সাগরিকা রায়

ট্রেনে উঠেই মুড খারাপ হয়ে গেল শ্রেয়ার। সাইড আপারে সিট, নীচে বসার জায়গা বলতে কিচ্ছু নেই! সারাক্ষণ কি ওপরে উঠে থাকা যায়? নাকি সেটা সম্ভব! একটা ফুল ফ্যামিলি জাঁকিয়ে বসেছে। পাশের কামরা থেকে রিলেটিভরা এসে আড্ডা জমিয়ে দিয়েছে।
কেঁইমেই, এর দাপটে শ্রেয়ার কান ঝাঁঝাঁ করছিল। তপন অবশ্য একধারে ঠেলেঠুলে জায়গা করে নিয়েছে। কিন্তু শ্রেয়া কী করে ওই ভিড়ে ঠাসা সিটের ভেতরে ঢুকবে ভেবে পেল না!
কিছু মহিলা বেশ খেয়াল করেছে শ্রেয়াকে। কিন্তু গ্রাহ্য না করে বিয়েবাড়িতে কী কী মজা হয়েছে, তার ডিটেইলসে চলে যাচ্ছে! কে একজন নতুন বরের মাসির হাঁটা নকল করে দেখিয়ে দিল!
শ্রেয়া তপনের দিকে তাকিয়ে রাগটা বোঝাতে চেষ্টা করছিল। কিন্তু সেটা বুঝেই তপন শ্রেয়ার দিকে তাকাচ্ছেই না! কোনোরকমে একটু বসার মতো অবস্থার সম্মুখীন হয়ে বেঁচে গেল ও।
এখন রাত সাড়ে দশটা। এরা কেউ আজ ঘুমোবে কিনা সন্দেহ আছে। প্ল্যানটা সেরকমই বলে মনে হচ্ছে। কথাবার্তায় পুরো আড্ডার মতলব রাতভর। কিন্তু বয়স্ক দু-তিনজন আছেন। তাঁরা মোটেই রাজি নন এই প্রস্তাবে।
মাথা নেড়েই চলেছেন পৃথুলা মহিলাটি। সুন্দরী ছিলেন একসময়ে। এখনও খানিক ছাপ রয়ে গেছে স্মৃতি হয়ে। তিনি প্রবল আপত্তি জানাচ্ছেন,—মাথা খারাপ হয়ে গেছে তোমাদের। কাল পৌঁছে অনেকেই অফিসে যাবে। সেটা ভুলেছ নাকি? আজ রেস্ট নিয়ে নাও। বিয়েবাড়িতে হুল্লোড় কম হয়েছে বুঝি? অনিয়মের চরম করে এসেছ সব! হুঁ!
কড়া শাসনে কাজ হল। মিনমিন করে ধীরে ধীরে কামরা ফাঁকা হতে শুরু করল। শ্রেয়া শুয়ে পড়বে ভেবেছিল। এক বয়স্ক অবাঙালি ভদ্রলোক লোয়ারে সিট পড়াতে ভারি অসন্তুষ্ট ভঙ্গিতে মাথা নাড়ছেন। এদিক-ওদিক তাকাচ্ছেন। ভদ্রলোককে একবার জিগ্যেস করে দেখাই যাক! কিছু কি মনে করবেন? আস্তে আস্তে শ্রেয়া যেচে প্রশ্ন করল,—আপনার কি লোয়ার? মানে লোয়ার ভালো লাগে না বুঝি? আপনাকে দেখে মনে হল কিনা, তাই বলছি।
—হাঁ। বহোত তকলিফ হোগা। রাতভর ভেন্ডারকো আনা যানা...! বিলকুল আচ্ছা নেহি লাগতা। পর, কেয়া করে! নসিব মে যো লিখা হ্যায়, ওহি হোগা ভাই! নিদ গয়ে আজ! ট্রেনমে ভি ইতনা বাতে কিঁউ? ঘরমে করনা চাহিয়ে! সব পাগল লাগতা।
—তাহলে আমি আপারে আছি। পালটে নিতে পারেন। শ্রেয়া এই সুযোগ ছাড়তে চাইল না। ও বরাবর লোয়ার সিট পছন্দ করে থাকে।
—ঠিক হ্যায়। আরে ভাই ঠিক হ্যায়। বহোত আচ্ছা হুয়া। বলেই লোকটি আপারে উঠে বসতে তৈরি হয়ে গেল। চটপট নিজের ব্যাগটি মাথার কাছে গুছিয়ে রাখল। একটি কালো মাঝারি মাপের ব্যাগ নিজের হাতে রেখে কষ্ট করে করে আপারে উঠে গেল।
শ্রেয়ার মন বলছিল, ওই ছোট কালো ব্যাগে নিশ্চয় মূল্যবান কিছু আছে। কারণ লোকটি ব্যাগটিকে হাতছাড়া করছে না। ওটা বগলের নীচে চেপে রেখে ওঠানামা করে চলেছে। হ্যাঁ, ওঠা আর নামা! কতবার যে এই ওঠা আর নামা চলল, তার ঠিক, ঠিকানা নেই! নামছে যখন, তখন অদ্ভুত ভাবে শ্রেয়ার সিটে একটা পা রেখে পরে দ্বিতীয় পা-টি রেখে নীচে নামছেন।
সত্যি বলতে শ্রেয়া শান্তিতে বসতে পারছিল না। লোকটা কেন ছোট সিঁড়িটা ব্যবহার করছে না! এভাবে সারারাত কি উনি হাইজাম্প লং জাম্প খেলে যাবেন নাকি? স্বস্তি খুঁজতে গিয়ে যে বিরাট অস্বস্তি শুরু হল! কি কুক্ষণেই না লোকটিকে আপার সিট অফার করেছিল!
খানিক পরে ঘুমিয়ে পড়েছে শ্রেয়া। তপন অনেকক্ষণ হল আপারে উঠে গেছে। ও লাইট ঘুমের ওষুধ ছাড়া ঘুমোতে পারে না। সুতরাং ঘুমিয়ে পড়েছে। আলো নিভে যাচ্ছে একে একে। শ্রেয়া মাঝে মাঝেই টের পাচ্ছিল লোকটা নামছে। উঠছে। আসলে ডায়াবিটিক পেসেন্ট। ওঁর উচিত ছিল লোয়ারের সিটে থাকা।
মানুষ কত অদ্ভুত যে হয়! ভেন্ডাররা যাতায়াত করে বিরক্ত করবে বলে লোয়ার ছেড়ে দিলেও শ্রেয়া যে বিরক্ত হতে পারে, সেকথা বুঝছে না। স্বার্থপর। নিজে সাড়ে সত্তরবার ওয়াশরুমে যাচ্ছে! আর খুবই আশ্চর্যের ঘটনা হল, যতবার যাচ্ছে, ব্যাগটা ঠিক বগলে চেপে নিয়ে যাচ্ছে! ভারী মোটা ব্যাগ, ওভাবে নিতে অসুবিধে যে হচ্ছে, সেটা দেখেই বোঝা যাচ্ছে বেশ! তবু...!
এমন কি দুর্মূল্য পদার্থ আছে ওতে? হিরে-মাণিক? গুপ্তধন? আরে, সেদিন ইউটিউবে একটা ঘটনা দেখল। কোন এক পুরনো বাড়ির মেঝে খুঁড়ে তিনশো কোটি টাকা মূল্যের হিরে-মাণিক, স্বর্ণমুদ্রা পেয়েছে কারা যেন!
ইস! কত টাকা! কত বড়লোক হয়ে গেছে যারা পেয়েছে! শ্রেয়া লোকগুলোর কথা ভাবছিল। এত এত টাকা দিয়ে লোকে কী করে? এসব ভাবতে ভাবতে ঘুমের পুরো বারোটা ছেড়ে চব্বিশটা বেজে গেল। শ্রেয়া তাকিয়ে রইল শুয়ে শুয়ে।
ঘুম ভালো হয় না গাড়িতে। শ্রেয়া চুপ করে শুয়ে থাকতে থাকতে মাঝে মাঝে তন্দ্রাভিভূত হয়ে পড়ছিল। লোকটা নেমে ওয়াশরুমের দিকে যাচ্ছে যখন, তখন কোন এক স্টেশনে গাড়ি থেমেছে। কিছু প্যাসেঞ্জারের কথাবার্তা, মাল টানাটানির হালকা শব্দে রাতের গাম্ভীর্য একটু লঘু হতে হতে ফের জমাট হয়ে উঠছিল। শ্রেয়া চোখ মেলে তাকিয়ে দেখল, কারা সব খুস-খাস ঢুকে পড়ল যে-যার সিটে। মোবাইল ফোন নিয়ে সময় দেখল শ্রেয়া। দুটো বেজে দশ। বিয়েবাড়ি পার্টির সেই পৃথুলা মহিলাটি উঠে জল খেলেন বোতল থেকে। একবার শ্রেয়ার দিকে তাকালেন। ফের শুয়ে পড়লেন।
চোখ বুজে ফেলতে ফেলতে শ্রেয়া খেয়াল করল সেই লোকটি এখনও ফেরেনি ওয়াশরুম থেকে! এতক্ষণ ধরে কী এমন কম্মো করছেন উনি? বিরক্ত করে ছেড়েছেন। এবারে শ্রেয়া সাফ বলে দেবে, সিঁড়ি ইউজ করতে! কিন্তু লোকটা অনেকক্ষণ হল গেছে! হঠাৎ করে কিছু হল না তো? আর ব্যাগটা বারবার সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছেন যে কেন!
শ্রেয়া খেয়াল করছে, আর অন্য কেউ কি খেয়াল করছে না? কতরকম মানুষ থাকে ট্রেনে! লোকটা যেভাবে ব্যাগ আঁকড়ে যাতায়াত করছে, যার নজর দেওয়ার, সে ঠিকই নজর দিচ্ছে! কে জানে, ব্যাগ কেড়ে নিয়ে দরজা দিয়ে ঠেলে বাইরে ফেলে দিয়েছে কিনা এতক্ষণে! সঙ্গে কেউ আসেনি। একা একা দামি জিনিস বা বেশি টাকা নিয়ে আসাই বা কেন?
শ্রেয়ার বুক ধুকপুক করতে শুরু করল। লোকটার কোন বিপদ হল নাতো? উঠে গিয়ে দেখবে শ্রেয়া? সেটা কি ঠিক হবে? তপনও এমন ঘুম ঘুমোয়! কুম্ভকর্ণ! চোখ মেলে তাকিয়ে থেকে লোকটির জন্য অপেক্ষা করছিল শ্রেয়া। কেন যে লোকটা বারবার ওয়াশরুমের দিকে যাচ্ছে! গলা ভিজিয়ে আসছে কি? না, না। তাহলে গন্ধে টের পেত শ্রেয়া।
কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে চোখ বুজে ফেলল ও। যাও বাবা! পরের ছেলে পরমানন্দ, আমাকে বলে তো আর যাওনি! আমি কেন তোমার ভাবনা ভেবে নিজের স্বস্তি নষ্ট করি? চিন্তাটা মাথা থেকে সরাতে সরাতেই চলে এল লোকটা। কেমন একটু হুমড়ি খেয়ে খেয়ে হাঁটছে! বয়স্ক লোক, একা একা যাতায়াত করা বা কেন!
শ্রেয়া লোকটার ফিরে আসা অনুভব করে তাকিয়ে দেখল, লোকটার হাতে কালো ব্যাগটা কোলের বাচ্চার মতো নিশ্চিন্তে নিরাপদেই রয়েছে। লোকটা উঠে পড়ল পুরনো কায়দার মতোই শ্রেয়ার পায়ের দিকে ঝাঁকি মেরে লাফিয়ে।
শ্রেয়া ভাবল, লোকটা কি ঘুমোবে না? আচ্ছা, এত যত্নে রাখা ব্যাগ, শোওয়ার পরে কোথায় রাখছে ব্যাগটাকে? কী আছে ব্যাগে? টাকা? কত টাকা? নিশ্চয় অনেক অনেক টাকা। সব যদি দু-হাজার টাকার নোটের বান্ডিল হয়, তাহলে ওই ব্যাগে কম করে বিশলাখ টাকা আছে! হুম। সিওর। আর সেই কারণেই লোকটা ব্যাগটাকে কাছছাড়া করছে না। সত্যি কি লোকটার ব্যাগে টাকা আছে?
উত্তেজনায় শ্রেয়ার চোখ থেকে ঘুম উড়ে গেল। বিশলাখ টাকা! ইস! যদি শ্রেয়ার কাছে অত টাকা থাকত! কত কিছু করতে পারত শ্রেয়া! এত এত টাকা গুনতো দীপকের চাচা গঙ্গাপ্রসাদ। রোজ রাতে দোকানের ঝাঁপ অর্ধেক বন্ধ করে ক্যাশ বের করে গুনতে বসত।
কয়েকদিন ধরেই নেপালি বস্তির ছেলেরা দেখেছে গঙ্গাপ্রসাদের অমর কীর্তি। একটা খেলনা পিস্তল নিয়ে এসে দেড়লাখ টাকা আর গঙ্গাপ্রসাদের সোনার চেন গলা থেকে খুলে নিয়ে হাওয়া। টাকা দেখালে সৎ মানুষ অসৎ হয়ে যেতে বেশিক্ষণ সময় নেয় না।
শ্রেয়া নীচে শুয়ে আছে।
লোকটা আপারে, ঠিক শ্রেয়ার সিটের ওপরের সিটটাতে। নীচে থেকে টেনে নামালে কেমন হয়? আস্তে আস্তে ব্যাগটাকে নামিয়ে নিয়ে দেখতে পারবে কী আছে ওতে! যদি টাকা থাকে?
ধুর, ওসব ভেবে লাভ নেই। বরং একটু ঘুমিয়ে নিলে শরীর ঝরঝরে হবে। পাশ ফিরে ঘুমের আরাধনা শুরু করলেও কালো ব্যাগটা মাথায় উঠে ভেংচি কাটতে লেগেছে। ধরতে পারলি না, না! আমার পেটে কী আছে, জানতে পারলি না, না! শ্রেয়া পরিষ্কার দেখতে পেল গজগজ করে হাসছে বান্ডিলে আটকে রাখা নোটগুলো- হাই শ্রেয়াজি, আইয়ে না, পকড়কে দেখিয়ে না।
তপন ডাকতেই ঘুম ভেঙে গেল। ভোর হয়ে গেছে? গাড়ি ফাঁকা ঠেকছে! এ কী? প্যাসেঞ্জারেরা কোথায় গেল?
—হবে না? তোমাকে ডেকেই যাচ্ছি, উঠছ না। নাও, ফ্রেস হয়ে নেওয়ার সময় নেই। চটপট ট্যাক্সির লাইনে দাঁড়াতে হবে।
তাড়াহুড়ো করে উঠে বসতেই মাথার ওপরের বার্থে ঠাই করে ব্যথা পেল শ্রেয়া। উফ, লোকটা এখনও ওঠেনি?
নীচে নেমে আপার বার্থের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠল শ্রেয়া। লোকটা চলে গেছে। মালপত্র নেই। কিন্তু বালিশের নীচে ওটা...! দম আটকে গেল শ্রেয়ার। কী দেখছে ও?
লোকটা কালো ব্যাগটা রেখে গেছে ভুল করে। শ্রেয়া দ্রুত তপনের দিকে তাকাল। তপন নীচু হয়ে সিটের তলা থেকে ব্যাগ টেনে বের করছিল। শ্রেয়ার দিকে পেছন ফিরে আছে। শ্রেয়া তপনকে লুকিয়ে বালিশের তল থেকে লোকটার কালো ব্যাগটা সাবধানে বাঁ-হাতের নীচে দোপাট্টার আড়ালে চেপে রাখল। নিজের হাতব্যাগটা ডান কাঁধে ঝুলিয়ে নিল। তপন ততক্ষণে ট্রলিব্যাগ নিয়েছে হাতে। দুজনেই নেমে পড়ল। শ্রেয়া দ্রুত হাঁটছিল। তপন পেছন থেকে জোরে ডেকে উঠল—আস্তে। ট্যাক্সি স্ট্যান্ডের দিকে চল।
শ্রেয়া পেছন ফিরে তাকিয়ে একটু হাসল। ফের ছুটে ছুটে ট্যাক্সি স্ট্যান্ডের দিকে যাচ্ছিল ও। তপন এসে ওর পেছনে দাঁড়াতে দাঁড়াতেই লাইনে চলে এল ওরা। চটপট ট্যাক্সিতে উঠে বসল দুজনে। শ্রেয়া তপনের বাঁ-দিকে এমনভাবে বসল, যাতে তপনের থেকে কালো ব্যাগটাকে লুকিয়ে রাখতে পারা যায়। গাড়ি ছুটছে। অথচ শ্রেয়ার মনে হল, কেন আরও স্পিড নিচ্ছে না গাড়িটা! অনেক টাকা ওর কাছে এখন। কত কিছু করতে পারবে শ্রেয়া! কত কিছু! ভাড়ার ফ্ল্যাটটাকে কিনে নিতে পারে! বা, একটা গাড়ি! বা, বা! কতকিছু করতে পারে শ্রেয়া!
—কী হল? কথার জবাব দিচ্ছ না! তপনের কথাগুলো ছিটকে এল। শ্রেয়া চমকে উঠেছে। কিছু বলছিল তপন। শ্রেয়া নিজের ভাবনায় আটকে ছিল বলে শুনতে পায়নি। খানিকটা বিরক্তই হল শ্রেয়া। তপন মাঝে মাঝে এত বিরক্তিকর হয়ে ওঠে যে বলার না। কখনও একা থাকতে দেবে না। কাউকে ফোন করছে দেখলে বারবার প্রশ্ন করবে,—কাকে ফোন করছে শ্রেয়া! হয়তো সাদা মনেই প্রশ্ন করে। কিন্তু ভালো লাগে না এসব।
—শ্রেয়া, কী হল? ডাকছি, কথা বলছ না!
—আমার কপাল ব্যথা করছে। টিপটিপ করছে। কথা বলতে ভালো লাগছে না!
—ওহ, আচ্ছা আচ্ছা! ওষুধ দেব বাড়িতে গিয়ে। চুপ করে বসে থাক।
শ্রেয়া রাস্তার দিকে তাকিয়ে শপিংমলগুলির জেগে ওঠা দেখছিল। বুটিকের শাড়ি কেনার খুব ইচ্ছে ছিল। একবার দুটো দোপাট্টা চোখ টেনেছিল খুব। তপনকে নিয়েই ঢুকেছিল বুটিকের ভেতরে। সোনা রঙের সিল্কের দোপাট্টায় ছোট ছোট জরির ফুল, সরু পাড়ে তুঁতে রং! আরেকটি ছিল অফ হোয়াইট কালারের। দুপাশের আঁচলে লাল সুতোর ভারী ঝুমকো! এক একটি পাঁচ হাজার টাকা!
তপন অসহায় চোখে তাকিয়েছিল শ্রেয়ার দিকে। শ্রেয়ার মোটেই কষ্ট হয়নি তপনের জন্য। বরং রাগ হয়েছিল। বিয়ে করেছে, অথচ বউ-এর সামান্য দোপাট্টার শখ মেটাতে পারে না! ক্ষোভ নিয়েই বেরিয়ে এসেছিল বুটিক থেকে।
এখন সেই ক্ষোভ নেই। মন ফুরফুরে হয়ে আছে। সেই বুটিকটাতেই যাবে। দুটো দোপাট্টাই কিনে নেবে। আর ...একদিন আইনক্সে যাবে। কতদিন সিনেমায় যায়নি! আর একটা বিখ্যাত জুয়েলার্সের ছোট্ট হীরের নাকছাবি। হাসিমারার মাসির নাকে যেমনটি দেখেছে। আচ্ছা, মাসি কি সেইজন্য খুব নাক নেড়ে নেড়ে কথা বলে? হি হি হি!
পাশ দিয়ে গাড়ির স্রোত ভেসে যাচ্ছে। শ্রেয়া শাহরিক জীবনের স্বাদ নিচ্ছিল চেটেপুটে। চোখ মেলে দেখার সময় পায় না এসব। সারাক্ষণ কেবল দিন যাপনের গ্লানিতে আটকে আছে। আজকের দিনটা একেবারে অন্যরকম। স্ট্রেস লেস। এরকম একটা জীবন পেলে কোনো অসুখ বাসা বাঁধতে পারে না শরীরে। মনেও।
বুকের গভীরে এই জীবনের বাসনাই আটকে ছিল। বুঝতে পারেনি শ্রেয়া। ওই যে, বিশাল হোটেলটা! ওখানে পয়লা বৈশাখে লাঞ্চ করবে দুজনে। তেমন হলে সল্টলেক থেকে মৃদুলদের ডেকে নেবে।
মৃদুল আর মৃদুলের বউ চম্পা। ওরা খুব বাইরে খেতে ভালবাসে। কতদিন শ্রেয়াকে খাইয়েছে আর্সালানে। আচ্ছা, বিরিয়ানি সবচেয়ে ভালো করে কারা? কী হল? তেমন হলে বেড়াতে চলে যাবে। ভেনিস! আহা হা! কতদিনের ইচ্ছে!
গাড়িটা বাঁক নিতে যাচ্ছে। শ্রেয়া চোখ বুজল। আর একটু পরেই বাড়ি। এবারে বিগবাজার থেকে সুন্দর সুন্দর পর্দা কিনবে। যেমনটা সিরিয়ালে দেখায়, ঠিক তেমন। শীতকালে গঙ্গার ওপর লঞ্চে পিকনিক। জীবনটা সুন্দর করতে কিছু টাকা চাই। বাকিটা তোমার হাতে। আচ্ছা...উফ...! আহ! মাগো যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে উঠল শ্রেয়া।
প্রবল শব্দে আছড়ে পড়ল গাড়ি! কী ভয়ঙ্কর শব্দ! সব যেন তছনছ হয়ে গেল! তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে শরীরটা। কী অসীম যন্ত্রণায় শরীর ছেড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে আত্মা। প্রাণ।
গাড়িসুদ্ধ লোক আচমকা গাড়ি থেমে যাওয়াতে প্রবল ঝাঁকি খেয়েছে। আপার বার্থ থেকে পড়ে গেছে একটি ছেলে। বছর পঁচিশ হবে বয়স। খুব ব্যথা পেয়েছে। কী হল ট্রেন লাইনে! যাত্রীদের মধ্যে হুড়োহুড়ি পড়ল। উৎসাহী জনেরা নেমে গিয়ে শুনে এবং দেখে রেল লাইনে কারা কলাগাছ ফেলে রেখেছে।
আচমকা ট্রেন থেমে যাওয়ায় ঝাঁকুনি লেগেছে যাত্রীদের! কেউ কেউ ঘুমিয়েছিল। তারা ব্যথাটা বেশিই পেয়েছে। আচমকা প্রবল ঝাঁকুনিতে দু-একজন ছিটকে পড়েছে। একজন বেশিরকম জখম হয়েছে!
এত জোর ঝাঁকুনি! আরও কারা সব ছিটকে পড়েছে। তারা লোয়ার বার্থেরই প্যাসেঞ্জার। শ্রেয়াও পড়েছে! ঘুমিয়েছিল বলে টের পায়নি। পড়েছে, নিজেকে সামলে নেওয়ার আগেই। স্বপ্ন দেখতে দেখতেই। স্বপ্নের ভেতরে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে পড়ে গেছে শ্রেয়া। একটা চমৎকার স্বপ্নের ভেতরে থাকতে থাকতে পড়ে গেছে! বেচারি!
তপন তেমন ব্যথা পায়নি। মাথায় চোট লেগেছে। সে-ও মারাত্মক কিছু নয়। কিন্তু শ্রেয়া নড়াচড়া করছে না! সিট থেকে মেঝেতে পড়েই অজ্ঞান হয়ে গেছে বুঝি? তপন তাড়াতাড়ি করে শ্রেয়াকে তুলে বসাতে গিয়ে স্তম্ভিত হয়ে গেল। শ্রেয়া অসাড় কেন? তপন চিৎকার করে ওঠে—শ্রেয়া! শ্রেয়া! কথা বল! কী হল তোমার? শ্রেয়া! কী আশ্চর্য! শ্রেয়া কথা বলছে না কেন! কেউ ডাক্তার আছেন এখানে? প্লিজ, আসুন। একটু দেখুন।
পিঙ্ক দোপাট্টায় ছোট ছোট ফুল ছড়িয়ে আছে শ্রেয়ার শরীরটাকে ঘিরে। উপুড় হয়ে পড়ে আছে শ্রেয়া। চুলগুলো একপাশে জড়ো হওয়া।
কিছুক্ষণের মধ্যে ভয়ঙ্কর সত্যটা সামনে চলে এল। শ্রেয়া আর বেঁচে নেই। হঠাৎ করে পড়ে গিয়ে মারা গেছে। আপার বার্থের লোকটা এতক্ষণ নীচে নামেনি। এবারে কালো ব্যাগটা চেপে ধরেই নেমে এলেন—ইয়ে ক্যা হো গয়া রে ভাই! লোয়ার সে গিরকে মর গয়ি! হায় রাম!
ভিড় জমে গেল ওদের কামরায়। বিয়েবাড়ি পার্টির পৃথুলা মহিলাটি শ্রেয়ার মৃত শরীরটা দেখে ভয়বিহ্বল গলায় চিৎকার করে উঠল—কী আশ্চর্য! এই মহিলা মারা গেছেন মানে? এই মিনিট দুই হবে, একটু আগেই এই মহিলাকে দেখলাম একটা কালো ব্যাগ বুকে চেপে ধরে দরজার দিকে চলে যাচ্ছেন! খুব তাড়াতাড়ি হাঁটছিলেন। যেন খুব তাড়া আছে! উনি চলন্ত ট্রেন থেকে কোথায় যাচ্ছেন ভেবে অবাক হয়েছিলাম। কিন্তু মরে গেলেন কী করে!!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন