গৌতম দাশ

অভ্যেসমতো বলাইমাস্টার সকালবেলা জামবাটিভরা মুড়ি আর একটা ছোটো কাঁসার বাটিতে আন্দাজমতো আড়াইশো গ্রাম আখের গুড় নিয়ে সবে বসেছেন। প্রথমবারের মুঠোভরতি মুড়ি জামবাটি আর হাঁ-করা মুখের মাঝামাঝি জায়গায়, এমন মোক্ষম সময় বাইরে থেকে হাঁক, ‘মাস্টারমামা, বাড়ি আছ নাকি? মাস্টারমামা...!’
মুঠোভরতি মুড়ি আবার জামবাটিতে ফিরে গেল!
বলাইমাস্টার সাড়া দিলেন, ‘কে?’
বাইরে থেকে জবাব এল, ‘আমি শীতলকাটির দাশু কয়ালের ভগিনীপতির মাসতুতো ভাই। একবার বাইরে আসবে?’
মুখের খাবার ফেলে বলাইমাস্টার বাইরে এলেন, কিন্তু কালো, ছিপছিপে, লম্বা চুলওয়ালা ছোকরাটিকে চিনতে পারলেন না। যদিও এক্ষুনি ছোকরা বেশ ঘনিষ্ঠ গলায় তাঁকে ‘মামা’ বলে ডাকছিল। তবে শীতলকাটির দাশু কয়ালকে তিনি চেনেন। ক-মাস আগে দু-বস্তা ধান চুরি করে ধরা পড়েছিল। কালী সরকারের ধান। সুন্দরবনের এই অঞ্চলের লোক থানা-পুলিশের বিশেষ ধার ধারে না। কাছাকাছি দু-তিনটে গ্রামের মাতব্বরদের ডেকে ছোটোখাটো অপরাধের ফয়সালা নিজেরাই করে নেয়। সেবার ওই ধান চুরির ব্যাপারে তিনজনের একজন বিচারক ছিলেন রঘুনাথপুরের বলাইমাস্টার। তবে সেবার বলে নয়, এই অঞ্চলের ভালো-মন্দ সমস্ত ছোটখাটো ব্যাপারেই বলাইমাস্টারের ডাক পড়ে। এলাকার লোক তাঁকে মাতব্বর বলে মানে। পেটে বিদ্যে না থাকলে কি আর মানুষ কখনো মাস্টার হয়? কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে, এখানকার কেউই তাঁকে মাস্টারি করতে দেখেনি। বহুকাল আগে এখান থেকে অনেক দূরে সোনাখালি নামে এক গাঁয়ে মাসছয়েক একটা প্রাইমারি স্কুলে মাস্টারি করতেন বলাই মজুমদার। সেখানে তেমন ভালো লাগেনি বলে ফিরে এসেছিলেন। এখন বাপ-ঠাকুরদার মতো আবার জমিজিরেত, ছোটোখাটো ব্যাবসা নিয়েই আছেন। কিন্তু ছ-মাসের মাস্টারির দৌলতে নামের পেছনে ‘মাস্টার’ উপাধিটা জুড়ে গেল। লোকে বলে ‘বলাইমাস্টার’। সেই সুবাদে পাঁচজনে বেশ খাতিরও করে। ব্যাপারটা মন্দ লাগে না।
মুখটা যথাসম্ভব গম্ভীর করে বলাইমাস্টার বললেন, ‘কী ব্যাপার?’
ছোকরা তড়বড় করে বলল, ‘তোমাকে শীতলকাটির লোকজন এখনই যেতে বলেছে। বাঘ দেখার নেমন্তন্ন। উত্তম ঘোষের গোয়ালে কাল রাতে একটা বাঘ ধরা পড়েছে। ওখানকার লোকরা বুঝতে পারছে না বাঘটাকে নিয়ে কী করবে! তাই তোমাকে ডেকে পাঠাল।’
বলাইমাস্টার শুকনো গলায় বললেন, ‘তুমি?’
ছোকরা আবার কথার খই ফোটাল, ‘আমি হারু। ঝাউচরে বাড়ি। কুটুমবাড়ি বেড়াতে গিয়েছিলাম। কাল রাতে শীতলকাটিতে দাশু কয়ালের বাড়িতে ছিলাম। রাতে একটা বাঘ উত্তম ঘোষের গোয়ালে কেমন করে যেন আটকে গিয়েছিল! মাঝরাতে থেকেই গাঁ-সুদ্ধ লোকের হইচই, চেঁচামেচি। মাঝখান থেকে আমার কাঁচাঘুমের দফারফা হয়ে গেল। তাই ভোর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজের বাড়িতে কেটে পড়ছি। তা ওখানকার লোকেরা বলল, যাওয়ার পথে যেন তোমাকে একটা খবর দিয়ে যাই। তাই দিলাম। ওরা বলেছে, ঘণ্টাখানেকের মধ্যে না গেলে আরেকজনকে পাঠিয়ে দেবে তোমাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার জন্য। তোমার নিস্তার নেই। দুগগা দুগগা বলে তাড়াতাড়ি রওনা হয়ে যাও। বাঘ দেখার নেমন্তন্ন রক্ষা করোগে। আমি যাই!’
মুচকি হেসে ছোকরা পা চালিয়ে চলে গেল।
এক-একটা সকাল আসে কাউকে কাউকে জব্দ করার জন্য। বলাইমাস্টার তৎক্ষণাৎ বুঝে গেলেন, আজ তাঁর জন্য সেরকম একটা সকাল বরাদ্দ হয়েছে। আজ সারাদিন তাঁকে নাকানি-চোবানি খেতেই হবে। সাতসকালে নেমন্তন্ন কীসের? না, বাঘ দেখার! কী অদৃষ্ট! লোকের ভূরিভোজের নেমন্তন্ন থাকে, আর তাঁর বরাতে বাঘ দেখার নেমন্তন্ন! না গেলে আবার লোক পাঠিয়ে ধরে নিয়ে যাওয়ার হুমকি দিয়ে রেখেছে। জীবনের ওপর ঘেন্না ধরে গেল বলাইমাস্টারের।
তবে যেতে যখন হবেই, একা যাওয়াটা সমীচীন হবে না। মুকুন্দকে সঙ্গে নিতে হবে। মুকুন্দ বলাইমাস্টারের দাবার পার্টনার। দু-জনে গল্প করতে করতে গেলে টেনশন খানিক কমবে। রঘুনাথপুর থেকে শীতলকাটি পনেরো-কুড়ি মিনিটের হাঁটাপথ।
কিন্তু মুকুন্দ প্রস্তাব শুনেই আঁতকে উঠল, ‘ওরে বাবা, বলো কী হে? এখনও তো ঠিকঠাক সকাল হয়নি, বাঘ দেখার নেমন্তন্ন এসে গেল? মানুষের কি খেয়ে দেয়ে কাজ নেই? দাঁড়াও, আমার বোধ হয় আজ অনেক কাজ আছে বাড়িতে। এখনই মনে পড়ছে না বটে! তা ছাড়া কাল বিকেল থেকেই আমার পেটের ডান দিকটায় কুনকুন করে একটা যন্ত্রণা হচ্ছে। ইচ্ছে থাকলেও আমার যাওয়া বোধ হয় ঠিক হবে না মাস্টার! অসুস্থ শরীর। ধরো, রাস্তায় যদি বেড়ে যায় তখন তোমারই হাঙ্গামা বাড়বে। তার চেয়ে এবারে তুমি একাই ঘুরে এসো। বিকেলে ফিরে এসে গপপো কোরো। দাবা না খেলে শুনবখন বসে বসে।’
