জাদুশিল্পী

গৌতম দাশ

সামনে বিছিয়ে রাখা কাপড়টার দিকে তাকিয়ে মন খারাপ হয়ে গেল ফটিকের। সামান্য কিছু খুচরো টাকাপয়সা। সব মিলিয়ে বিশ টাকাও হবে কিনা সন্দেহ। না:, আজকের দিনটাই মাটি। মেলায় তেমন লোকজনই নেই। পয়সা দেবে কে? অথচ বিষ্ণুপুরের এই রথের মেলা বছর কয়েক আগেও জমজমাট থাকত উলটোরথের দিন পর্যন্ত।

ফটিকের মনে পড়ল, ওপাশের ওই ঝাঁকড়া বকুল গাছটার নীচে গুরু নগেন বিশ্বাস ওকে নিয়ে দাঁড়াত। একটু গোছগাছ করে নিয়ে ফটিক ডুগডুগি বাজানো শুরু করত। মুহূর্তের মধ্যে ওদের চারপাশে লোক জড়ো হয়ে যেত। দূরদূরান্তের লোকও নগেনকে জাদুকর হিসেবে ভালো মতোই চিনত। অনেকক্ষণ ধরে নগেন হাসিমুখে একটার পর একটা খেলা দেখিয়ে যেত। হাতসাফাই আর জাগলিং-এর খেলা।

ফটিক একটু পাকা হওয়ার পর ওকেও খেলা দেখানোর দায়িত্ব দিত। দর্শকরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো সেসব খেলা দেখত। প্রতিটি খেলার শেষে একঝাঁক পায়রা ওড়ার শব্দের মতো সবাই হাততালি দিত। সামনের কাপড়ে শিলাবৃষ্টির মতো টাকাপয়সার বৃষ্টি হত। শুধু এখানে নয়, সারাবছর ধরে চারপাশে বিশ-পঁচিশ মাইলের মধ্যে যেখানে যত মেলা হয়—সব জায়গাতেই ওরা পৌঁছে যেত। তা ছাড়াও প্রত্যেক সপ্তাহে ছিল বীরনগর আর রতনগঞ্জের হাট। সেই সময়ে কোনো কোনো দিন আড়াইশো-তিনশো টাকাও রোজগার হয়েছে। সে-টাকায় সুখ ছিল। পুরোনো দিনের সেসব কথা ভাবলে আজও যেন গায়ে কাঁটা দেয়।

বছর আটেক আগে বুকের ব্যামোয় নগেন বিশ্বাস হঠাৎ-ই মারা যাওয়ার পর সবকিছুই কেমন যেন ওলটপালট হয়ে গেল। দিনকালও যেন বড্ড তাড়াতাড়ি বদলে গেল। এখন কোনো মেলাই আর আগের মতো জমজমাট হয় না। প্রথম দু-তিন দিন লোকজনের পাতলা ভিড় থাকে। তারপরই মেলা ঝিমিয়ে যায়। তা ছাড়া আজকাল ছোটখাটো ম্যাজিক, হাতসাফাই বা জাগলিং-এর খেলায় লোকের মন ভরে কই? হাতেগোনা যে কয়েকজন অলস কৌতূহলে খেলা দেখে, তারাও যেন বিশেষ মজা পায় না। হাততালি দিয়ে আনন্দ প্রকাশ করা দূরে থাক, খেলার শেষে বেজার-মুখে ভিক্ষে দেওয়ার মতো দু-এক টাকা ছুড়ে দেয়। সেটা কুড়িয়ে নিতেও বুকের মধ্যে খচখচ করে। অথচ পেটের দায়ে নিতেও হয়।

এখন নগেন নেই বটে, কিন্তু তার সব খেলাই ফটিকের হাতে বজায় আছে। তা ছাড়া আরও কয়েকটা খেলা ফটিক মাথা খাটিয়ে বের করেছে। অন্তত ঘণ্টাখানেক খেলা দেখানোর পুঁজি তার আছে। কিন্তু দর্শক কোথায়?

ফটিক একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে টাকাপয়সাগুলো কুড়িয়ে নিয়ে গুনতে শুরু করল। একবার-দু-বার।

‘একুশ টাকা পঞ্চাশ পয়সা। তাই তো?’

ফটিক একটু চমকে গিয়ে সামনে তাকাল। টাকমাথা, গোলগাল মাঝবয়সি একজন লোক তার দিকে হাসিহাসি মুখে তাকিয়ে আছে। চোখে চোখ পড়তেই লোকটার হাসি আরেকটু ছড়িয়ে পড়ল।

‘একজন মানুষের একবেলার খোরাকিও হয় না। তোমার ওস্তাদিকে বাহবা না দিয়ে উপায় নেই, কিন্তু রোজগারটা—না:, পেশাটা ছাড়বে কিনা সেটা এবারে ভাবার সময় হয়েছে বাপু।’

ফটিক বিরস মুখে বলল, ‘ছাড়তে চাইলেই কি আর ছাড়া যায়? আরেকটা কাজের জোগাড় না হলে ছাড়ি কেমন করে?’

লোকটি বেশ মোলায়েম গলায় বলল, ‘আহা, করতে চাইলে দুনিয়ায় কাজের অভাব কী? কিন্তু আসল কথাটা হল তোমার বিদ্যেটাকে তুমি ভালোবাসো। অবিশ্যি সেটাই স্বাভাবিক। এর পেছনে অনেক দিনের মেহনত আছে, যত্ন আছে—তাই ভালোবাসাও আছে। তা ছাড়া হাতের কৌশল দেখিয়ে লোকজনদের আনন্দ দিয়ে নিজেও নিশ্চয়ই আনন্দ পাও। সেটাও কম কথা নয়। সেইজন্যই চট করে পেশাটাকে ছাড়তে মন চায় না। কথাটা বুঝি বাপু, তবে কিনা মানুষের পেটের দাবি সবার আগে। দরকার পড়লে অন্য কাজ নিতে হবে বই কী।’

ফটিক সরঞ্জামগুলো গুছিয়ে নিতে নিতে বলল, ‘কোনো কাজের সন্ধান জানা আছে নাকি?’

লোকটি চিন্তিত গলায় বলল, ‘সাদামাটা একটা কাজের ব্যবস্থা হয়তো করে দেওয়া যেতে পারে। তোমার পছন্দ হবে কিনা জানি না, বাগানে ফুল ফোটানোর কাজ। কাজলপুরে চৌধুরি বাবুদের বাগানের কাজের জন্য একজন লোক দরকার। এখন একজন আছে কিন্তু আরেকজন লাগবে। কাজটা নেওয়ার ইচ্ছে থাকলে সপ্তাহখানেক বাদে কাজলপুরে গিয়ে আমার সঙ্গে দেখা কোরো।’

ফটিক জিজ্ঞাসা করল, ‘সপ্তাখানেক বাদে কেন?’

লোকটি একগাল হেসে বলল, ‘আসলে আমি এখন সাতদিনের ছুটি নিয়ে নিজের গাঁ যশড়ায় যাচ্ছি।’

ফটিক বলল, ‘মাঝে মাঝে ছুটিছাটাও আছে তাহলে?’

লোকটি মাথা নেড়ে বলল, ‘তা চাকরি থাকলে ছুটি তো থাকবেই। তবে অন্য সবার বেলায় না হলেও আমার ক্ষেত্রে একটু বেশিই কড়াকড়ি।’

ফটিক জিজ্ঞেস করল, ‘কেন?’

লোকটি গম্ভীরভাবে বলল, ‘ম্যানেজার না থাকলে চৌধুরিবাড়ি যে অচল হয়ে যায়। কাল ছুটির কথা বলতেই গিন্নিমা ধমকে উঠলেন, তুমি ছুটি নিলে আমাদের কেমন করে চলবে? এই তো সেদিন দশ দিনের ছুটি নিয়ে বাড়ি গেলে! বোঝো ব্যাপার! গিন্নিমার ‘এই তো সেদিন’ হচ্ছে ছ-মাসের পুরোনো কথা? মানছি, আমি না থাকলে খানিকটা অসুবিধা হয়। কিন্তু তুমিই বলো, আমার নিজেরও তো পরিবার ছেলেমেয়ের সঙ্গে দু-চার দিন কাটাতে সাধ হয়, নাকি?

তবে গিন্নিমার মুখের ওপর তো আর এসব কথা বলা যায় না। তাই ভেবেচিন্তে বললাম, ‘‘আজ্ঞে ধরুন, আজ যদি যমরাজ অনাথবন্ধুর ঘাড় ধরে তুলে নিয়ে যাওয়ার জন্য পেয়াদা পাঠিয়ে দেন? তখন কী হবে? নতুন ম্যানেজার না আসা পর্যন্ত কটা দিন তো কষ্ট ভোগ মানতেই হবে। সেই রকমই একটা কিছু ভেবে না হয়—’’

কর্তামশাই কাছেই ছিলেন। হেসে বললেন, ‘‘আচ্ছা যাও, তোমার সাতদিনের ছুটি মঞ্জুর করা হল। কিন্তু, ঠিক সময়ে ফেরত আসবে।’’

সেই ছুটি নিয়ে গাঁয়ে যাচ্ছি। পথে মেলাটা ঘুরে গেলাম। তোমার খেলা দেখে চোখ আটকে গেল। মানতেই হবে, তারিফ করার মতো খেলা। তা তোমার সংসারে আছে কে কে?’

ফটিক মাথা নেড়ে বলল, ‘তিনকুল বিলকুল ফাঁকা। কেউ নেই।’

অনাথবন্ধু হেসে বলল, ‘তাহলে আর চিন্তা কীসের? ভোজনং যত্রতত্র শয়নং হট্টমন্দিরে। চলে যেও কাজলপুরে, যা হোক একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে। তোমার নামটা কী হে?’

‘ফটিক।’

‘আচ্ছা, তাহলে ওই কথাই রইল। আমি চলি।’

অনাথবন্ধু চলে গেল। ফটিকের মনে হল, একটু বেশি কথা বলে বটে কিন্তু লোকটি ভালো।

সাতপাঁচ ভেবে দিন পনেরো বাদে ফটিক কাজলপুরের দিকে রওনা হল। কিছুদিন একটা অন্য ধরনের কাজ নিয়ে কাটালে ক্ষতি কী? দেখাই যাক! ভালো না লাগলে ফিরে আসতে তো বাধা নেই।

কাজলপুরে পৌঁছে ফটিক হকচকিয়ে গেল। চৌধুরিবাবুরা এককালে জমিদার ছিলেন। অনেকদিনের পুরোনো বিশাল বাড়ি। ফটিক পায়ে পায়ে ফটক পেরিয়ে ভিতরে ঢুকল।

খবর পেয়ে অনাথবন্ধু বেরিয়ে এল। ফটিককে দেখে খুব খুশি। রীতিমতো হাঁকডাক করে বলল, ‘এসো, এসো। ক-দিন ধরে আমি চাতকপাখির মতো রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছি অথচ ফটিকজলের পাত্তা নেই। ভাবলাম, বোধ হয় আর এলে না। যাক, শেষপর্যন্ত যখন এসেই পড়েছ, হিল্লে একটা হয়ে যাবে। আমি কর্তামশাইকে আগেই বলে রেখেছি, কোনো অসুবিধা হবে না। চলো, ভেতরে চলো।’

কর্তামশাই বৈঠকখানা ঘরে বসে খবরের কাগজ পড়ছিলেন। চোখ তুলে বললেন, ‘অনাথের কাছে তোমার কথা আগেই শুনেছি। তুমি তো গুণীমানুষ হে। ঠিক আছে, কাজে লেগে যাও। পরে একদিন তোমার ম্যাজিক দেখার ইচ্ছে রইল। কিন্তু তুমি দেখো, গাছে গাছে ফুল ফোটানোর কাজটা ম্যাজিশিয়ানদের টুপি থেকে জিনিস বের করার চেয়ে কম আনন্দের নয়। যাই হোক, আপাতত মন দিয়ে কাজ করো। অনাথ, তুমি একে সাধুর কাছে নিয়ে যাও। কাজটাজগুলো একটু বুঝে নিক।’

ঘরের বাইরে এসে অনাথবাবু বলল, ‘সাধু হল এখানকার গার্ডেন-ইন-চার্জ। কিন্তু চলো, তার আগে তোমাকে এবাড়ির সবকিছু ঘুরিয়ে দেখাই। এত বড়ো একখানা তিনমহলা বাড়ি কিন্তু বাস করার মানুষ নেই। মানুষের বদলে সারাবাড়িতে অজস্র বুনো পায়রার বাস। ওপরতলায় কর্তামশাই আর গিন্নিমা থাকেন। নীচের তলায় কাজের লোকজন, মালি, রান্নার ঠাকুর আর আমি—সবসুদ্ধ আটজন থাকি। সারি সারি ঘর ফাঁকা পড়ে আছে।’

এই দ্যাখো, ঠাকুরদালানে নিবারণ পাল ঠাকুর তৈরি শুরু করেছে। পুজোর আর তো বেশি দেরি নেই। এবারে পুজো একটু আগে আগেই পড়েছে। মহালয়ার আগেই কর্তামশাইয়ের ছেলে, বউমা আর নাতনি এসে যাবে। ওরা আমেরিকায় থাকে। প্রতিবছর পুজোর সময় বাড়ি আসে। তখন কয়েকদিন বাড়িটা বেশ জমজমাট হয়ে ওঠে। ফিরে গেলে আবার বাড়িটা খাঁ-খাঁ করে। তুমি যেন বাপু হুট করে কাজটাজ ছেড়ে চলে যেও না।

ওই দ্যাখো, সামনে যে লোকটা বাগানে মাটি কোপাচ্ছে, ওর নাম সাধু। এই যে সাধুবাবা, এদিকে একটু তাকাও, দ্যাখো তো নতুন শিষ্যটিকে পছন্দ হয় কিনা—’

ফটিক কাজে বহাল হয়ে গেল এবং কিছুদিনের মধ্যেই আবিষ্কার করল এই কাজটার মধ্যে এক ধরনের অদ্ভুত আনন্দ আছে। ভাবতে গেলে কেমন অবাক লাগে। মাটিতে একরত্তি চেহারার বীজ ছড়িয়ে দিলে কয়েকদিনের মধ্যেই মাটি ফুঁড়ে অঙ্কুর মাথা তোলে। আরও কয়েকদিনের মধ্যে কোথা থেকে যেন গাছের গায়ে সবুজ পাতারা এসে যায়। দেখতে দেখতে সেই গাছ তরতর করে বেড়ে ওঠে। ডগায় ডগায় কুঁড়ি দেখা দেয়। হঠাৎ এক সকালে চোখে পড়ে সেইসব কুঁড়িরা রং-বেরঙের ফুল হয়ে গেছে। তখন মনে হয় গাছেরা যেন হাসছে। কর্তামশাই ঠিকই বলেছিলেন, এটাও এক আশ্চর্য ম্যাজিক। ফটিক কাজের নেশায় ডুবে গেল।

একদিন ফটিক বাড়ির সবাইকে ম্যাজিক দেখাল।

কর্তামশাই তারিফের গলায় বললেন, ‘বা:, চমৎকার! সত্যিই তুমি শিল্পী মানুষ—জাদুশিল্পী। অনাথ তো তোমার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। অবিশ্যি প্রশংসা করারই কথা, শুনতে পাই বাগানের কাজেও তুমি অত্যন্ত দক্ষ হয়ে উঠেছ। এরা সবাই বলে, গাছগুলোর চেহারাই নাকি পালটে গেছে। আর কে যেন বলছিল, কাজ করতে করতে তুমি নাকি গাছেদের সঙ্গে কথা বলো। এটা কি সত্যি নাকি ফটিক?’

ফটিক লজ্জা পেয়ে মাথা নামিয়েছিল। কথাটা সত্যি। আগে ম্যাজিকের সরঞ্জামগুলো নিয়ে অনুশীলন করার সময় ওদের সঙ্গে আপনমনে কথা বলে যেত। এখন বাগানে গাছেদের সঙ্গে কথা বলে। এটা ফটিকের পুরোনো অভ্যাস।

কর্তামশাই বলেছিলেন, ‘এতে লজ্জার কিছু নেই ফটিক। গাছ আমাদের সবচেয়ে বড়ো হিতৈষী। এরাই পৃথিবীকে দূষণমুক্ত করতে পারে। আমরা না বুঝলেও গাছেদের বোধ আছে, নিজস্ব ভাষাও আছে। তুমি যদি ওদের ভাষা বুঝতে পারো, নিজের কথা বোঝাতে পারো, তাহলে সেটাই হবে পৃথিবীর সেরা ম্যাজিক।’

গিন্নিমা আঁচল থেকে একশো টাকা বের করে ফটিকের হাতে দিয়ে উচ্ছ্বসিত গলায় বলেছিলেন, ‘অতশত জানি না, ফটিকের ম্যাজিক আমার দারুণ ভালো লেগেছে, তাই এটা ওর পাওনা। ফটিক, টাকাটা যেন ‘‘ভ্যানিশ’’ করে দিও না, মিষ্টি খেও।’

টাকাটা দিয়ে মিষ্টি কিনে ফটিক সবাইকে খাইয়েছিল। কিন্তু কর্তামশাইয়ের বলা ‘জাদুশিল্পী’ কথাটা ফটিকের কানে লেগে রইল।

আর কে যেন বলছিল,কাজ করতে করতে তুমি নাকি গাছেদের সঙ্গে কথা বলো। এটা কী সত্যি নাকি ফটিক?

মহালয়ার আগের দিন দুপুর বেলা কর্তামশাইয়ের ছেলে, বউমা আর নাতনি এসে গেল। গাড়ি থেকে মালপত্র নামানোর কাজে হাত লাগাল ফটিক। আর ফাঁকে ফাঁকে তিনজনকে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। এদের সম্পর্কে তার মনে কৌতূহল ছিল। অনাথদা বলছিল এরা আমেরিকায় থাকে। ফটিক এর আগে আমেরিকায় বাস করা কোনো মানুষ দেখেনি। ওর ধারণা ছিল, যারা সাহেবদের দেশে থাকে, তারা এদেশের মানুষের থেকে নিশ্চয়ই কিছুটা আলাদা হয়। কিন্তু এদের খুঁটিয়ে দেখে ফটিক বেশ অবাক হল। কোথাও কোনো পার্থক্য নেই। শুধু কর্তামশাইয়ের সাত-আট বছর বয়সের নাতনি কথার মধ্যে বিস্তর ইংরেজি বলে। বাংলা উচ্চারণেও সামান্য টান আছে। ব্যাস, ওইটুকুই।

অবসর পেলে ফটিক ঠাকুরদালানে গিয়ে নিবারণ পালের প্রতিমা তৈরি করা দেখে। পরদিন দুপুর বেলা ফটিক যখন পুজোর দালানে পৌঁছোল তখন নিবারণ একমনে রঙের কাজ করে যাচ্ছে। ওকে সাহায্য করার জন্য আছে রাম আর বিশু। ফটিক বসে পড়ল।

নিবারণ আড়চোখে ফটিকের দিকে তাকিয়ে ঈষৎ বিরক্তির গলায় বলল, ‘বুঝলে ফটিক, পায়রার উৎপাতে সারাদিন কাজ করাটাই বড়ো মুশকিল হয়। একগাদা পায়রা খড়কুটো-নোংরা ফেলে জায়গাটা একেবারে যাচ্ছেতাই করে দেয়। তুমি এদের জাদুমন্তরে অদৃশ্য করে দিতে পারো না? সামনের বছর থেকে অন্তত মাসখানেকের জন্যও যদি—আরে দিয়া দিদিমণি যে? এসো এসো।’

ফটিক ঘুরে তাকাল। কর্তামশাইয়ের নাতনি এসে দাঁড়িয়েছে। ওর চোখে চোখ পড়তেই রিনরিনে মিষ্টি গলায় মেয়েটা বলল, ‘তুমি ম্যাজিশিয়ান আঙ্কল?’

কোনো কথা না বলে ফটিক একটু হাসল।

‘আমাকে দেখাবে? ম্যাজিক?’

ফটিক দেখল মেয়েটির চোখে-মুখে অসীম আগ্রহ। একে নিরাশ করা যায় না। কিন্তু ভালো কিছু দেখাতে হলে অল্পস্বল্প প্রস্তুতির দরকার হয়। তবু—

ফটিক হাসিমুখে বলল, ‘নিশ্চয়ই দেখাব। কিন্তু এখন মাত্র একটা ম্যাজিক। বেশি দেখলে নিবারণদা কাজ ফেলে রেখে ম্যাজিক দেখতে বসে যাবে। সেটা কি ঠিক হবে?’

দিয়া মাথা নেড়ে বলল, ‘নো। আচ্ছা, তাহলে এখন একটাই হোক।’

ফটিক বলল, ‘নিবারণদা, তোমার কাছে একটুকরো কাগজ আর পেন হবে?’

নিবারণ বলল, ‘তা হবে।’

ফটিক এবারে দিয়াকে বলল, ‘তুমি নিবারণদার কাছ থেকে কাগজ আর পেন নাও, তারপর কাগজের বড়ো করে তোমার নিজের নাম লিখে সেটা আমার হাতে দাও।’

দিয়ার নাম লেখা কাগজটা হাতে নিয়ে ফটিক সেটা ভাঁজ করল। তারপর নিবারণের কাছ থেকে দেশলাই নিয়ে একটা কাঠি জ্বেলে কাগজটা পুড়িয়ে ফেলল। পোড়া কালো ছাইটুকু ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিয়ে বিশুকে বলল, ‘তুই একদৌড়ে বাতাবি লেবুগাছটা থেকে একটা পাকালেবু পেড়ে নিয়ে আয় তো।’

লেবু এল। ফটিক একটা কাটারি দিয়ে লেবুটা দু-টুকরো করে ফেলল। লেবুর মধ্যে থেকে দিয়ার নাম লেখা ভাঁজ করা অক্ষত কাগজটা বেরিয়ে এল।

বিস্মিত দিয়া হাততালি দিতে দিতে চিৎকার করে উঠল, ‘এক্সেলেন্ট পারফরম্যান্স! মার্ভেলাস! আঙ্কল, য়ু আর এ গ্রেট ম্যাজিশিয়ান।’

পরমুহূর্তেই দিয়া এবং বাকি তিনজনের উচ্ছ্বসিত হাততালির শব্দ যেন আরও অজস্র হাততালির শব্দে মিশে গেল। সবিস্ময়ে ফটিক দেখল, পুজোর দালান এবং আশপাশ থেকে অসংখ্য সচকিত পায়রা ডানা মেলছে। ওর মনে হল যেন অগণিত দর্শক ওকে অভিনন্দন জানাচ্ছে। চোখ বুজে মুহূর্তের মধ্যে ফটিক পৌঁছে গেল এক আশ্চর্য স্বপ্নের মঞ্চে। যেখানে জাদুশিল্পী ফটিক এবং অসংখ্য মুগ্ধ দর্শক।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%