হুলুস্থূল

গৌতম দাশ

সবে ভোর হয়েছে। ফাল্গুনের প্রথম দিক। শীত যাই যাই করেও আটকে আছে। তিলোত্তমা সদর দরজা খুলে বাইরের ফুলবাগানে ঢুকলেন। অন্যান্য দিন এতক্ষণে ফুল তোলা হয়ে যায়। আজ ঘুম ভাঙতেই একটু দেরি হয়ে গেছে। সাধারণত বাড়ির সকলের ঘুম ভাঙার আগেই সংসারের বেশ কিছু কাজ সেরে ফেলেন তিলোত্তমা। সংসারটি নেহাৎ ছোটো নয়। দুই ছেলে। বড়ো ছেলে অলক রেলে চাররি করে। ছোটো ছেলে পুলক স্থানীয় স্কুলের গেমস টিচার। দুই ছেলের বউ চিত্রা আর মৌসুমী। অলকের একটি সাত বছরের ছেলে আছে—ঋজু। আর আছেন কত্তামশাই—শিবশংকর মুখুজ্যে। চাকরি থেকে রিটায়ার করেছেন অনেকদিন। এখন বার্ধক্যের সমস্ত সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে বিদ্যমান। চোখ এবং কান দুটোই বেশ কমজোরি। জীবনের প্রথমদিকে উকিল হওয়ার ঝোঁক ছিল। আইন পড়া শুরুও করেছিলেন কিন্তু মাঝে চাকরি পেয়ে যাওয়ায় পাস করা হয়ে ওঠেনি। এখন রোজ সকালে খবরের কাগজ পড়তে পড়তে বিভিন্ন অপরাধমূলক ঘটনাবলিকে আইনের কোন কোন ধারায় ফেলা যায় সেটা নির্ধারণ করাটা তাঁর প্রায় অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে।

সাজিভর্তি ফুল নিয়ে ভেতরের উঠোনে, পা রাখলেন তিলোত্তমা। বাঁ-দিকে ঠাকুরঘর, ডানদিকে রান্নাঘর। রান্নাঘরের বারান্দায় বেশ কিছু চটের বস্তা ডাঁই করা আছে। সেদিকে চোখ পড়তেই তিলোত্তমার মনে হল বস্তাগুলো যেন বেশ এলোমেলো হয়ে রয়েছে। আন্দাজ করলেন, পাশের ঘোষবাড়ির কুকুর ভুলো এসে শুয়ে আছে। দরজা বন্ধ থাকলেও নীচু পাঁচিল ডিঙিয়ে কুকুরটা যখন খুশি চলে আসে। ঋজুর প্রশ্রয়ে ভুলোর এ বাড়িতে অবাধ গতি। যদিও তিলোত্তমার সেটা মোটেই পছন্দ নয়। সকালবেলাতেই মেজাজ বিগড়ে গেল। তিনি পরিচ্ছন্নতা ভালোবাসেন। এক্ষুনি আবার সবকিছু ধোয়ামোছা করতে হবে।

ঠাকুরঘরে ফুলের সাজি রেখে একটা লাঠি নিয়ে তিলোত্তমা রান্নাঘরের দিকে এগোলেন। আজ দু-ঘা কষাতেই হবে। যেমন কুকুর, তেমনি মুগুর।

কিন্তু বারান্দার সামনে পৌঁছেই মারাত্মক চমকে উঠলেন। ভুলো নয়, বস্তাগুলো পেতে তার ওপর একটা লোক শুয়ে আছে। ঘুমোচ্ছে। গায়ে একটা হলুদ রঙের চাদর। মনটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। নির্ঘাৎ একটা চোর। চুরি করতে এসে হঠাৎ শরীর-টরীর খারাপ হয়েছে। শুয়ে পড়েছে। তারপর ঘুম এসে গেছে। কী সর্বনাশ!

তিলোত্তমা পায়ে পায়ে পিছিয়ে গিয়ে ঘরের দিকে ছুটলেন। লাঠি ফেলে বারান্দায় উঠে দেখলেন, বড়ো বউ চিত্রা সবে ঘরের দরজা খুলে বেরিয়ে এসেছে। তাঁকে দেখে হাসি হাসি মুখে বলল, ‘ভোর বেলা এমন চমৎকার একটা স্বপ্ন দেখছিলাম, আমাদের বাড়িতে যেন এক মহাপুরুষের আবির্ভাব হয়েছে, ইয়া বড়ো জটা, গলায় রুদ্রাক্ষের মালা—’

তিলোত্তমা তাকে থামিয়ে দিয়ে নীচু গলায় বললেন, ‘বাড়িতে বোধ হয় একটা চোর ঢুকেছে। অলককে ডাকো, পুলককেও ডাকো।’

চিত্রা সভয়ে দু-পা পিছিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে বলল, ‘কোথায়?’

তিলোত্তমা শিবশংকরের ঘরের দিকে যেতে যেতে জবাব দিলেন, ‘রান্নাঘরের বারান্দায়। ঘুমোচ্ছে।’

কত্তার ঘরে ঢুকে দেখলেন, তিনি মর্নিং ওয়াকের জন্য তৈরি হচ্ছেন। গঙ্গার ধারে তাঁদের বাড়ি। রোজ ভোরবেলা শিবশংকর এবং আরও কয়েকজন গঙ্গার ধারে খানিকক্ষণ হাঁটাহাঁটি করেন।

তিলোত্তমা চাপা গলায় তাঁকে খবরটা জানালেন, ‘ডাকাত কি চোর জানা নেই, বাড়িতে একজন কেউ এসেছে।’

শিবশংকর বিস্মিত হয়ে বললেন, ‘এত সকালে এল কেমন করে? ওরা সবাই ভালো আছে তো? কিশোরকে বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখলে নাকি? এতদূর থেকে এল!’ বলে হন্তদন্ত হয়ে ঘর থেকে বেরোবার উপক্রম করলেন।

তিলোত্তমা বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘তুমি কি কানের মাথা একেবারে খেয়ে বসে আছো? কিশোর ঠাকুরপো এত সকালে কুড়ি মাইল রাস্তা পেরিয়ে আসবে কেমন করে?’

কিশোর শিবশংকরের মাসতুতো ভাই। মাঝে মাঝে বেড়াতে আসেন। শিবশংকর দাঁড়িয়ে গিয়ে অবাক গলায় বললেন, ‘তাহলে তুমি কার কথা বললে?’

তিলোত্তমা একটু উঁচু গলায় বললেন, ‘কিশোর নয়, চোর—চোর এসেছে বাড়িতে।’

শিবশংকর যতখানি তৎপরতার সঙ্গে ঘর থেকে বের হতে যাচ্ছিলেন, তার চেয়েও দ্রুত পিছিয়ে গিয়ে বিছানায় বসে পড়লেন। তারপর বেশ উদবেগের সঙ্গে বললেন, ‘তা কী কী নিয়ে গেল? মিলিয়ে দেখেছ?’

তিলোত্তমা বললেন, ‘এখনও চলে যায়নি। রান্নাঘরের বারান্দায় শুয়ে ঘুমোচ্ছে।’

শিবশংকর একটু ভেবে নিয়ে বললেন, ‘যায়নি? তাহলে তুমি একটা কাজ কর, আলমারির দু-নম্বর তাক থেকে তিন নম্বর বইটা আর আমার চশমাটা দাও তো।’

তিলোত্তমা অবাক হয়ে বললেন, ‘এখন বই নিয়ে কী করবে?’

শিবশংকর বেশ চিন্তিত গলায় বললেন, ‘চোরটা এখনও যখন জিনিস নিয়ে চলে যায়নি, তখন চুরির কেস টিকবে না। ওর বিরুদ্ধে অনধিকার প্রবেশের মামলা ঠুকে দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু সেটা কত নম্বর ধারা ঠিক মনে পড়ছে না তো।’

তিলোত্তমা ঝাঁঝিয়ে উঠলেন, ‘ধুত্তোর, রাখো তো তোমার ধারাপাত। বুড়ো বয়সে যতসব বিটকেল বুদ্ধি।’

ওদিকে চিত্রা মৌসুমীকে ডেকে ব্যাপারটা বলে নিজের ঘরে গিয়ে ঢুকল। অলক আর ঋজু কম্বলের নীচে। অলক জেগেই ছিল, মায়ের কথাও কানে এসেছে কিন্তু ওঠেনি। প্রায় নাক পর্যন্ত কম্বল টেনে ঘাপটি মেরে শুয়েছিল। চিত্রাকে ঘরে ঢুকতে দেখে তাড়াতাড়ি চোখ বুজে ফেলল।

চিত্রা চাপা গলায় বলল, ‘ওগো শুনছ, বাড়িতে নাকি চোর ঢুকে বসে আছে!’

অলকের চোখ একমুহূর্তের জন্য খুলে গিয়ে আবার বন্ধ হয়ে গেল। তড়িঘড়ি মুন্ডুটাও কম্বলের নীচে সেঁধিয়ে গেল। সেখান থেকে অস্পষ্ট স্বর ভেসে এল, ‘ইয়ে—আমার শরীরটা মোটেই ভালো ঠেকছে না। চেঁচামেচি না করে কাউকে চট করে একবার থানায় পাঠিয়ে দাও। মোড়ের মাথা থেকে একটা রিকশা ধরে নিজেও চলে যেতে পারো। কতটুকুই বা রাস্তা।’

চিত্রা বেশ রাগী গলায় বলল, ‘আমি থানায় যাব আর তুমি কম্বলের নীচে ডুব-সাঁতার দেবে? বলিহারি!’

ঋজু তড়াক করে লাফিয়ে উঠল, ‘মা আমি চোর দেখব।’

হঠাৎ কম্বলের নীচ থেকে অলকের একটা হাত বেরিয়ে এসে খপ করে ঋজুর হাত চেপে ধরল। চাপাস্বর শোনা গেল, ‘কী ডানপিটে ছেলেরে বাবা! ওরে, আগে পুলিশ-টুলিশ এসে চোরটাকে বাঁধাছাঁদা করুক, তারপর দেখিস। এখন শুয়ে পড়, শিগগির শুয়ে পড়।’

এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে নিয়ে ঋজু ছুটে বেরিয়ে গেল। পেছন পেছন চিত্রা।

তিলোত্তমা শিবশংকরের ঘর থেকে ছোটো ছেলে পুলকের গলা পেয়ে বেরিয়ে এলেন। দেখলেন, পুলক তার নিজের ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে নীচু গলায় তড়পাচ্ছে।

‘ছেড়ে দাও আমাকে। ব্যাটার কান ধরে হিড়হিড় করে টেনে থানায় নিয়ে যাই। একটা ছিঁচকে চোরের এত সাহস আমাদের বাড়িতে চুরি করতে ঢোকে? আমাকে বাধা দিও না, ছেড়ে দাও—’

অবিশ্যি কেউই পুলককে ধরে আটকে রাখেনি। ঘরের মধ্যে নির্বিকার মুখে মৌসুমী বিছানা গোছাচ্ছিল। তা ছাড়া ঘরের দরজা ছেড়ে পুলক এক পা-ও এগোয়নি। ছেলের কান্ড দেখে তিলোত্তমা মুখ বেঁকিয়ে মন্তব্য করলেন, ‘তোর তিড়িং-বিড়িং থামা তো বাপু। তোদের রকমসকম দেখে আমার গা-পিত্তি জ্বলে যাচ্ছে। বড়োবাবু কোথায় গেল? সে কি খাটের নীচে ঢুকে বসে আছে নাকি?’

ঋজু ফিক করে হেসে বলল, ‘না ঠাকুমা, বাবা কম্বলের নীচে লুকিয়ে পড়েছে।’

শিবশংকর বেশ নড়বড়ে পায়ে বেরিয়ে এসে বারান্দার চেয়ারে ঝুপ করে বসে পড়লেন। পুলক তার ঘরের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল।

সেই মুহূর্তে পাড়ার অনাথ গাঙ্গুলি আর সুশান্ত ঘোষ দরজা দিয়ে ঢুকে উঠোনে এসে দাঁড়ালেন। দু-জনেই শিবশংকরের সঙ্গে মর্নিং ওয়াক করেন। তাঁর দেরি দেখে খবর নিতে এসেছেন। অনাথ গাঙ্গুলি হাঁক দিলেন, ‘কই শিবুদা, আজ তোমার আবার কী হল? বেরোলে না যে। শরীর ঠিক আছে তো—’

বারান্দার দিকে চোখ পড়তেই অনাথ গাঙ্গুলির কথা মাঝপথে আটকে গেল। দেখলেন, তিলোত্তমা ঠোঁটের ওপর আঙুল রেখে চুপ করে থাকার ইশারা করছেন আর শিবশংকর একটা চেয়ারে বসে হাতছানি দিয়ে উঠে আসতে বলছেন। দুজনেই ভড়কে গিয়ে তাড়াতাড়ি বারান্দায় উঠে এলেন।

তিলোত্তমা ফিসফিস করে বললেন, ‘আমাদের বড়ো বিপদ ভাই।’

সুশান্ত ঘোষ একবার শিবশংকরের দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে বেশ দুঃখের গলায় বললেন, ‘আর বলতে হবে না বউদি, বুঝতে পেরেছি। আহা রে, দাদার তাহলে শেষপর্যন্ত হার্ট অ্যাটাকই হয়ে গেল! ভাবা যায় না। বুঝলে অনাথদা, যে মুহূর্তে দেখলাম দাদা কথা বলতে পারছেন না, ইশারায় আমাদের ডাকছেন তখনই আমার মন কেঁদে উঠল। মুখখানাও খুব ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে। অবস্থা তো মোটেই ভালো নয়। দাদাকে এখানে বসিয়ে না রেখে ধরাধরি করে ঘরে নিয়ে গিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিলেই বোধ হয় ভালো হত। মর্নিং ওয়াকে বেরোবার মুখেই বোধ হয় এটা হয়ে গেল, না বউদি? একজন ডাক্তারকে তো ডাকতে হয়। ছেলেরা সব কোথায় গেল? দেখেছ অনাথদা, কার যে কখন বিপদ ঘনিয়ে আসে, কেউ বলতে পারে না। এই তো সেদিন ভরদুপুরে ঘুমেরই মধ্যে চলে গেল কানাই কুন্ডু—’

তাঁকে থামিয়ে দিয়ে শিবশংকর খিঁচিয়ে উঠলেন, ‘তোমার মুন্ডু।’

সুশান্ত ঘোষ হকচকিয়ে গিয়ে বললেন, ‘সেকি? আপনি সুস্থ আছেন? তাহলে বিপদটা কী?’

শিবশংকর আঙুল দিয়ে রান্নাঘরের দিকে দেখিয়ে বললেন, ‘একটা চোর ওখানে শুয়ে আছে। ঘুমোচ্ছে বোধ হয়। বিপদটা ওখানে।’

দু-জনেই বারান্দা থেকে সাধ্যমতো উঁকিঝুঁকি মেরে দেখতে চেষ্টা করলেন কিন্তু কিছু দেখা গেল না। অনাথ গাঙ্গুলি বেশ চিন্তিত স্বরে বললেন, ‘উঁহু শিবুদা, এ লোক চোর নয়। এলেবেলে চোর হলে কি আর সকাল পর্যন্ত এখানে শুয়ে ঘুম দিত? চুরির মালপত্র বিলিবন্দোবস্ত করে এতক্ষণে নিজের বাড়ি ফিরে খাওয়া-দাওয়া সেরে নিশ্চিন্তে নাক ডাকাত। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, এ লোকটা ডাকাত। সেদিন কে যেন বলছিল, আজকালকার ডাকাতদের রাতের বেলায় ডাকাতি করলে নাকি প্রেস্টিজ থাকে না। অন্যান্য দলের আর পাঁচজন ডাকাত নাকি সেটা নিয়ে বড্ড হাসাহাসি করে। এ লোকটা যে কারণেই হোক রাতের বেলায় ঢুকে পড়েছে বটে কিন্তু প্রেস্টিজ যাবার ভয়ে ডাকাতি করতে পারেনি। তাই দিনের আলো ফোটার জন্য অপেক্ষা করছে। সাঙ্গোপাঙ্গরাও নিশ্চয়ই কাছে-পিঠে আছে। ওরা এলে ধীরে-সুস্থে বন্দুক-পিস্তল উঁচিয়ে সবকিছু নিয়ে বুক ফুলিয়ে সবার চোখের সামনে দিয়ে গটগট করে চলে যাবে। উঃ, কী দিনকালই এল দাদা!’

পুলক ঘর থেকে বেরিয়ে এসে পেছন থেকে সব কথা শুনছিল। এখন এগিয়ে এসে ফ্যাশাশে মুখে বলল, ‘তাহলে উপায়? আগ্নেয়াস্ত্রের কাছে তো গায়ের জোর চলবে না। এখন কী হবে কাকু?’

অনাথ গাঙ্গুলি নিজের কপালে হাত দিয়ে বিমর্ষ গলায় বললেন, ‘সবই বরাত রে বাবা। এখানে লেখা থাকলে কার সাধ্য সেটা খন্ডায়? এখন ওপরওয়ালার ওপর ভরসা রাখ। তিনি রাখলে রাখবেন, মারলেও কিছু করার নেই। মানুষ নিমিত্ত মাত্র। অবিশ্যি বাড়ি থেকে বেরোতে পারলে পাড়ার লোকজনদের জড়ো করার একটা চেষ্টা করা যেত; কিন্তু যেতে তো হবে ডাকাতটার পাশের ওই দরজা দিয়ে। তবে যেতে আমিই পারতাম। নিজের জন্য ভাবি না, কিন্তু তোমাদের কথা ভেবেই সাহস হয় না বাপু। ইতিমধ্যে যদি ডাকাতটার ঘুম ভেঙে গিয়ে থাকে আর আমাকে দেখে হঠাৎ গুলি-টুলি চালিয়ে দেয় তাহলে এই সাতসকালে তোমাদের হয়রানির আর শেষ থাকবে না। নিজের প্রাণের আগে সে কথাটা ভাবতে হবে। তোমাদের এপাশে তো বোধ হয় কোনো দরজা-টরজাও নেই?’

এতক্ষণে অলক বেরিয়ে এসেছে। সে শুকনো মুখে বলল, ‘না কাকু, এদিকে তো কোনো দরজা নেই। তবে বাথরুমের জানালাটায় শিক দেওয়া নেই। কিন্তু সেটা এত ছোটো যে সেখান দিয়ে কোনো বড়ো মানুষের পক্ষে বেরিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।’

ঋজু সোৎসাহে বলল, ‘আমি পারি। একদিন মা আমাকে বাথরুমে আটকে রেখেছিল। আমি চৌবাচ্চার ওপর উঠে ওই জানালা দিয়ে বাইরে পালিয়েছিলাম।’

শেষপর্যন্ত তাই হল। ঋজুকে ধরাধরি করে জানালা দিয়ে বাইরে পাচার করা হল। নির্দেশ দেওয়া হল, আশপাশের বাড়িতে খবরটা জানিয়ে যেন কয়েকজনকে জোগাড় করে আনে।

মিনিট কুড়ির মধ্যেই উঠোনের দরজায় উঁকিঝুঁকি, তারপর কয়েকজন সাহস করে একসঙ্গে দ্রুতবেগে উঠোন পেরিয়ে এদিকে চলে এল। এরপর ছোটোখাটো জনতা রান্নাঘরের বারান্দার সামনে। হলুদ চাদর চাপা দিয়ে লোকটা তখনও ঘুমোচ্ছিল।

ঋজু বলল, ‘আমি ঢিল ছুড়ব?’

অনাথ গাঙ্গুলি আঁতকে উঠে বললেন, ‘কী সর্বনাশ, খবরদার ও কাজ করো না দাদু! ওদের কাছে বোমা-পিস্তল-টিস্তল থাকে। খেপে গিয়ে ওসব ছুড়লে এক্ষুনি রক্তগঙ্গা বয়ে যাবে। তার চেয়ে আমরা খানিকক্ষণ অপেক্ষা করি। সকাল হয়ে গেছে, ঘুম তো ভাঙবেই।’

লোকটা ওপাশ ফিরে শুয়ে ছিল। সম্ভবত কথাবার্তার শব্দে জেগে উঠে এদিকে ফিরে চোখ খুলল। তারপর ধড়মড় করে উঠে বসল। সঙ্গে সঙ্গে জনতা হুড়মুড় করে কয়েকহাত পিছিয়ে গেল। অলক অন্য কারও পায়ে বেধে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল। শুধু ঋজু একাই বারান্দার সামনে দাঁড়িয়েছিল। সে বলল, ‘তুমি চোর না-ডাকাত?’

লোকটা বেশ মজার গলায় বলল, ‘তোমার কি তাই মনে হয়? কে বলেছে একথা?’

ঋজু পেছন দিকে ফিরে অনাথ গাঙ্গুলির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘দাদুরা বলাবলি করছিল।’

অনাথ গাঙ্গুলি শশব্যস্তে সবেগে মাথা নেড়ে বললেন, ‘আমি কিছু বলিনি বাবা। পাঁচজন বলাবলি করছিল কিন্তু কথাটা আমার বিশ্বাস হয়নি। আমিই বরং ওদের বুঝিয়ে বলছিলাম, কেমন সুন্দর রাজপুত্রের মতো ফুটফুটে চেহারা, দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। এ মানুষ কি কখনো চোর-ডাকাত হতে পারে? নিশ্চয়ই তোমাদের ভুল হচ্ছে বাপু। মানুষ চিনতে আমার বিশেষ ভুল হয় না। পরে আমার কথা মিলিয়ে নিও।’

লোকটা মাথা নেড়ে বলল, ‘হ্যাঁ, এটা আপনি ঠিকই আন্দাজ করেছেন। আমি চোর কিংবা ডাকাত নই।’

তিলোত্তমা এগিয়ে এসে বললেন, ‘তোমার কথাটা মেনে নিলেও কিন্তু আমাদের দুশ্চিন্তা থেকেই যায়। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে দেখছি একজন অচেনা মানুষ আমাদের বাড়িতে শুয়ে ঘুমোচ্ছে। দিনকাল তো ভালো নয়। মানুষটা কে, কোথা থেকে এল, কেন এল, কোথায় যাবে এগুলো না জানা পর্যন্ত আমাদের দুশ্চিন্তা কাটে? তুমিই বল বাবা?’

লোকটি বেশ অপ্রস্তুত মুখে বলল, ‘আজ্ঞে হ্যাঁ, সেকথা একশোবার সত্যি। সেজন্য আমি মাপ চাইছি। কিন্তু এটা না করলে আমার কষ্ট অনেক বেড়ে যেত মাসিমা। আসলে আমি একজন মেকানিক। গঙ্গার ওপারে পেপার মিলের একটা মেশিন বিগড়ে গেছে। কাল বিকালে হেডঅফিস থেকে আমাকে পাঠানো হয়। সবকিছু ঠিকঠাক চললে সন্ধ্যের মধ্যেই আমার ওপারে পৌঁছে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মাঝপথে প্যান্টোগ্রাফ ভেঙে ট্রেন আটকে গেল। যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি করেও এখানে এসে দেখলাম খেয়া বন্ধ হয়ে গেছে। তখন বেশ মুশকিলে পড়ে গেলাম। হয় অত রাতে ফের চার কিলোমিটার হেঁটে স্টেশনে গিয়ে রাত কাটাতে হবে, নইলে গঙ্গার ধারে খোলা জায়গায় সারারাত বসে থাকতে হবে। মনে হল, যাহোক করে এখানেই কোথাও রাতটা কাটিয়ে দিতে পারলে সবচেয়ে ভালো হয়। কেননা তাহলে সকালেই প্রথম খেয়া ধরে ওপারে পৌঁছে যাওয়া যায়। কিন্তু এখানে আমার চেনাশোনা কেউ নেই। আর অচেনা লোককে কে-ই বা আশ্রয় দেবে বলুন?

তিলোত্তমা এগিয়ে আসে বললেন, ‘তোমার কথাটা মেনে নিলেও কিন্তু আমাদের দুর্শ্চিন্তা থেকেই যায়।

কী করব ভাবতে ভাবতে আপনাদের বাড়ির সামনে এসে মাথায় দুষ্টুবুদ্ধি চাপল। নীচু পাঁচিল ডিঙিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়লাম। রাতবিরেতে চলাফেরা করতে হয় বলে আমার ব্যাগে যন্ত্রপাতির সঙ্গে একটা টর্চও থাকে। সেটা জ্বেলে দেখলাম এখানে একগাদা বস্তা পড়ে রয়েছে। আর কী চাই? তবে ভেবেছিলাম, বাড়ির লোকজন জেগে ওঠায় আগেই পালাব, কিন্তু ভোর বেলা ঘুমটা ভাঙল না বলে ধরা পড়ে গেলাম। এখন আপনারা মারুন-কাটুন, যা ইচ্ছে করুন।’

শিবশংকর গম্ভীর গলায় বললেন, ‘তুমি অত ফিসফিস করে কথা বললে কেন হে? অর্ধেক কথা তো শুনতেই পেলাম না। যা বলার একটু চেঁচিয়ে বলো বাপু। ইদানিং আমার কানটা—’

সুশান্ত ঘোষ শিবশংকরের কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে বললেন, ‘ও বলছে ও চোর-ডাকাত নয়।’

শিবশংকর মাথা নেড়ে লোকটির দিকে ফিরে বললেন, ‘চুরি-ডাকাতির কেস টিকবে না ঠিকই কিন্তু অধিকার প্রবেশের দায়ে তোমার বিরুদ্ধে মামলা করা যায়, সেটা জানো? কত নম্বর ধারায় পড়বে সেটা অবিশ্যি এক্ষুনি মনে পড়ছে না। বইটা একবার দেখতে হবে।’

তিলোত্তমা ধমকে উঠলেন, ‘উঃ, আবার তোমার সেই ধারাপাত? হ্যাঁ, তোমার নামটা কী বাবা?’

লোকটি সবিনয়ে বলল, ‘আজ্ঞে আমার নাম বিশ্বনাথ।’

তিলোত্তমা বললেন, ‘কাল রাতে বোধহয় তোমার খাওয়া-দাওয়া কিছু জোটেনি। তাই তো?’

বিশ্বনাথ সলজ্জে বলল, ‘তাতে কোনো অসুবিধা নেই। ও আমার অভ্যাস হয়ে গেছে। আপনারা অনুমতি দিলে এবারে আমি বিদায় নিই।’

তিলোত্তমা বললেন, ‘গেরস্তবাড়ি থেকে সকালবেলা বাসিমুখে চলে যাবে, সেটা কখনো হয়? তুমি উঠে এসো, মুখ-হাত ধোও। একটু চা-জলখাবারের বন্দোবন্ত করি। সেটা খাওয়ার পরে যেও।’

অনাথ গাঙ্গুলি বললেন, ‘আমরা তাহলে আসি বউদি?’

তিলোত্তমা হাসিমুখে বললেন, ‘না না, আপনারা সবাই একটু বসুন। প্রথমে চা, তারপর গরম গরম লুচি—’

ঋজু শিবশংকরের কানে কানে ফিসফিস করে জিজ্ঞাসা করে, ‘দাদু এটা কোন ধারা?’

শিবশংকর খুব আশ্চর্যজনকভাবে কথাটা ঠিকঠাক শুনতে পেলেন এবং মজার গলায় উত্তর দিলেন, ‘নির্ভেজাল আনন্দধারা দাদু।’

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%