সংকটকালে মিহি মিথ্যেয় দোষ নেই। শাস্ত্রে নাকি এরকমই লেখা রয়েছে। বলাইমাস্টার বললেন, ‘একঘণ্টার মধ্যে না পৌঁছোলে লোক পাঠিয়ে আমাদের দু-জনকে ওরা ধরে নিয়ে যাবে বলে খবর পাঠিয়েছে। তুমি বোধ হয় একটু ভয় পাচ্ছ মুকুন্দ? কিন্তু ভয়টা কীসের? বাঘ তো ঘরের মধ্যে বন্ধ। তা ছাড়া এখন রঘুনাথপুরের সম্মান আমাদের হাতে। না গেলে ওরা ধরে নেবে, ভয় পেয়ে আমরা গেলাম না। শরীর খারাপের কথা বিশ্বাসই করবে না। সেটা অপবাদের শামিল মুকুন্দ! খবরটা পাওয়ার পর থেকেই আমি মনে মনে ছটফট করছি, কতক্ষণে তোমাকে নিয়ে শীতলকাটিতে পৌঁছোব। ওখানকার লোকজন আমাদের পরামর্শের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। মুকুন্দ, কবি বলেছেন, ‘‘হও উন্নত শির, নাহি ভয়’’।’
মুকুন্দ ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বলল, ‘চলো তা হলে। পৈতৃক প্রাণটা মুক্তহস্তে দান করে আসি। কিন্তু আমার বাপু একটু দেরি হবে। সকাল থেকে এখনও পেটে কিচ্ছু পড়েনি। ফাঁসির আসামির মতো শেষ খাওয়াটা খেয়ে নিই। তুমি বাড়ি যাও, কাজ গুছিয়ে খানিক পর আমি যাচ্ছি।’
বলাইমাস্টার বললেন, ‘না না, ঠিক আছে, তুমি খেয়ে-দেয়ে নাও। আমি তোমার এখানেই বসছি। বাড়ি ফিরে গিয়ে আর হবেটা কী? আমি গোছগাছ করেই বেরিয়েছি।’
আধঘণ্টার মধ্যেই বলাইমাস্টার মুকুন্দকে সঙ্গে নিয়ে শীতলকাটির পথে রওনা হলেন। যেতে-যেতে বেজার মুখে মুকুন্দ বলল, ‘আজকাল বাঘদের কী হয়েছে বলো তো মাস্টার? প্রায়ই শুনি বন ছেড়ে লোকালয়ে হানা দিচ্ছে। এটা তো আমাদের পক্ষে খুব দুশ্চিন্তার কথা। কারণটা কী?’
বলাইমাস্টার একটু ভেবে নিয়ে বললেন, ‘এর অনেক কারণ। তবে আমার যা মনে হয়, বাঘদের মনে দুঃখ হওয়াটাই এর প্রধান কারণ। মানুষের বেলায় কী হয়? কথায় আছে, লোকে মনের দুঃখে বনে যায়। কিন্তু ভেবে দ্যাখো মুকুন্দ, যারা বনেই বাস করে, তারা কী করবে? মনে দুঃখ হলে বন ছেড়ে তারা কোথায় যাবে? চারপাশেই তো লোকালয়। বাধ্য হয়ে তাদের লোকালয়েই আসতে হয়। মানুষের ওপর খানিক উৎপাত করে মন ভালো হলে আবার বনে ফিরে যায়।’
মুকুন্দ বিরস হয়ে বলল, ‘এটা কি রঙ্গ-রসিকতার সময় মাস্টার? তুমি পারও বটে!’ একটু পরে আবার বলল, ‘কিছুদিন আগে টিভিতে দেখছিলাম, একটা বাঘ লোকজনের তাড়া খেয়ে তালগাছে উঠে পড়েছে। বনবিভাগের লোক জাল, ঘুমপাড়ানি বন্দুক-টন্দুক নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে সেটাকে নামাতে। আমার তখন মনে হচ্ছিল, বাঘটা বেশ মজা পাচ্ছে এসব দেখে। হাসি হাসি মুখে জুলজুল করে তালগাছের ওপর থেকে তাকিয়ে ছিল। তুমি দেখেছিলে মাস্টার?’
বলাইমাস্টার বললেন, ‘ওই টিভিতেই যা দেখেছি। তবে আমার ধারণা, ওটা পাগল বাঘ। পাগলদের ওপরে উঠে বসে থাকার একটা ঝোঁক থাকে। মাঝে মাঝেই খবরে দেখা যায়, এক-একটা পাগল দুম করে হাওড়া ব্রিজের ওপর উঠে বসে থাকে। নীচে হাজারখানেক লোক জমে যায়। গাড়ি চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পাগল ওপর থেকে মজা দ্যাখে। তারপর দমকলের লোকেরা নীচ থেকে অনেক কাকুতিমিনতি করে তাকে নামায়। টিভিতে দেখানো বাঘটাও নির্ঘাত এই ধরনের পাগল বাঘ। হাতের কাছে হাওড়া ব্রিজ পেলে সেখানেই উঠে পড়ত! সেটা না পেয়ে তালগাছে বাধ্য হয়ে উঠে পড়েছে। কী করবে বলো? বেচারাকে দোষ দেওয়া যায় না।’
মুকুন্দ বলল, ‘তোমার মনে দেখছি ফুর্তির জোয়ার লেগেছে। আমার এদিকে দুশ্চিন্তায় নাড়ি ছেড়ে যাওয়ার জোগাড়।’
পথ একটু পরেই ফুরিয়ে গেল। গ্রামের বাইরে থেকেই মানুষের কোলাহল শোনা যাচ্ছে। মুকুন্দ ফ্যাকাশে মুখে বলল, ‘হট্টগোল শুনেছ মাস্টার? গাঁয়ে যেন মোচ্ছব লেগেছে।’
বলাইমাস্টার জিভ দিয়ে শুকনো ঠোঁট ভিজিয়ে বললেন, ‘তাতে আমাদের কী বলো? আমরা বাইরের লোক, আমাদের ডেকে পাঠানো হয়েছে, যাচ্ছি। যদি পরামর্শ চাওয়া হয়, বোধবুদ্ধি অনুযায়ী দেব। আমরা তো আর বাঘকে কোলে করে বনে পৌঁছে দিতে যাব না!’
উত্তম ঘোষের বাড়িটা ইতিমধ্যেই একটা অনুষ্ঠান বাড়ির চেহারা নিয়েছে। সামনের উঠোনে একটা বড়ো চট শামিয়ানার মতো করে টাঙিয়ে রোদ্দুর আড়াল করা হয়েছে। নীচে গোটাকয়েক মাদুর, শতরঞ্চি পাতা। সেখানে আট থেকে আশি, সব বয়সের মানুষের ভিড়। এখনই বোধ হয় একপ্রস্থ চা বিতরণ করা হয়েছে। কয়েকজনের হাতে প্লাস্টিকের চায়ের কাপ। উত্তম ঘোষ গলার দু-দিকে একটা ভাঁজ করা চাদর ঝুলিয়ে হাতজোড় করে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
এঁদের দু-জনকে দেখেই জনতা ফেটে পড়ল, ‘এই তো মাস্টারমশাই এসেছেন। সঙ্গে মুকুন্দও আছেন।’
উত্তম ব্যস্ত হয়ে এগিয়ে এসে আপ্যায়ন করল, ‘আসুন-আসুন মাস্টারমশাই। এই যে এখানে এসে বসুন। মুকুন্দভাই আসুন। বড়ো কষ্ট দিলাম আপনাদের। কী করব বলুন? উপায় ছিল না। ওরে জগা, আগে এদিকে দু-চাপ চা দিয়ে যা। অনেক দূর থেকে এঁরা এসেছেন। নিন, চা খান মুকুন্দভাই। ওরে মাস্টারমশাইকে দে।’
বলাইমাস্টার বললেন, ‘চা পরে হবে। আগে একঘটি খাবার জল দাও। তেষ্টায় গলা শুকিয়ে গিয়েছে। তা, এটা আবার তোমার কেমন মতিগতি উত্তম? গোয়ালে লোকে গোরু পোষে, তুমি নাকি আজকাল বাঘ পোষা শুরু করেছ?’
উত্তম লজ্জিত মুখে বলল, ‘সবই গ্রহের ফের মাস্টারমশাই। গোয়ালে তো গোরুই ছিল। গত অঘ্রানে একটা গোরুকে বাঘে মারল। বাকি একটা গোরু দিয়ে তো আর হালচাষ করা যায় না। বাধ্য হয়ে সেটাকে বেচে দিতে হল। ইচ্ছে ছিল, সামনের দুটো মাস পর একজোড়া হালের বলদ কিনব। গোয়ালটা কয়েক মাস ধরে ফাঁকাই পড়ে আছে। মানে ঠিক ফাঁকা নয়, গোরুর বদলে কিছু কাঠ, কয়েক বাণ্ডিল বিচুলি আর দু-বোঝা পাটকাঠি আছে ওখানে।’
মুকুন্দ ঝাঁঝিয়ে উঠল, ‘বক্তিমে থামিয়ে আসল কথাটা বলো তো উত্তম। বাঘটাকে পাকড়ালে কেমন করে?’
উত্তম মিটিমিটি হেসে বলল, ‘সেই কথাটাই তো বলছি। কাল রাতে ঘড়ি দেখিনি, তবে অনেক রাতই হবে। হঠাৎ আমার ছোটোছেলে গণেশের পায়ে যন্ত্রণা শুরু হল। বিকেলে খেলতে গিয়ে কোত্থেকে ডান পা মচকে এসেছে। কথাটা বাড়িতে বলেনি বকুনি খাওয়ার ভয়ে। এবার রাতদুপুরে টাটানি শুরু হয়েছে। ‘‘বাবা গো, মা গো’’ করে চিৎকার করছে। তখন কী করা যায়? ভাবলাম, চুন-হলুদ গরম করে লাগালে যদি ব্যথা কমে! লম্ফ ধরিয়ে পাটকাঠি নেওয়ার জন্য গোয়ালে গিয়ে ঢুকলাম। চুরি করার মতো তেমন কিছু নেই বলে গোয়ালের দরজা বেশিরভাগ সময় খোলাই থাকে। যেই-না একগোছা পাটকাঠি নিয়েছি, কাঠের গাদার পাশে একটা খসখস শব্দ পেলাম। নাকে এল বিটকেল বোটকা গন্ধ। লম্ফের আলোয় জ্বলজ্বলে একজোড়া চোখ।’
বলাইমাস্টার বললেন, ‘কাঠের গাদায় বাঘ? বেশ কাষ্ঠরসিক বাঘ বলতে হবে। কী বলো উত্তম?’
উত্তম হেসে বলল, ‘আজ্ঞে, তা যা বলেছেন। ভয় একটু পাইনি তা নয়, কিন্তু ঠাকুরের কৃপায় আর আপনাদের আশীর্বাদে বুদ্ধি হারাইনি বলে এ যাত্রায় প্রাণে বেঁচে গেলাম মাস্টারমশাই! এক পা এক পা করে পিছিয়ে আসতে গিয়ে বিচুলির বাণ্ডিলে পা আটকে পড়ে যাই আর কী! সামলাতে গিয়ে লম্ফ গেল নিভে। ঘুটঘুটে অন্ধকারে কোনোমতে হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে এসে গোয়ালের আগড়টা দিলাম লাগিয়ে। ব্যাস, বাঘবাবাজি ভেতরে আটকা পড়ে গেল।’
সমবেত জনতা একবাক্যে স্বীকার করে নিল, উত্তমের বুদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সাহসও আছে। উত্তম বলল, ‘এখন বাঘটাকে নিয়ে কী করা হবে, সেই পরামর্শের জন্যই আপনাদের দর্শন চেয়েছি। আপনি আছেন, পটাশপুরের সতীশখুড়ো আছেন, আমাদের গাঁয়ের পীতাম্বরমামা, মধুজ্যাঠা রয়েছেন। তা ছাড়া আরও অনেকে রয়েছেন। আপনারা পাঁচজন যা বলবেন, সেটাই শিরোধার্য করে নেব। বাঘটাকে গোয়ালের দরজা খুলে ছেড়ে দেওয়া হবে, নাকি বনবিভাগের লোক এসে ঘুমপাড়ানি বন্দুক দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে চ্যাংদোলা করে নিয়ে গিয়ে বনে ছেড়ে দেবে, নাকি অন্যকিছু...! আপনারাই ভেবেচিন্তে বলুন। ওরে জগা, আর-একবার একটু চায়ের বন্দোবস্ত কর।’
মুকুন্দ বলল, ‘বেশ ঘনঘন চা খাওয়াচ্ছ দেখছি। বাঘটাকে সকাল থেকে কিছু খেতেটেতে দিয়েছ? উপোস করে থাকলে সব প্রাণীরই মেজাজ বিগড়ে যায়, সেটা জানো তো?’
উত্তম কাঁচুমাচু হয়ে বলল, ‘আমাকে বেজায় লজ্জায় ফেললেন মুকুন্দভাই। কথাটা আপনার অন্যায্য নয়। বাঘ হোক আর যাই হোক, কৃষ্ণের জীব তো বটে! উপবাসে রাখা মহাপাপ। কিন্তু বিবেচনা করুন, বাঘের খোরাক আমি কোথায় পাব? এ তো আর খরগোশ নয় যে দু-টো গাজর আর বাঁধাকপির পাতা নিয়ে গিয়ে মুখের কাছে ধরব, আর মহাসুখে কচমচিয়ে খেয়ে নেবে। এ হল বনের রাজা। এমনিতেই বোধ হয় রেগে একেবারে আগুন হয়ে আছে, সকাল থেকে এ পর্যন্ত কোনো সাড়াশব্দ করেনি।’
বলাইমাস্টার হাত তুলে বললেন, ‘আচ্ছা, আচ্ছা, আমরা দেখছি কী করা যায়।’
সিদ্ধান্তে পৌঁছোতে বেশ সময় লাগল। শেষপর্যন্ত ঠিক হল, বাঘটাকে গোয়ালের দরজা খুলে মুক্তি দেওয়া হবে। বনদপ্তরে খবর দেওয়া যেত, কিন্তু কে এখন খালবিল পেরিয়ে চার মাইল ঠেঙিয়ে সেখানে খবর দিতে যাবে? আর খবর পেলেই যে বাবুরা হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসবেন, তা তো নয়। তাঁদের আঠেরো মাসে বছর। তার চেয়ে বনের জীব তাড়াতাড়ি বনে ফিরে যাক।
কিন্তু প্রশ্ন হল, এখন কে এগিয়ে গিয়ে গোয়ালের আগড়খানা খুলবে? পটাশপুরের সতীশখুড়ো বললেন, ‘কে আবার? যে আটকেছে, সেই খুলবে। উত্তম ঘোষ বাঘ ধরেছে, এসে দরজা খুলে তাকে ছেড়ে দেবে কি বনমন্ত্রী?’

ইষ্টনাম জপতে জপতে বলাইমাস্টার সেদিকে পা বাড়ালেন বটে,কিন্তু বুঝতে পারলেন, এই মুহুর্তে পা দুটো তাঁর বশে নেই, কে যেন পেছন থেকে তাঁকে একটু ঠেলা দিল।
উত্তম হাতজোড় করে বলল, ‘আপনার কথায় যুক্তি আছে খুড়োমশাই! একবার নয়, একশোবার মানি। কিন্তু শহর-বাজারে যেটা দেখা যায়, একটা নতুন কিছু যখন তৈরি হয়, ধরুন, একটা কারখানা। সেটা এসে উদবোধন করেন কোনো মন্ত্রী কিংবা বাইরের কোনো মান্যবর লোক। এখানে আপনাদের মতো জ্ঞানী গুণীজন হাজির থাকতে এই কাজ কি আমার মতো অধমকে শোভা পায়? আপনারাই বলুন। করতে আমার একবিন্দু আপত্তি নেই! কিন্তু ভেবে দেখুন, তাতে আপনাদের মানের হানি হবে। আর সেটা হবে কিনা আমারই ভিটেতে? এ যে আমার পক্ষে বড়ো লজ্জার কথা খুড়োমশাই।’
জনতা গুঞ্জন তুলল, ঠিক কথা। এখানে বিদ্যে-বুদ্ধিতে সবচেয়ে মানী লোক বলাইমাস্টার। কাজটা তাঁরই করা উচিত।
বলাইমাস্টার ফ্যাকাশে মুখে আমতা আমতা করে কিছু বলার চেষ্টা করলেন, কিন্তু জনতার কথার তোড়ে তাঁর গলা ডুবে গেল।
বৃদ্ধ পীতাম্বর সাঁপুই প্রথমে দু-হাত তুলে সকলকে শান্ত করলেন। তারপর দু-বার কেশে গলা পরিষ্কার করে বললেন, ‘মাস্টার, তুমি কি ভয় পাচ্ছ নাকি? অ্যাঁ? এতে ভয়ের কী আছে বাপু? আরে, আমরা এত লোক তো এখানেই রয়েছি। তুমি আগড়খানা খুলে দিয়ে টুক করে পিছিয়ে আসবে। ব্যাস, ফুরিয়ে গেল। বাঘ এখন নিজের প্রাণের ভয়েই আকুল, এখন কি আর তোমার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে বসে থাকার সময় আছে নাকি ওর? সাহস করে এগিয়ে যাও তো বাপু, কিসসু হবে না। আরে,আমার যদি তোমার মতো কম বয়স থাকত, দেখতে! কাউকে কিসসু বলতে হত না। বুক ফুলিয়ে গটগট করে গিয়ে কখন গোয়ালের আগড় খুলে দিতাম। বাঘ এতক্ষণ পগারপার। যত্ত সব ভিতুর ডিম। এরে জগা, তোর কেটলিতে আর চা আছে? হবে একটু?’
বলাইমাস্টার মিনমিনে গলায় বললেন, ‘না ইয়ে, ঠিকই তো, ভয়ের কী আছে? আমাকে আর-একটু জল দিও তো উত্তম। রোদে অনেকখানি হেঁটে এসেছি বলে ভেতরে-ভেতরে বড্ড জলটান হচ্ছে।’
উঠোনের পাশে একটা টিউবওয়েল। তার পাশে গোটা দুই আমগাছ। তার ওদিকে ঘরের পেছনে গোয়াল। গোয়ালের পেছন দিকে কলাবাগান।
উত্তম দূর থেকে গোয়ালের দরজা দেখিয়ে দিয়েছে। ইষ্টনাম জপতে জপতে বলাইমাস্টার সেদিকে পা বাড়ালেন বটে, কিন্তু বুঝতে পারলেন, এই মুহূর্তে পা দুটো তাঁর বশে নেই. কে যেন পেছন থেকে তাঁকে একটু ঠেলে দিল।
পিছনে যথেষ্ট দূরত্ব রেখে সতর্ক জনতা। দু-চারজন অত্যুৎসাহী কমবয়সি ছেলে আমগাছে চড়ে বসেছে। জনতা সাগ্রহে লক্ষ করছে বলাইমাস্টারকে।
টালমাটাল পায়ে এগোতে-এগোতে বলাইমাস্টার ঠিক করে ফেললেন, এ যাত্রায় প্রাণে বেঁচে ফিরতে পারলে প্রথমে কালীঘাটে গিয়ে মায়ের পুজো দেবেন। তারপর অন্যের ভালো-মন্দ বিষয়ে মাথা ঘামানো, মত প্রকাশ করা ইত্যাদি অনাবশ্যক ব্যাপারগুলো নিজের জীবন থেকে পুরোপুরি ছেঁটে ফেলবেন। এতদিন ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়িয়ে কী লাভ হল? এই তো আর কয়েক মুহূর্ত পরেই একটা কেঁদো রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের থাবার প্রচন্ড থাপ্পড় খাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। আবার এটাও হতে পারে, খোলা দরজা দিয়ে বেরিয়ে নাগালের মধ্যে তাঁকে পেয়ে বাঘটা বেশ খুশি হয়ে মুখে করে নিয়ে যাবে। বনে ফিরে গিয়ে তারিয়ে তারিয়ে ব্রেকফাস্ট করবে। যেমন বাঘের মর্জি! অবিশ্যি তার কাছে দুটোই সমান। সবই ভবিতব্য। বাবা বলতেন বটে, ‘ওরে বলাই, মানুষের জীবন পদ্মপাতায় জলের মতো বড়ো অনিত্য রে!’ আজ সকালে ঘুম থেকে উঠে যে কার মুখ দেখেছিলেন! মনে করার চেষ্টাই করলেন না বলাইমাস্টার।
বাঁশের আগড়ের গায়ে একটা দড়ির ফাঁস। কাঁপা হাতে তাড়াহুড়ো করে সেটা ধরে জোরে এক টান মারলেন বলাইমাস্টার। জানতেন না, অন্য পাশের বাঁধনের দড়িগুলোও একেবারে পচে গিয়েছে। জোরে টান লাগা মাত্রই দড়ি ছিঁড়ে আগড়টা ছিটকে এসে ঘাড়ের ওপর পড়ল। টাল সামলাতে না পেরে বলাইমাস্টার মাটিতে ছিটকে পড়লেন। পড়তে-পড়তেই মনে হল, কী একটা প্রাণী বিদ্যুৎবেগে বেরিয়ে এসে থমকে দাঁড়াল, তারপর তাঁর পাশ কাটিয়ে পেছনের কলাবাগানের মধ্যে দ্রুত অদৃশ্য হয়ে গেল। বলাইমাস্টার ভয়ে চোখে বুজে ফেললেন।
জনতা চিৎকার করে উঠল, ‘শিয়াল! শিয়াল!’
মুকুন্দ এগিয়ে এসে বলাইমাস্টারের হাত ধরে বলল, ‘উঠে পড়ো মাস্টার, ওটা বাঘ নয়, বাঘের ভাগনে!’
জনতার আশাভঙ্গের রাগ গিয়ে পড়ল উত্তম ঘোষের ওপর। পারলে তখনই দু-ঘা কষিয়ে দেয়। সকাল থেকে স্নান-খাওয়া, কাজকর্ম ছেড়ে সকলে এখানে হাপিত্যেশ করে বসে আছে একটা কেঁদো বাঘ দেখার জন্য। তার বদলে কিনা একটা চিমড়েপানা শিয়াল! এ তো চিটিংবাজি কেস।
উত্তম হাতজোড় করে বিনীতভাবে বলল, ‘আমার ভুল আমি স্বীকার করে নিচ্ছি, কিন্তু আজকাল বাঘ যে মাঝে মধ্যেই দেখা দিচ্ছে, এটা তো মিথ্যে নয়! গত সপ্তাহে পটাশপুরে সিধু হাজরার বাড়িতে ভরসন্ধ্যেবেলায় বাঘ এসেছিল। গাঁয়ের লোক মশাল জ্বেলে, পটকা ফাটিয়ে সেটাকে তাড়ায়। ঘটনাটা এই তল্লাটের সকলেই জানে। আমি বুঝতে পারিনি, আমার গোয়ালে ঢোকা প্রাণীটি বাঘ নয় শিয়াল। কিন্তু ওটা বাঘ হলেই কি বেশি ভালো হত? আজ যদি আমার গোয়ালে বাঘ এসে ঢোকে, কাল সেটা গাঁয়ের অন্য কারও ঘরে ঢুকতে পারে। প্রাণহানি হতে পারে। আমার তো মনে হয়, বাঘ যে আসেনি সেটা মঙ্গলের কথা। যদি সত্যিই বাঘ দেখার ইচ্ছে থাকে, তা হলে একটু কষ্ট করে একদিন কলকাতার চিড়িয়াখানায় গিয়ে দেখে এলেই হয়। সেখানে শুধু বাঘ কেন, বনের সমস্ত পশুপাখিকেই চাক্ষুষ করা যাবে। তবে হ্যাঁ, আজ আমি আপনাদের সকলকে অনেকক্ষণ বসিয়ে রেখেছি। আপনাদের ভোগান্তি হয়েছে, সময় নষ্ট হয়েছে। তাই আমার একটা প্রস্তাব আছে। আপনারা সকলে আজ দুপুরে যদি দয়া করে আমার এখানে দু-টি অন্নসেবা করেন, আমি বড়ো তৃপ্তি পাই। আমার তরফ থেকে আপনাদের সকলের কাছে বিনীত অনুরোধ। আপত্তি করলে অধম মনে বড়ো কষ্ট পাবে’ জনতা হর্ষধ্বনি করে প্রস্তাব স্বীকার করে নিল।
বলাইমাস্টার পরম পরিতুষ্ট গলায় বললেন, ‘না না উত্তম, এতে আপত্তি করার কী আছে ভাই? তুমি আমাদের নিজেদের লোক, তোমার অনুরোধ ঠেলি কেমন করে? তবে রান্নাবান্না শেষ হতে নিশ্চয়ই বেশ দেরি হবে। আমরা ততক্ষণ একসঙ্গে বসে গল্পগুজব করি। নিজেদের সুখ-দুঃখ, ভালো-মন্দের খবরাখবর নিই। এর মধ্যে তুমি বার দুই নিজের বিবেচনা মতো অল্পস্বল্প মুড়ি পাঠিয়ে দিও। আর সম্ভব হলে একটু চা। কী বলো মুকুন্দ?’
মুকুন্দ ঘাড় কাত করে জবাব দিল, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, ওতেই হবে।’
উত্তম বলল, ‘ঘরে নারকেল আছে, ভালো পাটালি আছে। অনুমতি করলে মুড়ির সঙ্গে দেওয়া যায়!’
বলাইমাস্টার পুলকিত স্বরে বললেন, ‘তা হলে তো অতি উত্তম হয়। না হে মুকুন্দ? সকালে যতখানি ভেবেছিলাম, আজকের দিনটা ঠিক ততখানি খারাপ যাবে না।’ মুকুন্দ একগাল হেসে বলল, ‘ভাগ্যিস গোয়ালে মামার বদলে ভাগনে ছিল!’

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন