ভয়

সাগরিকা রায়

অনিন্দ্যর কথা থেকে একটা কথা স্পষ্ট হয়ে গেল। মুখে যতই অবিশ্বাস দেখাক না কেন, ভেতরে ভেতরে ও তাহলে বিশ্বাস করে অন্য জগতের অস্তিত্বে?

'আমি একবার ভীষণ ভয় পেয়েছিলাম। জীবনে একবার ওইরকম ভয় পেয়েছিলাম। আজও যদি সেকথা মনে পড়ে আমার বুকের ভেতরের সমস্ত সাহস-টাহস হাওয়ায় উড়ে যায়। আমার জীবনে প্রথমবার এই ঘটনা ঘটে আট বছর বয়সে। স্কুলে যাচ্ছি, বড় রাস্তা মানে মেইন রোড পর্যন্ত যেতেই দেখি, আমার ক্লাসমেট সুদীপ্ত ভাদুড়ি ওর বাবার সাইকেলের পেছনে চেপে স্কুলে যাচ্ছে। ও চেঁচাল আমার নাম ধরে। আমিও স্কুলে যাচ্ছি। একটু পরেই দেখা হবে।

যেতে যেতে একটু অন্যমনস্ক হয়েছি, রাধাচূড়া গাছটার কাছাকাছি আসতেই লোকটাকে দেখলাম হজমিওলার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। আমাকেই দেখছিল লোকটা। কোঁচকানো জামা-প্যান্ট, যেন দলা পাকিয়ে হাঁড়ির মধ্যে ঢুকিয়ে রেখেছিল মাসখানেক। কিন্তু সেসব নয়, আমাকে আতঙ্কিত করেছিল লোকটার চোখ দুটো! সাপের চোখ দেখেছ কখনও? সে যে কী ক্রুর...কী নিষ্ঠুর...ভয়ংকর। সমস্ত শরীর থেকে যেন সরীসৃপের গায়ের গন্ধ বের হচ্ছে। আমার মনে হল লোকটা ছেলেধরা।

ছেলেবেলায় ছেলেধরা শব্দটার সঙ্গে খুবই পরিচিত ছিলাম আমরা। কতরকম ঘটনা শুনতাম। বাচ্চাদের ধরে নিয়ে ন্যুব্জ প্রতিবন্ধী বানিয়ে পথেঘাটে ভিক্ষে করায় ছেলেধরারা। ভিক্ষের পয়সা নিজেরা নিয়ে নেয়। একেবারে শিশুদের নিয়ে ছোট ছোট মাটির হাঁড়িতে বসিয়ে রাখে। তাদের চলতে ফিরতে দেওয়া হয় না। হাত-পায়ের বৃদ্ধি হত না। মাথাটা হয়ে ওঠে বিশাল। সেই ভয়ংকর চেহারা দেখে মানুষের ভয় হয়, করুণা হয়। ভিক্ষে দেয় মানুষ। এইসব শুনে একটা আতঙ্ক ছিলই। লোকটিকে দেখে তা আরও বাড়ল। দিলাম দৌড়। দৌড়তে দৌড়তে বিদ্যাজ্যোতি পুস্তকালয় পর্যন্ত পৌঁছে গেছি।

অভিষেক আর প্রমিথিউস-এর সঙ্গে দেখা। আমাকে ওভাবে দৌড়তে দেখে ওরা দাঁড়িয়ে পড়েছিল। সাহস পেয়ে ওদের কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখি লোকটার চিহ্নমাত্র নেই। নিজের ওপর রাগ হল! একটা লোককে দেখে এতটা পথ এভাবে পাগলের মতো দৌড়ে আসার কোনও মানে হয়!

অভিষেক অবশ্য জানাল যে, 'এইরকম লোকগুলো সত্যি সত্যি ছেলেধরা। নিশ্চয় তোকে রোজ ফলো করে। সাবধান থাকিস।' ব্যস! ওর কথা শুনে তো আমার হয়ে গেল। দিনচারেক স্কুলে গেলাম না। পেটে ব্যথা...হ্যানতান বলে কাটাই। কিন্তু পঞ্চম দিনের দিন যেতে হল স্কুলে। সেই রাধাচূড়া গাছের কাছাকাছি এসে ভয়ে ভয়ে হজমিওলার দিকে তাকাই না। কেউ নেই। বাপরে! বাঁচলাম!

