সাগরিকা রায়

একটা শর্টফিল্ম বানাতে গিয়ে নাস্তানাবুদ হয়ে যাওয়া খুব সাধারণ কথা। পাঁচ মিনিটের একটা ফিল্মের জন্য একবছর তিনমাস চার দিন! অথচ অভিনেতা মাত্র দুজন। এক, অলয় সান্যাল নামের এক কবি, দুই, এই শহর। কাউকেই কষ্ট হয়নি খুঁজে পেতে। দুজনকে যখন ডাকা হয়েছে, সময় দিয়েছে অফুরন্ত। কিন্তু হাতে টাকা না থাকলে যা হয় আর কি!
অলয়কে টাকা দিতে হয়নি। পরিচালকের পকেট বুঝে ও চুপচাপ ছিল। আর শহর কোনো ভাবেই ডিস্টার্ব করেনি ওকে। করেছে একজন। সে কথা ভাবলে মাঝে মাঝে মনে হয় গলা দাবিয়ে দিয়ে আসে লোকটার! একটা ফেরেব্বাজ লোক! দিনরাত বোতলে ঢুকে থাকে। নেশা কাটলে রাজা উজির মারে! কথায় কথায় অপমান করে।
একটা চোখ ছোট এমনিতেই। অন্য চোখটাও সরু করে হিন্দি সিনেমার মধ্য যুগের ভিলেনের মতো করে তাকায়। মুখে খিল্লি—বুঝলে চাঁদ। এভাবে হয় না। কথায় আছে, ফেল কড়ি, মাখো তেল। তুমি তেল চাও, কিন্তু আমি যে বাপু কড়ি চাই? তার বেলা? একজন পাবে, অন্যজন আঙুল চাটবে, এটা হয় না। জাস্ট হয় না। বুঝলে? এসব বুঝতে হবে! বুঝতে হবে!
বুঝেছে উত্তীয় ভদ্র। খুব ভালো করে বুঝেছে। লোকটা ক্যামেরাটা আর দেবে না ওকে। একহাতে ক্যামেরা, তো অন্য হাতে টাকা। অথচ উত্তীয়র হাত শূন্য বলা যায়। মাত্র পাঁচমিনিটের একটা ফিল্মের জন্য এত ঝামেলা করতে হবে?
গলা শুকিয়ে গিয়েছিল। ক্যামেরা চাইতে গিয়ে প্রায় গলা ধাক্কা খেয়েছে বাজে লোকটার থেকে। সেই সকালে বেরিয়ে এসেছিল বাড়ি থেকে। আজ শহরের কয়েকটি জায়গায় শ্যুট করার কথা ভেবেছিল। কিন্তু লোকটা যদি ক্যামেরা না দেয়, তাহলে সমস্ত পরিকল্পনা ভেস্তে যায় কিনা?
মনটা চা-চা করছিল। কিন্তু পকেট হাতড়ে দুশো টাকার নোটটাকে কচকচ করতে দেখল। এর মধ্যে ফোনটা বাজতে শুরু করল। বাজুক। ওটার আয়ুও বেশিদিন নেই। যে-কোনো একদিন কোমায় চলে যাবে।
নাহ! ফোনটা বাজছে ফের। কার ফোন? অলয়! কী ব্যাপার?
—তুমি কি টেলি ফিল্ম করবে? দারুণ একটা গল্প পেয়েছি!
ধুস! মোটে খাদ্য নেই, তায় পোলাও খাবে না বিরিয়ানি! অলয় তো উত্তীয়র অবস্থা জানে। জেনেশুনে কেনই-বা এমন আজব প্রস্তাব নিয়ে আসে!
ওকে ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিয়ে উত্তীয় ট্রাঙ্গুলার পার্ক থেকে মনোহরপুকুর রোড দিয়ে যাচ্ছিল। যেতে যেতে বৃষ্টি নামল। বৃষ্টির ফোঁটায় শরীরের দাহ কমল কিনা বলা যায় না। মনের দাহ বাড়ল।
পাশ দিয়ে সাঁই সাঁই করে কত গাড়ি ছুটে চলেছে। স্যান্ট্রো, মাঁতিজ, ইনোভা, বাকিগুলোর নামই জানে না ও। এত টাকা লোকে পায় কোথায়? কে দেয়?
একটা ক্যামেরা নেই ওর। একটা পাঁচ মিনিটের ফিল্ম বানাতে প্রাণ চলে যাওয়ার উপক্রম। অথচ ওই বুড়োর ক্যামেরার ভাড়া দিতে পারছে না বলে বুড়ো ক্যামেরাটা আটকে দিল! এটা ঠিক, অনেকগুলো টাকা পাবে বুড়ো। কিন্তু সে কি জানে না যে উত্তীয় একটা ভালো কাজ করতে চায়!
—আরে উত্তীয় না?
চমকে উঠেছে উত্তীয়। কে ডাকল ওকে? ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়েই চিনে ফেলল নিধুবাবুকে। নিধুবাবু রিসেন্টলি একটা পাঁচ মিনিটের শর্টফিল্ম বানিয়ে রসিকজনের নজর কেড়েছেন। কিছুদিন ধরেই ভদ্রলোক শর্টফিল্ম নিয়ে পড়েছেন। উত্তীয় খুশি হল লোকটাকে দেখে। এই লোকটার কাছে একটা দামি ক্যামেরা আছে। এটাই লোকটার সঙ্গে কথা বলার একমাত্র কারণ হতে পারে।
—কী খবর উত্তীয়? আপনার ফিল্ম বানানোর কী হল? দেখালেন না তো।
বিরক্তির বিষ চোখ-মুখ থেকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলল উত্তীয়। লোকটাকে দরকার হতে পারে। ওকে বুঝতে দেওয়া যাবে না যে উত্তীয়র এখন লাস্ট ডিগ্রি কোমা স্টেজ চলছে। নিজের ব্যর্থতা বা অকর্মণ্যতা বাইরে বোঝাতে নেই। তাতে লাভ কিছু হয় না। অযথা সহানুভূতির পাত্র হওয়া ছাড়া!
নিধুবাবুর সঙ্গে জমিয়ে গল্প শুরু করার ইচ্ছে ছিল তা ঠিক নয়।—আসলে উত্তীয় চেয়েছিল লোকটাকে পটাতে। সুতরাং নিধুবাবুর জন্য কচকচে দুশো টাকা ভাঙাতে হল। দু ভাঁড় চা নিয়ে বসল উত্তীয় নিধুবাবুকে নিয়ে। আর কথা বলতে দিল। যার যে বিষয়ে আগ্রহ, তাকে সে বিষয়ে বলতে দিলে সে খুশি হয়।
নিধুবাবু সেই সুযোগ পেয়ে চনমনে হয়ে উঠলেন। উত্তীয় প্রাণভরে শুনল নিধুর বাণী। কত রকম, কত ধরনের ক্যারেকটারের ক্যামেরা আছে, সে বিষয়ে নিধুবাবু জীবন্ত অভিধান। গল্পে গল্পে উত্তীয় দেখতে চেয়েছে নিধুর ক্যামেরা। শর্টফিল্মের জন্য উপযুক্ত ক্যামেরা আছে এই লোকটির! একবার কি সেটা দেখতে পাবে না উত্তীয়? একবার টাচ করতে?
নিধুবাবু হেসে ফেললেন-আরে! এটা আবার কথা হল? চলুন, শুভস্য শীঘ্রম। আজই চলুন। আমার বাড়ি কালীঘাটে। মেট্রোতে গেলে মিনিট পাঁচেক মতো লাগবে। উঠুন। ক্যামেরা আমার প্রাণ, সে সম্পর্কে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলতে পারি যদি শুনতে চান! হা হা হা!
উত্তীয় সমর্থনসূচক মাথা নাড়ল।
এতে উৎসাহিত হয়ে পড়লেন নিধু,—আরে, আজকালকার ছেলেপিলেরা জানে কী? সেদিন একজন এসেছে ক্যামেরার কাজ শিখবে। বললুম,—ক্যামেরা জিনিসটা কী বাপু?
সে আমতা আমতা করে মুখস্ত বলে দিল,—ক্যামেরা হল আলোকচিত্র গ্রহণের ও ধারণের যন্ত্র। ক্যামেরা নামটি এসেছে ল্যাটিন শব্দ কামেরা ওবস্কিউরা থেকে।
আমি হাততালি দিলাম, বাহ, বাহ! তুমি অনেক জেনে বসে আছ। আর কী চাই? হা হা হা!
এবারে উত্তীয়ও হেসে ফেলল। দুজনে হাঁটতে হাঁটতে চলে এসেছে নিধুবাবুর বাড়ির কাছাকাছি। উনি একাই থাকেন। পাঁচবছর আগে স্ত্রী বিয়োগ ঘটেছে। নিঃসন্তান। সারাজীবন ক্যামেরাকেই সন্তান ভেবে এসেছেন। এখনও ওই নিয়েই আছেন।
দোতলা বাড়ির একতলা ভাড়া দিয়েছেন। ওপরতলায় নিজে থাকেন। সিঁড়ি দিয়ে উঠে ঘরের তালা খুলে উত্তীয়কে নিয়ে ঢুকলেন। একটা রুমই ইউজ করেন বলে মনে হচ্ছে। টেবিল বিছানা সর্বত্র কাগজ, কম্পিউটার থেকে প্রিন্ট আউট করা নানান কিসিমের ছবি...! উত্তীয় অধীর হয়ে দেখছিল নিধুবাবুকে। কখন আসবে ক্যামেরাটা!
ঘরের কোণের একটা স্টিলের আলমারি খুলে নিধুবাবু বড় কালো ব্যাগ বের করে নিয়ে এলেন। ক্যামেরা বের করে চিচিং ফাঁক হাসি হাসলেন নিধুবাবু।—দেখুন। টাচ করুন।
উত্তীয় সাগ্রহে ক্যামেরার দিকে তাকিয়েছিল। এই ক্যামেরা দিয়ে নিধু টেলিফিল্ম বানায়! অনেক দাম নিশ্চয়!
—তা দাম তো আছেই! ছ'লাখ টাকা! রিটায়ার করলাম গত চোদ্দই মে। তারপরেই কিনে নিলাম। কে খাবে পি এফ-এর টাকা বলুন? আমার খেতে ক'টা টাকা লাগে? শখটা মিটিয়ে নেব না? শেষ বয়সের জন্য কিছু টাকা রাখতে হল। চিকিৎসার জন্য। তা বাদে আর কী চাই? বলুন?
—নিশ্চয়। কী যে বলেন! শখ মিটিয়ে নেওয়াই উচিত। উত্তীয় সমর্থন করে নিধুবাবুকে। নিধুর দিকে তাকিয়ে ছলাখ টাকা দেখতে কেমন হয়,ভাবছিল উত্তীয়।
ওকে বসিয়ে রেখে নিজের শখ সৌখিনতা নিয়ে কথা বলছেন নিধু,উত্তীয় নিধুর মুখের দিকে তাকিয়েছিল, কিন্তু মন অন্য কথা ভাবছিল। ক্যামেরা...ক্যামেরা...মেরা...মেরা...! ওই ক্যামেরাটা যদি পাওয়া যেত! যদি নিধু এখন ঝট করে মরে যায়, উত্তীয় ক্যামেরাটা নিয়ে হাপিস হয়ে যাবে। বেরিয়েই সোজা মেট্রোতে উঠে দমদম। কেউ দেখেনি উত্তীয়কে এখানে আসতে! নিধু মরে যাচ্ছে না কেন!
—তাহলে? শখ মিটল তো? হা হা হা! নিধুর হাসির শব্দ দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে খেয়ে উত্তীয়র দিকে ছুটে আসছিল উলটো ধাক্কা দিতে।
উত্তীয় স্থির চোখ মেলে নিধুর হাসি দেখছিল। শখ মিটল! কেমন হেসে হেসে মারাত্মক কথা বলল নিধু! শখ কি এত সহজেই মিটে যায়?
—আপনি থাকেন কোথায়?
—কাছেই। হাজরা। উত্তীয় অন্যমনস্ক।
রাস্তায় বেরিয়ে কিছুক্ষণ লক্ষ্যহীন ভাবে ঘুরে বেড়াল উত্তীয়। লোকাল বাস টার্মিনাসে বসে বসে ভুতুম হয়ে তাকিয়ে রইল ছুটে যাওয়া বাস-এর দিকে। একটা সময় উঠে একফালি বাসার উদ্দেশ্যে রওনা হল যখন, তখন মাথায় কিলবিল করছে নানান বিষধর সাপ। বিষের জোগান দিচ্ছিল ওরা। ছোট থেকেই রহস্য, রোমাঞ্চ, হরর গল্পের ফ্যান উত্তীয় নিধুর সর্বনাশের জন্য তৈরি হচ্ছিল মনে মনে। কিন্তু কী করে! কী ভাবে? মন চলছে সর্পিল গতিতে। উত্তীয় চলছিল ঠিক তার পেছন পেছন।
রিয়ার ফোন ধরল না। বেজে বেজে ফোন কেটে গেল একটা সময়। আজ পেরেম-ফেরেম নয়। আজ দোজখের বুড়ো চেপে বসেছে সিন্ধবাদের পিঠে। সেই পিশাচ বুড়ো ওকে নির্দেশ দিচ্ছে কী কী করতে হবে! এক-একটা নির্দেশ মনোমতো হলেই অদৃশ্য ক্যামেরার শাটারে আঙুল পড়ছে। ছবি ক্যাপচার হচ্ছে মেমরি কার্ডে। হালকা শব্দ হচ্ছে-ক্লিক!
সারারাত ধরে আজগুবি ভাবনায় স্নান করতে করতে একটা সময় বিরক্ত হয়ে ঘুমোনোর চেষ্টা করল উত্তীয়। ঘুম আসছে না। উঠে খানিকক্ষণ বিছানায় বসে রইল। ল্যাপটপ অন করে ইউটিউবে একটার একটা ভয়ানক সব থ্রিলার দেখল। থ্রিলার, হরর সিনেমা ও বরাবরই ভালোবাসে। আজ একটু বেশি বেশি ভালোবাসতে ইচ্ছে করছিল। প্রত্যেকটি দৃশ্য, প্রতিটি ফ্রেম গোগ্রাসে গিলছিল। উত্তেজনাটাকে আচারের মতো চেটে চেটে খাচ্ছিল।
পরপর কয়েকদিন নিধুর সঙ্গে দেখা হল উত্তীয়র। বরাবরই মর্নিং ওয়াক করেন নিধুবাবু। উত্তীয় কিছুদিন হল ডাক্তারের পরামর্শে শুরু করেছে মর্নিং ওয়াক। একদিন দেখা হয়ে গেল নিধুবাবুর সঙ্গে। দেখা হতে মহাখুশি নিধুবাবু—আপনি? এ লাইনে নতুন নাকি?
—আর বলবেন না। বলে দুঃখিত মুখে ডাক্তারের পরামর্শের কথা জানাল উত্তীয় নিধুবাবুকে। নিধুবাবু একটু শাসন করলেন,—শুনুন, আপনি আমার চাইতে অনেক অনেক জুনিয়র। এখনই শরীরটাকে নষ্ট করবেন কেন? ঠিক কাজ করেছেন। সকালের বিশুদ্ধ অক্সিজেন নিয়ে নিন শরীরে।
নিধুর দিকে তাকিয়ে ঘাড় কাত করে পরামর্শ নিল উত্তীয়। মনে মনে ভেঙচি কাটল। বুড়ো! বয়ে গেছে আমার মর্নিং ওয়াকের! তোমার জন্যই এই ভেক ধরতে হয়েছে। নিচ্ছি অক্সিজেন।
সেই নেওয়া শুরু হল। অক্সিজেন কতটা কাজ করেছে জানে না উত্তীয়। তবে দুজনের রোজ রোজ দেখা হওয়াটা যথেষ্ট কাজের হল বলেই মনে করে ও। আন্তরিকতা বাড়ল বলা বাহুল্য। এমন করেই দিন যাবে বলে তো মর্নিং ওয়াক শুরু করেনি ও।
সারারাত গোয়েন্দা, ক্রাইম-থ্রিলার পড়তে পড়তে নিজেকে তৈরি করতে থাকে উত্তীয়। কখনও উদ্ভ্রান্তের মতো পায়চারি করে ঘরের ছোট্ট পরিসরে। ভোর হতে হতেই বেরিয়ে যায়। হেঁটে হেঁটে চলে যায় নিধুর বাড়ির কাছাকাছি। নিধুর ঘরের আলো জ্বলতে দেখে। মানে নিধু ঘর থেকে বের হয়নি এখনও। সেখান থেকে প্রায় ছুটে চলে যায় নিধুর বাড়ির কাছাকাছি কালীঘাট পার্কে। সেখানে দাঁড়িয়ে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে নিধুবাবুর জন্য। নিধুবাবুকে দূর থেকে দেখেই জগিং শুরু করে উত্তীয়। নিধুবাবু ওকে দেখে নিজেই এগিয়ে আসেন।
এভাবে দুজনের মধ্যে একটা অসমবয়সের সখ্য গড়ে উঠল খুব দ্রুত। একটা নতুন টেলিফিল্মের জন্য তৈরি হচ্ছে উত্তীয়। গল্পটা নিজের। ভাবনাটাকে রূপ দিতে সারাদিন গল্প নিয়ে ভাবে। উত্তীয় এক রাতে নতুন গল্প লিখতে শুরু করল। নতুন থ্রিলার। টান টান। নির্মেদ গল্প।
একটা টেলিফিল্ম তৈরি করবে ও। কথায় কথায় নিধুকে বলে ফেলেছে ওর গল্প লেখার কথা। নিধু চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে উৎসাহ দিয়ে গেলেন—করুন। গল্প শেষ হলে আগে আমি পড়ব। ওটা আমার জন্য রাখতে হবে। অন্য কেউ যেন না পায়। নাকি আপনি নিজের জন্য করছেন?
উত্তীয় অল্প অল্প হাসে—আপনি হলেন আমার আইকন। আপনি যদি আমার গল্প নিয়ে ফিল্ম করেন, তার চেয়ে খুশির খবর আর কী হতে পারে? তবে
আগে গল্প শেষ করি।
সেদিন ফুরফুরে মনে বাড়ি ফিরল উত্তীয়। গল্পটা সাজাতে হচ্ছে নিপুণ ভাবে। যদিও এগিয়ে গেছে অনেকটা। এখন গল্প ক্লাইমেক্সের দিকে চলে এসেছে। রাত জেগে কি বোর্ডে আঙুল চলে ওর। গল্পের স্ক্রিপ প্রায় রেডি। আস্তে আস্তে লোকেশন, অ্যাক্টর চাই। টেলিফিল্ম কি আর এমনি এমনি হয় নিধু?
নিয়ম করে হোমওয়ার্ক করছে যে উত্তীয়! কত পড়াশোনা! কত সিনেমা দেখতে হচ্ছে! এক একটা ক্রাইমের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ কন্ঠস্থ করছে। আত্মস্থ করছে। গল্পের কোথাও কোনো ফাঁক রাখবে না উত্তীয়। নিধুর মতো অভিজ্ঞ লোক পর্যন্ত বোমকে যাবে পুরো গল্প পড়ে। হা হা হা! মেরে রাসকে কোমর, তেরি পহেলে নজর, যব নজরসে মিলাইয়ে তো মজা আ গয়া। উত্তীয় অন্ধকার ঘরের ভেতরে ঘুরে ফিরে নাচে। পাশে পাশে নাচে একতাল অন্ধকার!
নিধুবাবু ক্যামেরা বের করে ভালো করে দেখেন। এটা ডেইলি রুটিন নিধুর। প্রত্যেকদিন ক্যামেরা বের করে একটু হাওয়া বাতাস লাগিয়ে ফের মুছে টুছে স্বস্থানে স্থাপন করা। উত্তীয় মুখোমুখি চেয়ারে বসে বসে উদাসীন চোখে ক্যামেরাটা দেখছিল। এক-একবার মনে হচ্ছে ক্যামেরাটা স্থির দৃষ্টি মেলে উত্তীয়কে দেখছে! উত্তীয় নিধুকে লুকিয়ে চোখ টিপল। দুটো দিন ওয়েট গুরু। তারপর দেখ...! দারুণ সব ছবি তুলতে হবে। রেডি থেকো দাদা।
—তারপর? কী একটা ইমপর্টান্ট কথা আছে বলেছিলেন? কী কথা?
—বলছি। আগে ক্যামেরাটাকে স্বস্থানে ঢুকিয়ে রাখুন। কথা অনেক আছে। বসে শুনতে হবে।
—বেশ। নিধুবাবু ক্যামেরা আলমারিতে ঢুকিয়ে তালা লাগিয়ে এসে বসলেন,—হ্যাঁ,বলুন। কী এমন গুরুত্বপূর্ণ কথা?
—বলছি, একজন প্রডিউসার পাওয়া গেছে। উনি একটি টেলিফিল্ম বানাতে চান। কিন্তু প্রবলেম হয়ে গেছে অন্য জায়গায়।
—অন্য জায়গায়? নিধু সাগ্রহে গলা বাড়িয়ে দিলেন।
—মানে, ভদ্রলোকের খুব শখ বা ইচ্ছে বলতে পারেন। উনি চান আপনাকে দিয়ে শর্টফিল্ম বানাবেন। গল্প থেকে সব কিছুর ভার আপনার ওপর। উনি কেবল টাকা দেবেন।
—আচ্ছা? কে উনি? চিনি?
—না। আপনি চেনেন না। আর সেই কারণেই উনি আমাকে ধরেছেন। কবে কথায় কথায় বলেছিলাম আপনার সঙ্গে আমার পরিচয় আছে। সেকথা মনে রেখে আমাকে ফোন করেছিলেন। শর্টফিল্ম করবেন। এবং সেটা আপনাকে দিয়েই। বুঝুন! আর এর জন্য কোনো অধিকার ফলাতে আসবেন না। আপনার সঙ্গে কথা বলতে চান। এখন আপনার দিক থেকে গ্রিন সিগন্যাল পেলেই আমি কথা বলব।
নিধুবাবু একটু দোলাচলে পড়ে গেছেন বলে মনে হল উত্তীয়র। উনি কি বিশ্বাস করছেন না?
—আমি ভদ্রলোকের সঙ্গে একবার কথা বলতে চাই উত্তীয়। বুঝলেন তো? মানে মুখোমুখি কথা বলাই ভালো। উনি ঠিক কী ধরনের ফিল্ম করতে চান, সেটা আমার জানা দরকার। শর্ট বলতে কতটা সময় নিতে পারি, সেটা না জেনে গল্প বাছব কী করে? এইসব টুকিটাকি ব্যাপার আর কি!
উত্তীয় হাসিমুখে মেনে নিল নিধুবাবুর প্রস্তাব। বেশ! কথা বলে নেওয়াই ভালো। তাছাড়া উনি টাকা দেবেন যখন, ওঁর ইচ্ছের সম্মান দেওয়া উচিত। এবং বিজনেসের ব্যাপারে কি আর ফোনে ফোনে কথা বলা উচিত?
উত্তীয় উঠল,—তাহলে সে কথাই রইল? আমি কথা বলে আপনাকে বলছি।
উত্তীয় চলে যাওয়ার মুহূর্তে দরজা পর্যন্ত গিয়ে একবার পেছন ফিরে তাকাল। নিধুবাবু হাসি হাসি মুখে ক্যামেরার আলমারির দিকে তাকিয়ে আছেন! উত্তীয় বেরিয়ে গেল নিধুর বাড়ি থেকে।
রাতে বৃষ্টি নামল গা ছেড়ে। থামার লক্ষণ নেই। উত্তীয় ঘরের একটিমাত্র জানালা খুলে দিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে জলের ঝাপটায় ভিজে গেল। অনেক কাজ সামনে! আস্তে সুস্থে,ধীরে,মাথা ঠান্ডা করে বাকি গল্পটা লিখে ফেলতে হবে। সাসপেন্স শেষপর্যন্ত বজায় রাখতে হবে। গল্পটা নিধুবাবুর পছন্দ হলেই আর কোনো কথা নয়।
পরেরদিন সবে সকালটা পেরিয়েছ, ক্যাফেটেরিয়ায় বসে অপেক্ষা করে উত্তীয়। হুড়োহুড়ি চলবে না। একটু সময় নিয়ে আস্তে সুস্থে কাজ করতে হবে! আজ একটু খরচ করে কফি খাবে। ল্যাটে ফ্রাপুচিনো! আহা, কতদিনের ইচ্ছে! মাথা ঠান্ডা করে ভাবতে হবে! আজ ইচ্ছে করেই নিধুর সঙ্গে দেখা করা যাবে না। ওকে একটু চিন্তায় রাখা উচিত। খুব সহজে সব পেয়ে গেলে নিধু সন্দেহ করার সুযোগ পাবে।
পরের দিন ভোরেই দেখা হল। নিধু আজ বেশ খোশমেজাজে আছেন। উত্তীয়কে দেখে হইহই করে উঠলেন, আরে! আমার আগে চলে এসেছেন? ঘুম খুব ভালো হয়েছে দেখছি।
—তা হয়েছে বইকি। খবর আছে। ভালো খবর! উত্তীয় ল্যাজে খেলায়। ধীরে সুস্থে কথা বলে। মাঝে দুপাক জগিং করে নিল। নিধু অস্থির হচ্ছে? হচ্ছে! উত্তীয়র পাশে পাশে জগিং করছে, মুখ উত্তীয়র দিকে।
একসময় বসে ব্যাগ থেকে টাওয়েল বের করে ঘাড়, মুখ মুছে নিয়ে কথা শুরু করল উত্তীয়,—কথা আছে অনেকটা। গতকালই প্রডিউসারের সঙ্গে কথা হল রাতের দিকে। উনি ব্যস্ত মানুষ। বিজনেসম্যান। এখন শখ আছে একটি শর্টফিল্ম বানাবেন, সেটাও ফরচুনেটলি নিধুবাবুর ন্যাচারাল ম্যান নামক ফিল্মটা দেখেই ঠিক করেছেন। লাকিলি উত্তীয়র সঙ্গে আলাপ এবং নিধু উত্তীয়র কাছের মানুষ জেনে ধরে বসেছেন। নিধুকে রাজি করাতে হবে। গতকাল উত্তীয় কথা দিয়েছে নিধুর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেবে। তো ঠিক হয়েছে আজ রাত সাড়ে সাতটা নাগাদ সাতবেড়িয়ায় আসবেন সেই ভদ্রলোক। নিধুকে বনগাঁয় যেতে হবে।
—বনগাঁ? বনগাঁয় কেন? উনি থাকেন কোথায়?
—এই দেখুন, সে কথা বলিনি? থাকেন বাংলাদেশে। এক্সপোর্ট-ইমপোর্টের বিজনেস। মাঝে মাঝে ইন্ডিয়ায় আসেন। আজ তেমনি বিজনেসের কাজে আসছেন। সাতবেড়িয়ায় থাকবেন এক হোটেলে। এই সুযোগে আপনার সঙ্গে দেখা যেমন করবেন, তেমনি অ্যাডভান্স করে যাবেন। হ্যাঁ, যদি প্রোজেক্টের কথা এগোয়। আপনি বনগাঁ স্টেশনে যাবেন।
—কিন্তু গল্প? গল্পটা যদি পড়তে চান? তোমার গল্প রেডি?
—আমি মোটামুটি একটা খসড়া মেইল করেছি। উনি পছন্দ করেছেন গল্পটা। সেটা আশার কথা। এবারে পারফর্ম করবেন আপনি। হাসল উত্তীয়।
—বেশ, কখন যাচ্ছি?
—আপনি ঠিক সাতটায় বনগাঁ স্টেশনে পৌঁছে যাবেন! আমি চলে যাব সময়মতো। তবে মনে করে আপনার সিগনেচার হিসেবে ক্যামেরা নিয়ে যাবেন।
ঠিক সময়ে নিধুকে বনগাঁ স্টেশন থেকে ট্রেনে তুলে নিল উত্তীয়। ওর আসতে সময় লাগছিল। ঘণ্টাখানেক পরেই এল ও। নিধু দামি ক্যামেরা নিয়ে একা স্টেশনে বসে থাকতে অস্বস্তি বোধ করছিলেন। তাছাড়া কোথা থেকে হাসনুহানা ফুলের তীব্র গন্ধ আসছিল। প্রথমে ভালোই লাগছিল। কিন্তু গন্ধটা ক্রমে বাড়ছিল। বাড়তে বাড়তে কান মাথা নাক...ঝলসে যাচ্ছিল যেন। নিধু যখন অস্থির হয়ে পায়চারি শুরু করলেন, তখনই উত্তীয় এসে বাঁচাল-নিধুদা, একটু দেরি হল! স্যরি! আসুন ট্রেন এসে গেছে, উঠে পড়ি।
নিধু কিছু বোঝার আগেই ট্রেনে উঠে বসেছেন। কাঁধের ব্যাগে তাঁর অমূল্য ধন। বনগাঁ-রানাঘাট লোকাল ট্রেন ওদের নিয়ে রওনা হল। এ সময়ে কি ট্রেনে ভিড় কম থাকে? এই লাইনে আসা হয়নি। জানা নেই। নিধু ভাবলেন। কিছু বলতে গিয়ে দেখলেন,উত্তীয় একটু চাপে রয়েছে মনে হচ্ছে। একটা অস্থিরতা...! উসখুস করছে। হয়তো প্রডিউসার ঠিকঠাক এসে পৌঁছবে কিনা সে নিয়ে চিন্তায় রয়েছে। কিছু বললেন না নিধু। খানিক পরেই সাতবেড়িয়ায় নিধুকে নিয়ে নেমে পড়ল উত্তীয়। কানে ফোন উত্তীয়র।
—নিধুদা,প্রডিউসার এসে গেছেন। আসুন,এদিক দিয়ে গেলে শর্টকাট হবে। এখন লাইনে ট্রেন নেই। রেললাইন বরাবর যাব। চটপট কাজ হবে। ওখান থেকে নেমে ডানদিকের রাস্তায় ছোট্ট বাজার। সেখানেই উনি আছেন। বলেছেন ওঁর সঙ্গেই ডিনার সারতে হবে।
—আহা, আবার এসব ঝামেলা কেন? নিধু একটু সঙ্কুচিত।
—ভালোই হল। এত রাতে ফিরে কোথায় হোটেল খুঁজে বেড়াব? মুচকি হাসে উত্তীয়। দেখাদেখি নিধুও।
রেললাইনের ওপর দিয়ে যাতায়াত করা খুব সহজ কাজ নয়। লাইনের দুপাশে ঘোর অন্ধকার ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য উন্মুখ হয়ে আছে। মোবাইলের টর্চের আলোয় দেখা যায় ক্ষণেকের জন্য উঁকি মেরে যাওয়া ঝোপঝাড়! অনেক অনেক দূরে হয়তো বাজারের কুপির আলো টিমটিম করছে!
এখান থেকে শর্টকাট করতে হলে ডানদিকে নেমে গিয়ে খানিক পরে একটা বাজার। মানে মার্কেট! সভ্য মানুষের আবাস। ভাবতে ভাবতে এগিয়ে গিয়েছিলেন নিধুবাবু। উত্তীয় পিছিয়ে পড়েছে। পেছন ফিরে দাঁড়াতে যাবেন, অমনি পেছন থেকে কেউ জাপটে ধরেছে গলাটা।
নিধু কিছু বুঝে ওঠার আগেই ধারালো চপার তার কাজ সেরে নিল। তারপরেও উলটে পড়া শরীরের নানা স্থানে চপারের কোপ পড়ল। মৃত্যু নিশ্চিত চোখে দেখল, কিছুক্ষণ আগের হাসিখুশি নিধুবাবু চলে গেল বডি হয়ে লাইন থেকে খানিকটা ভেতরের রেলের জমিতে চাষ করা একটা পাটখেতে। বডি ঢুকিয়ে দেওয়ার আগেই ক্যামেরার ব্যাগ নিয়ে সরিয়ে রাখল উত্তীয়। এমনভাবে কাঁধে স্ট্র্যাপ জড়িয়ে গেছিল, খুলতে কসরত করতে হল।
অনভ্যস্ত হাতে চপার চালাতে গিয়ে হাতে একটু কেটে গেছে। জামাকাপড়ে রক্তের ছিটে লেগেছে নিশ্চয়, অন্ধকারে দেখা যাচ্ছে না। চটপট ব্যাগ খুলে আগে থেকে প্ল্যান করে নিয়ে আসা রাউন্ড নেক টি-শার্ট বের করে চেঞ্জ করে নিল উত্তীয়। ব্যবহৃত শার্টটা দলা পাকিয়ে রেখে দিল ব্যাগে।
নিধুর মোবাইলটা নিয়ে পকেটে রেখেছিল। ব্যাটারি আর সিমকার্ড বের করে দিল ছুঁড়ে ঝোপে জঙ্গলের অতলে। আর ব্যাগের মধ্যে গুছিয়ে নিল নিধুর ক্যামেরাটা। রক্তমাখা শার্টের পাশাপাশি চুপ করে রইল সে। এরপর রেল লাইন বরাবর হেঁটে বনগাঁ স্টেশনে এসে পৌঁছল ভোরের দিকে।
ট্রেনে উঠে পড়ল। যথারীতি বাড়িতে পৌঁছে স্নান সেরে নিল। ব্যাগ থেকে ক্যামেরাটা বের করে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখল। এটা বেশিদিন কাছে রাখা যাবে না। বিক্রি করে সেই টাকায় অন্য মডেল কিনবে ও। কাস্টমার আছে। বাংলাদেশের এক বিজনেসম্যান ক্যামেরা কিনবে বলেছিল উত্তীয়কে। তাকে ফোন করবে উত্তীয়। বেলার দিকে।
এখন ঘুম চাই। শরীর উত্তেজনায় ভেঙে পড়ছে। অনেকক্ষণ ঘুমুতে হবে। উত্তীয় দরজায় ছিটকিনি তুলে দিয়ে শুয়ে পড়ল। পরক্ষণেই ঘুমিয়ে কাদা। তখন টেবিলের ওপর থেকে ক্যামেরা উত্তীয়র দিকে ঘুরে গেল। ছবি উঠছে ক্লিক...ক্লিক...ক্লিক...। উত্তীয়র ঘুমন্ত চেহারা ক্যামেরার লেন্সে আটকে যাচ্ছে। আটকে যেতে যেতে ক্রমশ অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে শুরু করল। শরীরের যে যে পার্টের ছবি উঠছে, সেই সেই পার্ট বিছানা থেকে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছিল। নেই হয়ে যাচ্ছে। ক্রমে ক্রমে উত্তীয় পুরোপুরি ঢুকে গেল ক্যামেরার লেন্সে। এক আজব জগতে, যার অস্তিত্ব কোথায় কেউ জানে না।
দুদিন দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। পড়শিরা পুলিশে খবর দিয়েছিল। দরজা ভেঙে দেখা গেল ঘরে কেউ নেই। বিছানার চাদর কুঁচকে আছে, যেন কেউ শুয়েছিল একটু আগেও। টেবিলের ওপরে একটা ক্যামেরা। ক্যামেরাটার স্ট্র্যাপটা ঝুলছে অভ্যস্ত ভঙিতে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন