শুভজ্যোতি এবং

গৌতম দাশ

প্রায় কাকভোরে খবরটা নিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে ছুটে এলেন হেডস্যার রাজেন চক্রবর্তী। মাধ্যমিক পরীক্ষায় সপ্তম স্থান অধিকার করেছে শুভ। অবাক হওয়ার মতোই খবরটা। রেজাল্ট ভালো হবে এটা জানা ছিল, কিন্তু এতটা হবে এটা কারও ভাবনাতেই ছিল না।

খবর ছড়িয়ে যেতে দেরি হয়নি। মফস্সল শহরে প্রায় সকলেই সকলের চেনা। তারপর সারাদিন টিভির লোকজন, বিভিন্ন কাগজের সাংবাদিক, চেনা-অচেনা বহু মানুষের বহু প্রশ্ন, শুভেচ্ছা, উপদেশ, তার অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ, পছন্দ-অপছন্দ নিয়ে সকলের আগ্রহ দিনটাকে প্রায় স্বপ্নের মতো করে তুলল।

অসম্ভব ভালো লাগছিল শুভজ্যোতির। আজ একটা দিনের মতো দিন বটে। তার জীবনে এমনদিন এর আগে আর কখনো আসেনি। পাড়ার উপেনজ্যাঠা ছিলেন আজকের শেষ ব্যক্তি। তিনি বিস্তর আশীর্বাদ করে যখন বিদায় নিলেন, তখন রাত ন-টা বেজে গেছে।

দুপুরে একজন সাংবাদিক শুভকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তার প্রিয় খেলা কোনটা?

সে হেসে জবাব দিয়েছিল, ‘ওই যে বাইশ গজের খেলাটা—ক্রিকেট।’

‘নিয়মিত খেলো?’?

মুহূর্তের মধ্যে শুভর মুখের হাসি মিলিয়ে গিয়ে বিষাদ ঘনাল। কী বলবে? ওর হয়ে উত্তর দিলেন হেডস্যার। একটু ইতস্তত করে বললেন, ‘আসলে ওর একটু শারীরিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। জন্ম থেকেই। তাই—’

সমবেদনার গাঢ় গলায় সেই সাংবাদিক বলেছিলেন, ‘ওঃ, জানা ছিল না, আয়াম সরি। ডোন্ট মাইণ্ড। বাট অ্যাট দি সেম টাইম, এটাও আমার মনে হচ্ছে যে, অনেক ফিজিক্যালি ফিট ছেলে-মেয়েদের টপকে তুমি আজ এখানে এসেছ। একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ জিতে তুমি প্রমাণ করেছ তো তোমার ব্যাপারটা হয়তো কিছুটা কষ্টদায়ক, কিন্তু জীবনে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সেটা বিরাট কোনো সমস্যা নয়। আমি ঠিক বলছি তো?’

হেডস্যার উজ্জ্বল মুখে মাথা নেড়ে সায় দিয়েছিলেন, ‘ঠিক ঠিক।’

জন্ম থেকেই শুভর ডান-পা খানা ত্রুটিযুক্ত। পথে বেরোলে বাঁ-পা এবং দুটো ক্রাচ সম্বল করে তাকে চলাফেরা করতে হয়। ক্রিকেট পাগল হয়েও ঘরে বসে টিভিতে খেলা দেখেই সন্তুষ্ট থাকতে হয়। কোনো মাঠে গিয়ে খেলা দেখা বা খেলার সামর্থ্য তার নেই। এসব নিয়ে একসময়ে মনে ক্ষোভ ছিল। এখন আর নেই।

শুধু যে কষ্টটা শুভকে এখনও পীড়া দেয়, সেটা হল চারপাশের মানুষ তাকে আলাদা চোখে দেখে বেশিরভাগই অনুকম্পার দৃষ্টিতে তাকায়। এটা ওর সবচেয়ে খারাপ লাগে। অথচ কিছু করারও নেই। মেনে নিতেই হয়।

ওর বাবা যখন পথ দুর্ঘটনায় মারা যান তখন ওর বয়স চার বছরের কাছাকাছি। বাবার কথা কিছুটা আবছাভাবে মনে পড়ে। যদিও ওই বয়সের তুলনায় আরও খানিকটা স্পষ্ট মনে থাকার কথা। কিন্তু কেন কে জানে দু-তিনটে ঘটনা ছাড়া বাবার কথা ওর তেমন স্পষ্টভাবে মনে নেই। মনে করতে চাইলে ঘরে টাঙানো বাবার ছবির হাসিহাসি মুখখানাই মনে ভেসে ওঠে। বাবার মৃত্যুর পর ওর মাকে বাবার অফিসে একটা চাকরি দেওয়া হয়।

বাড়ি এবং শুভকে দেখাশোনার জন্য আনা হয় মায়ের এক দূর সম্পর্কের মাসিকে। তরুদিদা। বুড়ির তিনকুলে কেউ ছিল না। সুতরাং, আনন্দের সঙ্গেই থাকতে রাজি হয়েছিল। তরুদিদার তত্ত্বাবধানেই কাটে শৈশবটা। অবিশ্যি তরুদিদা এখনও আছে। পৃথিবীটা ভীষণ ভালো শুধু তিনজনের জন্য। একজন ওই তরুদিদা, দ্বিতীয়জন তার মামণি জয়শ্রী সেন। আর তৃতীয়জন তাদের স্কুলের হেডস্যার রাজেন চক্রবর্তী। এই তিনজনের ভালোবাসা আছে বলেই ছোটোবেলা থেকে তার শতসহস্র অসুবিধা কখনো দুর্বহ হয়ে ওঠেনি।

শুভ জানে সে তার মামণির কতখানি জুড়ে আছে। জানে বলেই তার কাছে বাঁচাটা এখনও বড়ো আনন্দের।

তরুদিদা অবিশ্যি মামণিকে মাঝেমাঝেই বলে, ‘ছেলে নিয়ে বেশি আদিখ্যেতা ভালো নয় জয়া, জানো না তো অতিযত্ন অযত্নের চেয়েও খারাপ।’

শুনে হাসে শুভ। এটা দিদার মনগড়া কথা। সে নিজেও কিছু কম আদর দেয় না। স্কুল থেকে ফিরতে আধঘণ্টা দেরি হলেই দিদা যে কত অস্থির হয়ে রাস্তায় গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, তা বহুবার নিজের চোখেই দেখেছে শুভ। যদিও দুশ্চিন্তার বিশেষ কোনো কারণ নেই, কেননা ওর আসা-যাওয়ার জন্য একটা রিকশা ঠিক করাই আছে। সেইজন্য তরুদিদার বকবকানি শুনে মামণিও হাসে।

আজকের এই সাফল্যের মূলেও তার মামণি। কিন্তু মামণি সে কথাটা জানে না। মামণি আর তরুদিদা এখন রান্নাঘরে রয়েছে। আজ কথাটা প্রকাশ করার দিন।

বছর তিনেক আগে এক ভ্রমণ সংস্থার সঙ্গে ও আর মামণি এক সপ্তাহের জন্য পুরী গিয়েছিল। তখন ও সবে ক্লাস এইটে উঠেছে। তার আগে বা পরে আর কোথাও বেড়াতে যায়নি শুভ।

পুরীতে তরুদিদাকেও সঙ্গে নিয়ে যেতে চেয়েছিল ওরা কিন্তু দিদাই রাজি হয়নি। বলেছিল, ‘না রে দাদা। তোরা যা। আমি আর এই বয়সে দৌড়ঝাঁপ করতে পারিনে। তা ছাড়া সবাই বাড়ি ছেড়ে চলে গেলে চোরেরা আর কিছু রাখবে ভেবেছিস? ফিরে দেখব, বাড়ির জানালা-দরজাগুলো পর্যন্ত খুলে নিয়ে গেছে। তার চেয়ে বরং আমার জন্য জগন্নাথদেবের মহাপ্রসাদ একটু আনিস। তাতেই হবে। সেটা মুখে দিলেই আমার তীর্থ করা হয়ে যাবে। আর তুই দাদা খুব সাবধানে থাকিস। তোরা ভালোয় ভালোয় ফিরে আসিস—এর চেয়ে বেশি আমি আর কিছুই চাই না।

সুতরাং, ওরা দু-জনেই গিয়েছিল। সেই প্রথম সমুদ্র দর্শন। বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে গিয়েছিল শুভ। টিভিতে দেখা আর নিজের চোখে দেখার পার্থক্য যে কতখানি সেটা উপলব্ধি করেছিল গভীরভাবে। স্বর্গদ্বারের কাছেই একটা হোটেলে ছিল ওরা। হোটেলের ব্যালকনিতে চেয়ার পেতে বসে সারাক্ষণ সমুদ্র দেখত। রাতে ঘুম আসার আগে পর্যন্ত কানে আসত সমুদ্রের গর্জন। একদিন দেখে এসেছিল কোনারক, উদয়গিরি, খন্ডগিরি, নন্দনকানন।

তারপর দিনদুপুরে রিকশা করে মামণি আর শুভ গিয়েছিল জগন্নাথদেবের মন্দিরে। সেখানে পাথুরে মেঝেতে, উঁচু-নীচু সিঁড়িতে ক্রাচ নিয়ে চলতে খানিকটা অসুবিধাই হচ্ছিল। একবার হুমড়ি খেয়ে পড়েই যাচ্ছিল। জগন্নাথদেবের সামনে পৌঁছে প্রথামাফিক একটা প্রণাম ঠুকে ফিরে যাওয়ার জন্য মামণির দিকে তাকাতেই শুভ অবাক হয়ে গেল। মামণি হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে আছে। দু-চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। থরথরিয়ে কাঁপছে ঠোঁট দুটো।

কোনো কোনো মুহূর্তে কিছু বলা যায় না। শুভ ব্যথিত বিস্ময়ে মামণিকে স্পর্শ করেছিল এবং আরও অবাক হয়ে অনুভব করেছিল মামণির শরীর উত্তপ্ত। জ্বর এলে যেমন হয়।

তৎক্ষণাৎ শুভর ভীষণ কষ্ট হয়েছিল। ও জানে মামণি কার জন্য প্রার্থনা করছে। কার জন্য মামণির মনে এক সমুদ্র-বেদনা। তার জন্য। শুধু তারই জন্য। পারলে মামণির মনের এই কষ্ট মুছে দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা সে করত। কিন্তু কেমন করে?

বিকালে সমুদ্রের ধারে বসে শুভ কথাটা তুলল। মামণি তুমি দুপুরবেলা জগন্নাথদেবের মন্দিরে কেঁদে কেঁদে নিশ্চয়ই আমার জন্য প্রার্থনা করছিলে! কিন্তু কার কাছে মামণি? আমি এক খোঁড়া ছেলে আর তুমি তার মঙ্গলের জন্য যাঁর কাছে প্রার্থনা করছিলে তাঁর তো দুটো হাতই নেই। তিনি আমাকে সাহায্য করবেন কীভাবে?’

মামণিকে আগে কখনো তেমনভাবে রাগতে দেখেনি শুভ। কিন্তু সেই মুহূর্তে মনে হল মামণি অসম্ভব রেগে গেছে। চোখ-মুখ লাল হয়ে উঠেছে।

সেদিনের সেই সমুদ্র গর্জনকেও ডুবিয়ে দেওয়া তীব্রস্বর আজও শুভর কানে বাজে। একটি শব্দও সে ভোলেনি।

‘ছি:! শুভ ছি:! আর কোনোদিন যেন তোমার মুখে এ ধরনের কথা না শুনি। নিজের সম্পর্কেও নয়। দেবতা সম্পর্কেও নয়। তুমি আজ মন্দিরের মধ্যে যেখানে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলে সেখানে আজ পর্যন্ত কত লক্ষ মানুষ এসে দাঁড়িয়েছে, জগন্নাথদেবের কাছে নিজেদের সুখ-দুঃখ, ভক্তি-শ্রদ্ধা নিবেদন করেছে। কেন এত মানুষ শত শত বছর ধরে আসে, দেবদর্শন করে ধন্য হয়? লক্ষ লক্ষ মানুষের এই আবেগকে শুধুই ফাঁকি বলব? ঈশ্বর তো কাউকে নিজে হাতে কিছু দেন না। মানুষ পুজো করে নিজের শক্তিকেই নতুন করে উপলব্ধি করবে বলে। সেটাই ঈশ্বরের আশীর্বাদ। বড়ো হয়ে তুমি এসব কথা বুঝবে শুভ।

এবারে তোমার কথা। তুমি নিজেকে খোঁড়া বলছ। একথা ঠিকই যে তোমার ডান পায়ে একটু সমস্যা আছে। চলতে ফিরতে খানিকটা অসুবিধাও হয়। কিন্তু তাতে কী? মানুষের শরীরটাই তো শেষকথা নয়। শরীরকে মনের নির্দেশ মেনে চলতে হয়। মানুষের মনই হল চালক। ক্লাসে তোমার রোল নম্বর আট। তোমাদের ক্লাসের তিনটে সেকশন মিলিয়ে ছাত্রসংখ্যা কমপক্ষে দুশো জন। তোমার নীচের বাকি একশো বিরানব্বই জন ছাত্র শরীরিকভাবে তোমার চেয়ে সুস্থ। কিন্তু লেখাপড়ার প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে তারা তো তোমার থেকে খানিকটা পিছিয়েই আছে। তাই না? নিজেকে প্রমাণ করাটাই হল আসল কথা শুভ। নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য অনেক ক্ষেত্র আছে। আগ্রহ এবং নিষ্ঠা থাকলে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। যে নিজেকে হেয় করে সে কখনো বড়ো হতে পারে না শুভ। আমি চাই না আমার শুভ কখনো সেই দলে যোগ দিক। এখনও আমি বিশ্বাস করি আমার এই ছেলেই একদিন বহু মানুষকে প্রেরণা জোগাবে। আজ আমি ঠাকুরের কাছে প্রার্থনা করছিলাম, অন্তত সেইদিন পর্যন্ত আমাকে বাঁচিয়ে রেখো ঠাকুর।’

মামণিকে আগে কখনো তেমনভাবে রাগতে দেখিনি শুভ । কিন্তু সেই মুহুর্তে মনে হল মামণি অসম্ভব রেগে আছে ।

বলতে বলতে সেদিন দ্বিতীয়বার কেঁদে ফেলেছিল মামণি।

সেইরাতে বহুক্ষণ ঘুম আসেনি শুভর। বাইরে থেকে উত্তাল সাগরের গর্জন ভেসে আসছিল। মনের মধ্যেও সেরকম একটা কিছু অনুভব করছিল। সেখানে একটা প্রতিষ্ঠা দানা বাঁধছিল—কিছু করতে হবে, করে দেখাতে হবে।

তার পরের পরীক্ষায় ওর রোল নম্বর হল এক। পরবর্তী বছরগুলোয় দুই রোল নম্বরের দেবর্ষির সঙ্গে নম্বরের ব্যবধান ক্রমশই বেড়েছিল। ওকে সর্বতোভাবে সাহায্য করেছিলেন স্কুলের হেডস্যার এবং আরও কয়েকজন স্যার। ওঁদের ঋণ পরিশোধ করা যাবে না।

আজ একটা মাত্র সোপান পেরল। ওপর দিকে এখনও অনেকগুলো সোপান বাকি।

মামণি আর তরুদিদা এখন রান্নাঘরে। অনুপ্রেরণা কোথা থেকে পেল সেই গল্পটা দু-জনকে না বলতে পারলে মনে শান্তি নেই, শোওয়ার পরে মামণির মুখের চেহারাটা কেমন হবে সেটা কল্পনা করে ভারী মজা পেল শুভ।

চেঁচিয়ে দু-জনকেই ডাকল শুভ। ওরা এলে পাশাপাশি রেখে দু-জনকে এবং বাবার ছবিতে প্রণাম করল শুভ। শুভকে জড়িয়ে ধরে দু-জনেই কাঁদছে।

শুভ জানে এই চোখের জলে আনন্দ আর দুঃখ দুটোই মিশে আছে। ও দু-জনেরই চোখ মুছিয়ে দিল। তারপর বলল, ‘তোমরা বোসো। আজ আমি তোমাদের একটা গল্প শোনাব। যেটা হওয়ার কথা ছিল না, সেটা কেমন করে হল—সেই গল্প। দিদা, তুমি জানো না, আজকের এই সাফল্যের জন্য যে লড়াইটার দরকার ছিল তার সূচনা হয়েছিল পুরীতে। মামণির সঙ্গে যেদিন জগন্নাথদেবের মন্দিরে গেলাম—’

শুভ ওর গল্পটা বলা শুরু করল। যখন শেষ হল, জানতেও পারেনি কখন যেন ওর দু-চোখ বেয়েও জল গড়িয়ে এসেছে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%