গৌতম দাশ

ওদের নামিয়ে দেওয়ার জন্য বাসটা মাত্র কয়েক সেকেণ্ড দাঁড়িয়েছিল। ওরা হুড়মুড়িয়ে নামামাত্রই বাসটা চলতে শুরু করল এবং আরও কয়েক সেকেণ্ডের মধ্যেই বাসের পেছনের লাইটটা বৃষ্টি এবং অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে গেল।
বাস থেকে বৃষ্টির মধ্যে নেমে মানস এবং তমাল মাথা বাঁচাবার জন্য একছুটে সামনের ঝাঁকড়া গাছটার তলায় চলে গিয়েছিল। আশপাশের দিকে তাকাবার ফুরসত পায়নি। বাসটা চলে যাওয়ার পর চারদিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল তাদের ভুল জায়গায় নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। এটা কোনো বাসস্টপ হতেই পারে না। তারা দাঁড়িয়ে আছে একটা তেমাথার মোড়ে। সামনে একটা টিমটিমে আলোর ল্যাম্পপোস্ট। ভিজে বালব-এর আলোয় বৃষ্টির ফিনফিনে ছাঁট দেখা যাচ্ছে।
যে গাছটার নীচে ওরা দাঁড়িয়ে আছে সেটার পাশেই একটা পুকুরের খানিকটা অংশ দেখা যাচ্ছে। আর দূরে দূরে রাস্তা বরাবর টিমটিমে আলোর ল্যাম্পপোস্ট। কোনোও বাড়িঘর নেই, দোকান নেই। জনমানবশূন্য বৃষ্টিমুখর সন্ধ্যায় এক অচেনা তেমাথার মোড়ে কেবল তারা দু-জন। এর মধ্যেই ঠাণ্ডায় প্রায় কাঁপুনি ধরে যাচ্ছে। অথচ এরকম হওয়ার কথা ছিল না। বিকালের মধ্যেই পৌঁছে যাওয়ার কথা ছিল। মাঝপথে যদি না বাসটা—
মানস আর তমাল। লোকে বলে মানিকজোড়। দু-জনেরই বয়স উনিশ। অবশ্য সঠিক ভাবে বলতে গেলে তমাল মানসের চেয়ে একুশ দিনের ছোটো। একই পাড়ায় থাকে। দু-জনেই একই কলেজের ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্র। ওদের দুই পরিবারের মধ্যেও যথেষ্ট ঘনিষ্ঠতা আছে।
বছর সাতেক আগে তমালের জ্যাঠতুতো দিদি পৌলমীর বিয়ে হয়েছে শঙ্করপুরে। শঙ্করপুর জায়গাটা পশ্চিমবঙ্গের মধ্যেই কিন্তু ঝাড়খন্ডের প্রায় লাগোয়া। মাঝারি আকারের শিল্পসমৃদ্ধ শহর।
তমালের জামাইবাবু ওখানকার একজন নামকরা ডাক্তার। প্রতিবারই পুজোর আগে পুলুদি আসে। প্রচুর পরিমাণে পুজোর কেনাকাটা করে। পুজোর ক-দিন জমিয়ে আড্ডা দেয়। সবাইকে নিয়ে হইহই করে মন্ডপে-মন্ডপে ঠাকুর দেখে বেড়ায়। পুলুদির নিজের কোনো ভাই-বোন নেই। ভাই বলতে তমাল। আর সঙ্গে সঙ্গে মানসও। ফিরে যাওয়ার সময় প্রতিবারই ওদের দু-জনকে ধমক সহযোগে নিমন্ত্রণ করে যায় এবং দুইবন্ধু মাথা নেড়ে যাওয়ার কথায় সায় দেয়। কিন্তু এপর্যন্ত দু-জনের একসঙ্গে যাওয়া হয়ে ওঠেনি। অবিশ্যি পুলুদির বিয়ের সময় গিয়েছিল কিন্তু তখন তো ওরা বেশ ছোটো। বছর তিনেক আগে তমাল একবারই মাত্র শঙ্করপুরে বেড়াতে গিয়েছিল জেঠু-জ্যেঠাইমার সঙ্গে। এবারে পুলুদি ভাইফোঁটার নিমন্ত্রণ করে গেছে দু-জনকে এবং দেওয়ালির আগে যেতে বলেছে। শঙ্করপুরের দেওয়ালি উৎসব নাকি দেখার মতো।
তাই এবারে মানস আর তমাল ঠিক করেই ফেলেছিল দেওয়ালির দু-দিন আগেই শঙ্করপুর যাবে। কলকাতা থেকে বাসে ঘণ্টা চারেকের পথ। অবিশ্যি ট্রেনেও যাওয়া যায়। তবে স্টেশনটা যেহেতু শহর থেকে বেশ খানিকটা দূরে তাই বাসে যাওয়াই সুবিধে। এসপ্ল্যানেড থেকে সাড়ে এগারোটার বাসটায় চাপলে বিকাল চারটের আগেই শঙ্করপুর পৌঁছে যাবে।
তমাল সেই কথাটাই টেলিফোনে পুলুদিকে গতকাল জানিয়ে দিয়েছে। পুলুদি বলেছে রানিতলা স্টপেজে নামতে। জামাইবাবু সেখানে থাকবেন। তোদের কোনো অসুবিধা হবে না।
বাসে সামনের দিকে পাশাপাশি দুটো সিট পেয়েছিল ওরা। জি টি রোড ধরে বাসটা চলছে। আস্তেআস্তে শহর হারিয়ে যাচ্ছে। রাস্তার দু-পাশে সবুজ গাছগাছালি শস্যখেত দেখা দিচ্ছে। এসব দেখতে দেখতে যেতে খুবই ভালো লাগছিল। সমস্যাটা দেখা দিল পানাগড় পেরোনোর পর। রাস্তায় অসংখ্য গাড়ি পরপর দাঁড়িয়ে আছে। ওদের বাসও থেমে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যেই জানা গেল—একটা পথ দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় মানুষ পথ অবরোধ করেছে খানিক আগে।
সুতরাং বসে বসে বাদামভাজা সহযোগে গল্প করা অথবা নীচে নেমে খানিকটা পায়চারি করা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না। রাস্তার দু-দিকে ধু-ধু করা মাঠ আর সামনে-পেছনে অজস্র থেমে থাকা গাড়ি। এই অবস্থায় বাড়ি ফিরে যাওয়াও অসম্ভব। বেলা সাড়ে চারটের কিছু আগে চোখে পড়ল দিগন্তে একখানা কালো মেঘ উঠছে।
চিরকালই মানসের বাস্তববুদ্ধি তমালের চেয়ে একটু বেশি। মানস বাসের জানলা দিয়ে মেঘখানা দেখে উদবিগ্ন হয়ে তমালকে বলল, ‘এখনই প্রায় সাড়ে চারটে বাজে। অবরোধ কখন উঠবে কে জানে! এর ওপর যদি বৃষ্টি আসে তাহলে কী হবে বলত পিন্টু (তমালের ডাকনাম)? ধর যদি রাত দশটার সময় বাসটা শঙ্করপুর পৌঁছোয়।’
তমাল বলল, ‘ডরো মাত! তাতেও নো প্রবলেম। রানিতলায় নেমে একটা রিকশায় উঠে গড়গড়িয়ে চলে যাব। দেশবন্ধু পার্কের পাশে সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল রোডে পুলুদির বাড়ি। এখন ওসব না ভেবে বরং আকাশের মেঘখানা পর্যবেক্ষণ করুন স্যার। এমন দৃশ্য কলকাতায় বসে কোনোদিন পাবেন না মিস্টার হাঁদুরাম।’
মানস বলল, ‘তুই দ্যাখ বসে বসে। আমি ব্যাং, ময়ূর বা কবি নই। শুনেছি মেঘ বৃষ্টি-টৃষ্টি দেখলে এদের খুব পুলক জাগে! আমার জাগে না।’
মানসের আশঙ্কাই সত্যি হল। বৃষ্টি এসেই গেল। আর খুব সম্ভবত বৃষ্টির জন্যই অবরোধও উঠে গেল। গাড়িগুলো নড়াচড়া শুরু করল। বাইরে তখন অন্ধকার নেমে গেছে। আরেকবার কনডাক্টরকে ওদের রানিতলায় নামিয়ে দেওয়ার কথা মনে করিয়ে দিল মানস। তারপর বাসে বসে থাকতে থাকতে দু-জনেরই কখন যেন ঝিমুনি এসে গিয়েছিল। বাস কনডাক্টরের ডাকে ধড়মড় করে উঠে তাড়াহুড়ো করে বাস থেকে নেমেছিল।
গাছের নীচে ক্রমশ এমন অবস্থা হয়ে দাঁড়াল যে, আর ওখানে দাঁড়িয়ে থাকা বৃথা। গাছ থেকেই যে পরিমাণ জল ঝরে পড়ছিল তা বৃষ্টির থেকে কম নয়। জামাপ্যান্ট, সঙ্গের ব্যাগ সবকিছুই ভিজে সপসপে হয়ে গেল। ঠাণ্ডায় কাঁপুনিটাও ক্রমশ বাড়ছে।
মানস বলল, ‘না:! এবার চল হাঁটা যাক। তারপর যা আছে বরাতে।’
তমাল বলল, ‘কিন্তু কোনদিকে যাবি?’
মানস বলল, ‘বাসটা যেদিকে গেল শহরটা নিশ্চয়ই সেই দিকে। আমরা সেই দিকেই যাব। কিন্তু প্রশ্ন হল, সেটা কতদূর?’
দু-জনে হাঁটা শুরু করল। সামান্য একটু পরেই বৃষ্টিটা বন্ধ হল। কিন্তু রাস্তায় জায়গায় জায়গায় জল জমে আছে। মন্দের ভালো রাস্তার ল্যাম্পপোস্টে আলোগুলো তখনও জ্বলছে। দু-জনেরই কথা ফুরিয়ে গেছে। সময়ের জ্ঞান হারিয়ে গেছে। শুধু হাঁটতে হবে বলেই হেঁটে যাচ্ছে। ক্রমশ রাস্তার দু-পাশে একটা-দুটো করে ঝুপসি অন্ধকার বাড়ি দেখা দিতে লাগল। কিন্তু এ পর্যন্ত কোনো গাড়ি বা লোকের দেখা মেলেনি।
হঠাৎ মানস দেখতে পেল সামনের দিক থেকে একটা রিকশা আসছে। যদিও এখনও অনেকটা দূরে আছে।
মানস প্রায় আর্তনাদ করে উঠল, ‘পিন্টু একটা রিকশা আসছে। ওটাকে থামাতেই হবে।’
তামাল বলল, ‘কিন্তু যদি ওটায় লোক থাকে?’
মানস বলল, ‘লোক থাকলে তাকে নামিয়ে দিয়ে এসে আমাদের নিয়ে যাবে। আমরা এখানেই দাঁড়িয়ে থাকব। মোটকথা রিকশাটাকে ধরতেই হবে। তবে মনে হয় রিকশাটা ফাঁকা। এদিকে তো কোথাও তেমন বাড়িঘর দেখলাম না। রিকশাওয়ালাই বোধ হয় বাড়ি যাচ্ছে।’
থামাতে হল না। রিকশাওয়ালা নিজেই থেমে গেল। রেনকোর্টে আপাদমস্তক ঢাকা। ওরা রিকশায় উঠে পড়ল। তমাল ঠিকানাটা বলে দিল। রিকশাওয়ালা বলল, ‘মালুম হ্যায়।’
তারপর রিকশাটা ঘুরিয়ে নিয়ে চালাতে শুরু করল। ঠাণ্ডা হাওয়া আটকাতে ওরা সামনের পরদাটা টেনে দিল। রিকশাওয়ালা যেখানে নিয়ে যায় যাক। দুশ্চিন্তা-ক্লান্তি আর ঠাণ্ডায় দু-জনেই সহ্যের শেষসীমায় পৌঁছে গিয়েছিল।
কতক্ষণ চলেছিল ওরা জানে না। চমক ভাঙল রিকশাওয়ালার কথায়, ‘আ গিয়া।’
চটপট রিকশা থেকে নেমে পড়ল দু-জনে। চারদিকে তাকিয়ে তমাল খুশি গলায় বলে উঠল, ‘একদম ঠিক ঠিকানায় পৌঁছে গেছি। এই তো পুলুদির বাড়ি।’
মানস রিকশাওয়ালাকে জিগ্যেস করল, ‘কত ভাড়া দেব?’
রিকশাওয়ালা বলল, ‘ভাড়া হামি কাল সুভে এসে লিয়ে যাব। লেকিন এক বাত জরুর মাইজিকে বোলবেন। হামার নাম ভজুয়া। হামি ডাগদারবাবুর বেটা পিরথুবাবুকে ইশকুলকে দিয়ে আসতাম অউর লিয়ে আসতাম। পরশু হামার এক অসুবিধা হয়ে গেল। হামি আর ওহি কাম পারবে না। আপলোগ মাইজিকে বোলবেন কি হামার ভাই হরিয়ার রিকশায় পিরথুবাবুকো ভেজনেমে কোই অসুবিধা হোবে না। অউর এক বাত। কৃপয়া ডাগদারবাবু অউর মাইজিকে হামর পরনাম জানাবেন।’

চারিদিকে তাকিয়ে তমাল খুশি গলায় বলে উঠল, ‘একদম ঠিক ঠিকানায় পৌঁছে গেছি। এই তো পুলুদির বাড়ি।’
‘ঠিক হ্যায়’ বলে দু-জনে গেট খুলে ভেতরে ঢুকে গেল। তারপর কয়েক মিনিটের মধ্যেই বাড়িময় হুলুস্থুল কান্ড।
ভিজে জামাকাপড় ছেড়ে আগুনের সেঁক নিয়ে, গরম দুধ খেয়ে তবে ধাতস্থ হল মানস আর তমাল। তারও খানিকক্ষণ পরে খাবার টেবিলে বসে সমস্ত ঘটনা একটু একটু করে বলতে শুরু করল দু-জনে।
বাস থেকে নামার জায়গাটার কথা শুনেই জামাইবাবু বললেন, ‘বুঝেছি। কনডাক্টর তোমাদের ‘‘রানিতলার’’ বদলে ভুল করে ‘রানিতালাও’ স্টপেজে নামিয়ে দিয়েছে। ওখান থেকে বাস বদল করে ঝাড়খন্ডের অনেক জায়গায় যাওয়া যায়। ওটা শহরে ঢোকার মুখে। এখান থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার। ইস! আমি বহুক্ষণ রানিতলায় দাঁড়িয়েছিলাম। ওই সময়ের মধ্যে কলকাতার দিক থেকে কোনো বাসও আসেনি। কোনো খবরও পাইনি। তারপর বৃষ্টি নামতে আমি চেম্বারে ফিরে যাই।’
তমাল বলল, ‘তবে জামাইবাবু রাস্তায় আরেকটু এগিয়ে ভাগ্যিস আমরা একটা রিকশা পেয়ে গিয়েছিলাম, তাই পৌঁছোতে পেরেছি। নইলে যে কী হত কে জানে!’
মানস বলল, ‘রিকশাওয়ালাটা অবশ্য আপনাদের চেনা। নাম বলল ভজুয়া। পৃথুকে ইশকুলে দিয়ে আসে, নিয়ে আসে।...ওঃ! কথাটা বলতে ভুলেই গেছি। ও আমাদের নামিয়ে দিয়ে বলল যে ওর কি একটা অসুবিধার জন্য আর পৃথুকে ইশকুলে নিয়ে যাওয়া নিয়ে আসার কাজটা করতে পারবে না। ওর ভাই হরিয়ার রিকশায় যেন পৃথুকে পাঠানো হয়। তাতে কোনো অসুবিধা হবে না। আমাদের রিকশা ভাড়াটাও তখন নেয়নি, কাল সকালে এসে নিয়ে যাবে বলেছে। আর আপনাদের দু-জনকে ওর প্রণাম জানাতে বলছে।
মানস লক্ষ করল দিদি আর জামাইবাবু একবার অবাক দৃষ্টিতে পরস্পরের দিকে তাকিয়ে নিলেন। দু-জনেই একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর জামাইবাবু ধীরে ধীরে বললেন, ‘তোমরা ঠিক শুনেছ, ও নাম বলেছে ভজুয়া?’
তমাল বলল, ‘হ্যাঁ তাই তো বলল। আমরা দু-জনেই তো শুনলাম। আর নইলে আমরা কেমন করে জানব যে ভজুয়া পৃথুকে ইশকুলে দিয়ে আসে, নিয়ে আসে?
জামাইবাবু বললেন, ‘সেটাও ঠিক কথা। কিন্তু...আসলে ভজুয়া পরশুদিন সকালে একটা লরির তলায় চাপা পড়ে মারা গেছে। লরিটা পেছন থেকে ওর রিকশায় ধাক্কা মারে। রিকশাটার বিশেষ কিছু হয়নি। কিন্তু ভজুয়া ছিটকে লরিটার চাকার তলায় পড়ে যায়। ও ওখানেই মারা যায়। আমার চেম্বারের খুব কাছেই ঘটনাটা ঘটেছিল। খবর পেয়ে আমি নিজে গিয়ে ওকে পরীক্ষা করেছি।
জামাইবাবু থামলেন। ঘরটা আশ্চর্যরকম নিস্তব্ধ হয়ে গেল। হঠাৎ-ই একটা রিকশার হর্নের শব্দে সবাই সচকিত হয়ে উঠল। রিকশাটা বাড়ির পাশের রাস্তা দিয়ে হর্ন বাজাতে বাজাতে ক্রমশই দূরে চলে গেল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই মিষ্টি সুরেলা আওয়াজে দেওয়ালে টাঙানো ঘড়িটা বাজতে শুরু করল। ঘড়ির দিকে চোখ গেল সকলেরই। কাঁটায় কাঁটায় রাত বারোটা।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন