গৌতম দাশ

হিমাদ্রি ঘোষালের একটা শখ আছে। পুরোনো মুদ্রা সংগ্রহের শখ। যদিও তিনি নিজে অন্য কারও কাছে বলতে হলে এটাকে ‘মুদ্রাদোষ’ বলেই উল্লেখ করেন। গত দশ-এগারো বছরের চেষ্টায় তাঁর সংগ্রহটা মোটামুটি বেশ ভালো জায়গায় এসেই দাঁড়িয়েছে।
শখটা প্রথম চাগাড় দেয় তাঁর বন্ধু চন্দন চৌধুরীর বাড়িতে একটা একটাকার নোট দেখে। নোটটা উনিশশো চল্লিশ সালে ছাপা। একপিঠে ষষ্ঠ জর্জের মাথাওয়ালা ছবি। অপর পিঠে বাংলা এবং আরও ছ-টা অর্থাৎ মোট সাতটা ভাষায় এক টাকা কথাটা লেখা। ঈষৎ সবুজ রঙের নোটটা।
চন্দন ব্যাঙ্কে চাকরি করে। একদিন একজন বয়স্ক লোক ওইরকম একশোখানা নোট নিয়ে এসেছিল ব্যাঙ্কে। যদি পালটানো যায়। তার মা মারা যাওয়ার পর মায়ের বাক্সের মধ্য থেকে নোটের বাণ্ডিলটা বেরিয়েছিল। ইংরেজ আমলের নোট, সুতরাং, সরকারিভাবে পালটানো যায়নি। কিন্তু চন্দন নিজের পকেট থেকে দশটা টাকা দিয়ে ওইরকম দশখানা নোট কিনে ছিল।
হিমাদ্রি ঘোষাল চন্দনের কাছ থেকে একটা নোট নিয়েছিলেন।
শুরুটা ওখান থেকে। কিন্তু পরেরগুলো? হিমাদ্রি ঘোষাল জানতেন, কলকাতায় অনেক জায়গায় পুরোনো পয়সা বিক্রি হয়। কিন্তু এটাও জানতেন যে, তার বেশির ভাগটা জাল।
ভাবতে ভাবতেই উপায় বের হল পুরোনো লোহা বা অ্যালুমিনিয়ামের ভাঙা জিনিসপত্র কিনতে কিছু কিছু লোক গ্রাম- গ্রামান্তরে ঘুরে বেড়ায়। এরকম জনাতিনেক লোকের সঙ্গে তিনি যোগাযোগ করলেন। তারা গ্রামে গ্রামে তাদের জিনিসপত্র কেনার সঙ্গে সঙ্গে পুরোনো পয়সার খোঁজ করবে। পেলে তিনি উপযুক্ত দামে সেগুলো কিনে নেবেন।
পদ্ধতিটা ভালোই ফল দিয়েছিল। ধীরে ধীরে তাঁর সংগ্রহটা পুষ্ট হতে লাগল। মোগল আমলের দুটো মুদ্রা সবচেয়ে পুরোনো—যেগুলোর একপাশটা অনেকটা ক্ষয়ে গেছে। কোচবিহারের মহারাজা একসময়ে মুদ্রার প্রচলন করেছিলেন। সেই মুদ্রাগুলোর একপাশে বাংলায় লেখা ‘একপাই সিক্কা’। সেইরকম মুদ্রাও দুটো আছে। ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির আমলে দেশীয় মহারাজারা যে মুদ্রা বের করেছিলেন, তার এক পিঠে ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির এমব্লেম—অপর পিঠে মহারাজার মাথা।
তাঁর সংগ্রহে গোয়ালিয়রের এবং জয়পুরের মহারাজার মুদ্রা আছে। এ ছাড়া আঠারোশো তেত্রিশ থেকে উনিশশো সাতচল্লিশ পর্যন্ত যাবতীয় পয়সার নমুনা তো আছেই। সঙ্গে আরও নানারকম।
মাঝে মাঝে হিমাদ্রি ঘোষাল বাক্সটা খুলে বসেন। একটা অদ্ভুত আনন্দলাভ করেন। মুদ্রাগুলো কয়েকশো বছর ধরে কত হাজার লোকের হাত ঘুরে তবে তাঁর কাছে এসেছে। ওগুলোর মাধ্যমে তিনি যেন ওই লোকগুলোর সবাইকে ছুঁতে পারেন।
আজ সকালে বিষ্টু হালদার একটা জিনিস দিয়ে গিয়েছে। বিষ্টু ওই তিনজনের একজন। জিনিসটা কোনো মুদ্রা নয়। একটা গোল চাকতি। ব্যাঙ্কের টোকেনের সাইজের। পরিষ্কার করার পরেও ধাতুটা কী, সেটা অবিশ্যি হিমাদ্রিবাবু বুঝতে পারলেন না। রূপো হতে পারে। ব্রোঞ্জও হতে পারে। জিনিসটা খুব সম্ভবত কোনো হারের লকেট। একপিঠ একদম সমান। অন্যপিঠে, ওপরের দিকটাতে ইংরেজিতে লেখা ‘এস এন’ আর তার নীচের দিকে একটা সাল—আঠারোশো উনপঞ্চাশ। একদম ওপরে হারের সঙ্গে আটকানোর জন্য একটা আঙটার ভাঙা আভাস।
হিমাদ্রিবাবু লকেটটার জন্য বিষ্টুকে একশোটা টাকা দিলেন।
এরকম ব্যক্তিগত কোনো জিনিস, এর আগে কখনো পাননি তিনি।
আবার একটু নেড়েচেড়ে দেখার জন্য রাতে শোওয়ার আগে লকেটটা নিয়ে বসলেন। আঠারোশো উনপঞ্চাশ মানে সিপাহি বিদ্রোহ ঘটতে তখনও আট বছর বাকি। ইংরেজিতে লেখা কোনো লকেট খুব সম্ভবত সেই সময়ে কোনো বাঙালি মহিলার গলায় ঝুলত না। সুতরাং, এটা কোনো মেমসাহেবের হওয়াই সম্ভব। ‘এস’ এবং ‘এন’ অক্ষরদুটো নামের আদ্যক্ষর হতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে বিষ্টু জিনিসটা এই নদিয়া জেলার অজপাড়াগাঁ থেকে পেল কী করে?
কথাগুলো মনে মনে নাড়াচাড়া করতে করতেই রাতে ঘুমোলেন হিমাদ্রিবাবু।
সকালে উঠে টেবিলে রাখা লকেটটার ওপর চোখ পড়তেই রাতের স্বপ্নটার কথা মনে পড়ে গেল।
স্বপ্নে একজন লম্বা-চওড়া, কাঁচা-পাকা দাড়ি-গোঁফওয়ালা সাহেব এসে হিমাদ্রিবাবুর ঘরের দরজায় দাঁড়িয়েছিল। সঙ্গে একটা মিশকালো কুকুর। সাহেব হাত-পা নেড়ে কিছু একটা বলছিল আর বারেবারে টেবিলের ওপরের লকেটটাকে দেখাচ্ছিল। হিমাদ্রিবাবু অবিশ্যি সাহেবের কথা একবর্ণও বুঝতে পারেননি।
আপনমনেই একটু হাসলেন হিমাদ্রিবাবু। স্বপ্নে কত রকমের উদ্ভট কান্ডই না ঘটে! কিন্তু খানিকক্ষণ পর থেকেই একটা কাল্পনিক চিন্তা মনের মধ্যে খচখচ করতে লাগল। চিন্তাটা স্বপ্নকে ঘিরেই। সকাল বেলাই বিষ্টুকে খবর পাঠালেন আসার জন্যে।
বিষ্টু এল সন্ধ্যার পরে। হিমাদ্রিবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, ‘বিষ্টু জিনিসটা তুমি কোথা থেকে পেলে?’
বিষ্টু বলল, ‘আমডাঙায়।’
‘সেটা কোথায়?’
‘এখান থেকে সাত-আট মাইল দূরে হবে।’
‘কার কাছে পেলে?’
‘একটা বারো-চোদ্দো বছরের ছেলের কাছ থেকে। দুটো ছেলে ছিল একসঙ্গে। যে ছেলেটার কাছে ওটা ছিল—তার নাম শিবু। সঙ্গের ছেলেটা ওকে ওই নামেই ডাকছিল। শিবু আমার ছেলেরও ডাকনাম। তাই নামটা মনে আছে। ছেলেটার গলার স্বরটা একটু খোনা খোনা। শিবু পকেট থেকে জিনিসটা বের করে আমাকে জিজ্ঞেস করল যে আমি নেব কিনা! তো আমি দেখলাম, জিনিসটা অনেকটা পয়সার মতো দেখতে হলেও পয়সা নয়। অনেকদিন মাটির নীচে পড়ে থাকলে যেমন হয়, সেরকম কাদা-মাটি লেগে কালচে মতো হয়ে গেছে। ভাবলাম, আপনি তো পুরোনো জিনিস নেন, তাই নেব কি নেব না ভাবতে ভাবতে নিয়েই নিলাম। ওকে দুটো টাকা দিয়েছিলাম।...ও হ্যাঁ, আমি ওকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘‘এটা তুই কোথায় পেলি?’’ ছেলেটা বলল, ‘‘কুড়িয়ে পেয়েছি।’’...কেন বাবু, এটা কী চোরাই মাল না কি?’
‘একটু গোলমেলে ব্যাপার আছে বিষ্টু। কাল রবিবার। কাল সকালেই আমরা আমডাঙায় যাব। তুমি সকাল আটটার মধ্যে এখানে চলে আসবে।’
জায়গায় জায়গায় রাস্তা বেশ খারাপ। হিমাদ্রিবাবুর মারুতি আমডাঙা পৌঁছোতে সময় নিল প্রায় আধঘণ্টা। আমডাঙা স্কুলের মাঠে গিয়ে গাড়ি থামল। এখনও গ্রামাঞ্চলে মোটরগাড়ি গেলে চারপাশে বাচ্চাদের একটা দল তৈরি হয়ে যায়। মিনিট দশেকের মধ্যেই হিমাদ্রি বাবুদের চারপাশে জনা দশ-বারো বাচ্চা ছেলেমেয়ে জুটে গেল। তাদের কাছে শিবুর বর্ণনা দেওয়ামাত্রই একটা ছেলে তিরের মতো ছুটে চলে গেল এবং মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই শিবুকে হাজির করে ফেলল।
হিমাদ্রিবাবু বিষ্টুর দিকে তাকালেন। বিষ্টু ঘাড় নাড়ল, অর্থাৎ এটাই সেই ছেলে। ততক্ষণে দু-চারজন বয়স্ক লোকও এসে গেছে বসার জন্যে একটা বেঞ্চ এসে গেল।
হিমাদ্রিবাবু পকেট থেকে লকেটটা বের করলেন। শিবুকে কাছে ডাকলেন। বিষ্টুকে দেখিয়ে শিবুকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এটা তুমি সেদিন ওকে দিয়েছিলে?’
শিবু একটু ঘাবড়ে গেছে বলে মনে হল। পরের মিনিট দশেকের চেষ্টায় শিবুর কাছ থেকে যে তথ্যটা বেরোল, সেটা এইরকম—
সাহেবকুঠিতে যে পেয়ারা গাছটা আছে, শিবু দিনকয়েক আগে সেই গাছটা থেকে পেয়ারা পাড়তে গিয়েছিল। তার আগে ক-দিন ধরে প্রচন্ড বৃষ্টি হয়েছিল, আর কে না-জানে বৃষ্টি হলে পেয়ারা পাকে।
কিন্তু সাহেবকুঠিতে তো আর একা যাওয়া সম্ভব নয়, সুতরাং শিবু নিলুকে নিয়ে গিয়েছিল। পাড়ার সময় একটা বড়ো পেয়ারা গাছ থেকে পড়ে গড়িয়ে একটু দূরে চলে গিয়েছিল। সেটা কুড়োবার সময়েই শিবুর নজরে পড়ে জিনিসটা। মাটি থেকে একটুখানি বেরিয়েছিল।
হাতে নিয়ে প্রথমে মনে হয়েছিল পয়সা। তারপর দু-জনে উলটে-পালটে দেখে বুঝেছিল ওটা পয়সা নয়। ফেলে না দিয়ে শিবু পকেটে রেখেছিল। তারপর পেয়ারা খেতে খেতে ফেরার সময়েই হঠাৎ বিষ্টুর সঙ্গে দেখা হয়। জিনিসটা সে বিষ্টুকে দেখিয়েছিল এই ভেবে যে, বিষ্টু যদি ওটার বদলে অন্তত আট আনা পয়সাও দেয়, তাহলে ওরা দু-জনে দুটো লজেন্স কিনতে পারবে।
হিমাদ্রিবাবু এরপর একজন বয়স্ক লোককে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আচ্ছা, এই সাহেবকুঠির ব্যাপারটা কী? ওটা কোথায়?’
দেখা গেল শুধু ওই ভদ্রলোক কেন, কেউই বিশেষ কিছু জানে না। শুধু এইটুকু জানে যে, ওটা কোনো একসময়ে সাহেবদের বাড়ি ছিল। গ্রামের উত্তর সীমানায় অনেকটা জায়গা নিয়ে ওটা ছিল। এখন ভাঙাচোরা ইট আর বনজঙ্গলে ভরতি। সাপের আড্ডা। তা ছাড়া জায়গাটার একটা ভৌতিক দুর্নামও আছে। ফলে গ্রামের লোকজন খুব একটা ওখানে যায় না।
কিন্তু এরকম ভাসা ভাসা খবরে হিমাদ্রিবাবুর মন ভরল না। স্বপ্নটা তাঁকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। জিজ্ঞেস করলেন, ‘গ্রামের অন্য কেউ বিশদভাবে বলতে পারবে?’
এবারে সকলেই একবাক্যে বলল যে, তাপস মাস্টার এব্যাপারটা খুব ভালোভাবে বলতে পারবে। মাস্টারমশাইয়ের বাড়ি ওখান থেকে মিনিট তিনেকের রাস্তা। জনতা তাঁকে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলল।
তাপসবাবু যত্ন করেই বসালেন হিমাদ্রিবাবুকে। তারপর জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে রইলেন।
হিমাদ্রিবাবু একটা গলা খাঁকারি দিয়ে শুরু করলেন, ‘আমি এখানকার সাহেবকুঠি সম্পর্কে একটু জানতে চাইছিলাম। এরা বলল যে, আপনি নাকি ব্যাপারটা সম্পর্কে বিশদভাবে জানেন। তাই—’
তাপসবাবু একটু হাসলেন। তারপর বললেন, ‘কেন? কোনো গবেষণা-টবেষণা নাকি?’
হিমাদ্রিবাবু বললেন, ‘সেটা পরে বলছি। তবে কোনো গবেষণা নয়। সাহেবকুঠির ইতিহাস সম্বন্ধে আপনি যতটুকু জানেন, সেটা যদি বলেন, তাহলে আমার পক্ষে একটা জিনিস বুঝতে সুবিধে হয়। কেননা জিনিসটা নিয়ে আমি প্রায় অন্ধকারে রয়েছি। আর তার জন্যে অস্বস্তি রয়েছে মনের মধ্যে।’
তাপসবাবু কয়েক সেকেণ্ড চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, ‘আমিও যে খুব বিশদভাবে জানি, তা নয়। তবু যতটুকু জানি, সেটা বলছি। এখানকার এই সাহেবকুঠি একসময়ে নীলকুঠি ছিল। খুব সম্ভবত এই নীলকুঠিটা তৈরি হয় ১৮৪২ সালে। নদিয়ায় একসময়ে প্রচুর নীলের চাষ হত। ‘‘হত’’ মানে সাহেবরা জোর করে করাত। এখানেও তাই। জনাদুয়েক সাহেব, তাদের স্থানীয় গোমস্তা আর লেঠেল বাহিনী ছিল। বড়ো সাহেবের নাম জানি না। ছোটো সাহেবের নাম ছিল স্যাণ্ডার্স।’
নিশ্চয়ই জানেন, ১৮৫৯ সালে নীলবিদ্রোহ হয়েছিল এবং সেই বিদ্রোহের ঢেউ নদিয়াতে ব্যাপকভাবেই লেগেছিল। তার মধ্যে আমডাঙাও বাদ যায়নি। এখানকার এবং পাশের গ্রাম চণ্ডিপুরের চাষিরা স্যাণ্ডার্স সাহেবকে মেরে ফেলেছিল। প্রাণভয়ে বড়োসাহেব পালিয়েছিল এখান থেকে। নীল চাষের ওখানেই ইতি।
তারপর কুঠিবাড়িটা ঠিক কতবছর পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল, বলতে পারব না। তবে খুব বেশি বছর নয়, হয়তো দু-এক বছর।

যাই হোক,আমডাঙা গ্রামের মানুষ একদিন দেখল, আরেকজন সাহেব এসে পরিত্যক্ত কুঠি বাড়িটা পরিস্কার করাচ্ছে, জঙ্গল কাটাচ্ছে।
যাই হোক, আমডাঙা গ্রামের মানুষ একদিন দেখল, আরেকজন সাহেব এসে পরিত্যক্ত কুঠিবাড়িটা পরিষ্কার করাচ্ছে, জঙ্গল কাটাচ্ছে। জানা গেল, ওই সাহেব কুঠিবাড়িটা কিনে নিয়েছে এবং বাস করবার জন্যই এখানে এসেছে। এই সাহেবের নাম স্যামুয়েল নরিস। প্রথমদিকে গ্রামের লোকজন সাহেবকে বাঁকা নজরেই দেখেছিল। তারপর ক্রমে-ক্রমে দেখল, এই সাহেবের স্বভাব আলাদা। গ্রামের আপদেবিপদে নিজে থেকেই ঝাঁপিয়ে পড়ে। তারপর কবে যে সাহেব আমডাঙার একজন হয়ে উঠল সেটা কেউ জানে না। গ্রামের লোকের কাছে সে হয়ে উঠল। ‘‘স্যামসাহেব’’। এই স্যামসাহেবের সবচেয়ে প্রিয় ছিল তার নিজের একটা কুচকুচে কালো কুকুর। আর প্রিয় ছিল গ্রামের ছোটখাটো ছেলের দল।
স্যামসাহেব সম্ভবত স্কটল্যাণ্ডের মানুষ ছিল। পৃথিবীতে একমাত্র আপনজন বলতে ছিল তার এক বোন। সেই বোন মারা যেতে সে স্কটল্যাণ্ডের যাবতীয় সম্পত্তি বিক্রি করে দিয়ে ভারতবর্ষে চলে আসে। স্যামসাহেবের গলায় সবসময়ে ঝুলত সেই বোনের দেওয়া একটা হার।
যাই হোক, কোন যোগাযোগের ফলে যে সাহেব আমডাঙার নীলকুঠি কিনে নিয়ে বাস করতে শুরু করল, সেটা আমি বলতে পারব না। তবে সাহেবের মৃত্যু হয় এই আমডাঙা গ্রামেই। আর আশ্চর্যের কথা, একই দিনে তার কুকুরটাও মারা যায়।
এসবই অবশ্য আমার শোনা কথা। আমি আমার এক বন্ধুর অতিবৃদ্ধ ঠাকুরদার মুখে শুনেছি। উনি ছেলেবেলায় স্যামসাহেবের প্রিয় ছেলের দলের মধ্যেই ছিলেন। স্যামসাহেব মারা যাওয়ার পর কুঠিবাড়িটা ওই অবস্থাতেই পড়েছিল। আর এখন তো ভাঙাচোরা কিছু ইট, বনজঙ্গল আর সাপখোপ ছাড়া কিছুই নেই। লোকে বলে, মাঝে-মাঝে স্যামসাহেব আর তার কুকুরকে নাকি দেখা যায় ওখানে। তবে ওরকম গল্প তো অনেকই শোনা যায়, যেগুলো গল্পই। সত্যি নয়।
তাপসবাবু থামলেন। হিমাদ্রিবাবু এতক্ষণ একমনে শুনছিলেন। এবার বললেন, ‘না তাপসবাবু। এটা গল্প হলেও বোধ হয় সত্যি। স্যামসাহেবের গলার হারের লকেটটা ঘটনাক্রমে আমার হাতে চলে এসেছে। এবং সেই সুবাদে পরপর দু-রাত্তির আমি স্যামসাহেব এবং তার কুকুরের দর্শন পেয়েছি। সাহেবের লকেটটা আমি ফেরত দিতে চাই। সেই জন্যেই আমি আমডাঙায় এসেছি।’
আদ্যোপান্ত ঘটনাটা হিমাদ্রিবাবু তাপসবাবুকে বললেন। তারপর লকেটটা দিলেন তাপসবাবুর হাতে।
শিবুকে নিয়ে দলটি সাহেবকুঠির দিকে চলল। মিনিট দশেক লাগল পৌঁছোতে। ভাঙাচোরা ইট, বনজঙ্গল মাড়িয়ে চৌহদ্দির দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে শিবু নিয়ে গেল। হাতদশেক দূরে একটা পেয়ারা গাছ। একটা বনতুলসির ঝোপের পাশে সেই জায়গাটা, যেখানে লকেটটা পাওয়া গিয়েছিল। জায়গাটা অন্যান্য জায়গার তুলনায় সামান্য উঁচু।
হিমাদ্রিবাবু তাপসবাবুকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘জায়গাটা কি একটু খুঁড়ে দেখা যায়?’
একটা কোদাল এসে গেল। খুব বেশি খুঁড়তে হল না। ফুটখানেক খুঁড়তেই দেখা গেল—একটা মানুষের এবং একটা পশুর কঙ্কাল পাশাপাশি শোয়ানো। নিখুঁত নয়— ভাঙাচোরা, কিন্তু পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে। মানুষের গলার হারটা বিবর্ণ হলেও যথাস্থানে রয়েছে। শুধু হারের লকেটটা হিমাদ্রিবাবুর কাছে পৌঁছে গিয়েছিল।
হিমাদ্রিবাবু লকেটটা নিজের হাতে কঙ্কালের বুকের ওপরে রেখে দিলেন। মনে মনে বললেন,—স্যামসাহেব, তোমার জিনিস তোমাকে দিয়ে গেলাম। এবার শান্তিতে থাকো।
মাটি দিয়ে কবরটা আবার ভরতি করে দেওয়া হল। তাপসবাবু এবং সকলের কাছে বিদায় নিয়ে গাড়িতে ওঠার সময়ে হিমাদ্রিবাবুর মনে হল, কেউ যেন কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, ‘থ্যাঙ্ক ইউ’। অবিশ্যি শোনার ভুলও হতে পারে। হিমাদ্রিবাবু আপনমনে একটুখানি হেসে ফেললেন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন