রাতকুটুম

গৌতম দাশ

ইতিহাসের অধ্যাপক শিবেন চক্রবর্তী রাত দশটায় ডিনার সেরে নিয়ে তাঁর পড়ার ঘরে গিয়ে বইয়ের জগতে ডুবে যান। রাত একটার আগে ওঠেন না। গৃহিণী মন্দিরা পাশের টেবিলে একগ্লাস জল আর ঘড়িতে অ্যালার্ম দিয়ে রেখে যান। রাত একটায় পাড়া কাঁপিয়ে অ্যালার্ম বাজে। প্রতিরাতেই শিবেনবাবু প্রথমে বেজায় চমকে ওঠেন। তারপর বিরক্তমুখে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বিড় বিড় করেন, ‘ব্যাস, ঘড়িবাবু বাজনা বাজিয়ে দিলেন। এবারে না-উঠে উপায় নেই।’ দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাত বাড়িয়ে ঘড়ির বাজনা বন্ধ করেন। বিরস মুখে গ্লাসের জলটুকু খেয়ে শুতে চলে যান। বহুকাল ধরেই এই নিয়মের কোনো নড়চড় হয়নি।

অনেকদিন আগে এক রাতে মন্দিরা ঘড়িতে অ্যালার্ম দিতে ভুলে গিয়েছিলেন। শিবেনবাবুর পড়ায় কোনোরকম ব্যাঘাত ঘটেনি। হঠাৎ একঝাঁক কাকের চিৎকারে চমকে উঠে মুখ ঘুরিয়ে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে হকচকিয়ে গেলেন। আবছা অন্ধকারে চোখে পড়ল উলটোদিকে পটলবাবুর বাড়ির ওপাশের মাঠে গেঞ্জি আর হাফপ্যান্ট পরা বেশ কয়েকজন লোক ব্যস্ত হয়ে ছোটাছুটি করছে। শিবেনবাবু অবাক হয়ে আপনমনে বলে উঠলেন, ‘দেখেছ কান্ড, ফুটফুটে জ্যোৎস্নারাত বলে ছেলেগুলো ঘুম-টুম বাদ দিয়ে মনের আনন্দে ফুটবল খেলছে। পাগল আর কাকে বলে।’ কিন্তু মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই মন্দিরা এসে বই হাতে শিবেনবাবুকে দেখে আরও অবাক হয়ে বলে উঠলেন, ‘সে কি গো, তুমি কাল সারারাত শোওনি? এই ভোর বেলা পর্যন্ত বইমুখে বসে আছ? পাগল হয়ে গেলে নাকি।’

শিবেনবাবু আমতা আমতা করে বললেন, ‘তাই নাকি? এত তাড়াতাড়ি ভোর হয়ে গেল? ইয়ে—তাহলে কালিতলার মাঠে ওরা বোধ হয় মর্নিং ওয়াক কিংবা জগিং-টগিং করছে। আমি তো ভাবলুম, জ্যোৎস্নারাত পেয়ে ছেলেগুলো রাতদুপুরে মাঠে ফুটবল প্র্যাকটিস করছে। কিন্তু অ্যালার্ম তো বাজেনি? উঁহু সারারাত আমি কান পেতেই ছিলুম। এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন ঘড়ি ঘরে রাখাও তো মুশকিল বাপু। না হয় দু-ঘণ্টা পরেই বাজনা বাজাত, কিন্তু বাজানো উচিত ছিল। আজ কলেজে ক্লাস নিতে গিয়ে আমি নির্ঘাৎ ঘুমিয়ে পড়ব। স্টুডেন্টরা হাসাহাসি করবে। কী মুশকিলেই পড়লুম রে বাবা!’

মন্দিরা ঝাঁঝিয়ে উঠলেন, ‘আজ রবিবারে আবার তোমার কলেজ আসছে কোত্থেকে?’

শিবেনবাবু স্বস্তির গলায় বললেন, ‘আজ রবিবার নাকি? বাঁচা গেল। অন্য কোনো বার হলে কী বিপদেই পড়তে হত, বলো দেখি।’

নিয়মমাফিক সে-রাতেও শিবেনবাবু তন্ময় হয়ে ইতিহাসের নানা কান্ডকারখানার মাঝে বিচরণ করছিলেন। হঠাৎ তাঁর মনে হল, মোলায়েম গলায় কেউ যেন বলছে, ‘স্যার, আপনি শুতে যাবেন না?’ বই থেকে চোখ না তুলে খুব অন্যমনস্কভাবে শিবেনবাবু বললেন, ‘দাঁড়াও বাপু, এত তাড়া কীসের? অ্যালার্ম কি বেজেছে?’

গলাটা তাঁকে জানিয়ে দিল, ‘প্রায় ঘণ্টাখানেক এখানে ঘোরাঘুরি করছি স্যার, তার মধ্যে বাজেনি?’

শিবেনবাবু আগের মতোই বললেন, ‘তাহলে এক্ষুনি শুতে যাবার কথা উঠছে কেন?’

স্বরটা একটু করুণ হয়ে গেল, ‘স্যার, এখানে বড্ড মশার উৎপাত। আর খানিকক্ষণ দাঁড়াতে হলে শরীরের পুরো ব্লাডটাই ডোনেট করে দিতে হবে।’

সেই মুহূর্তে শিবেনবাবু দু-হাজার বছর আগের রোম সাম্রাজ্যের সংকটের খুঁটিনাটি নিয়ে বেশ ব্যস্ত ছিলেন। সুতরাং, কথাগুলো খুব আবছাভাবে তাঁর কাছে পৌঁছোল। তিনি খানিকক্ষণ পরে আলতোভাবে বললেন, ‘তা ব্লাড ডোনেশন তো বেশ ভালো কাজ, কত মুমূর্ষু মানুষের প্রাণ বেঁচে যায়। তোমার কোন গ্রূপের রক্ত?’

হঠাৎ তাঁর মনে হল, তাই তো, এখন তো কারও এত কথা বলার কথা নয়। রোম সাম্রাজ্য থেকে চোখ তুলে দেখলেন জানালার বাইরে একজন অচেনা রোগা পাতলা লোক দাঁড়িয়ে আছে। শিবেনবাবু বেশ বিরক্ত গলাতেই বললেন, ‘কে হে বাপু তুমি? দিলে তো মনোযোগটা ভণ্ডুল করে?’

লোকটি বিনয়ে গলে গিয়ে বলল, ‘বলবার মতো তেমন কেউ নই, স্যার। পেটের তাগিদে রাতবিরেতে ঘোরাঘুরি করে সামান্য কাজ-টাজ করতে হয়। আমাকে একজন নাইট ডিউটি করা হতদরিদ্র মানুষ বলতে পারেন, স্যার। এখন আপনার সাহায্যপ্রার্থী।’

শিবেনবাবু বিব্রত মুখে বললেন, ‘তাই তো, বড়ো মুশকিলে ফেললে হে। এই দুপুর রাতে তুমি সাহায্য চাইছ? এখন সেটা কীভাবে সম্ভব? সন্ধ্যেবেলায় আসলেও না হয় আলমারি খুলে তোমাকে সাধ্যমতো কিছু দেওয়া-টেওয়া যেত। কিন্তু এই নিশুতি রাতে সে আলমারি খোলার সাহস আমার নেই, বাপু।’

লোকটি নিরীহ গলায় জিজ্ঞাসা করে, ‘কেন স্যার?’

শিবেনবাবু জবাব দিলেন, ‘আলমারিটা প্রায় মান্ধাতার আমলের জিনিস। আমার বাবা অনেক জিনিসের সঙ্গে ওই আলমারিটাও নিলামে কিনেছিলেন। ওটার হাতল ধরে ঘোরালে ভূতুড়ে বাড়ির দরজা খোলার মতো ক্যাঁ-চ, তারপর টান দিলে বন্দুক ছোড়ার মতো এমন একটা বিকট শব্দ করে যে লোকজনের পিলে চমকে যায়। এখন ওটা খুলতে গেলে এ বাড়ির এবং আশপাশের আরও কয়েকটা বাড়ির সকলের ঘুম ভেঙে যাবে। ছোটো ছোটো বাচ্চাগুলো কান্না জুড়ে দেবে। পাড়ার কুকুরগুলো তারস্বরে ঘেউ ঘেউ করে উঠবে। মোটকথা, একটা বিচ্ছিরি কান্ড হবে। সেইজন্য সন্ধ্যের পর পারতপক্ষে আমরা কেউ আলমারিতে হাত দিই না। বাবার স্মৃতি বলে ওটাকে বাতিল করতেও পারি না। ওই আলমারি নিয়ে অনেক গল্প আছে। একটা বলি, শোনো।

‘অনেকদিন আগে, বুঝলে, মহালয়ার ভোর বেলায় আমার বাবা তর্পণের বস্ত্র নেওয়ার জন্য আলমারিটা খুলেছিলেন। ঠিক সেই সময় পাড়ার একটি ছোটো ছেলে বাগানের ফুলচুরি করার জন্য পাঁচিলে উঠেছিল। ধরো, এই সূত্র দুটো যদি তোমাকে দেওয়া হয়, এরপরে কী ঘটেছিল, সেটা আন্দাজ করতে পারো?’

লোকটি বিজ্ঞের গলায় বলল, ‘আজ্ঞে তা আর পারি না? এ তো জলের মতো সোজা। ছেলেটা ফুলচুরি বন্ধ করে পাঁচিল থেকে উঁকি মেরে আলমারির ভেতরের টাকাপয়সার জায়গাটা দেখে রাখল। তারপর একদিন ঝোপ বুঝে কোপ মারল। আর মেসোমশাই যদি সেই সময়ে অন্যমনস্ক হয়ে আলমারি খুলে রেখে বাইরে চলে গিয়ে থাকেন তাহলে তো ছেলেটার পোয়াবারো। তক্ষুনি টুক করে ঘরে ঢুকে টাকাপয়সাগুলো হাতিয়ে নিয়ে চম্পট দিল। ঠিক বলেছি তো, স্যার?’

শিবেনবাবু অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘দশে একটা বড়োসড়ো শূন্য পেলে। আমার ছাত্র হলে তোমাকে আমি নিলডাউন করিয়ে দিতুম। বন্যেরা বনে সুন্দর, নির্বোধরা নিলডাউনে। আসলে যেটা হয়েছিল, হঠাৎ আলমারি খোলার বিকট শব্দে ছেলেটা চমকে উঠে পাঁচিল থেকে উলটে পড়ে মূর্ছা-টুর্ছা গিয়ে এক কেলেংকারি কান্ড। তারপর জল-বাতাস-ডাক্তার ইত্যাদি। এরপর থেকে আমাদের বাগানে ফুলচুরি বন্ধ হয়ে গেল। তুমি বরং কাল সকালে এসো। দেখা যাক, কতদূর কী করা যায়।’

লোকটি বলল, ‘আজ্ঞে আমি সেরকম সাহায্যের কথা বলিনি, স্যার। অবিশ্যি একটা পঞ্চাশ টাকার নোট আপনার পকেটে আছে। তবে সেটা আমি চাই না।’

শিবেনবাবু অবাক হয়ে বললেন, ‘আছে নাকি? কই জানি না তো।’ বলে ব্যস্ত হয়ে পাঞ্জাবির বুকপকেটে হাত ঢোকাতে গেলেন।

লোকটি বাধা দিয়ে বলে উঠল, ‘উঁহু, বুকপকেটে নয়। একটু আগে আপনি রুমাল ভেবে ভুল করে পঞ্চাশ টাকার নোটটা দিয়ে মুখের ঘাম মুছে পাশ-পকেটে রেখেছেন। তা ওটা ওখানেই থাক। সামান্য পঞ্চাশ টাকায় আমার আর কতটুকু সাশ্রয় হবে বলুন? স্যার, তার চেয়ে আপনি যদি এখন লাইট নিভিয়ে শুতে চলে যান, তাহলেই আমাকে ভালোরকম সাহায্য করা হবে।’

শিবেনবাবু বিমূঢ়ভাবে বললেন, ‘কী হে? বুঝলুম না তো কিছু।’

লোকটি বেশ নরম গলায় বোঝানোর চেষ্টা করে, ‘দেখুন স্যার, আপনার ঘরের লাইট সোজা গিয়ে পড়ছে পটলবাবুর বাড়ির জানালায়। ওই জানালাটা দিয়েই আমার কাজ শুরু করার কথা। অন্ধকার হলে আমার কাজের বেশ সুবিধা হয়, এই আর কী। এবারে বুঝলেন তো?’

শিবেনবাবু মাথা নেড়ে বললেন, ‘না হে, ব্যাপারটা আরও গুলিয়ে গেল। পটলবাবুর জানালায় তোমার কাজ? তুমি কি ছুতোর মিস্ত্রি নাকি? যদি তাই হও, তা হলেও এত রাতে তোমার কাজ করতে আসা উচিত হয়নি বাপু। পটলবাবুই বা কী মনে করবেন?’

লোকটি মৃদু হেসে বলল, ‘আজ্ঞে পটলবাবু এক্ষুনি কিছু মনে করবেন না। আসলে আমি পটলবাবুকে একটু হালকা করতে এসেছি।’

শিবেনবাবুর চোখে পটলবাবুর নাদুস-নুদুস চেহারাটা ভেসে উঠল। খুশি হয়ে বললেন, ‘ও তাই বলো। তুমি তাহলে ব্যায়াম-ট্যায়াম শেখাও। কথাটা আগে বললেই পারতে। আজকাল ডাক্তাররা শরীর হালকা করার কথা বলেন বটে। তা কতদিন এসব করাচ্ছ? পটলবাবুর তাতে উপকার কিছু হয়েছে? কিন্তু জানালার কথা কী বলছিলে? তুমি পটলবাবুকে জানালা ধরে ওঠ-বোস করাবে নাকি? ওরে বাবা, সারারাত না ঘুমিয়ে ওঠ-বোস করাটাও তো বেশ কঠিন কাজ। মোটা হওয়ার ভোগান্তিও তো কম নয়।’

লোকটি নিজের গালে চটাস করে একটা চাপড় মেরে বলল, ‘স্যার, এখানে খুব মশা, দাঁড়ানো যাচ্ছে না। এবারে দয়া করে যদি উঠে পড়েন, গরিবের বড়ো উপকার হয়।’

শিবেনবাবু ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘এখন বারোটা পঁচিশ। তার মানে, অ্যালার্ম বাজতে এখনও পাক্কা পঁয়ত্রিশ মিনিট বাকি। নিয়মভঙ্গ করা কি উচিত? তার চেয়ে তুমি বরং ভেতরে এসে বোসো। দু-জনে একটু গল্পগুজব করা যাক।’

একটু ইতস্তত করে লোকটি রাজি হয়ে গেল।

দুটো কোলাপসিবল গেট, তিনটে দরজা খুলে শিবেনবাবু তাকে বেশ খাতির করে ভেতরে এনে বসালেন। পায়ের কাছে একটা ছোটো ব্যাগ রেখে লোকটি চেয়ারে বসে পড়ল। শিবেনবাবুর মনে হল, লোকটির মুখে-চোখে বেশ দুঃখী দুঃখী ভাব আছে। আহা, বেচারাকে রাত জেগে কত পরিশ্রম করতে হয়। শিবেনবাবুর মন করুণায় ভরে গেল।

তক্ষুনি বেশ কুন্ঠিতভাবে লোকটি বলে উঠল, ‘স্যার, আমাকে একগ্লাস জল খাওয়াবেন? সেই কখন থেকে তেষ্টায় ছাতিটা একেবারে ফাটোফাটো করছে।’

শিবেনবাবু ব্যস্ত হয়ে কিচেনে গেলেন। ফ্রিজ খুলে চারটে সন্দেশ নিলেন। কাচের প্লেটে সন্দেশ আর একগ্লাস ঠাণ্ডা জল নিয়ে বেশ যত্ন করে লোকটিকে দিলেন।

সন্দেশ-জল খেয়ে লোকটি কৃতজ্ঞ গলায় বলল, ‘বড়ো তৃপ্তি পেলাম স্যার, কিন্তু আপনার পকেটের ওই পঞ্চাশ টাকার নোটটা টেবিলের নীচে গড়াগড়ি যাচ্ছিল, এই যে এখানে টেবিলের ওপর চাপা দিয়ে রেখেছি।’

শিবেনবাবু অত্যন্ত খুশি হয়ে বললেন, ‘বা:! তুমি তো খুব অনেস্ট দেখছি। ভেরি গুড। তোমার নামটা কী বাপু?’

লোকটি সামান্য ইতস্তত করে বলল, ‘আজ্ঞে আমার নাম গুরুপদ। কিন্তু টাকার ব্যাপারে আপনি বড়ো অসাবধান, স্যার। নিশ্চয়ই মাঝে মাঝে আপনার টাকাপয়সা হারিয়ে যায়?’

শিবেনবাবু একগাল হেসে বললেন, ‘এবারে দশে পুরো দশ পেলে। সত্যিই টাকাপয়সা আমার কাছ থেকে উধাও হয়ে যায়। একেবারে ম্যাজিকের মতো। কেবল একবারই হারিয়ে যাওয়া টাকা ফেরত পেয়েছিলুম।’

গুরুপদ বিস্মিত হয়ে বলল, ‘তাই কী কখনো হয় নাকি, স্যার?’

শিবেনবাবু উৎসাহের সঙ্গে বললেন, ‘তাহলে সেই গল্পটাই বলি, মন দিয়ে শোনো। এই তো কয়েক মাস আগের কথা। আমি বরাবর বাসেই যাতায়াত করি। আমাদের এখানকার টার্মিনাস থেকে উঠে কলেজের সামনে গিয়ে নামি। বেমালুম হারিয়ে যায় বলে খুব বেশি টাকা আমি কাছে রাখি না। সেদিন একটা বই কেনার জন্য পকেটে আটশো টাকা নিয়ে বেরিয়েছি। ইচ্ছে ছিল কলেজ স্ট্রিটে গিয়ে বই কিনে নিয়ে কলেজে ঢুকব। কিন্তু বইয়ের দোকানে পৌঁছে দেখলুম পকেটের টাকা যথারীতি উধাও হয়ে গেছে। মনটা বড়ো খারাপ হয়ে গেল। নিশ্চয়ই বাসে পিকপকেট হয়ে গেছে। পকেটমারদের ওপর একটু যেন রাগও হল। কেন রে বাপু, একটা দিন কি ছাড় দেওয়া যেত না?

পরের দিন কলেজে যাওয়ার সময় বাসে উঠেই কথাটা মনে পড়ে গেল। তৎক্ষণাৎ মনে হল, বাসের অন্যান্য যাত্রীদের এ ব্যাপারে সতর্ক করে দেওয়া আমার নৈতিক কর্তব্য। একটু গলা খাঁকারি দিয়ে শুরু করলুম, ‘অনুগ্রহ করে সকলে একটু শুনবেন। আজ আপনাদের একটা কথা জানানো কর্তব্য মনে করছি। গতকাল এই সময়ে এই বাসে আমার নগদ আটশো টাকা পিকপকেট হয়েছে। সুতরাং, সকলে একটু সতর্ক হয়ে পথ চলুন। ধন্যবাদ।’

কাচের প্লেটে সন্দেশ আর একগ্লাস ঠান্ডা জল নিয়ে বেশ যত্ন করে লোকটিকে দিলেন।

দেখলুম, সকলেই সাবধান হয়ে গেলেন। কেউ পকেট চাপড়ালেন। কেউ ব্যাগের চেন খুলে দেখে নিলেন। বাসের মধ্যে পকেটমারদের কার্যকলাপ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়ে গেল।

পরের দিন আবার সতর্কীকরণ, গত পরশু এই সময়ে এই বাসে আমার নগদ আটশো টাকা....ইত্যাদি। এইভাবে চার-পাঁচ দিন বলার পর একদিন যেই বাস থেকে কলেজের সামনে নেমেছি, একটা পাতলা চেহারার ছোকরা এসে আমার হাতে একটা খাম ধরিয়ে দিয়ে বলল, এই যে স্যার, এতে আটশো টাকা আছে। আপনার টাকা আপনি ফেরত পেয়ে গেলেন। দয়া করে কাল থেকে আর বাসে চেঁচামেচি করবেন না।’

গুরুপদ হাসতে হাসতে বলল, ‘ওদের জব্বর প্যাঁচে ফেলেছিলেন বটে।’

শিবেনবাবু বললেন, ‘ভেবেচিন্তে কি আর ফেলেছি বাপু! তা সে যাই হোক, আজ তোমার সততা দেখে বড়ো আনন্দ হল। এই তো চাই।’

নিমেষের মধ্যে গুরুপদর মুখের হাসি মিলিয়ে গিয়ে অস্বস্তি দেখা দিল। একটু পরে লজ্জিত গলায় বলল, ‘স্যার, বারে বারে আপনি আমাকে সৎ বলে বড়ো লজ্জায় ফেলছেন। আসলে আপনি অত্যন্ত ভালোমানুষ বলেই সবাইকে ভালো দেখার অভ্যাস। কিন্তু আমি ভালোমানুষ নই স্যার, বলতে সংকোচ হচ্ছে যে, আমি নিতান্তই একজন সাদামাটা চোর। আজ পটলবাবুর বাড়িতে চুরি করার ইচ্ছে নিয়েই এসেছিলাম।’

শিবেনবাবু বিস্ময়ে চোখ কপালে তুলে বললেন, ‘বলো কী হে, গুরুপদ? তুমি চোর? অ্যাঁ, সত্যি বলছ? দাঁড়াও, দাঁড়াও ব্যাপারটা একটু তলিয়ে ভাবতে দাও! বাংলার অধ্যাপক আশুবাবুর মুখে শুনেছি, ভূত আর চোরের মুখোমুখি হলে মানুষের নাকি আতঙ্কে নাড়ি ছেড়ে যায়। কিন্তু কই, কথাটা শুনে আমার বাপু একটুও ভয়-টয় করছে না। ঠাণ্ডা মাথায় ভালো করে ভেবেচিন্তে দেখো তো এ ব্যাপারে তোমার কোনো ভুলচুক হচ্ছে না তো? না হে, আমার তো তোমার কথাটা বিশ্বাস হচ্ছে না।’

গুরুপদ কাঁচুমাচু হয়ে বলে, ‘তবুও কথাটা সত্যি, স্যার। বলতে লজ্জা করে, পেটের তাগিদে শেষপর্যন্ত চোরই হয়ে গেলাম। মাসছয়েক আগেও একটা কারখানায় কাজ করতাম। দুম করে সেটা বন্ধ হয়ে গেল। তারপর কিছুদিন এটা-ওটা করলাম কিন্তু অভ্যাস না থাকায় কোনোটাই ঠিকমতো পেরে উঠলাম না। এরপর অভাবে স্বভাব নষ্ট। তবে সত্যি কথা বলতে কী, চুরির কাজটাও আমি ঠিকমতো পারি না, স্যার। এর মধ্যেই বার দুই ধরা পড়ে পাবলিকের হাতে গণধোলাই জুটেছে। আরেকবার ব্যাপারটা থানা পর্যন্ত গড়িয়েছিল। সবই বরাত, স্যার।’

শিবেনবাবু চিন্তিত গলায় বললেন, ‘তাই তো, তুমি তো মহাফ্যাসাদে পড়েছ দেখছি। এখন কোনো কাজ-টাজ যদি পাও, করবে?’

গুরুপদ সাগ্রহে বলে উঠল, ‘হ্যাঁ স্যার, করব। আমাকে একটা সুযোগ দিয়ে দেখুন।’

শিবেনবাবু মিনিটখানেক ভুরু কুঁচকে রেখে বললেন, ‘দাঁড়াও হে, কে যেন আমাকে একজন কাজের লোকের জন্য বলছিল, একটু মনে করতে দাও। কে যেন....কে যেন...ও হ্যাঁ মনে পড়েছে, আমার গিন্নি মন্দিরাই বলছিল। আসলে আমাদের বাড়ির কাজের লোক সনাতন কিছুদিন আগে দেশে চলে গিয়ে আর ফিরে আসেনি। বোধ হয় আসতে পারবে না বলে জানিয়েও দিয়েছে। তাই বাজারহাট, টুকিটাকি ফাইফরমাশ, আমার বইপত্র গুছিয়ে রাখা—এসবের জন্য একজন লোক দরকার। এগুলো তুমি করতে পারবে?’

গুরুপদ নিরীহভাবে বলল, ‘তা হয়তো পারব, কিন্তু জেনে শুনে বাড়িতে চোর ঢোকাবেন, স্যার?’

শিবেনবাবু চটে ওঠা গলায় বললেন, ‘তুমি তো বড়ো প্যাঁচালো প্রশ্ন তোলো হে, গুরুপদ? না জেনে-শুনে যাকে কাজে ঢোকাব, সে কি আরও বড়ো চোর কিংবা ডাকাত হতে পারে না? তুমি চাইলে এই কাজটা করতে পারো। ইচ্ছে থাকলে কাল সকালে এসে মন্দিরার সঙ্গে দেখা করো।’

হঠাৎ অ্যালার্ম বেজে উঠল। প্রতিদিনের মতোই শিবেনবাবু বেজায় চমকে উঠলেন। তারপর বললেন, ‘ঘড়িবাবু বাজনা বাজিয়ে দিয়েছেন। এবারে উঠতে হবে। তুমি এখন পটলবাবুর বাড়ির দিকে না তাকিয়ে সোজা বাড়িতে চলে যাও। এই পঞ্চাশ টাকার নোটটা নিয়ে যাও আর বাকি রাতটুকু ভালো করে ভেবে দ্যাখো।’

পরদিন সকালে ডোরবেল বাজতেই দরজা খুলে মন্দিরা দেখলেন একজন অচেনা লোক দাঁড়িয়ে আছে। কিছু জিজ্ঞাসা করার আগেই সে ঢিপ করে প্রণাম করে দু-হাত কচলে বলল, ‘আমার নাম গুরুপদ। স্যার আমাকে আসতে বলেছিলেন।’

মন্দিরা হাসিমুখে বললেন, ‘একটু আগে তোমার সব কথা শুনলাম। এসো, ভেতরে এসো। কিন্তু গুরুপদ, তোমার এই অতিভক্তি কীসের লক্ষণ সেটা তুমি জানো? তোমার সেসব গুণের কথাও তো শুনলাম।’

গুরুপদ মাথা চুলকে বলে, ‘আজ্ঞে ঠিকই শুনেছেন। তবে স্যারের কাছে একটা কাজের আশ্বাস পাওয়ার পর থেকে সেসব লক্ষণগুলো গা ঢাকা দিতে শুরু করেছে। কাজটা পেলেই লক্ষণগুলো পুরোপুরি মিলিয়ে যাবে।’

মন্দিরা গম্ভীর গলায় বললেন, ‘সত্যি?’

গুরুপদ লাজুক স্বরে বলল, ‘আজ্ঞে সত্যি, সত্যি, সত্যি, তিন সত্যি।’

মন্দিরা নির্দেশ দিলেন, ‘তাহলে এসো, নিজের কাজগুলো বুঝে নাও।’

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%