সেই দুর্যোগের রাত

সাগরিকা রায়

দরজায় টোকা নয়, রীতিমতো ধাক্কা যাকে বলে। আমি হতচকিত হয়ে পড়লাম।

আজ নিয়ে মাত্র সতেরো দিন হল আমি ভাড়াটে হয়ে এসেছি এইচ ব্লকের মিসেস মজুমদারের বাড়িতে। আই টি সেক্টরে চাকরি করি। আমার অফিসের নিয়ারেস্ট যে মেস আছে, সেখানে ছয়জন থাকে। আমার ইচ্ছে হলে সাত নম্বর হতে পারতাম, কিন্তু ইচ্ছে হল না। ভিড়, হইচই ভালোবাসি না। প্রাইভেসি বলে কিছু থাকে না সেখানে। তো একজন খবর দিয়েছিল এই এলাকার। বেশ নির্জন। ঝকঝকে রাস্তাঘাট। ডে নাইট সিকিউরিটির আশ্বাস। বাড়িগুলো ছিমছাম। সব চেয়ে সুবিধে যেটা, সেটাই এই জায়গাটা পছন্দের একমাত্র কারণ বলা যায়।

মেট্রো স্টেশনটা খুব কাছে। আর মিসেস মজুমদার খুব ভালো মহিলা। একাই থাকেন। কোনও ঝামেলায় নেই। কথা কম বলেন। এই কয়েকদিনেই মহিলাকে দেখেছি নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত থাকেন। বাড়ির সামনে বেশ খানিকটা ফাঁকা জায়গায় বাগান করেছেন। সারাক্ষণ বাগান নিয়েই আছেন। গ্রাউন্ড ফ্লোরের একটি ঘর ভাড়া দেন। পেয়িং গেস্ট। ঠিক সকাল সাতটায় চা রেডি। দোতলায় উঠে যাই চা খেতে। লম্বা সুন্দর প্রিন্টেড কৌটো থেকে বিস্কুট বের করেন। সরু সরু রোগাটে হাতে দুটো বিস্কুট বের করে অল্প অল্প হেসে আমার হাতে দেন। আমি বড় কাপ ভর্তি চা খেতে খেতে লক্ষ্য করি উনি চায়ের কাপ হাতে নিয়ে ভারি অন্যমনস্ক হয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকেন।

শুকনো মুখে দীর্ঘ ক্লান্তি ছায়া ফেলেছে। নিজের কথা কিছু বলেন না, আমার কথাও জানতে চান না। ঠিক সাড়ে আটটায় ব্রেকফাস্ট করি। ন'টায় বেরিয়ে যাই অফিসের উদ্দেশ্যে। ফেরাটা একটু রাতেই হয়। উনি খাবার হটপটে রেখে দেন। আমার আবির্ভাব বুঝে দরজা খুলে হটপট হাতে ধরিয়ে দেন।

ডিনার করি নিজের ঘরে বসেই। কখনো বিরক্ত হন না। বরং আমি অপ্রস্তুত হই। সঙ্কোচ হয়। আমার জন্য উনি বসে থাকেন ভেবে। সেদিন বলেই ফেলেছিলাম। সকালে চা খেতে খেতে প্রস্তাবটা দিলাম। আমি নাহয় ডিনার করেই ফিরব। তাহলে ওঁকে কষ্ট করে বসে থাকতে হয় না।

মন দিয়ে আমার কথা শুনলেন মহিলা। কোনও কথা বললেন না। এদিকে নিজেই প্রস্তাব দিয়ে ভুলেও গেছি। বাইরে থেকে খেয়ে আসার কথা বেমালুম উড়ে গেছে মাথা থেকে! ডিনার না করেই ফিরেছি। উনি দরজার মুখে দাঁড়িয়ে ডাকলেন। ঠিক বুঝেছেন আমার অবস্থা। ফিরে ফের ওপরে উঠে খাবারটা আনতে হল। বুঝলাম, উনি এই নিয়মই রাখতে চান।

আজও রাতের খাবার নিয়ে ঘরে এসে ঢুকেছি। দিনটা ভালো নয়। খুব দুর্যোগ শুরু হয়েছে দুপুর থেকে। অফিস ফেরত পড়ে গেলাম ঝড়ের মুখে। কোনওক্রমে মেট্রোতে উঠে পায়ের নীচের কংক্রিটের খোঁজ করছিলাম। খুব ধীর গতিতে চলছিল মেট্রো। শুনলাম বেশ কিছু লোকাল ট্রেন ওভারহেড তার ছিঁড়ে যাওয়ায় বাতিল হয়ে গেছে। প্ল্যাটফর্মে নেমে দেখি হুড়তাড় করে চলে যাচ্ছে লোকজন। আমার সঙ্গে ছাতা নেই। অগত্যা ভিজে ভিজে, ঝড়ের হাত থেকে নিজেকে বাঁচাতে প্রায় ছুটতে ছুটতে বাড়িতে এসে পৌঁছেছি। সমস্ত বাড়ির আলো জ্বালিয়ে রেখেছেন মিসেস মজুমদার। এমন তো কখনোই করেন না উনি! বুঝলাম, ঝড় বৃষ্টির জন্য ভয় পেয়েছেন। ভাগ্যিস ইনভার্টার আছে। নাহলে ঝড়ের তাণ্ডবে ইলেকট্রিকের হাইটেনশন লাইন ছিঁড়ে চারধার ঘোর আঁধারে ডুবে গেছে যেখানে, সেখানে উনি আলো ছাড়া ভয় তো পেতেনই।

ভিজে গায়ে কাঁপুনি ধরেছে আমাকে। ডোরবেল অকেজো। দরজায় কড়া নাড়তে যাচ্ছি, দরজা ঝট করে খুলে গেল। ভয়ার্ত মুখে দাঁড়িয়ে মিসেস মজুমদার। আমাকে বোধহয় দোতলার জানালা থেকে দেখেছেন! হয়তো আমার জন্য অপেক্ষা করছিলেন!

আমি ভেতরে ঢুকতেই তাড়াতাড়ি করে দরজা বন্ধ করে দিলেন। আমার অবস্থা দেখে একটু ধাতস্থ হলেন যেন। মুখের ভয়শীতল ভাবটা অনেকটা স্বাভাবিক— একটু গরম জলে স্নান করে নিন। ঠান্ডা লাগবে না। পারলে ওপরে আসুন। কফি করছি। বলে উনি ধীর পায়ে দোতলার সিঁড়িতে পা রাখলেন। খুব আস্তে আস্তে সিঁড়ি ভাঙছিলেন। যেন কত ক্লান্ত।

গরমজলে স্নান সেরে কফির উদ্দেশ্যে দোতলায় গেলাম। সিঁড়ি গিয়ে শেষ হয়েছে একটা প্যাসেজে। প্যাসেজ শেষ হয়েছে বন্ধ দরজার সামনে। দরজাটা খুললেই ছোট বারান্দা। ওই বারান্দায় সারাদিন বসে থাকেন মিসেস মজুমদার। তাঁকে কদাচিৎ বই পড়তে দেখেছি। হয়তো-বা বই হাতে আছে, তিনি তাকিয়ে আছেন বাইরের দিকে।

বারান্দার চারপাশ এমন ভাবে ঘিরে রেখেছেন, আলো বাতাস আসার সুযোগ পায় খুব কম। কিছু ঝুপসি গাছের ছায়ায় বাড়িটাকে অন্ধকার অন্ধকার লাগে। রোদ আসে না! পুরনো কিছু সিপিয়া কালারের ফটোগ্রাফ বাঁধাই করে সারি দিয়ে দেওয়ালে আটকে রেখেছেন।

গাছগুলো কেটে ফেললেই ভালো হতো। কিন্তু আমার প্রস্তাবে উনি যেভাবে রিঅ্যাক্ট করলেন! আমি আর কখনো কিছু বলার সাহস পাইনি। কি জানি, হয়তো উনি এমন ছায়াচ্ছন্ন থাকতে ভালোবাসেন। কার কেমন পছন্দ, কেউ কি বলতে পারে? তাছাড়া সানডে ছাড়া বাকি দিনগুলো আমার বাইরে কেটে যায়। বাড়িওলার বাড়ির গাছ কাটা হবে কিনা, তা নিয়ে ভাবতে বয়ে গেছে।

বোধহয় আমার জন্যই অপেক্ষা করছিলেন। সেই পুরনো চেয়ারে বসলাম, এ ঘরে ঢুকে বরাবর যেটায় বসি। চেয়ারের গদি একেবারে ডেবে গেছে। ঘরে খুব পুরনো পুরনো গন্ধ। টেবিলের উপর কফির মগ রেখেছিলেন। আমি বসতেই এগিয়ে দিলেন। জানতে চাইলেন আমার বিস্কুট লাগবে কিনা। এসময় কিছু খাই না জানাতে উনি নিজের কফি নিয়ে একটু দূরে বসলেন। দুজনে একই ঘরে বসে কফি খাচ্ছি, অথচ কেউ কথা বলছি না! আমার অস্বস্তি লাগছিল। কথাটা আমি শুরু করলাম।

—কি ঝড়টাই না হল! কালকের আগে ইলেক্ট্রিক কানেকশন আসবে না মনে হচ্ছে! উনি শুনে তাকালেন আমার দিকে। ভারি আনমনা লাগছিল তাঁকে। একটু কেশে বললেন,—আপনার ডিনার এখানেই সেরে যান নাহয়।

অযথা ঝামেলার দরকার কী? আমি রাজি হলাম। আপত্তি করার কিছু ছিল না। ঘরের ছায়া ছায়া পরিবেশে একটু কেমন লাগছে যদিও। ঘরে উজ্জ্বল আলো থাকলে ভালো লাগত। মনখারাপের চাদর মুড়ি দেওয়া ঘরে মহিলাও একই রকম! মনে হল উনি আমাকে কিছু বলতে চান। কফির শূণ্য কাপ সাইড টেবিলে রেখে না তাকিয়েই জানতে চাইলেন আমি বই পড়ি কিনা, কী ধরনের বই ভালোবাসি ইত্যাদি।

আসলে আমার বই টই খুব একটা পড়া হয় না। পড়লেও রহস্য রোমাঞ্চ ভৌতিক জাতীয় বই পড়ি। উনি হয়তো জ্ঞানগর্ভ বই-টই পড়েন। একটু ইতঃস্তত করে কথাটা বলতেই উনি উৎসাহ নিয়ে ঘুরে বসলেন,— আপনি প্রেত, আত্মা এসব বিশ্বাস করেন? কী মনে হয়? এসব আছে? তাদের ক্ষমতা আছে কিছু ক্ষতি করার?

আমি বিব্রত হই,—আসলে ব্যাপারটা নিয়ে বিশেষ ভাবে কখনও কিছু ভাবিনি। আপনি বুঝি বিশ্বাস করেন?

উনি মাথা ঝাঁকিয়ে আপত্তি জানালেন,— না, না! আমি বিশ্বাস করি না। কিন্তু অনেকে করে বলে শুনেছি। তাই জানতে চাইছিলাম।

—আমিও করি না। ধরুন, যদি ভূত, আত্মা ইত্যাদি থাকত, তাহলে যারা খুন হয়, তারা মানে তাদের আত্মা, প্রেত প্রতিশোধ নিতনা? পুলিশ, তদন্ত এসবের দরকার ছিল কি?

কথাগুলো বলার পরে আমার ধারণা হল মিসেস মজুমদার খুশি হবেন। কিন্তু উনি অদ্ভুতচোখে তাকালেন আমার দিকে। মুখে কিছু বললেন না।

বাইরে ঝড়ের তাণ্ডব শুরু হল ফের। প্রকৃতি উন্মাদ হয়ে উঠেছে যেন। গুম গুম আওয়াজে কানে তালা লেগে যাচ্ছে। বাতাসের বেগ তীব্র হয়ে উঠেছে। ক্রুদ্ধ প্রবল বাতাস উলটে পালটে দিচ্ছে পৃথিবীকে। প্রচুর গাছ ঝড়ের দাপটে মারামারি করছে যেন। খন্ডযুদ্ধ হচ্ছে বাইরে! আলো আজ আসবে না।

মিসেস মজুমদার বন্ধ জানালার সামনে বসে কী ভাবছিলেন। আমার কথার কোনও জবাব দিলেন না। আমার একটু অস্বস্তি হচ্ছিল। একেই এমন দুর্যোগের মধ্যে ভূত-প্রেত নিয়ে আলোচনা, তার ওপরে উনি এমন নিশ্চুপ হয়ে আছেন বা কেন কে জানে! ডিনার কমপ্লিট করে ঘরে যেতে পারলে বাঁচি। ভদ্রমহিলা বোধহয় বুঝতে পেরেছেন আমার অস্বস্তিটা। উনি উঠে এলেন—এখন কি ডিনার সার্ভ করব?

আমি রাজি হলাম। ডিনার সেরে নিলাম নীরবে। উনিও চুপচাপ খাচ্ছিলেন। রান্না উনি নিজেই করেন। অন্যান্য দিনের মতো রান্না হয়নি। কোনও খাবারে নুন বেশি, কোনওটায় নুনই নেই! রাতের রান্না করার সময় ঝড় এসেছিল। উনি আলো চলে যাওয়াতে ভয় পেয়ে উলটো পালটা করে ফেলেছিলেন। কিন্তু ইনভার্টার তো আছে!

এ নিয়ে কিছু বলব না ভাবলাম। কিন্তু একই খাবার উনিও খাচ্ছেন। কিছু কি টের পাচ্ছেন না? আসলে ওঁকে খুবই অন্যমনস্ক দেখাচ্ছে। কী খাচ্ছেন হয়তো স্বাদ পাচ্ছেন না। মন নেই খাবারে। কী হয়েছে মিসেস মজুমদারের? আত্মা নিয়ে জানতে চাইলেন। কেন?

—ঠিক আছে, তাড়াতাড়ি করে ঘুমিয়ে পড়ুন। খাবার ঠিক করে খেয়েছেন তো? ভালো করে খেয়াল করতে পারলাম না। মিসেস মজুমদার কুন্ঠিতভাবে বললেন।

আমি উড়িয়ে দিলাম। কোনও অসুবিধে হয়নি আমার। খাবার খুব ভাল ছিল। ইত্যাদি বলে বিদায় নিলাম। ঘুম পাচ্ছে। আসলে ভিজে টিজে এসে ভালো লাগছেনা। কাল আবার ভোরে ওঠার প্রোগ্রাম আছে। খুব ইচ্ছে করে বিছানা আঁকড়ে থাকতে। সেটুকু ইচ্ছে সানডেতে পুষিয়ে নিই।

ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। মাঝে মাঝেই ঝড়ের তাণ্ডব টের পাচ্ছি। ইদানিং ভূমিকম্পের আবির্ভাব হয় যখন তখন। সে ভয় যে হচ্ছে না একেবারে তা বলতে পারি না। ঘুমের মধ্যে অঝোর বৃষ্টির শব্দ পাচ্ছিলাম। কখন যেন গভীর ঘুমে তলিয়ে গিয়েছি। ঘুম ভাঙল প্রবল শব্দে। কী হল?

ঘুমটা চট করে ভেঙে যাওয়ায় পুরো সজাগ হয়ে গিয়েছি। কেউ দরজায় ধাক্কা দিচ্ছে! প্রবল ধাক্কায় দরজা ভেঙে যাওয়ার অবস্থা। কী হচ্ছে বুঝতে পারছিনা। কে এত রাতে আমার দরজায় ধাক্কা দিচ্ছে? ঝড়-জলের রাতে কোনও দুষ্কৃতকারী আসেনি কেউ বলতে পারবে? দরজা খোলা কি ঠিক হবে?

ধাক্কার প্রাবল্যে উঠতে বাধ্য হলাম। মোবাইলের টর্চ জ্বেলে দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। ভয় ছিল। বেশি ছিল কৌতূহল। কে এসে এভাবে আমার দরজায় ধাক্কা দেবে?

ঝট করে মনে হল মিসেস মজুমদার ছাড়া আর কে হতে পারে? বাড়ির মেইন গেটে তালা দেওয়া। ভেতরে একমাত্র বাড়ির লোক ছাড়া কেউ ঢুকতে পারবে না। নিশ্চয় মিসেস মজুমদার। উনি কি কোনও বিপদে পড়েছেন? আমি জোরে ডাকলাম,—মিসেস মজুমদার! বাইরে কি আপনি?

দরজার বাইরে যে আছে, সে আমার গলা পেয়ে চেঁচিয়ে উঠল,—প্লিজ, দরজাটা খুলুন। আমি মিসেস মজুমদার। খুব বিপদে পড়েছি। গলাটা কান্নায় ভরা। দ্রুত দরজা খুলে দিতে হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকে পড়লেন মিসেস মজুমদার। এই কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ওঁর চেহারা পালটে গেছে। ভয়ে ত্রাসে সমস্ত শরীর কাঁপছে। মুখের রং বিবর্ণ।

বাইরে প্রবল বর্ষণ চলছে,সঙ্গে ঘোর অন্ধকার। আমিও ভয় পেয়ে গেছি। তাড়াতাড়ি দরজা বন্ধ করে দিলাম। ততক্ষণে মিসেস মজুমদার ঘরের এক কোণে চলে গেছেন। বাচ্চা মেয়ের মতো চুপ করে দাঁড়িয়ে আছেন।

আমি অন্ধকারে মোম খুঁজে বের করলাম। আলো জ্বালতে মিসেস মজুমদারের ভয়চকিত চেহারাটা দেখতে পেলাম। নিজে বসে ওঁকেও বসার জন্য অনুরোধ করাতে উনি যেন আমার কথা শুনতেই পেলেন না। বিস্ফারিত চোখে কান পেতে কিছু শোনার চেষ্টা করছিলেন।

আমি ওঁকে লক্ষ করছিলাম। ওঁর মধ্যে আজ সন্ধে থেকেই অস্বাভাবিকত্ব অনুভব করছি। উনি স্পষ্টত ভয় পেয়েছেন। কিন্তু কেন ভয়, কীসের ভয় সেটা প্রকাশ করছেন না। কী হয়েছে মিসেস মজুমদারের?

—আপনি কিছু শুনতে পাচ্ছেন? গলার স্বর কাঁপছে ওঁর।

—কিছু মানে? ঝড়ের আওয়াজ ছাড়া আর কিছুই তো শোনা যাচ্ছে না! কেন বলুন তো? আপনি কিছু শুনছেন?

—কেউ দরজায় ধাক্কা দিচ্ছে শুনছেন না?

—দরজায় ধাক্কা? আমার দরজায়? সে তো আপনি ধাক্কা দিচ্ছিলেন! আমি যথার্থ অবাক হই।

—আমার ঘরের দরজায় সে এসেছিল! এই রকম ঝড় জলের রাতে সে আসে! বারবার আসে।

—সে মানে? আপনি কার কথা বলছেন?

ভদ্রমহিলা মুখ খুলতে গিয়ে থেমে গেলেন। ত্রাস মিশ্রিত চোখে তাকালেন একবার। তার পরেই মুখে কুলুপ এঁটে দিলেন। যতক্ষণ দুর্যোগ চলছিল, তিনি দুহাতে মুখ ঢেকে বসে রইলেন। আমি ইলেক্ট্রিক কেটলিতে জল গরম করে গ্রিন টি বানিয়ে ওঁকে দিলাম। নিজেও নিলাম। গরম চা ওঁর নার্ভাসনেস কাটিয়ে উঠতে হেল্প করবে। সত্যি তাই হল। চায়ে চুমুক দিতে দিতে একটু যেন সাড় ফিরল। তবুও হতচকিত ভাবটা কাটাতে পারছিলেন না। খুব ভয় পেয়েছেন। কিন্তু এত ভয় ঝড়-বৃষ্টিকে? তাহলে একা থাকেন কী করে? কিছু বললাম না। হয়তো এটা ওর একধরনের মানসিক সমস্যা। চা খেয়ে উনি কী করবেন বুঝতে পারছিলেন না। বললাম,—বসুন এখানেই। রাত বেশি নেই। ঘণ্টা তিনেক পরেই ভোর হয়ে যাবে।

উনি রাজি হলেন। আমি সোফায় বসে ওকে আমার বিছানায় শুতে বলাতে রাজি হলেন না। ঠায় একজায়গায় বসে রাত কাটিয়ে দিলেন। আমিও বসেই ছিলাম। কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি জানি না।

ঘুম ভাঙতেই দেখি ভোরের আলো দেখা যাচ্ছে। উনি কখন বেরিয়ে গেছেন। তখন বৃষ্টি একটু কমেছে। টিপ টাপ জল পড়ছে দেবদারু গাছ বেয়ে। আমারও ঘুম হয়নি। গা ম্যাজম্যাজ করছিল। উঠে গরম জলে স্নান করে নিয়ে বেরিয়ে গেলাম। বলে গেলাম বাইরে লাঞ্চ করে নেব।

উনি রাতে ঘুমোননি। ওকে আর ঝামেলায় ফেলব না। কিন্তু কে জানত ভয়ঙ্কর দুর্যোগ অপেক্ষা করে আছে আমাদের জন্য। অফিস ছুটির পর সন্ধের দিকে প্রচণ্ড হাওয়ায় তোলপাড় হয়ে যাচ্ছিল চারপাশ।

অব্জবাবুর কথা মনে পড়ল। এই রকম ঝড়-বৃষ্টির দিনে নিজেকে বাঁচাতে কোথায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। কোথা থেকে একটা সাইনবোর্ড উড়ে এসে গলায় ধাক্কা মারে। উনি মারা যান দুদিন পরে। ঝড় এলেই আমার অব্জবাবুর কথা মনে পড়ে।

ঝড় এল যখন, আমি মেট্রো স্টেশনের কাছাকাছি চলে এসেছি। ধুম ধাম শব্দে কোথায় কী পড়ে গেল। তাকিয়ে দেখার সময় নেই। রাস্তার লোকজন ছুটছে। আমিও। বোঁ বোঁ করে বাতাসের শব্দ উঠছে। কাগজের টুকরো, প্ল্যাস্টিক, ঠোঙার সঙ্গে জুটেছে ধুলো।

মেট্রোর অন্দরে ঢোকার মুখে বিহারি ভাজাওলার বেতের টেবিল উলটে সব একাকার। বাদাম মাড়িয়ে লাফিয়ে ঢুকে পড়লাম। সিঁড়ি দিয়ে উঠছি যখন, তখনও জানি না মেট্রো চলবে কিনা। ঠাসাঠাসি করে গাড়িতে উঠে পড়েছি। যে করে হোক, নিরাপদ জায়গায় পৌঁছতে হবে।

মিসেস মজুমদারের মুখ মনে পড়ল। কী যে করছেন মহিলা ভগবান জানেন। উনি কারও সঙ্গে মেলামেশাও করেন না। প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো থাকলে এভাবে নিঃসঙ্গ বোধ করতেন না নিশ্চয়।

বাঁশদ্রোণীতে নেমে পড়লাম। বাইরে দেখি লন্ডভন্ড অবস্থা। যথারীতি ইলেকট্রিক কানেকশন নেই। এরই মধ্যে গতকালের মতো নামল বৃষ্টি। ঝেঁপে নেমেছে। প্যান্ট গুটিয়ে ব্যাগ চেপে ধরে ছুটে চলেছি।

স্টেশনে অপেক্ষা করতে পারতাম, কিন্তু অবচেতনে ভয় ছিল মিসেস মজুমদারের জন্য। বয়স্কা মহিলা, একা আছেন, কী করছেন কে জানে! পার্কের পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় দেখি 'এখানে ক্রিকেট, ফুটবল খেলা চলিবে না 'লেখা বোর্ডটা রাস্তার ধারে পড়ে আছে। দু চারটে গাছের ডাল বিক্ষিপ্তভাবে ছড়ানো ছিটানো। ইত্যবসরে জল জমে গেছে রাস্তার ধারে। কোন ক্রমে বাড়ির সামনে পৌঁছে দেখি বাড়ি অন্ধকার। সারা বাড়িতে প্রাণের অস্তিত্ব নেই। বুক ধড়াস করে উঠল। এমন হওয়ার কথা তো নয়! উনি ভয় পেলে মোম বা এমার্জেন্সি লাইট জ্বালিয়ে রাখেন। আজ কেন অন্ধকারে আছেন? ভয় পেয়ে অজ্ঞান হয়ে যাননি তো?

হুড়পাড় করে দরজায় ধাক্কা দিচ্ছি। কোনও সাড়া শব্দ নেই। জোরে চেঁচিয়ে ডাকলাম-মিসেস মজুমদার, দরজা খুলুন! মিসেস মজুমদার! বৃষ্টির জল পড়ে যাচ্ছে ছাদের পাইপ বেয়ে। জল পড়ার বিচিত্র শব্দ উঠছে ছপ! ছপ! ছপাস! মনে হয় কেউ যেন জলে পা ডুবিয়ে ডুবিয়ে আসছে! প্রবল বৃষ্টি হচ্ছে আজ!

কেউ দরজার ওপাশে এসে দাঁড়াল। আমি ফের ডাকলাম— মিসেস মজুমদার দরজা খুলুন। আস্তে আস্তে দরজা খুলে যাচ্ছে। অন্ধকারে একটা অস্পষ্ট অবয়ব দেখা গেল। মিসেস মজুমদার!

আমি প্রায় ছুটে বাড়ির ভিতরে ঢুকে গেলাম ওঁর পাশ কাটিয়ে। বাইরে শিবের তাণ্ডব চলছে। ঘুরঘুট্টি অন্ধকারে ভয়শীতল আবহাওয়া ছুটে আসছে আমাকে লক্ষ্য করে। ঢুকেই মিসেস মজুমদারকে ঠেলে ঘরে টেনে নিলাম। সপাটে দরজা বন্ধ করে তাঁর দিকে তাকালাম,—কী ভয়ঙ্কর কাণ্ড! উফ, কী দুর্যোগ দেখেছেন? আমার জীবনে এমনটা দেখিনি।

মিসেস মজুমদার ফিসফিসে গলায় বললেন,—আমি দেখেছি। সেদিনটাও ছিল এমনই দুর্যোগ। আজ সে আসছে! তার পায়ের শব্দ শুনতে পাচ্ছেন?

—কার কথা বলছেন? আমি হতবাক প্রায়। যেন একটা ঘোরের মধ্যে আছেন মিসেস মজুমদার। ঘোরের মধ্যে থেকে নিজের অজান্তে কী সব বলে যাচ্ছেন! আমি ওঁকে টেনে ঘরের ভেতরে নিয়ে গেলাম।

সিঁড়ি ভাঙতে অসুবিধে হচ্ছিল ওঁর। শরীর ভেঙে পড়ছে যেন! ঘরে নিয়ে গিয়ে শুইয়ে দিলাম। উনি ভারি ক্লান্ত গলায় বললেন—আপনি যাবেন না প্লিজ। একা থাকতে বড় ভয় করছে।

শুনে অবাক হলাম। আসলে এই কয়েকবার মিসেস মজুমদারের দুর্যোগ—ভয় নিয়ে আমার মনেও প্রশ্ন জেগেছে। উনি এত ভয় কেন পান? আর 'সে আসছে, বা আসবে' এই কথাই-বা বলেন কেন? কার আসার কথা দুর্যোগের মধ্যে? কে আসবে ভেবে উনি ভয়ে কাতর হয়ে পড়েন? প্রশ্নটা না করে পারলাম না। আমাকে জানতেই হবে ভেতরের রহস্য।

আমার প্রশ্ন শুনে কেঁপে উঠলেন মিসেস মজুমদার। চোখ বুজে ফেললেন। গলার কাছটা থরথর করে কাঁপতে লাগল। একসময় উনি চোখ খুললেন—আজ আর কিছু লুকিয়ে রাখব না। সব বলতে হবে। আমার পাপ। কত বছর ধরে লুকিয়ে রেখে রেখে বেঁচে মরে আছি।

শোনো, তুমি যে ঘরে থাকো, সেই ঘরে একটি ছেলে এসেছিল পেয়িং গেস্ট থাকবে বলে। সে ছিল আমার প্রথম বোর্ডার। একা থাকি। প্রথম প্রথম ভয় করে অজানা, অচেনা লোককে। আমারও ভয় ছিল। এলাকাটা তখন আরও নির্জন।

একদিন ব্যাঙ্ক থেকে মোটা টাকা নিয়ে এসেছি। বাড়ির পেছন দিকটা বাড়াব ভেবেছিলাম। আসলে টাকার জন্য নয়, আমার স্বামী আমার জন্য যথেষ্ট টাকা রেখে গেছেন। উনি মারা যাওয়ার পরে বাড়িতে পেয়িং গেস্ট রাখব ঠিক করি। ভাবলাম পেছনের দিকে অনেকটা জমি রয়েছে। বাড়িয়ে নিলে আরও দুজনের ব্যবস্থা করতে পারি। বাড়িতে লোকজন থাকলে ভালো লাগবে।

যাহোক, ছেলেটি কোথায় যেন চাকরি করত। আমার খুব ভয় করত। খবরেরও কাগজে যা সব পড়ি! সেদিন খুব দুর্যোগের দিন! ওহ! সে কি ঝড়-জল! আমি দরজা দিয়ে ঘরে বসে আছি। ভয় হচ্ছে। এমন সময় আলো চলে গেল। আর তখনই সিঁড়িতে পায়ের আওয়াজ পেলাম। ভাবছি নতুন যে এসেছে, সে নিশ্চয়। কিন্তু সে কেন এসময় আসবে? আলো নেই বলে কি অসুবিধে হচ্ছে? কিন্তু আমার কী করার আছে?

দরজায় নক করেছে কেউ। আমি জানতে চাইলাম কে এসেছেন? কোনও জবাব নেই! ভয় আমাকে জাপটে ধরলো। আমাকে ব্যাঙ্ক থেকে বের হতে দেখেছে ভাড়াটে ছেলেটি। ঘরে টাকা আছে। ও এসেছে, কিন্তু জবাব দিচ্ছেনা কেন? আমার অবস্থাটা ভাবুন! এদিকে দরজা খুলছি না বলে এমনভাবে ধাক্কা দিচ্ছে, যেন ভেঙে ফেলবে! এবং সত্যি দরজা খুলে যাওয়ার উপক্রম হচ্ছে।

বুঝলাম নিজেকে বাঁচাতে হবে। ঝড়-জলের জন্য কেউ আমার ডাক শুনতে পাবে না। সিকিউরিটির ফোন নম্বর কোথায় মনে করতে পারছি না। এই সময় ভেঙে পড়ল দরজা। আমি দরজায় লাগাবার ডাঁসা হাতে নিয়ে দাঁড়ালাম। ছেলেটি ক্রিমিনাল। ও পুরো প্ল্যান করেই এখানে ঢুকেছিল। আমি ডাঁসা দিয়ে জোরে আঘাত করলাম। সে পড়ে গেল। আর উঠল না!

—তারপর? আমার শ্বাস পড়ছিল না,—কী করলেন?

—শেষরাতে উঠে বডি টেনে নিয়ে বাগানে পুঁতে দিলাম। তখনও প্রবল বৃষ্টি। মাটি নরম...। কিন্তু সে আসে। উঠে আসে বারবার এমন ঝড়জলের রাতে! হাঁপাচ্ছেন মিসেস মজুমদার।

কী বলব বুঝতে পারছি না। খুন করে আত্মগ্লানিতে ভুগছেন উনি। আত্মরক্ষার জন্য ওঁর হাতে খুন হয়ে গেছে। সেই অনুশোচনায় ভয় ত্রাস ওঁকে এসব অদ্ভুত ভাবনায় ডুবিয়ে রেখেছে। সে কথা মিসেস মজুমদারকে বোঝালাম।

আলো আসেনি এখনও। ঝড় থেমে গিয়েছে। বৃষ্টির তোড় অব্যাহত। আমি উঠে জানালা খুলে দিতে শিরশিরে বাতাস ঢুকে পড়ল ঘরে। বাগানের দিকে তাকিয়ে দেখার চেষ্টা করলাম। অন্ধকার বাগান! ওখানে মাটির নীচে শুয়ে আছে একজন! ভাবতেই গা শিরশির করে উঠল। আসলে পরিবেশ এই শিরশিরের জন্য দায়ী।

—বন্ধ করুন জানালা। ও ঢুকে পড়বে! মিসেস মজুমদার চেঁচিয়ে উঠলেন। আমি জানালা বন্ধ করে দিতে গিয়ে শুনতে পেলাম ছপ! ছপ! ছপাস! শব্দ হচ্ছে বাগানে।

—শুনতে পাচ্ছ? ও আসছে!! জল কাদায় ওর পা পড়ছে। সেই শব্দ কাছে এগিয়ে আসছে! ঝড়, জল মাখামাখি ছায়াটা বা ছায়া নয় এমন কিছু উঠে আসছে মাটির তল থেকে! আমি দেখতে পাচ্ছি! উফ! শোন, জলভরা বাগানে তার পায়ের শব্দ উঠছে! মিসেস মজুমদার আর্তনাদ করে ওঠেন,—সে আসছে!

সে আসছে!!!

ছাদের পাইপ বেয়ে বৃষ্টির জল পড়ে যাচ্ছে বাগানে! ছপ! ছপ! ছপাস!

কেউ কি জলের ভেতরে পা ডুবিয়ে আসছে!

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%