সেই রাত

সাগরিকা রায়

‘বড় বড় লোহার বল ছুটে আসছে। একটার পর একটা বল। কেউ গাঢ় লাল, কেউ মরচে লাল, কারও রং কমলাটে। সেই সব বলগুলো বাড়ির চারপাশে ছুটে বেড়াচ্ছে। এক একটা লাফ দিচ্ছে প্রায় তিনফুট, সাড়ে তিনফুট! ওরা চেষ্টা করছিল লাফাতে লাফাতে জানালায় ফাঁক দিয়ে ঘরে ঢুকে পড়ার। বার দশেক লাফাল। লাফাতে লাফাতেই একটা বল তিরবেগে ঘরের ভিতরে ঢুকে পড়ল। আর তারপরই শুরু হয়ে গেল অগ্নিকাণ্ড! কোথায়, কোনঘরে জ্বলন্ত স্টোভ ফেটে সারা বাড়িতে আগুন লেগে গেল। দুহাত দিয়ে জল ছিটোতে ছিটোতে রতন মজুমদার 'শিব...শিব...' বলে চিৎকার করে উঠলেন!

স্বপ্নটা ভেঙে যাওয়ার পরও ধাতস্থ হতে সময় লাগল। বললে বিশ্বাস করবে না, আমি জেগে উঠেও চারপাশে থেকে পোড়া গন্ধ পাচ্ছিলাম। সব যেন পুড়ছে। পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে।' রতন মজুমদার তাঁর স্বপ্নের অভিজ্ঞতায় কথা বিস্তারিত বলে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন।

বাস-এর ভেতরে গুটিশুটি বসে আমরা সবাই ওঁর কথা শুনছিলাম। জব্বর ঠান্ডা পড়েছে। গরম পোশাকেও মানছে না। জানুয়ারির প্রথমদিকে উত্তরবঙ্গে শৈত্যপ্রবাহ খেলে যায়। সারাদিন মেঘলা হয়ে আছে। সূর্যের দেখা পর্যন্ত নেই! তাপ আর আসবে কোথা থেকে। প্রতুলদা আবহাওয়া সম্পর্কে আগেই ওয়াকিবহাল ছিল। আমাদেরও তৈরি রেখেছিল।

ঘাড় ফিরিয়ে দেখি মাংকি ক্যাপের ভেতরে চশমাপরা চোখদুটো জানালার বাইরে মেঘ দেখছে। হু হু করে বাতাস এতক্ষণ কোন ফাঁক দিয়ে ঢুকছিল বুঝে ফেললাম। জানালা খুলে রেখে মেঘ দেখা হচ্ছে।

'তারপর? ইন্টারেস্টিং! স্বপ্ন-টপ্ন দেখতে হলে এরকমই দেখা উচিত!' শুভব্রত চেঁচাল। ওর স্বভাবটাই এরকম। না চেঁচিয়ে স্বাভাবিক সুরে কথা বলতে পারে না! ওর দিকে চোখ গরম করে তাকাল সুপর্ণা। এভাবে কথা বললে রতনদা রাগ করতে পারেন তো।

স্বপ্নটা সম্পর্কে আমার বিশেষ কোনও আকর্ষণ ছিল না! স্বপ্ন হল স্বপ্ন। মনের আজগুবি চিন্তাধারার প্রকাশ ছাড়া তাকে আর কিছু ভাবা যায় না। কিন্তু, আমাকে ভাবতে হল। থামলেন রতনদা! আমরা উৎসুক হয়ে তাকালাম। মাঝে মাঝে থেমে গিয়ে যে একটা আগ্রহ সৃষ্টি করার ধান্দা করছেন রতনদা, সেটা বোঝা যাচ্ছে। আসলে এই শীত, মেঘ, একঘেয়ে বাসরাস্তা সবকিছু জমে উঠেছে রতনদার স্বপ্ন বর্ণনার গুণে!

'কেন ভাবতে হল?' বাগচি বৌদি প্রশ্নটা করেই ফেললেন।

কারণ, সেদিন ভোরেই খবরের কাগজ খুলে দেখি, নাগাল্যান্ডের একটি গ্রামে আগুনের বলকে নাকি লাফাতে দেখা গেছে! 'রহস্যময় ব্যাপার' লিখেছে। বিস্তারিত খবর কিছু ছিল না! অথচ আগের দিন কী করে আমার মগজে সেটা পৌঁছে গেল?

'ইথার মারফৎ!' অমলদা পেছনে বসেছেন। তিনি অনেকক্ষণ কোনও কথা বলেননি। এতক্ষণে জায়গামতো তাঁর খবর পেয়েছেন।

হতে পারে। বিজ্ঞান হয়তো তাই বলবে। কিন্তু বারবার আমার কাছেই বা ইথার মারফত খবর পৌঁছয় কেন বলো? সেবার গেছি ভাগ্নেবাড়ি! ভাগ্নে বছর দশেক হল ওখানে আছে। সারাদিন ঘোরাঘুরি করি। খাই দাই। এভাবে তিনটে দিন কেটে যাওয়ার পর চতুর্থদিনে ফিরে আসব বাড়িতে। এরকমটাই প্ল্যান ছিল।

রাতে রাজহাঁসের ডিমের কারি আর মাংস খেয়ে নাক ডাকিয়ে ঘুমোতে ঢুকে পড়েছি বিছানায়। ঘুমোচ্ছিলাম বেশ! কোনও অসুবিধে-টুবি টেরও পাইনি। শেষরাতে অত্যন্ত বাজে....বিশ্রি একটা স্বপ্ন দেখলাম। দেখলাম একটা পেট্রোলপাম্পে আগুন লেগেছে! ওঃ! সে যে কী ভয়াবহ আগুন! জ্বলন্ত অগ্নিশিখা যেন আকাশ ছুঁয়ে ফেলবে! সেই আগুনের তাপে ঝলসে যাচ্ছে সব কিছু।

আমার ছেলেবেলায় যে স্কুলে পড়াশোনা করেছি, সেই ভবতারিণী বিদ্যামন্দিরের হেডমাস্টার মশাই দরজা খুলে বের হতে পারছেন না। আগুনে কি পুড়ে মরবেন মাস্টারমশাই? আমি সব দেখছি, শুনছি। অথচ একেবারে নির্বাক আমি। কিছু করছি না। চেষ্টাও করছি না। কেবলমাত্র সমস্ত বিষয়টির ভয়াবহতাকে অনুভব করে যাচ্ছি। বিরাট কোলাহল হচ্ছে! লোকজন দৌড়ে পালাচ্ছে। ভয়ংকর এক অঘটনের ছবি চোখের সামনে! বোধহয় চেঁচিয়ে উঠেছি, আমার ভাগ্নে ধাক্কা দিল-'ওঠো মামা! জল খাবে?'

ঘুম ভেঙেও আতঙ্ক কাটে না। এদিক ওদিক তাকাই। কী হল বুঝতে পারছি না! ধাতস্থ হতে যথেষ্ট সময় লাগল। জলটল খেয়ে বুঝলাম আমি এতক্ষণ স্বপ্ন দেখছিলাম! কিন্তু কী ভয়ংকর স্বপ্ন! ভাগ্নে হেসে বলল, 'ওভারডোজ হয়ে গেছে। ডিম আবার মাংস? উচিত হয়নি! পেটগরম থেকে নানান দুঃস্বপ্ন।'

ভাবলাম, তাই হবে। ডিম-এর সঙ্গে মাংসের পূর্ব কলহের খবরটা জানা ছিল। অথচ রসনার তাড়নায় সেকথা বেমালুম ভুলে গিয়ে এই কাণ্ড!

হজমিগুলি খেয়ে শুয়ে পড়লাম। আশ্চর্য ঘটনা হল, এরপরও ঘুমিয়েও পড়লাম। ঘুম ভাঙল বেলা আটটায়। দশটায় রওনা হব। চায়ের কাপে জাষ্ট চুমুক দিয়েছি, ভাগ্নে খবরের কাগজ নিয়ে ঢুকছিল ঘরে। আমাকে বলল 'মামা, বাড়িতে ফোন করে দাও। আজ তোমার বোধহয় যাওয়া হবে না। এখানে বনধ ডাকা হয়েছে!'

'কোনও মানে হয়? কী হল আবার?' ভাগ্নে-বউ সুলেখা বিস্কুট দিতে দিতে বেজার মুখ। চাকরি করে। বন্ধ হলে মুশকিল।

'আর বোলো না। এখানকারই একজন মাস্টারমশাইকে কয়েকজন দুষ্কৃতি নৃশংসভাবে খুন করেছে।'

'মাস্টারমশাইকে খুন?' আমি চমকে উঠেছি।

'ইস! কি বিশ্রি! ঘরে ঢুকিয়ে দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে।'

আমার মুখে আর কথা সরে না। আমার স্বপ্নের কথাটা যদি এখন বলি, ওরা বিশ্বাস করবে? মনে হয় না। স্বপ্নের যে বীভৎসতা, তা কি বোঝাতে পারব? রতনদা নীরব হলেন। আমরা স্তব্ধ হয়ে রতনদার কথা গিলছিলাম। নীরবতা ভাঙল শুভব্রত, 'একটা ব্যাপার লক্ষ্য করেছ কি সবাই? রতনদার সঙ্গে কিন্তু আগুনের একটা নিবিড় যোগ আছে। মনে ক'র প্রথম স্বপ্নটা! আগুনের বল! তারপর পেট্রলপাম্পের আগুন।'

ঠিক! এটাও কিন্তু যথেষ্ট আশ্চর্য হওয়ার বিষয়।

'ঠিক বলেছ! আগুনের সঙ্গে সত্যিই যেন আমার একটা সম্পর্ক আছে! আমার তখন ষোলো বছর বয়স। থাকি শিলিগুড়িতে। ওখানে বাবার প্রথম চাকরিজীবন কেটেছে। বাবা ওখান থেকে ট্রান্সফার হয়ে চলে গেলেন মেদিনীপুর। আমি রয়ে গেলাম শিলিগুড়িতে। বোডিং-এ থাকি। সামনে ফাইনাল পরীক্ষা। এসময়ে অন্যস্কুলে ভর্তি হওয়া সম্ভব নয়, আমার পড়াশোনাও বিঘ্নিত হবে। সুতরাং আমি রয়ে গেলাম ওখানেই। ঠিক হল, পরীক্ষা হয়ে গেলেই আমি মেদিনীপুরে চলে যাব। পরবর্তী পড়াশোনা ওখানেই করব।

বলতে ভুলে গেছি, ইত্যবসরে আমার দাদার বিয়ে হয়েছে। দাদার সঙ্গে আমার বয়সের পার্থক্য প্রায় নয় বছরের। মাঝে দিদি আছেন অবশ্য। তো, নতুন বউকে সেভাবে চিনিনি, বুঝতেও পারিনি। আত্মীয়-সূত্রে পাত্রী নির্বাচন হয়েছিল। পাত্রীর, গুণপনার বিবরণ শুনে মা পরমাসুন্দরী পাত্রীর খোঁজ করেননি। 'সংসার দেখবে সবাইকে নিয়ে গুছিয়ে থাকবে এমন মেয়েই চাই। পরমাসুন্দরী এনে কী শোকেসে রেখে দেবে?'' সুতরাং বিয়েটা হয়ে গেল।

আমি তো শিলিগুড়িতে আছি। আমার পড়াশোনা চলছে রমরম করে। একদিন স্বপ্ন দেখলাম যে আমাদের বাড়িটা স্টোভের আগুন লেগে জ্বলছে। মনটা খারাপ হয়ে আছে। কিছু ভালো লাগছে না। দূরে থাকলে মনটা আরও বেশি উতলা থাকে। উদ্বিগ্ন থাকে। ভয় হয়। মনে হয় ভীষণ বিপদ আসছে।

পড়াশেনায় মন বসছে না। হেঁটে বাজারের দিকে গেছি। এদিক ওদিক ঘুরে এলে একটু ভালো লাগবে হয়তো। দেখি এক জায়গায় বেশ ভিড়! কৌতূহল হল। ভিড়ের ভেতরে ঢুকে দেখি একটি লোক, পা ছড়িয়ে মাটিতে বসে আছে। যাকে দেখছে ভবিষ্যৎ বাণী করছে। লোকে প্রণাম ঠুকছে! শুনলাম এই লোকটি আজ সকাল থেকেই এখানে বসে আছে। টাকাকড়ি কিছু নেয় না। কিন্তু যা বলে একেবারে সত্যি! হুবহু মিলে যায়।

শুনে আগ্রহ হল। আবার, বলা ভালো, পরীক্ষা করতে ইচ্ছে হল। এগিয়ে সামনে গিয়ে দাঁড়াতে সে তীব্র চোখ দুটো তাকাল, 'এ। তেরা ঘরমে কলঙ্ক লাগে গা! আরে! লাগে গা কেয়া? লাগ গিয়া। ব্যস! যা! ঘর যা!'

অর্থাৎ? তোমার ঘরে কলঙ্ক লেগেছে। বাড়ি যাও! বুঝতেই পারছ আমার মানসিক অবস্থা কোথায় গিয়ে দাড়িয়েছে। মন খারাপ ছিলই, লোকটা আরও সেটা বাড়িয়ে দিল। বোর্ডিং-এ ফিরে এলাম। খাওয়ার ইচ্ছে-টিচ্ছে ছিল না। ভাবলাম, আগামীকাল মেদিনীপুর যাব। কিছু একটা হয়েছে। আমার মন শান্তি পাচ্ছে না!'

'তারপর? ....গিয়েছিলেন বাড়িতে?'

'হ্যাঁ! পরদিনই গেছি। গিয়ে দেখি সাংঘাতিক ঘটনা। বৌদি দাদার বিরুদ্ধে ফোর নাইনটি এইটের কেস ঠুকেছে।'

'ও বাবা! কেন?'

'কেন বলতে, আমার দাদার শ্বশুরবাড়ির তরফে বিবাহ পরবর্তী কিছু দাবি উঠেছিল। যেমন, বউদির দুটি বোন আছে, তাদের বিয়ের জন্য পঞ্চাশ, পঞ্চাশ মোট এক লক্ষ টাকা দাদাকে দিতে হবে। দ্বিতীয়ত দাদাকে শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে থাকতে হবে। কারণ তার শ্বশুরমশাই-এর কোনও পুত্র সন্তান নেই। তাঁর সংসারের দায়িত্ব নাকি বড়জামাইকে নিতে হবে। এসব দাবি তাঁরা বিয়ের আগে জানালে বিয়েটা নিশ্চিত হত না। সেই ঝুঁকি তাঁরা নেননি। ভেবেছিলেন বিয়ের পরে সব হাতে চলে আসবে। কিন্তু তাঁরা একটা জিনিস বুঝতে ভুলে গিয়েছিলেন। সেটা হল দাদা। দাদাকে মানিয়ে নেওয়াটা সহজ হল না। তখন....।'

'আপনার দাদা....তারপর কী হল?' সুপর্ণা গলা বাড়াল।

—'সব মিটে গেছে ভালোভাবেই। কেস ভণ্ডুল করে দিল বউদি নিজেই। জীবনটা যে সিনেমা নয়, সেটা বুঝতে সময় লেগেছিল তার। নিজের ভুল বুঝে ক্ষমা প্রার্থনা করেছিল বউদি আদালতেই। জজ-এর সামনেই। সুতরাং কেস টিকল না। কিন্তু সেতো অন্য প্রসঙ্গ! শুরুটা ভাবো! আমার স্বপ্নের ভেতরে আগুনের অস্তিত্বটা নিয়ে ভাবো'!

—'ভাবছি! কিন্তু আপনার উচিত ছিল সেই লোকটিকে খুঁজে বের করা। যে কিনা ভবিষ্যৎ বাণী করেছিল।' শুভব্রত এ্যয়সা চেঁচায় যেন ঝাকুনি খেতে খেতে যাচ্ছি।

রতনদা পিছন ফিরে শুভব্রতর দিকে তাকালেন— খুঁজেছিলেন। তন্নতন্ন করে খুঁজছি। পাইনি। কোথাও পাইনি।

স্বপ্ন সম্পর্কে আমাদের সবার তোরও জীবনে কিছু বলার থাকেই। স্বপ্ন কখনও সুন্দর ভবিষ্যতকে নিয়ে আসে, আবার কখনও বিপদ সম্পর্কে সচেতন করে। এতক্ষণ নানাভাবে চেঁচাতে থাকা শুভব্রত ওর অভিজ্ঞতা বলেছিল বাসের পেছনের সিটে বসে থেকেই। 'অভিজ্ঞতাটা ভালো নয় বুঝেছেন? মোটেই সুখশ্রাব্য নয়। তবুও বলছি। আসলে, রতনদার ঘটনাগুলো শুনে আমি না বলে পারছি না। শুনবেন?'

আমরা সমস্বরে আগ্রহ জানাতে শুভব্রত শুরু করল। 'দিনটা ছিল বৃষ্টির দিন। প্রবল বৃষ্টিতে রাস্তাঘাট জলে ডুবে আছে। নীরন্ধ্র অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থেকে ঠকঠক করে কাঁপছি। কলকাতা থেকে রওনা দিয়েছিলাম গতকাল। স্টেশনে পৌঁছে দেখি তুমুল বৃষ্টি। ওয়েটিং রুমে গিয়ে বসলাম। রুম বলছি ঠিকই, কিন্তু সে যেন আস্তাবল। কোনও রকমে বৃষ্টি থামা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। নতুন জায়গা। কিছুই চিনি না। বৃষ্টির জন্য রিকশ বা অটো বা ট্যাক্সি কিছুই চোখে পড়ে না। ঘণ্টাদেড়েক বাদে বৃষ্টিটা ধরল। 'জয় মা' বলে নেমে পড়লাম পথে। একে ওকে জিজ্ঞাসা করে করে যাচ্ছি। একটা সস্তার হোটেল হলে ভালো। খোঁজখবর নিয়ে ছিলাম পিনাকীর কাছ থেকে। ও আমারই মতো। মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টিটিভ। ও বলেছিল স্টেশনে নেমে যাকে বলবি, সে-ই দেখিয়ে দেবে। ঝর্ণা হোটেল। সস্তা অথচ হালকা ভালো খাবার। পেট গরম টরম হওয়ার ঝামেলা নেই।

পিনাকী যেমনটা বলেছিল, তা কিন্তু মিলল না। ঝর্ণা হোটেল কেউ চিনতে পারে না! ব্যাপারটা কী বুঝতে পারছি না। শেষ পর্যন্ত একজন পান দোকানি রাস্তাটা দেখিয়ে দিল। তাড়াতাড়ি পৌঁছতে হবে। বুঝতেই পারছেন, আকাশে ঘন মেঘ ঝুলে আছে। যে কোনও সময়ে ফের তুমুল বৃষ্টি শুরু হবে। আর, তা হলেই আমার অবস্থা শোচনীয় হয়ে উঠবে। আমার সঙ্গে রেনকোট, ছাতা কিস্যু নেই। নভেম্বর মাস। তখন ওসব নিয়ে বেরোব এমন ধারণাও মাথায় নেই।

দোকানির দেখানো রাস্তায় হেঁটে চলেছি। কীরকম নির্জন রাস্তা। রাস্তা-টাস্তা সব জলে ডুবে আছে। শীতল হাওয়া বইছে। বৃষ্টির ফোঁটা গায়ে পড়ল মনে হচ্ছে। এমন সময়ে মনে হল দূরে যেন আলো। লোকজন দেখা যাচ্ছে। আমি দ্রুত এগোচ্ছি। কিন্তু কিছুতেই যেন পৌঁছতে পারছি না। মাঝখানে চওড়া রাস্তায় কিছু গাড়ি নিশ্চল দাঁড়িয়ে। আমি ওয়েট করলাম। মনে হল গাড়িগুলো এখনই স্টার্ট নেবে। বেকায়দা জায়গায় আছি। যে-কোনও সময়ে গাড়ির সামনে পড়ে যাব। তো একটু তাকিয়ে দেখে মনে হল, গাড়িগুলোর কোনোটাই এখনই স্টার্ট দেবে না। তাড়াতাড়ি রাস্তা পেরিয়ে ওপারে যাচ্ছি মনে হল ওটাই হোটেল। লোকজন ইতস্তত দাঁড়িয়ে আছে। আলোটালো দেখা যাচ্ছে।

'বাপরে। ওভাবে একটা অজানা রাস্তায় ফট করে নেমে পড়াটা আপনার ঠিক হয়নি।' বাগচি বউদি টেনশনে আছেন। শুভব্রত ঝর্ণা হোটেলে না পৌঁছনো পর্যন্ত আমরা কেউ স্বস্তি পাচ্ছি না।

'হ্যাঁ। ঠিকই বলেছেন, আমারও ভীষণ অসহায় লাগছিল। যদিও আমার যা চাকরি, তাতে এরকম অবস্থায় আগে কখনও পড়িনি তা নয়, তবে অস্বস্তি হয়। একটু সন্দেহটন্দেহও হয়। কোথায় যাচ্ছি রে বাবা, ছিনতাই টিনতাই না হয় এসমস্ত ভাবনা আসে না তা নয়।'

'তাহলে, পৌঁছে গেলেন তো হোটেলে?' অমলদা ফের মুখ খুলেছেন, 'কিন্তু আমি তো বুঝতেই পারছি না। এরমধ্যে স্বপ্ন দেখবে কখন? এখনও তো হোটেল পেলে না। হোটেল পাবে বিছানা পাবে তারপর তো স্বপ্নটা।'

সুপর্ণা ঠিক পয়েন্ট-এ এসেছে। আমরা সবাই হেসে উঠলাম। দেখাদেখি শুভব্রত হাসল, 'হবে হবে। নাচা হবে, গানা হবে। সব হবে। 'তারপর এগোলাম একটা ট্রাক দেখতে পাচ্ছি। ট্রাকে ডালাগুলো সব খোলা। ঝুলে আছে গাড়ির চারপাশ দিয়ে। ট্রাকের ওপরে একটি মৃতদেহ। সাজানোর পর্ব চলছে হইচই!

বুঝতেই পারছ আমার মনটা বিষণ্ণ হয়ে গেল। কেউ একজন মারা গেছে, তারই সৎকার-এর উদ্যোগ চলছে। আমি পাশ কাটিয়ে যেতে যেতে একবার তাকালাম। এই বাড়িরই লোক নিশ্চই। কিছু মহিলাও দাঁড়িয়ে। কিন্তু অবাক কাণ্ড হল, কেউ এই মৃত্যুতে প্রবল শোকাহত নয়। মানে আমার তাই মনে হল। কেউ কাঁদছে না। সব যেন মূক। বধির। স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমি একবার আকাশের দিকে তাকালাম। শব যাত্রীদের ভেতর থেকে কে যেন বলল, 'তাড়াতাড়ি কর। বৃষ্টি এসে যাবে।'

আমিও পা চালালাম। এখনও আমার লক্ষ্যস্থল খুঁজে পাইনি। বৃষ্টির ফোঁটা মাঝে মাঝে গায়ে পড়ছে। ভাবলাম, এতগুলো লোক দাঁড়িয়ে। কেউ না কেউ নিশ্চয় ঝর্ণা হোটেল চিনবে। কাছাকাছি যাকে পেলাম তাকেই জিজ্ঞাসা করলাম, 'দাদা, ঝর্ণা হোটেলটা কোনদিকে।'

লোকটি অবাক হয়ে তাকাল। তারপর, তর্জনী তুলে আমার সামনের বাড়িটা, যার সামনে ট্রাক এবং শব যাত্রীরা দাঁড়িয়ে, তার দিকে দেখাল!

'এটাই?' কী আশ্চর্য। কিন্তু, এখানে মারা গেলেন কে?' প্রশ্নটা করতেই সবাই একসাথে কেঁপে উঠল। ভয়ে আমি তখন ঠকঠক করে কাঁপছি। চারদিকে নিঃসীম অন্ধকার। তারই মাঝখানে আমি দাঁড়িয়ে। সামনে একটি শব। আর কিছু বোবা ধরনের মানুষ। মনে হল আমার দৌড়ে পালিয়ে যাওয়া উচিত। আর ঠিক তখন কে একজন ধাক্কা দিল, 'বাবু বারিশ বন্ধ হুয়া, যায়েঙ্গে কাঁহা?'

ওয়েটিং রুমে বসে থেকে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ঘুম ভাঙতে দেখি কুলি আমাকে ঠেলছে। তাড়াতাড়ি করে উঠে দাঁড়িয়েছি। কুলিকে জিজ্ঞাসা করব বলে মুখ খুলেছি। ওর চেনাশোনা হোটেল আছে কি কাছাকাছি? কুলি ঘাড় নাড়লো 'নজদিগ মে হ্যায়' নাম কী? হোটেলের?'

খুশবু। কুলি নাম জানায় হোটেলের। চলো। ব্যাগ তুলে রেডি আমি। আপাতত ঝর্ণা হোটেলে উঠছি না। সে সাহস এই রাতে আর নেই। দেখা যাক আগামীকাল টাল সাহস যদি ফিরে পাই তখন দেখা যাবে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%