সাগরিকা রায়

বৃষ্টিতে ভিজতে ভালোবাসি, একথা সত্যি! কিন্তু তাই বলে রাত বারোটার সময়? নো ওয়ে! পিম্পা বলল,—মাথার ওপরে ছাদ থাকতে তোর ভয়ের কী আছে বুঝি না। আসলে তুই নিয়মের বাইরে যেতে চাস না। একদিন একটু রাত জেগে ফাংশন দেখলে দোষ কী? একটু-আধটু বৃষ্টিতে ভিজতে মজা কম নাকি?'
আমি ঘুম চোখে স্টেজের ওপরে একজন শিল্পীর বাঁশিতে ফুঁ দেওয়ার কসরত দেখছিলাম। কতরকম ভাবে শব্দ বেরিয়ে আসছে ওই বাঁশের বাঁশি থেকে! শেষে নাকি চমক আছে। কিন্তু ভাই,আমার বড্ড ঘুম পাচ্ছে! রাত বারোটা পর্যন্ত জেগে বাঁশির ফুঁ দেখলে কাল আমি টলতে টলতে ক্লাস করব! এস আর-এর একটি শব্দ কানে পশিবে না।
—কানে না পশিবে, মরমে তো পশিবে! পিম্পা হাসল।
—আরে! কান দিয়াই তো মরমে পশে! আমি হাসার চেষ্টা করি- কান কাজ না করলে মনে ঢুকবে কী করে লেকচার?
আসলে আমি বরাবরই ঘুমকাতুরে। আমাদের বাড়ি হল ডুয়ার্সে। সেখানে ঘোর শীতে কলকাতা থেকে যাত্রা আসে। চারপাশে চা বাগান। সেখানে আমোদ-আহ্লাদ বলতে একটু যাত্রা দেখা, কি সিনেমা। তো, যাত্রা এলে এলাকা জুড়ে সে কি হইচই! এমনকী, ফেসবুক নিয়ে পড়ে থাকা দাদা, দিদি, কাকা, কাকিরা অব্দি উৎসুক। তারা অবশ্যি শিবের নাচন, বা শাশুড়ি পঞ্চায়েত প্রধান-এর ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় দেবে বলে এমনভাবে মোবাইল ক্যামেরা তাগ করে থাকে, যেন জারোয়ারা ব্লো পাইপে বিষ-তির ছুঁড়বে ছুঁড়বে ভাব।
এই ফাঁকে একটা কথা বলে রাখি। যাত্রা চেয়ারে বসে দেখার মজা নেই। পা ঝুলিয়ে রাখার বড্ড কষ্ট ভুলি কাকিমার। মাঝে মাঝে পা ছড়িয়ে দিতে হয়, নইলে হাঁটু কটাস কটাস করে। সুতরাং আমি, দোলাদি, ঝিলু, বরণ, ছোটন মিলে চলে যাই সন্ধের দিকে। হাতে ভাঁজ করা বেডকভার,নয় শতরঞ্চি। ওগুলো মেলে দিয়ে খড়ের ওপর বেশ আরামদায়ক বসার জায়গা হয়। মায়াদির মা পানের বাটা নিয়ে বসে। রাশীকৃত বাদাম ভাজা খেতে খেতে সবাই হি হি করে হাসি। এসব করতে করতে জাস্ট যাত্রা শুরু হল কি, আমি ঘুমিয়ে কাদা! শেষ হলে সবাই ডেকে তুলত—ওরে আজ চল, কাল ফের...!
ঘুমই আমার কাল। নাহলে ইউনিভার্সিটির অমন ফাংশন ছেড়ে কেউ একা একা হস্টেলে ফিরে আসে? নির্বুদ্ধিতার কত যে দোষ! পিম্পা, রবিনা খুব বারণ করেছিল। আসলে আমি সঙ্গে না থাকলে ওদের জমাটি ব্যাপারটা আসে না। কিন্তু আমি সব বুঝেও ঘুমের কাছে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হলাম। অগত্যা, ওরা আমাকে হস্টেলের মুখে ছেড়ে দিয়ে ফিরে গেল ফাংশনে। ওদিকে আবার সিট দখল না হয়ে যায় সে চিন্তাও তো আছে!
ওরা ফিরে গেল। ওদের কথাবার্তার শব্দের টুকরো টুকরো অংশ একটা সময় মিলিয়ে গেল ইউক্যালিপ্টাস গাছের অন্ধকারে। আর তারপরেই চারপাশ বড্ড সুনসান হয়ে গেল। নৈঃশব্দেরও একটা শব্দ আছে। সেটা অনুভব করা যায়। কিন্তু ভাষা দিয়ে প্রকাশ করা যায় না। আমি দেখলুম, গার্ড ভাই পায়চারি করছে। হাতে তালি দিয়ে খৈনি ডলছে।
আমি কথা না বলে উঠে গেলুম সিঁড়ি বেয়ে। ফার্স্ট ফ্লোর ছাড়িয়ে সেকেন্ড ফ্লোরে উঠে একেবারে লম্বা বারান্দার শেষের ফোর বেডের রুমে গিয়ে ঢুকে পড়লুম। ফাঁকা ঘরে চারটে বিছানার ওপরে ফাংশনে যাওয়ার আগে চেঞ্জ করা জামা, কাপড় ডাই হয়ে আছে। সেসব গুছিয়ে রাখার মতো ইচ্ছে ছিল না।
আমি আমার বিছানার একধারে শরীর ছেড়ে দিলুম। কোথায় যেন ফাংশন হচ্ছে। ভাঙা গলায় কেউ গাইছিল- আমার পায়ের নূপুর কে নিল হায়...! বাবাহ! কে আর নেবে? এটা তো সোজা কেস। নূপুর নিশ্চয় রুপোর। তাহলে চোর নিয়েছে! চেনা লোকের কাজ!
মাঝরাতে আর গান গেয়ে পাগল করিস না। তোর নূপুর-চোর বাড়িতেই আছে রে! ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ছিলুম। গভীর ঘুম যাকে বলে। অনেক দূর থেকে হালকা গানের বা মাইকে কে কী বলছে বলে মনে হচ্ছে...।
এদিকে বিহারিপট্টি আছে। রাতের বেলা সেখানে রামলীলা হয়। এটা মার্চ মাস। সামনেই হোলি। মনে হচ্ছে গতবারের মতো এবারেও দীনবন্ধু চৌধুরীর পানমশলার দোকানে গানা হচ্ছে। রাতের ঠান্ডা ঠান্ডা বাতাসে কেঁপে কেঁপে আসছে শব্দগুলো। খানিকটা ভেঙে ভেঙে...ছড়িয়ে ছড়িয়ে...! কে কারে চরনো মে, লাগলে পরাণ আ...লাগলে পরাণ আ! কার চরণে প্রাণ সঁপেছি, কার চরণে! ঈশ্বরের প্রতি নিবেদিত গান। আগেও শুনেছি।
ওদের দোকানে মিষ্টি পান পাতা পাওয়া যায়। বিশু খাইয়েছিল ফার্স্ট ইয়ারকে। তখন শুনেছিলাম এই গান। একটি কালো লম্বা লোক হারমোনিয়াম বাজিয়ে গাইছিল। গানের অর্থ জিজ্ঞাসা করায় বলে দিয়েছিল। কিন্তু লোকটির মুদ্রা দোষ হল—'মানে কী'! একখানা বাক্যে ছবার যদি 'মানে কী' শুনতে হয়...! পিম্পা এত হেসেছিল যে বলার না। আচ্ছা! কোথায় ঠং করে কী পড়ল যেন...গার্ড ভাই কার সঙ্গে কথা বলছে...! আর মনে নেই।
একবার ঘুমের ভেতরে ডুব দিয়ে উঠলে, তারপর বেশ ঝরঝরে লাগে শরীর। আমারও তেমনই হল। হঠাৎ করেই ঘুমটা ভেঙে গেল! চোখ বুজেই বুঝলাম পিম্পারা কেউ ফেরেনি। ওরা অবশ্য বলেছিল যে, ফাংশন দেখে শেষরাতে মোড়ের ধাবায় ঘন দুধের চা, আর পুরি-সবজি খেয়ে ফিরবে।
আমি পাশ ফিরে আরাম করে ফের ঘুমনোর উদ্যোগ নিচ্ছি, মনে হল অনেক দূরে টক...টক...টকাস করে শব্দ হচ্ছে! গার্ড ভাই কী করছে এত রাতে? চিন্তাটা সরিয়ে দিয়ে ফের ঘুমিয়ে পড়তে পড়তে জেগে উঠছিলাম! টক টক...একটানা শব্দটা হচ্ছে! এবং হচ্ছে এই হস্টেলেই! কান পেতে শুয়ে শুয়ে শব্দ শুনে যাচ্ছি। কে করছে শব্দ? এরকম শব্দ এত রাতে এই হস্টেলে হচ্ছে মানে হল, এখানে আমি ছাড়াও আরও কেউ আছে যে ফাংশন পুরো দেখেনি।
আগে কখনও এরকম শব্দ শুনিনি কিন্তু! বেশ। কিন্তু রাত জেগে টক টক শব্দ করছে কেন? দেখব উঠে? নাহ! বেকার ছুটোছুটি। কী দরকার? হস্টেলের হরিভাই অনেকরাত জেগে কাজ করে বলে শুনেছি। আচ্ছা, হরিভাইকে দেখছি না কয়েকদিন! দেশে গিয়েছে বুঝি? দেশ মানে ছাপড়া জিলা। একদিন বলেছিল—হোলিকে টাইমমে দেশ যানা হ্যায় দিদি। পান মুখে দিয়ে কথা বলে হরিভাই। হিলহিলে লম্বা। তেমন রোগা। লাস্ট উইকে একটা সাঙ্ঘাতিক কাণ্ড হয়েছিল। কাউকে সেকথা বলতে পারিনি আজও।
সেদিন ক্লাস করে নিজের রুমে ঢুকেছি। আমার শাই পিঙ্ক কালারের কুর্তিটা রুমের জানালায় ক্লিপ এঁটে মেলে দিয়েছিলুম। হাওয়ার দাপটে ক্লিপ খুলে গেল। আমার চোখের সামনে সেটাকে দেখলুম উড়ে উড়ে পাখি হয়ে যাচ্ছে। ইস! যা রাগ হয়েছিল! এখন আবার নীচে নামতে হবে! কুর্তিটা আমার রুমের পেছনদিকে পড়েছে মানে হস্টেলের পেছনদিকে যেতে হবে।
তাড়াহুড়ো করে নেমে গেলাম সেকেন্ড ফ্লোর থেকে। হস্টেলে তখন কেউ নেই। আগে হস্টেলের পেছনদিকে কখনোই যাইনি। এদিক ওদিক দেখতে দেখতে যাচ্ছি। ক্রমেই অনাবিষ্কৃত অঞ্চলে এসে পড়ছি মনে হচ্ছে। কী নিস্তব্ধতা আঁকড়ে ধরছে চারপাশকে! ঝিমঝিমে দুপুর! কোত্থাও কেউ নেই। মনে হল, এদিকে যেন মানুষের চলাচলের চিহ্ন আছে। এখানে কারা আসে! ভারি জঙ্গুলে জায়গা! কুর্তিটা পড়ল কোথায়!
ওপরের দিকে তাকিয়ে আমার রুমের জানালাটা দেখতে চেষ্টা করলুম। হুম, মনে হচ্ছে এদিকেই পড়েছে কুর্তিটা। দেখি আর একটু এগিয়ে। কিন্তু সাপ-খোপ আছে কিনা!
রোদ খর খর করছে সবুজ গাছপালার ওপরে। মাটিতে শুকনো ঘাস। মাটির দিকে তাকাতে তাকাতে হাঁটছি। পড়লে এদিকেই পড়া উচিত। একসময় চোখ তুলে চমকে গেলুম। কী আশ্চর্য! আমার সামনে পরিপাটী একটি সবজি বাগান! মাচায় কুমড়োলতা, মাটিতে নানান সবজি ফলে আছে! সারি দিয়ে বেগুন গাছে বেগুন ঝুলে আছে। তরতরে কাঁচালঙ্কা ফুলকপি, বাঁধাকপি, সর্ষে শাক মুলো শাক।
গাছের গোড়ার মাটি খুঁড়ে রাখা। বোঝাই যাচ্ছে নিয়মিত যত্ন করা হয় এই বাগানকে। এই জঙ্গলের মধ্যে গুপ্ত জায়গায় এমন বাগান কী করে এল? এটা কি ম্যাজিক? নাকি ভূতুড়ে কাণ্ড? আমি হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকতে থাকতে একটা শব্দ পেলুম। কেউ আসছে! চমকে তাকিয়ে দেখি, আমার ঠিক দুহাত পেছনে হরিভাই দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে আমাকে দেখছে! তার হাতে একটা দড়ির খাটিয়া। সঙ্গে সঙ্গে বুঝে ফেললুম পুরো ব্যাপারটা। হরিভাই এখানে লুকিয়ে সবজি বাগান করেছে। এই বাগানের সবজি হস্টেলে বিক্রি করে থাকে! এই জন্য এত লুকোচুরি!
—দিদি, যা দেখলেন, কাউকে ভি বলবেন না। ওসুবিধা হোইয়ে যাবে আমার। হরিভাই করুণ চোখে তাকিয়ে আছে। আমার আবার কিসের অসুবিধে? হস্টেলের জন্য সবজি বাজার থেকে কিনতেই হয়। ও যদি সেটা চাষ করে বিক্রি করে, তো আমি কেন বাধা দেব? তাছাড়া আমি কে এসব নিয়ে কথা বলার?
আমি হেসে ফেলেছি,—কেন বলব ভাই?
আজও বলিনি। ফিরে আসতে আসতে দেখলাম কুর্তিটা একটা ঝোপের ওপর পড়ে আছে। কুর্তি নিয়ে নিজের ঘরের উদ্দেশ্যে চলে গেলাম।
আচ্ছা, সেদিনের পরে হরিভাইকে দেখিনি। নিশ্চয় দেশে গিয়েছে। তাহলে শব্দটা করছে কে? হরিভাই কি ফিরে এসেছে?
টক টক টকাস...টক টক...! আরে শব্দটা হচ্ছে তো হচ্ছেই! ঘুমের রেশটা কেটে যাওয়াতে ঝামেলা হল। এখন আর ঘুম আসতে চাইছে না। তেষ্টাও পাচ্ছে। আমার এই আরেক ঝামেলা। ঘুম একবার ভেঙে গেলে রাজ্যের কথা মাথায় ঢুকে পড়ে।
উঠে জল খেলাম। জল খেতে খেতে শব্দটা পাচ্ছি। একনাগাড়ে হয়ে চলেছে একটা শব্দ। অদ্ভুত! এত রাতে কে কী করছে? উঠে দেখতে হচ্ছে তো! খুব ডিস্টার্বড লাগছে। ঘুমব কী করে? টক টক টকাস...!
আচ্ছা, শব্দটা আসছে কোনদিক দিয়ে? ঘর থেকে বের হয়ে লম্বা বারান্দার অন্য প্রান্তের দিকে তাকিয়ে দেখলাম। লো পাওয়ারের আলো নিঝুম বারান্দাটিকে আরও নিঝুম করে তুলেছে শুধু নয়, একটা এমন ভয়াল নৈঃশব্দের সৃষ্টি করেছে, যাকে মর্গের সঙ্গে তুলনা করা যায়। আমার এক রিলেটিভকে একবার হসপিটালের ডিপ ফ্রিজারে রাখতে হয়েছিল। সুবীর আঙ্কেলের সঙ্গে আমি গিয়েছিলাম। আঙ্কেল আমাকে নিষেধ করেছিল। বলেছিল,— তুই আসিস না। ভয় পাবি।
আমি এত ভীতু নই যে নিজের রিলেটিভের বডি দেখে ভয় পাব। সুতরাং আমিও গেলাম। মনে আছে, সেই হিম ঠান্ডা ঘর, ড্রয়ারের সারি,বরফের সাদা ধোয়া...মৃতের দেশের সেই অনুভূতি এই মুহূর্তে আমার শরীর ও মনে ছড়িয়ে পড়ল। সেদিন যেটা অতটা বুঝতে পারিনি, আজ এই মুহূর্তে সেই অনুভূতি ঝপাস করে ঝাঁপিয়ে পড়ল আমার ঘাড়ে।
বারান্দাটা বিশাল লম্বা। একদিকে দাঁড়ালে অন্যদিক ভালো করে দেখা যায় না। আমি বেখেয়ালে অনেকটা চলে এসেছি ঘর ছেড়ে। এখন শব্দটা আরও স্পষ্ট। অর্থাৎ শব্দ অবশ্যই এই ফ্লোরেই হচ্ছে। এবং আমি এই লম্বা সুনসান নিস্তব্ধ বারান্দায় একেবারে একা দাঁড়িয়ে একটা অদ্ভুত শব্দ শুনছি!
একা কোথায়? যে শব্দটা করছে, সে তো আছে! আমার উচিত এগিয়ে গিয়ে চক্ষুকর্ণের বিবাদভঞ্জন করা। দেখেই আসি। ভেবে আমি এগিয়ে যাছি। যতই এগিয়ে যাচ্ছি, ততই শব্দের তরঙ্গ তীব্র হচ্ছে।
অবশেষে বারান্দার শেষ প্রান্তে পৌঁছলাম। সারি সারি অন্ধকার ঘরগুলো পেরিয়ে আসার সময় মাথায় কিছু ছিল না। আগ্রহ নিয়ে, বা বলা ভালো কৌতূহল নিয়ে এগিয়ে এসেছি। কিন্তু এখন বারান্দাটা যেখানে বাঁক নিয়েছে, সেখানে এসে একটু থমকে দাঁড়াতে হল। বারান্দাটা যেখানে বাঁক নিয়েছে, ওদিকে কখনই যাইনি। আসলে বারান্দার শেষ পর্যন্ত আসিনি কোনোদিনই।
এদিকের রুমগুলো বন্ধই থাকে। ফার্স্ট ফ্লোরে প্রত্যেকটি রুমে স্টুডেন্ট আছে। আর সেই কারণেই সেকেন্ড ফ্লোরের এদিকের রুমগুলো আপাতত ফাঁকা। মানে তালা দেওয়া। বারান্দায় ধুলোর গন্ধ। পাখির বাসার খচমচ শব্দ শুনেছি হেঁটে আসতে আসতে।
এদিকেই একটা সিঁড়ি দেখলাম। অন্ধকারে নেমে গেছে সিঁড়িটা! সিঁড়ির শেষ দেখা যাচ্ছিল না। কয়েক ধাপের পরে সিঁড়িটা বাঁক নিয়ে আরও নীচে নেমে গিয়েছে। ঝুঁকে পড়ে দেখতে পেলাম না সিঁড়ি কোথায় শেষ হয়েছে! এই সিঁড়িটার কথা কখনও শুনিনি তো! কোথায় নেমে গিয়েছে সিঁড়িটা!
এদিকে আলো নেই। কেউ থাকে না বলে এদিকের বাল্ব নিয়ে অন্য কোথাও সেট করেছে নিশ্চয়। আমরা যেদিকে থাকি, সেদিকে লো পাওয়ারের আলো জ্বলছে বারান্দায়। সেই আলোর আভা এই পর্যন্ত আসতে পারেনি বলে কেমন একরকম ঝাপসা ঝাপসা মুখ করে রয়েছে এদিকের বারান্দাটা! ফলে, এদিকটাকে আরও ভূতুড়ে করে তুলেছে।
যাক, সিঁড়ি নিয়ে পড়ে থাকলে হবে না। যে কাজে এসেছি, সেটা দেখি। সেই শব্দ তো এখনও হচ্ছে! মহা মুশকিল! ওদিকে কে আছে রে বাবা? এত রাতে কী করছে ওদিকে? আমি ঘুরে গেলাম এদিকের বারান্দা থেকে বারান্দার অন্যদিকে। শব্দ ওদিকেই হচ্ছে। এবং এখনও কন্টিনিউয়াস হয়ে চলছে শব্দটা।
এদিকে কেউ থাকে বলে মনে হয় না। কী অন্ধকার! অনেকটা চলে গেছে দেখছি বারান্দাটাও। কোনোদিন কি এসব ঘরে কেউ থাকতো? হয়তো থাকত। নইলে কেনই-বা হস্টেলের এক্সটেনশন করা হয়েছিল? বাঁ-দিকের বন্ধ ঘরগুলো বড্ড রহস্যময়! আসলে অন্ধকার মানেই রহস্য! যাকে স্পষ্ট করে দেখা যায় না, তাকে রহস্যময় লাগে। আর বন্ধ ঘর মানেই অদ্ভুত রহস্য-ভয় জড়িয়ে আছে যেন!
আমি এগিয়ে যেতে যেতে একবার থেমে পেছনদিকে চেয়ে দেখলাম। যে দিকটা ফেলে এলাম, সেটা অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে যেন! এখন যদি কেউ পেছন থেকে ছুটে এসে আমার পিঠে হাত দেয়! কেউ আছে কি? পেছন ফিরে তাকালাম। না, না! কেউ নেই। না থাকুক, আমি শব্দের উৎস দেখেই রুমে ঢুকে যাব। ভালো লাগছে না মনটা! অস্থির লাগছে।
এক পা...দু-পা...! ওই যে! শব্দ এখন জোরালো! ওই ...ওই ঘর থেকে শব্দটা আসছে! এখনও শব্দটা হয়েই চলেছে! ঘরে কে আছে? দরজায় হাত দিতে গিয়ে চমকে উঠেছি। একী? ঘরের বাইরে থেকে তালা দেওয়া যে! তাহলে ভেতরে কে রয়েছে? কান পেতে ফের শব্দটা শুনলাম। হ্যাঁ, ঠিক ধরেছি! টক টক ...এটা ঠিক টেবল টেনিসের বলের শব্দ। বল ছোট র্যাকেটে লেগে শব্দ করছে। স্ট্রোকগুলো স্পিডে হচ্ছে! স্পিড ড্রাইভে খেলছে কেউ!
টেবিল টেনিসে উৎসাহ আছে আমার। অবাক কাণ্ড তো! কে আছে আমাকে দেখতেই হবে। আমি ঘুরে অন্যদিকে গেলাম। এদিকে একটা জানালা আছে। বন্ধ। কিন্তু কাচ ভাঙা একটা পাল্লার। গোড়ালির ওপর ভর দিয়ে উঁচু হয়ে ঘরের ভেতরটা দেখতে যেতেই শব্দটা বন্ধ হয়ে গেল ঝট করে! ঘরে কেউ আছে! সে আমাকে দেখেছে বা বুঝেছে আমার উপস্থিতি। আমি অন্ধকার ঘরের ভেতরটা দেখার জন্য যতটা সম্ভব উঁচু হলাম। আবছা আবছা একটা টেবিল দেখতে পাচ্ছি।
আমার ভয় করে উঠল। কেন জানি না,মনে হল, এখানে আমার থাকা ঠিক নয়। আমি অন্য জগতে পা রেখেছি যেন! পেছন ফিরে চলে যাব ভেবেও পা সরছিল না আমার। কেমন করে যে নিজের রুমে ফিরে এসেছিলাম মনে নেই! শুধু মনে আছে অন্ধকার বারান্দায় আমি ছুটছি। পেছনে তাড়া করে আসছে একতাল অন্ধকার! আর একটা শব্দ টক টক টক...! আমার মনে হচ্ছে এটা অন্য রাস্তা!
এই দিক দিয়ে আমি কি এসেছি? এটা কি সেই বারান্দা? এদিকে এত পাতা পড়ে আছে...যখন এলাম, এমন কি ছিল? পায়ের নীচে শুকনো পাতাগুলো খুচ মুচ করে গুঁড়ো হচ্ছিল আমার পায়ের চাপে। আর তীব্র হাওয়া তাড়া করে আসছে কোন অজানা থেকে হো হো শব্দে!
ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলাম। কিন্তু বিছানায় ঢুকেও স্বস্তি পাচ্ছিলাম না। বন্ধ ঘরের ভেতরে কেউ যদি...! লাফ দিয়ে বিছানা থেকে নেমে দরজা খুলতে গিয়ে হাত ঘেমে উঠল। দরজা খুলব! বাইরে কেউ কি দাঁড়িয়ে আছে!
সারাটা রাত জেগে বসে রইলাম। গার্ড ভাই-এর কোনো সাড়া পাচ্ছি না। দূরের মাইকের আওয়াজ পাচ্ছি না। আমি যেন অন্ধকার কুয়োয় পড়ে গিয়েছি!
কখন সকাল হল জানি না। পিম্পা আমাকে ডাকছিল,—কী রে? দরজা খুলে রেখে ঘুমিয়ে পড়েছিস? কী কান্ড! একা একা এভাবে কেউ থাকে?
দরজা খুলে রাখিনি তো! দরজা খুলতেই গিয়েছিলাম, কিন্তু খুলিনি! তাহলে দরজা খুলে গেল কী করে!
পিম্পা আমাকে দেখছিল—কী হয়েছে রে? চুপচাপ লাগছে তোকে।
আমি বলব কিনা ভাবছিলাম। থাকতে না পেরে বলেই দিলাম,—জানিস, কাল খুব অদ্ভুত কাণ্ড হয়েছে!
—কী কাণ্ড?
—আয় আমার সঙ্গে। একটা জিনিস দেখাব।'
ওকে সঙ্গে করে সেই বারান্দার বাঁক পর্যন্ত আনতেই পিম্পা থেমে গেল,—এখানে কী আছে?
—আছে। দেখবি আয়। বলে আমি আস্তে আস্তে সেই ঘরটার অন্য ধারে গিয়ে দাঁড়ালাম। হ্যাঁ, এই সেই আধ ভাঙা জানালা। এই ভাঙা জায়গাটা দিয়ে ভেতরে উঁকি দিয়েছিলাম। শব্দ হচ্ছিল ঘরের ভেতরে। একটা টেবিল দেখেছিলাম মনে হচ্ছে। আমি ভেতরটা এখান থেকেই দেখতে চাই।
ফের আগের দিনের মতো গোড়ালি উঁচু করে ভাঙা পাল্লার ভেতর দিয়ে ঘরের ভেতরটা দেখার চেষ্টা করলাম। দিনের আলো এই পর্যন্ত আসেনি। তবুও আলোর অনেক ক্ষমতা বলে অন্ধকার ঘরটা অনেকটা ঝাপসা হয়েও অনেকটা দেখতে পারছি।
একটা টেবিল সত্যি আছে! ধুলো, মাকড়শার জালে মাখামাখি একখানা টেনিস টেবল। নীল রঙের টেবল। ডিভাইডেড বাই আ নেট! টেবিলের ওপর পড়ে আছে দুটো সাদা ছোট বল। একটা ছোট হাতলের র্যাকেট। সবই ধুলোয় একাকার। কতদিন কেউ টাচ করেনি এগুলো। তাহলে এই ঘরের ভেতরে কে খেলছিল?
পিম্পা আমার মতো করে ভেতরটা দেখে অবাক চোখে তাকাল,—কী ব্যাপার? কী দেখাতে এনেছিস আমাকে?'
—ওঘরে কাল কেউ খেলছিল! আমি শব্দ পেয়েছি। দেখতে এসেছিলাম। কিন্তু আমার উপস্থিতি টের পেয়ে শব্দ থেমে গিয়েছিল। কে ছিল এই ঘরে? হরিভাই তো টেনিস খেলে না।
পিম্পা আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে এল হিড়হিড় করে। নিজেদের ঘরে ঢুকে পিম্পা চাপা গলায় ধমক দিল,—'তুই কাল রাতে ওখানে গিয়েছিলি? জানিস না ও-ঘরে দুবছর আগে সুইসাইড করেছিল আয়েশা খাতুন! রেজাল্ট খারাপ হয়েছিল বলে বোকামিটা করেছিল! ও টেবল টেনিস খেলত। দারুণ দারুণ স্ট্রোক দিত!
আমি জানতাম না! কিন্তু কাল আয়েশা খাতুন ওই ঘরে ছিল?
—আর হরিভাই-এর কথা কী বলছিলি? হরিভাই-এর ডেঙ্গু হয়েছে। সে হাসপাতালে। কোনো খবর রাখিস না।'
আমার কষ্ট হচ্ছিল। আমার চোখ জলে ভরে যাচ্ছে একটা বোকা মেয়ের জন্য। রেজাল্ট খারাপ হলে কেউ মরে যায়?
সারাদিন কাউকে কিচ্ছু বলিনি। অনেক রাতে আস্তে আস্তে আমার রুম থেকে বের হলাম। ঘরে সবাই ঘুমে অচেতন। আমার ভীষণ ইচ্ছে হল, সেখানে যেতে। মনে হল, আমাকে আরেকবার সেই ঘরখানার সামনে যেতে হবে।
পা টিপে টিপে হাঁটছি। পিম্পার আবার ঘুম পাতলা। একটুখানি শব্দ হল কি, তিনি জেগে যাবেন! আচ্ছা, টক টক টকাস শব্দটা আজ নেই কেন! সে কি আজ আসেনি? রোজ আসে না! তবু সেই ঘরের কাচ ভাঙা জানালাটা দিয়ে ভেতরে উঁকি দিতে ইচ্ছে করছে খুব। আমি তাকে দেখতে চাই।
আজ বারান্দাটা বেশি অন্ধকার লাগছে যেন! হুম, আর দূর থেকে কোথাও কোন অনুষ্ঠানের আওয়াজ অব্দি নেই। এখানে কাছাকাছি গ্রাম আছে। প্রায়দিন সেখানে আসর বসে। যাত্রাপালাই বেশি। তাছাড়াও অমুক নাইট তমুক নাইটের বাহার কম নয়। আজ কেন...! খুব বেশি চুপচাপ লাগছে কি?
লাগুক! আমি চিন্তা-ফিন্তা ঝেড়ে ফেললাম। কোথাও মাইকের আওয়াজ আসা মানেই হইচই। কী দরকার সুস্থ রাতকে ব্যস্ত করার? সেদিন রাতে এই গান-বাজনার আঘাতে সুপারকে নালিশ করেছিল সিনিয়ররা। রাতে ডিস্টার্ব হয় বলে। হবেই। সারারাত ধরে যদি যাত্রাপালার গান ভেসে আসে—না, না, আর বাঁশি নয়...! তাহলে ভালো লাগে? সুপর্ণাদি রেগে গিয়েছিল বাসি নয় তো তো টাটকা খা! হি হি হি!
কে? আমি চমকে পেছনে তাকালাম। কে আসছে? স্পষ্ট পায়ের আওয়াজ পেলাম! থমকে পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখলাম ঘুটঘুটে বারান্দা ঠান্ডা হয়ে একা পড়ে আছে। অন্ধকারে আমাদের রুমটা দেখাই যাচ্ছে না। আমি একটু তাড়াতাড়ি যাই। পিম্পা জেগে গেলেই সব অভিযান ফক্কা। টেনে ঘরে নিয়ে যাবে!
লম্বা বারান্দাটা আর শেষ হচ্ছে না। এদিকেই কোথায় সিঁড়িটা দেখেছিলাম। আরেকটু যেতে হবে মনে হচ্ছে। কিন্তু টক টক শব্দ নেই! বারান্দাটা যেখানে শেষ হয়ে বাঁক নিয়েছে, সেখানে যাব। কিন্তু বারান্দাটা শেষই হচ্ছে না! কী লম্বা! হয়তো কাল এটা উত্তেজনায় খেয়াল করিনি।
আরে, ওই তো সিঁড়িটা অতলে নেমে গেছে! কাল দিনের বেলায় সিঁড়ি রহস্য উদ্ধার করতে হবে। আমি এগিয়ে যেতে থাকি। শব্দটা নেই বলে আমি ঠিকঠাক যাচ্ছি কিনা বুঝতে পারছি না। মনে হচ্ছে এদিকেই বাঁকটা পাব। আরেকটু এগিয়ে যাই।
যাচ্ছি তো যাচ্ছিই! রাস্তা আর শেষ হয় না যেন! এতটা লম্বা ছিল কি বারান্দাটা? হ্যাঁ, লম্বা বটেই, কিন্তু এতটা? বারান্দার শেষপ্রান্তে একটা আলো ছিল কি কাল? না, ছিল না। আমাদের রুমের কাছাকাছি বাল্ব আছে। সেটাও যথেষ্ট কম পাওয়ারের বলে এই পর্যন্ত আলো আসছে না! আমি হাতড়ে হাতড়ে আস্তে পা ফেলে ফেলে যাচ্ছি। হুম, ভয় পাওয়ার মতো কিছু ঘটেনি! আমি বারান্দার বাঁকের কাছে এসেছি। এবারে অন্যদিকে যাব। ওদিকেই আছে সেই ঘর!
এই সময়ে আমার বুক কেঁপে উঠল! ভাঙা জানালার ভেতর দিয়ে উঁকি দিয়ে কী দেখব আমি? আমার কি উচিত হয়েছে এত রাতে এমন পাগলামি করার? ভেতরে যে আছে, সে আমাকে দেখছে ঠিক! এখনই জানালার ভাঙা অংশ দিয়ে যদি মুখটা বাড়িয়ে...?
ওহ! একটা কিছু...! কিছু কি উঁকি দিল জানালা দিয়ে? আমি থর থর কেঁপে উঠে পেছন ফিরে ছুটতে শুরু করেছি। মনে আছে আমার বাঁ-দিকে পড়বে সেই সিঁড়ি। সেই সিঁড়ি বেয়ে কেউ কি ওপরে উঠে আসছে?
পিম্পা... পিম্পা...! আমি ডাকছি, কিন্তু গলা দিয়ে স্বর বের হচ্ছে না। কিভাবে আমার রুম পর্যন্ত যাব উফ, মাগো!
আমার রুমের সামনে এসে ছুটে ঢুকে পড়লাম। খুব বড় ভুল করেছি আজ! হে ঈশ্বর, আমাকে বুদ্ধিশুদ্ধি দাও। আমার বুক ধড়ফড় করছে! গলা শুকিয়ে গেছে! জল খাব। পিম্পা...! ডাকতে গিয়ে দেখি, পিম্পা তো বিছানায় নেই! শুধু ও কেন, কেউ নেই এই রুমে! এটা কোথায় এসেছি? কী আশ্চর্য! একটা পুরনো ভাঙাচোরা জিনিসে বোঝাই ঘরে আমি দাঁড়িয়ে আছি! আমার সামনে টেবিল টেনিস খেলার টেবিল। কেউ খেলছে। শব্দ উঠছে ঘরের মধ্যে টক টক টকাস...! টক টক ...!
আমার বোবা দৃষ্টির সামনে একটা কাচ ভাঙা জানালা।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন