ফিরে ফিরে আসে

সাগরিকা রায়

সে দিন খুব হুড়োহুড়ি ছিল। এক দৌড়ে বাস-এ উঠতে যাচ্ছিল রিভু।ফণিবাবু না আটকালে উঠেই পড়ত। থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে ফণিবাবুর দিকে তাকাল রিভু।

—কিছু বলছেন? বলতে বলতে রিভু ব্যস্তভাবে বাসের দিকে তাকাল। বাসটা ছেড়ে না যায়!

—বলছি, ভাল তো? ফণিবাবুর বেঁটে শরীরটার মতো ছায়াটাও খুব বেঁটে। রিভু অসহায় চোখে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখল বাসটা ছেড়ে দিল।

রিভু এত রেগে গিয়েছিল যে কী বলবে বুঝে উঠতে পারছিল না। একজন বয়স্ক মানুষকে কী-বা বলা যায়? কিন্তু ওর আজ খুব দরকারি কাজ ছিল। পরের বাস আবার পঁয়তাল্লিশ মিনিট পরে আসবে। ফণিবাবুর অহেতুক কুশল প্রশ্নাদির ধামাকায় সময়টা নষ্ট হল। ফল—বাস ফেল। মনে মনে গজগজ করলেও মুখে সেটা আর প্রকাশ করলনা রিভু। ফণিবাবু জবাব পাওয়ার জন্য ওর মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলেন।

—হ্যাঁ, ভালো আছি। আপনি ভালো তো? রিভু সৌজন্যমূলক হাসল। আসলে রিভু অভদ্র হতে শেখেনি।এটা যার যার স্বভাব। কিছু করার নেই।

—ভালো, তবে তুমি এত রোগা হয়ে গেছ কেন? জিম টিম করোনা? তোমার বাবা-কাকাকে দেখেছি। কী দারুণ সব চেহারা ছিল! আগের দিনের মানুষ। ঘি-মাখনে তো কোনও ভেজাল ছিলনা। শরীর ছিল খাঁটি। দুর্বলতা কাছে ঘেঁষতে পারত না। আর এখন? পৈটিক গোলমাল লেগেই আছে। শরীর ভালো হবে কী করে?

প্রশ্নটা রিভুকে উদ্দেশ্য করে। রিভু উসখুস করে, তা তো ঠিকই।

—তবে? ঠিক বলেছি কিনা বলো? ডাক্তারের চেম্বারে গেলে কী দেখবে? সব মুখ শুকনো করে বসে আছে। জিজ্ঞাসা। বলবে, পেটের গোলমাল। রাসায়নিক সার আমাদের সর্বনাশ করল। ঠিক কিনা?

ফণিবাবু রীতিমতো রাস্তা আটকে দাঁড়িয়ে। রিভু রীতিমতো বিপন্ন বোধ করে। রাস্তাঘাটে জরুরী দরকারে বেরিয়ে যদি এই সব অতি ভদ্রলোকেদের সঙ্গে দেখা হয়ে যায়, তাহলে বিপদ তো বটেই!

সকাল দশটার মধ্যে কোচবিহারে পৌঁছতে হবে। অথচ, হল! পরের বাস পেয়ে কোচবিহারে পৌঁছতে দেরি হয়ে যাবে অনেক! যা মনে হচ্ছে, আজ আর কাজটা হবে না।

সেলফোন বের করে নিবেদনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে রিভু। সবই লাক-এর ব্যাপার। ভাগ্য খারাপ হলে সব খারাপ! না হলে ঠিক এখনই নিবেদন ফোনের সুইচড অফ করে রাখে!

—আচ্ছা! তাহলে..., ফণিবাবু বিদায় নিয়ে গুড়গুড় করে রাস্তা পার হয়ে চলে যান। তাঁর কাজ শেষ। রিভুর বারোটা বাজিয়ে তিনি এবারে নিশ্চিন্তে চলেছেন।

—তুমিও পারো! বলতে পারতে পরে কথা হবে। এখন একটু ব্যস্ত আছি। সীমন্ত পেছনে দাঁড়িয়ে থেকে বিরক্ত হয়ে গেছে। আসলে ফণিবাবুর এই স্বভাবের সঙ্গে অল্পবিস্তর সবাই পরিচিত। মিতুল দাঁড়িয়ে থেকে ওদের কথা শুনছিল। ও এগিয়ে এল ওদের কাছে।

—সেদিন আমি ওকে পাত্তা দিইনি। কেন দেব? দোকান খুলব বলে চাবি বের করেছি। উনি হাজির। ভারি গলায়,—'কী খবর?' এমনভাবে বললেন! সাঙ্ঘাতিক চমকে উঠেছি। দেখি, ঠিক পেছনে এসে দাঁড়িয়েছেন! আমি চমকে উঠলাম। আর হাত থেকে চাবি পড়ে গেল। খুব রাগ হল।

কথার জবাব না দিয়ে চাবি তুললাম! তালা খুললাম। ভেতরে ঢুকতেই ফণিবাবু এসে কাউন্টারের বাইরে দাঁড়িয়ে ব্যবসাপত্র নিয়ে নানাবিধ উপদেশ দান করে যেতে লাগলেন।

আমি একটি শব্দও না করে দোকান ঝাঁট দিতে শুরু করলাম। ধুলোতে ওঁর আলার্জি আছে জেনে রাখো। ইনফো-টা কখনও কাজ দিতে পারে! ধুলো নাকে যেতেই 'অ্যা ইস ইস' বলে লাফ দিয়ে নেমে গেলেন দোকান থেকে! নিজের কথায় নিজেই হাসতে শুরু করে মিতুল। দেখাদেখি সীমন্তও। কিন্তু রিভুর মন তেতো হয়ে আছে। খুব খারাপ হল। বেশ দেরি হয়ে যাবে আজ। সত্যি! ফণিবাবু কী যে করেন!

—এই রিভু, ওঁর ধুলোতে এলার্জি! কাছে এলেই রুমাল বের করে ওঁর নাকের সামনে নাচাব। একমাত্র ফণিবাবুর জন্যই একটা রুমাল থাকবে পকেটে। পাউডার ভরা। বুঝলে? সীমন্ত হাসতে থাকে—ধুলো আর পাউডারের একই এফেক্ট।

ফণিবাবুকে নিয়ে অনেকক্ষণ রং তামাশা হল বটে, রিভু বুকের ভেতরের খোঁচাটা সরাতে পারল না। আজ ওর কোচবিহারে যাওয়াটা খুব দরকারি ছিল। অফিসের কাজ বলে কথা। ওকে চিন্তিত দেখে সীমন্ত বুদ্ধি দিল—মাথাভাঙা লিমিটেডে এ চলে যা। ওখান থেকে কোচবিহারে চলে যাবি। সময় নষ্ট হবে না।

সেই মতো রওনা হয়ে গেল রিভু। দিনটা আজ কেমন কেমন যেন। জটেশ্বর পেরোতে না পেরোতে তোড়ে বৃষ্টি নেমে গেল। সঙ্গে, যা হয় আর কি, ছাতাটা আনতে ভুলে গেছে। সকালে ঝকঝকে রোদ ছিল। ছাতা সঙ্গে নিয়ে আসার কথা মনেই নেই। বাড়িতেও কেউ মনে করিয়ে দেয়নি। অন্যদিন কালো ব্যাগে রেইনকোট থাকে। আজ সে ব্যাগ নিয়ে বের হয়নি। আজ শুরু থাকেই নানা বিড়ম্বনা। চলবে বোধহয় সারাদিন। কোথা থেকে ফণিবাবু এসে যাত্রায় বিঘ্ন ঘটালেন। ব্যস!

বাসের ভেতরে ঠান্ডা ঠান্ডা হাওয়া খেলছে। রাস্তার দু-ধারে প্রাচীন সব মহীরুহ হাজার বছরের ইতিহাস বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কত যুগ ধরে এরা বাতাস সাপ্লাই করে যাচ্ছে পৃথিবীর গায়ে! রিভুর ঘুম পাচ্ছে। আরামে শরীর ছেড়ে দিয়েছে সিটে। চোখ বুজে আসছে। কিছুতেই খুলে রাখতে পারছে না চোখ। রাতে ভালো ঘুম হয়নি। আজ কোচবিহার যেতে হবে বলে টেনশনে বারবার ঘুম ভেঙে গেছিল। গাঢ় ঘুম হয়নি। তাই এখন শরীর ঢলে ঢলে পড়ছে।

মাথাভাঙা পৌঁছতে এখনও ঘণ্টা দুই দেরি। সিটে শরীর এলিয়ে দিল রিভু। এভাবে থাকলে রেস্ট হবে। চমৎকার বাতাস খেলছে। মুখের উপর দিয়ে ঠান্ডা বাতাস হাত বুলিয়ে দিয়ে যাচ্ছে! আঃ, কি আরাম! বাইরে বৃষ্টিটা একটু ধরেছে।

ভেজা গাছপালা মাথা দুলিয়ে যেন ডাকছে রিভুকে! আধবোজা চোখে রিভু দেখল রাস্তার ধারের নাবাল জমিতে জমে থাকা জল সাঁতরে চলে যাচ্ছে ঢোঁড়া সাপ! মাঝে মাঝে মাথা উঁচু করে কী দেখে নিচ্ছে। লম্বা একটা ভেজা পথ চলে গেছে অনেক দূরে। এই বাস আর বৃষ্টি—স্নাত রাস্তাটা ছাড়া কোথাও কিছু নেই।

ফের চোখ বুজে আসছে। কী একটা দেখে ঝট করে সচেতন হয়ে পড়ল রিভু। চমকে গেছে ও। ভীষণ চমকে উঠেছে। ও কি সত্যি সত্যি দেখছে? কী আশ্চর্য!

ফণিবাবু! এখানে? বাসের জানালার বাইরে ফণিবাবু? চলন্ত বাসের সঙ্গে তাল রেখে কী করে ফণিবাবু হাঁটছেন? বাস চলছে। বাসের বাইরে পাশাপাশি চলছেন ফণিবাবু। রিভু বিস্ফারিত চোখে তাকিয়েছিল। ফণিবাবু যেতে যেতে ওর দিকে তাকালেন—সব ভালো তো?

রিভু বিস্ময়ে কথা বলতে পারল না। বাসের বন্ধ জানালার বাইরে থেকে ওকে চিনলেন কী করে ফণিবাবু? তাছাড়া বন্ধ কাচের জানালার বাইরে থেকে কথার শব্দ ভেতরে আসছে কী করে? আর একটা ব্যাপারেও কনফিউমড রিভু। ফণিবাবু কি সাইকেলে আছেন? গাড়ির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছেন কী করে?

রিভু গলা বাড়িয়ে দেখতে গেল। না তো! ফণিবাবু সাইকেলে বসে নেই! মূলত কোনও যান বাহনের উপরেই নেই ফণিবাবু! হেঁটে হেঁটে...না, বস্তুত ফণিবাবু যেন উড়ে চলেছেন বাসের সঙ্গে সঙ্গে! অথচ পিঠে কিন্তু কোনও পাখা টাখা কিস্যু নেই। ব্যাপারটা কী? ভদ্রলোক কি তন্ত্রমন্ত্র জানেন নাকি?

একটা আশ্চর্য ব্যাপার হল গাড়ির অন্য যাত্রীরা কেউ কিছু বলছে না! ওরা কি কিছুই দেখতে পাচ্ছেনা? রিভু ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে খেয়াল করল যাত্রীদের, নাঃ, কেউ কিছু দেখছে বলে মনে হচ্ছে না।

ফণিবাবু উড়ে উড়ে যাচ্ছেন হাওয়ায় ভর করে, কিন্তু কেউ দেখছেনা! একমাত্র রিভু ছাড়া! ভয় ভয় লাগতে শুরু করেছে রিভুর। কী কাণ্ড রে বাবা!

এরকম ঘটনা যে ঘটতে পারে, ও ভাবতেই পারেনি কখনও। কিন্তু চিন্তা হচ্ছে এই ভেবে যে ফণিবাবু এলেন কখন? বাসস্ট্যান্ডে রিভুর সঙ্গে দেখা হওয়ার পর তো হেঁটেই চলে গেলেন। এখন যেটা হচ্ছে, সেটা কি খুব সহজ কিছু? এভাবে উড়ে উড়ে যাওয়া যায়? এটা সম্ভব?

—ও ছেলে, কেমন আছ বললে না তো?

জানালার বাইরে ফণিবাবুর মুখ। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে রিভুর দিকে তাকান। রিভু 'ভালো আছি' বলবে কিনা ঠিক করতে পারছিল না। কেমন যেন বোকা বোকা লাগছে! ও কি চোখে ভুল দেখছে?

—ও ছেলে, কী আশ্চর্য! তখন থেকে জানতে চাইছি একটা কথা। জবাব দিচ্ছ না কেন? কি অ্যাঁ? খুব অবাক নাকি? ফণিবাবু হাসতে থাকেন।

রিভু দাঁত খিঁচিয়ে উঠবে ভেবেছিল। কী কাণ্ড আপনার বলুন? কোনও ভদ্রলোক কি এভাবে উড়ে উড়ে চলে? আপনি কি তন্ত্রমন্ত্র জানেন? বাহ্যত কিছুই বলল না রিভু। অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। এই সময় ফণিবাবু ওর জানালার কাছে এসে ফিসফিস করে কিছু বললেন। রিভু কিছু বুঝতে পারল না। ও গলা বাড়াল,—কিছু বলছেন?

ফণিবাবু হাসলেন,—রাগ করছো কেন? আমি কারও খারাপ চাই না। গাড়িতে ওঠার সময় পিছু ডেকেছি বলে কত নিন্দেমন্দ করলে! অথচ আমি কিন্তু তোমার ভালো চেয়েছি। নাহলে ওই গাড়িতে গেলে আজ এতক্ষণে তুমি ভাই...। রক্তাক্ত অবস্থায় রাস্তায় পড়ে থাকতে। বাধা না দিলে ওই গাড়িতে উঠতে তো?

—গাড়িটা অ্যাকসিডেন্ট করেছে নাকি? রিভু বিমূঢ়-কোথায়? কী করে?

—দেখ, আমি বলে গেলাম। এবারে তুমি মিলিয়ে নেবে। সেদিন মিতুলের দোকান খোলার সময় দেখলাম আজ ওর কোনও বেচাকেনার যোগ নেই। তাই বাধা দিয়েছিলাম। আমি তোমাকে তেমন বাধা দিয়েছি।

—কেন?

—আমি চাই সবাই ঘরে ফিরে আসুক। ভালো থাকুক। ফণিবাবু হাসতে থাকেন। হাসতে হাসতে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে যেতে থাকেন। আবার গুঁড়োগুলো জুড়ে জুড়ে ফের আস্ত ফণিবাবু।

মজা মন্দ নয়। ভদ্রলোক এসব কায়দা কী করে শিখলেন? রিভুকে শিখিয়ে দিলে তো আর বাস টাসের হাঙ্গামায় পড়তে হয় না! চমৎকার উড়ে উড়ে হেসে হেসে গায়ে বাতাস মেখে-টেখে যথা ইচ্ছে তথা যেতে পারে। কিন্তু উনি কী যেন একটা কথা বললেন! 'আমি চাই সবাই বাড়ি ফিরে আসুক'! মানে কী কথাটার? এমন কথা বললেন কেন ফণিবাবু? রিভু গলা বাড়িয়ে দেখতে গেল ফণিবাবু এখনও জানালার বাইরে আছেন কিনা!

প্রথমে কিছু দেখা গেল না। তারপরে ফণিবাবুর একটা হাত দেখা গেল। বাতাসে দোল খেয়ে খেয়ে চলেছে হাতখানা। রিভু বুঝতে পারল না ওটা সত্যি ফণিবাবুর হাত কিনা। অন্য কারও হাত নয়তো? কিন্তু উনি ছাড়া বাসের সঙ্গে সঙ্গে আর কেউ তো ছিল না!

ওই যে! আর একটা হাত। ওই হাতে একটা উল্কি আছে না? হুম, তাহলে ওটা ঠিক ফণিবাবুর হাত। একটা পা বাতাস ফুঁড়ে বেরিয়ে এল। ধুসর রঙের ফুলপ্যান্টের একটা দিক দেখা যাচ্ছে। বাপরে! ফণিবাবু কি এইভাবে টুকরো টুকরো হয়েই দেখা দেবেন? লোকটাকে সম্পূর্ণ রূপে পাওয়া না গেলে কথা-টথা বলবে কী করে রিভু?

বারবারই গলা বাড়িয়ে দেখছিল রিভু। যদি ফণিবাবুকে একবার অন্তত পুরোপুরি দেখা যায়! 'সবাই ফিরে আসুক' কথাটার মানে জিজ্ঞাসা করতে হবে। কেন তিনি অমন একটা কথা বললেন? ফিরে তো সবাই আসে, আসবে! কোথাও যাওয়া মানেই কি অগস্ত্য-যাত্রা নাকি? ভদ্রলোক একটু ছিটেল আছেন। এই যে বাস-এর সঙ্গে সঙ্গে 'নেই' হয়ে ছুটছেন, তারও কি কোনও অর্থ আছে?

—কিছু মনে করবেন না, আপনি বারবার বাইরে ঝুঁকে কী দেখছেন? তামাটে চেহারার মহিলার কোলের উপর উলের বল। দুহাতে বুনে চলছেন। মুখে পান। কথা বলার সময় মুখটা উঁচু করে রেখেছেন। পানের রস সামলাতে। উনি হয়তো অনেকক্ষণ ধরে রিভুকে লক্ষ্য করে চলেছেন। রিভু থতমত খেল। কী যে বলবে বুঝে উঠতে পারছে না। মহিলা একভাবে ওকে লক্ষ করে যাচ্ছেন। রিভু ঢোক গেলে।

—আসলে...ফণিবাবু...আমাকে...! কী করে ব্যাপারটা বোঝাবে বুঝে উঠতে পারে না রিভু। মহিলা কিন্তু বেশ বুঝে ফেললেন। মাথা নেড়ে নেড়ে বুনে চলেছেন। মুখ চলছে,—আপনি বুঝি কারও জন্য অপেক্ষা করছেন? তাই বলুন। কিন্তু তিনি এখানে কোথা থেকে আসবেন? এখানে কি স্টপেজ আছে?

—না, নেই।

—তবে?

—মানে, ফণিবাবু বাসের সঙ্গে ছুটতে ছুটতে মাঝে মাঝে 'নেই' হয়ে যাচ্ছেন। কখনও তাঁর একটা হাত, কখনও একটা পা দেখা যাচ্ছে...! তাই...! আসলে আমি ওঁকে একটা কথা বলব, কিন্তু কিছুতেই পুরোপুরি মানুষটাকে পাচ্ছি না। কথাগুলো বলেই রিভু জিভ কাটল। এই তামাটে চেহারার মহিলাটি কি রিভুকে পাগল ভাবছেন? ভাবাই তো উচিত!

—ওহো, তা-ই বলুন। দেখুন ঝট করে হয়তো পুরো শরীর নিয়ে হাজির হবেন! অনেকের মধ্যে এরকম শখ বা অভ্যেস থাকে ছোটার। সত্যি খুব বাজে অভ্যেস। রিভু ফের গলা বাড়াল। না, এখনও ফণিবাবুকে দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু মহিলাটি ওর কথা বিশেয়াস করেছেন! আশ্চর্য!

—দেখতে পেলেন? মহিলা উল বুনতে বুনতে প্রশ্ন করেন,—আপনার রিলেটিভ নাকি?

—না, না, পাড়ার লোক। খুব চেনা। আসলে উনি আজ আমাকে একটু অন্যমনস্ক করে তুলেছেন। একটা অদ্ভুত কথা বলেছেন কিনা! তাই আমি টেনশন ফিল করছি। রিভু বোকা বোকা হাসে।

—কী রকম? উল বুনতে বুনতে কথা বলেন মহিলা। চোখ তুলে রিভুকে দেখেন। মহিলার চোখের মণি ধূসর। অনেকটা ফণিবাবুর মতো।

—উনি আমাকে বললেন, আমি চাই তোমরা সব ফিরে এসো। কথাটার মানে বুঝতে পারছি না।

—ও, মহিলা ঠোঁট সূচালো করেন,—কথাটার মানে হল উনি আপনার জন্য চিন্তা করছেন। উনি চান, আপনি নির্বিঘ্নে বাড়িতে ফিরে যান। মহিলা ফিসফিস করে হাসলেন,—ভাববেন না। দ্রুত হাত চলে মহিলার। আশ্চর্য হল রিভু। ফণিবাবু কেন ওর শুভচিন্তক হয়ে উঠলেন? কথা নেই, বার্তা নেই, ওর জন্য চিন্তা করে বাস-এর সঙ্গে ছুটতে...নাকি উড়তে শুরু করেছেন!

আচ্ছা, রিভু স্বপ্ন দেখছে না তো? কৌতূহল বাগ মানছে না। ফের গলা বাড়িয়ে দিল রিভু। এবারে জানালার ঠিক বাইরেই ফণিবাবুকে দেখা গেল। হাসি হাসি মুখ। মাথা চুলকোতে চুলকোতে রিভুকে দেখে হাসলেন। মেঘ ঝমঝম দিনে ছায়া ছায়া ফণিবাবুর হাসিটা মেঘলা মেঘলা। বিষণ্ণ।

—তারপর? কোনও সমস্যা নেই তো? রিভুকে প্রশ্ন করছেন।

—কোনোই সমস্যা নেই। আপনি কি বাসের সঙ্গে সঙ্গে ছুটবেন? রিভু না বলে পারল না,—কেউ দেখে ফেললে আপনাকে পাগল ভাববে। নাহলে ভূত ভেবে দাঁত কপাটি লেগে যাবে। আমিই তো বুঝতে পারছি না কী দেখছি! চোখের ভুল না কী কে জানে!

—না, না, এখন ফিরে যাব। যতক্ষণ না একটা ফিরতি বাস পাই ততক্ষণ যাব এভাবে তোমাদের বাসের সঙ্গে উড়ে উড়ে ...।

—কেন? বুঝতে পারল না রিভু-ফিরতি বাস কেন? আপনি কি ফেরার সময় বাসে চেপে ফিরবেন?

—না, বাসে কেন? আমি তো উড়েই যেতে পারি। ফণিবাবু রিভুর অজ্ঞতায় হাসতে থাকেন।

—তাহলে ফিরতি বাসের জন্য অপেক্ষা কেন? আপনি কি রাস্তা চেনেন না?

—কি হয়, একা একা উড়লে বাতাসের ধাক্কায় গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে যাই। ওভাবে ফিরতে পারি না ভাই। বলতে বলতে ফণিবাবু খ্যাক খ্যাক করে হাসতে থাকেন। হাসতেই থাকেন। তাঁর মুখ থেকে ঝরঝর করে দাঁত খুলে পড়তে থাকে। রিভু আতঙ্কিত হয়ে পড়ে,—আরে, কী হচ্ছে এসব? চেঁচিয়ে ওঠে রিভু। ফর্সা চেহারার মহিলা অল্প ধাক্কা দেন,—এই কী হল? চেঁচাচ্ছেন কেন?

রিভু চোখ খুলে দেখল ওর পাশে একটি খুব ফর্সা মহিলা অবাক চোখে তাকিয়ে। মুখোমুখি সিটের রোগা, ফ্যাকাশে মহিলাও হাসি হাসি মুখে অবাক হয়ে তাকিয়ে। তার পাশের ছোট্ট ছেলেটি একমনে আঙুল চুষছে।

—কী হল? ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছিলেন নাকি? রিভুর পাশে বসা মহিলার হাতে কোনও বুনন নেই! সেই তামাটে মহিলা ইনি নন! সেই মহিলা কোথায় গেলেন? ভারি অবাক হল রিভু। জানালার বাইরে কোথাও ফণিবাবুর টিকিও নেই! কী কাণ্ড? ও সত্যি স্বপ্ন দেখছিল? অবচেতন মন ওকে ফণিবাবু সম্পর্কে এত তথ্য দিয়েছিল? এমনও হয় নাকি?

—আপনার রিলেটিভ না পরিচিত লোকটি এখনও বাসের বাইরে ভেসে আছেন? মহিলা মিটিমিটি হাসেন-নাকি চলে গেছেন?

—আপনি কী করে জানলেন? অবাক হল রিভু। ও যদি স্বপ্নই দেখবে, তাহলে এই মহিলা সেই স্বপ্নের কথা কী করে জানলেন? রিভু কি সত্যি এসব দেখেছে? ফণিবাবু সত্যি ভেসে ভেসে আসছেন বাসের সঙ্গে সঙ্গে? এসব কি সত্যি ঘটছে?

—আসলে, আপনার জন্য ওই লোকটি খুব দুশ্চিন্তা করেছেন। কে বলতে পারে এই বাসটা দুর্ঘটনায় পড়বে কিনা! হয় তো এমন। গতবছর এই দিনেই একটা বাস অ্যাকসিডেন্ট হয়েছিল...! এই বাসটাই মনে হচ্ছে যেন...! হয়তো সেটা ভেবেই উনি আপনাকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন।

ফর্সা মহিলা ধূসর চোখে তাকালেন,—ভয় করছে? ভয় নেই। ফণিবাবু আছেন। উনি ভেসে ভেসে আসছেন আপনার পাশে পাশে! তাছাড়া ভয় ভাবলেই ভয়! নাহলে সবই তো এক। একটু অন্যরকম মাত্র। ভয় আবার কী?

ভয়? জানেনা রিভু। স্বপ্ন আর বাস্তব কী করে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল, বুঝতে পারে না ও। এই মহিলা ওর স্বপ্নের ভেতরে ছিলেন না! তাহলে কী করে ফণীবাবুর কথা জানতে পারলেন?

বাসের ভেতরে একটা গন্ডগোল চলছে। সেই তামাটে মহিলা কোথায় চলে গেলেন উল বুনতে বুনতে...কোথা থেকে এই খুব ফর্সা মহিলা এলেন...এই ফ্যাকাশে মহিলাটি বা কখন বাচ্চা নিয়ে বাসে উঠলেন...! রিভু বাচ্চাটাকে দেখবে বলে মুখ ঘুরিয়ে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেল। অদ্ভুত কাণ্ড তো। কী হচ্ছে এসব?

উলটো দিকের সিটের রোগা ফ্যাকাশে মহিলা কোথায়? যিনি হাসি হাসি মুখে অবাক চোখে তাকিয়ে দেখছিলেন! তার সঙ্গে একটি ছোট বাচ্চা ছিল। বাচ্চাটা আঙুল চুষছিল! বাস কোথাও থামেনি। ওরা কোথায় গেল? চলন্ত বাস থেকে কোথায় চলে গেল?

বলা যায় না, ওরা ফের এসে হাজির হয়ে যাবে হয়তো! কী সব হচ্ছে আজ। ফর্সা মহিলা বাস অ্যাকসিডেন্টের কথা কী বলছিলেন যেন? সেটা তো শোনা হল না। রিভু ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়।

তামাটে মহিলা মন দিয়ে উল বুনে যাচ্ছিলেন।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%