ছাতিমের গন্ধ

সাগরিকা রায়

সুকান্ত বলল-ছাতিমের গন্ধ পাচ্ছি! আধো-অন্ধকারে সুকান্তর মুখটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। কেবলমাত্র অবয়বটুকু নিয়ে অস্তিত্বের জানান দিচ্ছিল ও। রাস্তটা শুনশান। অল্প অল্প চাঁদের আলো দু-পাশের জঙ্গল আর ঝোপঝাড়ে পড়ে মায়াবী করে তুলেছে রাস্তাটাকে। সুকান্ত বুক ভরে শ্বাস নিল। তারপর আরাম অথবা তৃপ্তির শ্বাস ফেলল,—আঃ! ছাতিমের গন্ধ ভারি সুন্দর, তাই না?

আমি নাক টেনেও কোনও গন্ধ পেলাম না। একটা বুনো বুনো গন্ধ পাচ্ছি অবশ্য। সেটা গালপালা, লতাপাতার। কিন্তু, ছাতিম...। নাঃ! এদিকে তো ছাতিম গাছ দেখছি না!

সুকান্ত একটু দাঁড়াল, 'আপনার সাহস আছে? আপনি সাহসী?' 'সাহস? কেন বলুন তো?' হঠাৎ সাহসের প্রসঙ্গে আমি কৌতূহলী হলাম।

'ছাতিমের গন্ধ পেলে ভয় পাবেন না তো? সবাই ভয় পায়।' সুকান্ত হাসল বোধহয়। অল্প হাসির শব্দ হল এই ফ্যাকাশে আলো-আঁধারির মধ্যে। আমার বোঝা উচিত ছিল, সাহসের প্রসঙ্গ যখন এসেছে, পরবর্তী ধাপে ভয়ের প্রসঙ্গ আসতে বাধ্য। কিন্তু, ছাতিমের গন্ধের সঙ্গে ভয়ের কারণটা কী? আমার অদ্ভুত লাগল। সুকান্ত এমন এমন সব কথা বলছে যার কূল-কিনারা পাচ্ছি না!

আমি পিছিয়ে পড়ছি দেখে সুকান্ত দাঁড়াল। জায়গাটা বেশ নির্জন। প্রায় আধঘণ্টা হল হাঁটছি, অথচ একটা লোক বা গাড়ি, বাইক কিচ্ছু এল-গেল না। মনুষ্যবিবর্জিত স্থান মনে হচ্ছে।

'এই রাস্তাটা সোজা চলে গেছে ওদলাবাড়ি, গোরুবাথান, পাঁপড়খেতি হয়ে লাভা-লোলেগাঁও। বিকেল হতে না হতে শুনশান হয়ে যায়। গাড়ি চলাচলও বন্ধ হয়ে যায়। দু-পাশে পাহাড়, জঙ্গল! বনের, পাহাড়ের শব্দ শোনা যায় এ সময়। ছেলেবেলায় পড়া সেই কবিতাটা মনে পড়ে। 'ফুটফুটে জোছনায়/ জেগে শুনি বিছানায়/ বনে কারা গান গায়/ ঝিমিঝিমি ঝুম ঝুম।' টানা কথা বলে থামল সুকান্ত—'এই সময়ে প্রতিদিন ঝুমঝুমির কথা মনে পড়ে আমার।'

'ওহো!' আমি হাসলাম, 'তার নাম বুঝি ঝুমঝুমি? তাকে বাড়িতে রেখে এসেছেন? নিয়ে আসা যেত না? অসুবিধে ছিল নিশ্চয়?' অনেকগুলো প্রশ্ন করে ফেললাম একবারে। অন্যের ব্যাপারে খুঁচিয়ে প্রশ্ন করা উচিত নয়।

'হ্যাঁ, সঙ্গে আনা অসুবিধে ছিল।' সুকান্ত কথা বাড়াল না দেখে আমি নিজেকে সংযত করলাম। আসলে সুকান্তকে আমি কিছুটা বুঝতে পারছিলাম অবশ্য। পরিবার থেকে দূরে থাকলে অনেকের মধ্যে এক ধরনের ডিপ্রেশন দেখা যায়। আমাদের দুজনের কেউ কথা বললাম না। চুপচাপ নিজের মনে চিন্তায় সঙ্গে হাঁটছি। কী ভাবছে সুকান্ত? ঝুমঝুমিকে?

'আঃ'! থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল সুকান্ত। নাক উঁচু করে শ্বাস নিল—'প্রাণটা ভয়ে যায়। আশ্চর্য! আপনি এখনও পাচ্ছেন না?'

বুঝলাম সুকান্ত ফের ছাতিমের গন্ধ পাচ্ছে। আশ্চর্য! সুকান্তর অবাক হওয়ার কথাই। আমি তো ছাতিম-টাতিম কিস্যুর গন্ধ পাচ্ছি না! অদ্ভুত! চারধারেই বুনো জংলি গন্ধ! ব্যাপারটা কী? আমি পাগল, না সুকান্ত? নাকি সুকান্ত মজা করছে আমার সঙ্গে? এটা কিন্তু এক ধরনের র‍্যাগিং! ভোলেভালা চেহারার ছেলেটা ছুপা রুস্তম নাকি? দেখতে হচ্ছে ব্যাপারটা! কিন্তু ও হঠাৎ আমার মতো সদ্য চেনা লোকের সঙ্গে ছেলেমানুষি করবে কেন?

এখানকার একটা কলেজে কেমেস্ট্রি পড়ায়। আদতে গম্ভীর স্বভাবের বলেই মনে হচ্ছে। অবশ্য মানুষের বুকের বাঁদিকে হার্ট নামক যে ভেতর-ফাঁপা, কোণ আকৃতির, পেশিবহুল যন্ত্রটি আছে, তার ভেতরে কী কী চক্রান্ত চলছে কে জানে! যদি সত্যিই ধূর্তামি করে, তাহলে পুলিশ কেস করে দেব। আই বি ডিপার্টমেন্টের রবিন আমার জিগরি দোস্ত, ফেসবুক দোস্ত, ওকে লেলিয়ে কাজ উদ্ধার করব। তোমার নারকো টেস্ট করে ফেলব। লাই ডিটেক্টর মেশিনে বসাব। রবিনের ক্ষমতা জানো না তো সুকান্ত! হুঃ!

'আমাদের বোধহয় ফেরা উচিত এবার!' আমি কিঞ্চিৎ উদ্বিগ্নভাব দেখালাম, এসব দিকে জঙ্গি মানে টেররিস্ট নেই?'

'নেই মনে হয়।' সুকান্ত হাসল থাকলে আমি অন্তত দেখতে পেতাম। আমার এই যে চোখ দুটো দেখছেন, এরা জাস্ট আই বল মাত্র নয়। রেটিনা আর কর্নিয়া ইত্যাদির বাইরে অন্য কিছু আছে এই চোখে। সবাই যা দেখে, আমি তা থেকে একটু বেশি দেখি।'

'আচ্ছা! তাহলে, এখানে থেকেই কলকাতার অখিল মিস্ত্রি লেনের ঝুমঝুমিকে দেখে ফেলতে পারেন!' আমি বলটা ছুঁড়লাম। এবার চাপটা কীভাবে নেয় সুকান্ত সেটাই দেখার।

'আপনাকে কি বলেছি অখিল মিস্ত্রি লেনেই ঝুমঝুমি থাকে?' সুকান্ত মাথা হেঁট করে হাঁটছিল।

আমি থতমত খেলাম। 'স্যরি'! বলা ছাড়া আর উপায় কী? বেফাঁস কথা বলাটা ভুল হল। এই প্রথম একটা সাইকেল চলে গেল আমাদের পাশ দিয়ে। খুব ব্যস্ত-সমস্তভাবে কেউ চলে গেল। আমরা সাইডওয়াকে চলে গেলাম। আরোহী বোধহয় এ সময় রাস্তাটা জনহীন ভেবেছিল। ব্রেক সামাল দিতে দিতে ওর মুখ দিয়ে দুটো শব্দ বেরিয়ে এল—'তেরো বাউ!' গালাগালি দিল নাকি?

ক'টা বাজে এখন? দীপঙ্কর আর তপন সাড়ে ন'টার পর চ্যাটে থাকবে। এখন ফেরা উচিত।

'ঝুমঝুমি ওখানে থাকে না! অখিল মিস্ত্রি লেনের কথা বলছি। ওর সঙ্গে আমার বিয়ে হয়নি। ওর শৌর্যের সঙ্গে বিয়ে হয়েছে। শিলিগুড়িতে।' সুকান্ত মুখ তুলে আকাশ দেখল—'কিন্তু একটা সমস্যা হয়েছে। প্রবলেম। সেটা ফেস করছি আমি।'

সুকান্তকে আমি মোটামুটি ঠিকই বুঝেছিলাম। ওর ব্যক্তিগত একটা সমস্যা আছে। সেই সমস্যা থেকেই ওর মধ্যে অদ্ভুত টানাপোড়েন চলছে। ঝুমঝুমির সঙ্গে ওর বিয়ে হয়নি। সেই চিরাচরিত ব্যর্থ প্রেমের গল্প। দেওদাস! পারো।

সুকান্তর উচিত চটপট বিয়ে করে ফেলা। সংসার নামক সার্কাসের ম্যানেজারি পেলে ডিপ্রেশন ধারেকাছে ঘেঁষবার সাহস পাবে না। ছাতিম-ফাতিম তখন ডাস্টবিনের মাল। সুকান্ত আমাকে কিছু বলতে চায়। ওর সমস্যার কথা। যে সমস্যা ও নিজে সামাল দিতে পারছে না। কাউন্সেলিং দরকার ওর। হয়তো আমাকে ভরসা করতে চাচ্ছে!

'চলুন ওইখানে বসি।' সামান্য দূরে বটগাছের বাঁধানো বেদি দেখাই সুকান্তকে। সুকান্ত চুপচাপ চলে এল আমার পাশাপাশি। আসলে ও ঝুমঝুমির মধ্যে বুঁদ হয়ে আছে।

অনেকটা সময় হেঁটেছি টানা। বটগাছের নীচে বহুদিন আগে কেউ বা কারা সিমেন্ট দিয়ে বাঁধিয়েছিল। গাছের ওপর আশ্রিত পাখিদের উসখুস শুনতে পাচ্ছি। জ্যোৎস্নার আলো ম্লান হয়ে গেছে এখন। একটু যেন আলো-ছায়া ভাব। সমস্ত পৃথিবী নিঃশব্দ হয়ে আছে। অপূর্ব এই তন্ময়তা। ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘের গায়ে চলকে পড়েছে মরা চাঁদ। সব মিলে উদাসীন পরাজগৎ তৈরি হয়েছে। সুকান্তর মনও এইরকম উদাসীন, নিঃশব্দ হয়ে আছে।

'এখন বলুন, কী প্রবলেম ফেস করছেন আপনি? বলে ফেলুন ফটাফট।'

সুকান্ত কিছুক্ষণ কথা বলল না। তারপর সহজ গলায় সমস্যাটা জানাল।

'ঝুমঝুমি আমার সঙ্গে দেখা করতে চায়।'

'তাতে সমস্যা কী? দেখা করুন। ওর বক্তব্য শুনুন।' আর সেটা যদি অসম্ভব হয়, তাহলে সরাসরি জানিয়ে দিন যে, যা মিটে গেছে, তাকে আর নতুন করে জিইয়ে রাখা উচিত নয়। কথাগুলো বলেই মনে হল, আমি হয়তো সুকান্তর অবস্থাটা বুঝতে পারছি না। ওর জায়গায় না থেকে চটপট সমাধান করা সহজ। ভালোবেসেছিল একসময়। আজও ভুলতে পারছে না। ঝুমঝুমির অবস্থাও কি একইরকম? ও-ও কি ভোলেনি সুকান্তকে? তাহলে বিয়ে করল কেন শৌর্যকে?

'আমিও ভেবেছিলাম একথা। আসলে চিরচরিত সেই এক গল্প। ভালো পাত্র। ব্রাইট ফিউচার। সেখানে আমি এম এসসি কমপ্লিট করিনি তখনও। ঝুমঝুমির সঙ্গে শৌর্যের আলাপ থেকে...! আমি হাওয়া হয়ে গেলাম ওদের মানে ঝুমঝুমির কাছে। জাল ফেলে বন্ধু ধরা তো আমার স্বভাব নয়। শৌর্যের কথা প্রথম বলেছে আমাকে ঝুমঝুমি। ওকে মিরচি বলে ডাকত শৌর্য। মজার মজার কথাবার্তা হত। আস্তে আস্তে আমার সঙ্গে দেখা করা ছেড়ে দিল ঝুমঝুমি। সারাক্ষণ চ্যাট করছে। বিয়েও হল। আনন্দে চলে গেল সংসার করতে।' মরা চাঁদের মতো হাসল সুকান্ত, 'এখন আবার দেখা করতে চায়!'

'দুঃখবিলাস আর কী! হয়তো শৌর্য সময়-টময় দিতে পারছে না কাজে চাপে। সুতরাং....!' সুকান্তর জন্য কষ্ট হচ্ছিল আমার।

'ছাতিমের গন্ধ পাচ্ছি আবার! ঘুম এসে যায় যেন!' চোখ বুজে বাতাস শুঁকছিল সুকান্ত। দেখাদেখি আমিও চোখ বুজলাম। বাতাস শুঁকলাম। কিন্তু...! নাঃ! আমার কপালে, মানে নাকে ছাতিম নেই! ব্যাপারটার কোনও লজিক পাচ্ছি না!

