যেখানে আকাশ নীল

গৌতম দাশ

গল্পগুলো পুরোনো। বহুবার বলাও হয়েছে এ পর্যন্ত। তবু শিঞ্জিনির কাছে সেগুলো পুরোনো হয় না। তার কারণ, রুটিনের ফাঁসে বন্দিনী তেরো বছরের নগরনন্দিনীর কাছে তার বাবার বাল্যজীবনের মুক্ত পরিবেশ এক আশ্চর্য রূপকথার দেশ। তাই কোনো কোনো বিরল অবসরে সে খুব আগ্রহ নিয়ে শুনতে বসে তার বাবার ছোটোবেলার গল্প। সেগুলোর পটভূমিকা এক গ্রাম, যেখানে মাথার ওপর অনেকখানি খোলা নীল আকাশ, চারপাশে আদিগন্ত সবুজ প্রকৃতি। গ্রামের একটি দূর দিয়ে বয়ে চলে ভাগীরথী। মেয়ের আবদার মেনে শুভেন্দু তাঁর সেই ইচ্ছা সুখের রাজ্যের গল্পগুলোর পুনরাবৃত্তিতে নিজেও সুখ পান।

গ্রামের নাম পলাশতলি। কলকাতা থেকে বেশ খানিক দূরে। শুভেন্দুর প্রথম জীবনের আনন্দময় যাপনভূমি। স্কুল জীবনটা ওখানেই কেটেছিল। তখনও লেখাপড়ার ভয়াবহ চাপ ছোটোদের বাঁচার আনন্দকে পানসে করে তোলেনি। স্কুল থেকে ফিরে বিকেল বেলায় বারোয়ারিতলার মাঠে ফুটবল খেলা অথবা ছুটির দিনে ভাগীরথীতে দল বেঁধে ঝাঁপাঝাঁপিতে ছিল দুরন্ত উল্লাস। দুর্গাপুজোর দিনগুলোয় থাকত একধরনের আলাদা উন্মাদনা। কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোয় গভীর রাত পর্যন্ত পাড়ার সব বাড়িতে নিমন্ত্রণরক্ষার পালা চলত। ফিনিক ফোটা জ্যোৎস্নার ওই মায়াবী রাতে গ্রামে সবার ঘরে সবার নিমন্ত্রণ থাকে।

তা ছাড়াও আছে বন্ধুদের সঙ্গে পানু ঘোষের আখের খেতে চুপিচুপি হানা দেওয়া কিংবা পৌষের হাড়কাঁপানো কুয়াশাভরা সন্ধ্যায় নিধু খুড়োর খেজুর রস খাওয়ার গোপন অভিযানের গল্প। শুভেন্দুর এইসব গল্প মুগ্ধ শিঞ্জিনিকে এক অচেনা পৃথিবীতে পৌঁছে দেয়।

যখন পলাশতলি ছেড়ে কলকাতায় চলে আসতে হয়েছিল তখন শুভেন্দুর বয়স সবে ষোলো পেরিয়েছে। মর্মান্তিক কষ্ট হয়েছিল। তবু মানতেও হয়েছিল। বাবার ইচ্ছায় কলকাতায় আসা। শুভেন্দুকে ঘিরে ভূদেব চক্রবর্তীর কিছু আশা-আকাঙ্ক্ষা ছিল। কলকাতা থেকে দূরের গ্রামে বাস করে, সেগুলোর রূপায়ণ বেশ দূরূহ কাজ। মফসসলে উচ্চশিক্ষার সুযোগ কম। ভূদেববাবু কোনোরকম ঝুঁকি নেননি। পৈতৃক সবকিছু বিক্রি করে দিয়ে প্রায় ত্রিশ বছর আগে কলকাতায় চলে আসেন। তিনি নিজেও কলকাতাতেই চাকরি করতেন।

মৃত্যুর আগে ভূদেববাবু ছেলের অনেকখানি সাফল্য দেখে গেছেন। অবিশ্যি তিনি চেয়েছিলেন শুভেন্দু ডাক্তার হোক। সেটা হয়নি। কিন্তু শুভেন্দু উচ্চশিক্ষিত। বড়ো চাকুরে। গাড়ি এবং সুসজ্জিত ফ্ল্যাটের মালিক। সুন্দরী স্ত্রী মনীষা। আর একমাত্র মেয়ে শিঞ্জিনি বা আদুরে ডাক শিনু।

একদিন হঠাৎ-ই শিঞ্জিনি জিজ্ঞাসা করে, ‘বাবি, একদিন ঘুরতে যাওয়া যায় না তোমার গল্পের দেশে?’

শুভেন্দু বললেন, ‘নিশ্চয়ই যাওয়া যায়। কিন্তু আমরা তো সেই গল্পের পলাশতলিতে পৌঁছতে পারব না। ইতিমধ্যেই ওখানকার পারসপেকটিভ-টা পুরোপুরি বদলে গেছে। সেটাই স্বাভাবিক। মাঝখানে রয়েছে তিরিশ বছরের একটা গ্যাপ। আর এই গ্যাপটা এমন একটা সময়ের যখন পৃথিবীতে খুব র‌্যাপিড চেঞ্জ এসেছে।’

‘তুই ভেবে দেখ শিনু, আজ থেকে তিরিশ বছর আগের পৃথিবীতে ইন্টারনেট নেই, ল্যাপটপ নেই, আইপড নেই, মোবাইল নেই—আরও কত কিছু নেই। এই সময়ের মধ্যে আমরা একে একে অনেক কিছু পেলাম। যদিও এরপর একটা বড়োসড়ো ‘‘কিন্তু’’ রয়েছে।’

শিঞ্জিনি অবাক হয়ে বলল, ‘কেন বাবি, ‘‘কিন্তু’’ রয়েছে কেন?’

শুভেন্দু বললেন, ‘মহাভারতে আছে, দেবতা এবং দানবদের সমুদ্রমন্থনের ফলে একে একে উঠে এসেছিল চন্দ্র, লক্ষ্মী, কৌস্তুভমণি, ঐরাবত, উচ্চৈ:শ্রবা, অমৃত এবং সবশেষে মারাত্মক কালকুট। সভ্যতার সমুদ্রমন্থনে আমরাও পেলাম সুখস্বাচ্ছন্দ্য, বিলাস সামগ্রী—জীবনকে সহজ করার জন্য, ভালোভাবে বেঁচে থাকার জন্য অজস্র উপকরণ। কিন্তু জীবন সহজ হল কই? অমৃতের সঙ্গে সঙ্গে যে গরলও চলে এল। বিশ্বজোড়া ভয়াবহ সন্ত্রাস, সংঘাত, হিংসা, আতঙ্ক, হাজার রকমের তীব্র সংকট যেগুলো সভ্যতাকে বিপন্ন করে তুলেছে। আরও আক্ষেপের কথা, অতিরিক্ত যন্ত্রনির্ভরতার জন্যই মানুষের মন থেকে কোমল অনুভূতিগুলো ক্রমশ যেন লুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। বুঝতে পারি না, পেলাম বেশি না-হারালাম বেশি। আমরা নাকের বদলে নরুণ পেয়ে আহ্লাদে আটখানা হচ্ছি না তো?

শিঞ্জিনি বলল, ‘বাবি প্লিজ, আজ তোমার মাথায় নির্ঘাৎ হেঁয়ালি ভর করেছে।’

শুভেন্দু একচিলতে হেসে বললেন, ‘নারে পাগলি, হেঁয়ালি নয়। মাঝে কিছু পুরোনো ঘটনা মনে করিয়ে দেয়, আগে মানুষের জন্য মানুষের অনেকখানি সহানুভূতি, ভালোবাসা, দায়বদ্ধতা ছিল। এখন সেগুলো কৃষ্ণপক্ষের চাঁদের মতো ক্রমশই ক্ষয়ে যাচ্ছে।

অনেকদিন আগেকার একটা ঘটনা বলি। আমরা তখন থাকতাম বরানগরের ভাড়াবাড়িতে। ওখানে নিয়োগিপাড়া রোড আর গোপাললাল ঠাকুর রোডের ক্রশিং-এ একজন ভিখারি ভিক্ষা করত। তার একটা পা হাঁটুর নীচ থেকে কাটা ছিল। যতদূর মনে পড়ছে, ওর নাম ছিল আবদুল। একদিন বাবা অফিসে বেরিয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরেই ফিরে এলেন। তাঁর মুখেই শোনা গেল ওই আবদুল হঠাৎ খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছে। অফিসের ব্যাগ রেখে দিয়ে বাবা বেরিয়ে গেলেন। আমিও ছুটলাম পেছন পেছন। পাড়ার আরও কয়েকজন ভদ্রলোক এগিয়ে এলেন। তারপর সকলে মিলে অসুস্থ আবদুলকে নিয়ে যাওয়া হল হাসপাতালে। কয়েকদিন আবদুল হাসপাতালে ভরতি রইল। প্রতিদিন বিকালে পাড়ার অনেকেই ফল-টল নিয়ে চলে যেত। যেদিন আবদুল সুস্থ হয়ে ফিরে এল, সেদিন পাড়ায় উৎসবের হাওয়া।

অথচ এখন? এই তো কয়েকদিন আগেই সকালের খবরের কাগজ খুলে জানা গেল, কলকাতার ফুটপাতে একজন পথচলতি মানুষ হঠাৎ অসুস্থ হয়ে বসে পড়েছে। যন্ত্রণায় একসময় ধীরে ধীরে শুয়ে পড়েছে। জ্ঞান হারাবার আগের মুহূর্ত সে দেখেছে তার পাশ দিয়ে অগুন্তি পায়ের ব্যস্ত আসা-যাওয়া। একসময়ে মৃত্যু এসে অসহায় মানুষটার সব জ্বালা জুড়িয়ে দিয়েছে। অসংখ্য লোক সারাদিন তার দিকে তাকিয়ে উদাসীনভাবে চলে গেছে নিজের কাজে। যেন সে একটা মরা ইঁদুর কিংবা বিড়াল। এমন ঘটনা এর আগেও আমাদের এই গর্বের কলকাতায় ঘটেছে শিনু। অথচ কয়েকজনের সামান্য চেষ্টা হয়তো মানুষগুলোকে জীবনের মধ্যে ফিরিয়ে আনতে পারত। মিডিয়ার দৌলতে ঘটনাগুলো আমরা জেনে যাই। অনেকেই লজ্জা পাই, কষ্ট পাই। সান্ত্বনা পেতে ভেবে নিই এগুলো নেহাৎ-ই দু-একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা। তারপর ধীরে ধীরে অনেককিছুর মতো এগুলোও ভুলে যাই। পৃথিবীটা কী অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে পালটে গেল শিনু। এই ভালো-মন্দর প্রভাব নিশ্চয়ই পলাশতলিতে গিয়েও পড়েছে।’

শিঞ্জিনি নরম গলায় বলল, ‘এমনও তো হতে পারে, তুমি যতখানি ভাবছ, এখনও পৃথিবীটা হয়তো ততখানি খারাপ হয়ে যায়নি।’

শুভেন্দু বললেন, ‘আমিও তো তাই চাই শিনু। এছাড়াও আছে নগরায়নের ধাক্কা। আমরা ওখানে গিয়ে হয়তো দেখব আমাদের পুরোনো বসতভূমিতে, যেখানে বাগান, পুকুর-টুকুর নিয়ে প্রায় তিন একরের মতো জমি ছিল, সেখানে একটা ছোটখাটো ফ্যাক্টরি তৈরি হয়ে গেছে। অথবা জমিটা অনেকগুলো প্লটে বিক্রি হয়ে গেছে। সেখানে একটা পাড়া গজিয়ে উঠেছে। তখন আমার মনটা যে বড়ো খারাপ হয়ে যাবে শিনু।’

শিঞ্জিনি হতাশ গলায় বলে, ‘তাহলে কি আমরা যাব না?’ শুভেন্দু একটু চিন্তা করে বললেন, ‘নো ম্যাডাম, আমরা একদিন যাব। ওখানে গিয়ে দেখব এখন পলাশতলির মানুষজন কেমনভাবে বাঁচে। যদি কোনো কারণে মন খারাপ হয়েই যায়, কী আর করা যাবে, কষ্টটুকু নিয়েই ফিরতে হবে। এখানকার অনেক ঘটনাও তো আমাদের মন খারাপ করে দেয় শিনু।

তা ছাড়া তুই এ পর্যন্ত অনেকবার পাহাড়-সমুদ্র-মরুভূমি দেখেছিস, কিন্তু কাছ থেকে বাংলা দেশের কোনো গ্রাম এখনও তোর দেখা হয়নি। সেটা দেখা দরকার। তোর ভালো লাগবে কিনা জানি না, কিন্তু অন্যরকমের একটা অভিজ্ঞতা তো হবে।’

মনীষা যেতে রাজি হল না। আঁতকে উঠে বলল, ‘ওরে বাবা, বেড়াতে যাব সেই অজ পাড়াগাঁয়ে! সরি, এক্সকিউজ মি। পুরো একটা দিন নষ্ট। কষ্টের কথা না হয় ছেড়েই দিলাম। বরং তোমরাই ঘুরে এসো। তোমাদের জন্য আমার শুভেচ্ছা রইল। আমি তোমাদের জন্য ড্রাইফুড প্যাক করে দেব। বোতলে জল দিয়ে দেব। যখন তোমাদের জন্য অ্যাংজাইটি ফিল করব, তখন ফোনে দুরবস্থার খবর নেওয়ার চেষ্টা করব। আর নন্দিতা ফ্রি থাকলে অর্গানাইজেশনের কিছু কাজ করা যেতে পারে। নইলে সারাদিন ননস্টপ রিল্যাক্স করব।’

শুভেন্দুর স্ত্রী মনীষা বালিগঞ্জের মেয়ে। আপাতত একটা এনজিও-র সঙ্গে যুক্ত। শহরের বস্তির দুঃস্থ মহিলাদের উন্নয়নের জন্য তাদের প্রচেষ্টা সম্প্রতি প্রশংসা পেয়েছে। গ্রাম্য কোনো ব্যাপারে মনীষার কৌতূহল নেই।

শুভেন্দু ঠিক করলেন, গাড়িতে নয়, ট্রেনেই যাওয়া হবে। শিয়ালদা থেকে ট্রেনে দেড় ঘণ্টার রাস্তা।

কলকাতাকে বাষট্টি কিলোমিটার পেছনে রেখে একটা ট্রেন শুভেন্দু আর শিঞ্জিনিকে নামিয়ে দিয়ে আরও দূরে চলে গেল। স্টেশন থেকে বেরিয়েই শুভেন্দু অবাক হলেন। বাঁ-দিকের রিকশা স্ট্যাণ্ডে আগে দু-খানা রিকশা থাকত, এখন অন্তত কুড়িখানা। ডানদিকে একটুকরো ফাঁকা মাঠ ছিল। সেটা পুরোপুরি উধাও। সেখানে সারি সারি দোকান। বেশিরভাগই জামাকাপড়ের। স্টেশনের গা ঘেঁষে একটা নিমগাছের নীচে বসে একজন মুচি জুতো সেলাই করত। নিম গাছটা এখনও আছে। গোড়াটা সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানো হয়েছে। গাছটাকে দেখে ভীষণ ভালো লাগল শুভেন্দুর। অনেকদিন পর চেনা কারও সঙ্গে দেখা হলে যেমন লাগে।

শুভেন্দু একটা রিকশা ডেকে নিলেন। স্কুল বিল্ডিং পাশে রেখে রিকশা এগলো। শুভেন্দু এই স্কুলেরই ছাত্র ছিলেন। স্কুল বিল্ডিং বিশেষ পালটায়নি। তারপর রাস্তার পাশেই বাজার। এই মুহূর্তে বাজার উপচে রাস্তাতেও কাঁচাসবজির দোকানদারি চলছে। বাজার পেরিয়ে ডানদিকে বাঁক নিয়ে রাস্তা সোজা পশ্চিমমুখো। দু-পাশে বসতবাড়ি। আগেও ছিল। তবে ফাঁকে ফাঁকে প্রচুর খালি জমি আর গাছগাছালি ছিল। এখন সেইসব জায়গায় অনেক নতুন রঙিন ঘরবাড়ি নিজেদের জায়গা করে নিয়েছে। শুভেন্দু অবাক হয়ে সেগুলো লক্ষ করছিলেন আর শিঞ্জিনি আড়চোখে শুভেন্দুকে।

একটু পরেই কৌতুকের গলায় ডাকল, ‘বাবি’।

ফিরে তাকালেন শুভেন্দু, ‘কী রে?’

‘কেমন বুঝছ?’

‘ওঃ, পুরোপুরি জমজমাট!’

এবারে রিকশাচালকের কাছ থেকে প্রশ্ন আসে, ‘বাবু, পলাশতলিতে কার বাড়িতে যাবেন?’

কার বাড়িতে? তাঁদের বাড়ির ক্রেতার নাম তো মনে নেই। বাড়ির অবস্থান বুঝিয়ে বললেন শুভেন্দু।

‘ও বুঝেছি। সোনা-মায়ের আশ্রমে।’

চমকে যান শুভেন্দু, ‘আশ্রম মানে? ওটা কি ধর্মকর্মের আখড়া হয়ে গেছে নাকি?’

রিকশাচালক হাসে। বলে, ‘না-না, সেসব কিছু নয়। আসলে লোকের মুখে মুখে ওটা আশ্রম হয়ে গেছে। সোনা-মায়ের আসল নাম সুনন্দা। এখানকার মানুষ সুনন্দা-মাকে ভক্তি আর ভালোবাসায় বলে সোনা-মা। সকলের সমস্ত আপদ-বিপদ, দুঃখ-কষ্টে উনি ঝাঁপিয়ে পড়েন। এমন মানুষকে ভক্তি না করে পারা যায়? গেলে আপনিও বুঝবেন।’

কিছুক্ষণের মধ্যেই রিকশা পৌঁছে গেল গ্রামে ঢোকার মুখে বারোয়ারি তলার মাঠে। পাশেই শস্যখেত। তার ওদিকে ভাগীরথীর রুপোলি ধারা। ও অঞ্চলের সমস্ত মানুষ গঙ্গাই বলে। এদিকটা খুব পালটায়নি।

পরিবর্তনের ছোঁয়া গ্রামের মধ্যে। টালি আর খড়ের ছাউনি মেটেবাড়িগুলো একটাও নেই। তার বদলে অ্যাসবেস্টসের ছাউনি দেওয়া পাকা দেওয়ালের ঘর। বেশ কিছু পাকাবাড়িও হয়েছে। শুভেন্দু ব্যগ্রভাগে চেনামুখ খুঁজছিলেন। কিন্তু, কাউকে পাওয়ার আগেই ঠিকানায় পৌঁছে গেলেন।

পাঁচিলঘেরা একটা ফিকে হলুদরঙের পুরোনো দোতলা বাড়ি। সামনে উঁচু উঁচু মোটা থাম। ত্রিশ বছর বাদেও প্রায় একই রকম। কেবল একটু বেশি জীর্ণ। শরীরের বিভিন্ন জায়গায় মেরামতির কিছু চিহ্নও আছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও এই মুহূর্তে এই বাড়িটা শুভেন্দুর এ পর্যন্ত দেখা সবকটা রাজপ্রাসাদকে হেলায় হারিয়ে দিল।

এক উদবেল আবেগ শুভেন্দুকে উথালপাথাল করছিল। শিঞ্জিনির হাত ধরে শুভেন্দু বাড়ির গেট খুলে ভেতরে ঢুকলেন।

পেছনে ফলের বাগান। সামনে একটু দূরে পুকুর। জমির সীমানা বরাবর নারকেল গাছের সারি। সবই আছে। বাড়ির সামনে একটুকরো সবুজ লন। তার পাশে ফুলবাগান। বিভিন্ন মরশুমি ফুলে বাগান যেন হাসছে।

নিজেদের উপস্থিতির কথা কাউকে জানানো দরকার। কিন্তু বাইরে কাউকেই দেখা যাচ্ছে না। একটু ইতস্থত করে সামনে পুকুরের দিকে এগিয়ে গেলেন শুভেন্দু। ঘাটের ওপর থেকে সিঁড়ির সারি জলের মধ্যে নেমে গেছে। টলটলে জল। শীতের উজ্জ্বল রোদে মাঝপুকুরে গা ভাসানো মাছের ঝাঁক।

শিঞ্জিনি বিস্মিত গলায় বলল, ‘ইস, কত মাছ! তুমি এখানে মাছ ধরতে বাবি?’

শুভেন্দু বললেন, ‘ইয়েস ম্যাডাম। কিন্তু এবারে চল তো দেখি একবার বাগানের দিকটায় যাওয়া যাক। দেখি, ওরা সবাই কেমন আছে।’

পুকুরের গা ঘেঁষে একটা সরু পায়ে-চলা পথ চলে গেছে পেছনের বাগানের দিকে। যেখানে আম-জাম-কাঁঠাল-লিচু-বাতাবি লেবু গাছেরা পাশাপাশি বাস করে। বাঁ-দিকে অনেকটা খোলা জায়গায় আবাদ করা হয়েছে। বেগুন, ফুলকপি, বাঁধাকপি। শিম-বরবটির নীচু মাচা। লকলকে লাউডগার ভরভরতি মাচার নীচে বিভিন্ন আকারের গাঢ় সবুজ লাউ।

বাগানে পৌঁছে শুভেন্দুর মনে হল বুড়ো গাছগুলোর গায়ে হাত রেখে জিজ্ঞাসা করেন, ‘তোমরা সবাই ভালো আছে তো? অনেকদিন বাদে তোমাদের সঙ্গে আবার দেখা হল। আমাকে চিনতে পারছ?’

শিঞ্জিনি অবাক গলায় জিজ্ঞাসা করল, ‘বাবি, এই সমস্ত তোমাদের ছিল?’

‘তোমাদের’ শব্দটা শুভেন্দুর কানে বিঁধল। কিন্তু তৎক্ষণাৎ মনে হল ও তো ভুল কিছু বলেনি। ওর কাছে এই জায়গা ‘আমাদের’ হওয়ার অনেক আগেই এটা হস্তান্তরিত হয়ে গেছে। জবাব দিলেন, ‘হ্যাঁ, শিনু, আয় এদিকে আয়। দেখ, এই হল হিমসাগর আমের গাছ। এই লাইনের সব ক-টাই তাই। আর ওই পাশেরগুলো ল্যাংড়া আমের গাছ। আর কিছুদিনের মধ্যেই মুকুল বেরোবে। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে গাছগুলোয় আম পেকে টসটসে হয়ে থাকবে। দূরের ওই দুটো কিন্তু বাতাবি লেবু গাছ। এপাশের তিনটে লিচু গাছ। একটা পাখি ডাকছে, শুনতে পাচ্ছিস? কী পাখির ডাক বলতে পারলে এক্ষুণি হাতে হাতে নগদ একশো টাকা পুরস্কার পাবি।’

শিঞ্জিনি আশ্চর্য হয়ে শুভেন্দুকে দেখছিল। এই বাবি তার অচেনা। এত উজ্জ্বল, প্রাণবন্ত বাবিকে সে আগে কখনো দেখেনি। একজন মানুষের মধ্যে কি অনেকগুলো মানুষ থাকে?

হঠাৎ মোবাইল বেজে উঠল। সংক্ষেপে মনীষার উদবেগ দূর করার চেষ্টা করে শুভেন্দু শিঞ্জিনিকে নিয়ে ফিরে এলেন পুকুরপাড়ে। মাছগুলো তখনও পিঠ ভাসিয়ে সাঁতরে বেড়াচ্ছিল।

শুভেন্দু বললেন, ‘এগুলো সব ছোটো মাছের ঝাঁক। বড়োগুলো আছে জলের তলায়।’

‘কে বাবা তোমরা?’

শুভেন্দু ফিরে তাকালেন।

একজন প্রৌঢ়া মহিলা। মাথায় কাঁচা-পাকা চুল। গায়ের রং টকটকে ফর্সা। পরনে হালকা রঙের একখানা সাধারণ তাঁতের শাড়ি। কিন্তু চোখ আটকে যায় তাঁর অসম্ভব ঐশ্বর্যমন্ডিত মুখখানায়। শান্ত সৌম্য মুখে করুণাঝরা দুই আয়ত চোখ। বয়স কোনো কোনো মানুষের মুখের দীপ্তি বাড়িয়ে দেয়। সম্ভ্রান্ত করে তোলে।

শুভেন্দু বুঝলেন, ইনিই সুনন্দা। এই অঞ্চলের সকলের সোনা-মা। বিব্রত গলায় বললেন, ‘দোষটা আমারই। প্রথমে আমারই জানানো কর্তব্য ছিল। কিন্তু ভেতরে ঢুকে কাউকে দেখতে পেলাম না। তাই একটু ওদিকে গিয়েছিলাম। এইটি আমার মেয়ে, ওকেই ঘুরিয়ে দেখাচ্ছিলাম। আসলে এই বাড়িতে একসময়ে আমরা বাস করতাম। আমার ছোটোবেলাটা এখানেই কেটেছে। আমার বাবার নাম ভূদেব চক্রবর্তী। অনেকদিন আগে আমরা এখান থেকে কলকাতায় চলে যাই। আমি শুভেন্দু আর এই আমার মেয়ে শিঞ্জিনি।’

স্মিত হাসলেন সুনন্দা। বললেন, ‘তাহলে তো তুমি ঘরের ছেলে। এসো আমার সঙ্গে। এসো দিদিভাই।’

শিঞ্জিনিকে প্রায় জড়িয়ে ধরে এগিয়ে চললেন সুনন্দা।

সামনের ঘরখানায়, যেটাকে একসময়ে বৈঠকখানা বলা হত, সেখানে গিয়ে ঢুকলেন। ঘরের দেওয়ালে রামকৃষ্ণ পরমহংস, সারদামণি এবং বিবেকানন্দের ছবি। গোটা তিনেক আলমারিতে ঠাসা বই। একটা বড়ো টেবিলের চারপাশে অনেকগুলো চেয়ার।

সুনন্দা বললেন, ‘তোমরা বোসো।’

তারপর জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমার মা-বাবা কেমন আছেন?’

শুভেন্দু জবাব দিলেন, ‘দু-জনেই অনেকদিন গত হয়েছেন।’

সুনন্দা কয়েক মুহূর্তে চুপ করে রইলেন। তারপর অনুচ্চ গলায় ডাকলেন, ‘গৌরী’! একটি তরুণী ঘরে ঢুকল।

সুনন্দা বললেন, ‘গৌরী, এরা আমার আরেক ছেলে আর নাতনি। আজ সারাদিন আমাদের সঙ্গে থাকবে। অনেককাল বাদে ছেলের মনে পুরোনো ভিটের জন্য টান পড়েছে। কি তাই তো?’

শুভেন্দু বললেন, ‘না, মানে—আমার এই মেয়ের অনেকদিনের ইচ্ছে তার বাবার ছেলেবেলার পরিবেশটা নিজের চোখে দেখবে।’

সুনন্দা হাসলেন। বললেন, ‘শুধু মেয়ের কথা বলছ কেন গো? মেয়ের বাবার কি ইচ্ছে হয়নি? শুধু মেয়ের ইচ্ছে হলে তাকে ধমক দিয়ে নিরস্ত করা যেত। তার সঙ্গে বাবার মনে ভিটের জন্য টান পড়েছিল বলেই তো দু-জনকে আমরা পেলাম। আসলে কী জানো শুভেন্দু, যে কারণেই হোক, যদি কোনো মানুষকে উদবাস্তু হতে হয়, সারাজীবন ধরেই ভিটের জন্য তার মন পোড়ে। আমি নিজে পদ্মাপারের মেয়ে, চলেও এসেছি অনেক ছোটবেলায়। এখন গঙ্গাতীরে বাস করি। ওখানকার তুলনায় অনেক সুখেও আছি। তবু তো সেই ছোটোবেলার কাশডাঙা গ্রাম এখনও মাঝে মাঝে আমার মনে ঢেউ তোলে। তবে থাক ওসব কথা। বউমাকে নিয়ে এলে না কেন?’

শুভেন্দু সামান্য বিব্রত গলায় বসলেন, ‘নিয়ে এলে ভালোই হত। কিন্তু হঠাৎ—আসলে ও এমন একটা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত যারা দুঃস্থ মহিলাদের জন্য কিছু কাজ-টাজ করে। সেই ব্যাপারেই—’

সুনন্দার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

বললেন, ‘খুব ভালো। কিন্তু এরপর যেদিন আসবে, সেদিন অবশ্যই ওকে নিয়ে আসবে। গৌরী, তুই এদের জলখাবারের ব্যবস্থা কর। সামান্য কিছু মুখে দিয়ে তোমরা যেখানে খুশি ঘুরে বেড়াও। শুভেন্দু তুমি তোমার ধুলোচাপা ছোটোবেলাকে খুঁজে বের করো আর সেটা আমার দিদিভাইকে দেখাও। দেখবে, ছোটবেলার কত তুচ্ছ কথা, তুচ্ছ ঘটনা এখনও কত আনন্দ জোগাবে। আগামী তিন ঘণ্টা তোমাদের ছুটি। আবার ডেকে নেব স্নান-খাওয়ার সময়।’

একটু পরে দু-জনে গরম লুচি, বেগুনভাজা আর মোহনভোগ বড়ো তৃপ্তি করে খেলেন। সুনন্দা সামনে বসে খাওয়ালেন। মনীষার ড্রাইফুড ব্যাগের অন্ধকারে পড়ে রইল।

গৌরী,তুই এদের জলখাবারের ব্যবস্থা কর। সামান্য কিছু মুখে দিয়ে তোমরা যেখানে খুসি ঘুরে বেড়াও।

শিঞ্জিনিকে গৌরীর কাছে রেখে শুভেন্দু বেরোলেন। দুই বাল্যবন্ধু সুবোধ আর বলাই তাঁকে টানছিল। প্রথমে গেলেন সুবোধের বাড়ি। ওকে বাড়িতেই পেলেন। মোটামুটি গোছানো সংসার। সুবোধ প্রথমে একটু আড়ষ্ট ছিল, পরে স্বচ্ছন্দ হয়ে গেল। ওর কাছেই শুভেন্দু খবর পেলেন, বলাই কিডনির অসুখে মারা গেছে। সুকান্ত, সরল সাদাসিধে বলে সবাই তার পেছনে লাগত, এখনগুজরাটে চাকরি করে। আর শুনলেন দত্ত-বাড়ির কথা। কেমন করে একটা সাধারণ গৃহস্থবাড়ি মানুষের কাছে ধীরে ধীরে আশ্রম হয়ে উঠল, সেই ইতিবৃত্ত।

ভূদেব চক্রবর্তীর কাছ থেকে বাড়ি এবং জমি কিনেছিলেন নিশিকান্ত দত্ত। তাঁরই স্ত্রী সুনন্দা। বছর পনেরো আগেও বাড়িটা গ্রামের অন্যান্য গৃহস্থবাড়িগুলো থেকে আলাদা কিছু ছিল না। নিশিকান্ত এবং সুনন্দার এক ছেলে—পুলক। রেলে চাকরি করে। গোড়া থেকেই জামালপুরে আছে। বছরে দু-তিনবার আসে। কোনোদিনই পাড়ার লোকের সঙ্গে দত্ত-পরিবারের তেমন ঘনিষ্ঠতা ছিল না।

পনেরো বছর আগে একবার সুনন্দার কঠিন অসুখ হয়। বাঁচার আশা ছিল না। একা নিশিকান্ত দত্তের কিছু করার সাধ্য ছিল না। গ্রামের কিছু ছেলে সুনন্দাকে কলকাতায় নিয়ে যায়। ওদের সঙ্গে গিয়েছিল সবিতা নামে একটি মেয়ে। সবিতা সরডাঙা গ্রামের অনুন্নত সম্প্রদায়ের একটি মেয়ে। ও দত্ত-বাড়িতে কাজ করত। সুনন্দাকে বাঁচাতে রক্ত দিতে হয়েছিল, আর সেই রক্ত দিয়েছিল সবিতা। সুনন্দা বেঁচে গেলেন।

ফিরে এসে তাঁর মনে হল, ঋণশোধ না করা গেলেও এদের জন্য কিছু করা যায়। সুনন্দা পরবর্তী কালে এই ঋণের কথা বাইরের মানুষের কাছে বহুবার স্বীকার করেছেন। প্রথমে সবিতাকে নিয়ে শুরু করলেন। কাজের ফাঁকে ফাঁকে ওকে লেখাপড়া শেখাতে লাগলেন।

সুবোধ শুভেন্দুকে বলে যাচ্ছিল, ‘তুই সরডাঙায় আগে গিয়েছিস? তিরিশ বছর আগে যদি গিয়ে থাকিস, তাহলে ওদের যেখানে দেখেছিলি, দশ-বারো বছর আগেও ওরা সেখানেই ছিল। পাড়ার মেয়ে-বউগুলো পরের বাড়িতে কাজ করত। পুরুষগুলো ধামাকুলো বুনত কিংবা পরের জমিতে মজুর খাটত। বাচ্চা ছেলে-মেয়েগুলোর লেখাপড়ার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক ছিল না। সন্ধ্যেবেলা মদ খেয়ে পাড়ার বেশিরভাগ পুরুষই মাতাল হত। রোজই ঝগড়া, মারপিট।

সুনন্দার আগ্রহে সবিতা কিছু বাচ্চা ছেলে-মেয়ে আর বউদের সন্ধ্যেবেলায় আনা শুরু করল। তাদের লেখাপড়া শেখাতেন সুনন্দা। কিছু পুরুষকেও কাজ দিলেন। বাড়ির ফাঁকা জমিতে এবং মাঠে নিজেদের চাষের জমিতে আবাদ করার কাজ। পুকুরে মাছ চাষের কাজ। ছোটোখাটো ব্যাবসা করার জন্য অল্পস্বল্প টাকা। সবচেয়ে যেটা বড়ো কথা, আমি জানি না ঠিক কীভাবে ওখানকার পুরুষদের মদের নেশা ছাড়ানো হল। এখন ওই পাড়ার কেউ মদ খায় না। আর ওখানকার প্রত্যেক ছেলে মেয়ে এখন স্কুলে যায়।

তুই দেখেছিস কিনা জানি না, দত্ত-বাড়িতে গৌরী নামে একটি মেয়ে থাকে। দক্ষিণপাড়ার বসন্ত বিশ্বাসের মেয়ে। বছর পাঁচেক আগে ওদের খড়ের ঘরে আগুন লেগে গেলে ওর মা-বাবা আর ছোটোভাই পুড়ে মারা যায়। গৌরী কোনোরকমে বেঁচে যায়। তারপর গৌরী আশ্রয় পেল সুনন্দার কাছে। আর গ্রামের যাদের খড়ের ঘর ছিল, প্রত্যেকে সাহায্য পেল অ্যাসবেস্টসের ছাউনি দিয়ে ঘর করার জন্য।

এর কিছুদিন বাদে নিশিকান্ত দত্ত হঠাৎ মারা যান। স্ট্রোকে। সকলেই ভাবল, এবারে সুনন্দা তাঁর ছেলের কাছে চলে যাবেন। শুনেছি, ওঁর ছেলে নিয়ে যেতেও চেয়েছিল। কিন্তু সুনন্দা রাজি হননি। অবিশ্যি গ্রামের মানুষও তাঁকে ছাড়তে চায়নি।

তারপর গত কয়েকবছর ধরে সমস্ত ব্যাপারটা ক্রমশ বড়ো আকার ধারণ করেছে। ইদানিং বোধ হয় কিছু সরকারি-বেসরকারি সাহায্যও আসে। সমস্ত টাকাটাই মানুষের কল্যাণে ব্যয় হয়। মাসে দু-বার কলকাতা থেকে একজন ডাক্তার আসেন। দুঃস্থ মানুষের চিকিৎসা, পুজোর সময় বাচ্চাদের নতুন জামা, শীতে বুড়ো-বুড়িদের একখানা করে নতুন চাদর—সবই দত্তবাড়ির খরচ। রোজ সন্ধ্যায় বয়স্ক নিরক্ষরদের শিক্ষাদানের ব্যবস্থা এখনও চালু আছে। প্রত্যেক রবিবার দুপুরে গ্রামে গরিবঘরের ছেলে-মেয়ে- দের খাওয়ানো হয়। আজ দুপুরে তুই নিজের চোখেই দেখবি। এই সমস্ত কাজগুলো সুষ্ঠুভাবে দেখাশোনা করার জন্য আছেন প্রণব বিশ্বাস আর উৎপল সরকার। অবিশ্যি রবিবার বলে আজ ওঁদের কাউকেই পাওয়া যাবে না।

বাইরে থেকে ব্যাপারটা ঠিক বোঝা যাবে না। কিন্তু এই অঞ্চলের সমস্ত মানুষের সঙ্গে সুনন্দার একধরনের আত্মিক যোগ তৈরি হয়ে গেছে। এখানকার অধিকাংশ মানুষ ওঁর কাছে কোনো না কোনোভাবে উপকৃত। আর সবচেয়ে বড়ো কথা, রাজনীতির কোনো রং এখানে নেই। এখন ওই বাড়িটাকে লোকে বলে আশ্রম আর সুনন্দাকে বলে ‘সোনা-মা।’

ভরাট মন নিয়ে ফিরলেন শুভেন্দু। দেখলেন, বাড়ির ভেতরের চত্বরে এক দঙ্গল বিভিন্ন বয়সের ছেলে-মেয়ে শিঞ্জিনিকে ঘিরে রয়েছে। শিঞ্জিনি তাদের সঙ্গে জমিয়ে গল্প করছে।

শুভেন্দুকে দেখে সুনন্দা অনুযোগের সুরে বললেন, ‘একটু দেরি করে ফেললে বাবা। খেতে দেরি হয়ে গেল। দিদিভাই তোমাকে ফেলে খেতে রাজি হল না। আর ওর নতুন বন্ধুরা ওকে ফেলে বসতে চাইছে না। স্নান করে এসেছ শুনলাম। তাহলে এবার খেতে দিতে বলি। তুমি আর দিদিভাই ঘরে বোসো। ওখানেই তোমাদের জায়গা করা হয়েছে।’

শুভেন্দু জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আর ওরা?’

সুনন্দা বললেন, ‘ওরা তো ওখানেই বসে। ঘরে একসঙ্গে এতজনের জায়গা হবে না।’

শুভেন্দু বললেন, ‘তাহলে আমরা বরং ওদের সঙ্গে ওখানেই বসি।’

সুনন্দা বললেন, ‘তা কী করে হয়! তোমরা আজ আমাদের অতিথি। কেমন করে ওদের সঙ্গে তোমাদের বসাই? তা ছাড়া ওদের যে একেবারে সাদামাটা ডাল-ভাত-তরকারি দেওয়া হয়।’

শুভেন্দু বললেন, ‘আপনার নাতনিকে দেখুন। ওকে কি এখন ওর বন্ধুদের কাছ থেকে তুলে আনা যায়?

সুনন্দা হেসে ফেললেন।

এক আশ্চর্য দুপুর ধরা দিল দু-জনের কাছে। শুভেন্দুর কাছ থেকে কখন যেন মাঝের তিরিশ বছর হারিয়ে গেল। সমবয়সি দুই বন্ধুর মতো শিঞ্জিনি আর শুভেন্দু ঘুরে বেড়ালেন পলাশতলির পথে পথে, নির্জন আমবাগানে, ঘন সবুজ শস্যক্ষেতের সীমানায়। এক অভূতপূর্ব আনন্দমাধুকরী। একসময়ে পায়ে পায়ে দু-জনে পৌঁছে গেলেন প্রায় নির্জন ভাগীরথী তীরে। একপাশে শীতের নদীর শান্ত প্রবাহ, অপর পাশে অগণিত মৌমাছির স্পর্শ-চঞ্চল বিস্তীর্ণ গাঢ় সবুজ আর উজ্জ্বল কাঁচাসোনা হলুদের ফুলন্ত সরষেখেত। কোথাও ঝলমলে রঙিন প্রজাপতিদের ব্যস্ত ওড়াউড়ি। দূরে নদীর বাঁকে তিনটে জেলেডিঙির আবছা অবয়ব। ঘন নীল আকাশের পটভূমিকায়, ডানায় রোদ মেখে গা ভাসানো এক নি:সঙ্গ শঙ্খচিল। সমস্ত পরিবেশ থেকে উঠে আসছিল একধরনের মৃদু ঝাঁঝালো গন্ধ। এসব কিছুর মধ্যেই ধীরে ধীরে দুপুর গড়িয়ে গেল।

পলাশতলির অনেকেই শুভেন্দুদের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। শেষ-বিকেলে চা খেতে খেতে তাদের সঙ্গে গল্প করছিলেন শুভেন্দু। দুপুরের ছেলে-মেয়ের দল সংখ্যাধিক্য ঘটিয়ে ফিরে আসায় শিঞ্জিনি ওদের সঙ্গে বাড়ির অন্য কোথাও ব্যস্ত ছিল।

সুনন্দা জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আজকের দিনটা তোমার কেমন লাগল শুভেন্দু?’

শুভেন্দু বললেন, ‘আজ সকালে যখন আমরা এখানে আসার জন্য বেরিয়েছিলাম, তখনও এখান থেকে কিছু পাব এমন ধারণা ছিল না। বরং আমাদের ভয় ছিল হয়তো খারাপ মন নিয়ে ফিরতে হবে। আসলে আমার ইচ্ছে ছিল আমাদের পুরোনো বসতভূমিকে একটু ছুঁয়ে দেখব। আপনি ঠিকই বলেছিলেন—ভিটের টান। আর শিশু দেখবে তার বাবার ছোটোবেলার যাপনভূমি।

রিকশায় আসতে আসতে চালক ছেলেটির মুখেই প্রথম আপনার কিছু কথা শুনলাম। অবাক হলাম। এখানে এসে আপনাকে দেখলাম। মনে হল, সাধারণ মানুষের থেকে আপনি আলাদা। তারপর গেলাম সুবোধের বাড়ি। ও আমার ছোটোবেলার বন্ধু। ওর কাছে আপনার সব কথা শুনলাম। মানুষের জন্য আপনার দরদের কথা। কেমন করে আপনি এই অঞ্চলের সবার মনে পৌঁছে গেলেন সেই বৃত্তান্ত। আমি মুগ্ধ হলাম। আমি এসেছিলাম শূন্য মনে, আর কতখানি ভরাট মন নিয়ে ফিরে যাচ্ছি, সেটা আমি কেমন করে বোঝাব? শুধু বলি, আজকের দিনটার জন্য আমি আপনার কাছে কৃতজ্ঞ। এমন দিন আমার জীবনে খুব বেশি আসেনি।’

সুনন্দা মৃদু হেসে বললেন, ‘শুনে আমারও ভালো লাগছে। কিন্তু শুভেন্দু, আমার শক্তি অত্যন্ত সীমিত। তেমন করে পারি কই? অধিকাংশ মানুষকেই কোনো-না-কোনো কষ্ট নিয়ে বাঁচতে হয়। অসহায় মানুষের জন্য কিছু করার চেষ্টা করি, এটাই আমার আনন্দ। তা ছাড়া এখানকার সকলে আমার পাশে আছেন বলেই এটুকু সম্ভব হয়। নইলে একা আমার আর কতটুকু সাধ্য? সকলকে নিয়ে বেঁচে থাকা বড়ো আনন্দের শুভেন্দু। ঠাকুর বলতেন, শিব জ্ঞানে জীব সেবা করার কথা। এর চেয়ে বড়ো কোনো মধুর সত্যের সন্ধান আমি এখনও পাইনি।’

ফিরে যাওয়ার রিকশার ব্যবস্থা সুনন্দাই করলেন। বিদায়বেলায় সুনন্দাকে প্রণাম করলেন শুভেন্দু। বহুদিন পর কাউকে প্রণাম করে আনন্দ পেলেন। শিঞ্জিনিকে প্রণাম করতে দিলেন না সুনন্দা। ওকে জড়িয়ে ধরে আদর করলেন। রিকশায় ওঠার সময় শুভেন্দু দেখলেন তাঁদের চারপাশে অনেক মানুষের ভিড়। সকলের ঐকান্তিক আকাঙ্ক্ষা দু-টি শব্দে তাঁদের কাছে ভেসে এল—‘আবার এসো’।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%