প্রত্যাবর্তন

গৌতম দাশ

বেশ কয়েকদিন ধরেই হারানের মনে হচ্ছিল কাজটা পালটানো দরকার। মাঝিগিরির কাজটা আর ভালো লাগছে না। সেই কোন ভোরবেলা থেকে শুরু হয় লোক পারাপারের খেয়া টানা। শেষ যখন হয় তখন গভীর না হলেও বেশ রাত। অবিশ্যি শিবু সঙ্গে থাকে প্রায় সারাটা দিন। কিন্তু সন্ধ্যে না-হতেই ও পালাই পালাই করে। শিবু চলে যাওয়ার পর ওকে আরও খানিকক্ষণ একা একা দু-চারবার পারপার করতেই হয়। তারপর আস্তে আস্তে চতুর্দিক নিঝুম হয়ে যায়। ঝিঁ-ঝিঁ পোকার দল ডাকতে থাকে। হারান ধীরে ধীরে তার কুঁড়ের দিকে রওনা হয়। তখন ওর খুব খারাপ লাগে। বড়ো একা মনে হয় নিজেকে।

মাস মাইনেতে ইজারাদারের খেয়া পারাপার করে হারান আর শিবু। মাইনে যা পায় তাতে ওর একা মানুষের ভালোভাবেই চলে যায়। তিনকুলে কেউ নেই। বাপ ছিল দিনমজুর। ওর জ্ঞান হওয়ার আগেই মারা গেছে। একটুও মনে পড়ে না। মাকে মনে পড়ে। মা পরের বাড়িতে কাজ করত। মা যখন মারা যায় তখন ওর বয়স দশ-বারো বছর।

তখন থেকে কখনো পরের জমিতে, কখনো পরের বাড়িতে, কখনো দোকানে কাজ করে পেট চালাতে হয়েছে। এখন হারানের বয়স তিরিশের বেশি। সঠিক বয়সটা অবিশ্যি ও নিজেও জানে না। চূর্ণি নদীতে খেয়া পারাপারের কাজটা করছে গত সাত-আট বছর ধরে। এটা করতে আর ভালো লাগছে না।

ক-দিন থেকেই প্রচন্ড গরম পড়ছিল। বৈশাখের কয়েকটা দিন মাত্র পার হয়েছে। সারাদিনের রোদ, সঙ্গে নৌকা বাওয়ার ধকল। হারান ভাবছিল কাল সকালেই সব ছেড়ে ছুড়ে দিয়ে পালাবে।

সেদিনই প্রায় সন্ধ্যের মুখে পশ্চিম আকাশে দেখা দিল মিশমিশে কালো একখানা মেঘ। সেই মুহূর্তে পার হওয়ার কোনো যাত্রীও অবিশ্যি ছিল না। হারান ঘাটের ওপর খড়ে ছাওয়া চালাঘরের মধ্যে যাত্রীদের বসার জন্য বাঁশের চালির ওপর একলাই বসে ছিল। জায়গাটাকে লোকে বলে ‘হারান মাঝির গদি’। শিবু মেঘ দেখে একটু আগেই বাড়ি পালিয়েছে।

মেঘখানা খুব দ্রুত উঠে এল। ওপারের বাঁশঝাড়, গাছপালাগুলো নুয়ে পড়ল। নদীর জল হাওয়ার বেগে শিরশির করে উঠল। এপারে নদীর ধারে বসে থাকা গোটা দুই বক ডানা মেলে উড়ে গেল। প্রায় মুহূর্তের মধ্যে ঝড়টা ধেয়ে এল এপারে। হারান চালাঘরের মধ্যে থেকে বাইরে এসে দাঁড়াল। সামনের তালগাছটা থেকে একটা আধশুকনো পাতা খুব দ্রুত উড়ে এল। এক ঝলক ঠাণ্ডা বাতাস হারানের প্রাণটা যেন জুড়িয়ে দিল।

প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হল বড়ো-বড়ো ফোঁটার বৃষ্টি। হারান চালাঘরের মধ্যে ফিরে যাবে বলে দৌড়োল। পুরোপুরি ঢুকতেও পারেনি, একপা ভেতরে একপা বাইরে—এই সময়েই বাজটা পড়ল। আকাশ যেন চিরে গেল। চোখ বুজে ফেলার মুহূর্তে একটা বিকট শব্দ। হারান কোনোরকমে হাত বাড়িয়ে চালাঘরের বাঁশের খুঁটিটা আঁকড়ে ধরল। তারপর আর কিছু মনে নেই।

জ্ঞান যখন ফিরতে আরম্ভ করল, হারানের মনে হল ওকে যেন গভীর জলের তলা থেকে ধীরে ধীরে তুলে আনা হচ্ছে। নিশ্বাস নিতে বেশ কষ্ট হচ্ছে। হাত-পা নাড়ানোর ক্ষমতা নেই—সারা শরীর আড়ষ্ট। ও যেন একটা বাড়ির উঠোনে শুয়ে আছে। চারদিকে অনেক লোক। একটা বউ ওর পাশে বসে চিৎকার করে কাঁদছে। চারপাশের লোকগুলোর মুখ ঝাপসা, কিন্তু যেন চেনাচেনা। একটা দশ-বারো বছরের ছেলের মুখ ওর চোখের সামনে ভেসে উঠল। ছেলেটার ডান ভুরুর ওপরে একটা লালচে জড়ুল। মনে হল হাত বাড়িয়ে ওই ছেলেটার কচি হাতটা ধরতে পারলে ওর খুব ভালো লাগবে। কিন্তু হাত ওঠানোর ক্ষমতা নেই।

হঠাৎ মনে হল ওর পায়ের ওপর কি যেন পড়ছে। আস্তে আস্তে চোখদুটো খোলার চেষ্টা করল হারান। পারল না। যেন কেউ আঠা দিয়ে চোখদুটো জুড়ে দিয়েছে। পায়ের ওপর যেন ঠাণ্ডা জল পড়ছে।

কয়েকমিনিটের মধ্যে হারান বুঝতে পারল সত্যি সত্যিই পায়ের ওপর জল পড়ছে। বৃষ্টির জল। অনেক কষ্টে চোখদুটো খুলল। কোনো বাড়ির উঠোনে নয়, ও নদীর ধারের চালাঘরটার মধ্যেই জলকাদার ওপর শুয়ে আছে। পায়ের দিকটা চালাঘরের বাইরে। তাই বৃষ্টির জল পড়ছে। কাপড় জলকাদায় মাখামাখি।

কাদার ওপর দু-হাতের ভর রেখে ধীরে ধীরে উঠে বসল হারান। খানিকক্ষণ বসে থেকে হাত বাড়িয়ে বাঁশের খুঁটিটা ধরে আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল। ঘরে ফিরতে হবে। অঝোর বৃষ্টির মধ্যে ভিজতে ভিজতে ক্লান্ত অবসন্ন হারান অনেক কষ্টে ওর কুঁড়েঘরে ফিরে এল। হাতড়ে হাতড়ে দেশলাই খুঁজে বের করে লম্ফটা জ্বালাল। গামছা দিয়ে মাথা, গা, হাত, পা মুছে কাদামাখা কাপড় ছাড়ল। তারপর লম্ফটা নিভিয়ে দিয়ে শুয়ে পড়ল। খাওয়ার কথা মনেই পড়ল না।

কিন্তু ঘুম এল না। অন্ধকার ঘরে ওর মনে আবার সেই ছবিটা ভেসে উঠল। এখন আরও স্পষ্ট। মনে হল ওই বাচ্চা ছেলেটার নাম কানু। আর বউটার নাম কি যেন...কি যেন...মনে পড়েছে—অনু—অন্নপূর্ণা। বাড়িটার উঠোনে বেশ দাঁড়িয়ে আছে হারান। উত্তরের দিকে তিনটে ঘর। টালি দিয়ে ছাওয়া—নীচটা পাকা। পশ্চিমের দিকে কাঁচা রান্নাঘর। সেটাও টালির ছাউনি। তার পেছনে বড়ো আমগাছটার তলার গোরুর গোয়াল। উঠোনের একপাশে বিচুলিগাদা। দক্ষিণ দিকে একটা ধানের গোলা। তার পাশে তুলসি মঞ্চ। উত্তরের ঘরগুলোর একেবারে পশ্চিমেরটায় একটা কাঠের সিংহাসনে রাধাকৃষ্ণের যুগলমূর্তি। কৃষ্ণের মুখে একচিলতে হাসি। ধূপের ধোঁয়ার ফাঁকে ফাঁকে ঠাকুরের মিষ্টি হাসিটা হারান স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে।

সকালে ঘুম থেকে উঠতে ওর একটু দেরিই হল। ঘাটে পৌঁছে দেখল শিবু এসে গেছে। শিবুই ওকে ডেকে দেখাল, ‘গতকাল বাজ পড়ে তালগাছটা একেবারে পুড়ে ঝলসে গিয়েছে।’ হারান কিন্তু শিবুকে নিজের ব্যাপারে কোনো কথাই বলল না।

শিবু অবিশ্যি দিন দুয়েকের মধ্যেই লক্ষ করল যে হারানদা অনেক অন্যমনস্ক হয়ে গেছে। পাঁচ কথা বললে এককথার জবাব দেয়। বেশিরভাগ জবাবই ‘হুঁ-হাঁ’ দিয়ে সারে।

হারান নিজেও সেটা জানে। ওর মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে ও বোধ হয় পাগল হয়ে যাচ্ছে। নইলে কই, এসব ব্যাপার তো আগে কখনো ওর মাথায় আসেনি। একলা বসে থাকলেই ছবিগুলো ওর মনে ভেসে ওঠে। বিশেষ করে সারাদিন পর ও যখন রাত্তির বেলায় নিজের ঘরে ফেরে, তখন থেকে ঘুম আসার আগে পর্যন্ত ওই ছেলেটা, বউটা, আরও কিছু লোকজনের মুখ ওর মনে পড়ে। আর আছে ওই রাধাকৃষ্ণের যুগলমূর্তি। সমস্ত কিছু ওকে যেন চুম্বকের মতো জায়গাটার দিকে টানছে। কালরাত্রে মনে হল গ্রামটার নাম রাঘবপুর।

অথচ এরকম কোনো গ্রামের কথা হারানের জানা নেই। সকালে এসেই শিবুকে জিজ্ঞাসা করল। শিবুও এরকম কোনো গ্রামের কথা জানে না। শিবু অবশ্য পরামর্শ দিল সুশান্ত দত্তকে জিজ্ঞাসা করতে। সুশান্ত দত্ত চূর্ণির ওপারে গোবিন্দপুরে থাকে। রোজ সকালে খেয়া পার হয়ে কলকাতায় যায় চাকরি করতে। আবার সন্ধ্যার পর ঘরে ফেরে। শিক্ষিত মানুষ। জানলেও জানতে পারে রাঘবপুর কোথায়।

সন্ধ্যেবেলায় হারান নৌকো বাইতে বাইতে সুশান্ত দত্তকে জিজ্ঞাসা করল, ‘বাবু, আপনি তো অনেক জায়গায় যান। রাঘবপুর নামে কোনো গ্রামের কথা জানেন?’

সুশান্ত দত্ত মনে করার অনেক চেষ্টা করল বটে। কিন্তু এরকম নামের কোনো গ্রামের কথা সে মনে করতে পারল না।

পাশে বসে ছিল রতন পাল। রতন বলল, ‘তুমি কি তিলডাঙা-রাঘবপুরের কথা বলছ হারানদা?’

বিদ্যুৎ চমকের মতো হারানের মনে হল—হ্যাঁ, তাই-ই বটে। তিলডাঙা আর রাঘবপুর পাশাপাশি প্রায় লাগোয়া গ্রাম। লোকে চেনার সুবিধার জন্য তিলডাঙা রাঘবপুর নাম একসঙ্গে উচ্চারণ করে বটে।

বলল, ‘হ্যাঁ। তুমি জানো সেখানে কেমন করে কোথা দিয়ে যেতে হয়?’

রতন বলল, ‘তা জানব না। ওখানে তো আমার বোনের বিয়ে দিয়েছি। বছরে কমপক্ষে দু-তিনবার তো যেতেই হয় আমাকে। খুব একটা দূর নয় বটে, মাইল পঁচিশ-তিরিশ হবে হয়তো, এখান থেকে কিন্তু যাওয়ার হাঙ্গামা আছে। তুমি যাবে নাকি হারানদা?’

হারান বলল, ‘যেতেও পারি।’

রতন বলল, ‘যদি যাও তাহলে—’ রতন হারানকে পরিষ্কারভাবে বুঝিয়ে দিল রাঘবপুরে কেমন করে যেতে হবে।

পরের দিন হারান শিবুকে বলল, ‘শিবু কালকের দিনটা আমি থাকব না। তুই তোর ভাইকে নিয়ে এসে কালকের দিনটা চালিয়ে নিস।’

শিবু বলল, ‘নিশ্চয়ই তুমি তোমার সেই রাঘবপুরের খোঁজ পেয়েছ? হারানদা সত্যি করে বলতো ব্যাপারটা কী?’

হারান একটু হাসল। বলল, ‘ফিরে আসি তারপর বলব।’

ভোর বেলা বেরিয়ে হারান যখন রাঘবপুর গ্রামের মুখে পৌঁছোল তখন বেশ বেলা হয়ে গেছে। গ্রামে ঢোকার মুখে একটা বিশাল অশ্বত্থগাছ। গাছটাকে ওর খুব চেনা মনে হল। আরেকটু এগিয়ে একজনকে জিজ্ঞাসা করল, ‘আচ্ছা, এখানে কানু ঘোষের বাড়িটা—’

লোকটা আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, ‘রাস্তাটা ধরে ডানদিকে ঘুরে গোটা চারেক বাড়ির পড়ে রাস্তার পাশে বাঁশের দরমার বেড়া দেওয়া বাড়িটা।’

হারান সেই জায়গায় এসে থমকে দাঁড়াল। কাউকেই দেখা যাচ্ছে না।

হারানের নিজেকে কেমন ঘোরলাগা মানুষ মনে হচ্ছিল। একবার বিজয়াদশমীর রাতে সিদ্ধির সরবত খেয়ে এরকম হয়েছিল। সবকিছুই চেনা-অচেনার মাঝামাঝি।

‘যা হয় হবে’ ভেবে মরিয়া হয়ে দরমার বেড়া ঘুরে বাড়িটার মধ্যে ঢুকে পড়ল হারান। সামনে কেউই নেই। উত্তরের দিকের তিনটে ঘরই আছে। তবে টালি দিয়ে ছাওয়া নয়— পুরোপুরি পাকাবাড়ি। পশ্চিমের রান্নাঘরও তাই। বাড়িতে ইলেকট্রিক এসে গেছে। তুলসি মঞ্চটা একইরকম আছে। ধানের গোলা একটার পরিবর্তে দুটো। ধানের গোলা আর তুলসি মঞ্চের মাঝামাঝি জায়গায় একটা ছোট্ট মন্দির। মন্দিরের দরজাটা খোলাই আছে।

পায়ে পায়ে মন্দিরের দিকে এগিয়ে গেল হারান। সিঁড়ি দিয়ে উঠে মন্দিরের বারান্দায় পৌঁছোল। ভেতরে রাধাকৃষ্ণের সেই যুগলমূর্তি। কৃষ্ণের সেই মিষ্টি একচিলতে হাসি।

ধীরে ধীরে বসে পড়ল হারান। চোখদুটো বুজে এল। সবকিছু মনে পড়ে যাচ্ছে। একসময় ওরই বাড়ি ছিল এটা। ওর নিজের নাম ছিল হরেন ঘোষ। অন্নপূর্ণা ছিল ওর বউয়ের নাম। কানু ছিল একমাত্র ছেলে। বাবা ছিল গোবিন্দ ঘোষ। ওর বাবা তীর্থ করতে গিয়েছিল। বৃন্দাবন থেকে ওই পিতলের যুগলমূর্তি বাবাই এনেছিল। হরেন তখন বেশ ছোটো। বাড়িতে রাধাকৃষ্ণের নিত্যপুজো চালু হয়েছিল। ধুমধাম করে পুজো হত ঝুলন পূর্ণিমায় আর দোল উৎসবে। বেশ কিছু জমিজমা ছিল। সেটা থেকেই সংসার চলত। গোবিন্দ ঘোষ যখন মারা যায়, হরেনের বয়স তখন পঁচিশ-ছাব্বিশ বছর। পরের বছরগুলোয় ধীরে ধীরে সংসারের উন্নতি হয়েছিল। কিন্তু তারপর একেবারে হঠাৎ-ই এল তার জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর দিনটা।

সেদিনটা ছিল আষাঢ়মাসের শেষদিকের একটা দিন। সকাল থেকেই বৃষ্টি নেমেছিল। ও গিয়েছিল মাঠে ধানের চারার তদারকিতে। আলের নীচে থাকা গোখরো সাপটাকে ও লক্ষই করেনি। গায়ে পা তুলে দিয়েছিল। মুহূর্তের মধ্যে বিদ্যুৎবেগে সাপটা ওকে ছোবল মারে। তখনই ও বুঝছিল ওর জীবন শেষ হয়ে গেল। মাথায় বাঁধা গামছাটা খুলে পায়ে একটা বাঁধন দিয়েছিল বটে কিন্তু তাতে কিছু হয়নি। যখন কোনোরকমে ও বাড়ি পৌঁছোল তখন ওর মুখ দিয়ে গ্যাঁজলা বেরুচ্ছে। সারাশরীর জ্বলেপুড়ে যাচ্ছে। চোখের দৃষ্টি ঘোলাটে হয়ে গেছে। উঠোনের ওপর শুয়ে পড়েছিল। মনে হয়েছিল বহুদূর থেকে ওর বউ অন্নপূর্ণার কান্না ভেসে আসছে। ইচ্ছা হয়েছিল কানুর হাতটা একবার শক্ত করে চেপে ধরতে। কিন্তু হাত ওঠানোর ক্ষমতাই ছিল না, সবকিছু আস্তে আস্তে কেমন যেন অন্ধকার হয়ে গেল।

চোখদুটো খুলল হারান। খুলেই চমকে উঠল। ওর সামনে বসে আছে কানু। নিশ্চয়ই কানু। ওইতো ডান ভুরুর ওপর ছোট্ট লালচে জড়ুলটা। কিন্তু কত বয়স হয়ে গেছে কানুর। মাথায় ছোট্ট করে ছাঁটা কাঁচাপাকা চুল। গলায় তুলসিকাঠের মালা। সেই বাচ্চা ছেলেটা আজ কতবড়ো একটা লোক হয়ে গেছে। তবুও চেনা যায় কানুকে।

কানু ওর দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে।

হারানের মনে হল ওর গলা-বুক শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। যেন বহুকাল ও জল খায়নি একফোঁটাও। বলল, ‘আমাকে একটু জল দেবে বাবা!’

কানু বলল, ‘দেব! নিশ্চয়ই দেব। কিন্তু তুমি আগে তোমার চোখদুটো মোছো, দেখছি বহুক্ষণ ধরে তুমি কেঁদে যাচ্ছ একনাগাড়ে।

কানু উঠে গেল। একটুপরে নিজেই ফিরে এল একটা বড়ো ঝকঝকে কাঁসার ঘটিতে জল আর বাটিতে করে মুড়ি-বাতাসা নিয়ে। বলল, ‘আগে এগুলো খাও ধীরেসুস্থে।’

হারান আগে ঢকঢক আধঘটি জল খেয়ে ফেলল আলগোছে। তারপর মুড়ি-বাতাসা। খেতে খেতে ওর মনে হল ও এসেছে কানুদের দেখতে। জায়গাটা ওকে এতবেশি টানছিল যে, না এসে উপায়ও ছিল না। একটু পরেই আবার চলে যেতে হবে। যদি কোনোরকমে এখানে পাকাপাকি থাকা যেত। এরা ওকে যেভাবে রাখত হারান সেভাবে থাকতে পেলেই বর্তে যেত। তবু তো কানুর কাছে থাকতে পারত। অথচ ব্যাপারটা বলাও যায় না।

কানু বলল, ‘এবারে বলো তোমার কথা। তুমি কে? কোথা থেকে আসছ? যাবেই বা কোথায়?’

হারান একটুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, ‘আমার নাম হারান বিশ্বাস। আসছি রঘুনাথপুর থেকে। যাব যে কোথায় নিজেই জানি না বাবা! যে কাজটা করছিলাম সেটা ছেড়ে দিয়েছি। দেখি যদি কোথাও কোনোরকম কাজ-টাজ পাই। তোমার বাড়িতে আমায় একটা কাজ-টাজ দাও না বাবা! দেবে?’

খুব আগ্রহভরে হারান কানুর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

কানু সামান্য ভাবল। তারপর বলল, ‘তুমি কীরকম কাজ জানো? চাষবাসের কাজকর্ম জানো? আসলে আমাদের জমিজমার ওপরেই ভরসা করে চলতে হয়। কিছু জমিজমা আছে। আমার বয়স হয়ে গেছে। আর সবকিছু দেখাশোনা করে উঠতে পারি না। আমার ছেলে কলেজে পড়ে। ওরা আজকালকার ছেলে—এসব কাজ বোঝেও না, পারেও না। করতেও চায়-না। চাষবাসের কাজ জানা একজন লোক পেলে আমার ভালো হয়। নিজে হাতে কিছু করতে হবে না, কিন্তু দেখাশোনা করতে হবে। তুমি পারবে?’

হারান একটু হাসল। মনের ওপর থেকে একটা বিশাল বোঝা নেমে গেলে যে শান্তির হাসি মানুষ হাসে—সেই হাসি। একটা নয়, দু-দুটো জীবনের চাষের কাজের অভিজ্ঞতা তার। এ জীবনেও মা মরে যাওয়ার পর অনেককাল মুকুন্দনগরের মন্ডলদের বাড়িতে চাষবাসের কাজের মধ্যেই ছিল। বলল, ‘আমাকে ক-টা দিন রেখেই দেখো না!’

কানু বলল, ‘ঠিক আছে। তুমি তাহলে থাকো। আজ দুপুরে তুমি তাহলে এখানেই স্নান করে দুটো সেবা করো। তোমার আর কে-কে আছে সংসারে?’

হারান বলল, ‘কেউ নেই।

কানু বলল, ‘কেউ নেই? মা, বাবা, বউ, ছেলে, মেয়ে কেউ নেই? এই ঠাকুরের দালানে বসে আছ। সত্যি বলবে—তুমি রাগটাগ করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসনি তো?

হারান একটু হাসল। বলল, ‘মিথ্যে কেন বলব বাবা। সত্যি সত্যিই আমার কেউ নেই। রাগ করব কার ওপর!’

কানু বলল, ‘তাহলে তুমি থেকেই যাও এখানে। আর কোথাও যেতে হবে না। আজ থেকে তুমি এ বাড়ির লোক হয়ে গেলে। সে একদিন তোমার সুবিধেমতো গিয়ে তোমার জিনিসপত্রগুলো নিয়ে এসো। খাওয়া-দাওয়া এখানেই করবে। আর মাইনে কত চাও, সেটা বলো।’

হারান বলল, ‘যা ইচ্ছে হয় দিও। আসলে আমি একটু শান্তি চাই বাবা।’

কানু বলল, ‘এবারে আমি একটা কথা বলি। আমার বয়স এখন আটচল্লিশ চলছে। দেখে মনে হচ্ছে তোমার বয়স পঁয়তিরিশের মধ্যেই হবে। কি! তাই তো?’

হারান ঘাড় নাড়ল। কানু ঠিকই বলেছে। তার বয়স ওই রকমই।

কানু আবার বলল, ‘তাহলে তুমি আমার থেকে তেরো-চোদ্দো বছরে ছোটো। কিন্তু তুমি আমাকে গোড়া থেকেই ‘বাবা-বাবা’ করে বলছ। ঠিক আছে তাই হোক। কিন্তু আমি তোমাকে নাম ধরে না ডেকে এবার থেকে ‘কাকা’ বলে ডাকব। তোমাকে অনেকটা যেন—থাক এখন সেকথা। তোমার এতে আপত্তি নেই তো?’

হারান মাথা নাড়ল। আপত্তি নেই।

কানু এবারে ওর বউকে ডাকল। হারানকে দেখিয়ে বলল, ‘এ আমাদের হারান কাকা। আজ থেকে আমাদের বাড়িতেই থাকবে। কাজকর্ম দেখাশোনা করবে। তুমি কাকাকে নিয়ে যাও—সবকিছু দেখিয়েশুনিয়ে দাও। আর কাকা, তুমি বিকেলে আমার ছেলে মানে তোমার নাতিকে দেখত পাবে। ও কলেজে গিয়েছে। যাও তোমার বউমার সঙ্গে যাও। সব বুঝেশুনে নাও।’

কানুর বউ প্রথমে একটু অবাকচোখে দু-জনের দিকে তাকাল। তারপর একটু হেসে হারানকে ডাকল, ‘আসুন কাকা। আসুন আমার সঙ্গে।’

সেদিনই হারান বউমার কাছ থেকে জানতে পারল অন্নপূর্ণা গত হয়েছে আটবছর আগে। কানুর একমাত্র মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। জামাই খুব ভালো চাকরি করে। বিকালেই কানুর ছেলে শ্রীকান্তর সঙ্গে নাতি সম্পর্ক পাতানো হয়ে গেল।

হারান রয়ে গেল। কয়েকদিন পর রঘুনাথপুর গিয়ে নিজের সামান্য যা-কিছু ছিল নিয়ে এসে রঘুনাথপুরের পাট চুকিয়ে দিল।

শ্রাবণমাসে এল ঝুলনপূর্ণিমা। ঘোষ পরিবারের উৎসবের দিন। জাঁক করে রাধাকৃষ্ণের পুজো হয়। এই উপলক্ষ্যে অতিথিসেবা, দরিদ্রনারায়ণ সেবা হয়। বাড়ির আত্মীয়-কুটুমদের নিমন্ত্রণ করা হয়। কয়েকদিন হইচই ব্যাপার চলে। ঝুলনের দিন হারান মন্দিরের বারান্দায় বসে পুজো দেখছিল। একেবারে আচমকা ওর মনে পড়ে গেল। কথাটা।

ওকে সাপে কামড়ায় আষাঢ়মাসে। তার আগে বৈশাখমাসে ও একদিন স্বরূপগঞ্জের হাটে গিয়েছিল একগাড়ি ধান বিক্রি করতে। ধান বিক্রি করে গ্রামের সুরেনের সঙ্গে গিয়েছিল গয়নার দোকানে। সুরেনের মেয়ের বিয়ের জন্য কিছু গয়না কেনার দরকার ছিল। একটা হার ওর খুব পছন্দ হয়েছিল। ধান বিক্রির টাকা তো সঙ্গে ছিলই। পুরো তিনভরির হারটা ও কিনেই নিয়েছিল অন্নপূর্ণার জন্য। কিন্তু কথাটা ও এসে অন্নপূর্ণাকে বলেনি। ইচ্ছা ছিল সামনে ঝুলন উৎসবে ঠাকুরের পায়ে উৎসর্গ করে হারটা অন্নপূর্ণার গলায় পরিয়ে দিয়ে চমকে দেবে।

কিন্তু ততদিনে হারটা কোথায় রাখা যায়। বাড়ির যেখানেই রাখুক অন্নপূর্ণা বা আর কারও চোখে পড়ে যাবেই। ভেবে ভেবে রাখার একটা জায়গা ঠিক করে ফেলেছিল। ওদের রাধাকৃষ্ণের যুগলমূর্তির ছোট্ট বেদির মধ্যে একটা গোপন কোটর আছে। মূর্তি দুটোকে বাঁ-দিকে ঠেলে দিলে ওই চোরাকোটরটা দেখা যায়। এটা ওকে ওর বাবা গোবিন্দ ঘোষই দেখিয়ে দিয়েছিল। হরেন ওইখানে গোলাপি কাগজে মোড়া হারটা রেখে দিয়েছিল। তারপর তো আর বলাই হল না কাউকে। হারটা কি এখনও ওখানে আছে? হারান অবিশ্যি কাউকেই কিছু বলল না। ঠাকুর যদি কখনো বলার সুযোগ দেন, কানুকে বলবে।

মাস ছয়েকের মধ্যেই দেখা গেল হারান ঘোষবাড়ির সমস্ত দায়িত্ব ঘাড়ে নিয়ে বসে আছে।

মাঝে কানু আর তার বউ খুব করে ধরেছিল হারানের বিয়ের জন্য। হারান রাজি হয়নি। বলেছিল, ‘না গো বউমা! এই তো তোমাদের নিয়ে বেশ আছি। বাইরের একটা উটকো মেয়ে এসে হয়তো সব লন্ডভন্ড করে দেবে। সে আমার সহ্য হবে না। ছাড়ো তো ওসব কথা। তোমরা যদি বেশি জবরদস্তি করো তো আমি কিন্তু সব ছেড়েছুড়ে দিয়ে পালাব।’

এরপর পুরো চার বছর কেটে গেছে।

কানুর ছেলে শ্রীকান্ত ইতিমধ্যে পাশের গ্রাম তিলডাঙার স্কুলে মাস্টারি পেয়েছে। কিছুদিনের মধ্যেই কালনায় শ্রীকান্তের বিয়ে ঠিক হল। শ্রীকান্ত সেদিন বিকেলে হাসতে হাসতে হারানকে জিজ্ঞাসা করল, ‘দাদু, তুমি আমার বউকে কী দেবে?’

হারান বলল, ‘বেশ বড়ো দেখে একটা ঘোড়ার ডিম দিলে কেমন হয় দাদু?’

পরমুহূর্তেই মনে হল হারটার কথা। সেটা যদি এখনও ঠাকুরের পায়ের নীচে থাকে, তাহলে—

সন্ধ্যেবেলা ঠাকুরের আরতির পর কানুকে ডেকে নিয়ে ঠাকুরঘরে গেল হারান। নিজের হাতে দরজা বন্ধ করল। তারপর নিজে বসল, কানুকেও বসাল। হারানের বুকের মধ্যে কেউ যেন হাতুড়ি পিটছে। বলল, ‘বাবা আমি যে কথাটা এখন বলছি, তুমি আমাকে কথা দাও, কাউকে, কোনোদিন কথাটা বলবে না।’

কানু বেশ অবাক হয়েছে। হারানের এরকম আচরণ সে কোনোদিন দেখেনি। তবু বলল, ‘কী কথা কাকা? ঠিক আছে কথা দিলাম। কেউ কোনোদিন তা জানবে না।’

হারান বলল, ‘তুমি কি জানো এই কেষ্ট ঠাকুরের পায়ের নীচে একটা ছোট্ট কোটর আছে?’

কানু আরও অবাক হল। দু-দিকে ঘাড় নাড়ল। জানে না।

হারান বলল, ‘যদি আর কেউ ইতিমধ্যে না জেনে থাকে তাহলে ওখানে একটা জিনিস থাকার কথা। তুমি এক কাজ করো বাবা। একহাতে বেদিটাকে চেপে ধরে যুগলমূর্তিকে একটু বাঁ-দিকে ঠেলে দাও তো। দেখোতো কী হয়। ওখানে কিছু পাও নাকি!’

কানু মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাই করল। যুগলমূর্তি সরে গেল। একটা কোটর দেখা দিল। কানু সেখান থেকে বের করে আনল গোলাপি কাগজের একটা মোড়ক।

হারান তখন কাঁপছে। বলল, ‘ওটা খোলো। ওর মধ্যে একটা হার থাকার কথা।’

হাতের মুঠোয় হার নিয়ে কানুবজ্রাহতের মতো তাকিয়ে আছে হারানের দিকে। অনেক কষ্টে বলল, ‘সত্যি করে বলোত কাকা—তুমি কে?’

হারান বলল, ‘বলব। আজ সবকথা বলব। কিন্তু মনে রেখো ঠাকুর সাক্ষী রেখে তুমি আমার কথা দিয়েছ সেকথা তুমি কাউকে কোনোদিন বলবে না।’

অনেকক্ষণ সময় নিয়ে হারান সবকথাই বলল কানুকে। নিজের জীবনের গোড়ার দিকের কথা, বাজপড়ার পর তার গতজীবনের কথা মনে পড়ে যাওয়ার ঘটনা—সব, সবকিছু।

হারান রাজি হয়নি।বলেছিল, ‘না গো বউমা !এই তো তোমাদের নিয়ে বেশ আছি।’

অনেকক্ষণ থেকেই কানুর চোখ দিয়ে জল পড়ছে। অঝোর ধারে।

কানু বলল, ‘তুমি যেদিন এবাড়িতে প্রথম এলে—আমি তোমাকে দেখলাম ঠাকুরদালানে তুমি চোখবুজে বসে আছ—কাঁদছ। তুমি বিশ্বাস করো, তোমাকে দেখেই আমার মনে হল আমার মরে যাওয়া বাবা ফিরে এসেছে। এ জীবনেও তুমি দেখতে অবিকল আমার মরে যাওয়া বাবার মতো। তোমার মুখ, তোমার হাঁটা-চলা, কথাবার্তার ধরন সবকিছু। ঠাকুর জানেন, আজ পর্যন্ত মনে-মনে আমি তোমাকে আমার মরে যাওয়া বাবাই ভাবি। তোমার বউমা সেকথা জানে—আমি ওকে বলেছি। তুমিও আমাকে কথা দাও ঠাকুর সাক্ষী রেখে—তুমি আর কখনো আমাকে ছেড়ে চলে যাবে না। কথা দাও!’

হারান কেঁদে ফেলল। বড়ো সুখের কান্না। বলল, ‘কথা দিলাম। কিন্তু তুমি এই হারটা আমার নাতবউকে দিও। ঠাকুর নিজের জিম্মায় এতকাল রেখে দিয়েছেন শুধু তাকে দেবেন বলেই। নইলে এটাতো ওর পাওয়ার কথা নয়।’

চোখে জল মুখে হাসি নিয়ে দুজনেই যুগলমূর্তির দিকে তাকাল। হারানের মনে হল ঠাকুরের হাসিটা আজ যেন অন্যদিনের থেকে একটু আলাদা—দুষ্টুমিতে ভরা।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%