গৌতম দাশ

তিনকড়ি বিশ্বাস পেশায় উকিল। রোগা ফর্সা চেহারা। পুরুষ্টু গোঁফ আর হালফ্যাশনের চশমাপরা গম্ভীর মুখখানা দেখলে মনে হয় বেশ বিচক্ষণ ব্যক্তি। যদিও ওকালতিতে তেমন সুনাম অর্জন করতে পারেননি। প্রত্যেক শনি এবং রবিবার সন্ধ্যায় তিনকড়ি উকিলের বৈঠকখানায় আড্ডা বসে। সেখানে নিয়মিত হাজিরা দেন গোপেন সাহা, দীনবন্ধু কবিরাজ আর মহাদেব মল্লিক। অনিয়মিত আসেন সুদর্শন চক্রবর্তী।
গোপেন সাহা এলাকার নামকরা ব্যবসায়ী। শ্যামবর্ণ নাদুস-নুদুস চেহারা। বাজারে বড়ো দোকান আছে। এখন ছেলেদের হাতে দায়িত্ব দিয়ে নিজে একটু আলগা হওয়ার ইচ্ছায় সপ্তাহে দু-দিন সন্ধ্যেবেলায় আড্ডায় যোগ দেন। কিছুকাল ধরে ধর্মকর্মে মন দেওয়ার চেষ্টা করছেন। গলায় তুলসি কাঠের মালা। বাড়িতে মাঝে মাঝে কীর্তনের আসর বসান।
দীনবন্ধু কবিরাজের কালো রোগা ঢ্যাঙা শরীর। বাড়িতেই একটু-আধটু কবিরাজির চর্চা করেন। একালের মানুষদের কবিরাজি চিকিৎসায় অনীহা সম্পর্কে তার বেশ ক্ষোভ আছে। তবে আশা রাখেন অদূর ভবিষ্যতে মানুষ আয়ুর্বেদ চিকিৎসার প্রকৃত মূল্যায়ন করতে শিখবে। রোগ চাপা দেওয়া ছাইভস্ম অ্যালোপ্যাথ ওষুধ না গিলে কবিরাজির দিকে ঝুঁকবে। গাছগাছড়া যে ডেকে কথা বলে এটা বুঝবে। কথাটা ভাবলেই দীনবন্ধুর মনে পুলক জাগে। আয়ুর্বেদের সেই সুদিনে এখনকার এই মানুষ খুন করা অ্যালোপ্যাথ ডাক্তারগুলোর করুণ দশার কথা ভেবে দীনবন্ধু মাঝে মাঝেই আপনমনে ফিক করে হেসে ফেলেন। রাস্তাঘাটে, হাটেবাজারে যেখানেই কথাটা মনে পড়ে, হাসি আর চাপতে পারেন না।
মহাদেব মল্লিক বেঁটে। মাথা ভরতি টাক। পৈতৃক সম্পত্তি নেড়েচেড়েই তাঁর দিন কাটে। তবে সে সম্পত্তি ওড়াননি, বরং বাড়িয়েছেন। এ পর্যন্ত বিস্তর লোকের নামে মামলা ঠুকেছেন। সেই সূত্রেই তিনকড়ি উকিলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা। খুব সাদাসিধে ভাবে থাকেন। ধুতি আর ফতুয়ার চেয়ে জমকালো কোনো পোশাক তাঁর অঙ্গে কেউ কখনো দেখেনি। শীতকালে ফতুয়ার ওপর একখানা মোটা চাদর দেখা যায়। জিজ্ঞেস করলে মোলায়েম হেসে জবাব দেন, ‘প্লেন লিভিং অ্যাণ্ড হাই থিংকিং-এর থিওরিটা মেনে চলার চেষ্টা করি ভাই। কী হবে জাঁকজমকের মধ্যে গিয়ে। জীবন তো দু-দিনের খেলা রে ভাই। আজ আছি, কাল নেই।’
মাঝারি গড়নের সুদর্শন চক্রবর্তী স্থানীয় স্কুলের অঙ্কের মাস্টার। তিনকড়ি উকিলের স্কুলজীবনের সহপাঠী। কথা কম বলেন কিন্তু স্পষ্টবক্তা। আড়ালে অনেকেই বলে সুদর্শন চক্র।
শনিবার সন্ধ্যাবেলায় শীতকালের টিপটিপে অকালবৃষ্টিকে কটূক্তি করতে করতে সাধ্যমতো জোরে হাঁটছিলেন মহাদেব মল্লিক। বেশ দেরি হয়ে গেল। কে জানে এতক্ষণে চা-জলখাবারের পর্বটা হয়ে গেল কিনা! বিকালে একজন একটা ভালো জমির সন্ধান নিয়ে এসেছিল। তার সঙ্গে কথা বলতে বলতেই দেরি হয়ে গেল।
তিনকড়ি উকিলের বৈঠকখানার সামনের বারান্দায় ভিজে ছাতা মেলে দিয়ে মহাদেব হুড়মুড়িয়ে ঘরে ঢুকে উদবিগ্নভাবে টেবিলের দিকে তাকালেন। টেবিল ফাঁকা। অর্থাৎ খাবার দাবার এখনও কিছু আসেনি। স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে তিনি চেয়ার টেনে বসে পড়লেন। বৃষ্টি হলেও আজ সবাই হাজির। এমনকি সুদর্শন চক্রবর্তীও। গোপেনের মুখটা একটু হাসি হাসি দেখাচ্ছে।
মহাদেব জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি হাসছ কেন গোপেন ভায়া? কী নিয়ে কথা হচ্ছিল তোমাদের? আজ আমার একটু দেরি হয়ে গেল। সাধে কী আর বলে, বিষয় হল বিষ। পাঁচজন সৎলোকের মধ্যে এসে সময়মতো বসব, দু-চারটে সৎবাক্য শুনব, তারও উপায় নেই হে।’
গোপেন বললেন, ‘বলছিলাম ওই ব্যাটা জগার কথা। ব্যায়াম করে করে কেমন অসুরের মতো শরীর বাগিয়েছে, দেখেছ তো? রাতদুপুরে হঠাৎ দেখলে লোকে ভিমরি খায়। লোককে ভয় দেখিয়ে স্বার্থ সিদ্ধি করা ছাড়া কোন কাজেই বা লাগে এসব শরীর! দেশ আর দশের কাজে তো আর লাগে না। লোকের পিলে চমকে দেওয়ার শাস্তি আজ সকালে ভগবান হাতে হাতে দিয়েছেন। সেই কালো ষাঁড়টা, যেটা বাজারে ঘুরে বেড়ায়—বেশ ছুঁচলো শিং—চেনো তো মল্লিক?’
মহাদেব বললেন, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, আমি কেন সবাই চেনে। তা কী করেছে ষাঁড়টা? জগাকে তাড়া করেছে?’
একগাল হেসে গোপেন বললেন, ‘তাড়া মানে মোক্ষম তাড়া। জগা একটা লাল রঙের জামা পরে দৌড়োচ্ছে। পেছনে ষাঁড়টা। তার পেছনে বাজারের লোক। মাছ বাজারের পাশের গলি দিয়ে দৌড়ে বেরিয়ে বড়ো রাস্তায় যাওয়ার মতলব করেছিল জগা। কিন্তু শেষরক্ষা হল না। তাড়াহুড়োয় পা পিছলে বড়ো রাস্তার পাশের নর্দমায় উলটে পড়ে কালো দুর্গন্ধময় পাঁকের মধ্যে একেবারে নাকানি চোবানি। উঠতেও পারছে না। ষাঁড়টা সামনে দাঁড়িয়ে ফোঁস ফোঁস করছে। পেছনে শ-খানেক মজা দেখার লোক জড়ো হয়ে গেল।
অনেকক্ষণ নাকানি-চোবানি খাওয়ার পর শেষপর্যন্ত একজনের পরামর্শে গায়ের লালজামাটা খুলে ফেলে দিয়ে জগা নর্দমা থেকে উদ্ধার পেল। তাই বলছিলাম মল্লিক, ধর্মের ষাঁড় তো—ঠিক বুঝতে পারে, কে সৎ আর কে অসৎ। নইলে লালজামা তো আর বাজারে জগা একা পরেনি? বেছে বেছে ওকেই কেন তাড়া করল?’
জগার ওপর গোপেনের বেশ রাগ সেটা এখানকার সবাই জানে। গতবার জগা ওর ব্যায়ামাগারের উন্নতির জন্য গোপেনের কাছে চাঁদা চেয়েছিল। পায়নি। সুতরাং রাগ পুষে তক্কে তক্কে ছিল। একদিন গোপেনের বেশি দামে কেরোসিন বিক্রির ব্যাপারটা হাতেনাতে ধরে বেশ হাঙ্গামা করেছিল। তাই জগার হেনস্থায় গোপেন যে আহ্লাদে আটখানা হবেন, সেটা অস্বাভাবিক কিছু নয়।
গোপেন আবার বললেন, ‘ধর্মের কল এখনও বাতাসে নড়ে, বুঝলে? তুমি কী বলো তিনকড়ি? কিছুই তো বলছ না।’
সকলেরই চোখ গেল তিনকড়ির দিকে! তিনকড়ি উদাস নয়নে জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়েছিলেন। আলোচনা একবর্ণও তাঁর কানে ঢুকেছে কি না সন্দেহ।
দীনবন্ধু উদবিগ্ন গলায় বললেন, ‘ও তিনকড়ি, তোমার হল কী? শরীর-টরীর খারাপ করছে নাকি? রোগ-ব্যাধি হলে চিন্তা নেই—আমি আছি। হয়তো ছোটোমুখে বড়োকথা হয়ে যাবে, তবু বলি, গুরুজনের আশীর্বাদে আর তোমাদের পাঁচজনের শুভেচ্ছায় আয়ুর্বেদ আমার আয়ত্তে আছে। তুমি শুধু মুখ ফুটে বলো, তোমার কী হয়েছে?’
তিনকড়ি সবার মুখের দিকে একবার তাকিয়ে নিস্পৃহ গলায় ঘোষণা করলেন, ‘আমি হিমালয়ে যাব, গুরুভাইদের চেনাশোনা জায়গা আছে। সস্তায় থাকা-খাওয়ার বন্দোবস্ত করে দেবে।’
দীনবন্ধু আবার বললেন, ‘আমাদের পোড়াকপালে তো আর তীর্থদর্শন লেখা নেই। মনে বড়ো সাধ ছিল, একবার কাশীধাম দর্শন করব। সে আর হল কই? ওসবের জন্য পুণ্যফলের দরকার হয়। তা কদ্দিন থাকবে ওখানে?’
তিনকড়ি উদাসভাবে বললেন, ‘কতদিন? সে তো জানি না। তবে জীবনের বাকি দিনগুলো ধর্মকর্মের মধ্যে হিমালয়েই কাটাব ভাবছি।’
মহাদেব মল্লিকের মাঝে মাঝে একটা করে লবঙ্গ মুখে দেওয়ার অভ্যাস আছে। কৌটো খুলে তিনি একটা লবঙ্গ মুখে ফেলতে যাচ্ছিলেন। তিনকড়ির কথা শুনে লবঙ্গের কৌটোটা হাত ফসকে ঠক করে নীচে পড়ে গড়িয়ে গেল। লবঙ্গগুলো অনেকদূর ছড়িয়ে গেল। মহাদেব নীচু হয়ে হামাগুড়ি দিয়ে বেশ কষ্ট করে টেবিলের নীচে আধো অন্ধকারে লবঙ্গ আর কৌটোটা খুঁজতে লাগলেন। টেবিলের নীচে মাথাটা একবার ঠুকে গেল।
সুদর্শন এতক্ষণে মুখ খুললেন, ‘বলো কী তিনু? তোমার হঠাৎ এমন বৈরাগ্য? মোকদ্দমায় হেরে গিয়েছ নিশ্চয়ই?’
তিনকড়ি একটু বিরক্তির গলায় বললেন, ‘হার-জিত তো আছেই। সেজন্য নয়। গতকাল কোর্টে একজন মক্কেল আমার চোখ খুলে দিয়েছেন।’
একটু আগে আসা চিঁড়েভাজার বাটি থেকে একখামচা চিঁড়েভাজা মুখে পুরে চিবোতে চিবোতে দীনবন্ধু বললেন, ‘চোখ খুলে দিয়েছেন মানে? তোমার কি চোখের ব্যামো আছে নাকি তিনকড়ি? বলোনি তো কোনোদিন? চোখ কি রোজই বুঁজে যায়? তাহলে কষ্ট করে একটু পদ্মমধু জোগাড় করতে হবে। কেন যে ওই হাতুড়ে ডাক্তারগুলোকে মক্কেল বানাও কে জানে। লোকটা নির্ঘাৎ তোমার চোখ কোনো যন্তর-টন্তর দিয়ে টেনে-হিঁচড়ে খুলে দিয়েছে? খুব ব্যথা পেয়েছ নিশ্চয়ই?’
তিনকড়ি বললেন, ‘তোমার উতলা হওয়ার কোনো কারণ নেই দীনু। মক্কেল আমার জ্ঞানচক্ষু খুলে দিয়েছেন। এবারে বুঝেছ?’
দীনবন্ধু আরেক মুঠো চিঁড়েভাজা সামলাতে সামলাতে অস্পষ্ট গলায় বললেন, ‘অ। তাই বলো। মাঝে মাঝে এমন দুশ্চিন্তায় ফেলে দাও!’
সুদর্শন প্রশ্ন করলেন, ‘তারপর সেই চোখে কী দেখতে পেলে তিনু?’
তিনকড়ি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘দেখলাম, জীবনের এতগুলো বছর চোর-ডাকাত-পকেটমার-খুনি বদমাশদের সঙ্গে বৃথাই কাটালাম। একটা দিনের জন্যও সাধুসঙ্গ হল না। অবশ্য উনি ভরসা দিলেন, হতাশ হবেন না উকিলবাবু, এখনও সময় আছে। আপনাকে শুধু মনস্থির করতে হবে, ভবিষ্যতে কী চান? পাপী সান্নিধ্য পাপ পঙ্কে নিমজ্জন নাকি সাধুসঙ্গে আধ্যাত্মলোকে উত্তরণ।’
সুদর্শন বললেন, ‘বাপরে! শেষদিকটায় বেশ মেশিনগানের গুলি কটকট করে বেরিয়ে এল। শব্দের ধাক্কাতেই শ্রোতা কুপোকাত। অবিশ্যি কথাগুলো মিথ্যে বলেননি। অগুনতি চোর-জোচ্চোরের সঙ্গেই তোমার নিত্য মেলামেশা। আহা, মুখের ওপর এমন খাঁটি কথা বলে তোমার টনক নড়িয়ে দেওয়া তো চাট্টিখানি কথা নয়। মহাপুরুষটি কে আর কেনই বা তিনি কোর্টে তোমার মক্কেল, বড়ো জানতে ইচ্ছে করছে তিনু।
তিনকড়ি বললেন, ‘তিনি ঠিক আমার মক্কেল নন, আমার বন্ধু ত্রিলোচনের মক্কেল। তবে সে একই কথা। আসলে কি জানো, আমাদের এই সমাজ বড়ো স্বার্থপর। এখানে সাধুসন্ন্যাসী, পুণ্যাত্মাদেরও রেহাই নেই। তাঁদেরও মিথ্যে মামলায় ফাঁসানো হয়। সেইরকম একটা কেস আর কি! কিন্তু তাঁকে কী আর মিথ্যে মামলায় সাজা দেওয়া যায়? বেকসুর খালাস পেয়ে গেলেন। সেই জ্যোতির্ময় পুরুষের নাম তুচ্ছানন্দ। অতিতুচ্ছ থেকেও আনন্দ সংগ্রহ করতে পারেন বলে বোধ হয় তাঁর এই নাম।’
সুদর্শন বললেন, ‘ভাগ্যিস তিনি তোমার মক্কেল নয়। সেটা হলে তাঁকে বোধ হয় জেলের ঘানি ঘুরিয়েই আনন্দ সংগ্রহ করতে হত। শুনেছি তোমার হাতে পড়লে নির্দোষ লোকেরও নাকি যাবজ্জীবন জেল হয়ে যায়। যাক সেকথা। তাঁর উপদেশ শুনে কী ঠিক করলে তাই বলো।’
তিনকড়ি আবেগের সঙ্গে বললেন, ‘সেটা আগেই বলেছি। হিমালয়ে গিয়ে সদগুরুর কাছে দীক্ষা নিয়ে সাধনা করব। ঈশ্বরের হৃদয় গলানোর সাধনা। কে বলতে পারে, হয়তো কঠোর সাধনায় একবছরের মধ্যেই ঈশ্বরের কৃপায় সিদ্ধিলাভ হয়ে গেল।’
সুদর্শন বিরক্তির গলায় বললেন, ‘পাগলের মতো কি যে আবোল-তাবোল বকে যাও তার ঠিক নেই। অতই সোজা? গত পঁচিশ বছরের প্র্যাকটিসে তুমি একজন জজ সাহেবেরও হৃদয় গলাতে পারোনি, আর একবছরের মধ্যেই ঈশ্বরের হৃদয়ে গলিয়ে ফেলবে? অঙ্কটা মেলে না হে তিনু।’
তিনকড়ি ঈষৎ চটে উঠে বললেন, ‘ইস্কুলে অঙ্ক কষিয়ে কষিয়ে তোমার মাথায় আর কোনো পদার্থ নেই বুঝলে? এটা তোমার মাথায় ঢুকল না যে, ঈশ্বরের হৃদয় জজসাহেবের মতো পাথুরে নয়।’
চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে কাপটা টেবিলের ওপর নামিয়ে রেখে গোপেন বললেন, ‘বড়ো আনন্দ পেলাম তিনকড়ি। আবার একই সঙ্গে বড়ো কষ্টও হল। তুমি চলে গেলে চারদিকটা বড়ো ফাঁকা ফাঁকা ঠেকবে। আমাদের এমন জমজমাট আসরটাও ভেঙে যাবে। তা যাক। সেটা আমরা সয়ে নেব। পৃথিবীতে কত কিছুই তো সয়ে নিতে হয়। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি তোমার দ্রুত আধ্যাত্মিক উন্নতি হোক। আমাদের আর এ জীবনে মুক্তি নেই ভাই। কূপমন্ডূক হয়েই থাকতে হবে। তাই ভাবি, ভগবানের লীলা বোঝা বড়ো শক্ত। কাকে, কখন কেমন মতিগতি দেন সে আর আমাদের মতো পাপীতাপী মানুষ বুঝতে পারে? আচ্ছা, এবার তবে উঠি তিনকড়ি। বৃষ্টিটা ধরেছে বলে মনে হচ্ছে। একবার দোকানটায় ঘুরে যেতে হবে।’
একে একে বাকিরাও উঠলেন। একেবারে শেষে বিদায় নিলেন সুদর্শন চক্রবর্তী। যাওয়ার আগে চিন্তিতস্বরে তিনকড়িকে বলে গেলেন, ‘তোমার হিমালয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তের ব্যাপারে আমার খটকাটা কিছুতেই কাটছে না তিনু। অঙ্কটা তো মিলছে না।’
পরদিন সকাল বেলা বাজারে কাঁচা সবজিওয়ালা কানাই গোটাচারেক পোকা বেগুন আর পাঁচশো গ্রাম আধপাকা ঢ্যাঁড়স তিনকড়ির ব্যাগে পুরে দিতে দিতে বলল, ‘তাহলে স্যার আমাদের মায়া কাটালেন?’
তিনকড়ি অবাক হয়ে বললেন, ‘তার মানে?’
কানাই একগাল হেসে বলল, ‘সব শুনে ফেলেছি স্যার। আমাকে ফাঁকি দিতে পারবেন না। ভেবেছিলেন, সাধু হয়ে চুপিচুপি হিমালয়ে চলে যাবেন, কেউ জানতে পারবে না, তাই কী হয় স্যার? তবে আমার মনে একটাই দুঃখ আপনার মতো এমন সাদামনের খদ্দের বোধ হয় আর পাব না।’
তিনকড়ি বললেন, ‘এ সব কথা তোমায় কে বলল?’
কানাই মুচকি হেসে বলল, ‘কোনো ভালো খবর কি কখনো চাপা থাকে স্যার? দাবানলের মতো ছড়িয়ে যায়। শুধু একটা রিকোয়েস্ট আছে স্যার। ভবিষ্যতে যদি কখনো দু-চার দিনের জন্য এখানে আসেন, দয়া করে একবার আমার দোকানে পায়ের ধুলো দেবেন।’
মাছবাজারে মাছের দোকানদার জনার্দন দূর থেকেই তিনকড়িকে হাতছানি দিয়ে চিৎকার করে ডাকল, ‘উকিলবাবু! এদিকে—এদিকে।’
কাছে পৌঁছোলে বলল, ‘হাতে মাছের আঁশটে গন্ধ রয়েছে তাই, নইলে আপনার পায়ের ধুলো নিতাম উকিলবাবু। আপনাকে দেখলেও পুণ্য হয়। এত বিষয়সম্পত্তি, জমজমাট ওকালতি সবকিছু হেলায় ত্যাগ করে আপনি চলে যাচ্ছেন। উঃ! ভাবাই যায় না। যাক, আজ কী মাছ খাবেন বলুন? ভালো ইলিশ রয়েছে। বড়ো দেখে একখানা দিই? না কি ইতিমধ্যে মাছ খাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন?’
তিনকড়ি বুঝলেন, গোপেনের মারফত বাজারের সমস্ত দোকানদার ব্যাপারটা জেনে গেছে। মহাবিপদ হল তো! কিন্তু তিনকড়ি তখনও জানেন না তিনি বাজারে বেরিয়ে আসার পর বিপদটা তাঁর বাড়িতেই ঢুকে পড়েছে।
বাড়ির পরিচারিকা সদু অন্যদিনের থেকে কুড়ি মিনিট আগেই হন্তদন্ত হয়ে তিনকড়ির বাড়িতে চলে এসেছে। তখন রান্নাঘরে তিনকড়ির গৃহিণী কাত্যায়নী সকালের জলখাবারের ব্যবস্থা করছিলেন। এ অঞ্চলে কাত্যায়নীর মেজাজের নামডাক আছে।
রান্নাঘরে গিয়ে সদু চোখ বড়ো বড়ো করে গালে হাত দিয়ে বলে উঠল, ‘ও বউদি, বাজার থেকে কী সব কথা শুনে এলাম গো। শুনে পর্যন্ত ভয়ে যে হাত-পা একেবারে পেটের মধ্যে সেঁধিয়ে যাচ্ছে। কী হবে বউদি? আমার এ বাড়ির কাজটা থাকবে তো?’
কাত্যায়নী তার দিকে একবার তাকিয়ে আগের মতোই ময়দা চটকাতে চটকাতে বললেন, ‘কী হয়েছে আগে সেটা বলবি তো?’
সদু বলল, ‘কথাটা প্রথমে আমি মুদিখানার দোকানদার অসিতের মুখ থেকে শুনি। তবে ওর কথাটা আমি বিশ্বাস করিনি। তারপর যখন পরান গয়লা, আলুওয়ালা সনাতন, ডিমের দোকানদার দেবেন সবাই মিলে আমাকে কথাটা জিজ্ঞেস করতে শুরু করল, তখন বুঝলাম বিত্তান্তটা মিথ্যে নয়। কিন্তু সেটা আমার কাছে লুকোনোর কী দরকার বউদি? জানতে তো পারবই—আজ নইলে কাল। আমি তোমাদের বাড়িতে দু-বেলা কাজ করি অথচ কই আমাকে তো কিচ্ছুটি বলোনি! মনে দুঃখ হয় কিনা বলো!’
কাত্যায়নী তেতে ওঠা গলায় বললেন, ‘সাতসকালে মেজাজ গরম করিসনে সদু। এবারে এই ময়দার তাল তোর মুখে ছুড়ে মারব। আসল কথা না বলে তখন থেকে ঘ্যানঘ্যান করছিস!’
সদু বলল, ‘আর কী বলব বউদি? আমাদের বাবু যে সন্নিসী হয়ে হিমালয়ে চলে যাচ্ছেন, তুমি তো আমার কাছে ঘুণাক্ষরেও আভাস দাওনি!’
কাত্যায়নীর হাত থেমে গেল। কড়াগলায় বললেন, ‘কী বললি? উকিলবাবু সন্নিসী হয়ে হিমালয়ে চলে যাচ্ছেন?’
সদু বলল, ‘তবে আর বলছি কী? বাজারের সব্বাই তো সেই কথাই বলাবলি করছে। কেন, তুমি কিছু জানো না বউদি?’
কাত্যায়নী থালাসুদ্ধ ময়দার তাল মেঝেতে আছড়ে ফেললেন। থালাটা ঝনঝন করে ছিটকে লেগে বেলুন চাকির বেলুনটা উড়ে গিয়ে সদুর কপালে লাগল। সদু ‘বাবা-গো’ বলে কপাল চেপে বসে পড়ল। তার আগেই ময়দার তাল ছিটকে পড়েছে শুকনো ময়দার পাত্রের গায়ে। সেটা কাত হয়ে গড়াতে গড়াতে ঘরময় ময়দা ছড়িয়ে দিল। মুহূর্তের মধ্যে লন্ডভন্ড কান্ড। রান্নাঘরের মেঝেতে ময়দা আর জলের বন্যা।
কাত্যায়নী দু-চোখে আগুন ঝরিয়ে সংক্ষিপ্ত মন্তব্য করলেন, ‘হওয়াচ্ছি সন্নিসী! কাত্যায়নীকে এখনও চেনে না। বাঘ আর গোরুকে একঘাটে জল খাওয়াতে পারি। তোদের উকিলবাবু তো কোন ছার।’
কিন্তু তিনকড়ি বাজার থেকে ফেরার পর কাত্যায়নী এ বিষয়ে কোনো উচ্চবাচ্চ করলেন না। গম্ভীরভাবে জলখাবার দিলেন। আরও ঘণ্টাতিনেক শান্তভাবে অপেক্ষা করলেন। আসলে কাত্যায়নী দেখতে চাইছিলেন তিনকড়ি তাঁকে কিছু বলেন কি না। কিন্তু তিনকড়ি তাঁকে এ বিষয়ে কিছুই বললেন না।
দুপুরে খেতে দিয়ে কাত্যায়নী তিনকড়ির সামনে গুছিয়ে বসলেন। থমথমে গলায় বললেন, ‘এসব কী শুনছি?’
ভাতের দলাটা তিনকড়ির গলায় আটকে গেল। কিছু কিছু সময়ে গৃহিণীকে তিনি সোঁদরবনের ডোরাকাটা বাঘের চেয়েও বেশি ভয় করেন। কাত্যায়নীর গলা শুনে তাঁর মনে হল সেইরকম একটা দুঃসময়ের মুখোমুখি হতে চলেছেন।
কোনোরকমে ভাতের দলাটা গিলে নিয়ে বোকা বোকা স্বরে তিনকড়ি বললেন, ‘কী, বলো তো?’
কাত্যায়নী তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে বললেন, ‘ন্যাকামি করার জায়গা পাওনা? রাজ্যিসুদ্ধ লোক বলাবলি করছে উকিলবাবু সন্নিসী হয়ে হিমালয়ে চলে যাচ্ছে, আর কথাটার বিন্দুবিসর্গ আমিই জানি না। লোকের মুখ থেকে সেটা আমায় শুনতে হল? সন্নিসী হবেন! হওয়াচ্ছি। খেয়ে ওঠো তুমি—আজ তোমারই একদিন কী আমারই একদিন। হিমালয়ে নয়, তোমাকে আমি যমালয়ে পাঠাব। আগে শিগগির বলো, এসব কুমতলব তোমার মাথায় কে ঢুকিয়েছে?’
সত্যি কথা বলতে গেলে এই কথাই বলতে হয় যে, তিনকড়ির এই বিবাগী হওয়ার ইচ্ছের পেছনে কাত্যায়নীর ভূমিকা অনেকখানি। শুক্রবার সকালে কোর্টে বেরোনোর আগে প্রায় অকারণে কাত্যায়নী তিনকড়িকে মোক্ষম দাবড়ানি দেন। সংসারের প্রতি বিতৃষ্ণা নিয়েই তিনকড়ি কোর্টে পৌঁছোন। সেখানে তুচ্ছানন্দের উপদেশ সেই বিতৃষ্ণাকে তীব্র করে তোলে। আবেগের বশে গতকাল সান্ধ্য আড্ডায় তিনি কথাগুলো বলে ফেলেছিলেন। তাতে এত বিপত্তি ঘটবে, সেটা কে জানত?
তিনকড়ি আমতা আমতা করে বললেন, ‘মতলব আর কে ঢোকাবে বলো? নিজেই ভাবছিলাম, বয়স বাড়ছে, এবারে একটু ধর্মকর্মের দিকে মন দেওয়া উচিত। সেই কথাটাই কাল কাকে যেন বলেছিলাম, এখন ঠিক মনে পড়ছে না—সেই ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে পাঁচকান করেছে। লোকের স্বভাবই যে তাই। কী আর করা যাবে বলো। নইলে তোমার কাছে এতবড়ো কথাটা চেপে যাব, তাই কী হয় নাকি? আমার ঘাড়ে ক-টা মাথা?’

আগে শিগগির বলো , এসব কুমতলব তোমার মাথায় কে ঢুকিয়েছে ?
কাত্যায়নী ঝাঁঝালো গলায় বললেন, ‘কথাটা যেন মনে থাকে। ধম্মকম্ম করতে হয়, বাড়িতে বসে করো, আপত্তি করব না। কিন্তু বাইরে পা বাড়াবার মতলব করলে হাত-পা ভেঙে ঘরে ফেলে রাখব। কেউ তোমাকে বাঁচাতে পারবে না। কথাটা জানানো কর্তব্য—তাই জানিয়ে দিলাম।’
অগ্নিদৃষ্টি হেনে কাত্যায়নী উঠে গেলেন। তিনকড়ি ভেতরে ভেতরে শুকিয়ে উঠলেন। জানা কথা, আগামী কয়েক ঘণ্টাব্যাপী তুমুল দুর্যোগের সামান্য আভাস মাত্র। তিনকড়ির মুখে ভাত তরকারি বিস্বাদ হয়ে গেল।
সন্ধ্যার আড্ডায় সবার আগে গোপেন এসে তিনকড়িকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কি হে তিনকড়ি, শুভযাত্রা কবে? দিন স্থির হয়েছে? গোছগাছ করে ফেলেছ নাকি? যাওয়ার আগে আমরা তোমাকে একটা বিদায় সম্বর্ধনা দেব। তুমি কিন্তু আপত্তি করতে পারবে না, আগেই বলে রাখছি।’
তিনকড়ি একটু শুকনো হেসে বললেন, ‘যাওয়া আর হচ্ছে কই গোপেন? জানোই তো সংসার যেকোনো ভালো কাজে পদে পদে বাধা। চলে যাওয়ার কথায় আমার গিন্নি আহার-নিদ্রা ত্যাগ করে হাপুসনয়নে কান্নাকাটি করতে লেগেছেন। আজ সারাদিন একফোঁটা জল পর্যন্ত গ্রহণ করেননি। বাধ্য হয়ে সিদ্ধান্ত বদল করতে হল। কী করব বলো? আমি যে বড়ো নরম মনের মানুষ গোপেন।’
মুষড়ে পড়া মুখ নিয়ে তিনকড়ি বসে রইলেন।
কিছুক্ষণ বাদে সকলে এলে গোপেন কথাটা জানিয়ে দিলেন। রবিবারের আড্ডা তেমন জমল না। হাওয়া বুঝে একে একে সকলেই উঠে পড়লেন।
সবার শেষে বিদায় নেওয়ার সময় সুদর্শন মুচকি হেসে তিনকড়িকে বললেন, ‘বুঝলে তিনু, অঙ্ক না মিললে মনে বড়ো অস্বস্তি হয়। কাল থেকে বড়ো অস্বস্তিতে ছিলাম। আজ অঙ্কটা দিব্যি মিলে গেল। বড়ো আনন্দ হচ্ছে। চলি ভাই। গুডনাইট।’

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন