ম্যাজিক

সাগরিকা রায়

মাঠ জুড়ে মেলা বসেছে এবার। সমীর চার পাশে তাকাল। আয়না ঘর, বেলুন ফাটিয়ে লক্ষ্যভেদ, চুড়ি, দুল, নীলার হার, খেলনা...সব আছে। এবার কিন্তু জামাকাপড়ের দোকানও এসেছে। অন্যান্যবার আর সব থাকলেও জামাকাপড় থাকে না। এবার সেই অভাবও পূর্ণ হয়েছে। লোকে আদেখলার মতো কেনাকাটা করছে।

সমীর মেলার ডানদিকে দিয়ে ঢুকে নাগরদোলার পাশ কাটিয়ে সোজা উত্তর দিকে হাঁটতে শুরু করল। গতবার এসেছিল। এবার কি এসেছে? আসেনি মনে হয়। ওই লোকটা জিনিসেই ভীষণ আগ্রহ সমীরের। ম্যাজিক। ছোট থেকেই এই ব্যাপারে ওর তীব্র আগ্রহ। ছোটখাটো দুটো একটা ম্যাজিক দেখাতে জানেও। কিন্তু, দুর্দান্ত কিছু শিখতে চায়।

গতবার এই মেলাতে এসেছিল। তখন দেখেছিল ম্যাজিক শো। একজন প্রৌঢ় ভদ্রলোক ম্যাজিক দেখিয়েছিলেন। ওর মনে হয়েছিল অ-সাধারণ! শো-এর শেষে দেখাও করেছিল ম্যাজিশিয়ানের সঙ্গে। ভদ্রলোক তখনও সাজসজ্জা চেঞ্জ করেননি। সমীরের আগ্রহ দেখে উনি কাছে ডেকে ওকে বসিয়েছিলেন, 'আপনি ম্যাজিক শিখতে চান। কিন্তু কী হবে তাতে? কী লাভ?'

একজন ম্যাজিশিয়ানের কাছ থেকে এরকম কোনও প্রশ্ন আদপে আশা করেনি সমীর। লোকটা ম্যাজিক শিখেছিল কেন? ভালবাসে বলেই তো। তাহলে, কেন এখন লাভ-ক্ষতি নিয়ে এত ভাবছে? সমীরের মুখের ভাব লক্ষ্য করছিলেন তিনি। একটু হেসেওছিলেন, 'ম্যাজিক শিখবেন?'

সাগ্রহে ঘাড় নেড়েছে সমীর 'হ্যাঁ'!

'আমার কাছে? আমি তো চলে যাব পনের দিন পরই।'

'পনের দিন? এ কদিনই শেখান।'

কী ভেবে রাজি হলেন, 'বেশ! আগামীকাল। সকাল দশটা।'

'দশটা? আর একটু পরে হলে হত না?' বিনীত স্বর সমীরের।

মূহূর্তে খিঁচিয়ে উঠলেন, 'যখন বলেছি তখন যদি আসতে না পারেন, তবে আসবেন না। ঠিক আছে?'

সমীর মনে মনে কান মুলেছে নিজের, 'ছি ছি! আমি কী করে আপনার কথা অমান্য করব বলুন তো। আমার টিউশন ছিল কিনা! বেশ! আমি ঠিক দশটাতেই তাহলে আসব!' পরপর বারোদিন ধরে চলল শিক্ষা। প্রথমে ম্যাজিক জিনিসটা কী সেটা নিয়ে বললেন। বলতে বলতে তাঁর চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল, 'অসম্ভবকে সম্ভবে পরিণত করতে চেয়ে মানুষ ম্যাজিক শেখে। শিখতে চায়। তুমি কি মাধ্যাকর্ষণ শক্তির কথা জানো? নিশ্চয় জানো। তাহলে এটাও জানো যে, মাধ্যাকর্ষণ শক্তির বিরুদ্ধে যাওয়া অসম্ভব। অথচ জাদুকর কী করেন? অঙ্গুলি হেলনে একজন তরুণীকে শূন্যে ভাসিয়ে দেন, তখন আমরা অবাক হই। ভাবি কী করে জাদুকর অগ্রাহ্য করছেন ওই মাধ্যকর্ষণ শক্তিকে। তাহলে, জাদুবিদ্যা হল অলীক আর অসম্ভবের রাজত্ব। আর, এই রাজত্বের একমাত্র অধিপতি হলেন জাদুকর। তাই জাদুকর সাধারণ মানুষ থেকে অনেক দূরের। বিস্ময় এবং শ্রদ্ধা মেশানো একজন মানুষ! মনে থাকবে?'

সমীর ঘাড় নাড়ে। থাকবে। মনে থাকবে। আসলে এসব কথা তো ও জানত। এভাবে স্পষ্ট করে নয়। তবু জানত। ভদ্রলোকের কথা বলার মধ্যে একটা সুর আছে। যেন নেশা ধরায়।

'কাল আসবেন।' ওকে বিদায় দিচ্ছিলেন জাদুকর। তুমি-আপনির নিয়ম মানছিলেন না তিনি। তবু, ভালো লাগল সমীরের। পরদিন যেতেই আগের দিনের অসমাপ্ত জায়গা থেকে ধরলেন, 'ম্যাজিক হল রাজার সখ এবং সখের রাজা। অর্থাৎ, হবি অফ কিংস অ্যান্ড কিং অফ হবিস। প্রচুর অর্থ চাই। প্রচুর অর্থ না হলে ভালো জাদুকর হওয়া যায় না ভাই। সব বেকার হয়ে যাবে।

আপনি সমাজ্ঞী হেনরিয়েটার নাম শুনেছেন? না? কী আশ্চর্য! জানেন না? শুনুন তবে। তিনি ছিলেন একজন রাণী। সম্রাজ্ঞী। জাদুকর কার্ল হারম্যানের কাছে তিনি 'জাদুবিদ্যা শিখেছিলেন। সাংঘাতিক ভালো জাদু দেখাতেন। এই জাদুবিদ্যা দেখানোর জন্য একটি বিশেষ রঙ্গমঞ্চ তৈরি করিয়েছিলেন। আর, এডওয়ার্ডের নাম জানেন? জানেন? বা! তিনি তো দুর্দান্ত জাদুকর ছিলেন। আফগানিস্তানের আমীর আমানুল্লা এমন হাত-সাফাইয়ের খেলা দেখাতেন যে সবাই হতবাক হয়ে যেত। তাহলে বুঝেছ তো? যাদুবিদ্যা রাজা মহারাজার ব্যাপার। অনেক অর্থ ব্যয় করো। দারুণ সব জাদু তোমার হাতের মুঠোয় এসে যাবে।'

সমীর বংশবদের মতো শুনতে থাকে। এভাবে দিন চারেক কেটে গেল। পঞ্চম দিনের দিন জাদুকর ওর জন্য অপেক্ষা করছিলেন। ওকে দেখে ডাকলেন, 'আসুন। আজ আপনাকে কয়েকটা তাস এর ম্যাজিক শেখাব।' এক প্যাকেট তাস ছিল তাঁর হাতে। সাফল করতে করতে কীভাবে তাস চিনে রাখতে হয়, কীভাবে তাস এরমধ্যে কারচুপি করতে হয়, এসব শিখল সমীর। যদিও দু-একটা ম্যাজিক ও আগেই জানত। তবু মুখে শব্দ করল না। কথা বলার কায়দাও লক্ষ্য করছিল ও। কিভাবে দর্শকদের কথায় আবিষ্ট করে রেখে ম্যাজিক দেখাতে হয় সেসব শিখতে হল। প্রায় দশদিন কেটে গেল এভাবে। দশদিনের দিন উনি জানালেন—আগামীকাল চলে যাচ্ছেন। আসছে বছর যদি আসেন, তবে আবার শেখাবেন।

মাথায় আকাশ ভেঙে না পড়লেও ভীষণ ক্ষেপে গেল সমীর। একি অন্যায় কথা। এতদিন ধরে বক্তৃতা না দিয়ে কিছুটা তো শেখাতে পারতেন। তাস এর ম্যাজিক তো বাড়ি বসে শিখতে পারে। সমীর নিজেই তাই শিখেছে। কিন্তু উনি কেন...। এর চেয়ে প্রথম দিনই বলে দিতে পারতেন যে তিনি ছাত্র তৈরি করেন না! এভাবে ঠকানো কেন?

রাগটা বুকে চেপে হাসিমুখে শিক্ষককে বিদায় জানাল ও। তিনি চলে গেলেন। বাঁকুড়ায় যাচ্ছেন এটুকু জানত সমীর। উনি কিছু ভাঙেননি। সমীরও জানতে চায়নি! যার যেমন ইচ্ছে, সে তেমনই করবে! কাউকে জোর করে তো কিছু শেখানো যায় না! বিফল মনোরথ সমীর তবু অপেক্ষা করেছে। নিশ্চয় ভদ্রলোক ওর সঙ্গে যোগাযোগ করবেন একদিন!

কিন্তু আশা মেটেনি। তারপর, অন্য কোনও জাদুকরকে খুঁজেছে সমীর। সেরকম কাউকে পায়নি। এক বছর কেটে গেছে। হাত সাফাই দু-একটা শিখেছে। তার বেশি আর কিছু শেখা হয়নি। ইদানীং কিছুটা হতাশা গ্রাস করেছে সমীরকে। এসব ওর জন্য নয়। ঠিক কথাই তো! অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো নাহলে এসব শখ স্বপ্নই থেকে যায়!

মেলার একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্ত পর্যন্ত ঘুরে ঘুরে সমীর ক্ষীণ হাসে। এবারে আসেনি। কোনও ম্যাজিকের তাঁবু নেই। ভদ্রলোক ঠকালেন ওকে। অবশ্য তিনি অসুস্থ হতে পারেন। অন্য কোনও কারণেও হয়তো তার পক্ষে আসা সম্ভব হয়নি। নাঃ! এসব ভাবনা ছেড়ে দেওয়াই ভাল। মন দিয়ে যেমন টিউশনি করছে সেভাবেই চলুক। চাকরি-টাকরিও পাবে কিনা কে জানে। কত এমন পাস গড়াগড়ি খাচ্ছে, সে কিনা বি.কম পাস, তার পক্ষে চাকরি টাকরি জোগাড় করা সম্ভব নাকি?

দিনটা যেন ওর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিল। যদি এমন হত, মেলায় সেই জাদুকর আসতেন, তাহলে সমীর হতাশ হত না। অথচ ভদ্রলোকের না আসার কারণে জীবনের ছক চেঞ্জ করে ফেলল ও! কত রকম যে হয়!

সমীর দ্রুত হাঁটতে থাকে। মেলা ছেড়ে বেরিয়ে পড়বে ও। আজ একটা টিউশনির কথা আছে। সুভাষপল্লি বাজারের ঠিক পেছনে ছাত্রটির বাড়ি। প্রথমে 'না' করেছিল সমীর। এখন মন ঠিক করে চলল। যদি ওরা অন্য শিক্ষক এখনও নিয়োগ না করে থাকে, তবে সমীর কাজটা করবে। গিয়ে পড়ালে পাঁচশো। কেবল অঙ্ক করাতে হবে। ক্লাস সেভেন! দেখা যাক ওখানে ভাগ্যে শিকে ছেঁড়ে কিনা!

বাচস্পতিবাবু বাড়ি পার হয়ে রবীন্দ্র সরণিতে পড়ল ও। সোজা হেঁটে যেতে যেতে ফের জাদুকরের কথা মনে পড়ল। ভদ্রলোক হাওয়া হয়ে গেলেন নাকি? অর্থ অর্থ করে ভদ্রলোক পাগল। অর্থ জোগাড় করে বিরাট জাদুকর হওয়ার ইচ্ছে ছিল তাঁর। কে জানে, সেই বিরাট অঙ্কের অর্থ জোগাড় করতে পারলেন কিনা।

মন ক্লান্ত বলে শরীর ক্লান্ত হয়ে পড়ছে। খালি রিকশ দেখে উঠে পড়ল সমীর কুড়িটা টাকা দিয়ে গন্তব্যস্থল পর্যন্ত যেতে পারবে। আজ আর হাঁটতে ইচ্ছে করছে না।

সুপর্ণা বোধহয় ওকে দেখেছে। হাত নাড়ল। সমীর ঠোঁট সামান্য ছড়াল। সুপর্ণা কিছু বলছিল। কী? রিকশর পেছনের ছোট পর্দা তুলে তাকাল সমীর। সুপর্ণা চেঁচাচ্ছে! সঙ্গে আবার কে? সমীর রিকশ থামাল—দাঁড়াও ভাই! কে যেন ডাকছে!'

ওকে থামতে দেখে এগিয়ে এল সুপর্ণা। 'এই সমীর! আমার কাকাকে একটু সঙ্গে করে কোর্ট মোড়ে নামিয়ে দিবি?'

'কোর্ট মোড়ে? আমি তো সুভাষ পল্লি যাচ্ছি! আচ্ছা বেশ! আমি নেমে গেলে উনি যেতে পারবেন তো?'

সুপর্ণা কাকার দিকে তাকাল, 'পারবেন?'

হাত নেড়ে সম্মতি জানালেন সুপর্ণার কাকা। সমীর সরে বসে তাঁরজন্য জায়গা করে দিল।

রথখোলা পর্যন্ত যেতেই সমীরের মনে হল সুপর্ণার কাকার সঙ্গে একটিও কথা হয়নি। কিছু জিজ্ঞাসা করা হয়নি। ও পাশের দিকে ঘাড় ঘোরাল, 'আপনি কোথায় থাকেন? এখানেই?'

'না! আমি কোথায় কখন থাকি, তার ঠিক নেই। যেমন ধরুন, এখন আমি এখানে। একটু আগে ছিলাম মোড়ের মাথায় কালভার্ট-এর উপর দাঁড়িয়ে!' সমীর থতমত খেল। ভদ্রলোক ফিচেল টাইপের রসিক। ও ভদ্রতা করে হাসল, বাঃ। মজার কথা বলেন দেখি।'

'মজা! ওটাই পারি ভাই! জীবনে আর তো কিছুই হল না।'

'মানে?'

'কিছু না। আসলে অনেক স্বপ্ন নিয়ে জীবনটা শুরু করেছিলাম। কী হল? যে কেরানি সেই কেরানি। নুন আনত পান্তা ফুরোয়!'

বেশ লাগল সমীরের। অনেকটা যেন ওরই মত অবস্থা। সায় দিল ও, 'এরকম তো সবার জীবনে হয়। আমার জীবনেও এই রকম অবস্থা এসেছে। কত শখ ছিল জাদুকর হব। প্রতিষ্ঠিত হব। কী হল? এখন যাচ্ছি টিউশনির খোঁজে। ক্লাস সিক্স-এর ছেলেকে পড়ানোর কাজটা পেলে মাস গেলে পাঁচশো টাকা পাব। কোথায় গেল জাদু! কোথায় গেল ম্যাজিক!'

'হাল কি ছেড়ে দিয়েছেন?' ভদ্রলোক সমীরের দিকে তাকান। সমীর লক্ষ্য করেছে ভদ্রলোক কথা বলার সময় পলক ফেলেন না!'

'তা, না ছেড়ে কী করব বলুন? হা হুতাশ করব? তাতে বা কী লাভ? অর্থ ছাড়া কোথায় যাব?' অর্থ! অর্থই সব! ভদ্রলোক স্বগতোক্তি করেন। সুভাষপল্লিতে নেমে গেল সমীর। ভদ্রলোক চলে গেলেন। মনটা বড্ড বিষন্ন হয়ে পড়ল। মানুষ স্বপ্ন দেখে। অথচ কারও কারও স্বপ্ন সত্যিই হয়। কেউ কেউ সত্যি সত্যি স্বপ্নকে সাকার করতে পারে।'

'তা পারে। আপনি সহজে হাল ছাড়বেন না। তাহলেই দেখবেন, আপনি পারবেন। পেরে গেছেন।'

সমীর চমকে তাকাল। আরে! ভদ্রলোক রিকশ নিয়ে কোর্ট মোড়ের দিকে চলে গেলেন। এখন কোথা থেকে ফিরে এলেন আবার? সমীরের পেছন পেছন হেঁটে আসছেন! আশ্চর্য!

'কিছু আশ্চর্য নয়। একটু গিয়ে মনে হল আপনার সঙ্গে কথা বলা দরকার। আমার কাজটা অন্যদিন করলেও হবে। কিন্তু, কে জানে, আপনাকে কথাগুলো বলতে পারব কিনা।'

অদ্ভুত লোক! মনের কথা হুবহু বলে দিচ্ছেন! আবার ওকে কিছু কথা বলবেন ভেবে নিজের কাজ ছেড়ে ওর পেছন পেছন আসছেন।

মনের কথা পড়তে পারি না। বডিল্যাংগোয়েজ বলে একটা কথা আছে। আমাকে দেখে আপনার হাবেভাবে চোখের দৃষ্টিতে যে ছবিটা ফুটে উঠল, তাই পড়েছি। এটাই হল ম্যাজিক আমার। হাঃ হাঃ করে হাসেন ভদ্রলোক। ঠিক কথা। সমীরের বাহবা দিতে ইচ্ছে হয় ভদ্রলোককে। চমৎকার লোক। এসব লোক যদি সবসময় আশেপাশে থাকে, মানুষ তাহলে সহজে হতাশ হবে না।

'এখন বলুন, জাদুকর হতে গেলে আপনার কী কী জানা দরকার।'

'কী?' সমীর দাঁড়িয়ে পড়ল। এ গলিটা বেশ নির্জন। এখনও শহুরে আবহাওয়া ঢোকেনি এসব গলিতে। পুরনো দিনের বাড়ি। বাগানে রাজ্যের শুকনো কাঁঠালপাতা পড়ে আছে। লোকজন নেই। এক বুড়ি খুকখুক করে চলে গেল খানিকক্ষণ আগে।

'প্রথমে সাধনা। সাধনা না করলে শিল্প আয়ত্ত হয় না! বার বার অভ্যাসের নামই সাধনা। তুমি যাদু শেখ। তারপর বারবার অভ্যেস কর। এটা এক নম্বর। কথা বল। সুন্দর করে কথা বলতে জানতে হবে! অর্থাৎ সুন্দর বাক্য বিন্যাস চাই! চাই অভিনয় ক্ষমতা। ভালো যন্ত্রপাতি! যন্ত্রপাতি! তার জন্য টাকা চাই।' সমীর হাসে ওটাই তো মেইন প্রবলেম!'

'না! তুমি পারবে! একবার শুরু কর।'

'আপনার কথা আমার মনে থাকবে। সত্যি কথা বলতে গেলে, এভাবে আমায় কেউ কখনো সাহস জোগায়নি!' সমীর বিনীত হয়।

ভদ্রলোক চলে যাচ্ছিলেন। সেই নির্জন গলিপথে দাঁড়িয়ে ভদ্রলোককে দেখছিল সমীর। আশ্চর্য হতে হয়। পৃথিবীতে এরকম লোকও আছেন! সুপর্ণা ভাগ্যিস ডেখেছিল ওকে। না হলে এরকম একটা মানুষের সঙ্গে দেখা হত না।

সমীর একটা শ্বাস ছেড়ে ছাত্রের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হল।

সারাদিনের মধ্যে এমন সব কাণ্ড ঘটল! সমীরের মন অশান্ত হয়ে ছিল! চাঞ্চল্যকে সরিয়ে রাখতে পারছিল না ও। সারা রাত ছিন্নবিছিন্ন ঘুম হল। তারই মধ্যে দেখল গত বছরের সেই জাদুকরকে। অদ্ভুত ভঙ্গিমায় যাদু দেখাচ্ছেন ভদ্রলোক। দুহাত নেড়ে বাতাস থেকে গাদা গাদা টাকা ধরছেন। অজস্র টাকা উড়ছে। পাখনা উড়িয়ে টাকারা ঘোরাঘুরি করছে। আর, জাদুকর বিশ্রীভাবে হাসছেন। হাসতে হাসতে তার শরীর ছেড়ে চামড়া খুলে ফেলছেন। রক্তাক্ত মুখ জুড়ে বীভৎস হাসি!

ঘেমে নেয়ে ঘুম ভেঙে গেল। কী বিশ্রী স্বপ্ন! সারাক্ষণ এই ম্যাজিক ম্যাজিক করে তার বারোটা বেজে গেল। কালই সুপর্ণার বাড়িতে যাবে। ওর কাকার সঙ্গে দেখা করতে হবে। উনি যত সব ভাবনা আরও ঢুকিয়ে দিলেন। পাগলকে সাঁকো নাড়াতে বলা, আর কী!

পরদিন সকালে সুপর্ণার বাড়িতে গিয়ে কাকার সঙ্গে দেখা হল। খবরের কাগজ পড়ছেন। ওকে দেখে চিনতে পারছিলেন না। একটু অবাক হল ও। গতকাল এত কথা, অথচ আজ চিনছেন না!

'গতকাল? ও, আপনার সঙ্গে রিকশতে গেয়েছিলাম? আচ্ছা! আসলে, বয়স হয়েছে! সব ভুলে যাই কিনা! হ্যাঁ, বলুন!'

'আসলে, আমার খুব ইচ্ছে করছিল আপনার সঙ্গে কথা বলতে! তাই...। আসলে... আপনি যেভাবে আমাকে যেভাবে অনুপ্রাণিত করেছেন...!'

'আমি? মানে? কী করে অনুপ্রাণিত করলাম?'

সমীর বাস্তবিক অবাক হচ্ছিল। ভদ্রলোক কি সুপর্ণার সামনে কিছু প্রকাশ করতে চাইছেন না? তাই হবে। সমীর কী করা উচিত এই মুহূর্তে বুঝতে পারছিল না! ভদ্রলোক কি ওকে এড়াতে চাইছেন! কিন্তু, কেন? 'একটু জল খাওয়া সুপর্ণা!' সুপর্ণাকে সরিয়ে দিতে চাইছিল সমীর। ভদ্রলোককে একা পাওয়া দরকার।

সুপর্ণা চলে গেল। ভদ্রলোকের দিকে তাকাল সমীর, 'গতকাল যেভাবে নিজের কাজ ছেড়ে আমার সঙ্গে কথা বললেন, আমি অভিভূত। কী বলে যে ধন্যবাদ দেব আপনাকে।'

ভীষণ আশ্চর্য হলেন ভদ্রলোক, 'কী বলছেন! আমি তো কিছু বুঝতে পারছি না। আমার কাজ ছেড়ে আপনার সঙ্গে কথা বললাম কখন? আপনি নেমে গেলেন সুভাষ পল্লীতে, আমি চলে গেলাম কোর্ট মোড়ে। ব্যাস! তারপর, আর...?'

'আপনি তো কোর্ট মোড়ে যাননি! ফিরে এলেন। বললেন, আমার সঙ্গে কিছু কথা বলবেন বলে নিজের কাজ ছেড়ে চলে এসেছেন! আমার সঙ্গে কত কথা হল। ম্যাজিক নিয়ে বললেন। আমাকে সাহস দিলেন।' সমীর কীভাবে বোঝাবে বুঝতে পারছিল না!

ভদ্রলোক কিছুক্ষণ তাকিয়ে তাকিয়ে সমীরকে দেখলেন, 'বসুন! জল খান! আমার খুব খারাপ লাগছে! কিন্তু, একটা কথা বলব। আপনি সত্যি আপনার সঙ্গে দ্বিতীয়বার দেখা করিনি। ঠিক সাড়ে তিনটের সময় আমার কাজ ছিল। আমি সাড়ে তিনটেয় কোর্টে পৌঁছেছি। খোঁজ নিয়ে দেখুন! আপনার সঙ্গে আমার কথা হয়েছে বলছেন, সেটা কখন?'

'সাড়ে তিনটে?' সমীর জানাল।

একেবারে ভুল হচ্ছে আপনার। আমি সাড়ে তিনটে কেন, সওয়া তিনটের মধ্যে কোর্টমোড়ে পৌঁছেছি! খোঁজ নিন! আশ্চর্য হওয়ার আর বাকি ছিল না কিছু। আবার, একথাও তো ঠিক যে, লোকটা উপকার করে অস্বীকার করবে কেন? সে তো সমীরের কোনও অপকার করেনি রে বাবা!

সবকিছু তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। সমীর উদ্দেশ্যহীনভাবে এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াল। এমন নয় তো, চিন্তায় চিন্তায় সমীর নিজেই আজগুবি সব ছবি দেখছে! এ আবার কী জাতীয় ম্যাজিক দেখাচ্ছে প্রভু ভগবান! আর যা-ই কর পাগল বানিয়ো না স্যার! তাহলে সব পুরোপুরি অন্ধকার!

রাতে নিজের বিছানায় বসে বসে তাসের ম্যাজিক অভ্যেস করে চলে সমীর। সব পুরনো খেলা। তার মধ্যে জাদুকর ভদ্রলোক যা শিখিয়েছিলেন, সবই এই একবছরে বার কুড়ি দেখানো হয়ে গেছে। অর্থাৎ, নতুন ম্যাজিক বলতে আর কিস্যু নেই। সব থোড় বড়ি খাড়া আর খাড়া বড়ি থোড়। এইসব এখন পথের ষোলো বছরের বাচ্চারা পারে। ধাৎ তেরি।

বিরক্ত সমীর তাসের প্যাকেট ছুঁড়ে ফেলে বিছানার ওপর। আর, তারপরই ঘটে যায় এক অভূতপূর্ব ঘটনা। বিস্মিত সমীর দেখে তাসগুলো প্যাকেট থেকে সার বেঁধে বেরিয়ে আসছে। একটার পর একটা। কোনও ধাক্কাধাক্কি নেই। গোলমাল নেই। অদৃশ্য অঙ্গুলি হেলনে ঘটে চলেছে এক চলচ্চিত্র!

সার বেঁধে তাসেরা সব দাঁড়াল। তারপর শুরু হল পর্যায় সারণির খেলা। সংখ্যানুযায়ী পরপর একের পিঠে এক উঠে দাঁড়াল। অসম্ভব ব্যালেন্সের খেলা যেন। এভাবে কতক্ষণ চলল কে জানে। একটা সময় সব তাস সার বেঁধে দাড়িয়ে ঝুঁকে পড়ে অভিবাদন করল সমীরকে। তারপর ঢুকে গেল প্যাকেটে। নীরবে। কোনওরকম ঠেলাঠেলি না করে।

ভয়ে তাসের প্যাকেট ছুঁতে পারল না সমীর। অস্বাভাবিক নয়! এরকম ম্যাজিক দেখবার কথাও ভাবেনি কখনও। দেখাবার কথা তো নয়ই!

'দেখাবার কথাও নয়।' সমীর নিজেকে প্রশ্ন করেছিল। 'সত্যিই কি এরকম ম্যাজিক দেখানো যায় না?'

কী করে? এ অন্য জগতের ম্যাজিক। পরলোক থেকে এসব ম্যাজিক শিখে আসতে হবে। কী করে তাকে ইহলোকে আয়ত্ত করবে ও।

কিন্তু, যদি আয়ত্ত করা যেত? তাহলে?

ভাবতেই চনমনে হয়ে পড়ে ও। জানে না কী করে এই ম্যাজিক দেখাল তাস! কে ছিল সেদিন ওর আশেপাশে? কিন্তু, একটা সন্দেহ যেন ঝাপসা হয়েও উঁকি দিয়ে চলেছে! কথা দিয়েছিলেন যাদুকর। ফিরে আসবেন। এসে ম্যাজিক শেখাবেন। উনি কি বেঁচে নেই! কথা রাখতে পারেননি বলে স্বস্তি পাচ্ছিলেন না? নাকি, সমীরের ঐকান্তিক আগ্রহ তাঁকে টেনে এনেছিল এ ঘরে? এই পৃথিবীতে?

সমীর ধীর গতিতে এগোয়। যেই হোক সে সমীরের ভালো চায়। সমীরকে এগিয়ে দিতে চায়। সে সুযোগ সমীর ছাড়তে পারে না। সেটা উচিত হবে না।

শুরু হয় দুই অসম জগতের মিলন। একজন গুরু অন্যজন ছাত্র। কাউকে দেখতে পায় না সমীর। অথচ একের পর এক ম্যাজিক শিখে ফেলে। দুঃসাহসিক ম্যাজিক অক্লেশে শিখতে থাকে সমীর। ঘরের দরজা বন্ধ করে।

খাওয়া নেই, দাওয়া নেই। স্নান নেই। তিনদিন কেটে গেছে। সমীরের কোনও সাড়াশব্দ না পেয়ে নীলাঞ্জন এসেছিল খোঁজ নিতে। বস্তুত ওরই ডাকাডাকিতে আর পাঁচজন উঁকি দিল। কে ছেলেটা?

—'আমি সমীর স্যারের কাছে পড়ি। আজ তিনদিন হল স্যার যাননি। কোনও খবরও দেননি! তাই...!'

'স্যার কি বাড়িতে আছেন—?'

আছেন! দরজা তো ভেতর থেকে বন্ধ! অর্থাৎ ভেতরে আছেন স্যার।' দরজা ভেঙে ফেলা হল। ভেতরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। একটা ভ্যাপসা গন্ধ। লোকটা আছে ঘরের চার দেওয়ালের মধ্যে!

'আলোটা জ্বালো।' ওয়ার্ড কাউন্সিলারকে ডেকে এনেছে কেউ। তিনি সব বিষয়টি নিজের হাতে তুলে নিলেন।

আলো জ্বেলে দিল কেউ টুক করে। ছোট ঘর। একটা টেবিল দরজার পাশেই। টুকিটাকি জিনিসপত্র ভর্তি ঘর। একটা শার্ট ঝুলছে চেয়ারের হাতলে। বাঁমদিকের দেওয়াল ঘেঁষে ছোট তক্তপোষ। সেই তক্তপোষের ওপরে রাজ্যের তাস, ম্যাজিকের নানা খুচরো সরঞ্জাম। কিন্তু—

'একি! ঘরে তো কেউ নেই!'

না! কেউ নেই ঘরে। সমীরের জুতো, জামা সব আছে। কিন্তু সমীর...?

নেই? সমীর নেই! জীবনে জাদুকর হওয়ার প্রবল ইচ্ছে থেকে সমীর এগিয়ে যাচ্ছিল জাগতিক মোহমায়া কাটিয়ে। এগোতে এগোতে কোথায় গেছে কে জানে!

জীবনের সেরা ম্যাজিক দেখিয়ে গেছে ও। আজ।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%