গৌতম দাশ

মর্নিং ওয়াক থেকে ফিরে শেভটেভ করে অনাদি হালদার ব্যালকনির বেতের চেয়ারে বসে চায়ের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। এটা রোজকার ব্যাপার। এক্ষুনি ভরত চা আনবে। ভরতই এখন অনাদিবাবুর সবকিছু। প্রায় আট বছর হল স্ত্রীকে হারিয়েছেন। একমাত্র ছেলে রজত রাঁচিতে চাকরি করে। সেখানেই সেটলড। অবশ্য বছরে অন্তত একবার সপরিবার অনাদিবাবুর কাছে আসে। তিনিও যান কখনো সখনো। তবে ফোনের যোগাযোগ মোটামুটি নিয়মিত।
চাকরি থেকে স্বেচ্ছাবসর নিয়েছেন বছর পাঁচেক আগে। মাঝে মাঝে অবশ্য বড়ো একা লাগে। তবুও মানিয়ে নিয়েছেন। ভরত আছে। পড়াশোনার মধ্যেও অনেকটা সময় কাটে। তা ছাড়া শরীরটা এখনও মজবুতই আছে। এই তো গত পরশুই তিনি সাতান্ন পূর্ণ করলেন। শারীরিক অসুবিধা তো এখনও বোধ করেননি তেমন কিছু।
হঠাৎই মনটা একটু বিষণ্ণ হল অনাদিবাবুর। আজ মর্নিং ওয়াকে গিয়েই খবরটা পেলেন বিশ্বনাথবাবুর কাছে। ভবেন মিত্তির মারা গেছে। গত পরশু বিকেলে দোতলার ছাদে ফুলগাছের পরিচর্যা করার সময় যেভাবেই হোক নীচে পড়ে গিয়েছিল। সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে নিয়ে গেলেও ভবেন বাঁচেনি।
ওঁদের মর্নিং ওয়াক গ্রূপের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য। কথাটা আচমকাই তাঁর মনে পড়ে গেল। যখন ভবেনের মৃত্যু সংবাদটা শুনেছিলেন তখনই তাঁর মনে হচ্ছিল ব্যাপারটা যেন চেনা চেনা। তখন মনে পড়েনি। এখন পড়ল। ভবেনের মৃত্যুদৃশ্যটা তিনি, দিন চার-পাঁচ আগে স্বপ্নে দেখেছিলেন। পরিষ্কারভাবে তিনি দেখেছেন, ভবেন একটা সাদা ঘরে শুয়ে আছে। গলা পর্যন্ত সাদা চাদর টানা। তিনি এগিয়ে গিয়ে ডাকতে চেয়েছিলেন। কিন্তু স্বপ্নে যেমন হয় আর কি—স্পষ্ট করে ডাকতে পারেননি। একজন নার্স এসে ভবেনের মুখটাও চাদর দিয়ে ঢেকে দিল। অনাদিবাবুর ঘুমটা ভেঙে গিয়েছিল। অবশ্য পরে স্বপ্নটাও ভুলে গিয়েছিলেন। এখন কেমন একটা মানসিক অস্বস্তি কাটাতে অনাদিবাবু খবরের কাগজ খুলে বসলেন।
এর মাসখানেক পরে দেখলেন মৃত্যু সম্পর্কিত দ্বিতীয় স্বপ্নটা নিবারণ চক্রবর্তীকে নিয়ে। অনাদিবাবুর ঘনিষ্ঠ লোক। একসময় তিনি আর নিবারণ চক্রবর্তী অনেক দাবা খেলেছেন। অনেকদিন অবশ্য খেলাটা আর হয় না।
দেখলেন, নিবারণ চক্রবর্তী একটা খাটে শুয়ে আছেন। চারপাশে অনেককে কান্নাকাটি করছে। বুঝতে অসুবিধা হয়নি নিবারণ চক্রবর্তী মারা গেছেন। ঘুম ভেঙে গেছে অনাদিবাবুর, গলা শুকিয়ে কাঠ। আলো জ্বেলে জল খেলেন। ঘড়িতে তিনটে পঁয়ত্রিশ। আর ঘুম আসেনি। ব্যালকনিতে গিয়ে বসেছিলেন, একটা ভয়ের অস্তিত্ব অনুভব করছিলেন মনের মধ্যে। অনেকক্ষণ ধরে শরীরে মধ্যে একটা তিরতিরানির ভাব ছিল।
সকালে ব্যালকনিতেই এসে বসেছিলেন আবার। নিবারণ চক্রবর্তী রোজ বাজারে যান আটটা নাগাদ। সেদিনও দেখলেন, নিবারণ আসছেন। হঠাৎ মনে একটা উল্লাস, একটু স্বস্তি বোধ করলেন অনাদিবাবু।
কোনোদিন যেটা করেন না, সেটাই করলেন। চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘চক্রবর্তীদা ভালো আছেন?’
