মৃত্যু-উপত্যকা

সাগরিকা রায়

এমনিতেই ট্রেনে ঘুম হয় না আমার। তবুও আজ ট্রেনে উঠে আপার বার্থে শুতে শুতে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলাম। কর্ণার অস্টিওআর্থাইটিস থাকার জন্য ও সবসময় লোয়ার বার্থ প্রেফার করে। ওর অবশ্য ট্রেনে ঘুম হয় না কখনোই। ঘুমিয়ে পড়ার আগে ঝুঁকে দেখেছি কর্ণা কপালের উপর হাত রেখে চোখ বুজে আছে। ভঙ্গিটা পরিচিত। ও স্রেফ চোখ বুজে আছে।

কতক্ষণ ঘুমিয়ে ছিলাম জানিনা, একসময় ঝট করে ঘুম ভেঙে গেল। ঘুম ভাঙতেই গাড়ি ভরা ঘুম দেখতে দেখতে উঠে বসলাম। কারা সুখে নাক ডাকছে। তাতে, উদারা, মুদারা একাকার হয়ে যাচ্ছে। কোনও স্টেশন এল। একটু চেঁচামেচি, কথাবার্তা হতে হতে ঝাপসা হয়ে এল সব। ট্রেন ছেড়ে দিল ফের।

ওয়াশরুমে যাব। নেমে পায়ে চপ্পল ঢোকাতে ঢোকাতে দেখি কর্ণা উঠে বসেছে। বোধহয় আমাকে নেমে আসতে দেখেছে। ইশারায় ওকে ওয়াশরুমে যাচ্ছি বলে সরু প্যাসেজ দিয়ে হাঁটছি। দুপাশে ঘুমন্ত মানুষের পাশ কাটিয়ে যেতে যেতে নিজেকে বড় একলা মনে হল। যেন এই পৃথিবীতে আমি একেবারে একা। কোথাও কেউ নেই!

বেসিনের কল খুলে চোখে মুখে জল দিলাম। আর ঠিক তখনই গাড়ি স্লো হয়ে এল। এটা কোন স্টেশন? কোনও চেঁচামেচি, হইচই নেই! হকারদের কথাবার্তা নেই! দরজার বাইরে মুখ বাড়ালাম। কি সুনসান স্টেশন রে বাবা! কোথাও মানুষজনের উপস্থিতি পর্যন্ত নেই! প্ল্যাটফর্মে কেউ শুয়ে বা বসে নেই! আচ্ছা, একটা কুকুর পর্যন্ত নেই! মৃদু নরম লালচে আলো গায়ে মেখে স্থির হয়ে আছে যেন হাজার বছর ধরে এই স্টেশনটা! আমি চোখ সরাতে পারছিলাম না। স্টেশনটা ভীষণভাবে টানছিল আমাকে। মনে হচ্ছে এখনই নেমে যাই। নামব?

—চল, নেমে যাই! আমাদের এটাই তো ইচ্ছে ছিল! যেখানে ইচ্ছে হবে, নেমে পড়বো। চল, নেমে যাই! আমার পেছনেই দাঁড়িয়ে কর্ণা। মন দোদুল্যমান। কিন্তু কর্ণা ব্যাগটা নিয়ে নেমে পড়ল বলে। আমি দ্রুত আমার রুকস্যাক নিয়ে এলাম। নেমে পড়লাম দুজনেই। আর সঙ্গে সঙ্গে ছেড়ে দিল গাড়ি। দেখতে দেখতে প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে গাড়ি হুস হুস করে হাওয়া। চেয়ে দেখি, স্টেশনে আমরা দুজন ছাড়া আর কেউ নেই! না, আছে, একটা ঝুপসি বটগাছ অন্ধকারকে জাপটে ধরে ঠায় দাঁড়িয়ে আমাদের দুজনকে দেখছে!

আমাদের দুজনের কাছেই বেড়ানোটা মজার। কোনও পার্টিকুলার জায়গায় যাব বলে বের হই না আমরা। ট্রেনে উঠে বসি। তারপর যেখানে ইচ্ছে হয়, নেমে পড়ি। ভালো লাগলে দু-চারদিন থেকে যাই। এভাবে কত রকম রকম মানুষ, জায়গা দেখে ফেললাম! সবই অনুল্লেখ্য জায়গা। কিন্তু আমাদের এটাই ভালো লাগে। তাই এই অজানা, অচেনা স্টেশনে নেমে পড়তে দ্বিধা হয়নি। হুম, কিন্তু, এরকম জনহীন জায়গাও দেখিনি এর আগে!

—খুব নির্জন, তাই না? কর্ণাও অদ্ভুত ব্যাপারটা অনুভব করেছে। আমি আসল কথা বুঝেছি। এই জায়গাটা আসলে ছোট্ট একটা স্টেশন। লোক বসতি খুব কম। বা, হতে পারে বসতি অনেকটা দূরে। তাহলে কথা হল আমরা এই রাতে এখানেই থাকছি। ভোর হলে দেখা যাবে!

বটগাছের নীচে পরিস্কার বাঁধানো বেদী। বেদীতে গিয়ে বসলাম আমরা। কর্ণা হেসে বলল- আমার স্কুলের কোলিগরা বলে তোরা হলি মুডি পাবলিক। কোথায় আমরা রাজগির যাব বলে ভেবে সেবারে কোন এক অজ পাড়াগাঁয় ছুটি কাটিয়ে এলাম।

—হ্যাঁ, কিন্তু সেখানের মেলার কথা মনে আছে? মোটা মোটা রসে ভরা জিলিপি, সর ভর্তি দুধ... আহা, এখনও মনে পড়ে। আমরা এই জিলিপির স্বাদ সত্যি ভুলতে পারি না আজও।

আমরা এসব আলোচনা করছি, এমন সময় কার যেন ব্যাকুল গলা পেলাম—আজও এল না! আর আসবে কিনা জানি না। ভালো লাগে? চমকে তাকিয়ে দেখি দুজন মহিলা স্টেশনের ওধার থেকে কথা বলতে বলতে আসছে। বোঝা গেল এই ট্রেনে কারও আসবার কথা ছিল, সে আসেনি। এরা হয়তো খুব আগ্রহের সঙ্গে এসেছিল তাকে নিতে। ব্যর্থ মনোরথ হয়ে ফিরে যাচ্ছে। যাক, তবু কারও দেখা তো পাওয়া গেল! এদের কাছে এখানকার কিছু মিছু খবর মিলবে এখন। আমি উঠে দাঁড়ালাম,—এই যে, একটু শুনবেন?

কর্ণা আমার দেখাদেখি উঠে দাঁড়িয়ে আমার সঙ্গে গলা মেলাল,—একটা কথা ছিল, একটু শুনবেন? আমাদের আওয়াজে মহিলা দুজন অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। নিজেদের মধ্যে কী সব আলোচনা করল। পরে এগিয়ে এল আমাদের দিকে। কাছে আসতে দেখি একজন মধ্যবয়সি, অন্যজন তরুণী। দুজনেই বেশ সম্ভ্রান্ত পরিবারের বলে মনে হচ্ছে। ওরা আমাদের দিকে তাকিয়ে হাসল—আপনারা? এখানে কোথায় এসেছেন?

আমি বললাম,—আসলে আমরা... এ জায়গাটা ভালো লেগে গেল! ট্রেন থেকে নেমে পড়লাম! কিন্তু এখানে হোটেল টোটেল আছে কিনা।

—আরে, হোটেল এখানে কোথায়? ওসব কিচ্ছু নেই। খুব পুরনো ধাতের জায়গা। তবে, আপনারা ঠিকই বলেছেন, জায়গাটা ভারি মনোরম। মধ্যবয়সী মহিলা বেশ গুছিয়ে কথা বলেন।

—আপনারা এত রাতে কোথায় যাবেন? চলুন, আমাদের বাড়িতে যাবেন চলুন। তরুণী কর্ণার দিকে সমর্থনের আশায় তাকাল।

আমি আর কর্ণা পরস্পরের দিকে তাকালাম। এই অচেনা মহিলা দুজন তাদের বাড়িতে যেতে বলছে। আমরা কি যাব এদের সঙ্গে? সেটা কি উচিত হবে? মহিলা দুজন আমাদের মনের অবস্থা বুঝতে পেরে সহানুভূতির সঙ্গে কর্ণার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল,— আসুন আমাদের সঙ্গে। কোনও চিন্তা করবেন না। যদি পছন্দ না হয়, তাহলে কাল অন্য ব্যবস্থা করবেন।

—তাছাড়া, এই রাতে এখানে দুজনে বসে থাকবেন? ভোর হতে বেশ দেরি আছে। মধ্যবয়সি আন্তরিক। আমি আর কর্ণা চোখাচোখি করলাম। যাওয়াই যাক। এত করে যখন বলছেন! তাছাড়া ভয়ের কী আছে? আমরা দুজনে আছি। এদের দেখে ভালো পরিবারের বলেই মনে হচ্ছে। আর এরা আমাদের কী ক্ষতি করবে? আমরা যে এখানে আসব সে কথা কি এরা জানত? বরং বাকি রাতটুকু এদের বাড়িতেই কাটিয়ে আসি। আমরা রাজি হয়ে গেলাম। ব্যাগ ব্যাগেজ নিয়ে আমরা উঠলাম। রওনা হলাম। ওরা ভারি খুশি আমাদের পেয়ে। জোর করে কর্ণার ব্যাগ টেনে নিল তরুণী। মধ্যবয়সি একটু আস্তে হাঁটছিলেন। তরুণী হুড়মুড় করে এগিয়ে যাচ্ছে দেখে থামালেন,—জরি, আস্তে চল। রাস্তা উঁচুনীচু আছে কিন্তু!

সত্যি রাস্তায় মাঝে মাঝেই গর্ত। ওদের পরিচিত রাস্তা বলে ঠিকঠাক এগিয়ে যাচ্ছে। আমাদের সাবধান করে দিচ্ছে—দেখবেন, সামনেই কিন্তু গর্ত বা, সামনেই কিন্তু জল জমে আছে। দেখে আসবেন। চলতে চলতেই জিজ্ঞাসা করলাম—আপনারা স্টেশনে কাউকে আনতে গিয়েছিলেন। মনে হল।

—আর বলবেন না। একজনের আসার কথা, তা এলোই না। মধ্যবয়সি মহিলা চিন্তিত—আজও এলনা রে জরি! কবে আসবে কে জানে! আদৌ আসবে কিনা কে জানে!

জরি যেতে যেতে থমকে দাঁড়াল। কিছু বলতে গিয়েও বলল না। ফের কর্ণার পাশাপাশি চলতে শুরু করল। আকাশে অল্প একটু চাঁদ দেখা যাচ্ছে মেঘের ছেঁড়া ছেঁড়া নড়াচড়ার পাশে পাশে। একটা মন কেমন করা আলো হালকা হয়ে নেমে এসেছে আকাশ থেকে। এখন কি শুক্লপক্ষ চলছে? একটু আগেই কি ঘুটঘুটে অন্ধকার ছিল? মেঘ করেছিল বোধহয়। আমরা উত্তেজনায় টের পাইনি।

উঁচু-নীচু রাস্তা দিয়ে হেঁটে একটা মাঠের মধ্যে গিয়ে পড়লাম। চাঁদ এখন মেঘের ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে আসায় মাঠ মোমের মতো নরম আলোয় মাখামাখি হয়ে আছে। কি অপূর্ব লাগছে, সে আর বলার নয়। আমি থমকে দাঁড়িয়ে পড়লাম। মোটে নড়তে ইচ্ছে করছে না। যেন আটকে গেছি এই অদ্ভুত চাঁদের আলোয়। মাঠটাও কেমন এক মায়াবী আলোয় স্নান করছে যেন। তারা ফুটফুট আকাশে একফোঁটা মেঘ নেই!

কোথায় কে ডেকে উঠল,—কে যাও? আমাদের বলল কিনা জানি না। তবে আমাদের সঙ্গিনী দুজন সে কথার কোনও জবাব দিল না। কর্ণা ভয়ার্ত গলায় বলে উঠল,—কাকে বলছে গো?

আমি মহিলা দুজনের দিকে তাকালাম। ওরা নির্বিকার হেঁটে চলেছেন। তরুণী বড্ড চুপচাপ। মধ্যবয়সি একবার আকাশের দিকে তাকালেন। শ্বাস ফেললেন মনে হয়। মুখে কথা নেই। এদিকে আর তৃতীয় লোক দেখিনি এখন পর্যন্ত। কোনও বাড়িঘরও দেখিনি। কোথায় যাচ্ছি আমরা? কারা আমাদের সঙ্গী? মায়ায় বেঁধে নিয়ে যাচ্ছে কি আমাদের? ভয়ের শিহরণ খেলে গেল বুকে। এরা কারা? রাতের বাতাসে শীত করে উঠল।

—ভয় নেই। আমরা এসে গেছি। একটু দূরেই আমাদের বাড়ি। মধ্যবয়সি অন্ধকারের দিকে তাকালেন। আমি চোখ সামনের দিকে প্রসারিত করেও কিছুই দেখতে পেলাম না। এই অন্ধকারে কিছু কি দেখা যায়? ভাবতেই চমকে উঠলাম। অন্ধকার কেন? এই না সুন্দর অপার্থিব এক আলোয় ভরে ছিল চারপাশ? কোথায় গেল শুক্লপক্ষের নরম জ্যোৎস্না?

—এই জায়গায় এমনই হয় বারবার। তরুণী দাঁড়িয়ে পড়ে পেছন ফিরে আমার দিকে তাকাল—কতদিন ধরে আছি। আজও বুঝে উঠতে পারলাম না জায়গাটাকে। এসে গেছি। ওই দেখুন আমাদের বাড়ি।

তাকিয়ে দেখি ছোট্ট সুন্দর একখানি বাড়ি। সামনে ফুলের বাগান। কাঠের সিঁড়ি উঠে গেছে বাগান থেকে ঘরের দরজার মুখে। আমরা ওদের পেছন পেছন উঠে গেলাম সিঁড়ি ভেঙে। মধ্যবয়সি দরজায় হাত রাখতেই দরজা খুলে গেল। ভেতরে একটা নীল আলোর ডুম। পুরনো দিনের মতো করে সাজানো বাড়ি।

—আসুন, এই আমাদের বাড়ি। ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে মধ্যবয়সি বললেন।

আমার কেমন অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছিল। কিন্তু অস্বস্তিটা কী বা কেন বুঝতে পারছিনা। নীলচে আলোয় ভরা ঘরে কী এক নাম না জানা ফুলের গন্ধ! ঘুম পাচ্ছিল।

—চা খাবেন? নাকি ঘুমিয়ে নেবেন? তরুণী কর্ণার ব্যাগটা ধরে রেখেছে তখনও।

—না না, একটু বিশ্রাম নেব। আসলে আপনারা দুজনেই এত রাতে স্টেশনে গিয়েছিলেন। আপনাদেরও রেস্ট দরকার। এখন আর চা নয়। কর্ণা সামলে নিল পরিস্থিতি।

সেই মতোই হল। একটা মাঝারি মাপের ঘরে টানটান করে পরিস্কার বিছানা পাতা। খোলা জানালা দিয়ে ফুরফুরে বাতাস আসছে। চাঁদের আলো ছলকে এসে পড়েছে বালিশের ওপর। এ-ঘরেও সেই অজানা ফুলের গন্ধ। আমাদের ব্যাগ-ট্যাগগুলো জরি ঘরের একপাশে রেখে দিল। তারপর অল্প হেসে বলল,—রেস্ট নিন। ওয়াশরুম ওই দিকে, বলে আঙুল তুলে একদিকে দেখাল। দুজনেই বিদায় নিয়ে চলে গেল। যাওয়ার সময় দরজা কাছ বরাবর গিয়ে জরি থমকে দাঁড়াল। কী বলতে গেয়ে থেমে গেল। তারপর তাড়াহুড়ো করে চলে গেল।

কর্ণা একটু অবাক চোখে তাকিয়েছিল ওদের চলে যাওয়ার দিকে। আমি এই সিচুয়েশন থেকে বের হতে গলায় জোর আনলাম,—এই কর্ণা, শুয়ে পড়। এত রাতে স্টেশনের বটতলায় না থেকে একটা ধোয়া কাচা বিছানা পেয়েছ, তার সদ্ব্যবহার করো। কর্ণা কথা বাড়াল না। শুয়ে পড়ল। এ-ঘরেও নীলচে আলো জ্বলছে। থাক, নতুন জায়গায় রাতে ঘরে আলো থাকা ভালো। কেন একথা মনে হল জানি না। আমরা অনেক সময় বেড়াতে গিয়ে হোটেলে থেকেছি। কখনও তো আলো জ্বেলে শুইনি। আজ কি আমি অস্বস্তিতে আছি? অন্ধকার কেন ভালো লাগছে না আমার!

আলো জ্বালিয়েই শুয়ে পড়েছি। বাড়ির অন্য অধিবাসীদের সাড়াশব্দ নেই। ওরা খুব টায়ার্ড ফিল করছে নিশ্চয়। বাড়িতে পুরুষ মানুষ নেই? কাউকেই দেখলাম না। আচ্ছা আমরা কি এখানে দুদিন থেকে যাব? দেখি, কাল কেমন লাগে এখানকার এনভায়রনমেন্ট। ঘুম আসছে না। স্বাভাবিক। নতুন জায়গা বলে কথা। একটু অস্বস্তি হয়। চোখের উপর নীলচে আলোটা কেমন রহস্যময় লাগছে! আচ্ছা, বিষের রংকে নীল বলে কেন? অমৃত মন্থনের সময় যে বিষ উঠেছিল, মহাদেব সেটা গ্রহণ করেছিলেন বলে তাঁর কন্ঠ নীল হয়ে গিয়েছিল বিষের ধ্বকে।

ঘুম ভাঙল কর্ণার ডাকে—ওঠ, সকাল হয়ে গেছে। ওরা ডাকছেন। চা খাব কিনা জানতে চাইছিলেন।

ডাইনিং রুমের ছোট টেবিলের উপর সাজানো চা, বিস্কুট। চেয়ারে চুপচাপ বসে আছে দুই মহিলা। আমাদের দেখে হাসল জরি,—আসুন, ঘুম হয়েছিল?

আমি ঘাড় নাড়ি,—খুব ঘুমিয়েছি। বলতে বলতে চেয়ার টেনে বসি। জরি চা এগিয়ে দিল আমাদের। পোর্সিলিনের কাপ। হালকা, ফিনফিনে। সরু সোনালি বর্ডার দেওয়া। চায়ে চুমুক দিয়ে মন প্রফুল্ল হয়ে গেল। খুব ভালো চা। কর্ণা একটু চুপচাপ হয়ে আছে। মধ্যবয়সি মহিলা জরির মাসি। জরি কি মাসির কাছেই থাকে? ওর মা বাবা! বাড়ি কোথায় ওর? আমাদের দেখে জরির মাসি অল্প হাসলেন। কথা বললেন না।

এত প্রশ্ন একসাথে করিনি। কথা প্রসঙ্গে এসেছে। কিন্তু এর একটিরও যথার্থ জবাব যাকে বলে, তা পাইনি। ওরা দুজনেই কথা ঘুরিয়ে দিচ্ছিল। আমার প্রশ্নের জবাবে উলটে আমাদেরই প্রশ্ন করছিল। আমরা কারা, কোথায় থাকি, কে কে আছে বাড়িতে এসবই। প্রথমে খেয়াল করিনি। খেয়াল যখন করলাম, ওরা ততক্ষণে উঠে পড়েছে। আমাদের চা খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। জরি বলল, চলুন, আপনাদের ঘুরিয়ে আনি।

—আমিও সেটাই ভাবছিলাম। আসলে জায়গাটা দেখার জন্যই তো নেমে পড়েছি ট্রেন থেকে। এতক্ষণে কর্ণা স্বাভাবিক হয়েছে মনে হল।

সেইমতো আমরা বেরিয়ে পড়লাম। আমাদের সঙ্গে জরির মাসিও চললেন। ঘরে তালা চাবির কোনও ব্যবস্থা নেই। দরজাটা টেনে দিল জরি। সেই সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেলাম বাগানে। গোল গোল ছোট ছোট কচুপাতায় লাল সাদা রঙীন ছাপ। অজস্র ফুলে ভরা বাগান যেন রূপকথা।

কিন্তু এসে যে গন্ধটা পেয়েছিলাম, সেটা এখানে নেই। ঝিলমিল করছে রোদের আলো। মেঘের চিহ্ন নেই আকাশে। খুশি খুশি মনে আমরা চললাম। পরিষ্কার পরিছন্ন রাস্তা। সবখানেই ফুলের আড়ম্বর বড্ড বেশি। হলুদ প্রজাপতি উড়ে বেড়াচ্ছে ফুলে ফুলে মধু খেয়ে। মাঝে মাঝে বেঁটে বেঁটে বটগাছ। বনসাই নয়। উচ্চতা আমার পরিচিত গাছের থেকে কিছুটা কম যেন।

সেই গাছে টিয়ের ঝাঁক দেখে আনন্দে চমকে উঠেছে কর্ণা। আমার চোখ তখন বসন্তবৌরির দিকে। ওটা কী আমলকি গাছ? ওখানে বসে গা চুলকোচ্ছে চারটে কাঠবেড়ালি। একজন আবার বাদাম খাচ্ছে। হেঁটে হেঁটে আমরা গিয়ে পড়লাম এক প্রশস্ত জায়গায়। জায়গাটা এত সুন্দর যে ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে আমার। কর্ণার দিকে তাকিয়ে দেখি ওর তো চোখে পলক পড়ছে না।

একটা নীল জলের পুকুর। আকাশের ছায়া পড়েছে জলে। ঠিক পুকুর নয়, দীঘি বলা যায়। বাঁধানো ঘাট। রং-বেরঙি ফুলের সারি চলে গেছে দূর পর্যন্ত। নারকেল সুপুড়িও সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে। সেখানে দেখলাম কিছু নারী-পুরুষ। জনা পনেরো হবে। কেউ বসে, কেউ বা দাঁড়িয়ে। প্রত্যেকেই এই সকালেই বেশ পরিপাটি হয়ে সেজে গুজে আছে।

আশ্চর্য হলাম সবার সঙ্গে একটি দুটি করে ব্যাগ দেখে। যেন এখনই কোথাও যাচ্ছে এরা। মাঝে মাঝে মহিলারা ব্যাগ-ট্যাগগুলোকে টেনে কাছাকাছি রাখছে। পুরুষেরা ভারি উদ্বিগ্ন মুখে পায়চারি করছে। আমাদের দেখেও কারো কোনও চিত্তবৈকল্য ঘটল না। কেউ জানতে চাইল না— আপনারা কারা?

জরির মাসি দূরে একটি গাছের নীচে উপবিষ্টা মহিলার দিকে দ্রুত এগিয়ে গেলেন। নীচু স্বরে কী কথা হল এত দূর থেকে বুঝতে পারলাম না। কথা বলতে বলতে জরির মাসিমা চোখে আঁচল চাপা দিলেন। অন্য মহিলা মুখটা ছাই করে শূণ্য চোখে তাকিয়ে রইলেন। কী ব্যাপার কিছু বুঝলাম না। কর্ণা আমাকে কনুই দিয়ে খোঁচা দিল। আমি তাকাতেই ফিসফিস করল,— লক্ষ্য করো, এখানে কেউ কথা বলছে না!

সত্যি তো! কেউ কথা বলছে না! কেউ কারো দিকে তাকাচ্ছেও না! কী হয়েছে এদের? কোথায় যাবে এরা ব্যাগ-ট্যাগ নিয়ে? যাবে যদি তো এখানে কেন অপেক্ষা করছে?

কর্ণা আমার হাত চেপে ধরল—আমার ভালো লাগছে না। চলো, আমরা চলে যাই। গত রাতের কথা তোমাকে বলিনি। রাতে ভালো ঘুম হয়নি। অনেক পরে মনে হল কে যেন আমাদের ঘরের সামনে দিয়ে হেঁটে গেল। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম। না, কেউ কিন্তু ফিরে এল না!

অত রাতে কে গেল? কোথায় বা গেল? আমি উঠে দরজা অল্প ফাঁক করে দেখতে গেলাম। কাউকেই দেখা গেল না। ওদের ডাইনিং রুম ছায়া ছায়া হয়ে আছে। সেখানে কেউ ছিল না। কে চলে গেল? কে ছিল? কেউ কি বাথরুমে গেছে। তাহলে একটা সাড়াশব্দ থাকবে তো বল? ভয় করছিল বলে দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়লাম। কখন ঘুমিয়ে পড়েছি ...!

আমি কিছু বললাম না। গতরাতে আমারও একই এক্সপিরিয়েন্স হয়েছে। ঘুম আসছিল না। মনে হল কেউ হেঁটে চলে গেল ঘরের সামনে থেকে। কর্ণাকে দেখলাম তদন্ত করতে যাচ্ছে। একটু পরে ফিরে এল।

আমার মন ভারি অস্থির হয়েছিল। আমি উঠে দরজা খুলে ঘর থেকে বের হলাম। ম্লান চাঁদের আলো ছড়িয়ে আছে ঘরের ভেতরে। আসবাবের কিছুটা দেখা যাচ্ছে। সবটা নয়। এরা যেন জীবন্ত। লুকিয়ে আমাকে দেখছে।

আমি পা টিপে টিপে এদিক ওদিক ঘুরে দেখছি। বাইরে, বাগানের দিকে কেমন একটা অস্পষ্ট শব্দ পেলাম। সেদিকে সাবধানে যেতেই চমকে উঠেছি। দুটো মানুষ পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে বসে আছে! ছায়া ছায়া চাঁদের আলোয় তাদের পাথরের মূর্তি বলে মনে হচ্ছিল। জরি আর ওর মাসি। এখানে! এসময়ে? কী করছে এত রাতে?

সমস্ত সিচুয়েশনটাই এমন যে আমি নিঃসাড় হয়ে পড়ছি! এখানে এমন কিছু প্রবলেম আছে, যা আমার ধারণার বাইরে। আমার অবস্থা হল যেন আমি সচেতন পদার্থ মাত্র। ভেবে দেখলে দেখা যাবে এখানে ভয়ের কিছু নেই! হয়তো ওদের ঘুম আসছে না। যাকে স্টেশনে আনতে গিয়েছিল, সে আসেনি বলে মন খারাপ হয়ে আছে।

এই সময় হঠাৎই বাগানের গাছপালাগুলো ভীষণ ভাবে দুলে উঠল। সমবেত প্রার্থনা সঙ্গীতের মতো একসাথে শব্দ উঠল—হোওওওও! ডালপাতা নড়ে ওঠার শব্দ বোধহয়! যেন কারা বুক চাপড়ে হাহাকার করে উঠেছে।

তখনই কেঁদে উঠল জরি। সেই কান্নার শব্দ যে শুনেছে সে জানে কান্না কি মর্মান্তিক হতে পারে। কী করে ঘরে এসেছিলাম জানি না। এখানে অস্বাভাবিক কিছু চলছে ঠিক। আমার বুক কাঁপছিল।

—আজ, আজ চলে যাব। ভালোই লাগছে না। বাড়ির জন্য খুব মন খারাপ লাগছে। কর্ণা ভয় বিহ্বল গলায় কথা বলে।

আমিও ডিসিশন নিলাম। চলে যাব। সারাদিনে ট্রেন কখন আছে স্টেশনে গিয়ে জানতে হবে। এখন থাকলে এখনই যাব। এক সেকেন্ড আর এখানে নয়। ভারি অস্বস্তিকর জায়গা এটা। কর্ণাকে বললাম ব্যাগ নিয়ে বের হব বাড়ি থেকে। ট্রেন পেলেই!

ওদের কিছু বুঝতে দিলাম না। যেতে চাইলে আটকানোর প্রশ্ন নেই। কিন্তু রিস্ক নেব না। ছেলেটাকে মায়ের কাছে রেখে এসেছি। কেন যেন ওর মুখটা খুব টানছে আমাকে। কর্ণা মুখ গোঁজ করে আছে।

চটপট বাড়িতে ফিরলাম। জরি অবাক হল—খিদে পেয়েছে?

—আরে না। স্নান করব।

বাড়িতে ঢুকেই ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে এলাম। বের হতেই ওদের মুখোমুখি। আমি হেসে বললাম,—এবারে যাই। এখন অন্য জায়গায় যাব।

ওরা কিছুই বলল না। চুপ করে আমাদের চলে যাওয়া দেখছিল। এতক্ষণে হাঁপ ছাড়লাম। রাস্তায় নেমে কর্ণা বলল,—স্টেশনের রাস্তা চিনতে পারবে?

—কেন পারব না? সোজাসুজি এসেছি। মাঝে একটা মাঠ আছে মাত্র। বের হয়ে তো পড়ি!

অনেকটা হেঁটে হেঁটে আমরা কোনো স্টেশন খুঁজে পেলাম না। রাস্তায় একটা লোক নেই যাকে জিগ্যেস করা যায়। খাঁ খাঁ মাঠ পেলাম। এই মাঠকেই সেদিন চন্দ্রালোকিত রূপকথার মাঠ বলে মনে হচ্ছিল। যা হোক, মাঠ পাওয়া গেছে। মাঠ পেরিয়ে সোজাসুজি রাস্তাটা বন্ধুর। মনে আছে। সেই মতো এগিয়ে গিয়ে একটা সুনসান পরিত্যক্ত টিনের শেড দেওয়া লম্বা ঘর দেখে মনে হল এটা কি স্টেশন? সেদিন এরকম ছিল না তো! কোথায় গেল সেই স্টেশন?

কর্ণা বিমূঢ় হয়ে এদিক ওদিক দেখছিল। কী দেখে চেঁচিয়ে উঠল,—ওই যে দেখ, সেই বটগাছটা, বেদিতেই বসেছিলাম আমরা! বেদিটা ভাঙা! সেদিন কিন্তু...

কী ভগ্নদশা চারপাশে। এখানে নেমেছিলাম মুগ্ধ হয়ে? যাক, ট্রেন আসুক। বেদিতেই বসে থাকব সারাদিন যতক্ষণ না ট্রেন আসে।

সকাল কেটে বিকেল, বিকেল পেরিয়ে রাত নেমে এল। কোনও ট্রেন এল না। কিন্তু রাত বাড়তেই স্টেশনের ছবি পালটে যাচ্ছিল। জনহীন স্টেশনে এক মায়াবী আলো ছড়িয়ে পড়ল। কর্ণা বলল-অনেক রাত হয়েছে, এই সময়েই আমরা এখানে নেমেছিলাম। বলতেই দূরে ট্রেনের আওয়াজ পেলাম। আমরা ব্যাগ ট্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম।

ট্রেন আসছে। শব্দটা খুব কাছে এগিয়ে আসছে। ডট কম ডট কম শব্দে ট্রেনটা থেমে যাওয়ার শব্দ পাচ্ছি। কিন্তু কোথায় ট্রেন? কিছুই তো নেই! আরে, ট্রেন চলে যাচ্ছে শুনতে পাচ্ছি! কী কান্ড! ট্রেনের বাঁশির আওয়াজ পাচ্ছি! আমরা ট্রেন পাব না? ছুটোছুটি করতে লাগলাম আমরা দুজন। আমি চিৎকার করে উঠলাম—কর্ণা কর্ণা! ট্রেন চলে গেল

চলে আসুন, এখানে আর কখনও ট্রেন থামবে না। নামলেই হল। যেতে পারবেন না। জরি এসে দাঁড়িয়েছে আমাদের পেছনে কতদিন হয়ে গেল আমরা ফিরতে পারছি না। যে নামে, সে আর ফিরে যেতে পারে না কখনও। কিন্তু সবাই যেতে চায়। বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে সব যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায় এখানে এলেই। চলুন। আপনাদের ঘর ঠিক করে রেখেছি। এখানে কে বা কারা ঘর বানিয়ে রেখেছে জানি না! আমরা কি স্বপ্ন দেখছি? কোথায় আছি? কিচ্ছু বুঝি না! জানি না! এক গাড়ি লোকের থেকে দু, একজনকে বেছে নেয় এই জায়গাটা। এবারে আপনাদের বেছে নিয়েছে এটা একটা মৃত্যু উপত্যকা!

সে রাতে মরা চাঁদের আলোয় ভিজে ভিজে আমরা পাথর হয়ে বসে থাকলাম। কর্ণা মানতে চাইছে না। ও পাগলের মতো কেঁদে চলেছে। আমার কিছু করার নেই। জরি, জরির মাসি ম্লান হেসেছে, কাঁদতে দিন। ফিরতে সবাই চায়। ট্রেন আসার অপেক্ষায় আছি সবাই। কিন্তু আজও ট্রেন আসেনি। ফিরব কী করে?

মানে? আমরা কি মরে গেছি? মৃত্যুর পর কি এরকমই হয়? আমি বিহ্বল হয়ে যাই। আমাদের বাড়ি! আমাদের ছেলে? আমাদের স্বজনেরা...?

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%