জোর করেই ফিরে এসেছি। সুকান্ত আর আমার বাসস্থান একটিই। মিসেস খনা বকসির মেসবাড়ি। বরং পেয়িং গেস্ট বলাই ভালো। জোরাজুরি করে সুকান্তকে তুলেছি বটবৃক্ষের প্রস্তরবেদি থাকে। শাহরুখ থেকে অনুষ্কা শর্মা পর্যন্ত আলোচনা করে করে মুখে ফেনা তুলে ফেলেছি। মাঝে একবার শর্টশার্ট এবং ফর্মাল নিয়েও কথা চালিয়েছি। জাপানের ভূমিকম্পও বাদ যায়নি।

সুকান্তকে অনেকট ফ্রেশ দেখাচ্ছিল লাস্ট মোমেন্ট পর্যন্ত। মিসেস বকসির গুহায় ঢুকে ও চলে গেছে ওর ঘরে। দশটায় ডিনার। এখন ন'টা। কম্পিউটার অন করে বসে পড়লাম। তপন, দীপঙ্কর, প্রবীর লাইনে আছে। মৌকণাও আছে। কম্পু ছিল বলে। নয়তো প্রিয় সঙ্গগুলি কোথায় পেতাম।

গতকাল ফারফ্রম দ্য ম্যাডিং ক্রাউডটা ডাউনলোড করেছি। গন উইথ দ্য উইন্ড আমার হেভভি ফেভারিট। হিচককের সাইকোর পঞ্চাশ হল। ওটা দেখব আজ রাতে। এ নিয়ে প্রায় পঞ্চাশবার হবে বোধহয় দেখা। জোলির বা কালেক্টর দেখেছি পরশু ট্রেনে আসতে আসতে। সুকান্তকে দেখতে হবে এসব সিনেমা। ওর নিশ্চয় দেখা। আচ্ছা! ও কি কম্পি-ইউজ করে না? করলে তো ঝুমঝুমির সঙ্গে যোগাযোগ করে নিতে পারত! ঠিক। ঝুমঝুমির ই-মেল আইডি জোগাড় করত হতে তাহলে! দেখা যাক সুকান্ত কী বলে!

ডাইনিং টেবিলে সুকান্তকে দেখলাম না। ও নাকি আগেই খেয়ে নিয়েছে। একটু অবাক হলাম। অর্থাৎ ও একা থাকতে চাচ্ছে। ছেলেটা সত্যি পাগল। অল্প ডোজের ঘুমের ওষুধ দেব নাকি? ওর ঘুম দরকার। সারাক্ষণ দুশ্চিন্তার মধ্যে থাকলে মাথা কাজ করে না!

খেয়ে উঠে ওর ঘরের সামনে গিয়ে দেখি দরজা বন্ধ। আলো নেভানো। শুয়ে পড়েছে নিশ্চয়। থাক, ডিস্টার্ব না করাই ভালো। ঘুম থেকে তুলে ঘুমের ওষুধ খাওয়ানোটা জাস্ট জোক ছাড়া আর কী?

কম্পিউটার অন করে সাইকো দেখছিলাম। অনেকবার দেখা ছবি। অন্য কোনও ছবি দেখব নাকি? দ্য শাইনিংটা...না, দ্য হান্টিং কানেকশনটা দেখব। গৌতমেন্দু বলেছিল এটার কথা। নিঝঝুম রাত, বিছানায় শুয়ে হরর ফিল্ম দেখার মজা উপভোগ করব। আরাম খুঁজে নিতে হয় বস। কেউ বডি পিয়ার্সিং-এ আরাম পায়, কেউ ট্যাটু করে আরাম পায়, কেউ স্রেফ গপসপ করে।

সুকান্ত জেগে থাকলে ওকে ডেকে নিতাম। সম্পর্ক-টম্পর্ক ব্রেক আপ করলে মন থেকে সব ঝেড়ে ফেল। ফালতু প্রব খাড়া করার সময় কোথায় স্যর এই গতির যুগে? সুকান্ত ইনট্রোভার্ট ছেলে। সেরকম ভাবলে আমার জীবনে দিয়া ছিল। বুবুল ছিল। নিভা ছিল। ছিল তো ছিল। পটেনি, সরে পড়েছে ওরা। কখনও আমি সরেছি।—সেটা সম্পর্ক থেকে সরেছি। কিন্তু ফেন্ডশিপ থেকে তো সরিনি। এখনও...এই যে! মেসেজ এল নিভার! কল সেন্টারে কাজ পেয়েছে। কনগ্রা পাঠালাম।

ঘুম পাচ্ছে! কাল সারাদিন ঘোরাঘুরি আছে। মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টিটিভ-এর চাকরি। কোম্পানির প্রোডাক্ট বিক্রি করি! সারাক্ষণ কথার চাষ। আহ! হাই উঠছে।...দুদিনের কাজ। আগামীকাল কাজ শেষ করে পরশু সকালে কলকাতা! ওরে এম. আর, এবারে শুয়ে পড়। এসব জায়গায় ঘুম ঘুম ভাব আছে। ঝিমঝিম ভাব। আলস্য কাটে না। এ জন্যই সুকান্ত কেমন লেজি...! বোরিং পাবলিক।

বাইকে চাবি ঘুরিয়ে ছোটা এখানে সম্ভব নয়। রিকশ ভরসা। প্যাঁক প্যাঁক শব্দে রিকশ ছুটছে। সারাটা দিন ছুটেছি। সবেমাত্র চেনাশোনা হচ্ছে। ডাক্তারকে ব্রিফ করে করে এগোচ্ছি। মোটামুটি ভালোই মনে হচ্ছে মার্কেট। এখন খনার গুহায় ঢুকে পহেলে নাহানা, বাদমে খানা।

সুকান্ত দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে। গতকাল সেই যে ঘরে ঢুকেছে, আজ দেখা হল। স্নান সেরে কালো কফিতে চুমুক দিচ্ছি, সুকান্ত এল। একটু ইতস্ত ভাব। ওর এই ভাবটা মজাদার। জড়তা এখনও কাটেনি এমন। সদ্যোজাতর মতো!

'তারপর? বলুন!' ইশারায় বসতে বললাম।

'কী প্রোগ্রাম আজ? হাঁটতে বের হবেন? আমি যাচ্ছিলাম, তাই ভাবলাম...।'

অর্থাৎ, না বলা বাণীর আজ প্রকাশ পাওয়ার দিন। আজ ঝেড়ে কাশবে সুকান্ত। ব্যর্থ প্রাণের আবর্জনা আজ যদি পুড়িয়ে না ফেলে তো রিং-এ দেখা হবে সুকান্ত।

হেসে বললাম—'অফকোর্স। হাঁটি হাঁটি পা পা / যথা খুশি তথা যা...। চলুন।'

উত্তরবঙ্গের সন্ধেটা স্নিগ্ধ। একটু ঠান্ডা ঠান্ডা হাওয়া কানের পাশ কাটিয়ে লুকোচুরি খেলে। মাথার ওপর বিস্তীর্ণ আকাশ। চাঁদ এখন সরু একফালি পাঁচ টাকা পিস কুমড়োর মতো। সরু সরু লম্বাটে কালো মেঘ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। কাল বাড়িতে ফিরব। পরশু থেকে আই পি এল শুরু। এরকম নিস্তরঙ্গ জীবন কলকাতাতে ইমাজিন হয় না। গাছপালা, ধু ধু মাঠ, আদিম প্রকৃতির মানুষ। শহর অঞ্চল ছাড়ালেই শুনশান চারপাশ, অনাবিল বাতাস।

'চলুন, ওই দিকে যাই। ভালো লাগে।' সুকান্ত আঙুল তুলে সেদিকটা দেখাল, ওইদিকে গতকালও গেছি। আপত্তি করলাম না। ওর মেজাজ মতো চলে দেখি কী হয়! হাঁটছি। রশিদ খান-এর 'আওগে যব তুম সাজনা'-গুনগুন করছি। সুকান্ত অভ্যেসমতো মাথা হেঁট করে হাঁটছে। মুখে শব্দ নেই। ওহো! সেই ব্যর্থ প্রেমের ঝুমঝুমি বাজছে ওর প্রাণে! ভুলে মেরে দিয়েছিলাম। স্যরি বস!

'আপনি ঝুমঝুমির সঙ্গে ফেসেবুকে যোগাযোগ করছেন না কেন?' সুকান্ত চমকে গেল যেন। চটপট নিজেকে সামলেও নিল—হ্যাঁ! ভাবছি!

'ওর সেলফোন নম্বর তো আছে। ফোন করে জানতে চান কেন যোগাযোগ করতে চাচ্ছে? আফটার অল ও মানে উনি আপনার বেষ্ট ফ্রেন্ড ছিলেন। মানে আছেন।' আমি সুকান্তর মনের দরজাটা খুলে দিতে চাইছিলাম।

'ওর ফোন নম্বর আমার কাছে নেই।' সুকান্ত বটগাছের নীচের বাঁধানো জায়গাটা হাত দিয়ে ঝেড়ে নিল, তারপর বসল, 'এদিকে অনেক সময় নির্বিষ সাপ থাকে। ঢোঁড়া। লোকাল টার্ম হল ঘেণ্টি। ঘেণ্টি সাপ। কামড়ায় না। বড্ড ভিতু। দেখে বসুন।

সাপ শুনে সতর্ক হলাম। পশুপ্রেমী হিসেবে আমার খ্যাতি আছে। কিন্তু এই শীতল সরীসৃপটিকে ঠিক মেন নিতে পারি না। শিরশির করে। অ্যানিম্যাল প্ল্যানেট ছাড়া সাপ সামনাসামনি দেখতেও চাই না। সাবধানে বসতে যাচ্ছি, সুকান্ত বলল,—'কাল চলে যাচ্ছেন?'

'হ্যাঁ। তবে আসতে হবে মাঝে মাঝে। আপনার মোবাইল নম্বরটা দেবেন। আপনি এখানে কতদিন আছেন?' এককথায় খুলে গেল সুকান্তর দু-বছর! এক বছর এগারো মাস দুদিন। তখন মিসেস বকসির ছ'জন পি.জি ছিল। আমাকে নিয়ে। পরে ঋতব্রত চলে যায়। একদিন মাঝরাতে ওর খুব পেটে ব্যথা হল। সেদিন মিসেস বকসির মেসে তিনজন ছিলাম। উইক এন্ডে চলে যায় বাকিরা।

মিসেস বকসির ইনসমনিয়া আছে। ওষুধ খেয়ে ঘুমোন। কাকে ডাকব ভেবে পাচ্ছি না। দীপেন সরকার কেবল 'কী মুশকিল, কী মুশকিল' করে যাচ্ছেন। ডিসিশন নিতে পারছি না। আমাদের রান্না করে যে পরিমল, আপনি তো দেখেছেন, এখনও ও-ই রান্না করে, সে বলল, পাশের বাড়িতে নাকি ডাক্তার থাকেন।

মাত্র দেড়দিন হল এসেছি। নিজের ঘরটাই ভালো করে দেখা হয়নি, পাশের বাড়ি দেখব কখন? আমি পরিমলকে বললাম, 'আপনি তো চেনেন, ডাক্তার ডেকে আনুন।' বলে 'দূর, এত রাতে আমাকে পাত্তা দেবে না। রাগী লোক। আমার ভয় করে।' ভাবুন! অজানা জায়গায় কী ঝামেলায় পড়েছিলাম!

'ডাক্তারের ফোন নম্বর আছে? জিজ্ঞাসা করলাম পরিমলকে। তো পরিমল হাত উলটে বলে—নাঃ!

এদিকে ঋতব্রতর অবস্থা চোখে দেখা যায় না। শেষ পর্যন্ত আমি ডাক্তারের বাড়ির অবস্থান জেনে দৌড়ে বের হলাম। ল্যাম্পপোস্টগুলোর অবস্থা তো দেখছেন। ঠিকঠাক জ্বলে না। তখন একটা মাত্র ল্যাম্পপোস্ট ওই রাস্তায়। তা সেটাও বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে। পাশাপাশি তিনটে বাড়ি দেখলাম। তিনটেই একইরকম দেখতে। সব বাড়িগুলো অন্ধকারে ডুবে আছে। এর ভেতরে ডাক্তার কোন বাড়িতে থাকেন বুঝতে পারছিলাম না। হঠাৎ মনে হল তিন নম্বর বাড়িটাতে একটু একটু আলো দেখা যাচ্ছে। নীল নীল আলো। নাইট ল্যাম্পের আলো যেমন হয়। আলো দেখলে ভরসা হয়। আমি তাড়াতাড়ি গিয়ে দাঁড়ালাম।

বাড়ির সামনে...,'চলুন একটু হাঁটি।' সুকান্ত কথা থামিয়ে উঠে পড়ল। হাঁটতেও শুরু করল সামনের দিকে। ওর এই ব্যাপারটা একটু অদ্ভুত। ঝট করে ডিসিশন নিয়ে নেয় কারও পরামর্শ না নিয়ে। ও উঠে পড়ল। আমিও। বসে থেকে একা একা করবটা কী? তাছাড়া ঋতব্রতর জন্য ডাক্তার পাওয়া গেল কি না জানা হল না। অন্ধকার রাস্তায় সামান্য আলোর আভাস। সাপ যদি থাকে বুঝতে পারব কিনা...। হ্যাট হ্যাট শব্দ করলাম।

'তারপর? বাড়িটার সামনে পৌঁছে গেলেন? আমি কথার সুতো ধরিয়ে দিলাম—ডাক্তার পেলেন? অন্য ডাক্তার কেউ নেই এদিকে?'

'আগে শুনুন। বাড়ির সামনে...গেটের দু-পাশে দুটো ফুলে ভরা ছাতিম গাছ। কী মোহময় গন্ধ! ছাতিমের প্রতি আমার টান আছে। গন্ধটা খুব ভালো লাগে। কী বলব, এত সুগন্ধ! আমার ঘোর লেগে যাচ্ছিল। তিন-চার ধাপ সিঁড়ি দেখা যাচ্ছে অল্প আলোতে। সিঁড়ি টপকে উঠলাম। ডোর বেল বাজালাম। দুবার। তিনবার। চারবার। এবার মনে হল দরজার ওপাশে কেউ এসে দাঁড়িয়েছে। অস্পষ্ট উপস্থিতি বোঝা যাচ্ছে যেন।

মহিলা কণ্ঠে প্রশ্ন এল—'কে!' একটু ফিসফিস শব্দ। ভয়ে ভয়ে কথা বললে যেমন হয়। আমি বন্ধ দরজার এপাশ থেকে যথাসম্ভব ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলার পর ওপাশ থেকে একটা শব্দ এল। দীর্ঘশ্বাস ফেললে যেমন হয়...! তারপর আর কোনও শব্দ নেই! আবার বেল বাজালাম। আবার। আবার। কোনও সাড়া নেই। কেউ হেঁটে চলে যাচ্ছে যেন দূরে।'

সুকান্ত হাঁপাচ্ছিল। ওর অবস্থা দেখে অবাক হলাম। 'তারপর'? আমি দাঁড়িয়ে পড়লাম। সুকান্ত ঘাড় নীচু করে হাঁটছিল। ও থেমে গেল। কী ভয়ংকর অভিজ্ঞতা! এসব কি সত্যি হয়েছিল?

'পরিমল আমার দেরি দেখে দীপেন সরকারকে দিয়ে কাকে ডেকে এনেছিল। ঋতব্রতকে পাঁচ মাইল দূরের হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হয়। গ্যাসট্রিক আলসার না প্যাংক্রিয়াসের প্রবলেম ছিল বলে মনে হচ্ছে। ভুলে গেছি। পরে তো ঋতব্রত চলে যায়।

'এমন একটা ব্যাপার ঘটেছিল, কাউকে বললেন না? দরজা খুললেন না ভদ্রমহিলা...!' আমার পুরো বিষয়টা বেশ রহস্যময় মনে হচ্ছিল। সুকান্ত এক মুহূর্ত মাত্র আমার দিকে তাকাল। তারপর নাক টেনে বলল, 'ছাতিমের গন্ধ! পাচ্ছেন? না? যে পায় সে অজানা জগৎকে দেখতে পায়! আমার সেই অভিজ্ঞতার সময়ও এই গন্ধ পেয়েছিলাম।

'আপনি পাচ্ছেন। আপনি কি অজানা জগৎ দেখে ফেলেছেন?' হাসছিলাম। সুকান্ত অবশ্য হাসল না। কিছু ভাবছিল যেন।

'পরদিন কী হল জানেন? যাকেই গত রাতের ঘটনা বলি, সে-ই হাসে। বলে, দিনের আলোয় দেখে আসুন। ওখানে দুটো মাত্র বাড়ি আছে। ডাক্তার চট্টরাজ আর দীপঙ্কর ডাক্তার দত্তর! যার রিসর্ট আছে লাটাগুড়িতে। তিন নম্বর বাড়িই নেই!'

বিশ্বাস হল না ওদের কথা। এমন জলজ্যন্ত রাত আমি ভুলব কী করে? ছুটে গেলাম। আশ্চর্য! পরপর দুটো বাড়ি! তিন নম্বরে যে বাড়িটা ছিল সেটার চিহ্নমাত্র নেই। এমনকী ছাতিমগাছ দুটোরও। ছোট ছোট ছেলেরা খেলাধুলো করছিল। ফাঁকা জায়গা। ঠিক মাঠ নয়।'

'তারপর?' আমার কৌতূহল হচ্ছিল। এরকম হতে পারে কখনও?

'আমিও তাই ভাবছিলাম। সবাই বলল, ওটা আমার ভ্রম। ওখানে কেন, এ অঞ্চলেই ছাতিম নেই! ঘুমচোখে নাকি ভুলভাল দেখেছি। কিন্তু, ছাতিমই দেখব কেন? অন্য কিছু তো দেখতে পারতাম।...ওই যে! আবার একঝলক ছাতিমের গন্ধ! আপনি পাচ্ছেন না, সত্যি? গন্ধটা পেলেই মনে হয় বন্ধ দরজাটা এখনই খুলে যাবে।...ওই যে! দূরে মিসেস বকসির বাড়িটা দেখছেন? এই যে এদিকে...ঠিক ওখানে আমি তিন নম্বর বাড়িটা দেখেছিলাম।' সত্যি কি সুকান্ত কিছু দেখেছিল? নাকি সত্যি বিভ্রম?

'আপনি কিছু দেখছেন? আমি হয়তো আবারও দেখতে পারি বাড়িটা। ওই রকম একটা বাড়ির নকশা মনে মনে কল্পনা করেছিলাম একদিন। গেটের দু'পাশে ছাতিম থাকবে। জানতো ঝুমঝুমি।' সুকান্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

'ওঃ! আপনার ঝুমঝুমির সঙ্গে যোগাযোগ করা দরকার। এগুলো অবচেতন মনের কাণ্ড। আসলে চেতন মন আর অবচেতন মন...!' আমি থেমে গেলাম।

সুকান্ত হাসল।

'আপনারা জানেন না। বুঝতে পারছেন না। ঝুমঝুমি আমার সঙ্গে যোগাযোগ করছে তো। ওই যে ছাতিমের গন্ধ! ওই বাড়ি! দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে ও! আমি জানি। ও কষ্ট পাচ্ছে আমার জন্য।'

আমার কিন্তু সুকান্তর জন্য কষ্ট হল। মানসিকভাবে অসুস্থ সুকান্ত। ওর ফ্যামিলির এসব জানা দরকার। ওর সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে যাওয়া দরকার। শুধু বাড়ি নয়, গাছ, ফুল, গন্ধ...এমনকী নীল নীল আলোও দেখে ফেলেছে বেচারি! ভালোবেসে আঘাত পেয়েছিল। ওর অজান্তে সেই ব্যথা মহীরুহ হয়ে উঠেছে ভেতরে ভেতরে।

আমার সঙ্গে পড়ত দৃপ্ত। ওর তো শরীর খারাপ হয়ে গিয়েছিল মিতুর সঙ্গে রোহনের বিয়ে হওয়ার পর। হরিদ্বারে চলে গিয়েছিল। এখন অবশ্য ঘোর সংসারী। পয়লা বৈশাখে বিগ বাজারে গিয়েছিল বউ-ছেলে নিয়ে। সুকান্ত একা হয়ে পড়েছে বলে ওর কেসটা অনেক গভীরে চলে গেছে। যা নেই, তাকে আছে ভাবছে।

'আপনাকে সৎ পরামর্শ দেব, শুনবেন? আপনি এ সপ্তাহেই ঝুমঝুমির সঙ্গে দেখা করুন। ও যোগাযোগ করেছে কার মারফত? ফোন নম্বর নেই বলছেন!'

'ফোন করেনি। সংকেত দিচ্ছে! বললাম না আপনাকে। ওই বাড়ি, ফুলের গন্ধ...সব ঝুমঝুমির সংকেত!'

'উনি কি ম্যাজিক জানেন যে এভাবে যোগাযোগ করছেন?' আমি একটু রেগে গেলাম সত্যি!

'ম্যাজিক জানে না। ভুল বুঝে ক্ষমা চাচ্ছে ঝুমঝুমি! শৌর্যর সঙ্গে বিয়ের এক বছর পর ও তো সুইসাইড করেছে। আমার ধারণা মেরে ঝুলিয়ে দিয়েছিল শৌর্য। প্রমাণের অভাবে ছাড়া পেয়ে গেছে। হঠাৎ-ই সেদিন...ছাতিমের গাছ, গন্ধ, ওই বাড়ি দেখিয়ে ঝুমঝুমি আমাকে বলছে ও ভুল করেছিল! বিশ্বাস করছেন তো কথা?' সুকান্ত কাতর চোখে তাকিয়ে ছিল আমার দিকে। ওই দৃষ্টি দেখে আমার মনে হল সুকান্ত মিথ্যে বলছে না হয়তো। কিন্তু এমন কথা বিশ্বাস করাও তো...!

ওকে মিথ্যে আশ্বাস দিয়ে বোকা বানিয়ে রাখাও ঠিক নয়! বললাম, 'চলুন, ঘরে যাই। গরম কফি খেতে ইচ্ছে করছে।'

সুকান্ত বুঝল আমাকে। 'কী করে বিশ্বাস করবেন আমাকে! এ তো অনুভবের ব্যাপার। আপনি তো সেই জায়গায় যেতে পারবেন না। শুধু আমি বুঝতে পারছি। দরজাটা একদিন ঠিক খুলে যাবে দেখবেন।'

হাসতে গিয়ে থেমে গেলাম। পা যেন মাটির সঙ্গে আটকে গেল। একঝলক টাটকা বাতাসের সঙ্গে ভেসে এল গাঢ় সুবাস। ফুলের গন্ধ! ছাতিম ফুলের গন্ধ! সুকান্তর কথার সত্যতার প্রমাণ।

আমি চমকে তাকালাম। সুকান্ত থেমে পড়ে আমাকেই দেখছিল! ও বুঝেছে সব।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%