আরামের শ্বাস ফেললেও পুরোপুরি স্বস্তি ছিল না। কে জানে লোকটা আশপাশে কোথাও লুকিয়ে আছে কিনা। কোথাও লোকটার অস্তিত্ব আছে ভেবে চারপাশ দেখতে দেখতে যাচ্ছি। এভাবে দুটো দিন কেটে গেল। তারপর আর লোকটার কথা আমার মনে রইল না। মানে, ভেবেছিলাম তাই। কিন্তু অবচেতন মনে লোকটার চোখদুটো আটকে গিয়েছিল। এরপর দ্বিতীয়বার লোকটাকে দেখি একটা বিয়ে বাড়িতে। বিয়েবাড়ির হই চই-এর মধ্যে এক কোণে দাঁড়িয়ে মন দিয়ে লোকজন দেখছিল লোকটা।

তখন আমার বয়স সতেরো-আঠেরো। লোকটার দিকে কেন যে নজর গেল! দেখি ভিড়ের ভেতরে দাঁড়িয়ে আমার দিকে স্থির দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে আছে লোকটা। সেই ভীষণ নিষ্ঠুর...ক্রুর দৃষ্টি। সাপের মতো। হিম! আমার সমস্ত শরীর ঝিমঝিম করে উঠল। মুহূর্তে সেই হজমিওলা...রাধাচূড়া গাছ সমস্ত যেন ভেসে উঠল আমার চোখের সামনে।

কতক্ষণ যে লোকটার দিকে তাকিয়েছিলাম! সম্বিত ফিরতে দেখি লোকটা নেই। এদিক ওদিক তাকিয়েও লোকটাকে পেলাম না। লুকিয়ে লুকিয়ে খুঁজছি, এত তাড়াতাড়ি লোকটা যে কোথায় গেল। তন্নতন্ন করে খুঁজেও লোকটাকে কোথাও পেলাম না।'

'আচ্ছা অনিন্দ্য, এই লোকটাকে তুমি মোট দুবার দেখলে! ওকে দেখার পর তোমার জীবনে কোনও অঘটন কি ঘটেছিল?' আমি প্রশ্নটা করাতে ভাবল না অনিন্দ্য। মাথা নাড়ল। 'না! আমারও ধারণা ছিল যে, এইরকম সাংঘাতিক মানুষকে দেখে ফেলাটা আমার জীবনে একটা দুর্ঘটনা। ও ঠিক আমার কোন ক্ষতি করতে এসেছে। ওর দেখা পাওয়াটা নিশ্চয়ই অশুভ! কিন্তু সেই আটবছর বয়সে, বা সতেরো-আঠেরো বছর বয়সেও কিছু ঘটল না। আমি ফেরি ভুলে গেলাম লোকটিকে!'

'দ্বিতীয়বার ও কী পোশাক পরেছিল?' তথাগত জানতে চায়। 'এই একটা ভালো প্রশ্ন করেছ। ঠিক সেই পোশাক যেন ছিল লোকটির গায়ে। সেই কোঁচকানো খয়েরি রঙের শার্ট! আমার ভালো করে মনে আছে। একটুও ভুলিনি!' অনিন্দ্য জোর গলায় নিজেকেই জানায় যেন।

অবাক হওয়ারই কথা। এতবছর ধরে লোকটা একই পোশাক পরে আছে। অনিন্দ্য ছোট ছিল বলে পোশাকটা লক্ষ্য করেনি। দ্বিতীয়বারের পোশাকটাই ওর মনে আছে। এটাই ঠিক! ওকে বললে খেপে যাবে, গল্পটাই ভেস্তে যাবে ভেবে ঘাঁটালাম না! অনিন্দ্য অস্থিরভাবে পায়চারি করছিল। ওর পায়ের ধাক্কায় ছোট পাথর ছিটকে পড়ল জলে।

'তারপর কী হল?'

অনিন্দ্য বোধহয় আমার প্রশ্নটা শুনতে পায়নি। অথবা শুনেছে, কিন্তু অন্য ভাবনায় আটকে আছে বলে জবাব দিতে ভুলে গেছে। আমরা ওকে বুঝতে পারছিলাম, বা বুঝতে চেষ্টা করছিলাম। তাই, ওকে সময় দিচ্ছিলাম। একটু পরেই ও সমে ফিরবে। এরকমটাই তো হয়। হয়ে থাকে।

একসময় অনিন্দ্য গিয়ে একটা বড় পাথরের ওপর বসে পড়ল। পায়ের কাছে সবুজ জল। তিস্তার বুকে পাহাড় আর জঙ্গলের ছায়া পড়েছে। অনিন্দ্য যেন অনেক দূর থেকে কথা বলছিল, 'শেষবার লোকটাকে দেখেছি বছরখানেক আগে। মাদ্রাজে যাব। ট্রেনে উঠেছি। মনে হল সেই লোকটাকে দেখলাম যেন। ভীষণ চমকে তাড়াতাড়ি নেমে এলাম। গেল কোথায় লোকটা? এইমাত্র জানালার পাশ দিয়ে সরে যেতে দেখলাম যেন! খোঁজাখুঁজি হল। কিন্তু অন্যান্যবারের মতো তাকে পেলাম না। ভাবলাম ব্যাপারটা হাস্যকর। একটা লোক হঠাৎ আমার পিছু নেবে কেন? বিশেষ করে অন্যান্য দিনগুলোতে সে আসেনি। যেদিন দেখেছি তা নেহাতই চোখের দেখা। হয়তো লোকটার চোখের দৃষ্টিটাই ওইরকম। চেহারা দেখে কি মানুষ চেনা যায়?

এইসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে আমি ড্রাইভারের কেবিন পর্যন্ত গেছি। আর তখনই বিস্ফোরণটা হল আমার ব্রেনের মধ্যে। সেই লোকটা সেই ট্রেনের ড্রাইভার! আমি বিস্ময়ে প্রথমে হতবাক হয়ে গেলাম। হাঁ করে লোকটার দিকে তাকিয়ে আছি। বাঁশি বাজতেই চমকে তাকিয়ে দেখি অন্য একজন ড্রাইভারের কেবিনে বসেছে। তাহলে ওই লোকটি কোথায় গেল?

কী যে হল জানি না! আমার মন বলছিল ভালো হচ্ছে না ব্যাপারটা! কোথাও যেন কিছু গণ্ডগোল আছে! নিজের কামরায় গেছি। বসেছি! হঠাৎ করে ভীষণ আতঙ্ক তাড়া করে উঠল। আমার লাগেজ টেনে নিয়ে ঝট করে নেমে পড়লাম ট্রেন থেকে।'

'সেই ট্রেনটা অ্যাকসিডেন্ট করেছিল নাকি?' তথাগত জানতে চায়! 'ট্রেনের দুটো কামরায় আগুন লেগে। বহু মানুষ পুড়ে শেষ হয়ে গিয়েছিল। হকারের ষ্টোভ থেকে আগুন লেগেছিল কাগজে পড়েছিলাম।'

থামে অনিন্দ্য। আমাদের মুখগুলো একবার দেখে নেয় ও। 'জানি না কেন লোকটা সেই ছেলেবেলা থেকে আমাকে টার্গেট করে রেখেছে! এবার পারল না। ও কি আবার চেষ্টা করবে?' 'এভাবে ভাবছ কেন? ভালোটা ভাবো! লোকটা...জানি না কে, কী তার পরিচয়, কী উদ্দেশ্য তার তোমাকে বারবার দেখা দেওয়ার। কিন্তু ওকে আগেও দেখেছ বলেই তো তুমি সেদিন ট্রেন থেকে নেমে পড়েছ। নাহলে তো নামতে না। লোকটা তোমাকে সাবধান করছে এটাই তো ঠিক!'

জানি না! কেনই বা আমাকে রক্ষা করবে ও? কীসের টান ওর আমার প্রতি? সাতজন্ম আমি ওকে কখনও দেখিনি। আমার চেনা পরিচিত, আত্মীয় স্বজন কেউ নয় ও!—এত লোক থাকতে কেন ও...?' বিষয়টি ভাবার মতো। এবং বলা যায় আতঙ্কিত হওয়ার মতো। চারপাশে নিঝুম, বন-পাহাড়, তার মাঝে অনিন্দ্যর বিদঘুটে লোকরা....সব মিলিয়ে যথেষ্ট ছমছমে পরিবেশ। তাছাড়া, অনিন্দ্যর কাহিনিতে ভয় তো আছেই। সেই ছেলেবেলা থেকে একটা ভয় ওকে তাড়া করে আসছে। কত অদ্ভূত ঘটনা ছড়িয়ে আছে মানুষের জীবনে।

'সবচেয়ে অবাক কাণ্ড কি জানো?' অনিন্দ্য অদ্ভূতভাবে হাসছিল, 'আমার মায়ের জীবনেও এইরকম একটা ঘটনা আছে। মায়ের মেজো কাকা, তিনি অধুনা বাংলাদেশে মানে অবিভক্ত ভারতের পূর্ববঙ্গে থাকতেন। মায়ের জন্ম সেখানেই। আমার দিদিমার তিনটি ছেলে। মানে, আমার তিন মামা। মাসি নেই। দিদিমার শ্বশুড়বাড়িতে কাকা, জ্যাঠা সবারই ঘরে পুত্রসন্তানের রমরমা। কন্যা সন্তানের বড়োই অভাব। তো, স্বাভাবিকভাবে একটি কন্যার জন্য বাড়িশুদ্ধ লোক হন্যে হয়ে রয়েছেন। সেই সময় আমার জন্ম।

মায়ের নাম পুতুল। মায়ের মেজোকাকা নাম রেখেছিলেন ''সোনার পুত্তলি।'' তো, ওইরকম নাম তো আর থাকে না। ছোট হতে হতে শেষ পর্যন্ত পুতুল-এ গিয়ে ঠেকল। তো বুঝতেই পারছ সোনার পুত্তলির আদর কীরকম ছিল সে বাড়িতে। বিশেষ করে মেজোকাকা যেন উন্মাদ হয়ে গেলেন। সারাক্ষণ মা-কে নিয়ে থাকেন। দিদিমাও নিশ্চিন্ত।

মেজোকাকা আবার সাধু প্রকৃতির লোক ছিলেন। তিনি মায়ের ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন, 'ওই মেয়ে এদেশে থাকবে না দেখো।' শুনে সবাই ভেবেছিল মা হয়তো বিলেত যাবে। আসলে কাকা ওই কথার মধ্য দিয়ে হয়তো বা দেশত্যাগের কথাই বলে ফেলেছিলেন।

মা তখন এক বছরের শিশু। দেশভাগ হল। মা ভারতে চলে এল কিন্তু মেজোকাকা, বড়কাকা ওরা রয়ে গেলেন ওই দেশে। কথা হয়েছিল যে, সম্পত্তি-টম্পত্তি যদি বিক্রি করতে পারেন, সে চেষ্টা করবেন। তারপর তাঁরাও ভারতে চলে আসবেন। আমার দাদু, দিদিমা আর মা, মামারা সব এদেশে চলে এলেন। এসে তো বহুৎ ঝামেলার মধ্যে পড়লেন। কোথায় থাকবেন, কী করবেন কিছুই ঠিক নেই। সে সব অন্য কাহিনি। ধীরে ওঁরা সেটল হলেন।

একদিন বড়কাকাও চলে এলেন। যা পেয়েছেন বিক্রিবাটা করে চলে এলেন তিনি। মেজোকাকা আর এলেন না। তিনি জানালেন, 'এই বাড়ি তাঁর বাপ-ঠাকুর্দার বাড়ি। এই বাড়ি ছাইড়া যামু না,' একবার এসেছিলেন এদেশে। মাকে দেখতে। দিদিমা ভীষণ অবাক হয়েছিলেন সেদিন। মেজোকাকা মায়ের হাতে একজোড়া সোনার বালা পরিয়ে দিয়েছিলেন, 'তর বিয়ার লাইগ্যা আনছি'।

মায়ের বয়স তখন ছয় বছর। সেই শেষবার মায়ের সঙ্গে মেজোকাকার দেখা হল। তিনি চলে গেলেন। তারপর মাস-সাতেক পর খবর এল মেজোকাকা মারা গেছেন। কী হয়েছিল জানা যায়নি। মা শুনেছিল খবরটা। কিন্তু বয়সটা কম বলে বিশেষ রেখাপাত করেনি। তাছাড়া মানে কিছু বছর দূরে থাকার জন্য যোগাযোগটা ক্ষীণ হয়ে এসেছিল মায়ের মনে। বা, হয়তো সেভাবে ছিলই না! ছোটদের যেমনটা হয় আর কি!

প্রথম ঘটনা ঘটে মায়ের টাইফয়েড-এর সময়। তখন মায়ের বয়স পনের বছর। 'ডাক্তার-ওষুধে ঘর ভরা' অবস্থা চলছে। একদিন রাতে মা দেখল কে একজন মন দিয়ে ওষুধ তৈরি করছে। 'খল' দেখেছ? পাথরের তৈরি ওষুধ গুঁড়ো করার ছোট পাত্র? ওইরকম খল-এর মধ্যে ডলে ডলে ওষুধ তৈরি করছে কেউ। তন্দ্রাচ্ছন্ন এবং অসুস্থ মা ওষুধ প্রস্তুতকারককে চিনতে পারল না। ঘুমঘোরে মা বুঝল তাকে ওষুধ খাওয়ানো হচ্ছে। এগুলো স্বপ্ন হিসেবে স্বীকৃতি পেয়ে যেত। যে শুনত সে-ই তাই ভাবত।

অদ্ভুত এবং অসাধারণ ঘটনাটি হল অন্যখানে। পরদিন থেকে মা দ্রুত আরোগ্য হল। বলতে গেলে পরদিনই মা-র জ্বর কমে গেল। সবাই, এমনকী ডাক্তারবাবু পর্যন্ত অবাক। মা বলেছিল ঘটনা। একজন যখন তাকে ওষুধ বেটে খাইয়ে দিয়েছে তখনই শরীরটা অনেক ভালো লাগছিল। কে মা-কে ওষুধ খাইয়েছিল? কেউ জানে না। অথচ মা স্পষ্ট দেখেছে।

বেশ কয়েকবছর পরের ঘটনা। মা ট্রেনে চেপে যাচ্ছে। ট্রেনের জানালার পাশে বসেছে। গাড়ির দুলুনিতে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছে। হঠাৎ মা-র মনে হল কেউ যেন মা-কে ডাকছে 'ওঠ'! সোনার পুত্তলি! ওঠ।' মা-র ঘুমটা ভেঙে গেল। চমকে তাকিয়ে দেখে একজন ফেরিঅলা 'পেন' বিক্রি করার জন্য হাঁকছে। পুরো ব্যাপারটা কি স্বপ্ন? মা একটু থতমত খেয়ে উঠে জল খেল। বাথরুমে গেল চোখে-মুখে জল দিতে। আর ঠিক তখনই মা যেখানে বসেছিল সেখানে এতবড় একখানা ঢিল এসে পড়ল। মা যদি সে সময় সেখানে বসে থাকত তাহলে অবশ্যই মা-র মাথা ফাটত। কে মাকে বাঁচাল?

পরে মা-র কাছে এই ঘটনা শুনেছিলাম। মা নিজেও ঘটনার তল খুঁজে পায়নি। বলেছিল 'বিশ্বাস হয় না! স্পষ্ট শুনেছি ডাক। সোনার পুত্তলি, ওঠ। আমার এইনাম অন্য কেউ জানে না। আমার অবচেতন থেকে কি এই নাম উঠে এসেছে?' এরপরে আরও তিনবার মা এই অজানা বন্ধুর সাহায্য পেয়েছে। প্রথমবার মা-র বিয়ের সময়। দ্বিতীয়বার আমার জন্মের সময়। আর তৃতীয়বার আমার বাবার এক বিপদের সময়।

আমার দিদিমা বলেছিলেন, এই অজানা বন্ধু আর কেউ নয়, আমার মেজো দেওর। তোর মেজোকাকা। সে ছাড়া আর কেউ তোকে সোনার পুত্তলি বলে ডাকত না!' মা খুব কষ্ট পেয়েছিলেন শুনে। কতটা টান থাকলে একজন মানুষ তার মায়ায় গত জন্মের রোদ, বৃষ্টি, সম্পর্ক... কাউকে ভোলে না! একেই বলে টান।

ইদানীং মা খুব নিশ্চিত বোধ করে। বলে, যখনই কোনও বিপদে পড়বি, মেজোকাকাকে স্মরণ করিস! যদিও সম্পর্কে 'দাদু' হন, কিন্তু আমরা ছোট থেকেই মায়ের মুখে মেজোকাকা, মেজকাকা, শুনে তাঁকে 'মেজোকাকা' বলতে শিখেছি। একটা ঘটনা হল, কখন যেন আমার মনেও একটা শক্তির সৃষ্টি হয়েছে। যাকে ভরসাও বলা যায়। যখন যেখানে থাকি, মনে জোর আছে যে মেজোকাকা আছেন। কোনও ঝামেলায় পড়লেও অসুবিধে হবে না!'

অনিন্দ্য হাসছিল। একটা গভীর প্রত্যয় ওর চোখে মুখে বিচ্ছুরিত হচ্ছিল। স্বজনকে কাছে পাওয়ার মধ্য দিয়ে যে ভরসা সৃষ্টি হয় তার মধ্যে আনন্দ তো আছেই। আমার জ্যাঠামশাই এইরকম ঘটনার কথা বলেছিলেন। বাবার মৃত্যুর সময় জ্যাঠামশাই কাছে ছিলেন না। মৃত্যুর খবর তাঁকে দেওয়া হল। তিনি আসছেন। সারা রাস্তা জেগে আছেন। জেঠিমা ঘুমিয়ে পড়েছেন। জ্যাঠামশাই-এর কেমন যেন অস্বস্তি হল। মনে হল উঠে দাঁড়িয়ে একটু পায়চারি করবেন। ইচ্ছেটা এতটাই জোরদার হল যে তিনি সত্যিই উঠলেন। উঠে দাঁড়িয়ে কামরার মধ্যে ধীরে ধীরে পায়চারি করতে লাগলেন। ওপর থেকে ভারী সুটকেশ গড়িয়ে পড়েছিল তাঁর বসার জায়গায়। যে কেউ ওখানে থাকলে আহত হতেন।

জ্যাঠামশাই ঘটনার অসাধারণত্বে যথার্থ স্তম্ভিত হয়েছিলেন। কীসের অস্বস্তি তাঁকে ওখান থেকে উঠে যেতে বাধ্য করেছিল? তাঁর বিশ্বাস ছিল যে সদ্য মৃত ভাই তাঁকে বাঁচিয়েছেন। এইসব বিশ্বাসের প্রমাণ হল তার অনুভূতি, উপলব্ধি। যাকে কোনও পরীক্ষা নিরীক্ষা দিয়ে প্রমাণ করা যায় না।

অনিন্দ্য গরম চা ঢেলে দিচ্ছিল আমাদের। বেলা গড়িয়ে গেছে অনেকক্ষণ। এখন ফিরতে হবে। তাড়াতাড়ি চা শেষ করছি, অনিন্দ্য হাসল হঠাৎ' 'সেই লোকটা আমার জীবনে একটা দুঃস্বপ্ন! যখনই মনে পড়ে, একঘর লোকের মধ্যেও শিরশির করে ওঠে বুকটা। মনে কর, নির্জন কোনও রাস্তা দিয়ে হাঁটছি বা বাড়িতে কেউ নেই! আমি বাড়িতে ঢুকছি তখন... আমার মনে হয় সেই লোকটা আমার পেছনে হেঁটে আসছে। অত্যন্ত নিঃশব্দে হাঁটে সে। সরীসৃপের মতো। কোনও শব্দ হয় না হাঁটার সময়।

যে-কোনও দিন হয়তো আমার ধারণাটা সত্যি হবে। হয়তো পেছন থেকে সেই, ক্রুর ভয়াল সরীসৃপ আমার সামনে এসে দাঁড়াবে।' সত্যি কি তাই? জানি না! আমরা কেউ জানি না অনিন্দ্যর কথাগুলো সত্যি হবে কিনা। কিন্তু এই পাহাড়, বন আর নদীর নির্জনতায়, থম মেরে যাওয়া প্রকৃতির মধ্যে মনে হল হয়তো তাই! হয়তো সে সুযোগ খুঁজছে! একদিন... হঠাৎ...!

সেবকের কালীবাড়িতে ঘণ্টা বাজছে। সন্ধে হয়ে এল বলে। আমরা দ্রুত পাহাড়ের ধাপ ভাঙছি! নির্জন পাহাড়ে একরকম শব্দ হয়। ঝিমি ঝিমি...ঝুন ঝুন। কোথা থেকে কোনও নিশাচরের শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দ ভেসে আসছে বাতাসে। বাতাস ক্রমশ হিমেল হয়ে উঠছে। পাহাড়ের গায়ে কুয়াশা গাঢ় হয়ে উঠেছে। রহস্যময় তার রূপ! এখন যদি কুয়াশা ভেদ করে সেই লোকটি বেরিয়ে আসে?

যাঃ! হাসি পেল! এত তাড়াতাড়ি ভয় পেতে পারি, বয়সটা তো সেই কচিতে আটকে নেই! তবু, ভয় আমাদের সবার মধ্যে আছে। আসলে, রহস্যময়তা একরকম ভয়। যাকে বুঝতে পারছি না। রহস্য ভেদ করতে পারছি না তাকে ভয় যে করতেই হবে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%