নিবারণ চক্রবর্তী হেসে হাত তুলে মাথা কাত করলেন। অর্থাৎ, আছেন। যেন ঘাম দিয়ে জ্বল ছাড়ল অনাদিবাবুর।
কিন্তু খবরটা পেলেন রাতে খাওয়ার টেবিলে। ভরতই বলল। সন্ধ্যেবেলা বাইরে থেকে শুনে এসেছে। নিবারণ চক্রবর্তী খাওয়া-দাওয়া সেরে রোজকার মতোই ঘুমিয়েছেন। ঘুমের মধ্যেই কখন মারা গেছেন কেউ জানে না। বিকেলে চা নিয়ে কে যেন ডাকতে গিয়ে দেখেছে, তিনি নেই। ডাক্তার বলেছেন, স্ট্রোক।
কিন্তু অনাদিবাবু এসব কথা আর শুনতেই পাচ্ছিলেন না। তাঁর সবকিছুই অস্পষ্ট লাগছিল। নিজেকে কেমন অসুস্থ লাগছিল। শুধু স্বপ্নদৃশ্যটা জ্বলজ্বল করছিল—মৃত নিবারণকে ঘিরে সকলে কান্নাকাটি করছে।
পরের দিনই ফ্যামিলি ফিজিশিয়ান ডাক্তার মুখার্জির কাছে গেলেন অনাদিবাবু। তিনি সবকিছু শুনলেন। কিন্তু অনাদিবাবু স্পষ্ট বুঝতে পারলেন যে, তিনি ঠিক বিশ্বাস করতে পারলেন না। ডাক্তার অল্পস্বল্প কিছু ওষুধ দিলেন, আর রাতের খাওয়াটা আর-একটু হালকা করার পরামর্শ দিলেন। শেষে মৃদু হেসে বললেন, ‘দেখবেন যেন আমাকে নিয়ে আবার এরকম স্বপ্নটপ্ন দেখে ফেলবেন না।’ অনাদিবাবু হাসতে চেষ্টা করলেন, কিন্তু পারলেন না।
এখন রাতের বিছানাটাই আতঙ্কের জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুপুরবেলা আগে একটু শুতেন। এখন আর শুতে পারেন না। যদি ঘুমিয়ে পড়েন! রাতেও যতক্ষণ পারেন জেগে থাকারই চেষ্টা করেন। কিন্তু কখন যে ঘুমিয়ে পড়েন নিজেই জানতে পারেন না।
কখনো-কখনো হঠাৎ-ই ঘুম ভেঙে যায়। মনে করতে চেষ্টা করেন, কোনো স্বপ্ন দেখেছেন কিনা! মনে না পড়লেই স্বস্তি।
বেশ কয়েকজনকে ঘটনাগুলো বলার চেষ্টা করেছেন। কাউকেই ঠিকমতো বোঝাতে পারেননি। শুধু ভরতই একমাত্র লোক, যে সহানুভূতির সঙ্গে সংকটটা বুঝতে চেষ্টা করেছে—কিন্তু সমাধান কিচ্ছু হয়নি। স্বপ্নের ওপর তো কারও হাত থাকে না।
আরও মাস তিনেক পরের কথা। এবারে স্বপ্নে এল তাঁর পোষা চন্দনাটা। ব্যালকনিতে খাঁচায় টাঙানো থাকে পাখিটা। মাঝে মাঝে তাঁর নাম ধরে ডাকে। পাখিটা তাঁর এবং ভরতের দু-জনেরই খুব প্রিয়। স্বপ্নে দেখলেন, চন্দনাটা বসে আছে, ব্যালকনিতেই। খাঁচার বাইরে। একটা কালো বিড়ালের মতো জন্তু এসে পাখিটার মুন্ডুটা ধড় থেকে আলাদা করে দিল। একটা হালকা চিৎকার যেন শুনলেন—ট্যাঁ-ট্যাঁ-ট্যাঁ।

তাঁকে শেষ করতে দিলেন না অনাদিবাবু। খুব শান্ত ভাবেই বললেন, ‘আমি জানি ভরত। পাখিটাকে বাগানে গর্ত করে পুঁতে দিয়ে এসো।’
ঘুমটা ভেঙে গেল। কিন্তু অনাদিবাবু ব্যালকনিতে গেলেন না। তিনি জানেন, ওখানে কী হয়েছে বা হবে। ঘটনাটা আজ যদি না-ও ঘটে থাকে কাল বা পরশু ঘটবেই।
পরদিন একটু বেলায় ভরতই খবরটা দিতে এল। তখন পড়ার ঘরে বসে অনাদিবাবু খুব অন্যমনস্ক হয়ে একটা বই পড়ার চেষ্টা করছিলেন। আজ সকালে ব্যালকনিতে যাননি তিনি। ভরত বলল, ‘বাবু, চন্দনাটা কেমন করে যেন খাঁচার বাইরে—’
তাঁকে শেষ করতে দিলেন না অনাদিবাবু। খুব শান্তভাবেই বললেন, ‘আমি জানি ভরত। পাখিটাকে বাগানে গর্ত করে পুঁতে দিয়ে এসো।’
পরদিন ঠিক করলেন রাঁচিতেই চলে যাবেন। অন্তত কয়েকটা দিনের জন্যও। সারাক্ষণ মানসিক যন্ত্রণার বোঝাটা আর বইতে পারা যাচ্ছে না। সর্বক্ষণই মনে হয় এবারে কার পালা! পরিচিত মুখগুলো এক এক করে ভেসে ওঠে মনের মধ্যে।
রাঁচিতে গিয়ে যেন বাঁচলেন অনাদিবাবু। নাতি-নাতনি, ছেলে, ছেলের বউয়ের সাহচর্যে অনেকটা হালকা হতে পারলেন। যদিও ঘটনাগুলো বলেননি ওদের।
তবু ফিরতে তো হবে। অনাদিবাবু ঠিক করলেন, আর-এক সপ্তাহ পরেই ফিরবেন। সেই অনুযায়ী ট্রেনের রিজার্ভেশন করলেন।
ফেরার দু-দিন আগেই দেখলেন স্বপ্নটা। একটা লালচে মতো রাস্তা ধরে তিনি হাঁটছেন। একটু দূরেই একটা নদী দেখা যাচ্ছে। জায়গাটা অনাদিবাবুর অচেনা। বেশ ভালোই লাগছিল। আর-একটু এগাতেই দেখলেন রাস্তার পাশে একটা বসার বেঞ্চ। সেখানে একটা লোক আপাদমস্তক চাদরমুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে। চাদরটা খুব চেনা লাগল। তাঁর নিজেরই ঠিক ওরকম একটা চাদর আছে। তিনি গিয়ে লোকটার মুখের ওপরের চাদরটা সরিয়ে দিলেন। দেখলেন, লোকটার চোখ বন্ধ করা মুখটাও তাঁর চেনা। ভীষণ চেনা। প্রতিদিনই তো ওই মুখ আয়নায় দেখে আসছেন, অন্তত পঞ্চাশ বছর ধরে।
ঘুমটা ভেঙে গেল। স্বপ্নদৃশ্যটা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মনে পড়ে গেল। না, অনাদিবাবু ভয় পেলেন না। বরং যেন স্বস্তি পেলেন। আর কোনো প্রিয়জনের মৃত্যুর আগাম খবর তাঁকে পেতে হবে না। শুধু পরশু ফিরে যাওয়ার টিকিটটা বাতিল করতে হবে। এখানে ছেলের কাছেই অন্তিম ক্ষণটা থাকতে চান অনাদিবাবু।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন