে ভয়ে এগোলেন। 'কী হল গো? দুঃস্বপ্ন দেখেছ নাকি?

'হ্যাঁগো! খুব খারাপ স্বপ্ন! জামাইকে'...

'জামাই? জামাইকে নিয়ে স্বপ্ন?'

মা প্রায় আর্তনাদ করে উঠলেন। এর কারণ আছে। পিসিমার স্বপ্ন যেভাবে ফলে যেত, তাতে দুঃস্বপ্ন দেখেছেন পিসিমা—মানেই প্রাণে ত্রাস, আর এই স্বপ্ন হয় যদি হয় জামাইকে নিয়ে। তাহলে তো...

'না! জামাইকে নিয়ে ঠিক নয়! আজ আর জামাইকে আটকে রাখা যাবে না। ওদের বাড়িতে কোনও অঘটন ঘটার সম্ভাবনা! দেখলাম জামাই আতঙ্কিত মুখে বাড়িতে ছুটছে! কী একটা হয়েছে।'

মা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। যাকে বলে কিংকর্তব্যবিমূঢ়। পিসিমাই গিয়ে বাবাকে ডেকে অবস্থাটা বুঝিয়ে বললেন। বাবা একটু ইতস্তত করলেন। কারণ জামাইকে এই স্বপ্নর ব্যাপারটা গুরুত্ব বোঝানো কঠিন কাজ। সে হয়তো হাসবে! বা কী ভাববে! কিন্তু পিসিমা জোর করলেন 'দেরি করো না। ওকে বাড়িতে পাঠিয়ে দাও।'

'কী বলে পাঠাব?'

বলো, স্বপ্ন দেখেছি! মিথ্যে বলো না।'

বাবা জামাইকে ডাকলেন। আগের দিন যাঁকে থেকে যাওয়ার জন্য বারবার অনুরোধ করা হয়েছে, পরদিনই কী বলে তাঁকে যেতে বলবেন। জামাই বলে কথা। কিন্তু আমার বাবা পিসিমার মতো। মিথ্যে বলবেন না। অন্য কোনও কারণ বানিয়ে বলবেন না! সুতরাং জামাইকে পিসিমার স্বপ্নের কথাটা বলা হল।

অশোকদা তো প্রথমে ভাবলেন যে সবাই বুঝি ঠাট্টা করছেন। তারপর যখন বুঝে ফেললেন যে, ব্যাপারটা সিরিয়াস, তখন উঠলেন। আমরা স্পষ্টত বুঝে ফেললাম যে মনে মনে প্রচণ্ড হাসছেন অশোকদা, কিন্তু কিছু করার ছিল না আমাদের। বাবা বললেন—'তুমি স্নান করে নাও।'

স্নান সেরে খেয়ে উঠেছেন। তখনই ফোনটা এল। অশোকের দাদার ফোন, 'তাড়াতাড়ি আয়! মা-র স্ট্রোক হয়েছে। নার্সিংহোমে নিয়ে গিয়েছি!'

অশোকদার চোখের সেই দৃষ্টি আজও ভুলতে পারিনি। পিসিমাকে প্রণাম করে উনি বলেছিলেন 'এক আশ্চর্য ক্ষমতা আপনার।'

পিসিমা বলেছিলেন, 'জানি না বাবা! শান্তিও পাই না! দুঃস্বপ্ন দেখতে পারি—এই ভয়ে ঘুমোতে ইচ্ছে করে না!... তুমি সাবধানে যেও! তোমার মা ভালো হয়ে যাবেন। ভালো হয়ে গেলে এসে কিন্তু দুটো দিন থেকে যেও! নয়তো শান্তি পাব না!' দিদিকে নিয়েই চলে গেলেন অশোকদা। মাস তিনেক পর মাসিমা সুস্থ হলে অশোকদা দিদিকে নিয়ে এসেছিলেন।—থামলেন অমলদা—'একটু চা-কফি হলে বেশ হত।'

'আছে আছে! বাগচি বউদি ফ্লাস্ক খুলে চা ঢাললেন কাপে। হাতে হাতে পৌঁছে গেল অমলদার কাছে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%