আনন্দধামে আলোড়ন

গৌতম দাশ

ফোনটা তুলতেই অপর প্রান্ত থেকে মৃগাঙ্ক মৌলিকের গলা ভেসে এল।

‘গুডমর্নিং স্যার। সন্ধ্যের দিকে হাতে খানিকক্ষণ সময় হবে? যেতাম একটু।’

অংশুমান হেসে বললেন, ‘মর্নিং। কিন্তু আপনি এত বিনয় করে বলছেন কেন? আমার পর্ণকুটিরের দরজা তো আপনার জন্য সবসময়েই অবারিত মৃগাঙ্কবাবু।’

‘আসলে একটু ইয়েমতো ব্যাপার আছে। সামনাসামনি বলা দরকার। তাহলে ওই কথাই রইল।’

‘ঠিক আছে। সন্ধ্যে সাতটা নাগাদ চলে আসুন।’

সন্ধ্যেবেলায় মৃগাঙ্কবাবু এলেন। অভ্যর্থনা করে বসিয়ে অংশুমানবাবু বললেন, ‘আপনি কিন্তু সাতাশ মিনিট লেট করে ফেলেছেন। আমি তো প্রায় ভাবতে শুরু করেছিলাম যে, আপনি বোধ হয় আজ আর এলেন না।’

মৃগাঙ্কবাবু বললেন, ‘আর পারি না মশাই। লোডশেডিং-এর কল্যাণে রাস্তাঘাট অনেক জায়গাতেই ঘুটঘুটে অন্ধকার। অনেক কষ্টে সাইকেলে—আচ্ছা, এই লোডশেডিং রোগটা তো বেশ পুরোনো। এটাকে সারানো গেল না কিছুতেই!’

অংশুমানবাবু বললেন, ‘চেষ্টা চলছে বলেই তো শুনি। কিন্তু হয়ে উঠছে না আর কী! তা ছাড়া জনগণ তো এতে মোটামুটি অভ্যস্ত হয়ে গেছে। বিকল্প অনেকরকম ব্যবস্থাও হয়ে গেছে। তবে আশাকরি আপনি নিশ্চয়ই লোডশেডিং-এর সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতে আসেননি। ও বেলা বললেন যে একটা ইয়েমতো ব্যাপার আছে।’

মৃগাঙ্কবাবু বললেন, আরে সেটা বলার জন্যই তো আসা। মন দিয়ে শুনবেন। আমার এক মাসিমার বাড়ি হুগলি জেলার বয়ড়া নামে একটা জায়গায়। ব্যাণ্ডেল-বর্ধমান লাইনে ব্যাণ্ডেল থেকে চতুর্থ স্টেশন হচ্ছে খন্যান। ওখানে নামতে হবে। স্টেশনের কাছেই উত্তর-দক্ষিণে জি টি রোড। জি টি রোড ধরে দক্ষিণ দিকে সোজা সাড়ে তিন-চার কিলোমিটার গেলেই রাস্তার পাশেই বাঁ-দিকে বয়ড়া গ্রাম।

আমার মেসোমশাইয়ের নাম সতীকান্ত নিয়োগী। ওঁরা ওখানকার আদি বাসিন্দা। ইটভাঁটা, কাঠের ব্যাবসা, বেশ কিছু জমিজমা পুকুর-টুকুর মিলিয়ে বেশ জমজমাট অবস্থা। মেসোমশাইয়ের দুই ছেলে। বড়ো অঞ্জন— ব্যাঙ্কে চাকরি করে। সংসারের ব্যাপারে মাথা ঘামানোর সময় পায় না—ঘামায়ও না। মেসোমশাইয়ের বয়স হয়েছে—প্রায় আশির কাছাকাছি হল বোধ হয় অনেকদিন ধরেই জমিজমা এবং ব্যাবসা দুটোই ছোটো ছেলে উজ্জ্বলের হাতে ছেড়ে দিয়েছেন। সংসারের হাল এখন পুরোপুরি উজ্জ্বলের হাতে। উজ্জ্বল অবিশ্যি ভালোই চালায়। অঞ্জন বয়সে আমার চেয়ে বছরদুয়েকের ছোটো। উজ্জ্বল বছর চারেকের।

আজ সকালে উজ্জ্বলের একটা ফোন পেলাম। আজকেই সকালবেলা ওদের বাড়ির মন্দির থেকে উজ্জ্বল একটা কাগজের প্যাকেট পেয়েছে। সেই প্যাকেটার মধ্যে আরও কয়েকটা ছোটো-ছোটো পলিথিনের প্যাকেট আছে। সেগুলোর মধ্যে সাদা এবং বাদামি কিছু গুঁড়ো প্যাক করা আছে। সম্ভবত ড্রাগজাতীয় বস্তু। অথচ ওরা কেউ ব্যাপারটার বিন্দুবিসর্গও জানে না। ব্যাপারটা কাউকে বলাও যাচ্ছে না। পুলিশকে তো নয়ই। বললে পুলিশ হয়তো উলটে ওদেরই চাপ দেবে। জিনিসটা তো ওদের বাড়িতেই পাওয়া গেছে। হতে পারে বাইরে থেকে কেউ হয়তো ওদের ফাঁসাতে চাইছে। উজ্জ্বল বেশ ভয় পেয়ে গিয়েছে। আমার পরামর্শ চাইছিল।

ব্যাপারটা জানতে পারার পর আমার আপনার কথাই প্রথম মনে হল। সত্যি কথা বলতে কী মশাই, এখন রহস্যময় ব্যাপার দেখলেই আমার আপনার কথাই মনে হয়। আমি উজ্জ্বলকে পরে ফোন করে আপনার কথা জানালাম। ও আপনাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য খুব করে ধরেছে। আপনি যেন স্যার, ‘না’ বলবেন না। উজ্জ্বল অবিশ্যি আপনাকে ফোন করবে। আমি বলেছি আটটা নাগাদ ফোন করতে। এই তো আর মিনিটদশেক বাদেই করার কথা।

চা খেতে-খেতেই উজ্জ্বল নিয়োগীর ফোনটা এল। যাওয়ার জন্য সনির্বন্ধ অনুরোধ জানালেন ভদ্রলোক। অংশুমানবাবু প্রথমটা এড়িয়ে যাওয়ারই চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু শেষপর্যন্ত পারলেন না। মৃগাঙ্কবাবুর মুখ চেয়ে যেতে রাজি হয়ে গেলেন।

পরদিন জি টি রোড থেকে বয়ড়ায় ঢোকার রাস্তার মোড়ে যখন মৃগাঙ্কবাবু আর অংশুমানবাবু বাস থেকে নামলেন, ঘড়িতে তখন ন-টা কুড়ি। উজ্জ্বলবাবু ওখানে দাঁড়িয়েছিলেন। প্রাথমিক পরিচয়ের পর উজ্জ্বলবাবু বললেন, ‘আপনাকে দেখে মনে একটু জোর পাচ্ছি স্যার। মৃগাঙ্কদার কাছে আপনার সম্পর্কে অনেক কথা শুনলাম। আসুন।...এই রাস্তাটা ধরে সামান্য একটু এগোলেই আমাদের বাড়ি।...আমাদের গ্রামে ঢোকার দুটো রাস্তা। আসলে দুটো ঠিক নয়, রাস্তা একটাই—রাস্তাটা ইংরেজি ‘‘ইউ’’ অক্ষরের মতো। একদিক দিয়ে ঢুকে আবার ঘুরে সিকি কিলোমিটার দূরে এসে জি টি রোডেই মিশেছে। গ্রামের বাড়িগুলো রাস্তাটার দু-পাশে।’

অংশুমানবাবু দেখলেন, রাস্তাটার শুরুতেই জি টি রোডের পাশেই ছোট্ট একটা পোস্ট অফিস। সামনে একটা সাইনবোর্ড ঝোলানো—বয়ড়া ডাকঘর, রথতলা। কয়েকটা ছোটো-মাঝারি দোকান। এগুলোকে পাশ কাটিয়ে এবড়োখেবড়ো খোয়াওঠা রাস্তাটা সোজা উত্তরদিকে চলে গেছে।

মৃগাঙ্কবাবু বললেন, ‘রথযাত্রা উৎসবটা এখানে বেশ জাঁকিয়েই হয়। রথযাত্রা শুরু হয় উজ্জ্বলদের বাড়ি থেকেই। সারাবছর রথটা উজ্জ্বলদের বাড়িতেই থাকে মন্দিরের পাশটায়। উৎসবের ক-টা দিন, বুঝলেন মশাই, বয়ড়ার প্রত্যেকেই একেবারে যাকে বলে একেকজন রথসচাইল্ড।

সামান্য এগিয়েই রাস্তার পুবদিকে বেশ খানিকটা জায়গা নিয়ে একটা ছোট্ট মন্দির। চারদিকে ফুটচারেক উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। ভেতরে, সামনের দিকটায় একটুকরো ফুলবাগান, গোটা দুই নিম গাছ, একটা আম গাছ। মন্দিরের বারান্দায় রুদ্রাক্ষের মালা গলায় লালকাপড় পরা জটাজুটধারী একজন মধ্যবয়স্ক পুরুষ দাঁড়িয়ে আছেন।

উজ্জ্বলবাবু আপনমনেই বললেন, ‘দুলুমহারাজ ফিরেছেন দেখছি। দিনতিনেক আশ্রম তো তালাবন্দ ছিল।’

তার পরেই উঁচু গলায় জিজ্ঞাসা করলেন, ‘মহারাজ এই ক-দিন কোথায় গিয়েছিলেন? আশ্রম বন্ধ ছিল দেখলাম।’

মহারাজ দাড়ি-গোঁফের ফাঁকে একটু হেসে জবাব দিলেন, ‘একটু বর্ধমান গিয়েছিলাম বাবা। কাজ ছিল। পরশু সকালেই ফেরার কথা ছিল কিন্তু হল না। একটু আটকে গেলাম। এই খানিক আগেই ফিরলাম, এখানকার সব কুশল তো?’

উজ্জ্বলবাবু একটু হেসে হাত তুলে জানিয়ে দিলেন, ‘সব কুশল।’ তারপর বললেন, ‘এটা দুলুমহারাজের আশ্রম। সাধক মানুষ। মাঝেমাঝে দু-একদিনের জন্য এদিক-সেদিক চলে যান। মহারাজের এক চেলা আছে—নাম বটেশ্বর—তা মহারাজ না থাকলে সে-ও থাকে না। আশ্রম তালাবন্ধই পড়ে থাকে।’

মৃগাঙ্কবাবু বললেন, ‘মহারাজের মুখে বেশ একটা মহাপুরুষসুলভ জ্যোতি রয়েছে মনে হল। নিশ্চয়ই সাধনমার্গে অনেকদূর এগিয়েছেন। উজ্জ্বল, ফেরার সময় একবার মহারাজের কাছে নিয়ে যাস তো। একটু পায়ের ধুলো নেব।’

আরেকটু এগিয়ে অংশুমানবাবু বললেন, ‘রাস্তাটায় জিপ চলে দেখছি। গ্রামে কারও জিপগাড়ি আছে?’

উজ্জ্বলবাবু একটু অবাক হয়ে সামনে-পেছনে তাকিয়ে নিয়ে বললেন, ‘না, স্যার। আমাদের গ্রামে তো কারও জিপগাড়ি নেই। তবে এ রাস্তায় যে জিপ চলে এটাও ঠিক। আমাদের এখানকার একটি ছেলে—সোমনাথ, হাইওয়ে পেট্রল পুলিশে চাকরি করে। ও যেদিন-যেদিন ডিউটিতে থাকে, বিশেষ করে রাত্তিরে—সেদিন-সেদিন পেট্রল পুলিশের জিপটা একবার করে গ্রামের ভেতর দিয়ে টহল দিয়ে যায়। কিন্তু জিপের ব্যাপারটা আপনি কেমন করে—’

মৃগাঙ্কবাবু বললেন, ‘বলে দিন স্যার। কৌতূহলটা আর জিইয়ে রাখবেন না দয়া করে।’

অংশুমানবাবু বললেন, ‘আশ্রমটা ছাড়িয়ে এসেই এক জায়গায় রাস্তায় খোয়া উঠে গিয়ে মাটি বেরিয়ে গিয়েছে। গত পরশু সন্ধ্যের আগে একপশলা বৃষ্টি হয়েছিল, মনে আছে মৃগাঙ্কবাবু? শুধু আমাদের ওদিকেই নয়, এদিকেও বৃষ্টিটা ভালোই হয়েছে দেখছি। বৃষ্টির জমা জলে জায়গাটায় কাদা রয়েছে এখনও। তার ওপরেই জিপের চাকার দাগ রয়েছে।’

উজ্জ্বলবাবু বললেন, ‘কিন্তু সেটা তো জিপ না-হয়ে অন্য কোনো গাড়িরও হতে পারে। আপনি জিপের কথাই বললেন কেন স্যার?’

অংশুমানবাবু বললেন, ‘কেননা জিপের চাকা অন্য সমস্ত গাড়ির চাকার থেকে একটু আলাদা। লক্ষ করলে পার্থক্যটা নিজেরাই ধরতে পারবেন।’

উজ্জ্বলবাবু বললেন, ‘এক্সেলেন্ট। যাইহোক, আমরা এসে গেছি। সামনের ডানদিকের দোতলা বাড়িটা। আসুন স্যার।’

সামনে মার্বেল ফলকে বাড়ির নাম লেখা রয়েছে— ‘আনন্দধাম’। গেট খুলে ওঁরা ভেতরে ঢুকলেন। সামনে বেশ খানিকটা জায়গা রেখে বাঁ-দিকে একটা মন্দির। তার পাশে অ্যাসবেস্টসের ছাউনির নীচে মাঝারি আকারের একটা রথ। সামনের ফাঁকা জায়গাটায় নানা ধরনের ফুল গাছ। এদিকটাতেও গেট থেকে বাড়ি পর্যন্ত রাস্তাটার দু-পাশে বেলিফুলের ঝাড়। রাস্তার শেষে ঝকঝকে পরিচ্ছন্ন সাদা দোতালা বাড়ি। বুঝতে একুটও অসুবিধা হয় না নিয়োগী পরিবার অবস্থাপন্ন।

ড্রয়িংরুমে বসে পরিবারের অন্য সকলের সঙ্গে পরিচয় হল। গৃহস্বামী সতীকান্তবাবু, তাঁর স্ত্রী অর্থাৎ মৃগাঙ্কবাবুর মাসিমা, উজ্জ্বলবাবুর স্ত্রী এবং বউদি। অঞ্জনবাবু বাড়িতে নেই, অফিসে গেছেন।

জলখাবার খাওয়ার পর চায়ে চুমুক দিয়ে অংশুমানবাবু বললেন, ‘উজ্জ্বলবাবু, এবারে প্যাকেটটা নিয়ে আসুন। দেখি।’

প্যাকেট এল। বাদামি পুরু কাগজের একটা প্যাকেট। দৈর্ঘে-প্রস্থে একটা বইয়ের মতো। ইঞ্চিখানেক পুরু।

উজ্জ্বলবাবু বললেন, ‘প্রথম যখন প্যাকেটটা পাই, ওপরের কভারটা স্টিকার দিয়ে খুব ভালোভাবে আটকানো ছিল।’

অংশুমানবাবু বললেন, ‘আপনি গোড়া থেকে পুরো ব্যাপারটা বলুন।’

উজ্জ্বলবাবু বললেন, ‘আমার অনেকদিনের অভ্যেস খুব সকালে স্নান করে ঠাকুরঘরে গিয়ে পুজো করা। ঠাকুরের প্রতি আমার দুর্বলতা একটু বেশিই আছে বলতে পারেন। আমাদের মন্দিরে শ্বেতপাথরের রাধামাধবের অধিষ্ঠান। রোজ সকালে নিজের হাতে ফুল তুলে ওঁদের পুজো করতে আমার খুব ভালো লাগে।’

গতকাল সকালেও রোজকার মতোই গিয়েছি। ফুলটুল গুছিয়ে ধূপকাঠি জ্বেলে দিয়ে তখন চন্দন ঘষছি। হঠাৎ কোথা থেকে একটা আরশোলা উড়ে এসে আমার গায়ে বসল। তাড়িয়ে দিতেই ওটা ফরফর করে উড়ে গিয়ে দেওয়ালের তাকের পেছনে চলে গেল। মনটা খিঁচড়ে গেল। ওটাকে তাড়াতেই হবে।

উঠলাম। আমাদের মন্দিরের দেওয়ালের গায়ে চারটে তাক করা আছে। সেখানে ওপরের দুটো তাকে বেশ কিছু ধর্মগ্রন্থ আছে। রামকৃষ্ণ কথামৃত, কাশীদাসী মহাভারত, কৃত্তিবাসী রামায়ণ, যোগবিশিষ্ট রামায়ণ, গীতা-চন্ডী ইত্যাদি বইগুলো ওই দুটো তাকে থাকে। আমার বাবা এবং আমি—দু-জনেই হাতে সময় পেলে ওই বইগুলো মাঝেমধ্যে পাঠ করি। নীচের তাক দুটোয় পুজোর নানারকম জিনিসপত্র, যেমন শাঁখ, কাঁসরঘণ্টা, ধুনুচি, পঞ্চপ্রদীপ, ধূপধুনো, কিছু বাসনপত্র এইসব থাকে।

আরশোলাটাকে খুঁজতে বইগুলো নামাতেই এই প্যাকেটটা পেলাম। বইগুলোর পেছনে ওটা ছিল। প্রথমে তো খুব অবাক হয়ে গেলাম। কিন্তু প্যাকেটটা খুলে একেবারে হতভম্ব। বেশ ভয় পেয়ে গেলাম বলতে পারেন। এর আগে কখনো আমি ড্রাগজাতীয় বস্তু দেখিনি। এগুলোর সম্বন্ধে শুনেছি, কাগজে পড়েছি। কিন্তু কাল এগুলো দেখেই আমার মনে হল জিনিসগুলো নির্ঘাত ড্রাগজাতীয়। কিন্তু এগুলো এখানে রাখল কে? বাড়িতে যারা আছে তাদের কারও সম্পর্কেই আমার কোনো সন্দেহ হয় না। তাহলে কি বাইরের কেউ আমাদের ফাঁসানোর জন্য এগুলো রেখেছে?

পুজো করা মাথায় উঠল। একটা মারাত্মক দুশ্চিন্তা মাথায় ঢুকে গেল। তৎক্ষণাৎ দাদাকে ব্যাপারটা বললাম। শুনে ও-ও প্রথমটায় হতভম্ব হয়ে গেল। তারপর আমাকে বলল, ‘‘এক কাজ কর, তুইও প্যাকেটটা টান মেরে পেছনের পুকুরে ফেলেদে। আপদ বিদেয় হোক।’’

এই পরামর্শ দিয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে ও অফিসে চলে গেল। কিন্তু আমি এত সহজে নিশ্চিন্ত হতে পারলাম না। আসল ব্যাপার না বলে বাড়ির প্রত্যেককে আলগাভাবে প্যাকেটটার কথা জিজ্ঞাসা করলাম। কেউ কিছু বলতে পারল না। অবিশ্যি বাড়ির কাজের লোকগুলোকে কিছু জিজ্ঞাসা করিনি। তাহলে ব্যাপারটা পাঁচকান হয়ে যেতে পারে। তারপর মৃগাঙ্কদাকে ফোন করলাম। ও আপনার কথা বলল। এখন দেখুন স্যার, আপনি যদি কিছু কিনারা করতে পারেন।’

অংশুমানবাবু বললেন, ‘বাড়িতে কে কে আছেন?’

উজ্জ্বলবাবু বললেন, ‘বাবা-মা, বউদি আর আমার গিন্নিকে তো দেখলেন। এ ছাড়া আছে দাদা। আর আমার ভাইপো, বয়স পনেরো বছর। ক্লাস নাইনে পড়ে। আমারও একই ছেলে, বয়স বারো—ক্লাস সিক্সে পড়ে। এ ছাড়া বাইরের লোক আছে দু-জন। সত্য আর গোপাল। দু-জনেই কাজের লোক। বাড়ি আর ব্যাবসার নানারকম কাজে ওদের লাগানো হয়। বাসনধোয়া, ঘরমোছা ইত্যাদি কাজের জন্য একজন ঠিকে কাজের মেয়ে আছে। আর রাঁধুনি আছে একজন—কৃষ্ণাদি। সে এ বাড়িতেই থাকে।’

অংশুমানবাবু বললেন, ‘আচ্ছা উজ্জ্বলবাবু, আপনার দাদার পরামর্শমতো আপনি প্যাকেটটা ফেলে দিলেন না কেন?’

উজ্জ্বলবাবু বললেন, ‘ফেলিনি একটাই কারণে। আমার খুব জানতে ইচ্ছে করছে ব্যাপারটার পেছনে কে আছে? আমাদের বাড়িটা চোরাচালানের আখড়া হোক, এটা আমি চাই না। অবিশ্যি শেষপর্যন্ত যদি কোনো কিনারা না করা যায়, তাহলে হয়তো পুকুরের জলেই টান মেরে আপদ বিদেয় করতে হবে।

অংশুমানবাবু সবগুলোই খুব ভালোভাবে পরীক্ষা করলেন। বাদামি মোড়কটা নাকের কাছে নিয়ে গিয়ে শুঁকলেন। তারপর প্যাকেটটা ঠিক যেমন ছিল, সেভাবেই আবার বাঁধলেন। তারপর বললেন, ‘উজ্জ্বলবাবুর মতো আমারও এই জাতীয় জিনিসের চাক্ষুস অভিজ্ঞতা এই প্রথম। তবে মনে হচ্ছে বহুলোকের সর্বনাশের রসদ এখানে মজুত রয়েছে। চলুন, এবারে এটা যেখানে পেয়েছেন সেই জায়গাটা একবার দেখা যাক। এটাও নিয়ে চলুন।’

মিনিট দুয়েকের মধ্যেই মন্দিরে পৌঁছে গেলেন তিনজনে। ব্ল্যাক মার্বেল আর শ্বেতপাথরের চৌখুপি-কাটা মেঝে। সামনে কাঠের সিংহাসনে শ্বেতপাথরের রাধামাধব। ঘরে ফুল ধূপধুনোর মিশ্রিত মনোরম গন্ধ। মন্দিরের বাঁ-দিকের দেওয়ালে চারটে তাক। উজ্জ্বলবাবু যেমন যেমন বলেছিলেন, ঠিক তেমন তেমনই সবকিছু রয়েছে।

মৃগাঙ্কবাবু মন্দিরে ঢুকেই চোখ বুজে হাতজোড় করে বলে উঠলেন, ‘ঠাকুর কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে পান্ডবদের জেতানোর চেয়ে ঢের সহজ এই রহস্যটার একটা কিনারা করে দাও প্রভু। আমার মুখরক্ষা করো ঠাকুর।’

অংশুমানবাবু হাসতে হাসতে বললেন, ‘উজ্জ্বলবাবু, এবারে এটা যেখানে যেমনভাবে ছিল, ঠিক তেমনভাবে রাখুন তো।’

উজ্জ্বলবাবু প্যাকেটটা দ্বিতীয় তাকের মোটা বইগুলোর পেছনে ঢুকিয়ে দিলেন। অংশুমানবাবু মিনিট পনেরো-কুড়ি ধরে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সবকিছু দেখলেন। কখনো বসে, কখনো দাঁড়িয়ে। দু-বার মন্দিরের বাইরের চাতালে গেলেন। নীচু হয়ে চাতাল- টাকে পরীক্ষা করলেন। তারপর বললেন, ‘ঠিক আছে, এবারে চলুন। আমার যা যা দেখার দেখে নিয়েছি।’

ড্রয়িংরুমে সোফার ওপর ধপ করে বসে পড়ে মৃগাঙ্কবাবু বললেন, ‘ও মশাই, কিছু বুঝলেন?’

অংশুমানবাবু বললেন, ‘অন্তত দুটো ব্যাপার স্পষ্ট। যে লোকটা এটা করেছে, তার উচ্চতা বাঙালির গড় উচ্চতার চেয়ে একটু কম। লোকটা পাঁচ ফুটের বেশি লম্বা নয়। আর পরশু বিকালে বৃষ্টির সময়টুকু সে মন্দিরের ভেতরে এবং বাইরে ছিল। দ্বিতীয়ত, তার কাছে ছিল একটা কেরোসিন তেলের টিন। যেটা সম্ভবত সামান্য ফুটো হয়ে গেছে। তেল চুঁইয়ে পড়েছে। আবার ফুটো না হতেও পারে। তাড়াহুড়োয় হয়তো তেলের টিনটা একবার কাত হয়ে গিয়েছিল। তাতেই গা বেয়ে তেল গড়িয়ে পড়েছে। মোটকথা কেরোসিনের একটা কন্টেনার তার হাতে ছিল।

বৃষ্টি আসার মুহূর্তে সে মন্দিরে ঢুকে যায়। কেরোসিনের টিনটা ঘরের কোণে রাখে। তারপর বইয়ের তাকের পেছনে প্যাকেটটা সেট করে। বৃষ্টি পড়ছিলই। লোকটা বেরিয়ে চাতালে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করে। তখন টিনটা বাইরের চাতালের থামের পাশে রাখে। বৃষ্টি থামার পর ওখান থেকে চলে যায়। নিশ্চিতভাবেই লোকটার এ বাড়িতে যাতায়াত খুব বেশি। কেননা, সে জানত চাতালে দাঁড়িয়ে থাকার সময় যদি কেউ তাকে দেখেও ফেলে, তাতেও অসুবিধা নেই।

যাই হোক, কেউ তাকে না দেখলেও দুটো সূত্র সে পেছনে রেখে গেছে। কেরোসিন তেলের দাগ এবং গন্ধ মন্দিরের মধ্যে সামান্য। অর্থাৎ খুব সামান্য সময়ই সে মন্দিরের মধ্যে ছিল। কিন্তু বাইরে তাকে বেশ খানিকক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়েছিল বলে চাতালের থামের পাশে দাগটা বেশি এবং গন্ধটাও স্পষ্ট। কেরোসিন লোকটার হাতে লেগেছিল বলে প্যাকেটটার ওপরের বাদামি কাগজেও কেরোসিনের সামান্য দাগ লেগেছে।’

মৃগাঙ্কবাবু বললেন, ‘কিন্তু লোকটা পাঁচ ফুট লম্বা এটা বুঝলেন কী করে?’

অংশুমানবাবু বললেন, ‘আপনি কাউকে যদি দেওয়ালের মতো জায়গায় কিছু লিখতে বলেন, দেখবেন সে সাধারণত তার চোখ বরাবর উচ্চতায় লিখতে শুরু করবে। আমি স্কুলে অঙ্ক করাই। আমি যখন আমার ছাত্রদের বোর্ডে অঙ্ক কষতে দিই, তখন যে ছাত্র যে উচ্চতার, সে তার চোখের সোজাসুজি উচ্চতায় বোর্ডে অঙ্ক কষা শুরু করে। মোটামুটি সেই নিয়মেই এই লোকটা প্যাকেটটা লুকোনোর জন্য দ্বিতীয় তাকটা বেছে নিয়েছিল। আরেকটু লম্বা হলে সে ওপরের তাকটাই বেছে নিত। যাই হোক, উজ্জ্বলবাবু, এরকম উচ্চতার কোনো লোকের কথা কি আপনার মনে পড়ছে, যার এবাড়িতে অবাধ যাতায়াত আছে?’

উজ্জ্বলবাবু বিস্ফারিত চোখে বললেন, ‘শুধু উচ্চতা নয়, কেরোসিন তেলের ব্যাপারটাও মিলে গেছে। পরশু বিকেলে আমি নিজে সত্যকে রথতলায় পাঠিয়েছিলাম কেরোসিন আনতে। সন্ধ্যেবেলায় বৃষ্টির পরে সত্য এসে বলল, ‘‘টিনটা ফুটো হয়ে গেছে, আরেকটা কেনা দরকার।’’ ওর পেটেপেটে এত শয়তানি! দাঁড়ান, ওকে ডাকছি।’

কয়েক মিনিটের মধ্যেই সত্য এল। বেঁটেখাটো রোগা শ্যামবর্ণ একটি লোক। বছর পঁয়ত্রিশ বয়স।

উজ্জ্বলবাবু বললেন, ‘সত্য, এঁরা তোমাকে কিছু কথা জিজ্ঞাসা করবেন। তুমি ঠিকঠিক জবাব দেবে।’

সত্য একবার চোখ তুলে সবাইকে দেখল। তারপর চোখ নামিয়ে নিল।

অংশুমানবাবু জিজ্ঞেস করলেন, ‘সত্য, তুমি কতদিন এ বাড়িতে আছ?’

সত্য বলল, ‘আজ্ঞে তা ধরেন, আঠারো-কুড়ি বছর হবে।’

‘তাহলে তো অনেকদিন ধরেই এখানে আছ। বাড়িতে তোমার কে কে আছে?’

‘আজ্ঞে, মা-বউ আর আমার ছেলে।’

‘যদি এদের ছেড়ে তোমাকে অনেক বছরের জন্য কোথাও যেতে হয়, ধরা যাক তুমি এমন কোনো কাজ করে ফেললে, যার জন্য তোমাকে জেলে যেতে হল, তাহলে ওদের অবস্থা কেমন হবে?’

অংশমানবাবু লক্ষ করলেন, সত্য অস্বস্তিবোধ করছে। মুহূর্তের জন্য চোখে ভয়ের ছায়া দেখা দিল। বললেন, ‘পরশু বিকালে বৃষ্টির আগে এবং পরে তুমি কোথায় ছিলে? কী করছিলে?’

সত্য বলল, ‘পরশু বিকেলে বাবু তো আমায় কেরোসিন আনতে দিলেন। আমি রথতলায় সতীশের দোকান থেকে কেরোসিন কিনলাম। মাঝখানে বিষ্টিতে আটকে গেলাম। তারপর ওটা এখানে দিয়ে আর কিছু করতে হবে কিনা জেনে নিয়ে বাড়ি গেলাম।’

অংশুমানবাবু বললেন, ‘তুমি পুরোটা ঠিকঠিক বলোনি, ব্যাপারটা বরং আমি বলি। তুমি কেরোসিন কিনে ফেরার সময় কোনো লোকের কাছ থেকে একটা বাদামি রঙের কাগজের প্যাকেট নিলে। সেটা অন্য কারও কাছে তোমাকে পৌঁছে দিতে বলা হল। ওটা নিয়ে তুমি এ বাড়িতে ঢুকলে। বোধ হয় তখনই বৃষ্টিটা নামল। তুমি মন্দিরের চাতালে গিয়ে দাঁড়ালে। তারপর বৃষ্টির ছাঁটের জন্য মন্দিরের মধ্যে ঢুকলে। প্যাকেটটা অনেকটা বইয়ের মতো দেখতে। তুমি মনে মনে ওটা লুকিয়ে রাখার একটা জায়গা খুঁজছিলে। বইগুলো দেখে তোমার মনে হল ওটা তো বইয়ের পেছনেই রাখা যায়। তুমি প্রথমে হাতের কেরোসিনের টিনটা মেঝের কোণে রাখলে। তারপর বইয়ের পেছনে প্যাকেটটা রাখলে। টিনটা নিয়ে মন্দির থেকে বেরিয়ে আবার চাতালে গিয়ে দাঁড়ালে। তখন বৃষ্টিটা জোরেই পড়ছে। সুতরাং, তুমি কেরোসিনের টিনটা চাতালের ভেতরের দিকটায় থামের আড়ালে রাখলে। তারপর বৃষ্টি থামল। এরপর যা যা ঘটেছে সেটা তুমি ঠিকই বলেছ। কিন্তু বাকিটা আমি ঠিক বললাম তো?’

সত্যর চোখদুটো দেখে মনে হল ওগুলো ঠিকরে বেরিয়ে আসবে। মুখটা শুকিয়ে গিয়েছে। দু-বার ‘আজ্ঞে আজ্ঞে’ করে থেমে গেল।

অংশুমানবাবু বললেন, ‘এবারে বলো তোমাকে প্যাকেটটা কে বা কারা দিয়েছে? আর কার কাছে পৌঁছে দিতে বলেছে?’

সত্য বলল, ‘আজ্ঞে, তাদের আমি চিনিনে। কেরোসিন কিনে আমি যখন ফিরছিলাম, তখন একটা কালো টাটা সুমো আশ্রমের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। আর দুটো লোক—একজন খুব ঢ্যাঙা, আরেকজন কুচকুচে কালো। লোকদুটো আমায় জিজ্ঞাসা করল, দুলুমহারাজ কোথায় গেছেন তুমি জানো? তো, আমি বললাম, আমি জানি না। ঢ্যাঙা লোকটা আমায় জিজ্ঞাসা করল, ‘‘তোমার বাড়ি কোথায়?’’ আমি বললাম, ‘‘এই তো কাছেই।’’ তখন মেঘ উঠছে। আমি কয়েক পা এগিয়েছি, এমনসময় লোকদুটো আমায় আবার পেছন থেকে ডাকল। কালো লোকটা বলল, ‘‘তুমি একটা ওষুধের প্যাকেট তোমার কাছে রাখবে? দুলুমহারাজ এলে তাকে দিয়ে দিতে পারবে? আশ্রম বন্ধ বলে আমরা দিতে পারলাম না। যদি তুমি ওষুধটা একটু দিয়ে দিতে পারো, ভালো হয়। আমাদের এখন অনেক দূর যেতে হবে বলে অপেক্ষা করতে পারছি না।’’ ’

অংশুমানবাবু বললেন,এবারে বলো তোমাকে প্যাকেটটা কে বা কারা দিয়েছে? আর কার কাছে পৌঁছে দিতে বলেছে?

আমি বললাম, ‘ঠিক আছে দিয়ে দেব।’ তখন ঢ্যাঙা লোকটা একটা প্যাকেট গাড়ির মধ্যে থেকে বের করে এনে আমার হাতে দিল। আর কালো লোকটাকে বলল, ‘হাজারবার বলেছি একটা মোবাইল রাখতে। একটা মোবাইল রাখলে আর এই ঝামেলায় পড়তে হয় না।’

প্যাকেটটা নিয়ে চলে আসছি, পেছন থেকে ওরা আবার আমায় ডাকল। আমার নাম জিজ্ঞাসা করল। আমি বললাম। তারপর পকেট থেকে একটা পেটমোটা ম্যানিব্যাগ বের করে তার থেকে দুশো টাকা আমার হাতে দিয়ে বলল, মিষ্টি খেয়ো। তারপর খুব তাড়াহুড়ো করে গাড়িতে গিয়ে উঠল। আমিও মেঘ উঠেছে দেখে দৌড় দিলাম। কিন্তু আগে আমার মনে কোনো সন্দেহ হয়নি। ওরা টাকা দেওয়ার পরই আমার সন্দেহটা হল। মনে হল, এটা বোধ হয় ঠিক ওষুধের প্যাকেট নয়। দুলুমহারাজ খুব গাঁজা খায়। একবার মনে হল, বোধ হয় প্যাকেটের মধ্যে গাঁজা আছে। সেটা খুব একটা দোষের না হলেও আমার কাছে যদি গাঁজা পাওয়া যায়, সেটা ভালো হবে না। তাই ওটা—

অংশুমানবাবু বললেন, ‘ওটা তুমি নিজের বাড়িতে নিয়ে গেলে না কেন?’

সত্য বলল, ‘আমার ছেলেটা খুব দুরন্ত। বাড়িতে নিয়ে গেলে পাঁচমিনিটের মধ্যেই সবাই ব্যাপারটা জেনে যেত।’

অংশুমানবাবু বললেন, ‘দুলুমহারাজ আজ সকালে ফিরে এসেছেন, এটা তুমি জানো?’

সত্য বলল, ‘আজ্ঞে না। আমি তো ওদিকটায় আজ যাইনি। কাল সন্ধ্যেবেলায় একবার গিয়েছিলাম, দেখেছিলাম আশ্রম তালাবন্ধই আছে। সে যাই হোক, বাবু, ওর মধ্যে কী আছে সেটা আমি জানি না। ওর মধ্যে কি খারাপ কিছু আছে? আমার কোনো দোষ নেই বাবু। আমি তো জেনেশুনে ওটা নিইনি।’ বলতে বলতে সত্য কেঁদে ফেলল।

অংশুমানবাবু বললেন, ‘ঠিক আছে সত্য। আসলে ওর মধ্যে গাঁজার থেকেও মারাত্মক কিছু নেশার জিনিস আছে। আচ্ছা, এবারে তুমি যাও। কিন্তু এ বাড়ি ছেড়ে এখন কোথাও যেও না। একটু পরেই তোমাকে আবার ডাকব।’

সত্য বাইরে চলে গেল।

মৃগাঙ্কবাবু বললেন, ‘ওঃ! একেবারে যাকে বলে রেড হ্যাণ্ডেড ক্যাচ-কট-কট। ধরা পড়ে গিয়ে সত্যর মুখটা কেমন শুকিয়ে গেল, দেখলি উজ্জ্বল!’

অংশুমানবাবু বললেন, ‘তাহলে উজ্জ্বলবাবু, এখন কী করবেন বলুন!’

উজ্জ্বলবাবু বললেন, ‘কী করা যায় বলুন তো?’

অংশুমানবাবু বললেন, ‘একটা কাজ করতে পারেন। সত্যকে দিয়েই প্যাকেটটা দুলুমহারাজের আশ্রমে পাঠিয়ে দিন। কিন্তু তার আগে এখানকার কে একজন পেট্রল পুলিশে চাকরি করে বলছিলেন, তাকে একটু খবর দিন। সবকথা বলুন। আমার মনে হয় বাকি ব্যবস্থা সেই করবে।

সোমনাথ বাড়িতেই ছিল। খবর পেয়ে আধঘণ্টার মধ্যেই চলে এল। উজ্জ্বলবাবু ওকে সবকিছু বললেন। প্যাকেটটা দেখালেন।

সোমনাথ বলল, ‘একটা গ্যাং বেশ কিছুদিন ধরেই এই অঞ্চলে মাল সাপ্লাই করছে, এটা আমরা জানতে পেরেছি। আবার এই অঞ্চল থেকেই মালগুলো বিভিন্ন জায়গায় চলে যাচ্ছে। সেন্টারটা যে আমারই গ্রামে এটা জানা ছিল না। এ তো দেখছি বাঘের ঘরে ঘোগের বাসা। ছি ছি। আচ্ছা, আমি দেখছি। আধঘণ্টা বাদে আপনারা সত্যকে দিয়েই প্যাকেটটা আশ্রমে পাঠিয়ে দিন। এক্ষুনি আমি ব্যবস্থা করছি।

উজ্জ্বলবাবু বলল, ‘শুধু আমাদের ব্যাপারটা গোপন রেখো। আমরা যেন এর মধ্যে জড়িয়ে না পড়ি।’

সোমনাথ বলল, ‘ঠিক আছে। তাই হবে।

আধঘণ্টা বাদে সত্যকে দিয়ে প্যাকেটটা দুলুমহারাজের আশ্রমে পাঠিয়ে দিলেন উজ্জ্বলবাবু। সত্য ফিরে এসে জানাল প্যাকেটটা পেয়ে দুলুমহারাজ খুব খুশি হয়ে ওকে বর্ধমানের সীতাভোগ আর মিহিদানা খাইয়েছেন। তবে বুকে ধুকধুকুনি নিয়ে কি আর মিষ্টি খাওয়া যায়! অনেক কষ্ট সে ওগুলো খেয়েছে।

দুপুরে খেতে বসে অংশুমানবাবু বললেন, ‘আমার বুকে যদিও ধুকধুকুনি নেই, তবুও আমি কিন্তু এত কিছু খেতে পারব না উজ্জ্বলবাবু।’

পরিবেশন করছিলেন উজ্জ্বলবাবুর বউদি। বললেন, ‘দাদা আমরা আজই সবকিছু শুনলাম। আপনি আজ দেশ এবং দশের মঙ্গল করলেন। একটা দুষ্টুচক্রও ঠিক ধরা পড়ে যাবে। আজ আমার কত্তাটি বাড়ি থাকতে পারলেন না অফিসে অডিট চলছে বলে। ফিরে এসে সব শোনার পর একথা যদি শোনেন যে, আমরা অতিথি আপ্যায়নটুকুও ঠিকমতো করতে পারিনি, তাহলে আমাদের কপালে ধমক-ধামক আর আমার দেবরটির কপালে এই বুড়োবয়সেও নির্ঘাৎ চড়চাপড় বরাদ্দ আছে। সুতরাং, আমাদের এই কজনের মঙ্গলের জন্য একটু কষ্ট করে যদি—’

মৃগাঙ্কবাবু বললেন, ‘ম্যায় কাবাবমে হাড্ডি বনগিয়া ভাই। কোই মুঝে খানে কে লিয়ে পীড়াপীড়ি নেহি করতা হ্যায়। মেরা বরাত।’

হাসি-গল্পের মধ্যে দিয়ে খাওয়া দাওয়া শেষ হল।

ঘণ্টাদুই বাদে অংশুমানবাবু বললেন, ‘এবারে আমরা বিদায় নেব। অনেকটা যেতে হবে। নিয়োগী পরিবারের সকলে আন্তরিকতার সঙ্গে ওঁদের আবার আসার জন্য নিমন্ত্রণ জানালেন। আনন্দধামের বাইরে বেরিয়ে এসে দু-পা এগিয়ে হঠাৎ মৃগাঙ্কবাবু থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে অংশুমানবাবুর দিকে তাকিয়ে ফিক করে হেসে বললেন,—দাঁড়ান। ঠিক এক মিনিট, স্যার। আমি আসছি।’

কথাটা বলেই আবার বাড়ির মধ্যে ঢুকে গেলেন। মিনিটদুই বাদে ফিরেও এলেন। উজ্জ্বলবাবু জি টি রোড পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে গেলেন। আশ্রমের পাশ দিয়ে আসার সময় ওঁরা দেখলেন দুটো পুলিশের গাড়ি আর একটা পুলিশ ভ্যান দাঁড়িয়ে আছে। আশ্রমের ভেতরে বাইরে পুলিশের ছড়াছড়ি।

অংশুমানবাবু বললেন, ‘মৃগাঙ্কবাবু, দুলুমহারাজের পায়ের ধুলো নেওয়ার ইচ্ছেটা এখনও আছে নাকি আপনার?’

মৃগাঙ্কবাবু হেসে বললেন, সে উপায় কি আর রাখলেন স্যার! দুলুমহারাজের নাম-ঠিকানা সবই তো পালটে দিলেন আপনি। আপনার কল্যাণে মহানায়ক হয়ে গেল মহাশয়তান আর ঠিকানা পালটে সাধনঘর হয়ে গেল শ্রীঘর।’

জি টি রোড পৌঁছোনোর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই, একটা খালি রিকশা পেয়ে গেলেন ওঁরা। উজ্জ্বলবাবুকে বিদায় জানিয়ে দুজনে রিকশায় উঠে বসলেন।

কয়েক মিনিট বাদে মৃগাঙ্কবাবু বললেন, ‘আজ সারাদিনের ব্যাপারটা কেমন লাগল মশাই?’

অংশুমানবাবু বললেন, ‘ভালোই। তবে আনন্দধাম থেকে বেরিয়ে আসার পর আবার সেখানে ঢুকে গিয়ে আপনি যেটা করে এসেছেন, সেটা সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে।’

মৃগাঙ্কবাবু অবাক হয়ে বললেন, ‘কী করেছি আপনি জানেন? বলুন তো দেখি।’

অংশুমানবাবু বললেন, ‘খুব সম্ভব আপনি রাধামাধবের কাছে আপনার মুখরক্ষা হওয়ার জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে বেশ ভক্তিভরে একটা প্রণাম করে এসেছেন। তাই তো?’

মৃগাঙ্কবাবুর ফেটে পড়া হাসির শব্দে রাস্তার পাশের বাবলা গাছ থেকে একটা বক ডানা মেলে উড়ে গেল। রিকশাওয়ালা পেছন ঘুরে ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করল। মৃগাঙ্কবাবু তাকে এক ধমক দিয়ে বললেন, ‘পিছে মৎ ঘুরো ভাইয়া। সামনে দেখকর চালাও। জাতীয় সড়কমে অ্যাক্সিডেন্ট একটু বেশিই হোতা হ্যায়। স্টেশন এখনও বহুত দূর হ্যায়। সামালকে সামালকে চলো।

মৃগাঙ্কবাবু আবার হিন্দি বলছেন। অংশুমানবাবু হেসে ফেললেন।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%