সাগরিকা রায়

কখনও এমন হয়। আমাদের অবচেতন মন থেকে কোনও একটি দৃশ্য বা ছবি উঠে আসে স্বপ্নের ভেতর। কতবার এমন হয় কোনও ঘটনা ঘটেছে, সেই মুহূর্তে মনে হয় ঘটনাটি আমার জানা। এরকমটাই আমি দেখেছি আগে। সেই দেখা হয় স্বপ্নের ভেতর, নয়তো ভাবীকালের বাতাস এসে সে খবর দিয়ে গেছে!
স্বপ্নদৃশ্যের বাস্তব চেহারা দেখা গেছে, বা দেখেছে এমন অনেককে জানি। ঠিক সেরকম একজন নীলাদ্রিবাবু। সমুদ্র দেখতে গেছেন পুরীতে। সবই স্বাভাবিক ছিল। বাদ সাধল একটি লোক। অতি সাধারণ চেহারার লোকটির ধুতি-কুর্তাটাও যথেষ্ট পরিষ্কার নয়। সমুদ্রের ঢেউ হাতে তুলে কী বিড়বিড় করছিল লোকটি। তারপর সেই জলকে ফের ফিরিয়ে দিল সমুদ্রে। পেছন ফিরে চলে যাচ্ছে লোকটি। নীলাদ্রি কৌতূহলী হয়েই পেছন ফিরে লোকটিকে দেখছিলেন। চলে গেল লোকটি। সমুদ্রে বেড়াতে আসা পর্যটকদের ভিড়ে মিলিয়ে গেল সে।
এখানেই মিটে গেল। যদি এমনটা হত, তাতে ঝামেলা থাকত না। কিন্তু যা ভাবা যায়, তা হয় না সবসময়। যেমন হল না নীলাদ্রির ক্ষেত্রে। সমুদ্রের নোনাজল গায়ে মেখে স্নান সেরে হোটেলে ফিরে গেলেন। চিংড়ি খেলেন। সারা বিকেল ঘুরে বেড়ালেন এখানে ওখানে। সব ঘটল স্বাভাবিক ছন্দে। রাতে নিয়ম মতো শুতে গেলেন। আর তারপরই ঘটল অদ্ভুত ঘটনা।
সেই ঘটনা ঘটল মধ্যরাতে। কোথায় কী লুকিয়ে ছিল মনের কোণে। একে একে সব বেরিয়ে এল তা নয়। বেছে বেছে তারই ভেতর থেকে একজন বেরিয়ে এল। ঘন কুয়াশার ভেতর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন নীলাদ্রি।
এলাকাটা পাহাড়ি এলাকা। নির্জন পথ। সরু সর্পিল। কুয়াশায় ভিজে গেছে মাটি, গাছ, পাথর। ঠান্ডায় জমে যাচ্ছেন যেন। এক জায়গায় দেখলেন একটি মন্দির। জাঁকজমকহীন। পথের ধারে অনাড়ম্বর একটি ঘর। বিশাল শিবলিঙ্গ এখানে পূজিত হন। কিছু ফুল, বেলপাতা, আতপ চাল লিঙ্গের গায়ে ছড়িয়ে আছে।
শীতল আবহাওয়ার নীলাদ্রি গুটিশুটি হয়ে যাচ্ছিলেন। কে একজন তামার পাত্রে তাঁকে চরণামৃত দিল। হাত বাড়িয়ে চরণামৃত নিলেন নীলাদ্রি। চরণামৃত নিতে গিয়ে চমকে উঠলেন। সমুদ্র তীরের সেই লোকটি। নির্বিকার মুখে সে চরণামৃত দিয়েছে নীলাদ্রিকে। তারপর এগিয়ে যেতে বলল। হাত নেড়ে বলল যাও।
ঘুম ভেঙে যেতে স্বপ্নটা অবাস্তব হয়ে গেল সত্যিই, কিন্তু হারিয়ে গেল না। বরং উলটোটাই হল। তিনি ভাবলেন হয়তো গতজন্মের কোনও দৃশ্য তিনি দেখেছেন। ওই লোকটির সঙ্গে তাঁর হয়তো কোনও সম্পর্ক ছিল। যাকে আত্মীয়তার সম্পর্ক বলে। তাঁর মনে হল, লোকটিকে তাঁর চাই। একবার অন্তত। তাকে জিজ্ঞাসা করতে হবে সে কোনও শিবমন্দিরের পূজারী কি না। অথবা তাঁর বাবা, কাকা কেউ কখনও পূজারী ছিল কিনা!
বিষয়টি নিয়ে নীলাদ্রি এত বেশি ভাবলেন যে এক সময় তাঁর স্থির বিশ্বাস হল লোকটির সঙ্গে তাঁর একটা সম্পর্ক ছিল।
সেদিন সারাটাক্ষণ তিনি সমুদ্রের তীরে কাটালেন। পরদিনও এবং তার পরদিনও। রোদে ঝলসে গেলেন কখনও। কখনও ঝেপে বৃষ্টি এল। ভিজে গিয়ে কাঁপলেন। তবু, ঠায় দাঁড়িয়ে রইলেন। যদি লোকটি আসে। ওকে তাঁর খুব দরকার। এত এত মানুষ থাকতে সে কেন নীলাদ্রির স্বপ্নের ভেতরে ঢুকে পড়ে? চরণামৃত খাওয়ায়।
সমুদ্রে বসবাসের একটা নির্দিষ্ট সময়সীমা আছে। সেই সীমা একসময় অতিক্রান্ত হল। তাঁকে ফিরে আসতে হল নিজস্ব আবাসস্থলে। স্বপ্নের কথাটা বলেছিলেন পাশের ব্লকের কৌশিকবাবুকে। কৌশিক চট্টোপাধ্যায়। জ্যোতিষ-ট্যোতিষ খুব মানেন। হাত ভরতি নবগ্রহকে সন্তুষ্ট রাখার নানান উপায় ঝকমক করে। তিনি বলেছেন, এ দৃশ্য হয়তো তাঁর জীবনে আরও একবার দেখা যাবে। এ রকমটা হয় কখনও!
জীবনের পঞ্চান্নটি বছর তো লোকটিকে ছাড়াই কেটে গেছে। ভালোই কেটেছে। ছেলেমেয়ে-স্ত্রীকে নিয়ে সুখের সংসার। বেড়াতে ভালোবাসেন। সমুদ্রে যাবেন ঠিক করেছেন। স্ত্রী ও সঙ্গী। কিন্তু লাস্টমোমেন্টে স্ত্রী বের হতে পারলেন না। মানে সমুদ্রে গেলেন না। তিনি গেলেন ছেলের শালার হঠাৎ বিয়ের পার্টি অ্যাটেন্ড করতে! তাঁকে সেখানে যেতে হল। সুতরাং নীলাদ্রি একাই চলে গিয়েছলেন। স্ত্রী সঙ্গে থাকলে তিনিও লোকটিকে দেখতে পেতেন। বলা যায় না, মেয়েলি কৌতূহলের বশে, সমুদ্রের ঢেউ হাতে তুলে লোকটি বিড়বিড় করে কী বলছে জানতে হয়তো একসেকেন্ড সময় নিতেন না। এসব সময় পথে নারী কতটা গ্রহণীয়া সে কে আর বুঝবে?
কৌশিক চট্টোপাধ্যায়ের আশ্বাস শুনে নীলাদ্রি একটু শান্তি পেয়েছিলেন। তারপর যখন ধীরে ধীরে সংসারের বাতাসে ফের রপ্ত হলেন, যখন অফিসে বসে দে বাবু, সিনহা, অভিজিতের সঙ্গে ঘর কাঁপিয়ে বিদেশি মুদ্রা বিনিয়োগ, রপ্তানি বাণিজ্য, কার্পোরেট কালচার নিয়ে মাথা ঘামাতে শুরু করলেন, সব কিছু ফের স্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছিল। পাহাড়ি এলাকা, অনাড়ম্বর মন্দিরটি, তার পূজারী....আস্তে আস্তে মিশে যাচ্ছিল শহুরে হাওয়ায়। তবু, কখনও কখনও ভাবেননি তা নয়। সে ভাবনাটাও কিছুটা গল্প শোনার মতো। যার কোনও সুস্পষ্ট ভিত্তি নেই।
পনেরো বছর পর তিনি বেড়াতে গিয়েছলেন স্ত্রী, পুত্র, কন্যা, তাদের স্ত্রী স্বামী সন্তানদের নিয়ে সিমলায়। বয়স হলেও শরীর যথেষ্ট ফিট। তাছাড়া সঙ্গী আছে আত্মজনেরা। অসুবিধে নেই। সেখানে গিয়ে বেশ খুশিতে আছেন। রোজ ঘোরাঘুরি, ভরপেট খাওয়ার পরও হু হু করে খিদে পাচ্ছে। একদিন খেয়ে উঠে হোটেলের পেছনের সরু রাস্তা ধরে 'এই আসছি' বলে বের হলেন। পাহাড়ি পথে হেঁটে চললে হিসেব থাকে না। পাথরের ধাপ ভেঙে কখনও নামলেন, কখনও উঠলেন।
ঘন সবুজ পাহাড়ি এলাকা। এরই মধ্যে কুয়াশা ছড়িয়ে পড়েছে, স্যাঁতসেঁতে মাটি। হেঁটে যেতে যেতে একসময়ে নীলাদ্রি লক্ষ করলেন জায়গাটা তাঁর চেনা। এ জায়গায় আগেও এসেছেন তিনি। চারপাশে লক্ষ করছেন। শীত করছিল। একটা লোক চোখে পড়ছে না। দেখলেন রাস্তার ধারে একটি ঘর। পাহাড়ি এলাকায় যেমন থাকে। পাথরের ঘর। তার ভেতরে বিশাল শিবলিঙ্গ। ফুল বেলপাতায় সজ্জিত মহাদেব। মাটিতে বসে আছে পুরোহিত। তাঁকে দেখে পুরোহিত চরণামৃত দিল। দুধ, মধু, আতপ চাল সহযোগে একটি সুমিষ্ট পদার্থ। বেশ লাগল মুখে দিয়ে।
আচ্ছন্নর মতো দাঁড়িয়ে রইলেন নীলাদ্রি। এই জায়গা তাঁর পরিচিত। স্বপ্নের ভেতর এসেছিলেন এখানে। পুরোহিতের দিকে তাকালেন। সেই লোকটি কি? সমুদ্রের ঢেউ হাতে তুলে সে বিড়বিড় করছিল না। এ সে নয়। অন্য লোক। রোগা, লম্বা, ফর্সা লোকটির চোখ দুটো বাদামী। কিছু বলবেন মনে করে অনেকক্ষণ দাঁড়ালেন। লোকটি সপ্রশ্নচোখে তাকাল। তিনি মাথা নাড়লেন, না কিছু নয়। পুরোহিত আশীর্বাদী ফুল দিল তার হাতে। নীলাদ্রি কী ভেবে দশটি টাকা প্রণামির থালায় দিলেন।
ফিরে এসে তিনি অনেকক্ষণ কোনও কথা বলেননি। কী হল যে! কিছুই বুঝতে পারছেন না। স্বপ্নটা মিলে গেছে অথচ, যার জন্য স্বপ্ন দেখা, সে নেই। তাহলে স্বপ্নটা এল কোন পথ দিয়ে? কীভাবে?
অনেক প্রশ্নের মতো এরও কোনও উত্তর নেই। স্বপ্ন সম্পর্কে ফ্রয়েড অনেক কথা বলেছেন। সে সম্পর্কে নতুন করে কিছু বলার নেই। নীলাদ্রির বিষয়টি একরকম। আবার সুমন্তর বিষয়টি আর একরকম। সে স্বপ্ন দেখতো নির্জন একটি পথের। ঘোর অন্ধকার। যাকে বলে নিশুতি রাত।
কিছু আগে বৃষ্টি হয়ে গেছে। একা একা হেঁটে যাচ্ছে সুমন্ত। কোথাও কোনও আলো নেই। মানুষ নেই। মানুষের অস্তিত্ব নেই। রাস্তার দুপাশে সারি সারি ঝাঁপ ফেলা দোকানঘর। দোকান ঘর বন্ধ করে দোকানিরা দূরে তাদের বাড়িতে চলে গেছে। এই ভয়ংকর রাতে, নির্জন অন্ধকার রাস্তায় বাড়ি ফিরে আসার জন্য ব্যাকুল সুমন্ত। কোথাও বাড়ি নেই। একটি দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ও আশ্রয় খোঁজে। ভয়ে বুক ধকধক।
বারবার এই স্বপ্ন দেখে ও। একবার ও একটা বাড়িতে পৌঁছে যায় স্বপ্নে। সেটা ওর বাড়ি নয়। অরুণদের বাড়ি। অরুণ ওর বন্ধু। অথচ বাড়িতে অরুণ ছিল না। কাঠের সিঁড়ি উঠে গেছে। একটা একটা ধাপ পার হয়ে বারান্দায় পৌঁছে যায় সুমন্ত। এরপর ও কোনদিকে যাবে বুঝতে পারে না। খুঁজতে খুঁজতে একটি ঘরে ঢোকে। আসবাবগুলো প্রাচীন। সেই ঘরে বিরাট টেবিলের মুখোমুখি একটি আয়না বসানো আলমারি। সেখানে দাঁড়িয়ে অরুণের মা। সুমন্তর দিকে তাকিয়ে তিনি হাসলেন। ম্লান হাসি। হাসিতে রং নেই। লাবণ্য নেই।
এইরকম স্বপ্নের কথা বলেছিল সুমন্ত। ভীষণ নড়বড়ে অবস্থা ওর তখন। কোনও কিছুতে জোর নেই। মন হয়ে গেছে দুর্বল। হয়তো মন দুর্বল বলেই এসব স্বপ্নের ভেতর ঘোরাফেরা করে ও।
ঘরের ভেতরে বসে বসে আকাশ দেখছিল সুমন্ত। 'তুমি ক্লাবে যাও না?' প্রশ্ন করাতে মাথা নাড়ে ও 'না'। ভালো লাগে না। বন্ধুবান্ধব থেকে বিচ্যুত হলে সময় মতো চাকরি বাকরি না পেলে নিঃসঙ্গতা বোধ থেকে এইসব চিন্তাভাবনা চেপে ধারে মানুষকে। এই সব বোধ আসে স্বপ্ন। ভয়াল, ভয়ংকর স্বপ্ন।
হতেই পারে। স্বপ্নকে কখনও কখনও এভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। সেই ব্যাখ্যার কিছুটা সত্যি, কিছুটা তৈরি করা। তবু তার একটা কারণ খুঁজে পাওয়া যায়। কিন্তু যেসব স্বপ্নের মধ্যে কখনও ভবিষ্যৎ আকষ্মিকভাবে এসে হাজির হয়, তখনই সেই স্বপ্ন হয়ে ওঠে বিশিষ্টতায় ভরা। এইরকম এক স্বপ্নের কথা শুনেছিলাম ডুয়ার্সের এক স্কুলের মাস্টার মশাই-এর মুখে। স্বপ্নটির বর্ণনা শুনে হাড় হিম হয়ে গেছিল।
'গভীর রাত নয়। অথচ চারপাশে অদ্ভুত অন্ধকার জমাট বেঁধে আছে। যেন গ্রহণ লেগেছে। পশু-পাখির অস্তিত্ব নেই কোথাও। পথঘাট অসীম নীরবতায় ডুবে আছে। কেবল অনেক দূর থেকে একটা শব্দ ভেসে আসছিল। টং টং টং....অজস্র চাকাযুক্ত একখানা গাড়ি আসছিল কোন এক অজানা, রহস্যময় জায়গা থেকে।
লম্বা চওড়া কাঠের পাটাতনে বসে প্রাচীন পৃথিবীর এক মানুষ ঘণ্টা বাজাচ্ছিল টং টং টং। সেই গাড়ির অদ্ভুত যাত্রীটির পেছনে কিছু নারী-পুরুষ বিমর্ষমুখে বসে আছে। প্রত্যেকের মুখ পরিচিত। সেই বাজনা, যাত্রীরা সবাই এতটা রহস্যময়, এতটা শোকস্তব্ধ যে মাস্টারমশাই সহ্য করতে পারলেন না। চিৎকার করেননি। দৌড়ে পালিয়ে যেতেও পারেননি। এক জায়গায় ঠায় দাঁড়িয়ে রহস্যময় যানটিকে চলে যেতে দেখলেন। সেইসব পরিচিত বিমর্ষ মুখগুলি কে জানে কোথায় গেল।
হতে পারে মনের কোনো কোণে এই ধরনের কোনও কথা লুকিয়েছিল। এ ধরনের, সিনেমা দেখেছিলেন হয়ত।
'না! আমি ভেবেছি অনেক। সিনেমা, গল্প, কারও কাছে শোনা কাহিনি...কিছুই এর সঙ্গে যুক্ত নয়।'
'তাহলে?'
'সেটাই তো রহস্য।'
স্বপ্ন ব্যাপারটি এক ধরনের রহস্য। মনের অতল কোনের রহস্য। কিন্তু অদ্ভুত যান, তাতে অদ্ভুত যাত্রী কিছু বিমর্ষ মানুষ....এই পর্যন্ত ঠিক আছে। একখানা বিশ্রী ধরনের স্বপ্ন বা রহস্যময় স্বপ্ন বা কিছুই নয়, জাস্ট একটি স্বপ্ন বললেই চুকে যেত। বিষয়টিকে লঘু হিসেবে ধরে নেওয়া হল না, যখন মাস্টারমশাই বিষণ্ণমুখে তাঁর প্রতিক্রিয়া জানালেন, 'মনে হচ্ছে খুব খারাপ সময় আসছে। অনেক মানুষ এর মৃত্যু হবে। মনে হচ্ছে আমার। স্বপ্ন, পরলোক, বিষয়গুলি উনি মানতেন।
মনে হতে পারে। রহস্যময় স্বপ্ন দৃশ্য থেকে মন জাগ্রত অবস্থায় নানা কিছু কল্পনা করতে পারে। যুক্তি তৈরি করতে পারে। তার কোনও বাস্তবতা আছে কিনা সেটাই হল দেখার। মাত্র ছ মাসের মধ্যে যখন পরপর কিছু মানুষের মৃত্যু হল, মাষ্টারমশাইকে পেয়ে গেলাম বাজারের মধ্যে। স্বপ্নের কথা ভুলিনি। বলেছিলাম তাঁকে, 'মনে আছে আপনার?'
'মনে আছে। দেখেছেন কতগুলো লোক মরে গেল। বাস অ্যাক্সিডেন্টেই কতগুলো গেল।'
'এদের কি দেখেছিলেন সেই গাড়িতে?' একটু চুপ করে থেকে মাস্টারমশাই হাসলেন, 'সবার মুখ তো মনে নেই। যাঁরা মারা গেলেন, তাঁদের মধ্যে তিনজনকে দেখেছিলাম মনে আছে।'
'সেই তিনজনকে কি স্বপ্নের কথা বলেছিলেন কখনও?'
'না। বলতে চেয়েছিলাম, কিন্তু বলা হয়নি। সে রকমভাবে সুযোগই এল না। বললেই কি ওরা বেঁচে যেত?'
এখানে অবশ্যম্ভাবী ভাবে নিয়তি-র প্রসঙ্গ চলে আসবে। এটাই নিয়ম। সে তোমার নিয়তি হোক বা নাই হোক, স্বপ্নের ব্যাখ্যা কী দেব? ভবিষ্যৎ দর্শন?
আবার কখনও কিছু সাংকেতিক স্বপ্ন দেখা যায়। আপাতত শ্রীধরের স্বপ্ন দর্শন বিষয়ে আলোচনা করা যাক।
শ্রীধর গুজরাটের ভুজ-এ একটি চালকলে চাকরি করত। পিছুটান না থাকায় নিজের রাজ্য ছেড়ে অন্য রাজ্যে গিয়ে পড়ে থাকতে ওর অসুবিধে ছিল না। বরং গুজরাটি শিখে-টিখে জবরদস্ত গুজরাটি হয়ে উঠেছিল ও।
ভুজ জায়গাটির নাম আমাদের বহুল পরিচিত। পৃথিবী কাঁপিয়ে দেওয়া ভূমিকম্পের জন্য 'ভুজ' শব্দটি কখনও আমাদের স্মৃতি থেকে হারিয়ে যাবে না। তো, শ্রীধর ওখানে থাকাকালীন একটি বাঙালি পরিবারের সঙ্গে পরিচিত হয়। স্বামী-স্ত্রী এবং একটি মাত্র বাচ্চা নিয়ে তারা কাছাকাছি থাকে। যতই অন্যভাষা, অন্য খানায় রুচি জন্মাক, নিজস্ব সংস্কৃতি আর ভাষাকে যেমন কেউ ভুলতে পারে না, শ্রীধরও পারল না।
একদিন ওদের সঙ্গে দেখা হল। ভুজ এর পাশের গাঁয়ে গিয়েছিল শ্রীধর। ফেরার পথে বাঙালি ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা হল। ওঁরা কিছুদিনের মধ্যে কলকাতায় যাচ্ছে শুনে শ্রীধরের মনটা দুলে উঠল। কেউ নেই সেখানে, কার কাছে যাবে ভেবে মনকে বোঝাল। কিন্তু, টানটা রয়ে গেল। কেউ নেই সত্যিকথা। কিন্তু খুঁজে পেতে দেখল কেউ তো আছে। কান্তা মসি আছে বর্ধমানে। সিউড়িতে আছে আভাপিসি। যদিও এঁরা কেউ রক্তের সম্পর্কের আত্মীয় নয়, তবু আত্মীয় বলতে এঁরাই। কিন্তু সাতজন্মে কেউ খোঁজও করেনি। কী দরকার হঠাৎ করে গিয়ে এঁদের বিরক্ত করা।
মনকে বোঝায় শ্রীধর। সেদিন অনেক রাত পর্যন্ত এইসব নানা ভাবনা ভাবে ও। বাপ, মা বহুদিন হল গত হয়েছেন। বাপের চেহারা মনেও নেই। মা দীর্ঘদিন বেঁচেছিলেন। তাও প্রায় পনেরো বছর হল মাকে হারিয়ে এদিকে চলে এসেছে শ্রীধর। বাঙালি ভদ্রলোকের কলকাতায় যাওয়ার কথা শুনে হঠাৎ করেই হোক আপনজনের জন্য মনটা ব্যাকুল হয়ে পড়ল। সেইসঙ্গে মাকে, মার কথাও ভাবল। এইসব ভাবনাচিন্তার পর ঘুমিয়ে পড়েছে কখন জানে না।
হঠাৎ মনে হল সমস্ত পৃথিবীটা যেন দুলছে। মহাপ্রলয় উপস্থিত। মাটি ফুঁড়ে আগুন জল সবকিছু ছিটকে বেরিয়ে আসছে। চারিদিক তুমুল হাহাকার আর্তনাদ, বনের পশু-পাখি উম্মত্তের মতো ছুটছে। পাশাপাশি ছুটছে মানুষ। প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে সব পরিত্রাহি চিৎকার করছে। শ্রীধর কী করবে বুঝতে পারছে না। দেখল তাসের ঘরের মতো দুলে উঠে বিরাট বিরাট বাড়ি হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল। সেই বাঙালি ভদ্রলোক সিঁড়ি টপকে নেমে আসতে আসতে বিরাট সিমেন্টের চাঙড়ে আটকে পড়লেন। তাঁর মাথার উপর সমস্ত ছাদটা বীভৎস শব্দে ভেঙে পড়ল।
শ্রীধর বুঝল রক্ষে নেই। আজ পৃথিবীর শেষ দিন। কোথায় যাবে, কী করবে কিছু মাথায় আসছে না। পাগলের মতো ছোটাছুটি করছে শ্রীধর। পেছনে ঘরের দরজা ধরে দাঁড়িয়ে মা। বলল, পালা শ্রীধর। যত তাড়াতাড়ি পারিস পালা।
ঠিক এই সময় ঘুম ভেঙে গেল। প্রথমে বিশ্বাস করতে পারেনি যে এটা একটা স্বপ্ন মাত্র। এত স্পষ্ট এত জীবন্ত স্বপ্ন আগে কখনও দেখেনি শ্রীধর। উঠে জল খেতে পারছে না ভয়ে। কী যে দেখল এতক্ষণ। মা-র কথা চিন্তা করছিল বলে স্বপ্নের ভেতরে মা চলে এসেছে। পরদিন সারাক্ষণ স্বপ্ন নিয়ে ভাবল শ্রীধর। যদিও স্বপ্ন স্বপ্নই, তবু মায়ের ব্যাকুল মনটা কিছুতেই ভুলতে পারছিল না ও, 'পালা শ্রীধর। যত তাড়াতাড়ি পারিস পালা।'
এটা কি কোনও ইঙ্গিত? অস্বস্তি হচ্ছিল। অস্বস্তিটা তীব্র হওয়াতে দিন সাতেকের ছুটি নিল শ্রীধর। কিছু ভালো লাগছে না। একবার কান্তামাসি, আভাপিসির সঙ্গে দেখা করে এলে ভালো লাগবে। মনটা উচাটন হয়েছে তো।
চলে গেল শ্রীধর। যেদিন গেল, তার দুদিন পর ঘটে গেল সেই ভয়ংকর ভূমিকম্প। সমস্ত ভুজ শহর চূর্ণ হয়ে গেল। খবরের কাগজে খবরটা পড়ে স্তম্ভিত হয়ে গেছিল শ্রীধর। এরকমও তাহলে হয়?
কিন্তু, শ্রীধর তো একা এসেছিল, বাঙালি ভদ্রলোক কি এসেছেন কলকাতায়? নাকি, তিনি ওখানেই....?
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন