সাগরিকা রায়

বারোই এপ্রিল, খড়দা, ট্রেনলাইনের পাশের একটি মাঠ থেকে অগ্নিদগ্ধ, একটি মহিলার মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। মুখ ক্ষত-বিক্ষত ছিল। পরিচয় জানা যায়নি। বলুবাবুর ছেলে দীপনের ক্লাসমেট অনীক। গত একুশ তারিখ থেকে ওর মা নিখোঁজ। বলুবাবুর কাছে এসেছিল পরামর্শ নিতে। টিভির খবরে চোখ আটকে যেতে চমকে উঠল। মহিলার ছবিটা দেখাচ্ছে তখন। ঘন নীল সালোয়ার, লং কামিজের ফ্লোরাল প্রিন্ট স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে! অনীক সম্ভবত আর্তনাদ করে উঠেছে। বলুবাবু কফির কাপ থেকে অবাক হয়ে মুখ তুললেন,—কী হল?
—আমার মা! নিউজে দেখাল এইমাত্র! খড়দা ট্রেনলাইনের পাশের মাঠ থেকে একজন মহিলার আগুনে পুড়ে যাওয়া, এবং ট্রেনে কাটা পড়া বডি পাওয়া গেছে। পোশাক একেবারে মায়ের মতো! আঙ্কল, এখন আমি কী করব! অনীক কাঁপছিল থরথর করে—সেদিন মা এই পোশাক পরেই বেরিয়েছিল। আমার পরিষ্কার মনে আছে! ফোন নিতে ভুলে গিয়েছিল। আমি ছুটে গিয়ে ফোনটা হাতে দিলাম!
স্বাভাবিক। নিজের মা মনে করে যদি কোন বডিকে দেখে কেউ,তার অবস্থা সুস্থ থাকতে পারে না! বলুবাবু জানেন ঘটনাটি। অনীকের মা একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের কর্মচারী। গত পরশু অফিসে বেরিয়েছিলেন। তারপরে আর খোঁজ নেই। অফিসে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সেদিন উনি অফিসেই যাননি! অথচ মা অফিসেই যাচ্ছে বলে বেরিয়েছিল বাড়ি থেকে! তাহলে?
বলুবাবুর কষ্ট হচ্ছিল অনীককে দেখে। ছেলে দীপনকে বললেন,—একবার থানায় যাবেন। অনীককে নিয়ে। দীপনকেও যেতে হবে। বন্ধুর এমন অবস্থায় পাশে থাকা উচিত।
থানায় গিয়ে অনীককে দিয়ে নিখোঁজ ডায়েরি করালেন বলুবাবু। অনীকের মুখ থেকে যতটুকু জানার, জেনে নিলেন ইনস্পেকটর। অনীক ভুলতে পারছিল না ডেডবডির গায়ের পোশাকটা। মা বলেছিল, এই পোশাকটা খুব কম্ফর্টেবল। ঢিলেঢালা। একচুয়ালি পোশাকটা দিদির। মা মাঝে মাঝেই পরতো। আচ্ছা, দোপাট্টা নিয়ে কিছু বলছিল কি খবরে? খেয়াল করা হয়নি তখন। মা দোপাট্টা নিয়েছিল বরাবরের মতো। সেটা কোথায় গেল? এখন কী করবে অনীক?
—আমার মনে হয়, তোমার দিদিকে নিয়ে খড়দায় যাওয়া দরকার। এমন ঘটনা সত্যি না হলেই মঙ্গল। তাহলেও, মন শক্ত রাখো তোমরা। যেকোনো প্রবলেমের সম্মুখীন হতে হবে। বড় হচ্ছ। সব সামলে নিতে শিখতে হয় এসময়ে।
অনীক স্তব্ধ হয়ে আছে। গত পরশু থেকে মা নিখোঁজ। দুদিন পরে আজই থানায় খবর দেবে ভেবেছিল ও। বলুবাবুর কাছে এসেছিল ওই কারণেই। আজ টিভির নিউজটা না দেখলে...! আচ্ছা,সত্যি কি ওই মহিলা ওর মা? কে মারল মাকে? অনীক ভেবে পাচ্ছিল না।
ওর বাবা মারা গেছেন ওর চারবছর বয়সে। জলে ডুবে মৃত্যু হয় বাবার। কোথায় পিকনিক করতে গিয়ে জলে পড়ে যায় বাবা। লঞ্চ থেকে। বডি পাওয়া গিয়েছিল দুদিন পরে। সে কথা খুব ভালো করে মনে নেই অনীকের। আজ মায়ের খবর যদি সত্যি হয়, তাহলে ভয়ঙ্কর বিভীষিকাময় জীবন শুরু হল ওদের দু-ভাইবোনের।
মায়ের জীবনে একটি শত্রুর আবির্ভাব হয়েছে, এটা কি মা বুঝতে পেরেছিল? পারলে একটিবার কি ছেলে-মেয়েকে জানাত না? নাকি মায়ের জীবনে এমন কেউ ছিল, যার কথা সন্তানদের জানানো যায় না! এখন চোখ খুলে তাকালেই অবৈধ সম্পর্কের খবর দেখতে পাওয়া যায়! মা কোনো ফাঁদে পড়েছিল কি?
দিদি কঙ্কনা কেঁদে চলেছে একটানা। যদিও ও টিভির খবর দেখেনি। অনীকের থেকে শুনে মন কু ডাকছে। মা কখনওই ওদের না জানিয়ে কোথাও যায় না। অফিসের কাজে দেরি হলে বাড়িতে জানিয়ে দেয়। আজ চব্বিশ তারিখ। মা শেষবার অফিসে গিয়েছিল একুশ তারিখে। আজ নিখোঁজ ডায়েরি করা হল। আজই পুলিশ ওদের নিয়ে খড়দায় যাচ্ছে। মর্গে বডি রাখা আছে। দেখে যদি সনাক্ত করতে পারে ওরা...!
মর্গ কখনও দেখেনি কঙ্কনা। অভীক দেখেছে বাইরে থেকে। আজ মর্গের সামনে এসে কেঁপে উঠল ভাইবোন। ভেতরে শায়িত বডির ওপরের কাপড় সরাতে বীভৎস দেহ বেরিয়ে এল। আগুনে পুড়ে গেছে গোটা মুখ। নাকি অ্যাসিডে! ট্রেনে কাটা পড়েছে বাকি শরীর। খানিকটা অংশের অক্ষত পোশাক দেখা যাচ্ছে। পোশাক দেখে কেঁদে উঠেছে কঙ্কনা। এই পোশাক ওর। মা পরত মাঝে মাঝে। একটা প্যাকেট থেকে দো-পাট্টা বের করে ওদের দেখানো হল। ফ্লোরাল প্রিন্টের দোপাট্টা। বডির পাশেই পড়ে ছিল!
দেহ সনাক্ত হল। এই পুড়ে যাওয়া দেহ বেলেঘাটা তারকমণি দত্ত লেনের মনিকা দত্তর। যে গত একুশ তারিখে অফিসে যাচ্ছি বলে অফিসে যায়নি। আর বাড়ি ফেরেনি।
ঘন অন্ধকার ঘরটি থেকে বেরিয়ে আসছিল সকলে। বডি নিয়ে যাওয়ার কিছু আইনি পদ্ধতি আছে। সেসব বলুবাবু দেখছেন। সবাই বেরিয়ে গেলেও কঙ্কনা একবার মায়ের ঢাকা দেওয়া বডির দিকে তাকাল। রুদ্ধশ্বাস মেয়েটি অবিশ্বাসে ভরা চোখ নিয়ে মায়ের বীভৎস মৃত্যুর দিকে তাকাল। কে মেরেছে মাকে এভাবে? কেন মেরেছে? ওদের সত্যি কোনো শত্রু আছে?
মন সামলে নিতে পেছন ফিরেছে, তখনই শব্দটা হল। একগোছা চুড়ির শব্দ। ঘরের ভেতরে মৃতদেহ কয়েকটি, আর জীবিত একমাত্র কঙ্কনা। চুড়ির শব্দ হল কোথায়? কঙ্কনার মনে পড়ল মায়ের হাতে চুড়ি ছিল না তো। কার হাতে চুড়ির শব্দ হল এখানে? ভয়ে গা শিরশির করে উঠল কঙ্কনার। দ্রুত বেরিয়ে এল মর্গ থেকে। অনীককে কিছু বলা ঠিক হবে না এখন। কিন্তু কাউকে বলা দরকার। ব্যাপারটা অদ্ভুত নয় কি?
কাউকে বলতে বাধল কেন জানে না কঙ্কনা। অথচ মনে হল, লোকে হাসবে মনে মনে! ভাববে, মর্গে এসে ভয় পেয়ে যা খুশি বলছে! এত বড় মেয়ে মায়ের বডি দেখে ভয় পাচ্ছে, এটা নিজের কাছেও লজ্জার! অবসাদে ভার হয়ে আছে মন, শরীর। ইচ্ছেও করছিল না কথা বলতে। নাহলে, আর কাউকে না বললেও অন্তত অনীককে বলতে পারত! না, ওকে এসব না বলাই ভাল। ভাবে কঙ্কনা। ছেলেটা খুব ভেঙে পড়েছে। এখন আধিভৌতিক ঘটনা বলে ওর ভেতরে ভয়ের সৃষ্টি করা ঠিক হবে না! সেটা বড় দিদি হিসেবে উচিত হবে না। বরং ভাইটিকে সামাল দেওয়া উচিত।
অবশেষে দেহ সৎকার হয়ে গেল। সৎকারের আগে হাতের চুড়িগুলো খুলে কঙ্কনার হাতে দেওয়া হয়েছিল। মুখ ভীষণভাবে পুড়ে যাওয়াতে বোঝা যাচ্ছে না কানে দুল ছিল কি না! কিন্তু দুহাতে মেটালের চুড়ি ছিল। রংবেরঙি চুড়ি একগোছা করে। লাল নীল হলুদ চুড়িতে জরি-চুমকি বসানো। মা এই চুড়ি কবে কিনেছিল? মাঝে মাঝে মেটালের রঙিন বা অক্সিডাইসড কালচে চুড়ি পরত মা। কিন্তু এগুলো আগে দেখেনি কঙ্কনা। খুব সুন্দর চুড়িগুলো।
মনের বাসন্তী রং যেন ফুটে উঠেছে এর মধ্য দিয়ে। মা কি কাউকে ভালোবেসেছিল? তাহলে সে কে? কেন তার সম্পর্কে কিচ্ছু জানাল না মা! ওরা বাধা দিতে পারে ভেবেই কি...! কে সে লোক? কোথায় ভুলিয়ে নিয়ে গিয়েছিল মাকে?
মায়ের চিতার আগুনের দিকে অদ্ভুত চোখে তাকিয়েছিল অনীক। পাশে দাঁড়িয়ে কঙ্কনা কান্না ভুলে অন্য কথা ভাবছিল। আজ একটা অদ্ভুত কাণ্ড হয়েছে। খুবই অদ্ভুত কাণ্ড। এ কথাটাও ও কাউকে বলতে পারছে না!
মায়ের মোবাইল ফোনটি পাওয়া যায়নি! সেটাই স্বাভাবিক ছিল। মাকে যে বা যারা হত্যা করেছে, তারা ফোনটি নষ্ট করেছে, নয়তো যা হয়ে থাকে, সিম চেঞ্জ করেছে। ফোন না পেয়ে পুলিশ কোনো ট্রেস পাচ্ছে না হত্যা রহস্যের। ওই নম্বরে ফোন করেছে পুলিশ। কিন্তু ফোন সুইচড অফ দেখাচ্ছে! হতে পারে ট্রেন লাইনের কোথাও ভেঙে পড়ে আছে ফোন। ভেবেছে কঙ্কনা।
আজ সকালে বিছানা ছাড়েনি তখন, রাত কাটেনি ভালো করে, রাস্তায় ত্রিফলা আলো হাতে দাঁড়িয়ে। তখন কেন যেন খুব ইচ্ছে হল, মায়ের সঙ্গে কথা বলতে। কেন ইচ্ছে হল, কেন এমন একটা উদ্ভট ইচ্ছে এল মনে, কঙ্কনা জানে না।
মন টানছিল বড্ড। নিজের ফোন বালিশের পাশে রেখে ঘুমোয় রোজ। আজও বালিশের পাশেই ছিল ফোন। ঘরের ভেতরের আবছায়া অন্ধকারে ফোন টেনে নিয়ে মায়ের নম্বরে ডায়াল করতেই ওদিকে কেউ ফোন তুলেছে যেন। হালকা উপস্থিতি ভেসে এল ইথারে! কেঁপে উঠল কঙ্কনা। অস্ফুটে উচ্চারণ করেছে—মা! ওপাশে শব্দ নেই! কিচ্ছু নেই! ও-পারের জীব এ-পারে আসতে পারল না!
অনেকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইল কঙ্কনা! কী হয়ে গেল এটা! পরলোক থেকে মা কি কিছু বলতে চাইছে? মায়ের খুনির নাম বলতে চায় মা? মা কি সন্তানদের কাছে বার্তা পৌঁছে দিতে চায়? আর তখনই শব্দ পেল কঙ্কনা। দ্বিতীয়বার। চুড়ির শব্দ। মেটালের চুড়িতে যেমন শব্দ হয়, তেমনই শব্দ। ঘরের ভেতরের বদ্ধ বাতাসে পাক খেয়ে খেয়ে মিলিয়ে গেল শব্দটা। অথচ তার রেশ রেখে গেল!
অনেকক্ষণ বসে বসে মাকে অনুভব করছিল কঙ্কনা। কীভাবে তদন্তের পথে এগিয়ে যাবে ও? পুলিশ বিশেষ কিছু করতে পারবে বলে মনে হচ্ছে না! কবে, কোন মহিলা খুন হয়েছে,তার জন্য তার ছেলে মেয়ের যা দুশ্চিন্তা, সে কি অন্য কারও থাকে? এভাবেই একদিন সব কিছু ঢাকাচাপা পড়বে। এক সরু গলির ছোট বাসায় দুটো ভাইবোন একান্তে মায়ের কথা ভাববে কোনো এক বিকেলের ট্রেন চলে যাওয়ার শব্দে। ওই ট্রেনেই ফিরে আসত মা। বাসায়। সন্তানদের কাছে।
কাজ মিটে গেল। ফের আগের জীবনে ফিরে যেতে হল। জীবন এইরকমই হয়! তবু, অনেক রাতে মোবাইল ফোনে মায়ের নম্বরে ফোন করে কঙ্কনা। ফোন বাজে না! কেউ ফোন রিসিভ করে না।
অনীক বাড়িতে ছিল না। কঙ্কনা দুটো টিউশনি করে পাড়াতেই। সন্ধের দিকে বাড়ি ফিরেছে। দরজার তালা খুলে ঘরে ঢুকতেই মায়ের গায়ের গন্ধ পেল। বাজার চলতি শ্যাম্পুই ব্যবহার করত মা। হপ্তায় তিনদিন চুল না ধুলে স্বস্তি পেত না। বার্গান্ডি কালার ইউজ করত চুলে। যদিও চুলে পাক ধরার বয়স হয়নি।
আসলে মা বরাবরই শৌখিন ছিল খুব। পরিপাটি ছিল। অন্ধকার ঘরে মায়ের গায়ের গন্ধে কঙ্কনার মনে হল, মা আছে এখানেই কোথাও। ফিসফিস করে কঙ্কনা—মা! তুমি আছ এখানে? বলো না মা! আমাকে বলো, তুমি কি কিছু জানাতে চাও?
কেউ জবাব দেয় না। শূন্য ঘরে কঙ্কনার বলা বর্ণমালা একা একা ছুটোছুটি করে। পাশের ঘরের ভাড়াটে কাকিমা দেখেছে কঙ্কনাকে ঘরে ঢুকতে। সে চা নিয়ে এসেছে—হ্যাঁ রে, অন্ধকারে বসে আছিস কেন? চা এনেছি।
কঙ্কনা দেখল কাকিমা বড় যত্ন করে ওর জন্য চা নিয়ে এসেছে। চুল খোলা কাকিমার। সন্ধের দিকে স্নানের অভ্যেস। প্রাইমারি স্কুলে চাকরি করে। বাড়ি ফিরে স্নান করে চা বানায়। ইদানিং ওদের জন্য চা করে আনে।
চায়ের কাপ হাতে নিয়ে কঙ্কনার চোখে জল আসে। ইচ্ছে করে কাকিমাকে সব খুলে বলে। মায়ের কথা। ফোনের কথা। চুড়ির শব্দের কথা। কিন্তু সামলে নিতে জানে ও। এসব কথা চাউর হলে ওরা এখানে থাকতে পারবে কিনা...! ভূতের ঘর বলে ওদের বাড়ি একটা কৌতূহলের জায়গা হয়ে দাঁড়াবে। লোকে অতিষ্ঠ করে খাবে। থাক। কষ্ট সবসময় শেয়ার করা ঠিক নয়।
কাকিমা বকবক করে কী সব বলে যাচ্ছে। কঙ্কনা তাড়াহুড়ো করে চা খায়। কাকিমাকে আটকে রাখা ঠিক নয়। কাপটা কাকিমার ঘরে পৌঁছে ধুয়ে রাখল কঙ্কনা। নিজের ঘরে ফিরে চেঞ্জ করে নিল। অনীকের ফিরতে দেরি হবে। বলুবাবুর ছেলে দীপনের সঙ্গে টিউশনে গেছে নাকতলায়। বিছানায় শুয়ে মোবাইল নাড়াচাড়া করছিল কঙ্কনা। করতে করতে কখন মায়ের নম্বরে রিং করেছে। ফোন বেজে উঠতে ও-ধার থেকে কেউ বলে উঠল—হ্যালো!
চমকে ফোন ছেড়ে দিল কঙ্কনা। স্তম্ভিত হয়ে গেল যথার্থ। রেসপন্স করার কথা মনে নেই। এ কে? ভারী মোটা পুরুষালি গলা! কে? কে?
সামলে নিয়ে, নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে ফোন তুলেছে হাতে। কিন্তু ওধারে কোনো সাড়া নেই। বারবার ফোন করে গেল কঙ্কনা। কেউ সাড়া দিল না। একসময় শুনতে পেল সার্ভিস প্রোভাইডারের রেকর্ডের ভয়েস... ফোনের সুইচড অফ।
অস্থির হয়ে পড়ল কঙ্কনা। কী হচ্ছে এসব? মায়ের দুটো নম্বর। একটা সুইচড অফ মা খুন হওয়ার সময় থেকেই। আরেকটা সেদিন অন হয়েছিল। আজ অন হয়েছে। কেউ ফোন রিসিভ করেছে। তাহলে? ও কি বলুবাবুর কাছে যাবে? ঘটনাটা স্বাভাবিক নয়।
কঙ্কনা তালা দিল ঘরে। বলুবাবুর বাড়ি কাছেই। সেখানে গিয়ে বলুবাবুকে বাড়িতেই পেয়ে গেল। ফোনের ব্যাপারটা খুলে বলতে বলুবাবু অবাক প্রায়—সে কি! থানায় জানাতে হচ্ছে। চল, থানায়।
দেরি করেনি ওরা। থানায় গিয়েছে। ফোনের নম্বরটা দিয়ে এসেছে। এই নম্বরে কোথা থেকে ফোন রিসিভ করা হয়েছে, সেটা কললিস্ট চেক করলে বোঝা যাবে।
বলুবাবু কঙ্কনাকে নিয়ে ফিরে এলেন। অফিসার খুবই আগ্রহী ঘটনা শুনে। নড়ে চড়ে বসেছেন। আগামিকাল জানা যাবে এই নম্বরের ফোন কোথা থেকে রিসিভ করা হয়েছে। উত্তেজনায় রাতে ঘুমোতে পারল না কঙ্কনা। অনীকও।
থানায় গিয়েছে ওরা বেলা দশটার দিকে। থানা থেকে ডেকে পাঠিয়েছে ওদের। ওরা পৌঁছতেই অফিসার কঙ্কনার মায়ের যে নম্বর অন আছে, সেই নম্বরে ফোন করতেই কেউ ফোন রিসিভ করেছে। কথা বলছে না। অফিসার সরাসরি নিজের পরিচয় দিলেন—আমি বেলেঘাটা থানা থেকে বলছি...।
কথা শেষ হতে-না-হতেই ফোন কেটে দিল কেউ। ফোনের আইএমই আই টাওয়ার লোকেশন দেখে জানা গেল ফোন এ সময়ে বিহারের পাটনায় আছে!
তল্লাশি শুরু হল। ব্যাঙ্কে খোঁজ নেওয়া বা জিজ্ঞাসাবাদের পর্ব চলছিলই, এবারে জোরদার হল। প্রচুর জেরা করতে করতে বেরিয়ে এল কঙ্কনার মায়ের এক প্রেমিকের নাম। ব্যাঙ্কে কঙ্কনার মায়ের সঙ্গে ডি গ্রুপে চাকরি করে দীপক সিং। সে ছুটিতে গেছে কঙ্কনার মায়ের নিখোঁজ হওয়ার চারদিন আগে। এখনও ফেরেনি। কারণ তার মা হসপিটালাইজড। পায়ের হাড় ভেঙেছে।
পুলিশ পাটনায় চলে গেছে। সেখানে গিয়ে দেখা যায় সেদিনই দীপকের বিয়ে। পাত্রী বেলেঘাটা তারকমণি দত্ত লেনের মনিকা। কঙ্কনার মা।
তাহলে সেই বডি কার ছিল? যে কঙ্কনার পোশাক পরে ছিল!
পুলিশের প্রশ্নের উত্তরে দীপক জানাল এক আশ্চর্য কাহিনী। দীপক বিবাহিত। কিন্তু নিঃসন্তান। ও মনিকাকে বিয়ে করবে ঠিক করে। বউকে জানায় মনিকার কথা। বউ বাড়ি থেকে চলে যায়। অনেক খোঁজ করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
পুলিশ বিশ্বাস করেনি দীপককে। এমনকী মনিকাকেও। জেরায় মনিকা ভেঙে পড়ে। মনিকার সঙ্গে ষড়যন্ত্র করেছিল দীপক। সেটা কলকাতায় থাকতেই করেছিল। বউকে পাটনায় রেখে মনিকাকে নিয়ে কলকাতায় থাকবে। ছেলে মেয়েকে মানিয়ে নেবে মনিকা। কিন্তু দীপকের বউ মানতে চায়নি। সে থানায় যেতে চায়। তখন পেছন থেকে কুড়ুলের বাড়ি মেরে বউএর মাথা ফাঁক করে দেয় দীপক।
বডি লুকোতে ঘটনাটা এভাবে সাজায়। সাপও মরে, লাঠিও না ভাঙে—র মতো মঞ্চসজ্জা করা হয়। মনিকার পোশাক পরিয়ে বডির মুখ অ্যাসিডে পুড়িয়ে দিয়ে বাকি শরীরের খানিকটায় আগুন ধরিয়ে দেয় দীপক। বড় ব্যাগে করে বডি নিয়ে ট্রেনের লাইনে ফেলে রাখে। যাতে বডি পাওয়া গেলেও সকলে ভাববে মনিকার বডি ওটা। তাছাড়া দীপক আগেই বাড়িতে চলে গিয়েছিল। মনিকা কবে কোথায় গেছে, সেকথা দীপকের জানার কথা তো নয়!
দীপক এবং মনিকাকে অ্যারেস্ট করা হল। অনীক বা কঙ্কনা মায়ের সঙ্গে দেখা করতেও গেল না। বলুবাবু বলেছিলেন,—যদি তোমরা চাও, মায়ের হয়ে আইনি লড়াই লড়তে পারো। তবে বেশ শক্ত জিতে আসা।
ওরা চায়নি। যে মা সন্তানদের এইভাবে ঠকাতে পারে, তাকে ক্ষমা করার প্রশ্নই আসে না।
তবে, কঙ্কনা থানার অফিসারের কাছে একটি জিনিস চেয়েছে। একটা ছবি। দীপকের বউ-এর ছবি। একেবারেই অচেনা একটি মানুষ কঙ্কনাকে বিশ্বাস করেছিল। বলতে চেয়েছিল গল্পের মূল কথাটা। আসল কথাটা। বলতে চেয়েছিল বডি মনিকার নয়। তোমরা ভুল করছ। বডিটা আমার।
আমার মানে? কঙ্কনা তাকে চেনেই না! সে কীভাবে কঙ্কনাকে জানান দিয়ে গেছে? কোনো ইশারা দিয়েছে যাতে কঙ্কনার মনে একটু সন্দেহ জাগাতে পারে! এই হত্যা রহস্যের পর্দা তুলতে চেয়েছিল সে! চুড়ির শব্দ দিয়ে!
কঙ্কনার মা মনিকা কখনোই মেটালের জরি চুমকি দেওয়া চুড়ি পরে না। বডি সাজাতে গিয়ে দীপক আর মনিকা চুড়ি খুলে রাখতে ভুলে গিয়েছিল বডি থেকে। মৃত মানুষটা আর কীভাবে যোগাযোগ করত কঙ্কনার সঙ্গে? চুড়ির শব্দ দিয়ে আকৃষ্ট করেছিল কঙ্কনাকে। বোঝাতে চেয়েছিল ওটা তোমার মায়ের বডি নয়!
অফিসার কথা দিয়েছেন, দীপকের বউ-এর একটা ছবি কঙ্কনাকে সংগ্রহ করে দেবেন।
রাতে ঘুম আসে না। কঙ্কনা একজন প্রতারকের কথা ভাববে না ভেবেও ভাবে। লজ্জায় মাথা নীচু হয়ে যায়। পাশের ঘরের কাকিমা এসে চা দিয়ে গিয়েছে আজও রোজের মতো। তখন কাকিমার ভিজে চুল থেকে শ্যাম্পুর গন্ধ নাকে আসতেই সেদিনের ঘরের গন্ধের কথা মনে পড়ল। মা ছিল না ঘরে তখন। গন্ধটা ছিল কাকিমার চুলের গন্ধ। কত ভুল করে মানুষ বিশ্বাস থেকে! কত নিগূঢ় ভালোবাসা ছিঁড়ে যায়!
পাশ ফিরে শুতে গিয়ে শব্দটা পেল কঙ্কনা। অন্ধকার ঘরে বেজে উঠেছে একগোছা চুড়ির শব্দ! একবারই!
সে বুঝি বিদায় নিল কঙ্কনার কাছ থেকে! বিশ্বাস করেছিল কঙ্কনাকে! কেন? কঙ্কনাকে সে তো চিনত না! বরং মণিকার মেয়েকে অবিশ্বাস করাটাই স্বাভাবিক ছিল! কারণ সে বুঝেছিল, মণিকা শুধু তাকেই নয়, সন্তানদেরও ঠকাচ্ছে! একজন কারও কাছে আশ্রয় খুঁজেছে সে! বিশ্বাস করেছে! একটি মানুষ আরেকটি মানুষকে বিশ্বাস করতে চেয়েছে! অবিশ্বাসের দুনিয়ায় সে আঁকড়ে ধরে কাউকে বোঝাতে চেয়েছিল সত্যিটা!
চোখ বুজল কঙ্কনা। সবাই ঠগ হয় না। একথাও ঠিক, চুড়িগুলো না বেজে উঠলে হয়তো আজও বিশ্বাস হতো মা নেই! কঙ্কনা অদেখা মানুষটিকে দেখতে পায় মনে মনে। একগোছা চুড়ি সে পরেছিল যখন, জানত না, এগুলোই তার স্বপক্ষে সাক্ষ্য দেবে! ঘুমিয়ে পড়ল কঙ্কনা। সত্যের জগতে শান্তির ঘুম ঘুমোতে গেল ও।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন