অন্যভুবন

সাগরিকা রায়

‘একটা তেপায়া টেবিল চাই। অথবা আরও একটি পদ্ধতি আছে!' প্ল্যানচেট নিয়ে একটা কৌতূহল যে ছিল না তা নয়। বিশেষ করে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ প্ল্যানচেটে আগ্রহী, ছিলেন জেনে সেই কৌতূহলের ধিকিধিকি আগুনে যেন সরল কাঠ গুঁজে দেওয়া হল। একটু ভয়ের সঙ্গে কৌতূহলের চাটনি মিলে ব্যাপারটা জব্বর হল।

কিন্তু কৌতূহল নিরসনের কোনও সুযোগও আসে না। সুতরাং গত বছর ঘোর গ্রীষ্মকালে ডুয়ার্সে বেড়াতে গিয়ে যখন এরকম একটা সুযোগ এলই, রজতাভ আর ঝুঁকি নিল না। বরং বলা ভালো ঝুঁকি নিল। প্ল্যানচেটে বসার উদ্যোগটা নিয়ে ফেলল।

অনিমেষদার বাড়িটা পুরনো দিনের ধাঁচে। শোবার ঘর থেকে কিচেন-এ যেতে মাঝখানে বিশাল উঠোন পার হতে হবে। কিচেনও যে সে কিচেন নয়। বড়সড় বেডরুম বলা যায়। তারও পেছনে রয়েছে বাগান। যাকে অনিমেষদা 'মালিবাড়ি' বলে সম্বোধন করেছিল। সেই মালিবাড়িতে নানান গাছপালা। কী নেই? বন কাঁঠাল, কাঁঠাল, আম, জাম, পেয়ারা, আতা, তেঁতুল, ঝিকা ছাড়াও বেশ কিছুটা জায়গা জুড়ে আছে মানকচুর জঙ্গল। উঠোন জুড়ে কফি গাছ, দারচিনি গাছ, কাজুবাদামের গাছ। 'সবুজ বিপ্লব' বলে ফেলল রজতাভ।

সারাক্ষণ সবুজের মধ্যে কাটাতে কাটাতে যেন তারুণ্য ঝরে পড়ছিল রজতাভর মন ও শরীরে। নদী, পাহাড়, জঙ্গল যখন ছুঁয়ে মেখে একাকার তখন ধীরে সুস্থে বসার সময় এল। সারাক্ষণ বৃষ্টিতে ঘরে বসে বোর হওয়া ছাড়া আর কী? সুতরাং অনিমেষের লোকাল বন্ধু দেবব্রত যখন জমিয়ে বসে ভূতের গল্প শুরু করল, তখন ছমছম করা ছাড়াও আরামও হল যে তার আর সন্দেহ নেই। আর, তখনই অনিমেষ প্ল্যানচেটের প্রসঙ্গ টেনে আনল। কে যেন কবে প্ল্যানচেট করেছিল, সেই কবে প্ল্যানচেটে মিডিয়াম স্বয়ং অসুস্থ হয়ে পড়েছিল, তা নিয়ে মুখরোচক গপ্পোটপ্পো চলল। ফের অনিমেষই তাল তুলল, 'প্ল্যানচেট করলে কেমন হয়?'

'বেশ হয়!' লাফিয়ে উঠল রজতাভ। দেখাদেখি দেবব্রত। 'একটা তেপায়া টেবিল চাই। অথবা আরও একটি পদ্ধতি আছে।' অনিমেষ দুজনের মুখের ভাব লক্ষ্য করে—'শুনেছি, পরিচ্ছন্ন জায়গায় অ্যালফাবেট লিখে মাঝখানে একটি কৌটোর ঢাকনা রাখতে হবে। বেজোড় সংখ্যায় বসতে হবে। প্রত্যেকের তর্জনী কৌটোর ঢাকনার ওপর একই জায়গায় রাখতে হবে। দৃঢ়ভাবে কোনও মৃতব্যক্তিকে একমনে চিন্তা করতে হবে। এমন কোনও ব্যক্তিকে বাছতে হবে যাকে তিনজনই চেনে। অর্থাৎ, প্ল্যানচেটে যারা বসেছে মৃত ব্যক্তি তাদের পরিচিত হওয়া চাই।

শুনে টুনে তো যাকে বলে লাফাতে শুরু করল রজতাভ। কবে হবে? কখন হবে? করে পাগল করে তুলেছে। অনিমেষের মা ওদের মতলব শুনে মোটেই খুশি হলেন না। তাঁর আপত্তিতে ব্যাপারটা ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হল। কিন্তু বাঁচাল অনিমেষের জ্যাঠতুতো দাদা শুভেন্দু। প্ল্যানচেট নিয়ে তাঁর একটা সময় প্রবল উৎসাহ ছিল। নানা কাজকর্মে বিষয়টা নিয়ে ভাবনা-চিন্তার সময় তাঁর ছিল না। কিন্তু এবার এদের পেয়ে তাঁর পুরনো উৎসাহ চাঙ্গা হয়ে উঠল।

'প্ল্যানচেট করলে আমাকে ভুলিস না অনিমেষ।' অন্তত বারদশেক বলে গেছে শুভেন্দু। ঠিক হল বার দুয়েক প্ল্যানচেটে বসা হবে। দুদিন এর জন্য বরাদ্দ হল। প্রথম দিন বসবে রজতাভ, অনিমেষ আর শুভেন্দু। পরদিন অনিমেষ, দেবব্রত আর রজতাভ। এসব না হয় ঠিক আছে, কিন্তু সমস্যা হল প্ল্যানচেটে কাকে ডাকা হবে তা নিয়ে। অনিমেষ, দেবব্রত যাকে চেনে রজতাভ তাকে চেনে না। আবার রজতাভ, অনিমেষ যাকে চেনে শুভেন্দু তাকে চেনে না।

চিনলেই তো হল না। সে ব্যক্তিকে আবার মৃত হতে হবে। শেষে এমন হল মৃত বাছতে গাঁ উজাড়। সব সমস্যারই সমাধান আছে। অবশেষে ওরা একজনকে পেল। তিনজনই তাকে চেনে। সে হল সুভাষ মিত্র। গতকাল তিনি মারা গেছেন ক্যান্সার-এ। দুরারোগ্য ব্যাধি!

'তাহলে? উনিই? ওকেই ডাকব?' অনিমেষ শুভেন্দুর দিকে তাকাল।

'হ্যাঁ! সদ্য মারা গেছেন! মনে হয় কাজ হবে!'

সেদিন সন্ধেবেলা উদ্যোগ নেওয়া হল প্ল্যানচেটের। শুভেন্দু, দেবব্রত আর অনিমেষ বসবে। ঘরে ধূনোর গন্ধ দেওয়া হয়েছে। ঘর অন্ধকার করে মোমবাতি জ্বালিয়ে রাখা হয়েছে। যেসব নিয়ম-এর কথা ছিল, সব মেনেই বসা হয়েছে। মেঝে পরিষ্কার করে ইংরেজি বর্ণমালা বৃত্তাকারে লিখে রাখা হয়েছে। সেই বৃত্ত ঘিরে তিনজন বসেছে। কৌটোর ঢাকনির ওপর তর্জনী রেখেছে। প্রত্যেকে তর্জনী একই জায়গায় অবস্থিত।

হঠাৎ-ই নড়ে উঠল কৌটোর ঢাকনা। যাকে প্ল্যানচেটে কাণ্ডারী বলাটা ভুল হবে না। এক মনে সুভাষ মিত্রর চেহারা স্মরণ করে চলেছে তিনজনেই। ঢাকনা নড়ে উঠল। অসম্ভব গতিতে বৃত্তাকারে ঘুরে চলেছে। প্রতিটি বর্ণ-এর পাশে যাচ্ছে, স্থির হচ্ছে না। স্থির হয়ে দাঁড়াচ্ছে না। অবশেষে 'এস' বর্ণর পাশে গিয়ে ঢাকনা স্থির হল। অনিমেষ জিজ্ঞাসা করল—'সুভাষবাবু এসেছেন?'

কোনও জবাব নেই। ঢাকনা পূর্ববৎ স্থির।

অনিমেষ আবার জানতে চায়, 'সুভাষদা! আপনি এসেছেন?' এভাবে বার পাঁচেক জিজ্ঞাসা করার পরই ঢাকনা নড়ে উঠল। সোজা চলে গেল, 'ওয়াই' বর্ণটির ওপর। কিছুক্ষণ নীরব থেকে অনিমেষ জানতে চাইল, 'আপনার ক্যান্সার হয়েছিল শুনেছি। কোথায় হয়েছিল? শরীরের কোন অংশে?'

ঢাকনা নড়ে উঠল। 'এন' বর্ণের উপর গিয়ে দাঁড়াল। অর্থাৎ, ক্যান্সার নয়? তবে?

কী হয়েছিল আপনার'? অনিমেষ প্রশ্ন করে।

'এইচ' বর্ণের ওপরে গিয়ে দাঁড়াল প্ল্যানচেটের প্রহরী। এইচ? এইচ দিয়ে...হার্ট নাকি...?'

'হার্ট'-এর অসুখ হয়েছিল আপনার?'

'ওয়াই বর্ণের ওপর দিয়ে তিরতির করে কাঁপে ঢাকনা। আঙুলের নীচে সেই কম্পন তিনজনেই অনুভব করে। এরপর আর প্রশ্ন করেনি ওরা। করতে পারেনি। সমস্ত অবস্থাটা এমন জায়গায় গিয়ে দাঁড়িয়েছিল, ওরা কথা বলতে পারেনি। ভয় ছাড়াও দুঃখবোধও ছিল। মৃত্যুর পরবর্তী অবস্থায় পৌঁছে চেনা মানুষটির সঙ্গ বেদনায় আক্রান্ত করেছিল ওদের।

প্রথম অভিজ্ঞতার আঁচ অবশ্য রজতাভকে চনমনে করে তুলল। প্রথমবার ও ছিল দর্শকের আসনে। দূরে বসেছিল। কিন্তু দেখেই, অর্ধেক অভিজ্ঞতা আয়ত্তে চলে এল। 'আমাকে একটা সুযোগ দাও।' 'বলে এমন কাকুতি মিনতি করতে লাগল যে অনিমেষ বাধ্য হল সেদিনের আসর সাজাতে।

শুভেন্দু বারণ করেছিল। কিন্তু রজতাভর জেদ জয়ী হল। ঘণ্টা খানেক বাদে ওরা ফের বসল। সেই ঘর। সেই একই অবস্থানে ওরা তিনজন। শুভেন্দু এবার দর্শকের আসনে। রজতাভকে বারণ করা হয়েছে শব্দ না করতে। অনিমেষ বারবার সাবধান করেছে, 'হঠাৎ করে উঠে দাঁড়াস না? ঢাকনা যেদিকে ঘুরছে, তার বিপরীতে নিয়ে যাওয়ার জন্য চাপ দিস না।' রজতাভ সায় দিয়েছে ওদের প্রস্তাবে। ঘর থমথমে। সাড়াশব্দ নেই। হঠাৎ রজতাভ বলে উঠল, 'ইস। কাকে ভাবব?'

অনিমেষ বলল, 'সারদাবাবুকে আমাদের কলেজের সারদাবাবু। গতবছর যিনি অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেলেন।'

'গত বছর? তিনি জন্ম নেননি বলছিস?' দেবব্রত পালটা প্রশ্ন করে।

দেবব্রতর কথায় যুক্তি আছে। অথবা যুক্তি নেই। কোনটাকে সে মেনে নেব বুঝতে পারল না অনিমেষ। রজতাভ বলল, 'আমি শুনেছি আত্মার নাকি ছায়া হয়। সে রয়ে যায় বাতাসে।'

'তাহলে?' জীবিত মানুষকে ডাকা হয় না কেন? তার আত্মার ছায়া তো বাতাস থেকে প্ল্যানচেটের আসরে আসতে পারে।' পাল্টা যুক্তি দেবব্রতর।

'তোরা কি ওসব নিয়ে থাকবি? সারদাবাবুকে আমরা তো তিনজনই ভালো করে চিনি। চল, তাকেই ভাবি। তার চেহারাটা ভাব। একমনে। কথা নয় একটিও আর।'

অনিমেষ বরাবর লিডার গোছের ছেলে। ওরা আর অমান্য করতে পারল না ওকে। একমনে সারদাবাবুকে নিয়ে ভাবতে বসল। ওদের কলেজের অফিস স্টাফ সারদাবাবু। বাহান্ন-তিপান্ন বছর বয়স ছিল তাঁর। রোড অ্যাক্সিডেন্টে মারা যান। লম্বা, দোহারা চেহারা। তামাটে গায়ের রং। মাথা জোড়া টাক। অল্প কটা চুল পেছন থেকে টেনে সামনে মাথার ওপর চাউমিনের মতো ছড়িয়ে রাখতেন। সরু গোঁফ সুন্দর করে ছাঁটা। চোখ দুটি ছিল সরু। থুতনিতে অল্প কটা দাড়ি ছিল। ওরা নাম দিয়েছিল চেঙ্গিস খান।

সেদিনও কলেজে এসেছেন। বাইকে চেপে যাতায়াত করতেন। কলেজ ছুটির পর সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাচ্ছেন, দেবব্রত পাশ কাটিয়ে ওপরে উঠছিল। তিনি বাইক চেপে ব্যাঙ্ক পর্যন্ত পৌঁছতেই একটা ট্রাক এসে ধাক্কা দিয়েছিল। তৎক্ষণাৎ মৃত্যু হয় তাঁর। শুনে দেবব্রত আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিল। আর অনিমেষ তো চোখের সামনে দেখেছিল কীভাবে ট্রাকটা এসে সারদাবাবুকে ধাক্কা মারল। রজতাভকে খুব ধমক দিয়েছিলেন সারদাবাবু। সারদাবাবুর কাছে জানতে চেয়েছিল আপনাদের বাৎসরিক বনধটা কবে?'

'ইয়ার্কি হচ্ছে?' বলে ধমক দিয়েছিলেন। রজতাভ ক'দিন সামনে যায়নি আর। সেই সারদাবাবু। বাড়িতে স্ত্রী আর... 'এ্যাই।' ফিসফিস করে ওঠে অনিমেষ। তিনজনের তর্জনীর নীচে নড়তে শুরু করেছে ঢাকনা। কোনো বর্ণমালার ওপর স্থির না হয়ে অবিরত ঘূর্ণ্যমান। সেই ঢাকনার দিকে ভয়ে ভয়ে তাকিয়ে থাকে ওরা। একসময়ে অনিমেষ প্রশ্ন করে, কে আপনি? সারদাবাবু এসেছেন কী? সারদাবাবু, আপনি এসেছেন? এসে থাকলে 'এস'-এর ওপর স্থির হন।'

রজতাভর চোখের সামনে যেন ম্যাজিক বা রহস্যময়তার দরজা খুলে যেতে থাকে। কৌটোর ঢাকনা আসতে আসতে 'এস'-এর ওপর স্থির হয়ে দাঁড়ায়।

'সারদাবাবু! আপনি কি ভালো আছেন?'

ঢাকনা চলে গেল 'এন-এর ওপর।'

যেখানে আছেন, সে জায়গাটা কীরকম? আলোকিত? নাকি অন্ধকার? ঢাকনা ফের 'এন' বর্ণের ওপর দিয়ে অবস্থান করল। কী বলতে চান সারদাবাবু? উনি ভালো নেই?

এই সময়ে একটা অদ্ভুত প্রশ্ন করে বসে রজতাভ, 'সারদাবাবু! শুনতে পাচ্ছেন? যেখানে আছেন, সেখানটা কী রকম? চেনাজানা কাউকে দেখেছেন সেখানে?'

ঢাকনাটা এন বর্ণের ওপর স্থির হয়ে রয়েছে। রজতাভ ছাড়ে না—'আপনার সঙ্গে কেউ আছে?'

ঢাকনা নাড়ল না।

আপনার ভালো লাগে ওখানে?'

ঢাকনা অস্থিরভাবে ঘোরাঘুরি করতে থাকে। অনিমেষ ভয় পাচ্ছিল। ঢাকনাকে সামলাতে পারছে না ওরা।

অনুরোধ করতে থাকে অনিমেষ—'চলে যান। আপনি চলে যান। প্লীজ! চলে যান।' ধীরে ধীরে ঢাকনার অস্থিরতা কমে আসে। এক সময়ে স্থির হয়ে পড়ে ঢাকনা। মোমবাতির ক্ষীণ আলো ঘরের ভেতরে আবছা আলো ছড়িয়ে আছে। ছায়া ছায়া কারা সব নড়েচড়ে! রজতাভ ভয়ে ভয়ে চারপাশে তাকায়। আসলে, এই ধরনের পরিবেশের সঙ্গে ও মোটেই পরিচিত ছিল না কখনও। প্রথম অভিজ্ঞতার ধাক্কা যথেষ্ট জোরদার হয়ে পড়েছে। একটু নার্ভাস ফিল করছিল ও! সেটা বুঝেই উঠে পড়ল অনিমেষ। সুইচ বোর্ডে আঙুল দিতে আলো জ্বলে উঠল। ঘরভরা আলোতে ভয়টয় হাওয়া। সারদাবাবু, সুভাষ মিত্র এক ফুৎকারে উড়ে গেছে যেন। তবুও রজতাভর চোখমুখ স্বাভাবিক হল না। অবস্থা বুঝে দেবব্রত এগিয়ে এল 'চা খাবে? গরম গরম চা খাই চল।' চা নয়, জল খেল রজতাভ। একটু সামলে নিতেই হাসল রজতাভ—'অভিজ্ঞতাটা দারুণ হল যাই বল অনিমেষদা! ভাবছি, ফের কখন বসব?'

'না। বার বার এসব কোরো না। এগুলো ছেলেখেলা নয়। আমরা বিশ্বাস করি বা না করি, মৃত্যুর পরবর্তী অবস্থাকে সামনে টেনে আনার কোনও মানে হয় না। অনিমেষ-এর গলার স্বরে কিছু ছিল যা রজতাভকে কথা বলতে দিল না। তারপর দুদিনও বেশ শান্তিতে কেটে গেল। চতুর্থ দিনে অনিমেষের বিশেষ কাজ থাকায় সকাল সকাল বেরিয়ে গেল ও। সময় নষ্ট করল না রজতাভ। পাশের বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে এল দেবব্রতকে। আর সব কাজের কাজি শুভেন্দু ছিল। নিয়ম মেনে তিনজনেই বসে পড়ল প্ল্যানচেটে। দেবব্রত আপত্তি করেছিল—'অনিমেষ বারণ করেছে। আমার বোধহয় তোমাদের বাধ্য দেওয়া উচিত। অথচ আমি তোমাদের দলে ঢুকে পড়েছি। ঠিক হচ্ছে না।'

আপত্তি টিকল না রজতাভর দাবিতে। কিন্তু কাজের কাজ কিছু হল না। প্ল্যানচেটে আত্মা এল কিনা বুঝতে পারছিল না ওরা। মাঝে মাঝে ঢাকনা অস্থির হয়ে ঘুরে চলে, মাঝে মাঝে থেমে থাকে অনন্তকালের জন্য। শেষ পর্যন্ত দেবব্রত চাপ দেয়—'উঠে পড়। আর নয়। ঝামেলায় পড়ে যাবে কিন্তু।'

আসর ভেঙে দেওয়া হল। উঠে আলো জ্বেলে ঘরের জানলা-দরজা খুলে সব কিছু আবার স্বাভাবিক ছন্দে এল। অনিমেষের মায়ের কাছে কিচেনে গিয়ে এঁচোড় খাওয়ার আবদার করল রজতাভ। বেলা দশটার সময় এঁচোড় খাওয়াতে হলে তার একটা প্রস্তুতি দরকার হয়। এঁচোড় কেটেকুটে রান্না করার ঝামেলা আছে। কিন্তু মায়েদের মন! রজতাভর মুখ চেয়ে এঁচোড় রাঁধার প্রোগ্রাম হল।

'কিন্তু বাবা! এঁচোড় পেছনের মালিবাড়ি গিয়ে গাছ থেকে পেড়ে আনতে হবে।' অনিমেষের মা হাসেন।

'গাছ থেকে গাছপাঁঠা আমি খুব ভালো আনতে জানি। এখনই যাব।

এখনই আনবো। পাঁচ মিনিট।' রজতাভ বরাবরই হুড়োহুড়ি করা ছেলে। ফটাফট চলে গেল বাগানে। বড়সড় এঁচোড় বেছে নিয়ে মাটিতে দাঁড়িয়ে বাঁশের খোঁচায় এঁচোড় পাড়তে চাইছিল। খোঁচাতে খোঁচাতে মাথাটা যেন পাগল পাগল ঠেকল। মাত্রাতিরিক্ত জেদী হয়ে উঠল ও। অবিরত খুঁচিয়ে চলল এঁচোড়টিকে। ও যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, তার ঠিক উলটো দিকে রয়েছে এঁচোড়। হঠাৎ-ই সম্পূর্ণ বিপরীতে ঘুরে রজতাভর কাঁধের ওপর এসে পড়ল এঁচোড়। অসহ্য যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠল রজতাভ। ছুটে এলেন অনিমেষের মা! মনে হয়েছিল কাঁধের হাড় ভেঙেছে। সেরকম কোনও অঘটন অবশ্য ঘটল না। ডাক্তার এল। যথাবিধি চিকিৎসার পর সুস্থ হল রজতাভ। আর তখনই অনিমেষের কাছে কথাটা পাড়ল দেবব্রত—'আমি বারণ করেছিলাম। শুনলো না। প্ল্যানচেট করেছিলাম ওই দিন! আমরা তিন জন। তুই চলে গেলি, তখন!'

তো? অনিমেষ কথার মর্মার্থ বুঝতে অপারগ।

'মনে হয় কোনও দুষ্ট আত্মা ওর দিকে এঁচোড়টা ছুঁড়ে দিয়েছিল।' দেবব্রত ইতস্তত করে। কথাটা বলতে গিয়েও বড্ড খেলো মনে হয়েছিল নিজেকে। কিন্তু না বলেও পারছিল না। এছাড়া অন্য কোনও ব্যাখ্যা আসছেও না ওর মনে।

'ধ্যাৎ'। হেসেছে অনিমেষ—' তোদের যা নির্বোধের কথা! আত্মার কি কোনও কাজকর্ম নেই নাকি? রজতাভর কাঁধের ওপর এঁচোড় ছুঁড়ে মারবে। ওটা রজতাভর-ই আত্মা!'

'কিন্তু, আমার যেন মনে হল....।' দেবব্রত শেষ চেষ্টা চালিয়ে যায়। অনিমেষ বিষয়ের গভীরে যাচ্ছে না।

—'বিষয়ের গভীরে বোধহয় আমিই গেছি। তোরাই যেতে পারছিস না বাস্তবে আয়। অবাস্তব ধারণা নিয়ে বসে থাকিস না তো!' মৃদু ধমক দিল অনিমেষ।

'কিন্তু...আমি একটা কথা বলি?' রজতাভ চুপচাপ সব দেখে যাচ্ছিল। এবার আর অপেক্ষা করে না ও বক্তব্যের চাপে পেট ফুলে উঠেছে ওর। প্রচুর কথা জমে আছে। সবটাই তো নিজের অনুভূতির কথা।

'কিসের অনুভূতি? তোরা পাগল করে দিবি নাকি?

একটা বেলা বাড়ি ছিলাম না। এরই মধ্যে কী যে করেছিস জানি না!' অনিমেষ বিরক্তি চাপে না।

'আসলে...কী হল....আমি তো এঁচোড় পাড়তে গেছি। বাঁশ দিয়ে খোঁচাতে খোঁচাতে....মানে গাছে উঠে এঁচোড় পাড়ার অভিজ্ঞতা তো নেই—তাই ভাবলাম, বাঁশের খোঁচায় এঁচোড় বেশ নেমে আসবে।'

—'এল?' একটুও হাসে না অনিমেষ।

—'কোথায়?' খুঁচিয়ে যাচ্ছি। প্রথমে সমস্ত ব্যাপারটা একদম স্বাভাবিক ছিল। কোথাও কোনও অঘটন ঘটার সামান্য চেষ্টা ছিল না। এমন সময় কী হল, আমার মাথার মধ্যে যেন পাগলামি চেপে গেল। উন্মাদ অবস্থা যাকে বলে। অসম্ভব জেদ চেপে গেল। মনে হল, যে করে হোক, এঁচোড়টা পাড়তে হবে। হবেই। আমার মানসিক অবস্থা বুঝেই এঁচোড়টা যেন বদমায়েশি করতে শুরু করেছে। কেবল দোল খেয়ে যাচ্ছে না। পড়ছে মাটিতে, না কিছু। শেষ পর্যন্ত পড়ল! কিন্তু মাটিতে নয়। কাঁধের ওপর।

'আক্কেল হল তো?' দেবব্রত ফোড়ন দেয়।

'হল মানে! কিন্তু বুদ্ধিতে কুলোচ্ছে না। গাছের ওপাশে ছিল এঁচোড়! কী করে ঘুরে গিয়ে আমার কাঁধে পড়ে? আমার জেদ-এর অর্থও আমার কাছে পরিষ্কার নয়। আবার এঁচোড়ের ব্রেন এর বজ্জাতিটাও পরিষ্কার নয়। এক একবার মনে হচ্ছে সত্যি হয়তো আত্মার কারবার।' রজতাভ বক্তব্য শেষ করে সবার মুখের দিকে ক্রমান্বয়ে তাকাল। অর্থাৎ ওর বক্তব্য শুনে কেউ ওকে সাপোর্ট করছে কিনা। অনিমেষ হয়তো হেসে উঠত বা আবার একটা ধমক দিত কি টিটকিরি দিত, শুভেন্দুর কথায় থেমে গেল ও। সামান্য গলা খাঁকারি দিল শুভেন্দু—'আমার কিন্তু দেবব্রত বা রজতাভর কথায় কোনও খামতি আছে বলে মনে হচ্ছে না! ওরা ঠিকই বলছে রে! কোও দুই আত্মা আজ ঝামেলা করছে।'

—'কী ব্যাপার? আমাকে সব খুলে বল দেখি।' অনিমেষের সন্দেহ হচ্ছিল এদের হাভভাব দেখে। কিছু একটা হয়েছে, অথচ পরিষ্কার করে কেউ কিছু জানাচ্ছে না।

—'আমিই বলছি।' শুভেন্দু দাঁড়িয়ে ছিল যেভাবে, সেভাবেই শুরু করে—'তুই চলে যাওয়ার পরই আমরা প্ল্যানচেট-এ বসি। ঠিক হয় কাউকে ডাকবো না। কেবল আমন্ত্রণ জানাব যে কোনও আত্মাকে। সেই ভেবে বসেছি। একমনে ডাকছি কেউ যদি থাকেন চলে আসুন। চেনা হোন, পরিচিত হোন বা আচেনা, অপরিচিত যেই হোন আসুন। বিশ্বাস করবি না, কৌটোর ঢাকনাটা যেভাবে ঘুরতে আরম্ভ করল তা বলার নয়। আমরা একটু নার্ভাস হয়েই আসর ভেঙে দিলাম।

'আসব ভেঙে দিলি মানে? ভয় পেয়ে উঠে দাঁড়ালি?' অনিমেষ আতঙ্কিত যেন।

'হ্যা। আমরা সত্যি খুব ভয় পেয়েছিলাম রে?' শুভেন্দু কাঁচুমাচু। 'তোরা আসর ভেঙে উঠে দাঁড়ালি। আত্মা অস্থির, আর তোরা আঙুল তুলে ফেললি, উঠে দাঁড়ালি? আঙুল তুলে ফেললি, উঠে দাঁড়ালি? আত্মাকে বিদায় না জানিয়েই?' অনিমেষ বিশ্বাস করতে পারছিল না যেন! দেবব্রত, রজতাভ এবং শুভেন্দু বজ্রাহতের মতো দাঁড়িয়ে থাকে। স্তব্ধ! অনিমেষ প্রত্যেকের মুখ লক্ষ কয়ে যায়—' তোরা কি সত্যি সত্যি কি তা-ই করেছিলি?'

—'আমরা... মাথায় ছিল না। আমরা কেউ ঠান্ডা মাথায় ছিলাম না। নার্ভাস হয়েই...। কিন্তু তুই সত্যি বলেছিস অনিমেষ। তখন যে-ই এসে থাকুক, আমরা তাকে বিদায় না জানিয়েই প্ল্যানচেট থেকে উঠে পড়েছিলাম। আত্মা তখনও ঘুর্ণাবৃত্ত-এর মধ্যে ছিল।' শুভেন্দু থেমে থেমে ঘটনার বিবরণ দেয়।

'আর সেই জন্য রজতাভ দুর্ঘটনার মধ্যে পড়ে। ও অস্থির হয়ে পড়েছিল হঠাৎই! ভাগ্য ভালো তোদের কোনও ক্ষীণশক্তির আত্মার হাতে পড়েছিলি তোরা। নাহলে এতক্ষণে যা হাল হত তোদের।'

সত্যি কি তাই? এভাবে কি আত্মা আসে? অনিমেষের মা যেমন হেসেছিলেন—। 'দূর! তোরা পারিসও। আত্মা কি ছোলা-মটর নাকি যে চাইলেই পাওয়া যাবে? ওগুলো তোদের মনের ধারণা। তোদেরই মানসিক দুর্বলতার চাপে কৌটোর ঢাকনা ঘোরে।'

হয়তো তাই। হয়তো নয়। কিন্তু সুভাষ মিত্র? অনিমেষ খোঁজ নিয়েছিল। সত্যি সুভাষ মিত্রের হার্ট-এর প্রবলেম ছিল। তাতেই তার মৃত্যু। সেটা কি ওদের মনের চাপে কৌটো ঘুরছিল? মনও অনেকখানি রহস্যময় বিষয়। একেও সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করা যায় না। অনিমেষ তখন কোনো মন্তব্য না করলেও পরে একদিন ধীরে সুস্থে একটা ঘটনা বলেছিল ওদের।

আমার মা যা বলেছেন, আমার নিজেরও সেটা মনে হয়। মনে হয় পুরো ব্যাপারটাই তৈরি করা। কাদের তৈরি? যারা আসরে বসে, তাদের। আত্মা কি খোলামকুচি নাকি যে ডাকলেই চলে আসবে? ঠিক। প্রশ্নটা আসতে পারে। যুক্তিও আছে। আবার, এর উল্টো প্রশ্নেরও কিন্তু যুক্তি আছে। যেমন ধরো, আমার জ্যেঠু। জ্যেঠুর অটল বিশ্বাস যে, এভাবেও আত্মা আসে। তাঁর নিজের ব্যবসা, মানে জ্যেঠুর শিলিগুড়িতে প্রমোটারি থেকে নানান ব্যবসা আছে, তো, প্রতিদিন প্ল্যানচেটের মাধ্যমে জ্যেঠু কিছু পরামর্শ নিয়ে রাখেন। আশ্চর্য ব্যাপার হল, কী করবেন, কী করবেন না, এই পরামর্শ দিতে আজ পর্যন্ত আত্মারা কখনও ব্যাজার হয়নি। জ্যেঠুর ধারণা বিশেষ একটি আত্মাই তাঁকে নিয়মিত পরামর্শ দেয়। তাতে কখনও জ্যেঠু ঠকেননি। এটা কী করে হয়? এটাও কি মনের বিকার?' ওরা তিনজন অনিমেষের প্রশ্নের জবাব দিতে পারছিল না।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%