রামায়ণ বৃত্তান্ত

গৌতম দাশ

কলিংবেলে হাত ছোঁয়ানোর চল্লিশ সেকেণ্ডের মধ্যেই দরজাটা খুলে গেল। হাসিমুখে অংশুমান লাহিড়ি মৃগাঙ্ক মৌলিককে অভ্যর্থনা জানালেন।

‘আরে, আসুন আসুন মৃগাঙ্কবাবু। কী সৌভাগ্য আমার। অনেকদিন পর দীনের পর্ণকুটিরে পদার্পণ করলেন।’

মৃগাঙ্কবাবু হাসলেন। বললেন, ‘রোজ না হোক, মাঝেমধ্যেও যদি খানিকক্ষণ অন্তত আপনার সঙ্গে গল্পগুজব করার সময় পেতাম, ভালো লাগত। কিন্তু সে আর হয় কই স্যার?’

অংশুমানবাবু বললেন, ‘ঠিক আছে, আপনি আগে বসুন। তারপর দেখছি খানিকক্ষণ গল্পগুজব করে যদি আপনার মন ভালো করে দেওয়া যায়।’

মৃগাঙ্কবাবু চেয়ারে বসে পকেট থেকে চশমাটা বের করলেন। রুমাল দিয়ে মুছে সেটা চোখে দিলেন। তারপর উলটোদিকের চেয়ারে বসা অংশুমানবাবুর দিকে তাকিয়ে দেখলেন, মাস্টারমশাই তাঁর দিকে সকৌতুকে তাকিয়ে আছেন।

মৃগাঙ্কবাবু কিছু বলার আগেই অংশুমানবাবু বললেন, ‘এই মুহূর্তে আপনার সম্পর্কে গোটাতিনেক তথ্যগত সম্ভাবনা আমার মনে উঁকি দিচ্ছে। সেগুলো অবিশ্যি হতেও পারে, না হতেও পারে। আন্দাজগুলো ঠিক কিনা যাচাই করে নেওয়া যেতে পারে কি?’

মৃগাঙ্কবাবু বললেন, ‘নিশ্চয়ই। বলুন।’ অংশুমানবাবু বললেন, ‘প্রথমত, আপনার পুরোনো চশমাটা গত দিন-দশেকের মধ্যে ভেঙে গেছে।’

মৃগাঙ্কবাবু বললেন, ‘এটা আমার এই নতুন চশমাটা দেখে বলছেন তো? আর বলবেন না, পুরোনোটা হাত থেকে পড়ে গিয়ে একেবারে চুরমার হয়ে গেল। এই তো দিন-সাতেক হল বোধ হয়।’

অংশুমানবাবু বললেন, ‘দশদিন আগেই সরস্বতী মন্দিরে গিয়ে আপনার পুরোনো চশমাপরা মুখখানাই দেখে এসেছি। সুতরাং, এর মধ্যে নিশ্চয়ই ঘটনাটা ঘটেছে। দ্বিতীয়ত, কাল রাত্রে বিয়েবাড়ি থেকে কখন ফিরলেন? এই বয়সে বেশি রাত করে বিয়েবাড়ির চর্ব্যচোষ্য ভোজ না খাওয়াই ভালো মৃগাঙ্কবাবু। মনে তো হচ্ছে, গুরুভোজন করেই ফিরেছেন। ঠিক তো—নাকি ভুল বললাম?’

মৃগাঙ্কবাবু প্রথমে একেবারে হকচকিয়ে গেলেন। তারপর সামলে নিয়ে কোনোরকমে বললেন, ‘আপনি...আপনি কেমন করে? হ্যাঁ—কাল সোদপুরে আমার পিসতুতো দাদার মেয়ের বিয়ে ছিল। কিন্তু...আপনি...?’

অংশুমানবাবু বললেন, ‘তাহলে তো ঠিকই বলেছি। কোন সূত্রে মনে হল, সেটা পরে বলছি। বরং তৃতীয় তথ্যে আসা যাক। আচ্ছা, এর মধ্যে আপনার আগের সাইকেলটা কি চুরি গেছে?’

মৃগাঙ্কবাবু আরেকবার অবাক হলেন। তারপর বললেন, ‘এটাও ঠিক বলেছেন। দোকানের সামনে থেকে দিনদুপুরে ওটা চুরি গেছে। কিন্তু আপনি মশাই স্কুলে অঙ্ক না করিয়ে গোয়েন্দা দফতরে চাকরি নিলেই ভালো করতেন। সুনাম অর্জন করতে পারতেন। এবার বলুন তো—ঠিক কীভাবে ব্যাপারগুলো আন্দাজ করলেন?’

অংশুমানবাবু বললেন, ‘খুব শক্ত কিছু নয়। গতকাল ছিল অঘ্রানের শেষ বিয়ের দিন। চারদিকে প্রচুর বিয়ে ছিল। আমার নিজেরও একটা নেমন্তন্ন ছিল। আপনি যখন ঘরে ঢুকলেন, তখনই আপনার পোশাক থেকে বিয়েবাড়ির গন্ধ পেলাম। আরও ভেঙে বলতে গেলে, একটু লাট-খাওয়া, ধোপদুরস্ত পোশাক থেকে পারফিউমের গন্ধ পেলাম। সাধারণত পুরুষমানুষের পোশাক সুবাসিত হয় বিয়েবাড়িতে গেলে। অর্থাৎ হয় আপনি বিয়েবাড়ি যাওয়ার সময় জামায় পারফিউম দিয়ে গিয়েছেন নইলে বিয়েবাড়িতেই স্প্রে করে আপনাকে সুবাসিত করা হয়েছে। তা ছাড়া আপনার ডানহাতের জামার হাতার নীচের দিকে মাংস বা মাছের ঝোলের ছোট্ট একটা দাগ রয়েছে। আপনি যখন চশমাটা মুছছিলেন, তখনই চোখে পড়ল। আর সাইকেলের ব্যাপারটা হল—আমি যখন দরজা খুলে দিলাম, তখনই আপনার কাঁধের ওপর দিয়ে চোখে পড়ল বাইরে রাখা একটা নতুন ঝকঝকে সাইকেল। আপনিই এনেছেন। আপনি সাইকেলেই আসেন এবং আপনার আগের সাইকেলটাও আমি চিনি। সেটা এখনও বাতিলের পর্যায়ে আসেনি। সেটা নেই এবং একখানা নতুন ঝকঝকে সাইকেল। সুতরাং—’

মৃগাঙ্কবাবু বললেন, ‘ধন্যিমশাই আপনার দেখার ক্ষমতা। এবারে আমি কেন এসেছি সেটা বলি।’

অংশুমানবাবুর বললেন, ‘এবারে আবার কোন রহস্য?’

মৃগাঙ্কবাবু বললেন, ‘এবারে বলা যেতে পারে ‘‘পুস্তকরহস্য’’। আপনি হয়তো জানেন না। প্রায় মাস ছয়েক হয়ে গেল, আমার বইয়ের দোকানে পুরোনো বই বিক্রির একটা কাউন্টার করেছি। কলকাতার বিভিন্ন সোর্স থেকে পুরোনো বই আসে। সবরকম বই-ই আসে। মাঝে মাঝে দুষ্প্রাপ্য বইও কিছু কিছু চলে আসে। যেগুলো এখন আর ছাপা নেই বাজারে। সপ্তাখানেক আগে বেশ কিছু বইয়ের একটা চালান আসে। এগুলোর মধ্যে একটা কৃত্তিবাসী রামায়ণ ছিল, যেটা বহু পুরোনো। শুধু পুরোনোই নয়, বইটার মধ্যে একটা বিশেষত্ব রয়েছে। দাঁড়ান—বইটা আগে দেখুন।’

মৃগাঙ্কবাবু কাঁধের ঝোলাটার মধ্যে থেকে বেশ স্বাস্থ্যবান একটা বই বের করলেন। খবরের কাগজ দিয়ে মোড়া। তারপর বইটা অংশুমানবাবুর দিকে এগিয়ে দিলেন।

অংশুমানবাবু বইটা নিয়ে সাবধানে খুললেন। প্রচ্ছদ নেই। পাতাগুলো হলদেটে। প্রায় ঝুরঝুরে অবস্থায় পৌঁছে গেছে। ওপরের খবরের কাগজের মলাটের মধ্যে গোটাকতক পৃষ্ঠা ঢুকেছে। খবরের কাগজের মলাটটাও বেশ পুরোনো। খানিকটা হলদেটে হয়ে গেছে।

মৃগাঙ্কবাবু বললেন, ‘খবরের কাগজের মলাটটা খুলুন।’ অংশুমানবাবু মলাটটা সাবধানে খুলে ফেললেন। তারপর বললেন, ‘মলাটটাও কত পুরোনো সেটা খেয়াল করেছেন? ১৯৬৬ সালের ৩ মার্চ দৈনিক বসুমতী কাগজ দিয়ে মলাটটা দেওয়া হয়েছিল। বইটা খুব যত্নেই ছিল এবং একসারি বইয়ের মধ্যে ঢোকানো ছিল। বইয়ের মলাটের দু-পাশ মোটামুটি পরিষ্কার কিন্তু পেছনের অংশটা অপেক্ষাকৃত বেশি নোংরা। অর্থাৎ বাইরের ধুলোবালি লেগেছে বইয়ের মলাটের পেছনের অংশে। দু-পাশে অন্য বই থাকার ফলে পাশগুলো পরিষ্কারই আছে। গ্রন্থ শুরুর আগেরপৃষ্ঠাটা রয়েছে। কবি কৃত্তিবাস প্রণীত রামায়ণ।’

মৃগাঙ্কবাবু বললেন, ‘পৃষ্ঠাটা ওলটান।’

অংশুমানবাবু পৃষ্ঠা ওলটালেন। ডানদিকে আদিকান্ডের শুরু। বাঁ-দিকের হলদেটে পৃষ্ঠায় সুন্দর হাতের লেখায় কয়েকটি কথা।

‘কবির লড়াই-এ কবিয়াল আন্তুনিসাহেব রাম বসুকে পরাজিত করলেন। তাঁহার করকমলে নগন্য উপহার এবং কৃত্তিবাসী রামায়ণ তুলিয়া দিয়া ধন্য হইলাম।—নীলকন্ঠ রায়। নায়েবমশায়। মোগলটুলি। চুঁচুড়া। ২৫শে কার্তিক ১২৩১ সন।’

অংশুমানবাবু বললেন, ‘আপনি তো একটা অমূল্য বস্তু জোগাড় করে ফেলেছেন।’

মৃগাঙ্কবাবু বললেন, ‘আচ্ছা এই আন্তুনিসাহেবই কি সেই বিখ্যাত অ্যান্টনি কবিয়াল?’

অংশুমানবাবু বললেন, ‘খুব সম্ভব। কেননা অ্যান্টনিসাহেবের প্রথম জীবনে বাসস্থান ছিল চুঁচুড়ার পাশেই চন্দননগরে। আর যতদূর জানি, সাহেব জন্মেছিলেন অষ্টাদশ শতকের শেষদিকে, আর মারা গিয়েছিলেন ঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝির কিছু আগে। সঠিক সালটা এই মুহূর্তে মনে করতে পারছি না। খুব সম্ভব ১৮৪০ সালের আশপাশে। বইয়ের ১২৩১ সন মানে ইংরেজির ১৮২৪ সাল। সুতরাং, সাল-তারিখ মিলে যায়। তবে এগুলো সম্পর্কে আরও জানতে হলে কিছু বইপত্তর ঘাঁটাঘাঁটি করতে হবে। আপনি এক কাজ করুন—বইটা রেখে যান। সপ্তাখানেক বাদে না হয় কষ্ট করে আরেকবার পায়ের ধুলো দেবেন। আপত্তি নেই তো?’

মৃগাঙ্কবাবু বললেন, ‘না, না, আপত্তি আবার কীসের।’

দশদিন বাদে এক রবিবারের সকালে মৃগাঙ্কবাবু আবার এলেন। অংশুমানবাবু যথারীতি অভ্যর্থনা করে বসলেন। তারপর বললেন, ‘মৃগাঙ্কবাবু, বইটির সমকালীন কিছু কিছু তথ্য জোগাড় করা গেছে। সেগুলো পড়ে আমার যা মনে হয়েছে সেটা বলি। কৃত্তিবাসী রামায়ণ প্রথম মুদ্রিত হয় আঠারোশো দুই বা তিন খ্রিস্টাব্দে। এই বইটা সেই সংস্করণেরও হতে পারে। ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাংলা দেশে কবিগানের লড়াই যথেষ্ট জনপ্রিয় ছিল। আমি এই তথ্যটুকু পেয়েছি যে, অ্যান্টনি কবিয়াল চুঁচুড়াতে কবিগান করেছিলেন। এ্যান্টনি সেই সময়ের একজন নামকরা কবিয়ালই ছিলেন। ভোলা ময়রা, হরুঠাকুর, রামবসু, গোঁজলাগুই, ঠাকুরসিং ইত্যাদি কবিয়ালের সঙ্গে তাঁর নাম আজও একই সঙ্গে উচ্চারণ করা হয়। সুতরাং, তিনি প্রথম শ্রেণির কবিয়ালই ছিলেন। কিন্তু আমার মনে হয় তাঁর কৃতিত্ব আরও অনেকটা বেশি। কেননা জন্মসূত্রে অ্যান্টনি ছিলেন পোর্তুগিজ খ্রিস্টানের সন্তান। এদেশের আচারবিচার, রীতিনীতি, শাস্ত্রপুরাণ—এগুলো যত্ন করে তাঁকে শিখতে হয়েছিল। নইলে কবিগানের আসরে বাঙালি প্রতিপক্ষের সঙ্গে লড়াই করতে পারতেন না, জিততেও পারতেন না। একটা অন্যদেশের কালচার আত্মস্থ করে তাৎক্ষণিকভাবে গানের মাধ্যমে পরিবেশন করা খুব সহজ কাজ নয়। তা ছাড়া গানটাও তো নিজের খেয়াল খুশিমতো নয়, প্রতিপক্ষের প্রশ্নের উত্তর গানের মাধ্যমে দিতে হত—প্রশ্নটাও সেইভাবেই করতে হত। স্বভাবকবি নাহলে সেটা সম্ভব নয়।

এবারে আসি মোগলটুলি প্রসঙ্গে। মোগলটুলি জায়গাটা হুগলি জেলার চুঁচুড়া শহরের উত্তর অংশে! এইখানেই আছে অপেক্ষাকৃত কম বিখ্যাত আর্মেনিয়ান গির্জা। অথচ ভারতের পূর্বাঞ্চলের দ্বিতীয় প্রাচীন গির্জা। প্রাচীনতম গির্জা হচ্ছে ব্যাণ্ডেল চার্চ। ব্যাণ্ডেল চার্চ আর্মেনিয়ান চার্চের থেকে শ’খানেক বছরের বেশি পুরোনো। সেটা মোগলদের রোষে একাধিকবার বিধ্বস্ত হয়েছে, ভস্মীভূত হয়েছে, পুনর্নিমিত হয়েছে। কিন্তু এই আর্মেনিয়ান গির্জাটি সেরকম কোনো দুর্ঘটনার শিকার হয়নি। ১৬৯৫ সালে একজন আর্মেনিয়ান ব্যবসায়ী খোজা জোসেফ মার্গার মোগলটুলিতে এই গির্জার ভিত্তি স্থাপন করেন এবং তাঁর ভাই ১৬৯৭ সালে এই গির্জা সমাপ্ত করেন।

আমাদের হাতে আসা কৃত্তিবাসী রামায়ণের পূর্বতন মালিক নীলকন্ঠ রায় এই মোগলটুলিতেই বাস করতেন। তাঁর পেশাটাও তিনি লিখেই গেছেন। কোনো জমিদারের নায়েবমশাই ছিলেন। আজ থেকে প্রায় দুশো বছর আগের কথা। সেই সময়ের নায়েব বলতে সাধারণত আমাদের মনে যে একটা অত্যাচারীমার্কা ছবি ফুটে ওঠে, আমার মনে হয় এই নীলকন্ঠ বাবু সেরকম ছিলেন না। কারণ কবির লড়াইয়ে জয়ী কবিয়ালের হাতে উপহার সামগ্রীর সঙ্গে বই তুলে দেওয়া হচ্ছে—এটা নি:সন্দেহে বিরল ঘটনা। অন্তত সেই সময়ে। এই ঘটনা প্রমাণ করছে নীলকন্ঠ রায়ের বাড়িতে সরস্বতীর অধিষ্ঠান ছিল। ভালো কথা, বলুন তো এই বই-টা আপনি কী করবেন? নিশ্চয়ই বিক্রি করবেন না।

মৃগাঙ্কবাবু বললেন, ‘না না, বিক্রির প্রশ্নই ওঠে না। ইচ্ছে করলে আপনি বইখানা রেখে দিতে পারেন।’

অংশুমানবাবু বললেন, ‘বইখানা নিশ্চয়ই অমূল্য সম্পত্তি। অ্যান্টিক পর্যায়ে চলে গেছে। যেকোনো সংগ্রহশালাও আনন্দের সঙ্গেই গ্রহণ করবে। কিন্তু আমার ইচ্ছে করছে নীলকন্ঠ রায়ের উত্তরপুরুষ যদি কেউ থাকেন, তাঁর হাতে বইখানা তুলে দিতে। অবিশ্যি যদি তিনি আগ্রহী থাকেন।’

মৃগাঙ্কবাবু বললেন, ‘সেটাও মন্দ প্রস্তাব নয়। তাহলে চলুন একদিন যাই চুঁচুড়ায়। গিয়ে বইখানা দিয়ে আসি।

অংশুমানবাবু হাসলেন। তারপর বললেন, ‘বাড়িটা কীভাবে খুঁজে বের করবেন? মোগলটুলিতে গিয়ে প্রত্যেক বাড়িতে ঢুকে জিজ্ঞাসা করবেন যে তাঁরা নীলকন্ঠ রায়ের বংশধর কিনা! প্রতিদিন যদি এভাবে অনুসন্ধানটা চালিয়ে যেতে পারেন, তাহলে পুরো জায়গাটা কভার করতে সম্ভবত দু-তিন মাস লেগে যাবে। মাস তিনেক বাদে হয়তো শেষ বাড়িটার লোকও মাথা নেড়ে আপনাকে জানিয়ে দিল যে, তারাও রায়মশাইয়ের উত্তরপুরুষ নয়। তখন আপনি আবিষ্কার করলেন যে, নীলকন্ঠ রায়ের বংশধররা হয়তো আর ওখানে থাকেনই না। বা তাঁর বংশ লুপ্ত হয়ে গেছে।’

মৃগাঙ্কবাবু ঈষৎ অপ্রস্তুত মুখে বললেন, ‘এটা তো ঠিক বলেছেন মশাই। তবে কীভাবে তাঁদের খোঁজ পাওয়া যেতে পারে বলুন তো?’

অংশুমানবাবু বললেন, ‘এক কাজ করুন। বহুল প্রচারিত কোনো দৈনিক সংবাদপত্রের ব্যক্তিগত কলমে পরপর দুই রবিবার বিজ্ঞাপন দিন। বিজ্ঞাপনে আপনার ফোন নম্বর দিন। যদি কেউ যোগাযোগ করেন, পরবর্তী পর্যায়ে ঠিক করা যাবে আমরা কী করব। বিজ্ঞাপনে লিখুন, ‘‘চুঁচড়া মোগলটুলি নিবাসী, জনৈক নায়েবমশাই নীলকন্ঠ রায় ১৮২৪ খ্রিস্টাব্দে নিজস্ব স্বাক্ষর সম্বলিত একটি কৃত্তিবাসী রামায়ণ দান করেন। পুস্তকটি আপাতত আমার অধিকারে রয়েছে। নীলকন্ঠ রায়ের প্রকৃত উত্তরাধিকারী যদি কেউ আগ্রহী থাকেন, নিমোক্ত ফোন নম্বরে যোগাযোগ করতে পারেন।’’ আপনি আপাতত বইটা হাতছাড়া করবেন না। নিয়েও যেতে পারেন, আমার কাছেও রেখে যেতে পারেন।’

মৃগাঙ্কবাবু বললেন, ‘বইটা আপনার কাছেই থাক। আমি আর ওটা নিয়ে যাব না। আর আরেকবার বিজ্ঞাপনটা কী হবে বলুন তো, লিখে নিই। যত শিগগির পারি ওটা কাগজে দেওয়ার ব্যবস্থা করছি।’

দিন পনেরো বাদেই বিজ্ঞাপনটা কাগজে বেরিয়ে গেল। প্রথম রবিবারের বিজ্ঞাপনের ব্যাপারে কেউ যোগাযোগ করল না। তারপরের রবিবারের সন্ধ্যাবেলায় অংশুমানবাবুর টেলিফোনটা বেজে উঠল। রিসিভার তুলে ‘হ্যালো’ বলতেই ওদিক থেকে মৃগাঙ্কবাবুর উত্তেজিত কন্ঠভেসে এল।

‘এই যে স্যার। বইয়ের ব্যাপারে একজন যোগাযোগ করেছেন। একটু আগেই ফোন করেছিলেন। এই ধরুন আধঘণ্টাখানেক আগে। আমি তখন সবে এক কাপ চা নিয়ে বসেছি। এক চুমুক দিতে না দিতেই—’

‘ফোনে কী শুনলেন, সেটা আগে বলুন।’

‘বলছি। ভদ্রলোকের নাম দেবাংশু রায়। চুঁচুড়ার মোগলটুলিতেই থাকেন। বললেন,—নীলকন্ঠ রায় ওঁর প্রপিতামহের পিতামহ—না না, দাঁড়ান, একটু গুলিয়ে গেল বোধ হয়—ইয়ে—পিতামহের প্রপিতামহ। দেবাংশুবাবুরও বয়স হয়েছে, তা ছাড়া শারীরিক কিছু সমস্যাও নাকি আছে। এখন আর বিশেষ চলাফেরা করতে পারেন না। তাই উনি নিজের ফোন নম্বর আর ঠিকানা দিলেন। এও বললেন যে, ঠিকানার কোনো দরকারই হবে না। মোগলটুলিতে গিয়ে যদি নায়েববাড়ির কথা জিজ্ঞাসা করেন, যে-কেউ বাড়ি দেখিয়ে দেবে। আমি আবার আপনার কথা বললাম। আপনিই তো উদ্যোক্তা। দেবাংশুবাবু আমাদেরদু-জনকেই সাগ্রহে নিমন্ত্রণ জানালেন। বললেন, ‘‘আমার যদি ক্ষমতা থাকত, আমি নিজেই যেতাম। কিন্তু সেই ত্রুটি মার্জনা করে আপনারা যদি আমার এখানে দয়া করে আসেন, আমি বাধিত হব। আতিথেয়তার ত্রুটি হবে না এটুকু বলতে পারি। শুধু আমায় আগে একবার ফোন করে কবে আসছেন সেটা দয়া করে জানিয়ে দেবেন আর সকালে আসবেন সারাদিনটা হাতে নিয়ে।’’ ’

অংশুমানবাবু বললেন, ‘তথাস্তু চলুন যাই একদিন—ঘুরেই আসা যাক।’

পরের রবিবার সকালে দু-জনে চললেন মোগলটুলি। নৈহাটি থেকে ঘাট পেরিয়ে ওপারে চুঁচুড়া। সেখানে একটা সাইকেল রিকশায় উঠে ঠিকানাটা বলে দিলেন। ছোকরা ঘাড় নাড়ল। অর্থাৎ ‘নায়েববাড়ি’ তার চেনা।

খানিকক্ষণের মধ্যেই রিকশাটা একটা বিশাল গেটওয়ালা পুরোনো দোতলাবাড়ির সামনে এসে থামল। রিকশার ভাড়া মিটিয়ে অংশুমানবাবু মৃগাঙ্কবাবুর দিকে তাকালেন। চোখে চোখ পড়তেই মৃগাঙ্কবাবু বলে উঠলেন, ‘অ-ট্টা-লি-কা! নায়েববাড়ি কোথায়—এ তো মশাই জমিদারবাড়ি। কেমন যেন একটু নার্ভাস বোধ করছি।’

অংশুমানবাবু বললেন, ‘নার্ভাস বোধ করার তো কোনো কারণ নেই। আমরা তো অনাহুত নই। চলুন, ভেতরে যাওয়া যাক।’

গেট খুলে ভেতরে ঢুকলেন দু-জনে। দু-পাশে ফুলবাগান এবং পামগাছের সারি নিয়ে লাল মোরাম দেওয়া রাস্তাটা সোজা বাড়ির সামনে পৌঁছেছে। বাড়ির ডানদিকে একটু দূরে একটা মন্দির। বাঁ-পাশে একটা পুকুরের খানিকটা অংশ দেখা যাচ্ছে। ওঁরা বাড়ির কাছে পৌঁছোনোর আগেই একজন সৌম্য বৃদ্ধ বেরিয়ে এলেন। আভিজাত্যের ছাপ তাঁর সর্বাঙ্গে। মাথায় ধবধবে সাদা চুল। টকটকে ফরসা রং। পরনে সাদা পাঞ্জাবি-পাজামা। চোখে রিমলেশ চশমা।

ঈষৎ হেসে দু-হাত জোড় করে নমস্কার করে বললেন, ‘আসুন আসুন। আপনারা নিশ্চয়ই অংশুমানবাবু এবং মৃগাঙ্কবাবু। আমি দেবাংশু রায়, নীলকন্ঠ রায়ের একমাত্র বংশধর। আপনাদের কষ্ট দিলাম বলে প্রথমেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।’

অংশুমানবাবু প্রতিনমস্কার করে বললেন, ‘আমি অংশুমান লাহিড়ি আর ইনি মৃগাঙ্ক মৌলিক। আপনি এসব কথা বললে কিন্তু আমাদের সত্যি সত্যিই লজ্জায় ফেলা হবে দেবাংশুবাবু। আসার কষ্ট নগণ্য কেননা একটা নতুন ধরনের অভিজ্ঞতার লোভ ছিল। প্রায় দুশো বছর আগের যে জায়গা থেকে বইটা একটা বৃত্ত শুরু করেছিল, হয়তো বহু হাত-ঘোরা বইটাকে আবার সেই জায়গায় পৌঁছে দিতে পারলে আমাদের হাতেই সেই বৃত্তটা সম্পূর্ণ হবে। ইতিহাসের হাত ধরার এমন সুযোগ তো বারবার আসে না। তাই না এসেও তো উপায় ছিল না।’

দেবাংশুবাবু হেসে বললেন, ‘ঠিক আছে। কথা পরে হবে। আগে ভেতরে এসে বসুন।’

সুন্দর এবং রুচিসম্মতভাবে সাজানো বৈঠকখানা। সোফায় বসেই মৃগাঙ্কবাবু কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন। দেবাংশুবাবু হাত তুলে মিষ্টি হেসে বললেন, ‘কথা বলার জন্য আজ সারাদিনটা আমাদের হাতে আছে। কি তাইতো?’

দু-জনেই ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালেন। দেবাংশবাবু বললেন, ‘এখন সামান্য কিছু জলযোগের ব্যবস্থা রয়েছে। আপনারা অনুমতি দিলে—’

একঘণ্টা পরে আবার সকলে বৈঠকখানা ঘরে ফিরে এলেন। এই একঘণ্টায় জলযোগের সঙ্গে সঙ্গে অংশুমানবাবু এবং মৃগাঙ্কবাবু পরিচিত হয়েছেন গৃহকর্ত্রী মান্দরা রায় এবং দেবাংশুবাবুর ভাগনে অর্জুনের সঙ্গে। অর্জুন শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ছাত্র। মামার বাড়িতে থেকে পড়াশুনো করে। আরও জেনেছেন, দেবাংশুবাবুর একমাত্র মেয়ে সুদেষ্ণার বিয়ে হয়েছে ইংল্যাণ্ড প্রবাসী একজন ডাক্তারের সঙ্গে। একমাত্র ছেলে দেবমাল্য দিল্লিতে চাকরি করে। পুত্রবধূ মৈত্রেয়ী এবং আটবছরের নাতি দেবর্ষিকে নিয়ে প্রতিবছর দেবমাল্য যখন আসে, সারাবাড়িটা ঝলমল করে ওঠে। ওরা বেশিরভাগ কালীপুজোর সময়েই আসে। কেননা নায়েববাড়ির কালীপুজো এই অঞ্চলে বিখ্যাত পুজো কয়েকপুরুষ ধরেই। আর দু-জনে মুগ্ধ হয়েছেন রায়পরিবারের বিনম্র আন্তরিক আতিথেয়তায়।

অংশুমানবাবু ঝোলা থেকে বইটা বের করে দেবাংশুবাবুকে বললেন, ‘এবারে বইটা আমরা আপনার হাতে তুলে দেব।’

দেবাংশুবাবু দু-হাত বাড়িয়ে দিলেন। অংশুমানবাবু বইটা তুলে দিলেন তাঁর হাতে। বইটা নিয়ে দেবাংশুবাবু ধীরে ধীরে মলাট খুলে নীলকন্ঠ রায়ের স্বাক্ষরিত পৃষ্ঠাটা দেখলেন। তারপর বইটা বন্ধ করে একবার কপালে ঠেকালেন। বইটা টেবিলের ওপর রেখে দিয়ে পর্যায়ক্রমে দু-জনের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘এখন আপনাদের বলতে বাধা নেই যে, আমার শারীরিক অসুস্থতা এবং বার্ধক্য সত্ত্বেও হয়তো আমি আপনাদের কাছে যেতে পারতাম কিন্তু তাতে আপনাদের মনে খানিকটা সন্দেহ হয়তো রয়েই যেত যে, নীলকন্ঠ রায়ের প্রকৃত উত্তরাধিকারীর কাছেই বইটা ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে কিনা। আপনাদের জানা দরকার ছিল যে, প্রকৃত জায়গাতেই আপনারা এই অমূল্য সম্পত্তি সমর্পণ করছেন। অনেকটা সেইজন্যও আপনাদের কষ্ট করে এখানে আসার জন্য অনুরোধ জানালাম।

তারপর বইটা বন্ধ করে একবার কপালে ঠেকালেন।

এবারে আমাদের অতীত সম্পর্কে আপনাদের কিছু জানাব। নীলকন্ঠ রায় আমাদের রায়বংশের সবচেয়ে কৃতীপুরুষ। উনি আমার পিতামহের প্রপিতামহ। ওঁর পিতা শিলাদিত্য রায় থেকেই এই বংশের নায়েবগিরি শুরু হয়। শিলাদিত্য রায় ছিলেন বলাগড়ের জমিদারদের নায়েব। ওঁর থেকেই এই বসত বাড়ি এবং কালীমন্দির প্রাথমিকভাবে তৈরি হয়। কালীপুজোও শুরু করেন শিলাদিত্য রায়। তাঁর পুত্র নীলকন্ঠ রায়। এত গুণ একজন মানুষের মধ্যে খুব বেশি দেখা যায় না। তাঁর এই বিভিন্ন গুণাবলি এবং কৃতিত্বের জন্যই বলাগড়ের জমিদারবাবু তাঁকে উপাধি দেন ‘নায়েবমশাই’। নীলকন্ঠ রায় এই উপাধি মাথা পেতে গ্রহণ করেন এবং যেখানেই নিজের নাম স্বাক্ষরের প্রয়োজন হয়েছে, স্বাক্ষরের পাশে লিখেছেন ‘নায়েবমশায়।’

নীলকন্ঠ রায় শিক্ষিত ছিলেন, নিজে শিল্পী ছিলেন, তাই শিল্পের কদর করতেও জানতেন। প্রতি বছর আমাদের বাড়িতে মহা ধুমধাম করে কালীপুজো হত, অবিশ্যি এখনও হয়, তবে অত জাঁকজমক সহকারে এখন আর হয় না। নীলকন্ঠ রায়ের আমলে কালীপুজোর পরে অন্তত সাতদিন ধরে চলত তরজা, কবিগান, যাত্রা, কথকতা ইত্যাদি। আর প্রতিদিনের জয়ী এবং পরাজিত উভয়পক্ষই পেত যথেষ্ট পরিমাণে উপহার। আরও মজার কথা এই যে, প্রতি বছর কাকে, কী দেওয়া হয়েছে, সে-সমস্ত কিছু নীলকন্ঠ রায় একটা জাবদা খাতায় লিখে রাখতেন। সে খাতাটা এখনও আছে।

আপনাদের শুনলে হয়তো ভালো লাগবে, আমার নিজেরও বলতে গৌরব বোধ হয় যে, আমাদের এই বাড়িতে ঊনবিংশ শতাব্দীর বহু মনীষীর পদধূলি পড়েছে। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রাজা রামমোহন রায়, স্যার আশুতোষ, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, দীনবন্ধু মিত্র—এঁদের পদধূলিতে ধন্য হয়েছে এই বাড়ি।

আমাদের একটা ছোট্ট সংগ্রহশালা আছে। দুপুরে সামান্য ডাল-ভাত খাওয়ার পর আপনাদের সেটা দেখাব। আমার মনে হয় সেটা আপনাদের ভালোই লাগবে।

আর একটা কথা। এই মহামূল্যবান বইটি আমাকে ফেরত দিয়ে আপনারা আমাকে চিরঋণী করেছেন। সে ঋণ পরিশোধের নয়। কিন্তু এই বইটি হাতে পাওয়া থেকে এখানে আসা পর্যন্ত আপনাদের কিছু অর্থব্যয় হয়েছে। আমি বিশেষ করে মৃগাঙ্কবাবুর কথা বলছি, কেননা ওঁর তো বইয়েরই দোকান। এখানে একটা বাণিজ্যিক দিকও রয়েছে। মৃগাঙ্কবাবু আপনি যদি দয়া করে বলেন...যদিও জানি অর্থমূল্যে এই ঋণ পরিশোধ করতে চাওয়াটা হয়তো ধৃষ্টতা...তবু—।’

মৃগাঙ্কবাবু বিব্রতস্বরে দু-বার ‘না-না, একী বলছেন—একী বলছেন’ বলে থেমে গেলেন। অংশুমানবাবু মৃগাঙ্কবাবুর দিকে তাকিয়ে দেখলেন বেচারা মৃগাঙ্কবাবু কাঁচুমাচু মুখ করে অসহায় দৃষ্টিতে তাঁর দিকেই তাকিয়ে আছেন। অংশুমানবাবু বুঝলেন, মৃগাঙ্কবাবু কথা খুঁজে পাচ্ছেন না।

অংশুমানবাবু বললেন, ‘দেবাংশুবাবু আমি আপনার অনুমতি নিয়ে মৃগাঙ্কবাবুর হয়ে দু-একটি কথা বলছি। কিংবা আমার কিছু বলারও দরকার নেই। আপনি মৃগাঙ্কবাবুর মুখের দিকে তাকালেই বুঝতে পারবেন যে, আপনার প্রস্তাব শুনে মৃগাঙ্কবাবু কতখানি অস্বস্তিতে পড়েছেন। আমরা এসেই আপনাকে একটা কথা বলেছিলাম যে, আমরা একটা বৃত্ত সম্পূর্ণ করতে এসেছি। একটা বই—দুশো বছর আগে যে বাড়ি থেকে তাঁর যাত্রা শুরু করেছিল, বিভিন্ন হাত ঘুরে শেষপর্যন্ত আমাদের মাধ্যমেই তার যাত্রাপথের বৃত্তটা সম্পূর্ণ হচ্ছে, দুশো বছরের পুরোনো ইতিহাস বর্তমানের হাত ধরছে—এই দুর্লভ দৃশ্য দর্শন করার জন্যই আমরা এখানে এসেছি। আপনি অনুগ্রহ করে অর্থের কথা তুলে বিব্রত করবেন না। প্লিজ।’

দেবাংশুবাবুকে সামান্য অপ্রস্তুত দেখাল। বললেন, ‘হয়তো আমি আপনাদের মর্যাদায় আঘাত করে ফেলেছি। আপনারা আমাকে মাপ করবেন।’

অংশুমানবাবু বললেন, ‘না না, ছি ছি। এসব কথা বলবেন না। বরং আমাদের হাতে এখন বেশ খানিকটা সময় রয়েছে। ফাঁকে এখানকার আর্মেনিয়ান গির্জাটা একটু দেখে আসা যায় না?’

দেবাংশুবাবু বললেন, ‘খুব ভালো কথা। নিশ্চয়ই যায়। চলুন ঘুরে আসি। এই তো কাছেই।’

দুপুরবেলায় রীতিমতো রাজসিক ভোজনের শেষে দেবাংশুবাবু বললেন, ‘আপনারা এখন একটু বিশ্রাম করুন। আমি ঘণ্টাখানেক বাদে আসছি।’

ঠিক একঘণ্টা বাদেই দেবাংশুবাবু এলেন। সংগ্রহশালাটা বাড়ির পেছনের অংশে। দীর্ঘবারান্দা পেরিয়ে ওঁরা পৌঁছোলেন সেখানে।

ঘরে ঢুকে অংশুমানবাবু অবাক হয়ে গেলেন। মোটেই ছোটো ব্যাপার নয়। একটা বিশাল হলঘর। কাচের শোকেস এবং দেওয়াল ভরতি জিনিস। রায়বংশের অনেকের তৈলচিত্র। এক কোণে একটা ছোট্ট অথচ সুন্দর পালকি।

দেবাংশুবাবু বললেন, ‘আসুন, প্রথমে আমি নীলকন্ঠ রায়ের ছবিটা দেখিয়ে তারপর বাকি জিনিসগুলো দেখাব। এই দেওয়ালের প্রথম ছবিটি নীলকন্ঠ রায়ের—এক সাহেব চিত্রকর, রবার্ট হ্যারিসনের আঁকা। ১৮৩৬ সালে এটা আঁকা হয়েছিল।’

মৃগাঙ্কবাবু বললেন, ‘এখনও কত সুন্দর, কত জীবন্ত রয়েছে ছবিখানা।’

দেবাংশুবাবু বললেন, ‘এখানে যা-কিছু দেখবেন তার বেশিরভাগই নীলকন্ঠ রায়েরই সংগৃহীত জিনিস। আসুন আমরা বাঁ-দিক থেকে শুরু করি। এই যে দেওয়ালে দেখছেন দু-জোড়া ঢাল-তরোয়াল—এগুলো পলাশির যুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছিল। এই কামানের গোলাদুটোও তাই। ওই যে পুরোনো ধাঁচের এক জোড়া গাদাবন্দুক আর গোটাকতক তরোয়াল দেখছেন, ওগুলো অবিশ্যি কোনো যুদ্ধে ব্যবহৃত হয়নি। ওগুলো আমাদের পরিবারের নিজস্ব ছিল। এখানে দেখুন কিছু মুদ্রা রয়েছে। মোগল আমল থেকে ইংরেজ আমল পর্যন্ত ভারতবর্ষের প্রায় সমস্ত রকমের মুদ্রাই আছে। এই টুপিটা আর কলমটা ছিল ওয়ারেন হেস্টিংসের। আরও দু-জনের কলম রয়েছে—ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর আর রাজা রামমোহন রায়ের। ওই যে কোণের পালকিটা দেখছেন—ওতে করে আমাদের বংশের মহিলারা পার্বণে গঙ্গাস্নান করতে যেতেন। এবারে একটা জিনিস আপনাদের দেখাব। নীলকন্ঠ রায়ের খাতা। খাতাটা খুব পুরোনো বলে বেশি নাড়াচাড়া করাটা মুশকিল, তবু আপনাদের বিজ্ঞাপন দেখে আমি বহুদিন বাদে খাতাখানা খুলেছিলাম। এখন আবার একবার খুলছি।’

দেবাংশুবাবু একটা কাচের শো-কেস খুলে একটা লাল খেরোর খাতা বের করলেন। অংশুমানবাবু বললেন,—এই কাচের শো-কেসগুলো তো অনেক পরে তৈরি হয়েছে!’

দেবাংশুবাবু বললেন,—হ্যাঁ, এগুলো আমার ঠাকুরদা তৈরি করিয়েছিলেন। খোলা পড়ে থেকে থেকে অনেক জিনিস নষ্ট হতে বসেছিল। এই দেখুন ২৫শে কার্তিক ১২৩১ সনের জায়গাটা। কালীপুজোর পরের দিন কবিগানের অনুষ্ঠানটা হয়েছিল। এটা তার পরের দিন লেখা।

অংশুবাবু পড়লেন। লেখা রয়েছে:

‘গতকল্য আন্তুনি কবিয়ালের সহিত রাম বসুর কবির লড়াই হইল। আন্তুনি জয়লাভ করলেন। তাঁহাকে প্রদান করা হইল এক জোড়া গরদের ধুতি, একটা উত্তরীয়, নগদ একশত এক টাকা এবং তাঁহার অনুরোধক্রমে কৃত্তিবাস প্রণীত একখানি রামায়ণ। রাম বসু লাভ করিলেন একখানি গরদের ধুতি, একটি উত্তরীয় এবং নগদ একান্ন টাকা।

অংশুমানবাবু দেখলেন, এই লেখা এবং বাইরের লেখা একই জনের।

দেবাংশুবাবু বললেন, ‘যে কৃত্তিবাসী রামায়ণটি আপনাদের মাধ্যমে এখানে ফিরে এল, তার জোড়া আরও একখানি রামায়ণ এখানে রয়েছে। সম্ভবত বাংলায় ছাপা সবচেয়ে প্রাচীন রামায়ণ বই এগুলো। তা ছাড়া আছে কালীপ্রসন্ন সিংহের অনুবাদ করা মহাভারত। আপনারা নিশ্চয়ই জানেন যে, কালীপ্রসন্ন সিংহ ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সংস্কৃত মহাভারত বাংলায় অনুবাদ করে বিনামূল্যে তিনহাজার কপি জনসাধারণের মধ্যে বিতরণ করেন। তার সতেরোটি খন্ড ছিল। সবগুলো খন্ডের দুটো করে কপি এখানে রয়েছে। এগুলো সংগ্রহ করেন আমার প্রপিতামহ তারানাথ রায়। এ ছাড়া বেশ কিছু পুথি রয়েছে। রামায়ণ-মহাভারতেরই হাতে লেখা পুথি। বাংলা নয় সংস্কৃত।

এবারে আসুন নীলকন্ঠ রায়ের নিজস্ব কিছু শিল্পসৃষ্টি দর্শন করা যাক। এদিকটায় আসুন। এই যে সরস্বতী, গণেশ, কালী, দুর্গা, শিবমূর্তিগুলো দেখছেন—এগুলো সবই নীলকন্ঠ রায় নিজের হাতে তৈরি করেছিলেন। সবগুলোই চন্দন কাঠের।’

অংশুমানবাবু মুগ্ধ হয়ে গেলেন। মূর্তিগুলো প্রায় ইঞ্চি ছয়েক লম্বা। অপূর্ব গঠনশৈলী। এর মধ্যে গণেশ, সরস্বতী এবং শিবের মূর্তি কয়েকটি করে। কালীমূর্তি দু-টি এবং দুর্গামূর্তি একটি রয়েছে। সত্যিই নীলকন্ঠ রায় শিল্পী ছিলেন।

মৃগাঙ্কবাবুর মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল, ‘অসাধারণ—অপূর্ব জিনিস মশাই।’

দেবাংশুবাবু বললেন, ‘আপনাদের ভালো লাগছে জেনে আমার নিজেরও আনন্দ হচ্ছে।’

অংশুমানবাবু বললেন, ‘আপনাকে অনেক ধন্যবাদ দেবাংশুবাবু। আপনাদের এই সংগ্রহশালা না দেখলে একটা মন ভরে যাওয়া অভিজ্ঞা থেকে আমরা বঞ্চিত থাকতাম।’

দেবাংশুবাবু বললেন, ‘এবারে আমি একটা প্রস্তাব করব। আপনারা যদি এতে অসম্মত হন, তাহলে আমি খুব কষ্ট পাব। আশাকরি আমাকে কষ্ট দেবেন না। পেশাগত দিক দিয়ে আপনারা দু-জনেই দেবী সরস্বতীর সঙ্গে সংযুক্ত। এখানে এই যে নীলকন্ঠ রায়ের তৈরি চন্দনকাঠের গণেশ আর সরস্বতীর মূর্তি রয়েছে। তার থেকে একটি সরস্বতীর মূর্তি অংশুমানবাবুকে এবং একটি গণেশমূর্তি মৃগাঙ্কবাবুকে আমি উপহার দিতে চাই। ‘‘না’’ বলবেন না। প্লিজ।’

অংশুমানবাবু হেসে বললেন, ‘আপনার এই উপহার আমরা সানন্দে গ্রহণ করব।’

বৈকালিক চা-পর্ব শেষ করে দেবাংশুবাবু ওঁদের কালীমন্দিরে নিয়ে গেলেন। প্রতিমা দর্শন করে বেরিয়ে এসে দু-জনে বিদায় চাইলেন। দেবাংশুবাবুর মূর্তিদুটো ওঁদের হাতে তুলে দিলেন এবং আবার আসার জন্য বারেবারে অনুরোধ জানালেন। দু-জনেই জানালেন আবার ওঁরা আসবেন। রিকশায় যেতে যেতে অংশুমানবাবু বললেন, ‘আপনার দৌলতে আজ একটা অনবদ্য অভিজ্ঞতা হল মৃগাঙ্কবাবু।’

মৃগাঙ্কবাবু সশব্দে হাসলেন। বললেন, ‘তাহলেই বিবেচনা করুন স্যার। মাঝেমধ্যে নিজে হালে পানি না পেয়ে একটু-আধটু সমস্যা নিয়ে আপনার কাছে যাই বটে, কিন্তু সেগুলোও আপনাকে কম আনন্দ দেয় না। এই ভাইয়া— রোককে, রোককে। বাঁ-দিক মে খুব সম্ভব ফেরিঘাট হ্যায়। হামলোগ তো ওপার যায়ে গা।

হিন্দিতে বলার কোনো দরকারই ছিল না। রিকশাওয়ালা ছোকরা বাঙালি! সে-ও মৃগাঙ্কবাবুর হিন্দি শুনে হেসে ফেলল। তা ছাড়া ওকে ফেরিঘাটে নিয়ে যাওয়ার কথাই বলা আছে। ও ঠিক জায়গাতেই পৌঁছে দেবে। অংশুমানবাবু বুঝলেন, মৃগাঙ্কবাবু তুরীয় মেজাজে রয়েছেন।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%